হোম গদ্য গল্প ইংলিশ মিডিয়াম কন্যা, সৎ বাবা কিংবা মাকড়সা মা

ইংলিশ মিডিয়াম কন্যা, সৎ বাবা কিংবা মাকড়সা মা

ইংলিশ মিডিয়াম কন্যা, সৎ বাবা কিংবা মাকড়সা মা
299
0

খাওয়ার ফাঁকে কন্যার চোখ দেখে নিজের কাছে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। দোয়েল পাখির মতো একজোড়া চোখে কেমন আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এত বেশি নিষ্পাপ দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্বার্থপর মানসিকতা উন্মোচিত হয়ে যাবে ভেবে কাজে মন দেই। সবকিছু সাজিয়ে খাওয়ায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করি। মুরগির ঝলসানো ড্রামস্টিকে কামড় বসালে পোড়া গন্ধ ছড়ায়। মনে হলো রাউন্ড টেবিলে খেতে বসা চারজনের শরীর-মন পুড়ে যাচ্ছে কন্যার দীর্ঘশ্বাসে।

‘খাচ্ছ না যে! বলে আমার স্বামী একটা চিকেন ব্রেস্ট এগিয়ে দিলে বাধা দেই, চিকেন ব্রেস্ট আমার অপছন্দ। কেমন ছ্যাবালা ছ্যাবালা মাংসের থুব। ফার্মের মুরগিতে এলার্জি।


সন্তানদের ত্যাগ করে বিয়ের শৃঙ্খলে শুরু হলো দু’জন স্বার্থপরের দাম্পত্য জীবন।


ছেলের বউ ফার্মের মুরগি পছন্দ করে না দেখে শাশুড়ি প্রায় শোনায়, দেশি মুরগি ময়লা আবর্জনা খায়, ফার্মের মুরগি তার ধারে কাছে নাই। ফার্মের মুরগির হাড্ডি চামড়া সবই কত মোলায়েম।’ শাশুড়িকে কিছু বলি না। ভাবি, কৃত্রিম উপায়ে বেড়ে ওঠা সব কিছুই কৃত্রিম। আমার স্বামী চিকেন ব্রেস্টটা তার মায়ের প্লেটে উঠিয়ে দেয়। হঠাৎ বমি বমি লাগে। আমার সেই লোভী মাকড়সার গল্পটা মনে পরে। যে ছিল লোভী ও অলস। খাবারের সন্ধানের জন্য সে তার সন্তানদের নিজের কোমড়ে দড়ি বেঁধে ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিল, বাছাধনরা, যখনি খাবারের সন্ধান পাবে তখনি দড়ি ধরে টান দেবে। এভাবে তারা সবাই মা-এর কথা মতো উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম গেল। এক এক করে সবাই যখন খাবারের সন্ধান পেল দড়ি ধরে দিল টান। চারিদিক দিয়ে টান খেয়ে মাকড়সার কোমড় সরু হতে হতে এক সময় দম আটকে পটল তুলল। এই জন্য হয়তো মাকড়সার কোমড় এত সরু।… হঠাৎ কেন গল্পটা মনে হলো ভেবে অবাক হই।

দশটার খবর থেকে ভেসে আসছিল বিশ্ব পরিবার দিবসের কথা। আকাশ সংস্কৃতি সাধারণ মানুষকে দিবস সচেতন করেছে। কদিন আগে গেল মা দিবস। বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস…। আজ পরিবার দিবস। ভাবি, কোনটা আমার পরিবার! কাকে কাকে নিয়ে আমার পরিবার গঠিত। আমার কন্যা কী আমার পরিবারের একজন! ইচ্ছে করে ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ে পড়া পরিবারের সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ দিয়েছেন যে সব বিজ্ঞানী তাদের প্রশ্ন করি—মানুষের সঙ্গে হেঁয়ালি করার তাদের কি এত দায় পড়েছিল। কেন শুধু শুধু মানুষকে মিথ্যে প্রবোধ দেয়া!

চিকেনটা খুব মজা বউমা, কোথা থেকে আনছো! শ্বশুরের কথায় আমি মাংসসহ হাড্ডিটা বোনপ্লেটে রেখে সংযত হয়ে বলি, এই তো রাস্তার মোড়ে, ‘লাজিজ’ থেকে।

মাংসসহ ড্রামস্টিকটা ফেলতে দেখে আমার স্বামী বলে, চিকেন ভালো না লাগে বিফ কারিটা নাও!

