হোম গদ্য গল্প আকালুর খিয়ারযাত্রা

আকালুর খিয়ারযাত্রা

আকালুর খিয়ারযাত্রা
1.88K
0

রৌমারীর গাঁয়ে গাঁয়ে যখন কার্তিকের শেষ দিনটা চাকাভাঙা গরুগাড়ির মতো থমকে দাঁড়ায়, যখন মাঠে মাঠে আমন ধানের খেতগুলো ভয়ানক শত্রুতা আরম্ভ করে, শালার ধান পণ করে যে সহজে পাকবে না, কারণ খেতমজুরদের শুকিয়ে মারা দরকার, যখন কুকুরেরা করুণ ঊ ঊ ঊ স্বরে কান্না জুড়ে দেয়, তখন আকালুরা খবর পায় দক্ষিণের খিয়ার দেশে ধান পেকেছে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা বেরিয়ে পড়ে দলে দলে, ছুটতে শুরু করে দক্ষিণ দিকে : সেখানে ধান কাটার কাজ জুটবে, আর তিন বেলা গামলা গামলা সাদা সাদা ভাত গলা পর্যন্ত খেতে পাওয়া যাবে।

পার্বতীপুর পৌঁছে আকালুর বেজায় খিদা পেল। সব সময়ই তার কারণে-অকারণে খিদা পায়; তবে এখনকার খিদাটার কারণ যুক্তিসঙ্গত : এখানে পৌঁছার রাস্তাটা ছিল অনেক লম্বা। বিস্তীর্ণ চর পেরিয়ে, বৈঠার নৌকায় ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে, খানাখন্দে ভরা রাস্তাঘাট হেঁটে পাড়ি দিয়ে প্রথমে কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন, তারপর পার্বতীপুর রেল জংশনে পৌঁছতে পৌঁছতে দুই দিন লেগে গেল। এখন আকালুর খিদার কোনো বাপ-মা নাই। তার চোখে যেন অন্ধকার নেমে আসছে। সে চোখ বন্ধ করে ভাবছে, খিয়ারত যায়া এত এত এত ভাত খামু, প্যাটটা জানি মোর একিবারে ফাটি যায়।

ভাবতে ভাবতে তার খিদা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। কিন্তু সব সম্বল যে ১২টা টাকা তার কোমরে গোঁজা আছে তাতে সে এখনই হাত দিতে চায় না। আবার কিছু-একটা পেটে না পড়লে পেটের সমস্ত নাড়িভুঁড়িই হজম হয়ে যাবে বলে তার বোধ হতে থাকে। অবশ্য তাতে তার আপত্তি ছিল না, পেটের মধ্যে নাড়িভুঁড়ি সতেজ থাকল, না পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে গেল তা নিয়ে তার কোনো চিন্তাই থাকত না, যদি পেটখানা তার হা হা করে না জ্বলত।

আকালু অগত্যা একটা টাকা খরচ করে একখানা বনরুটি কিনে ফেলল। কিন্তু সেটা এতই ছোট যে পুরাটাই এক গ্রাসে পেটের মধ্যে চালান করা গেল। তার ফলে মুখে চিবুনোর সুখ পাওয়া যাচ্ছে বটে, কিন্তু পেটের চুল্লিখানার আগুন নিভছে না। বরং সামান্য ইন্ধন পেয়েই যেন সে আগুন আরও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

তাই সে আরও একটা টাকা খরচ করল। তাতেও পেটের খাঁ খাঁ হাহাকার দূর হলো না। কিন্তু আকালু স্থির করল, আর কোনো টাকা এখন খরচ করবে না। পানি খাওয়ার জন্য সে একটা ভাতের হোটেলের দিকে হেঁটে যেতে লাগল। যেতে যেতে ভাবল, এক প্লাস পানি খেতে পয়সা লাগবে না।


আকালু দুরু দুরু বুকে উৎসুক চোখে চেয়ে রইল বুড়ার দাড়ি-গোঁফে ঢাকা অজস্র বলিরেখাপূর্ণ মুখটার দিকে।


কিন্তু এক গ্লাস পানির সঙ্গে তাকে এক মণ গালিও হজম করতে হলো। তবে গালি তো মার নয় যে গায়ে লাগবে। তাই সে দাঁত বের করে হোটেলটার এক কর্মীর উদ্দেশে ‘দে রে ভাই, আরেক গিলাস পানি খাবা দে’ বলতে বলতে প্লাস্টিকের জগ থেকে নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে নিয়ে ঢক ঢক করে খেয়ে ফের এক বদন ভ্যাকটানো হাসি দিয়ে ডান হাতের চেটোয় মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল।

স্টেশনে ফিরে এসে আকালু দেখতে পেল, সঙ্গীদের কেউ নাই, রেলগাড়ি চলে গেছে।

‘বেয়াক্কেল হয়া গেনু বাহে!’ নিজেকেই বলল সে। বেক্কলের মতোই কোমরে একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল প্লাটফরমের কিনারে।

তখন হঠাৎ কেউ বলে উঠল, ‘কী রে, কাক্ হারালু?’

আকালু ভিড়ের শব্দে সব কথা শুনতে পেল না, শুধু তার মনে হলো কেউ বুঝি তার নাম ধরে ডেকে উঠল। সে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেল একটু দূরে এক জটাধারী বুড়া প্লাটফরমের উপর লাল সালুকাপড় বিছিয়ে বসে আছে, দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখে মিটিমিটি হাসি নিয়ে সে চেয়ে আছে তারই দিকে।

আকালু বুড়ার দিকে এগিয়ে গেল। বুড়া তাকে বলল, ‘ডান হাত দে।’

‘ক্যা?’ আকালু চমকে উঠে বলল। বুড়ার সামনে তাবিজ-খাবনামার পসরা দেখেও সে বুঝতে পারছে না বুড়া কেন তার হাত চাইছে।

‘ক্যা আবার কী রে?’ বুড়া বলল, ‘ভাগ্য জানবার চাস না?’

আকালু এবার বুঝতে পারল জটাধারী বুড়ার ব্যবসাটা কী।

‘ট্যাকা নাগবে?’ সে বলল।

বুড়া সাদরে হেসে বলল, ‘আয় দিনি, হাতটা দে।’

‘আগে কও, কত নাগবে?’

