হোম গদ্য গল্প আমনের পানি

আমনের পানি

আমনের পানি
255
0

গতকালের ঘটনাটাকে কোনোভাবেই মন থেকে সরাতে পারছে না সালেক। বিশ্রী একপ্রকার অস্বস্তি ও নুনের ছিটা লাগা ঘায়ের মতো করে জ্বলছে তার। মফিজুর, হাসান, জামিরুল এদের কারো থেকে সে কোনো অংশে কম টাকা দিয়েছে এমন নয়। অথচ তার সাথেই কিনা এমন হলো!

এক আকাশ মনখারাপ সাথে নিয়ে সালেক হালটের দিকে হাঁটতে থাকে, উদ্দেশ্যহীন। আশ্বিনের আকাশে এই সময় এতটা কালো মেঘ থাকার কথা নয়। গ্রামটাকে পেছনে ফেলে একেবারে বিলের কালো পানি যে অংশটায় এসে এ বছর থেমে গেছে সেইখানে এসে দাঁড়ায় সালেক। পাটের মরসুম শেষ, তারপরও যেন পচা পাটের কিছুটা গন্ধ এইখানে লেগে আছে এখনও। সালেকের মন ভালো নেই, হাঁটুজল নেমে একটা ডোবানো ডোঙার গলুই খুঁজে পায় সে, টেনে পানির উপরে ভাসিয়ে দুই দিকে তুমুলভাবে দুলিয়ে সেটার খোল থেকে পানি সরায়, একদলা এঁটেল শক্ত মাটি দিয়ে ডোঙার লেজের কাছে বেঁধে দিয়ে পানি আটকায় সে। পাশেই ভাসানো ছিল বাঁশের আগা দিয়ে বানানো ডোঙা ঠেলার ‘চোড়’, বাম হাতে ওটা নিয়ে ডান পা-টা ডোঙায় রেখে সজোরে ধাক্কা দিতেই ডোঙাটা ঘন ঠাসা কলমিলতা আর বুনো জলজ উদ্ভিদগুলো চিরে পশ্চিম দিকে ছুটে চলে। বা দিকে মানে উত্তরের মুখ ঘোরালে দূরে দেখা যায় সরু লাউয়ের ডগার মতো আন্তঃজেলা হাইওয়ে,  তার উপর দিয়ে কালো পিঁপড়ের আসা যাওয়ার মত করে বাস ট্রাক ছুটে যায়। দক্ষিণ দিকে জেলে পাড়া, বাতাস এখনও দক্ষিণ দিক থেকে আসে, প্রচুর আঁশটে গন্ধ তাতে। চোখটা চারদিকে ঘুরিয়ে আনলে কোথাও জনমানব দেখা যায় না।


প্রতিবার ফিরে এসে মেয়েটার যৌন কাতর বর্ণনায় সালেকের মনের ভেতর ধীরে ধীরে আকাঙ্ক্ষার গাছটা রোদে বৃষ্টিতে বড় হচ্ছিল।


তাছাড়া এই ভর দুপুরে মানুষ বিলে থাকেও না এখন। পানির গভীরতা এখনও ১০- ১২ হাত, মাটির থৈ পেতে কোথাও কোথাও বাঁশের চোড়ের আগাটা পানির সমতলে চলে আসে। সালেক একদলা থুতু সজোরে পানিতে ফেলে দিলে কোত্থেকে এক ঝাঁক ছোট সাদা-কালো পুঁটি এসে সেটুকু খাবলা খাবলি করে খেয়ে নেয়। সেই পুঁটির ঝাঁকের মধ্যেই কিছুটা গোঁয়ার ভঙ্গিতে সজোরে বাঁশের আগাটা বর্শার মতো নামিয়ে দিলে ডোঙাটা আরেকটু গতি পায়। তার ডোঙার গলুইর সাথে সংঘর্ষে আমন ধানের কচি পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠলে সালেকের খানকি মাগিটার কথা মনে পড়ে।

—ওই বেশ্যা মাগি, ট্যাকা তো সবটাই নিলি, আমি কিছু কম দিছিলাম তোরে?

বাঁশের চোড়টাকে সেই কাল্পনিক মহিলার যোনিদ্বার বরাবর গেঁথে দিতে উদ্যত হলে সালেকের নিক্ষিপ্ত বাঁশের চোড়টা পানির শরীর কেটে সজোরে কাঁদার মধ্যে গেঁথে যায়। মনের জেদ ও ক্ষোভে বাঁশের আগাটা একটু বেশিই গেঁথে গিয়েছিল বলে সেটাকে টেনে তুলতে একটু বেগ পেতে হলো। সেইটা এঁটেল কাদা থেকে টেনে তুলতে তুলতে বলে, ‘দিতাম যদি এইরম কইরে গাইথে বুঝতি পারতি শালী আমার কত জোর!’