বিফ আমি যতটা সম্ভব অ্যাভয়েড করি। বিয়ের পর ওয়েট প্রায় পাঁচ কেজির মতো বেড়েছে। তিন বছর আগের কথা। কন্যার বয়স তখন আট। মেয়ের এত বড় মেয়ে আছে একদম বোঝাই যায় না। কী সুন্দর ফিগার! ছেলে পক্ষের এক ভাবি অবাক হয়ে বলেছিল! আশ্চর্য বাহ্যিক সৌন্দর্যে মানুষ কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। খুশি খুশি বিয়েটা হয়ে গেল। তার আগে আট বছর আমি কিভাবে কাটিয়েছিলাম! অসমাপ্ত পড়ালেখা শেষ করা—কম্পিউটার ট্রেনিং—কিন্ডারগার্টেন টিচিং করে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ভেবেছি, একা জীবন চলে না। অন্য দিকে পারিবারিক প্রেশারও ছিল।

আমার স্বামীর তখন মাত্র দু’বছরের ডিভোর্সি জীবন। আগের ঘরের পুত্র মায়ের সঙ্গে আমেরিকায়। কিন্তু আমার কন্যা থেকে গিয়েছিল নানার বাড়িতে। সন্তানদের ত্যাগ করে বিয়ের শৃঙ্খলে শুরু হলো দু’জন স্বার্থপরের দাম্পত্য জীবন। দু’জনই পাকা অভিনেতার মতো অতীতকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের প্রেজেন্ট করতাম নতুন কাপল হিসাবে। নতুনরা আমাদের জুটি দেখে হিংসে আর পুরানরা করত ব্যঙ্গ।

ইদানীং আমি কন্যার মুখোমুখি হতে ভয় পাই, ঠিক ভয় না লজ্জা। মেয়েটিও যেন সব বুঝতে পারে। তার গভীর চোখ দুটোর দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। অথচ একদিন ভেবেছিলাম, কন্যাকে বুকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো এবং তখন আমি সবচেয়ে সুখী ছিলাম। একটা মাতৃত্ববোধ আমার মনকে আবিষ্ট করে রাখত। তখন প্রায় ভাবতাম, অদূর ভবিষ্যতে অনাগত সময়ের কাছে আমার অস্তিত্ব পৌঁছতে পারবে কন্যার হাত ধরে।

আমি এখন উঠব, খাওয়া শেষ করে কন্যা ওঠে দাড়ায়। ফার্মের মুরগির মতো তার শরীর। জাংক ফুডের প্রভাবে এ জেনারেশনের সব বাচ্চারা কেমন বালকী হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ ভাত-মাছ-মাংস তাদের কাছে বোরিং মনে হয়। পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডুইচ, চিকেন ব্রস্ট সঙ্গে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নিত্য নতুন ভিনদেশি ফাস্ট ফুড।

একদিন আমি কন্যাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলাম। যদিও এই কাজটি তার নানা-নানু করত। আইডি কার্ডে নামেমাত্র আমার ছবি ও নাম ছিল। গেটে দাঁড়িয়ে আমি বোকা বনে গেলাম। বিস্কিট কালারের শার্ট ও বটল গ্রিন স্কার্টে সব বাচ্চাগুলোকে মনে হচ্ছিল ক্লোন বেবি। ইংলিশ মিডিয়াম চাইল্ড ফার্ম। সেদিন নানাবাড়ি ফেরার পথে কন্যা প্রশ্ন করেছিল, মা, স্টেপ ফাদার মানে কী?

কন্যার প্রশ্নের সম্মুখে আমি বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। নিরুত্তর দেখে কন্যা বলে, সারিনা বলেছে, স্টেপ ফাদার মানে সৎ বাবা। তোমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে কি আমার সৎ বাবা!

আমি নিশ্চুপ।

ওর সৎমা ওকে টর্চার করে। কিন্তু ‘সৎ’ মানে তো অনেস্ট।

এর মাঝে স্বার্থপর সময়গুলো কেটে গেছে। বিয়ের পর নতুন শরীরী সুখে উন্মত্তের মতো নিজেকে ভাসিয়েছি। হানিমুন-শপিং-নতুন ফ্লাট-অফিসিয়াল পার্টি শ্বাসরুদ্ধকর ব্যস্ততা। কন্যারও ভোরে স্কুল, বিকালে আর্ট, রাতে কম্পিউটারে গেম। সময়কে কেমন দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ফাস্ট লাইফ। বুকে লেপটে শুয়ে থাকা কন্যাটি কেমন যোজন যোজন দূরে সরে গেল। মাসে একবার কি দু’বার দেখা। দেখা হলে যদি বলি, মিস করো না!