‘দেস ট্যাকা পাঁচেক।’

‘না, থাক। নাগবে না মোর ভাগ্য জানা।’

‘আয় আয়, তিন ট্যাকা দেস।’

‘মুই বাহে গরিব মানুষ। এক ট্যাকা দিবার পারোং।’

বুড়া দরদভরা গলায় হেসে বলল, ‘আয় আয়, তাই দেস।’

আকালু এগিয়ে গিয়ে বুড়ার সামনে দুই পায়ের গোড়ালি উপর ভর করে বসল, তারপর ডান হাতটা বুড়ার দিকে বাড়িয়ে দিল, তালুটা মেলে ধরল। বুড়া আকালুর শক্ত কর্কশ হাতটা টেনে নিল, তালুর রেখাগুলোর দিকে চেয়ে তার দুই চোখের বাইরের কোণে অজস্র ভাঁজের ঢেউ খেলতে শুরু করল। আকালু দুরু দুরু বুকে উৎসুক চোখে চেয়ে রইল বুড়ার দাড়ি-গোঁফে ঢাকা অজস্র বলিরেখাপূর্ণ মুখটার দিকে।

‘হুম্।’ চাপা গূঢ়ধ্বনি বেরিয়ে এল বুড়ার গলার গভীর থেকে।

‘কী? কী দেখিলেন?’ আকালু ভয়ে ভয়ে বলল।

‘বালা-মছিবত দ্যাখা যায়।’

‘আঁ?’ প্রায় আর্দনাদ করে উঠল আকালু।

বুড়া তার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘শরীল নাপাক নাই ত?’

‘ক্যা?’ ভয়-পাওয়া স্বরে বলল আকালু।

‘মুতে পানি লেস?’ বুড়ার কণ্ঠে ধমকের সুর।

‘হয় হয় লেই, তা কী হইছে?’ আকালু জোর করে মিথ্যা বলল।

বুড়া সদয়-নির্মম ফেরেশতার মতো হেসে বলল, ‘মিছা কথা কলে কিন্তুক গুনা হয়।’

আকালু দুষ্টামি-করে-ধরা-পড়া বালকের মতো হেসে বলল, ‘তা মোর হাতত কী লেখা আছে?’

‘আছে, কেছু বালা-মছিবত আছে।’

‘কী বালা-মছিবত, হুজুর?’

‘সগ্‌লিরই জীবনে কুনো-না-কুনো সময়ে বালা-মছিবত আসে। আবার আল্লামালিক তার সোমাধানও বাতলে দেয়।’ বলতে বলতে বুড়া তার ডান পাশে রাখা একটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে চ্যাপ্টা ও চারকোনা একটা মাদুলি হাতে তুলে নিল। বেশ সমীহের সঙ্গে সেটা নিজের ডান হাতের মুঠির মধ্যে চেপে ধরে আকালুর মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘কিন্তুক্ তোর শরীলডা ত এখন নাপাক আছে।’

আকালু কী জবাব দেবে ভেবে পেল না; নিরুপায় চোখে চেয়ে রইল বুড়ার মুখের দিকে।

বুড়া নিজের ডান হাতের মুঠির মধ্যে মাদুলিটা লুকিয়ে রেখে শুধু মুঠি নাড়িয়ে বলল, ‘উয়ার মধ্যে আছে আল্লাপাকের পবিত্র কালাম। সমস্ত কোরানমজিদ পুরাটাই ভরা আছে এই তাবিজের মধ্যে। যা, এলায় ওজু করি আয়।’

‘ওডারও কি আলাদা দাম দেওয়ার নাগবে?’

‘তা নাগিবে। কিন্তু তোর জন্যে বেশি নোয়ায়। তুই তো ভালো চ্যাংরা, মুখ দেখেই বুঝা যায়।’

‘কত দাম?’

‘তোর জন্যে বিশ ট্যাকা।’

আকালু আর্তনাদ করে উঠল : ‘সব্বোনাশ কথা! মোক্ বেচিলেও বিশ ট্যাকা হবার নোয়ায়! তোমরা জানেন না তামাম ঔমারিত কাম-কাজ কিছু নাই? না-খায়া থাকতি থাকতি মোরা মরি গেইনু। তোমরা জানেন না, তালে তোমরা কেংকা গণক?’

বুড়া ঘাবড়াল না। তার মুখে সেই সর্বজ্ঞের হাসি অটুটই রইল। সে আকালুকে বলল, ‘আল্লার কালাম ত মূল্যবান জিনিশ।’

‘তা না-হয় বুঝিনু। তাবিজটা নিয়া মোর কী লাভ হবি সেই কথা কন।’

জটাধারী বুড়া চোখের কোণে রহস্য জাগিয়ে বলল, ‘কী লাভ চাস তুই?’

‘হামাক এমন তাবিজ দ্যাও, যখন-তখন খিদা না নাগবে।’

‘পাগলা! জিন্দা মানুষের ত খিদা নাগিবেই। খিদা নাগে না তো মরা মান্‌ষের।’

‘তালে তাবিজে মোর কাম নাই।’

‘আরে পাগলা, আল্লামালিক খিদা দিইছে, ফির খোরাকিও দিইছে। উডা কুনো কতা নোয়ায়। জীবনে আরু বালামছিবত আছে।’

‘খিদার চায়া বড় মছিবত আর কী হইবার পারে, বাহে?’

হুজুরের বদলে বাহে ডাক শুনে বুড়া গর্জন করে উঠল, ‘ব্যাদ্দপ!’

আকালু ভয়ানক চমকে উঠল। তা দেখে বুড়া মনে মনে খুশি হলো। আকালুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘রুজির মালিক আল্লা। তার সাথে ক্যান বেয়াদবি করিস? যা, ওজু করে আয়।’

আকালু মিনতিভরা কণ্ঠে বলল, ‘কিন্তুক্ হুজুর, মোর কাছে ত বিশ ট্যাকা নাই। সবসুদ্দা আছে খালি দশখান ট্যাকা।’

বুড়া হেসে ওর পিঠে সাদরে একটা থাবড় মেরে বলল, ‘যা বেটা যা, ওজু করে আয়।’

প্লাটফরমের এক পাশে মসজিদ, মসজিদের সামনে সারি সারি টিপকল, লোকজন সারি ধরে বসে ওজু করছে। আকালুও তাদের পাশে বসে হাত-পাগুলো কচলে কচলে ধোয়, তারপর চোখেমুখে বার কয়েক পানির ঝাপটা দেয়, তারপর উঠে হন হন করে সেই বুড়োটির দিকে ছুটতে থাকে। একটা লোকের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগল, লোকটা ধমক দিয়ে উঠল, ‘শালা চোখের মাথা খাইছু?’ আকালু তাকে একটা ভ্যাটকানো হাসি উপহার দিয়ে চলে গেল। গিয়ে দেখল বুড়া বসে আছে একা, তার চোখেমুখে সেই রহস্যময় হাসি। আকালু তার সামনে গিয়ে দু’পায়ের গোড়ালি উঁচু করে বসে ডান হাতটা পেতে দিল। বুড়া রুপালি চারকোনা মাদুলিটার সুতা ধরে সেটাকে শূন্যে দোলাতে দোলাতে বলল, ‘আল্লার পবিত্র কালাম। সমস্ত কোরান মজিদ। সাবধান! ভালো করে ওজু করিছু ত?’