গত বছরের জমানো কিছু টাকা তার কাছে ছিল, এই টাকা জমানোর পেছনে একটা উদ্দেশ্যও অবশ্য ছিল।

মফিজুর এর আগে যশোরে অনেকবার গেছে, প্রতিবার ফিরে এসে মেয়েটার যৌন কাতর বর্ণনায় সালেকের মনের ভেতর ধীরে ধীরে আকাঙ্ক্ষার গাছটা রোদে বৃষ্টিতে বড় হচ্ছিল। সন্ধ্যার পর তিন রাস্তার মাথায় রাত একটু গভীর হলে এই অভিজ্ঞতা বিনিময় চলত। সেইখানে হাসানের মাতৃকূলের কোনো দূরসম্পর্কের খালার মেয়ের সাথে কী কী হয়েছিল, তার প্রমাণ স্বরূপ শার্টের পকেট থেকে বহু ভাঁজে ময়লা পড়া প্রাচীন একটা চিঠিও দেখায়, মফিজুর এইবার যে মেয়ের সাথে শুয়ে এসেছিল তার গলাটা ছিল পানকৌড়ির মতো সরু আর ঊরুসন্ধি নাকি ইলিশ মাছের লেজের উপরে রুপালি চওড়া পেটের মতো ভরাট। এমনকি কিছুটা লেখা পড়া জানা জামিরুলেরও বলার মতো একটা দুটো গল্প আছে, শুধু সালেক এইখানে তুমুল নৈঃশব্দ্য নিয়ে বসে থাকে।

সালেকের বয়স ২৩, গায়ের বর্ণ পরিবার সূত্রে কালো। জন্মগতভাবে তার ডান মুখটা কিছুটা বাঁকানো, মুখের পেশির এই অংশে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রায়শই অনিয়ন্ত্রিত ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে লালা ঝরতে থাকে, সেই জন্য গলার স্বরটাও কিছুটা অসংলগ্ন ও অস্পষ্ট। চোখের মণিও অবিন্যস্ত, ট্যারা। সালেকের এই শারীরিক বৈকল্য অনেক ছোট বেলা থেকেই তাকে করে তুলেছে অনেকটা গোঁয়ার, জেদি আর নিভৃতচারী। সে কম কথা বলে আর আস্তে হাঁটে, হাঁটলে মাটি কাঁপে।

গতকাল ৯০০ টাকা নিয়ে তাদের সাথে যশোর গিয়েছিল, মফিজুরের সেইসব নায়িকাদের দেখতে, অবশ্য শুধুই দেখতে নয়! মনিহার সিনেমার সামনে তাদের বাস থামলে মফিজুরের নেতৃত্বে তারা হাঁটা শুরু করে। কিছুটা কম চওড়া রাস্তায় নেমে এলে সালেক বুঝতে পারে সে এতদিনে কাছাকাছি চলে এসেছে। তারপর আরেকটু কম আলোয় ঘেরা আরেকটু সরু রাস্তায় পৌঁছলে সালেকের বুকের ভেতর জমানো কালো কয়লায় ঠাসা আগুনে কামারের হাপর ওঠা নামা করতে থাকে। ছোট ছোট ঘর থেকে প্রায় উন্মুক্ত বুক নিয়ে মেয়েরা দরজার সামনে দাঁড়ানো। তাদের ঠোঁট মাছরাঙার মতো রাঙানো, মাছরাঙারা শক্ত কলমির ডালে যেভাবে ঠাঁই বসে থাকে এরা অবশ্য অমন নয়, এরা সবায় চঞ্চল ও জোরে কথা বলে, সালেক সোজাসুজি তাকাতে পারে না। একটা ছোটখাটো ঘরের কাছে তাদের দলটি থামলে একটা মধ্যবয়সী মহিলা মফিজুরের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা প্যাঁচিয়ে ধরে।

—এতদিন কোথায় ছিলা আমার ভাতার!