কন্যা বলে, একটা নতুন ফিল্ম এসেছে। স্পাইডার ম্যান থ্রি। দেখতে নিয়ে যাবে!

কিছুদিন আগেও সে পোকেমন কার্ড কিনে দেয়ার জন্য পাগল করে ফেলত। কত সব পোকেমনদের নাম বলত, পোকেমন, বোবাসর, পিকাচু, রাইচু, রাইকু, সুইকু, লুগিয়া, মিউটু। জানো মা, মিউটু হচ্ছে এভিল।

আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করতাম, পোকেমন আবার কী?

বিজ্ঞের মতো বলত, পোকেমন হচ্ছে পকেট মনস্টার। হিউম্যানরা পোকেমনদের ক্যাপচার করে ব্যাটেল করার জন্য। ব্যাটেলে উইন করে ৮টা ব্যাচ পেলে সে চ্যাম্পিয়ন শিপে ঢুকতে পারবে। সব শুনে আমি হা করে তাকিয়ে থাকতাম।


কন্যার চোখে আমার স্বামীর প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ লক্ষ করি নি, অবশ্য আমার কন্যা মা হিসাবে আমাকেও তেমন শ্রদ্ধা করে না।


এক সময় কন্যা পাগল ছিল ওয়ার্ল্ড ডিজনির কার্টুন কালেকশনে। পিনাকিউ, সিন্ডারেলা, দ্য লিটেল মারমেইড, স্নো হোয়াইট অ্যান্ড সেভেন ড্রাফস, থাম্বালিনা, বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট ছবিগুলো তার মুখস্ত ছিল। সেসব গল্পের কাহিনি প্রায় আমাকে শোনাত। আমি ছিলাম তার মুগ্ধ শ্রোতা। আমিও তাকে অনেক গল্প শোনাতাম; তার মধ্যে ঘুরেফিরে লোভী মাকড়সার কাহিনিটা চলে আসত বারবার। গল্পটা শুনে কন্যা আমাকে বলেছিল, স্পাইডার ম্যান এত ভালো কিন্তু স্পাইডার উইম্যান এত ব্যাড কেন!

আমি কন্যার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে বসে থাকতাম।

আমার কন্যার গাছগাছালি, লতাপাতা, প্রকৃতি এগুলোর প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবে প্লানেটের প্রতি ছিল তার দুর্নিবার আকর্ষণ। ছোটবেলা থেকে সে আয়ত্ত করে ছিল প্লুট, নেপচুন, ভেনাস, মার্কারি, ইউরেনাস, স্যাটার্ন, জুপিটার, মার্স, আর্থ এসবের গতিবিধি। আমার কন্যা মনে করত, কেউ মারা গেলে তাদের আত্মা প্লানেটে চলে যায় এবং পরে তারা এলিয়েন হয়ে যায়। তার বাবাও সেখানে আছে এবং সেও এলিয়েন হয়ে গেছে। তাই সে স্পেস ট্রাভেলিং-এর উপর পড়াশোনা করত এবং মুভি দেখত কিভাবে সেখানে যাওয়া যায়। বড় হতে হতে তার ধারণাগুলো পাল্টালে সে প্রশ্ন করত, বাবা তাহলে কোথায়? এই কঠিন প্রশ্নের উত্তরটি কন্যার কাছে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করা আমার জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। কন্যাকেও আমি দোষ দেই না। জানার আগ্রহে কিছুদিন পরপর তার কৌতূহলী মন উৎসুক হয়ে উঠত। ২য় বিয়ের ক’দিন আগে সকল কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে যখন আমি আমতা আমতা করছিলাম তখন কন্যা নিজের পছন্দ মতো একটা উত্তর খুঁজে বের করে বলল, আব্বু তোমাকে ডিভোর্স করেছে বলে তুমি রেভেঞ্জ নিতে চাও! ইজেন্ট ইট!