আকালু দুরু দুরু বুকে মাথা দুলিয়ে সায় দিল। বুড়ার গলার ভিতর থেকে গমগমে আওয়াজ বেরিয়ে এল : ‘সাবধান!’

আকালু আবার মাথা দোলাল। বুড়া দুই চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করে আল্লার কালামের আয়াত আবৃত্তি করল, তারপর চোখ খুলে মাদুলিটাতে ফুঁ দিল তিন বার। তারপর সেটা মুঠির মধ্যে চেপে ধরল, চেপে ধরেই রইল, যেন মাদুলিটা আকালুর হাতে তুলে দিতে তার মন চাইছে না, যেন তা বড় অমূল্য এক সম্পদ।

আকালুর ডান হাত বুড়ার মুখের সামনে পাতাই ছিল, এবার সে হাতটা নাড়াতে শুরু করল। মানে, সে মাদুলিটা পেতে ভীষণ উদ্‌গ্রীব। বুড়া এবার সেটা আকালুর হাতের তালুর মধ্যে রেখে তার হাতের সব আঙুল মুড়িয়ে মুঠি বানিয়ে দিল, যেন সে বলতে চাইল : লুকিয়ে রাখ্।

আকালু মাদুলিটা নিজের মুঠির মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরল, মুঠিতে চুমা খেল; তারপর খুব যত্নে পিরানের পকেটে রেখে বুড়ার দুই পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তারপর বলল, ‘এই তাবিজের ফজিলত কী হুজুর?’

বুড়া গম্ভীরভাবে বলল, ‘বালামছিবত দূর হয়া যাবে।’

‘আর?’

‘আর কী চাস?’

‘খালি ভাত খাবার মন চায়, হুজুর।’

বুড়া তার ঝুলির ভিতর থেকে একটা বিচিকলা বের করল, নিজেই সেটা ছিলল, বিড় বিড় করে দোয়া পড়ে কলাটাতে তিনটা ফুঁ দিল, তারপর সেটা আকালুর দিকে বাড়িয়ে ধরে সস্নেহে হাসল।

আকালু ডান হাত বাড়িয়ে কলাটা নিল।

‘বিসমিল্লা কবু।’

আকালু বিসমিল্লা বলে কলায় একটা কামড় বসাল, অজস্র বিচি তার দাঁতের তলে কিড়মিড় শব্দে সোরগোল করে উঠল।

‘খা খা, ভালো করি চিবি চিবি খা।’

আকালু এক নিমেষেই কলাটা সাবাড় করে ফেলল। বুড়া হেসে বলল, ‘কী? আর খিদা আছে?’

‘খিদা আবার নাই? ইরকম একশডা কলায়ও মোর প্যাট ভরিবার নোয়ায় হুজুর। মোর খিদার একখান বেবস্তা করি দ্যান ত!’

‘আল্লার পাক কালাম আছে তোর সাথে। বেবাক বেবস্তা আল্লায় করি দিবে। এখন তাবিজের হাদিয়াডা দে।’

‘হাদিয়া?’ প্রায় ডুকরে কেঁদে উঠল আকালু।

‘আল্লার পবিত্র কালাম। তার হাদিয়া নাই?’

‘মোর কাছে মাত্র দশখান ট্যাকা আছে, হুজুর,’ আকালু মিনতি করে বলল, ‘খিয়ারত যাবার নাগছুঁ। সারা অমপুর জেলাত কাম-কাজ নাই, না খায়া থাকতে থাকতে মরি যাওয়ার অবস্তা হুজুর!’

বুড়া গম্ভীরভাবে বলল, ‘আল্লার কালাম লিয়ে দরাদরি? নোয়ায়, ভালো নোয়ায়!’

আকালু বুড়ার দুই পা চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘এলায় মাপ করি দ্যান হুজুর!’

বুড়া তার পিঠে আদরের থাবা মেরে বলল, ‘যার মূল্য আছে তা মাগনা লিতে নাইরে আহাম্মক। বুকত্ ঈমান থুইস্। দশ ট্যাকা থুইয়া যা, কলা ফিরি, আল্লামালিকের গাছের ফল।’

আকালু এবার বলল, ‘এক ট্যাকা দিলে সত্তর ট্যাকা পাওয়া যায়?’

বুড়া মাথা দুলিয়ে বলল, ‘সত্তর হাজার গুণ পাওয়া যায়। বুকত ঈমান থাকার নাগে।’

আকালু তার শেষ সম্বল দশ টাকার নোটটা বের করে বুড়ার পায়ের কাছে রাখল। বুড়া টাকাটার দিকে তাকাল, তারপর আকালুর মাথায় হাত রেখে বলল, ‘আল্লা তোর ভালো করিবে। বুকত ঈমান থুইস্।’


লোকেরা আকালুকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে। মরে গিয়ে আকালু হিন্দু হয়ে গেল নাকি?


২.
আকালু চলন্ত রেলগাড়ির এক জনাকীর্ণ প্রায়ান্ধকার কামরার মেঝেতে গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে বসে তন্দ্রায় দুলছে। তার গলায় ঝুলানো মাদুলি বুকের মাঝখানে জীবন্ত; ঠান্ডা ও চুপচাপ। তন্দ্রায় ঢুলতে ঢুলতে সে দেখতে পাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত মাঠে যত দূর চোখ যায় শুধু ধানখেত আর ধানখেত। থোকা থোকা ধানের শিষে ধরে আছে ছোট ছোট ফুলের মতো ভাত, ধবধবে সাদা। ভাতের সুঘ্রাণে ম ম করছে সারা মাঠ। আকালুর নাকের পাটা তির তির করে কাঁপছে, ওর নাকের ফুটা বড় হচ্ছে।

কারা যেন উল্লসিত স্বরে বলাবলি করছে : ‘ধান পাকি ভাত হয়্যা গেছে বাহে! এখন খালি প্যাট ভরি খাও। যত পার খাও বাহে, খাতি থাকো। ভাত খাতি মরি যাও, তাও শান্তি!’