এই সম্বোধনে সালেক কিছুটা লজ্জা পাইলেও মফিজুর যেভাবে অবলীলায় তার ব্লাউজের উপরে হাত চালিয়ে দেয় তাতে বোঝা যায় মফিজুরকে এরা ভালো করেই চেনে।

—এই যে তোমাগের নতুন নাগর আনছি, একটু সোহাগ কইরে দাও।

সালেকের দিকে আঙুল দিয়ে মফিজুর দেখিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে তিন চার জন কমবয়সী মহিলা সালেকের চারপাশে ঘিরে হাত ধরে টানাটানি লাগিয়ে দেয়। এইরূপ পরিস্থিতিতে সালেকের করণীয় কি তা বুঝে উঠতে পারে না, উদ্ধার করতে মফিজুরকেই আসতে হয়, বিকার যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধীয় একটা বিশ্রী গালি ছুড়ে দিলে মেয়েরা সালেকের হাত ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়।

এই মহিলাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি মুখরা তাকেই সালেকের জন্য নির্ধারণ করা হলো, এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো অংশেই সালেকের কোনো ভূমিকায় ছিল না। এরপর মফিজুর, হাসান ও সুবোধ জামিরুলও যে যার পছন্দকে সাথে করে নিয়ে প্রায়ই পাশাপাশি রুমে ঢুকে যায়।

ঘরটা অনেক ছোট, ঠাসা আসবাব পত্র ছাপিয়ে একটা টান টান ময়লা বিছানা পোয়াতির পেটের মতো ফুলে আছে। দুটো বালিশ, ফুল তোলা। তার উপরে চিরদুঃখী শাবানার একটা সিনামার পোস্টার, তার কোমরে হাত দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ানো আলমগীর। সিনেমাটার নাম ড্যাম ওঠা ভিজে দেওয়ালের সুরকির সাথে মিশে এমন অবস্থায় আছে যে সেটা প্রায়ই দুর্বোধ্য!


সারারাত ফুটে থাকা ক্লান্ত শাপলাগুলো কেমন নেতিয়ে আছে, জলফড়িং তার উপর দিব্যি বসে আছে আসন্ন বৃষ্টির সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে।


মশারির স্ট্যান্ডের সাথে জরি লাগানো সুতা, তার নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর রঙিন কাগজ কাটা নামহীন ফুল ঝুলছে, এইরকম ফুল আগে কোথাও দেখে নি সালেক। হঠাৎ ধরা পড়া শালিকের বাচ্চার মতো অসহায় বোধ করে সালেক। মেয়েটি ইতোমধ্যে শাড়ি খুলে ফেলেছে। লাল পেটিকোটের উপর দিয়ে তার নাভিমূল দেখা যায়, পৌষের বীজতলার উপর সকালে বকের দল মরা মাছ খেতে এলে দূর থেকে এমন লাগে—সেই সাদা বকের ঝাঁকের মধ্যে নাভিটা কাকতাড়ুয়ার মতো খয়েরি রঙ নিয়ে জ্বলছে!

—টাকাডা হাতে দেও।

সালেক টাকার প্রসঙ্গে এলে ভয় পেয়ে যায়। মফিজুর এমন কোনো নির্দেশনা দিয়ে যায় নি যে টাকা আগে না পরে!

মেয়েটা আরেকবার তাড়া দিলে সালেক প্যান্টের পকেটের অতল থেকে টাকাটা বের করে আনে। গুনে গুনে  ছয় শ! মেয়েটা টাকা হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সালেকও বিছানার কাছাকাছি যেয়ে বসে। মেয়েটার দিকে তাকায়।

—তুমি কোনদিকে তাকায় আছো নাগর? বোঝাত যায় না!

মেয়েটা জানে না সালেকের বা-পাশের চোখের মণি স্থানচ্যুত বিধায় তাকে ট্যারা লাগে। তাতে দেখার কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্ত শ্লেষাত্মক কথায় সালেক কিছুটা অপমান বোধ করে। এবার সালেক বুঝতে পারে তার ভেতরে তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। বোশেখের পর শুকনো জমিতে যেভাবে আষাঢ়ের ঢল নামে আর মাটি কেমন নরম আলগা হয়ে নেতিয়ে যায়! একটা গন্ধ আসে। সেই আবেশে সালেক তার মুখ মেয়েটার বুক বরাবর নামিয়ে দিতে থাকে, তার অনিয়ন্ত্রিত ঠোঁটের ভেতরে এতক্ষণ দমিয়ে রাখা লালা আর ধরে রাখতে পারে না। সালেক কাঁপতে কাঁপতে বিছানা ভাসিয়ে দেয় সেই সাথে একদলা লালা তার মুখ থেকে মেয়েটার বুকের ভাঁজে গিয়ে পড়ে।

এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা মেয়েটাকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। হাতের এক ঝটকায় সালেককে বিছানা থেকে প্রায়ই ফেলেই দেয়।

—ওই লুলা বিটা, বাইর হ আমার ঘরেত্তে। ছ্যাপ আটকাতি পারিসনে আবার খেলতি আইছিস? পিচেশ কোয়ানকার!