কন্যা আবারও উঠার জন্য ব্যস্ত হলে আমার স্বামী বলে, এখনই কেক কাটব। জাস্ট এ মোমেন্ট।

—মর্নিং- এ স্কুল।

—তাতে কী! একদিন স্কুলে না গেলে কিছু হবে না।

আমি স্বামীর কাছ থেকে একটু বেশিই আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, রাতটা আমাদের সঙ্গে থাকার প্রস্তাব দেবে। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অন্তত বলতে পারত! বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্য তারা এধরনের প্রস্তাব দেয় নি। আমি নিজেও কন্যাকে রাতটা থাকতে বলতে পারতাম! আসলে আমিও চাই না কন্যা আমাদের সঙ্গে থাকুক। আজ আমাদের স্পেশাল নাইট, আমার স্বামী আমাকে নীলাভ কালো একটি সিল্কের নাইটি গিফট করেছে, স্বামীর চোখের ভাষা বুঝি। সে বিয়ের রাতে প্রমিজ করেছিল প্রতিটি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে ডায়মন্ডের কিছু একটা গিফট করবে। বাসর রাতে দিয়েছিল হোয়াইট গোল্ডের উপরে ডায়মন্ড বসান রিং। পরেরটায় ডায়মন্ড নাকফুল। এবার সে ডায়মন্ড ইয়ারিংয়ের সঙ্গে নাইটি ফ্রি।

টিভিতে অদ্ভুত কিছু দেখে কন্যা হেসে ওঠে, হাসিটা একদম ওর বাবার মতো। আমার ভেতরটা মোচর দেয়। আমি কখনই ডিভোর্স চাই নি। চেয়েছিলাম অনন্তকাল অপেক্ষা করব। বছরের পর বছর লাপাতা থেকে একদিন ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল, কন্যার কথা একবারও ভাবল না।

হাসি মিলিয়ে গেলে কন্যা আবার অস্থির হয় যাওয়ার জন্য। আমার কন্যাকে আমি ছাড়া কেইবা এত বুঝতে পারে। এক সময় মনে করতাম, পৃথিবীতে কিছু ভালোবাসার প্রমাণ দেয়া লাগে না, আমার কন্যা আমার রক্তবিন্দু দিয়ে সৃষ্টি। কন্যার জন্মের পর মুখ দেখতাম আর ভাবতাম, কে বলে পিতা- মাতার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত, আমি বলি, সন্তানের পায়ের নিচে পিতা-মাতার বেহেস্ত। এতটাই আবেগী ছিল মন। তিন বছরে আবেগগুলো কেমন যেন আলগা হয়ে যাচ্ছিল, এর জন্য দায়ী কে! এসব ভাবলে কষ্টে গলা আটকে যায়। অনুভব করি মাথায় নয় বরং বুকের কোটরে কে যেন অনবরত হাতুড়ি পেটা করছে। কন্যার ভবিষ্যতের কথা ভাবলে হাত-পা ঘামত। ব্যাপারটা নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করলে সে কন্যাকে আমাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে থাকার—বেড়াবারশপিং করার পরামর্শ দিত।

এদিকে স্ত্রীকে সুস্থ রাখার জন্য আমার স্বামী তৎপর হলে আমাকে কিছুটা স্বস্তি দিত। পরক্ষণে আমার শাশুড়ির গোমড়া মুখ পুনরায় অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিত। আমাকে হাতের তালু মুছতে দেখে আমার স্বামী বুঝতে পেরে বলে, আবার টেনশন করছ! ডাক্তার-না তোমাকে রিলাক্স থাকতে বলেছে!

স্বামীর কথায় আমার বুকে হাতুড়ি পেটা বন্ধ হয় কিছুটা। সে রাউন্ড টেবিলে বৃত্তাকার কেকটি বসিয়ে সবাইকে ডাকে। কেকটি আমার কন্যা এনেছে। মায়ের তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকিতে এগারো বছর কন্যার গিফট। ব্লাক ফরেস্টের উপরে গোলাপি ক্রিম দিয়ে লেখা, হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। আম্মু-আব্বু সে কিছুই লেখে নি। কিন্তু কেন! ব্যাপারটা আমি দেখেও এড়িয়ে গেছি। প্রশ্ন করি নি। কার কাছে প্রশ্ন করে জানব, কেন আমার কন্যা আব্বু-আম্মু কথাটি লিখল না!

কন্যার চোখে আমার স্বামীর প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ লক্ষ করি নি, অবশ্য আমার কন্যা মা হিসাবে আমাকেও তেমন শ্রদ্ধা করে না। শ্রদ্ধা জিনিসটা এ জেনারেশনের ডিকশনারিতে নেই বললে চলে। শ্রদ্ধা বোধ না থাকুক কন্যার চোখে সামান্য নির্ভরতাটুকু কখনও দেখি নি। আমি কম্পিত হাতে ছুড়িটা তুলে কেকটা দু’ভাগ করে ফেলি।