আকালু ঝাঁপ দিয়ে নেমে পড়ল ধানখেতে; ধানখেত নয়, ভাতের দরিয়া। সে হাঙরের মতো গোগ্রাসে গিলতে লাগল শিষসুদ্ধ থোকা থোকা ভাত।

‘খাও বাহে খাও। আল্লায় দিছে, কিয়ামতভর খায়াও ফুরাবে না।’

ভাতের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে আকালু ভাত খাচ্ছে। শুধু মুখ দিয়ে নয়, সর্বাঙ্গ দিয়ে। সাদা সুগন্ধি রাশি রাশি ভাত তার সারা শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে ত্বক ভেদ করে।

কিন্তু হায়, তবুও তার পেট ভরছে না, পেটের জ্বালা কমছে না। কারা যেন বলাবলি করছে।

‘কী মরণখিদা দিলু তুই, খোদা! মোরা কি এইবার খিদার চোটেই মরিই যামু?’

আকালু দেখতে পেল খেতের সমস্ত ভাত শেষ, আর তার পেটখানা ফুলে হয়েছে ঢাউস এক ঢোল। পাহাড়ের মতো পেট নিয়ে নিধুয়া পাথারের মাঝখানে সে চিত হয়ে পড়ে আছে সে। গাঁয়ের লোকেরা দলে দলে এসে তার পেটে ঢোল বাজাচ্ছে, নাচছে আর গান গাইছে।

তারপর তারা আকালুকে কাঁধে তুলে নিল, নিয়ে চলল যেন মড়া নিয়ে যাচ্ছে। তারা বলাবলি করছে : ‘মরি গেইছে, আকালু ভাত খাতি খাতি মরি গেইছে। যাক, তাও শান্তি!’

লোকেরা আকালুকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে। মরে গিয়ে আকালু হিন্দু হয়ে গেল নাকি? তওবা আস্তাগ ফেরুল্লা! আকালু তার বুকের উপর ঠান্ডা মেরে পড়ে-থাকা জিন্দা মাদুলিতে সমীহভরে হাত বোলাতে লাগল। কিন্তু নাছোড় দৃশ্যটা ঝুলেই রইল তার চোখের সামনে। ওই যে নদীপাড়ের শ্মশানঘাটে হিন্দু লোকেরা মড়া পোড়াচ্ছে :

‘কোনঠে যান, বাহে?’

‘খিয়ারত যাই, বাহে। এই তল্লাটে তো কাম-কাজ কেছু নাই।’

‘তা কে মরি গেল কাঁই?’

‘নিবারণ। না খায়া থাকতি থাকতি নিবারণ মরি গেল।’

‘বোল হরি, বোল!’

লোকেরা আকালুকে কাঁধে করে শ্মশানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সে শুয়ে ভাবছে : ‘ই কিরকম কারবার, বাহে!’

আকালু তাজ্জব হয়ে শুধু ভাবছে। তার প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে গেছে। সে এখন মড়া, আর যারা তাকে কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে তারা নিশ্চয়ই হিন্দু।

‘মুই তালে মরিই গেনু!’

লোকেরা ‘বোল হরি, হরি বোল’ রব করতে করতে এগিয়ে চলল কাঁধে মড়া নিয়ে। নদীর পাড়ে পৌঁছে তারা মড়াটার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল। আকালুর সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে। একজন একটা চেলাকাঠ দিয়ে প্রচণ্ড জোরে একটা বাড়ি মারল আকালুর মাথার খুলিতে।

আকালুর তন্দ্রা ছুটে গেল, সে দখতে পেল তার পাশে বসা লোকটা নিজের কপালে হাত বুলাচ্ছে আর আকালুকে বলছে, ‘দরদ লাগল, বাহে?’

আকালু হেসে বলল, ‘ঢুঁসাঢুঁসি ভালো খেলা। কিন্তুক্ মোর মাথাডা কলে নোয়ার নাকান শক্ত। তোমার কপালডা ফাটি যায় নি ত?’

লোকটাও এবার হাসল। হেসে বলল, ‘কোনঠে যান?’

‘খিয়ারত যাই। ই তল্লাটে কাম-কাজ নাই, না খায়া গোয়া শুকায়।’

‘হামিও তো খিয়ারত যাবার নাগ্‌ছু বাহে। তোমার বাড়ি কোন গাঁও?’

‘চিতলমারি। তোমার কোন গাঁও?’

‘শিয়ালমারি। নাম কী হয়?’

‘আকালু। তোমার নাম কী হয়?’

‘আব্বাস। তা একলাই চলিলেন খিয়ারত?’

‘আর কয়ো না বাহে, শালা হারামিরা হামাক একলা ছাড়ি চলি গেইল।’

আব্বাস বলল যে সেও দুর্ভাগ্যবশত আকালুর মতোই দলছুট। তারপর দুজনের মধ্যে আলাপ জমে উঠল।

আব্বাস বলল, ‘বিয়া করছেন?’

‘লিজেই খাওয়া পাঁও না, আবার বিয়া!’ হেসে বলল আকালু।

আকালু জিজ্ঞাসা না করতেই আব্বাস বলল, ‘মুই বিয়া একখান করছিনু হয়। বউডা মরি গেইছে।’

‘না খায়া?’ আকালুর ধারণা আব্বাসের বউ মারা গেছে অনাহারে।

আব্বাস বলল, ‘প্যাটের মধ্যে ঘাও হছিল। ডাকতরে কয় আলছার। মরি গেইল।’

আকালু সান্ত্বনার সুরে বলল, ‘আল্লায় বাঁচি থুইলে বউ আর একখান পাওয়া যাইবে হয়।’ তারপর সে আব্বাসের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার কাছে খাওন কিছু আছে?’

আব্বাস ডানে-বামে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাল তার কাছে কোনো খাবার নাই। সে বলল, ‘খিদা নাগছে?’

আকালু বলল, ‘হয় হয়। বেড্ডাই খিদা বাহে। ভাত খাঁওনি আজ দুই দিন হয়। পার্বতীপুর আসিয়া দুইখান বনউটি কিনি খানু, শালার প্যাট কেছুই মালুম পাইল না। উংকা শও দুয়েক বনউটি নাগিবে। মোর মনে কয়, মোর প্যাটের মধ্যে বুঝি একখান আক্কস আছে, বাহে।’

আব্বাস হেসে বলল, ‘আগে খিয়ারত যায়া নেও। তারপরে কত ভাত খাইবেন, ভাত খাতি খাতি অরুচি হয়্যা যাবি।’

আকালু উদ্‌গ্রীব হয়ে জানতে চাইল, সে যত ভাত খেতে পারবে গৃহস্থেরা কি তাকে তত পরিমাণ ভাতই দেবে?

