হোম গদ্য গল্প আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম

আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম

আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম
1.35K
0

পনেরো বছর ধরে একটি গল্প আমাকে তাড়া করছে অন্ধ তিরের মতো। আমি পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছি সেই গল্পের গ্রহ থেকে যাযাবর বেদুইনের মতো। যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় সেই তিরের কাঙ্ক্ষা । যাতে অবমুক্ত থাকে আমার গাল্পিক জীবন। তবু কেন জানি মনে হয়—আমি যেন সেই গল্পের কাঁটাতারেই পড়ে আছি। মনে হয়, আমি গল্পের খুব নাগালেই হাঁটুমুড়ে বসে আছি। এই বুঝি ধরে ফেলছে সে আমার অন্তর-বাইর। এই বুঝি জড়িয়ে ধরছে আমার যাপিত শূন্যতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পনেরো বছর ধরে একটা গল্প আমাকে তাড়া করছে অন্ধ তিরের মতো।

পনেরো বছর আগে লাভরোডের কোনো এক কফিশপে আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের নিব খুলে। শ্রাবণের মাস। বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। তৃষ্ণার তীব্রতা থেকে উৎসারিত হতে চাইছিল—

‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়’


হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটছি কোনো এক গল্পের পথে। 


তারপর কাঁটার উপর হাঁটতে হাঁটতে একটি একটি করে কেটে গেছে পনেরোটি বছর। পনেরো বছর ধরে একটা গল্প আমাকে তাড়া করছে অন্ধ তিরের মতো। হ্যাঁ, পনেরো বছর আগে লাভরোডের কোনো এক কফিশপে আমি একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের নিব খুলে। অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার—আজ সেই নিবে কোনো কালি নেই। আজ সেই হৃদয় ক্লেদাক্ত—রক্তাক্ত। আর পনেরো বছর ধরে আমি একটা গল্পও লিখতে পারি নি। এই না পারার আক্ষেপঅনলে হাঁটতে হাঁটতে জানাশোনা ছেড়ে এত দূর আসা। এতটা দূরতম হওয়া। পৃথিবীর সমূহ গল্পের সঙ্গে এতটা দূরত্ব-দেয়াল গড়ে তোলা। দূরত্ব-দেয়াল বাড়তে বাড়তে কোনো একদিন হয়তো আকাশটাই ছুঁতে চাইবে। আকাশের কথা মনে হলে বাবার কথা মনে পড়ে যায়। কোনো একদিন শরতের আকাশ এঁকে ফার্স্ট প্রাইজ পেলে বাবা বলেছিলেন, ‘তুই একদিন আকাশ হবি।’ অথচ আমাদের কোনো আকাশ নেই। যা আছে—সবটুকু শূন্যতা।

অথচ কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও গল্প হয়ে উঠেছে কল্পনার ধমনিতে প্রবাহিত তরঙ্গমালার ভেতর। চিন্তার কাপড় আর বিবিধ রঙের সুতার ফোঁড় পেরিয়ে বেরিয়েছে কত রেডিমেড কাহিনি-কামিজ। অথচ আদৌ সেই গল্পটা লেখার ফুসরত হলো না। অথচ আজও আমি তাড়িত হই সেই না লেখা গল্পের অদূরস্পর্শে। সেই না বোঝার গল্পের কোরকে আজও হারিয়ে যাই উদাস চাতকের মতো।

কী ছিল সেই গল্পে? কোনো এক নিছক গল্পের ভঙ্গিমা—নাকি ভঙ্গিমার আড়ালে লুকিয়ে রাখা কোনো এক আমির আবডাল? গল্প হলে সে গল্প কার? আমার—নাকি আমাকে ফেলে আসা কোনো এক দূরাতীতের? নাকি অন্য কারো লতাপাতার—যে আমাকে ডিঙিয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনো এক দূরতম ছায়া? নাকি অন্য কোনো মায়াবত নৌকোর মর্মরে শীত? যার কোনো ঘাট নেই—পারাপারের তাড়া নেই—তমসা নেই। বাড়িতে, অফিসে, কফিশপে, আড্ডায়, এমনি এমনি অনেক জায়গায়—অনেকভাবেই—অনেকেই প্রশ্নের ছুরি বসিয়েছিল আমাকে। আমি কেবল নিরুত্তর তাকিয়েছিলাম আমার অসীম অসহায়ের দিকে—অপার অপরাগতার দিকে—অবারিত আঁধারের দিকে। যে আঁধার-জঙ্গলে আমি এক নিভু নিভুর নিঃসঙ্গ জোনাকের কাফেলা।

