হোম গদ্য গল্প আগন্তুকা ও গজদন্ত মিনার

আগন্তুকা ও গজদন্ত মিনার

আগন্তুকা ও গজদন্ত মিনার
457
0

সম্পাদক ইনবক্সে টোকালেন—

‘গল্প দেন না একখান।’

আমার গদগদ ভাব আমি কিছুতেই দেখাই না। পাশের জানালা থেকে লাফ মেরে এসে সম্পাদকের জানালায় বসলাম।

‘কিসের জন্য?’ আমি লিখি। ওই ইলেকট্রনিক পর্দাতেই।

‘কী যে বলেন! আমাদের কি ঈদ সংখ্যা থাকতে নেই?’ সম্পাদক ক্লিয়ার করে ছাড়েন।

পাশের জানালায়, চ্যাটবক্স আর কি, এক নারীকে তখন বোঝাচ্ছিলাম আমার প্রতিভা। এরকম সময়ে ইয়েতে পর্যন্ত যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু সম্পাদকের নিমন্ত্রণে আমার গুরুতর বেগ লঘু হয়ে যায়। আমি মনে মনে গুনতে থাকি কয়টা হলো।

‘ওওওও…বাহ।’ আমি কয়টা ঈদ সংখ্যার নিমন্ত্রণ পেলাম গুনতে গুনতে টাইপ করি।

‘কী বিড়বিড় শুরু করলেন?’ সম্পাদক আবার টাইপ করলেন।

‘আরে আপনি দেখি সিসি টিভি পুরাই। বিড়বিড় শুনলেন ক্যামনে?’ আমি বলি, মানে লিখি।

‘সিসি টিভি তো বধির, কোনো মাইক্রোফোন নাই।’ সম্পাদক আবার ক্লিয়ার করলেন।

‘কী বলেন এইসব! তাহলে তো হলো গিয়ে মূক। মাইকহীন তাই মূক।’

‘আরে হলো তো রে ভাই, ওদিকে মূক হলে এদিকে বধির।’ সম্পাদক ব্যাখ্যা করেন।

‘এইটা তো মহাপ্যাঁচ কষে ফেললেন দেখি। দু’দিকে মূক আর বধির হলে তো তুলনামূলক দশা-বিচারে বিরাট ভেজাল। কিছুই হয় না হিসাব। ধরেন একদিকে কার্যকরী একটা শ্রবণ ব্যবস্থা না থাকলে তো মূকত্ব অপ্রকাশ্য। আবার অন্যদিকে বচন প্রবাহিত না হলে বধিরতারই-বা কিভাবে বিচার হবে?’ আমি সংজ্ঞার নিয়ামক ব্যাখ্যায় নেমে যাই।

‘হইছে কী আপনার? সৃজনশীল ক্যাটেগরিতে ওয়াকওভার দিতে চান মনে হয়! মননশীলে নামবেন নাকি?’

‘এইটা আবার কী বললেন? সিসি টিভি নিয়ে না কথা হচ্ছিল?’ আমার আউলাতে শুরু করে।

‘ভাইজান। বলতেছিলাম গল্প বাদ দিয়া দর্শন লিখতেছেন নাকি ইদানীং?’ সম্পাদককে ভালো শোনায় না।

‘কই, না তো!’ আমি ধরায় নেমে আসি, কিংবা দর্শনাতঙ্ক থেকে, যাকে বলে, সংবিৎ ফিরে পাই। প্রায় পাই।

‘তাহলে বলেন। কিছু একটা দেবেন কিনা বলেন।’ সম্পাদক পেশা ছাড়েন না।

‘কিসের কথা বলেন?’ আমি সত্যিই বেদিশা হয়ে পড়ি।

‘আচ্ছা লোক তো ভাই আপনি! দুই মিনিটও তো হয় নাই। গল্প চাইতেই তো নক দিলাম।’


সাহিত্যিকেরা যে খ্যাতির গজদন্ত মিনার ছাড়া নিজেদের খুঁজে পান না, আমি সেই দলে নাই।


সম্পাদকের স্মরণ করিয়ে দেবার নিষ্ঠায় আমার ম্যাজিকের মতো স্মরণ হয়। গল্প তিনি চাইছিলেন তা স্মরণ হয় বটে। কিন্তু আরো বিপুল বেগে পাশের জানালার কথা স্মরণ হয়। লাফ দিয়ে সেই জানালায় যাই, যেখানে নবপরিচিতা ছিলেন। বস্তুজগতে এইরকম জানালা হতে জানালায় লাফ দিলে হনুমানের মতো দেখাত। ডিজিটাল জগতে লাফালাফি অদৃষ্টমূলক। ফলে আমি লাফাতে আরাম বোধ করি। তাছাড়া তখন লাফানো ভিন্ন কোনো পথ নাই।

ঈদ সংখ্যার গদগদভাব আর সম্পাদক অন্য জানালায় ঝুলে রইলেন। নবনারী লিখে রেখেছেন—

‘ঘুমায়ে গেলেন নাকি?’