আব্বাস যেন নিজেই এক গৃহস্থ এমন ভঙ্গিতে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘নিচ্চই। কতটি ভাত খাবার পারেন তুমি, বাহে?’

আকালু বলল যে সে এক বৈঠকে দেড় সের চালের ভাত খেতে পারবে। আব্বাস হেসে আকালুর চিমসে যাওয়া পেটে মৃদু গুঁতো মেরে বলল, ‘তালে তোমার এই প্যাটখান ফটাস করি ফাটি যাইবে।’

আকালু খিক খিক শব্দ করে হেসে উঠল।

তারপর সে আব্বাসের কাছে জানতে চাইল, খিয়ার তো বিরাট বড় অঞ্চল, তারা ঠিক কোনখানে যাবে কাজের খোঁজে। আব্বাস তাকে বলল যে সে আগের বছর আমন মৌসুমে যেখানে ধান কাটতে গিয়েছিল, এবারও সেখানেই যাবে। সেখানকার গৃহস্থরা ভালো মানুষ। তারা কৃপণ নয়, তাদের বাড়িতে বিরাট বিরাট ডেকচিতে ভাত রান্না হয়, তারা কামলাদের পেট ভরে ভাত খেতে দেয়। আকালু, যার বয়েস পঁচিশ কী ছাব্বিশ, যে আগে কখনো খিয়ার দেশে ধান কাটতে যায় নি, শুধু সেখানকার ধান আর ভাতের গল্প শুনেছে, সে আব্বাসের মুখে অঢেল ভাত আর গৃহস্থদের উদারতার কথা শুনে খুশি হয়ে পা নাচাতে লাগল।

৩.
খুব ভোরে আকালু আর আব্বাস ট্রেন থেকে নামতেই কতকগুলি ছেলে তাদেরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্লাটফরমের এক কোনার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল। ওরা দেখতে পেল ছেলেগুলি শুধু ওদের দুজনকেই নয়, ট্রেন থেকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোককে ওইভাবে ধাক্কা মেরে মেরে এক দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেগুলির চোখ লাল, কারও হাতে লম্বা লাঠি, কারও হাতে কঞ্চি। তারা গরুর পাল খেদানোর মতো তাদের ঠেলে ঠেলে প্লাটফরমের এক কোনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, জোরে জোরে ধমকাধমকি করছে। তারা লোকগুলিকে চার দিক থেকে ঘিরে রয়েছে। এমন সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে যেন কেউ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে।

‘ব্যাপার কী, বাহে?’ আকালু আব্বাসকে বলল।

আব্বাস কিছু বলার সুযোগ পেল না। এক তরুণ তার কোমরে বাঁধা গামছা ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে বলল, ‘চুদির ভাই, যাস কোনটে?’

আব্বাস ভড়কে গিয়ে তরুণটাকে বলল, ‘এংকা করেন ক্যা? কী চান তোমরা, বাহে?’

‘বস্ এটে।’ তরুণ আব্বাসের কোমরের গামছা ধরে টান দিল। আকালুর কাঁধে এমনভাবে চাপ দিল যেন সে তার ঘাড়ের উপর চড়ে বসবে।

‘কী ব্যাপার, ভাই?’

‘বস্ বস্। এই শালারা, বস্। কেউ এক পাও লড়বু না।’

আকালুরা যেন গরুর পাল। তাদের কাঁধে কাঁধে ঠেলাঠেলি লেগে গেল, কেউ কেউ প্লাটফর্মের উপর বসে পড়ল। একটা ছেলে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে লোকগুলির মাথা গুনতে আরম্ভ করল। একটা লোক এসে তাকে বলল, ‘হামার তিনজন লাগবে।’

ছেলেটা তাকে বলল, ‘নব্বই ট্যাকা।’

লোকটা চিৎকার করে উঠল, ‘কী? এক মাথা তিরিশ ট্যাকা?’

ছেলেটা বলল, ‘হয়। নব্বই ট্যাকা বার কর।’

লোকটা আরও জোরে চেঁচামেচি শুরু করে দিল : ‘কী আরম্ভ করিছিন তোমরা? দেশটা কি মগের মুল্লুক হয়া গেল যি তোমরা যা ইচ্ছা তাই করবিন?’

‘ট্যাকা দিয়ে মানুষ লিয়ে চলে যা চুপচাপ। গ্যাঞ্জাম করিস না।’

‘তিন দশে তিরিশ ট্যাকা। তার এক পসাও বেশি দিমু না।’

ছেলেটা এবার লোকটার বুকে একটা ধাক্কা মেরে বলল, ‘কোন্টেকার লাটসায়েব রে তুই? যা ভাগ্‌।’

লোকটা এবার চুপসে গিয়ে বলল, ‘সেদিনক্যাই তো দশ ট্যাকা করে লিয়ে গেনো, ভাই!’

তখন আরেক লোক এসে বলল, ‘হামার সাতজন মানুষ লাগবে।’

‘দুইশ দশ ট্যাকা।’

ছেলেটার কথা শুনে লোকটার দুই চোখ কপালে উঠে গেল, ‘কয় কী?’


আকালুর গায়ে জ্বালা ধরে গেল। আব্বাস কেমন লোক? তার কি খিদা-তিয়াস নাই? আর মরদগুলারও কি খিদা লাগে না? তিয়াস লাগে না?


দুজন পুলিশ কনস্টেবল একটু দূরে ঘুর ঘুর করছে আর ফিরে ফিরে ওই ভিড়ের দিকে তাকাচ্ছে। তাদেরকে শোনানোর উদ্দেশ্যে লোকটা চিৎকার করে বলল, ‘কী অত্যাচার শুরু করিছিন তোমরা? দেশত কি আইন-বিচার বলে কেচ্ছু নাই?’

দুই পুলিশ কনস্টেবলকে এবার হাসতে দেখা গেল। তারা এগিয়ে এল না।

হঠাৎ আব্বাস উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতেই তার একটা হাত খপ করে চেপে ধরল একটা ছেলে, ‘এই, যাস কোন্টে?’

আব্বাস হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘ছাড়েন ত বাহে।’

ছেলেটা আব্বাসের মাথায় একটা চাটি মেরে বলল, ‘বস্, যাবু কোনটে?’