সালেক ঘর থেকে বের হয়ে দরজার বাইরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যেই সেই মধ্যবয়সী মহিলা আরেকজন সুপুরুষকে নিয়ে সালেকের নাকের ডগার উপর দিয়েই সেই ঘরে ঢুকে পড়ে, তার আগে সালেকের দিকে তাকিয়ে বলে, কি নয়া নাগর, এত তাড়াতাড়ি!

মফিজুরদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সালেক সৃষ্টিকর্তার সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। এত লোক থাকতে আমাকেই কেন এমন হইতে হলো! তার শারীরিক বৈকল্যকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে চায় না! তীব্র অপমানে নীল বিন্দু হয়ে ঘরের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকে!

কিছুক্ষণ পর শার্ট কাঁধে নিয়ে ঘর্মাক্ত দেহে মফিজুর বেরিয়ে আসে, তার কিছুক্ষণ পর হাসান ও জামিরুল। প্রত্যেকেই কম বেশি উচ্ছ্বসিত, সালেকের মনখারাপ দেখে মফিজুর বলে ওঠে, মন খারাপ করতিছিস ক্যান সালেক! আমি জানি তোর কী অইছে? দ্যাখ, প্রথম প্রথম আমার এমন হইত, কামের আগেই শ্যাষ! করতি করতি ঠিক হয়ে যাবেনে সালেক, মন খারাপ করিস নে।

সালেক মুখ বুজে সব শুনতে থাকে, সবটুকু তার বলতে পারে না।

ডোঙাটা প্রায়ই বিলের মাঝ বরাবর চলে এসেছে। আকাশ আগের চেয়েও কালো। বৃষ্টি সমাগত। উত্তরে তাকালে লাউয়ের ডগাটা অস্পষ্ট, মেঘ আর বিলের কালো পানির মাঝে শুধু ধোঁয়াশার চাঁদর, বোঝা যায় ওদিকে বৃষ্টি নেমেছে, এই বৃষ্টির মধ্যে ছোট ছোট বিন্দুর মতো বাস ট্রাক হঠাৎ হঠাৎ উঁকি দেয়। বিলের এই অংশে জলজ লতা পাতার ঘনত্ব কম, নিচে তাকালে ছোট চান্দা মাছের ঝাঁক দেখা যায়, ঝাঁকটা অনেকক্ষণ সালেকের ডোঙার আশেপাশে ঘুরছে। স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁকটা একসাথে যখন ডানে মোড় নেয় তখন একটা রুপার থালা যেন চকমকিয়ে ওঠে পানির নিচে। আসন্ন বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটু তাড়াতাড়িই চোড় চালাতে থাকে সালেক, আর একটু গেলেই ছোট পুলটা, অগ্রাহায়ণের শেষ দিকে পানি নেমে গেলে এই জেগে থাকা পুলটার দুদিকে রাস্তার দেখা মেলে। এই দুই গ্রামের সংযোগ বলা যায় এই পুলটা। সারারাত ফুটে থাকা ক্লান্ত শাপলাগুলো কেমন নেতিয়ে আছে, জলফড়িং তার উপর দিব্যি বসে আছে আসন্ন বৃষ্টির সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে।

মরা শাপলা ঘেরা এই অংশটুকু পার হয়ে সালেক পুলের নিচে আসতেই অঝোরে বৃষ্টি নামল। পুলের বয়সটা সালেকের বয়সের সমান হবে, গ্রামের মসজিদের পর কংক্রিটের এই পুলটাই হলো এ এলাকার একমাত্র ইট সিমেন্টের গাঁথুনি। প্রতি বছর পানির ছাপ রেখে যায় তার পিলারে, নোনা ধরে সিমেন্ট বালু খসে পড়েছে অনেকটাই, কঙ্কালের মতো কিছু রড বেরিয়ে পড়েছে এরই মধ্যে। সালেক আপাতত বৃষ্টি থেকে নিরাপদ। বৃষ্টির শব্দ পুলের ছাদে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। ডোঙাটা পিলারের গা থেকে বেরিয়ে আসা রডের সাথে বেঁধে দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ করে, ফেলে আসা হালটের মাথায়। সাদা একটা কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে পূর্ব দিগন্ত। একটা রঙিন ধোড়া সাপের বাচ্চা হুস করে সালেকের ডোঙার সাথে গা লাগিয়ে স্থির হয়। এই নৈসর্গিক ছন্দময় শব্দে সাপেদেরও মন ভরে ওঠে। টাটকা মাছ খেয়ে পেট মোটা আরেকটি ধোড়া সাপ কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে বাচ্চাটির কাছে এসে শান্ত হয়। দক্ষিণের দিকে যে সবুজ ক্ষীণকায় আমনের ক্ষেত ছিল এই বৃষ্টিতে সেটা ধুয়ে একটা ঘন ছাইরঙা সুতার মতো রূপ নেয়।