‘আরে না না।’ আমি লিখি। সম্পাদকের ঈদ নিমন্ত্রণ লিখতে গিয়েই আবার স্মরণ পড়ে লিখতে গেলে প্রকাশিত হতে আমার উৎসাহ বিষয়ক আলাপে ভেজাল বাধিয়ে ফেলতে পারি। ওদিকে কোনো উত্তর নাই। আমি আবার লিখি—

‘চা বানাতে গেছিলাম।’

‘বানিয়েছেন?’

আমি লিখি, লিখে আবার কাটি। পয়লা লিখি ‘হুম, এই তো খাচ্ছি’। সাথে সাথেই সম্পাদকের কথা মনে হয়। আবার জানালা-লাফ দেবার সম্ভাবনা মনে উঁকি দেয়। আমি লিখি—

‘চুলায়।’

‘তো বানিয়ে নিয়ে আসুন না! আমি আছি।’ নবনারী আমাকে আশ্বস্ত করেন।

‘আহা! জ্বাল হোক না আগে।’ আমি রন্ধন প্রণালিগত সময় হিসেব কষি।

‘আপনি কি চা বানাচ্ছেন নাকি বিরিয়ানি রানছেন?’ নবনারী আমাকে ইন্টারোগেটেন। এর মধ্যেই প্রিং প্রিং করে সম্পাদকের দু’তিনটা বার্তা বন্ধ জানালায় ধাক্কাধাক্কি করছে। আমার দু’বার ইচ্ছে হলো নবনারীকে বলি আমাকে মিনিট পাঁচেক সময় দিতে। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারি না কেন যেন। একবার ইয়ে চাপার কথাও বলার কথা ভাবি। কিন্তু ওই যে বললাম এরকম মহৎ মুহূর্তে ওসব অনুভূতিকেও গৌণ করে দিতে হয়। তাছাড়া তিনিই বা কী ভাববেন! আমার ভাবনার মধ্যেই তিনি আবার বার্তা দিয়ে বসেন—

‘যা বলছিলেন বলুন চা-টা নিয়ে এসে।’

‘হুম। চা নিয়ে আসি।’ বলেই আমি পরের জানালায় গিয়ে বসি। সম্পাদক তিনবার লিখেছেন : ‘কী ভাই, কিছু বলেন না কেন?’

এবার আমি নবোদ্যমে সম্পাদকের পর্দায় লিখি—

‘খুব খুশি হলাম লেখা চাইলেন বলে।’

‘তো দিয়া দেন একখান লেখা।’ তিনি উপসংহারে পৌঁছাতে চান।

‘কিন্তু ইচ্ছা তো হয় না।’ আমি হুড়াহুড়িতে লিখে ফেলি।

‘ইচ্ছা না হইলে দেবেন না। এইখানে জোরাজুরির কী আছে? এতক্ষণ বসায়া রাইখা বলার তো কিছু নাই।’ সম্পাদক চটলেন মনে হয়।

‘আরে আরে তা নয়। গল্প দেবার ইচ্ছা তো মেলা। আমার লিখতে বসতেই ইচ্ছা করে না।’

আমি তাড়াতাড়ি শুধরাই। সম্পাদকও সময়ক্ষেপণ করেন না—

‘ভাইজান! লিখতে ইচ্ছা না হইলে লেখক থাকবেন না। দিয়েন না লেখা। চ্যাটে বইসা এত ভাবারই-বা কী আছে?’

একটা ঈদের নিমন্ত্রণ ক্যাজুয়েলি হাতছাড়া হয়ে যাবার সমূহ আশঙ্কায় আমি হা রে রে রে করে উঠি—

‘এইটা কী বললেন? এটা কোনো সম্পাদকের মতো কথা হলো?’