‘মহামছিবৎ! বাহে, মোরা মদুপুর যাইম। ওটি মোরা কাম করি।’

‘ট্যাকা দিয়ে যা।’

‘মোরা গরিব কামলা মানুষ। ট্যাকা ত দিবে গিরস্তরা।’ আব্বাস করুণভাবে বলল।

‘ট্যাকা না দিলে যাওয়া পারবু না।’ ছেলেটা ঘোষণা করল।

ওদিকে গৃহস্থদের বাড়ি থেকে মজুর নিতে আসা জনা-পাঁচেক লোকের সঙ্গে ছেলেগুলোর ঠেলাঠেলি-ধাক্কাধাক্কি চলতে চলতে এক পর্যায়ে মারপিট বেঁধে গেল। ছেলেগুলি লাঠি আর কঞ্চি দিয়ে ফটাফট বাড়ি বসাতে লাগল, আর লোকগুলি তাদের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করে দিল। স্টেশনের বিভিন্ন দিক থেকে লোকজন ছুটে আসতে শুরু করে দিল; একটা তুমুল হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। দুই পুলিশ কনস্টেবল দূরে দাঁড়িয়ে রসিক চোখে চেয়ে রইল। এই ফাঁকে আব্বাস আকালুর একটা হাত ধরে বলল ‘চলেন, বাহে!’

দুজনে দৌড়াতে আরম্ভ করল।

শহর পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে আকালু আব্বাসকে বলল, ‘তোমার সেই গাঁও কত দূর, বাহে?’

‘দশ মাইল।’

‘হাঁটি হাঁটিই যাওয়া নাগিবে?’ অসহায়ের মতো জানতে চাইল আকালু।

‘হয়।’ আব্বাস মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে বলল।

‘ক্যা, বাস-টাস চলে না?’

‘চললি কী হইবে? ভাড়া নাগিবে না?’

‘তোমার কাছত্ ট্যাকা-পসা কিছু নাই?’

‘তোমার কাছত্ নাই?’

‘দশখান ট্যাকা আছিল, বাহে। এক হুজুরে ঠগিয়া নিইছে। তাবিজ দিইছে একখান। কয়, বালামছিবত দূর হয়্যা যাইবে।’

‘ভালো কথা।’ আব্বাসের কণ্ঠে তিরস্কার।

‘মুই এডা বোকা লোক, তাই নোয়ায়?’ আকালু নিজেকে তিরস্কার করে বলল।

আব্বাস উত্তর দিল না। সে কেন গম্ভীর হয়ে গেল আকালু বুঝতে পারল। আব্বাস লম্বা লম্বা কদম ফেলে হন হন করে হেঁটে চলল। সে বেশ লম্বা একটা লোক, যদিও হাড্ডিসার। আকালু তার মতো লম্বা নয়, সে ছোট ভাইয়ের মতো আব্বাসের সঙ্গে কদম মিলিয়ে চলল।

এভাবে মাইল দশেক রাস্তা পায়ে হেঁটে দুজনে যখন মুধুপুর গ্রামের ইব্রাহিম মণ্ডলের বাড়ির খলায় পৌঁছল, এবং আব্বাস হাঁক ছেড়ে বলল, ‘চাচা মিয়া, আবার আসিনু বাহে’, তখন বেলা দশটা। আকালু আব্বাসের অবস্থা জানে না, তার নিজের মনে হলো, এখন পেট ভরে ভাত খেয়ে সটান শুয়ে পড়তে পারলে সে আর কোনো দিন জেগে উঠবে না।

কিন্তু মণ্ডলবাড়ির কিষানেরা ইতোমধ্যে সকালের পান্তাভাত খেয়ে ধান কাটতে মাঠে চলে গেছে; এই বেলার মতো বাড়ির অন্য সকলেরও খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকেছে। দুপুরের রান্নার আয়োজন সবে শুরু হয়েছে। তাই আকালু আর আব্বাস একটু গুড়সহ খানিকটা মুড়ি ছাড়া আপাতত কিছুই পেল না। কিন্তু মুড়ি তো ভাতের মতো গোগ্রাসে গেলার খাদ্য নয়। পেটের মধ্যে চালান করার আগে দাঁতে-জিবে অনেক কসরত করতে হয়। তাতে ভাত খাওয়ার মতো তৃপ্তি মেলে না। বরং চিবানোর মচমচ শব্দকে বেগার খাটুনি মনে হয়, কারণ মুড়ি পেট পর্যন্ত পৌঁছে বলে মনে হয় না, মুখ-গহ্বরের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যায়।

‘মিছা কতা কওয়া আর মুড়ি খাওয়া ত সমান কতা বাহে, কুনো লাভ নাই।’ মচমচ শব্দ করে মুড়ি চিবুতে চিবুতে আকালু আব্বাসকে বলল।

আব্বাসের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

৪.
ছোট একখানি মাঠ; মনে হয় সোনা-বিছানো একটা গোলকার আঙিনা। মাঠের সীমানা শেষ হয়েছে চোখের নাগালের মধ্যেই, ঘন গাছগাছালিতে ঢাকা গ্রামগুলি যেন গায়ে গায়ে জড়াজড়ি করে ঘিরে রেখেছে মাঠটিকে। পশ্চিম পাথারে ইব্রাহিম মণ্ডলের তিন বিঘা জমিতে ধানকাটার শব্দ : ধানগাছ আর কাস্তের দাঁতের সারি মিলে ঘসর্ ঘসর্। পাঁচ জনের একটা বাহিনী সকাল থেকেই ধান কাটছিল, আকালু আর আব্বাস তাদের সঙ্গে যোগ দিলে সংখ্যাটি দাঁড়াল সাত। মণ্ডলের হুকুম, এই সাতজনকে এক দিনের মধ্যে তিন বিঘা জমির সব ধান কাটা শেষ করতে হবে। ফাঁকি দিয়ে গপ্প-গুজব করার সুযোগ নাই।

ভাত যত পার ভাত খাও, কামডা ঠিক মতন করা চাই। হেলেদুলে গাওত্ বাতাস লাগায়া দিন পার করার মতলব চলবে না।

সুতরাং শুধু ঘসর্ ঘসর্ শব্দে ধান কাটা, শুধু ফোঁস ফোঁস শব্দে শ্বাস ফেলা।

আকালুর মাজা ধরে এল। হাতদুটি আর চলতে চাইছে না। চোখ টাটাচ্ছে, পাদুটো কামড়াচ্ছে। আর পেটের মধ্যে জ্বলছে আগুন।

‘খিয়ারত আসিও এক থালি ভাত এখনতরি পানু না বাহে!’ মনের দুঃখে বিড় বিড় করে বলল আকালু। কিন্তু আব্বাস তা শুনতে পেল না।

আকালু ভাবছে, দুপুরবেলার খাওয়ার সময় আর কত দেরি। সে আকাশের চোখ তুলে দেখল, সূর্য দক্ষিণ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রওয়ানা করেছে। মানে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে।

আকালু তার পাশে ধান কাটায় ব্যস্ত আব্বাসকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে বলল, ‘ক্যা বাহে, খিয়ারের মানষের ইংকাই বিচার?’