আমি এও জানি যে, আমাকে আজীবন বয়ে যেতে হবে সেই অব্যক্ত গল্পটাকে। যে পনেরো বছর ধরে আমাকে তাড়া করছে অন্ধ তিরের মতো। আর যাকে আমি পনেরো বছর আগে লাভরোডের কোনো এক কফিশপে লিখতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের নিব খুলে।

সত্যিই আমি যেন সেই গল্পের নিরন্তর বাহক। তার অর্গলময় দরজার সম্মুখে বিস্মৃতির বন্দুক সজ্জায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো এক অন্ধ প্রহরী। জীবনানন্দের সমগ্র থেকে উড়ে আসা কুয়াশাকুহকের ভেতর যাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি—একাকী—খুব সংগোপনে। নিস্তব্ধ শিশিরের মতো এক শীত থেকে আরেক শীত। কাল থেকে কালান্তর। যেন হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটছি কোনো এক গল্পের পথে। এই পরিভ্রমণের শেষ কোথায়—কোথায় সেই অন্তিম গন্তব্যগহন? কেবল শামসুদ্দীন আবুল কালামের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেটে ছড়িয়ে পড়ে ‘পথ জানা নাই’।

অনলাইন সাহিত্য পোর্টাল ‘পাতাপ্রকাশ.কম’-এর জাকির ভাই কোনো এক গল্পের জন্য সেই পনেরো বছর ধরে ঘুরছেন আমার গল্পহীন ঘোড়ার লাগাম ধরে। আর কতদিন লোকটিকে ঘুরাব? নিজেও জানি না। ভাই আমাকে দিয়ে হবে না। আমার ভেতর কোনো গল্প নেই। আমি পরিত্যক্ত এক ডাকবাক্স। যেখানে কোনো চিঠি ফেললে চিঠি তার পথ হারিয়ে ফেলে, প্রাপকের ঠিকানা ভুলে যায়। জাকির ভাইকে বারবার বলেছি।

অথচ এই জাকির ভাই-ই আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে সহস্র পথ ও গন্তব্যের গল্প। আমাকে দিয়েই জাগিয়েছে ঘুমিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের অশোক। শুষ্ক মাটিতে ফুটিয়েছে রক্তকরবীর রক্তাভ নাচ। জোড়া লাগিয়েছে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের ফাঁক ও ফাটল। বর্ণাঢ্যময় করে তুলেছে স্বপ্ন ও সৌন্দর্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া জঙ ধরা চোখ ও চুম্বন।


মেয়ে মানুষের কান্না শুনলে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে হয় আমার।


জাকির ভাই প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও আমাকে ফোনে অনুরোধের নুড়ি ছোড়েন কোনো এক গল্পের জন্য। আর তখনই আমার বয়ে নিয়ে যাওয়া গল্পের কথা মনে পড়ে খুব করে। পৃথিবীর সমূহ গল্প ভুলতে যাওয়া মানুষটি এই একটা গল্পের ভেতরই যেন বেঁচে আছি একাকিত্বের পনেরো বছর। আমি চাই এই একটা গল্প অন্তত কেউ না জানুক আমাকে ফসকে। এই একটা গল্পই বেঁচে থাক একান্ত ব্যক্তিগতভাবে একাকিত্বের অন্তর্জালে। মাছ ও মসলার মতো—শাক ও সবজির মতো—ভাত ও ভর্তার মতো জড়িয়ে থাক আমার রোজকার প্রণালির ভেতর।