নবনারীও প্রিং করে বার্তা দিয়ে ফেলেছেন। ওই জানালাও হাতছাড়া হবার আশঙ্কায় আমি সম্পাদকের সঙ্গে গুরুতর গোলযোগ সম্ভাবনা সত্ত্বেও সেই জানালা খুলে বসি। নবনারী লিখেছেন—

‘চা আনছেন? আমারও চা খাইতে মন চায়। আচ্ছা যা বলতেছিলেন বলেন।’

‘কই? কী বলতেছিলাম?’ আমার আর মাথায় থাকে না ঠিক মতো।

‘সাহিত্য লেখেন কেমনে আপনি? নাকি দলিল লেখেন?’ নারী খেঁকিয়ে উঠলেন।

‘ওহো! ওই চা-ফা চক্করে আউলে গেছে।’ আমি রক্ষা করতে চাই।

‘এক চায়ের চক্করে প্লট আউলায় ফেললেন? বলতেছিলেন খ্যাতি নিয়া আপনার ইয়া নাই। কী জানি স্তম্ভ না মিনার বুঝাইতেছিলেন মনে হয়।’

নারী আমাকে আপ্রাণ সদয় রাস্তা বাতলে দেন। হয়তো আজকে তার জানালাপত্র বিশেষ খোলা নাই। আমাতে সমূহ দয়া তার।

‘আহা! কী বলেন? বোঝাব কেন? বলছিলাম এই যে সাহিত্যচর্চা… এর সত্যিকার ইয়ে হলো…’

এটুকু টাইপ করেই আমার হঠাৎ মনে হলো সম্পাদকের কথা। পাশের জানালায় ঝুলে পড়ি একটুও সময় দেরি না করে। সম্পাদক লিখে ফেলেছিলেন—

‘সম্পাদকের মতো কথা হলো না মানে? আপনি একটা লেখা দেবেন কিনা সেইডা খোলতাই করেন না, খালি গুতুর গুতুর করেন। আর আমার কথা সম্পাদকের মতো হয় নাই? আমি কি বিয়ার প্রপোজাল দিছি নাকি?’ সম্পাদক আরেক গিয়ারে চলে গিয়েছেন।

‘আরে না না! ছি ছি! বিয়ার কেন দেবেন?’ আমি রা রা করে টাইপ করি। এর মধ্যে নেশাগ্রস্তের মতো নবনারীর জানালায় বোঝানোর তাগিদ বোধ করি যে যশ-খ্যাতির ঊর্ধ্বেই সাহিত্যের মানচিত্র থাকতে হবে। মন শান্ত করে তাই তাকে লিখতে বসি। তিনি লিখেছেন—

‘কিয়ে?’

আমি লিখি—

‘সাহিত্যের মূল জমিটা কোনো সৌধ বা স্তম্ভ-সাপেক্ষ নয়। এটা হলো একটা দৈনন্দিনতার ম্যাজিক…।’ তিনি লেখেন—

‘ম্যাজিক? ম্যাজিক কেমনে?’

সম্পাদকের প্রিং করা জানালাও না-খুলে থাকতে পারি না। তিনি বলে ফেলেছেন—

‘বিয়ার দেবো কেন? এই বৈশাখ মাসে বিয়ার। আমি কি সম্পাদক নাকি শিল্পপতি?’

আমি সম্পাদকের জানালায় হনুমান না হয়ে, নবনারীর জানালায় হই। লিখি—

‘মানে এই যে আপনি এক আগন্তুকা। এর তো কোনো গুরুত্ব থাকার কথা নয়; কিন্তু দেখুন আছে। আমরা জমে আছি আলাপে। এ কিন্তু সাহিত্যেরই ম্যাজিক। দৈনন্দিনতার ম্যাজিক…’ আমি প্রতিভার দাবি নিয়ে আগাতে থাকি।

‘কী বলেন এইসব। আপনি আমারে কী জানি বোঝাইতে গেছিলেন। আমি ভাবলাম সাহিত্যিক মানুষ, হয়তো ভালো কিছু শিখব। তো আপনি তো প্যাঁচাইয়া ঝোল বাইর কইরা দিছেন।’ নারী প্রতিভার আওতামুক্ত হবার দ্বারপ্রান্তে চলে গেছেন এক নিমেষে।

‘মানে আমি বলতে চাইছি, সাহিত্যিকেরা যে খ্যাতির গজদন্ত মিনার ছাড়া নিজেদের খুঁজে পান না, আমি সেই দলে নাই।’ আমি একটা আস্ত প্রস্তাবনা শেষ করে ছাড়ি। কিন্তু তিনি নিমেষে লিখে ফেলেছেন—

‘গজদন্ত মিনার মানে?’