রাতের ঘড়ি এগারোটার ঘর অতিক্রম করলে কন্যাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য স্বামীর সদ্য কেনা টয়োটা প্রেমিয়োতে চড়ি। ড্রাইভিং সিটে আমার স্বামী, পাশে আমি ও পিছনের সিটে কন্যা। আকাশে তখন ক্লান্ত তারাদের ম্লান আলো। মেঘেরা চেপে বসেছে আকাশের বুকে। অপাঙ্‌ক্তেয় চাঁদ ডুবে মরবে মেঘের আড়ালে। মনের অজান্তে গেয়ে উঠি, আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা …


সাইড রিয়ার ভিউয়ে দেখি কন্যার মায়াবী মুখ। ভেতরটা হু হু করে উঠলে পথের কাছে প্রার্থনা করি, ও পথ! তুমি কোনোদিনই শেষ হইও না প্লিজ!


ছড়াটা না শুনলে কন্যার ঘুমই আসত না! আমি কাত হয়ে কন্যার দিকে তাকাই, স্বর নামিয়ে বলি, কেকে আব্বু-আম্মু মেনশন করলেই তো পারতে!

ওহ মাম, ডোন্ট বদার মি! আই ফিল টায়ার্ড।

কন্যার কথা বলার স্টাইল দেখে আর কথা বলার সাহস পাই না। হঠাৎ মনে হলো ঝি’য়ের পেটে মা’য়ের জন্ম। গ্লাসের বাহিরে অসহায় দৃষ্টি প্রসারিত করি। নির্জন রাতের চোখ বেয়ে কষ্ট ঝরবে হয়তো। নিজেকে খুব বেশি অসহায় মনে হয়, আমি কি কন্যার চোখে নির্ভরতা এনে দিতে চেয়েছিলাম নাকি নিজে নির্ভর করতে চেয়েছিল কারো উপর! নিজের উপার্জন করার ক্যাপাবিলিটি তো আমার ছিল।

ব্যাপারটা একটু বেশি কম্পিকেটেড করে ফেলছি না তো! যারা হোস্টেলে থাকে অথবা দেশের বাহিরে পড়তে যায় তারাও তো বাবা-মা ছাড়া থাকে। আমি সেরকম ভাবলেই তো পারি! ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি থামলে দেখি স্বামীর অপেক্ষামাণ দৃষ্টি, ঘণ্টাখানেক পর যা সিল্কের নাইটির নিচে উন্মোচিত হবে। সেই দৃষ্টি আজ আমাকে মোটেও পুলকিত করল না। সাইড রিয়ার ভিউয়ে দেখি কন্যার মায়াবী মুখ। ভেতরটা হু হু করে উঠলে পথের কাছে প্রার্থনা করি, ও পথ! তুমি কোনোদিনই শেষ হইও না প্লিজ!

জেসমিন মুন্‌নী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ঢাকা। রক্তের গ্রুপ ‘বি’ নেগেটিভ।

শিক্ষা : বিএ [অনার্স], এমএ [বাংলা], চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই—

মৌ [আন্দরকিল্লাহ পাবলিকেশন]
শামুক রাজা ঝিনুক রাণী [নওরোজ পাবলিকেশন]
মানুষ ও মানুষের গল্প [শ্রাবণ প্রকাশনী]
কুয়াশা ও দীঘশ্বাসের দিন [শুদ্ধস্বর প্রকাশনী]
লেখক ও নায়িকার দ্বিতীয় পর্ব [জয়তী প্রকাশনী]
ইস্তাম্বুল উপাখ্যান [ভ্রমণ গদ্য, শ্রেষ্ঠ প্রকাশনী]
জীবনানন্দ দাশের লক্ষ্মীপেঁচা উপন্যাস, মেঘ প্রকাশনী]
সুখী মানুষের দেশে [ভ্রমণ গদ্য, তিউরি প্রকাশনী]

সম্পাদনা—

‘দ্রাঘিমা’ গল্প বিষয়ক অনলাইন পত্রিকা।

‘ইস্তাম্বুল উপাখ্যান’ গ্রন্থের জন্য সৈয়দ মুজতবা আলী পুরস্কার, ২০১৭ অর্জন।

শ্রেষ্ঠ শিক্ষক [ইন্টারন্যশনাল টার্কিশ হোপ স্কুল, ঢাকা, ২০১৬]

অন্যান্য—

বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পতে গল্পের উপর কাজ করেছেন।
এম. এম. নুরুল হক ফাউন্ডেশনের মেম্বার।
পলাশডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপদেষ্টা।
উত্তরা লেডিস ক্লাব ও লায়ন্স ক্লাবের মেম্বার।

ই-মেইল : jasminmunni70@gmail.com