‘ক্যান? কী হইল?’

‘দুবর হইল না? ডুব-গোসল, খাওয়া-দাওয়া নাই?’

‘সবুর ধর্। কত খাবু?’

‘কখন বাহে? কখন খাবা দিবে?’

আব্বাস হাসল। আকালুর গায়ে জ্বালা ধরে গেল। আব্বাস কেমন লোক? তার কি খিদা-তিয়াস নাই? আর মরদগুলারও কি খিদা লাগে না? তিয়াস লাগে না?

আকালু মনে এরকম প্রশ্ন জাগল। কিন্তু সে আর কিছু বলল না। রাগ ঝাড়তে থাকল ধানগাছগুলোর উপর। তার কাস্তের ঘসর্ ঘসর্ বেড়ে উঠল। মজুরদের কালো কালো পিঠে ঘাম চকচক করছে। বাতাসে ঘসর্ ঘসর্ শব্দ। ফোঁস ফোঁস ধ্বনি।

অনেকক্ষণ পরে আব্বাস আকালুর পাঁজরে কনুই মেরে বলল, ‘ওই দ্যাখ, তোর জন্যি ভাত আসতিছে। কত খাবু?’

আকালু পিছন ফিরে চেয়ে দেখতে পেল জমির আল ধরে কাঁধে ভার নিয়ে আসছে মণ্ডলবাড়ির কিশোর রাখাল। কী সুন্দর দৃশ্য : নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে ছেলেটা, তার কাঁধের ভারের শিকায় দুলছে কলসি আর গামলা। আকালু মুহূর্ত গুনছে, ছেলেটার কদম গুনছে। তার জিবের তলে দুই পাশে নোনা রস জড়ো হচ্ছে।

রাখাল ছেলেটা এসে জমির আলের উপর কাঁধের ভারটা নামিয়ে রেখে বড় মানুষের মতো কেজো ভঙ্গিতে বলল, ‘খাওয়া-দাওয়া কোরে ল্যাও বারে।’

আকালু এক ছুটে গিয়ে গামলাটির ঢাকনা সরাল। গামলাভর্তি ধবধবে সাদা ভাত। কলসির মুখের উপর আরেকটা গামলা। সেটার ঢাকনা সরিয়ে আকালু দেখতে পেল খেসারি কলাইয়ের ঘণ্ট, খুব ঘন, যেন দই। অবশ্য মধ্যে মধ্যে সবুজ টুকরো-টাকরা আছে; কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজের কুচিও বিরল নয়। কিন্তু ভাতের গামলাটার দিকে আবার চেয়ে আকালুর মুখটা বেজার হয়ে গেল।

‘এই ভাত কয় জনার? সাতজন মানষের জন্যি এত্তিকোনা ভাত?’ সে বলল। তার কথা শুনে অন্য মজুরেরা হাসাহাসি শুরু করে দিল। কারণ, ভাতের গামলাটা মোটেও ছোট নয়।

আকালু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘এই ভাতে কি মোর একলারই প্যাট ভরবে, বাহে? খিয়ারের গিরস্তরা বুলে কেরপন নোয়ায়?’

মজুরেরা হাসছে। বেশি হাসছে আব্বাস। হাসতে হাসতে সে আদরের সুরে বলল, ‘পাগলা, পাগলা!’

আকালু বলল, ‘তোমরার প্যাটগুলান কি মুরগির প্যাট, বাহে?’

আব্বাস হেসে বলল, ‘তোর প্যাটখান কি ডাবর?’

‘ডাবর নোয়ায়, দরিয়া! মোর প্যাট দরিয়া হয়। এই ভাত মুই একলাই খামু। তোমরার ভাত তোমরা আনিবার কন্ বাহে।’

‘পারবু?’

‘পারমু না? তোমরাগুলা দেখিবার চান?’

মজুরেরা এক সঙ্গে বলে উঠল, ‘দ্যাখা দিনি! হামরা কেউ এডা ভাতও ছোঁমো না। তুই একলাই খা। শ্যাষ করা না পারলে কিন্তুক জরিপানা!’

আকালু চিৎকার দিয়ে উঠল: ‘চ্যালেঞ্জ!’

মজুরেরাও চিৎকার করে বলল, ‘চ্যালেঞ্জ!’

আকালু শিকার ভিতর থেকে ভাতের গামলাটা দুই হাতে ধরে বের করে আনল। কলসির মুখের উপর থেকে খেসারির ঘণ্টের গামলাটা নামাল, একটা শিকায় সাতটা থালার সঙ্গে প্লাস্টিকের একটা গ্লাস থাকা সত্ত্বেও সে কলসি কাত করে একটুখানি পানি ঢেলে শুধু ডান হাতটা ধুয়ে নিল। তারপর, থালাটালা কিছু নয়, পুরো ভাতের গামলাটাই মুখের সামনে রেখে মাটির উপর লেটা মেরে বসল। খেসারির ঘণ্টের পুরো গামলাটাই উপুর করে ঢেলে দিল ভাতের গামলায়। তারপর আরম্ভ করল খাওয়া। আব্বাস ও অন্য মজুরেরা তার সামনে আধাআধি একটা বৃত্তের মতো হয়ে বসে পড়ল। তারা নিজেদের খিদার কথা ভুলে গেছে, তাদের মুখে এখন বিনোদনের হাসি।

আকালু একটুখানি ঘণ্ট নিয়ে মুঠি ভরে ভাত মাখছে, বড় একটা গোল্লা বানাচ্ছে, তারপর গপ করে মুখে পুরে দিচ্ছে। দিয়ে, বার-দুই মাড়ি নাড়াচ্ছে, তারপর কোত করে গিলে ফেলছে।


কিষানেরাও পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে হাসাহাসি করছে। মণ্ডলবাড়ির রাখাল ছেলেটা হাততালি বাজিয়ে নাচছে।


এইভাবে চলতে থাকল। আকালু ভাত মাখে, গোল্লা বানায়, আবার মুখে পুরে দেয়, চিবায় না, কোত করে গিলে খায়। এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি চলতে লাগল। আব্বাসেরা হাসিমুখে চেয়ে চেয়ে দেখে চলল আকালুর ভাত খাওয়া: কোত কোত শব্দে তার ভাত গেলা। তারা তার পেটের দিকে তাকাচ্ছে, দেখে অবাক হচ্ছে যে হাড্ডিসার আকালুর শুকনা পেটটা একটুও ফুলে উঠছে না।

আকালুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। আব্বাসেরা মনে মনে বলল, এইবার আকালুকে থামতে হবে, আর সে খেতে পারবে না, কারণ সাতজন মানুষের খাবার একজন মানুষের পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আকালুর মধ্যে থামার কোনো লক্ষণ তারা দেখতে পেল না। সে একইভাবে খেয়ে চলল, তার পেট ফুলে উঠল না। আব্বাসেরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদের মনে প্রশ্ন জাগল, আকালু কি ভাত পাচার করার কায়দা জানে? সে কি সেই কিংবদন্তি খানেওয়ালা, যে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ওরস, মজলিস ইত্যাদি গণভোজে বসে গোগ্রাসে খাদ্য খায়, আর সেইসব খাদ্য গিয়ে পড়ে তার বাড়িতে ফেলে আসা অনাহারি বউ-ছেলেমেয়েদের শূন্য থালায়?