কোনো এক জ্যোৎস্না ধোঁয়া নিশুতি রাতে মা আমাকে বলেছিলেন, কিছু কিছু গল্প থাকে মানুষের, যা ব্যক্ত করার মতো কোনো মানুষ পাওয়া যায় না আজন্মকাল। বোনের মেহেদি মুছে যাওয়ার গল্পটা আজও আমাদের বাড়িতে এরকম জ্যোৎস্না ধোঁয়া নিশুতি রাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। খুন হবার পর হিমঘর থেকে বাবাকে আনতে গিয়ে দেখি—তার বুকপকেটে লেগে আছে কোনো এক মেয়ে মানুষের করুণ কান্নার দাগ। মেয়ে মানুষের কান্না শুনলে আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছে হয় আমার।

এইসব গল্পের কুয়াশায় ডুব দিলে উবে যায় সমূহ আহার, নিদ্রা ও তৃষ্ণার ক্রিয়া। পাল্টে যেতে থাকে আমার অস্তিত্ব অদ্ভুতভাবে। আমি ফুল স্পর্শ করলে হয়ে যায় করুণ কণ্টক। কোমলতা স্পর্শ করলে হয়ে যায় কদর্য কুঠার। প্রাণ স্পর্শ করলে হয়ে যায় নিষ্প্রাণ নিষ্প্রভ। সবুজ স্পর্শ করলে হয়ে যায় ধূপধূসর ধোঁয়াশা। মাঠ স্পর্শ করলে হয়ে যায় বিরান মরুভূমি। আমার রূপ হারাতে থাকে অরূপের গহিনে। আয়নায় দাঁড়ালেও আমাকে চিনতে পাই না। মুছে যাই কোনো এক দৃশ্যময় আমি। আমি ভুলে যাই—আগামীকাল বলে কোনো এক দিবসের আসন্নতা আছে। আমার মনে থাকে না নিজস্ব জন্মতারিখ। কেবল ঈশপকে ঈশ্বর ভেবে ভুলের খাতা দীর্ঘ হতে থাকে। কোনো একদিন পরীক্ষার খাতায় গ্যালিলিওয়ের জীবনী লিখতে গিয়ে আমার ভেতর সূর্যকে প্রদক্ষিণের কাঙ্ক্ষা জাগে। সেই থেকে আমি সূর্যের চারদিকে ঘুরছি।

আমার সব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কেবল গল্প ছাড়া। কেউ কেউ থানায় আমার নামে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ অত্যাচারী জেরার রিং দিয়ে আমার অব্যক্ত গল্পটাকে ব্যক্তিগত বারান্দার বিরিশিরি থেকে টেনে আনবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। অবশেষ সব কলুর বলদে পরিণত হলে তারা আমার পায়ে বেড়ি পরিয়ে ত্রাণের মতো ছুড়ে মেরেছে গল্পভুখাদের মাঝে।

চৌহদ্দি থেকে উড়ে আসতে থাকে অজস্র অন্ধ তির। কোনো এক গল্পের জন্য এতটা তাড়না, এতটা প্রণোদনা, এতটা অত্যাচার কখনই বোধ করি নি। অবশেষ গল্পের ভেতর যেতে যেতে সন্ধান করতে হয় কোনো এক গল্পকে। যাকে কখনও দেখি নি। যার সঙ্গে কখনও আলাপ হয় নি লাভরোডের কোনো এক কফিশপে। অথবা প্রাচীন সৌন্দর্যের তাঁবুতে আড্ডারত অর্বাকের ক্যানভাসে। অথবা যার সঙ্গে ঘোরা হয় নি শাহবাগের ভিড় ঠেলে লোকাল বাসে চেপে শামসুর রাহমনের পুরাতন ঢাকা।

এমন এক গল্পের নিকটতম হলে টের পাই বেগানা বর্ণ, গন্ধ। ছুঁতে থাকি অচেনা সুর ও সুরা। তখন শাদামাটা কথা আমার ভালো লাগে না। পত্রিকায় ছাপানো আগেরকার গল্পগুলো ছিঁড়ে ফেলতে প্রবলভাবে উদ্ধত হয়ে ওঠে ইচ্ছেরা।