আমি সেদিকে হতভম্ব হয়ে তাকাতেই সম্পাদকের বিয়ার প্রপোজাল না দেবার কথা মনে করি। তাকে লিখি—

‘না ভাই, বিয়ার না, আমি জানি ম্যারেজ। তাই-বা কেন দেবেন? কেই-বা দেয় আজকাল? লেখা চেয়েছেন বলে খুশিতে আমি খানিক দিশেহারা আছি। গোছায়ে কথা বলতে পারতেছি না তাই।’ সম্পাদককে না বিগড়াতে উৎসাহ দিই। নারীকে লিখতে বসি—

‘গজদন্ত মিনার মানে হাতির দাঁত দিয়ে বানানো মিনার, স্তম্ভ।’

‘এইডা কেডা বানায়? মিনার বানানোর আর জিনিস নাই? আপনি তো তখন থেকে মিনার মিনার করেই পাগল হইলেন।’ নারী আমাকে শায়েস্তা করার জন্য মরিয়া হয়ে গেছেন।


আজাইরা সাহিত্যিক আমি ডজনখানেক চিনি। পোতানো মানুষজন কইত্তে সাহিত্যিক মাারাইতে আসে।


সম্পাদক লিখেছেন—

‘তো এত খুশিতে দিশেহারা না হয়ে একখান লেখা দিয়া দ্যান ভাই।’

আমি আগন্তুকা নারীকে উত্তর করি—

‘আহা এটা তো মেটাফোর, রূপক।’

তিনি কহেন—

‘হোক মেটাফোর। আজাইরা জিনিস, আজাইরাই। আর তখন থেকে আপনিই তো মিনার খাড়া করার তালে আছেন।’

তার বাক্যদর্শনে আমার হার্টবিট মিস হয়ে যায়। আমি তড়িঘড়ি করে তাঁকে বোঝাতে উদ্যত হই—

‘গজদন্ত মিনারে বসবার সাধ সাহিত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বুঝলেন?’

কিন্তু পাঠানোর পরই আবিষ্কার করি এটা গেছে সম্পাদকের জানালায়, মানে চ্যাটবাক্সে। আর আমার চোখ গোলগোল অবস্থা থেকে স্বাভাবিকে আনার আগেই তিনি উত্তর করে ফেলেছেন—

‘আমারে গজদন্ত মিনার চেনান? এতক্ষণ বসায়া রাইখা ফাইজলামি মারেন? আমার বাসা এলিফ্যান্ট রোডে, আমারে গজ চেনাইতে আইসেন না। আর আপনার ভড়ং আমি দন্ত ফালাইয়া দিয়া ছোটামু দেইখেন।’

এক মুহূর্তে ঈদ সংখ্যার মিনার আমার সৌধে পরিণত হয়। সম্পাদককে কিভাবে পরিস্থিতিটা বোঝানো যায় তা ভাবতেই মাথা আউলে গেল। আমি মাতালের মতো আগন্তুকার ডাকবাক্স খুলি।

‘এইসব আজাইরা সাহিত্যিক আমি ডজনখানেক চিনি। পোতানো মানুষজন কইত্তে সাহিত্যিক মাারাইতে আসে। মিনার ধইরা বইসা থাকেন সারাদিন।’


ঈদসংখ্যা ২০১৯

মানস চৌধুরী

জন্ম ২৮ মার্চ ১৯৬৯; বরগুনা। নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; কালচারাল ডাইনামিক্সে ডক্টরেট, হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
কাকগৃহ [পাঠসূত্র, ২০০৮]
ময়নাতদন্তহীন একটি মৃত্যু [বাঙলায়ন, ২০১০]
[পুনঃপ্রকাশ, সৃষ্টিসুখ, কোলকাতা ২০১৪]
আয়নাতে নিজের মুখটা [বাঙলায়ন, ২০১০]
পানশালা কিংবা প্রেম থেকে পলায়ন [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]

কবিতা—
ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য কবিতা [অনলাইন ভার্শন, সৃষ্টিসুখ]
সুবেহ খানসামার কবিতা [অনলাইন ভার্শন, সৃষ্টিসুখ]

আছে আরও কিছু বই, যৌথ রচনা ও যৌথ সম্পাদনায়।

ই-মেইল : manoshchowdhury@yahoo.com

Latest posts by মানস চৌধুরী (see all)