গামলার অর্ধেকটা খালি হয়ে গেল। আব্বাসের মনে পড়ল, এই সময়ের মধ্যে আকালু একবারও পানি খায় নি। ‘এই পাগলা, দুই ঢোক পানি খা রে।’ আব্বাস আকালুকে বলল। আকালু কোনো কথা না বলে ভাত গিলতে গিলতে ডানে-বামে মাথা ঝাঁকিয়ে আব্বাসের উপদেশ উড়িয়ে দিল।

এখন আকালুর কপাল থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরে পড়ছে ভাতের গামলায়। ঘামের রেখা এঁকেবেঁকে নামছে তার ঘাড়-গর্দান বেয়ে। আকালু ভাতের গামলা থেকে মাথা তুলছে না, কারো দিকে তাকানোর ফুরসত তাই নাই।

ভাতের গামলা খালি হয়ে এল। আকালু শেষ ভাতটুকু জড়ো করে একটা লোকমা বানাল, সেটা হাতের তালুতে নিয়ে সে মুখের কাছে তুলল, হা মেলল। কিন্তু না, ভাতের লোকমাসুদ্ধ হাতটা নেমে এল। ভাতের লোকমা গামলার মাঝখানে রেখে আকালু ভারি একটা শ্বাস ছাড়ল। শ্বাসটা বেরিয়ে যাওয়ার পরে মনে হলো তার নাক দিয়ে আর বাতাস ঢুকছে না। দম বন্ধ হয়ে গেছে। এবার সে চোখ তুলে আব্বাসের দিকে তাকাল। তার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আব্বাসের মনে হলো, আকালুর দুই চোখ ফেটে মণিদুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে টিটকারির সুরে বলল, ‘কী রে? এলায়ও প্যাট ভরে নাই?’

আকালু কিছু বলল না। অন্য মজুরেরা বলে উঠল, ‘শালা, এলাও মোরা কী খাঁও?’

আকালু হঠাৎ চারদিকে হাত-পা মেলে দিয়ে চিতপাত শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার ফলে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো; সে কনুইয়ে ঠেস দিয়ে উঠে বসল, দুই পা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে দুই হাত পেছনে ঠেস দিয়ে মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। কিন্তু স্বস্তি পেল না; সে দুই হাতে চাড় লাগিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আবার চিতপটাং শুয়ে পড়ল। তার পর হাতদুটো জড়ো করে রাখল পেটের উপর। হাঁসফাঁস করতে করতে বলল, ‘মোর প্যাটখান ফাটি গেল বাহে!’

আব্বাসেরা হো হো করে হেসে উঠল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আকালুর গড়াগড়ি শুরু হয়ে গেল। ধানকাটা মাঠের উপর গড়াগড়ি খেতে খেতে সে কেঁদে কেঁদে বলল, ‘মুই আর বাঁচিম না বাহে, মুই মরি গেনু।’

বুকের মাদুলিটা ডান হাতে চেপে ধরে গড়াগড়ি খেতে খেতে আকালু দমবন্ধ গলায় চিৎকার করে কেঁদে বলে উঠল, ‘ও দয়াল আল্লা, মাপ করি দে! মোকে মাপ করি দে!’

আব্বাস হাসছে, অন্য কিষানেরাও পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে হাসাহাসি করছে। মণ্ডলবাড়ির রাখাল ছেলেটা হাততালি বাজিয়ে নাচছে।

মশিউল আলম

জন্ম ১৫ জুলাই, ১৯৬৬; জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
গল্পগ্রন্থ—
১. রূপালী রুই ও অন্যান্য গল্প [সাহানা, ১৯৯৪]
২. মাংসের কারবার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০২]
৩. আবেদালির মৃত্যুর পর [ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৪]
৪. পাকিস্তান মাওলা ব্রাদার্স [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১]

উপন্যাস—
১. আমি শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছি [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
২. তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত [মাওলা ব্রার্দাস, ২০০০]
৩. নাবিলাচরিত [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৪. ২০৯৯ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০১]
৫. ঘোড়ামাসুদ [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
৬. প্রিসিলা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৭. বাবা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৯]
৮. বারে বারে ফিরে আসি [জনান্তিক, ২০১১]
৯. জুবোফস্কি বুলভার [প্রথমা, ২০১১]
১০. দ্বিতীয় খুনের কাহিনি [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
১১. কাল্লু ও রেজাউলের সত্য জীবন [আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৬]
১২. যেভাবে নাই হয়ে গেলাম [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬]

শিশু সাহিত্য [উপন্যাস]—
১. তুমুল ও হ্যারি পটার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
২. তুমুলের আঙুলরহস্য [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
৩. বিড়াল কাহিনি [চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০১৬]

কলাম সংকলন—
১. জাহাঙ্গীর গেট খোলা আছে [অনন্যা, ২০১১]
২. বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়েছিল কে ও অন্যান্য নিবন্ধ (আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৭]

অনুবাদ—
১. প্লেটোর ইউটোপিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৭]
২. অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৯]
৩. সক্রেটিসের আগে : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০৩]
৪. সাদা রাত : ফিওদর দস্তইয়েফস্কি [বাংলা একাডেমি ২০০০, অবসর প্রকাশনা সংস্থা ২০১৬]
৫. বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি : আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
৬. উইকিলিকসে বাংলাদেশ : মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তার অনূদিত সংকলন [প্রথমা প্রকাশন ২০১৩]
৭. দ্য গুড মুসলিম : তাহমিমা আনাম [প্রথমা প্রকাশন ২০১৫]

ই-মেইল : mashiul.alam@gmail.com

Latest posts by মশিউল আলম (see all)