আমি এমন-ই এক গল্পের কাছে পৌঁছাতে চাইছি পনেরো বছর ধরে। যেখানে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসও পৌঁছাতে পারে নি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’-তে। ফ্রয়েডের একরোখা চোখ যেখানে প্রতিসরিত হয় নি, রয়ে গেছে ব্যাখ্যাতীত। এমন-ই এক গল্প আমাকে পনেরো বছর ধরে তাড়া করে। এমনই এক গল্প পনেরো বছর আগে কোনো লাভরোডের এক কফিশপে আমি লিখতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের নিব খুলে।


আমি অবমুক্ত হতে চাই সেই গল্পের মায়াবতী ঘর ও ঘোরের চৌকাঠ থেকে।


কোনো এক বৃষ্টির রাতে তাকে লিখতে বসলে আমার সব গল্প কবিতা হতে থাকে। বেদানার দানার মতো বেরিয়ে আসে কোনো এক অস্পর্শী নারী। যাকে আমি ফেলে এসেছিলাম লাভরোডের কোনো এক কফিশপে। আমি কবিতার পেছনে ছুটি। নারী প্রবল আত্মহননের দিকে ছুটে। কিন্তু আমি চাইছিলাম যে, গল্পে আমি নামের কেউ থাকব না। আমি আরও প্রবলভাবে চাইছিলাম যে, বেদানার দানার মতো বের হয়ে আসা অস্পর্শী নারী আমাকে স্পর্শ করুক কেবল কান্না ও করুণা ব্যতীত। আমার নরম সিনার ভেতর বেঁচে থাকুক রক্তাভ ভোরের মতো।

অথচ চরিত্রগুলো ভায়োলিনের সুরে মুখিয়ে ছিল চলে যাওয়ার স্রোতে। গল্পটা থেমে যায়। আমি আর লিখতে পারি না। গল্প আসে না। রাতের পর রাত কেটে যায় নিদ্রার নিদানে। দিনের পর দিন কেটে যায় দীর্ঘ দহনে। গল্প আসে না। সেই একটা গল্প ব্যতীত কোনো গল্প ধরা দেয় না। আমি অবমুক্ত হতে চাই সেই গল্পের মায়াবতী ঘর ও ঘোরের চৌকাঠ থেকে। সেই গল্পগহন থেকে বেরিয়ে যেতে চাই কোনো এক গহিনতম নৈঃশব্দ্যে। ভুলে যেতে চাই আমার গল্পের কোনো ব্যক্তিগত বিরিশিরি নেই। নিজেকে বিশ্বাস করাতে থাকি—লেখকের চাঁদের আলোর মতো নিজস্ব কোনো গল্পসত্তা থাকতে পারে না। সে যা লিখে—সব কল্পনার আবর্তন থেকে নেয়া আজন্ম দায়। চরিত্র ও ঘটনাবলি তো ঘূর্ণায়মান জগতেরই অনন্তর অভিব্যক্তি কেবল।

কোনো একদিন গল্প থেকে উড়ে আসা চরিত্র বলে, সে কথা না পাওয়ার পাপে মরে গেছে। অপ্রাপ্তির পথ তাকে নিয়ে গেছে নিরুদ্দেশের মাঠে। কে সে? যাকে পনেরো বছর আগে কোনো এক কফিশপে আমি লিখতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের নিব খুলে। শ্রাবণের মাস। বাইরে মুষুল ধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। তৃষ্ণার তীব্রতা থেকে উৎসারিত হতে চাইছিল—

‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়’


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

রেজাউল ইসলাম হাসু

জন্ম ১০ ডিসেম্বর, ১৯৮৭; রংপুর।

শিক্ষা : হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা।

পেশা : চাকরি [একটি বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে।]

প্রকাশিত বই—
ওকাবোকা তেলাপোকা [শিশুতোষ, ২০১৬]
এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [শিশুতোষ, ২০১৭]

ই-মেইল : rejaulislamhashu1987@gmail.com

Latest posts by রেজাউল ইসলাম হাসু (see all)