পরবর্তী ক্ষুধা না আসার আগে সালেক আর হাঁসেদের মতো সুখী প্রাণী এই পৃথিবীতে আর একটিও নেই।


পুলের নিচে সালেকের সাথে এক পাল পাতি হাঁসও এসে আশ্রয় নেয়, তার দু তিনটা বাচ্চা ক্ষণে ক্ষণে অবাধ্য হয়ে পুলের ছাউনির বাইরে বেরিয়ে যায়, বৃষ্টির ফোঁটার সাথে নেচে নেচে কিছুক্ষণ খেলতে থাকে, বড়দের প্যাক প্যাক চিৎকারে আবার তারা ফিরে আসে। শরীরী ভাষা দেখলে বোঝা যায়, এ ফিরে আসাটা অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু পালের আর দুইটা হাঁস স্বভাবে ভিন্ন, খয়েরি পালকের হাঁসদুটো প্রায়শই পুলের ছাউনি থেকে বের হয়ে নির্লজ্জ যৌনতায় মেতে ওঠে! তাদের নির্লজ্জ এমন অবাধ জলকেলি সালেকের কাছে অসহ্য ঠেকে।

দুটো হাঁসের এই লুকোচুরি দেখতে দেখতে সালেক কখন যে তার লুঙ্গির গেরো খুলে ফেলেছে টের পায় নি, বাঁশের চোড়ের আদলে তার পুরুষাঙ্গ কখন যে তার ডান হাতের মুঠির মধ্যে চলে এসেছে বুঝতে পারে নি সে। বিলের স্বচ্ছ পানিতে কাঁপতে কাঁপতে বৃষ্টির সাথে দূরে কোথাও বজ্রপাত হয়। সেই শব্দে হাঁসেরা সচকিত হয়, খয়েরি পালকের হাঁসটি কিছুক্ষণ মেয়ে হাঁসটিকে রেহাই দেয়, পুলের ছাদের পাটাতন থেকে আশ্রয় নেয়া দুটি শামুক ঠোকরা উড়ে যায়।

সালেক রক্তবর্ণ চোখে হাতের তালুতে দোজখের উত্তাপ টের পায়, ছন্দে ছন্দে দুলে উঠা ডোঙার আঘাতে একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গের ঢেউ ফুলের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিক, দুটো রঙিন ধোড়া সাপ এখনো সেই ঢেউয়ে মুখ লাগিয়ে ডোঙার গা ঘেঁষে সালেককে দেখতে থাকে। গোঙাতে গোঙাতে, অশ্রাব্য গালিতে এই চারপাশ ভরিয়ে দিতে দিতে পুরুষশ্রেষ্ঠ সালেক নিজেকে নিবৃত্ত করে, এক্ষণে সালেক নিজেকে ধোড়া নয়, পদ্মগোখরা ভাবে! যেন ছোবলে নীল করে দিল খানকির শরীর! এতক্ষণে সালেক শান্ত হয়। আকাশের মতো নির্লিপ্ত শান্ত স্বভাবে ফিরে আসে সালেক!

বৃষ্টি থেমে গেলে পশ্চিম দিগন্তে বিকেলের আভা ছড়িয়ে পড়ে। ছাই রঙা আকাশের ফাঁকে ফাঁকে কিছু লাল রঙ দেখা যায়।

পানিতে প্রতিফলিত সেই মেঘের রঙের উপর জোরে জোরে খোঁচা মারতে মারতে সালেকের ডোঙাটি গ্রামের দিকে ফিরতে থাকে। হাঁসেরাও বেরিয়ে যায় পুলের নিচ থেকে, পরবর্তী ক্ষুধা না আসার আগে সালেক আর হাঁসেদের মতো সুখী প্রাণী এই পৃথিবীতে আর একটিও নেই।

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, ব্রান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইন্স।

প্রকাশিত বই—
বিপ্রতীপ [গল্প, অনুপ্রাণন, ২০১৬]

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)