হোম গদ্য গল্প অ্যাকিলিসের গোড়ালি

অ্যাকিলিসের গোড়ালি

অ্যাকিলিসের গোড়ালি
244
0

দীপনের আত্মহত্যার চেষ্টা যেদিন ব্যর্থ হলো, তার তিন দিন পর অর্থাৎ শনিবার আচমকা রিভলবারের শব্দে বাড়িটা কেঁপে উঠল। বিকট শব্দ, হ্যাঁ, ঠিকই সে শুনতে পেয়েছিল, আর কেউ শুনতে পেয়েছিল কি-না তা ঘুম ভেঙে গেলে বুঝে উঠতে পারছিল না; কারণ, বাড়ির আর কেউ তখনও জেগে উঠেছিল না। এবং কয়েক মুহূর্ত বিছানায় ব’সে চোখ রগড়াতে-রগড়াতে যখন স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারল, বিছানা থেকে নেমে, টয়লেটে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াল। বিগত ক’দিনের অস্বাভাবিক ঘুমে তার মুখ ফুলে উঠেছে বেশ; আয়নার কাছে সে বরাবরই কৃতজ্ঞ, কারণ সে মনে করে—রূপসীদের উপেক্ষার পর এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা পেয়েছে; সে যে কুৎসিত নয়, এই তথ্যটি আয়না ছাড়া আর কেউ তাকে কখনও জানাতে পারে নি। তখনও সকালের আলো বাইরে ফুটে উঠেছিল না; কমোডে বসল সে, জলত্যাগের ফাঁকে নিজের শিশ্নের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করল তার চামড়া-কর্তিত বর্তুল অগ্রভাগে ফুসকুড়ি জেগে উঠেছে। কোনও ব্যাপারই নয়। কিন্তু শেষ বিন্দুগুলির একেকটি পতনের মুহূর্তে দীপন অনুভব করল—না, ব্যাপারটি উপেক্ষণীয় কিছু নয়। ‘তবে কি আমি নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি?’—এই ভাবনা তাকে বিচলিত করল বটে; তবু শিশ্নে পানি ঢালার অবসরে একে প্রতিরোধের অন্তত মানসিক উপায়টা খুঁজে পেল সে। ঠিক করল, আজ মর্নিংওয়ার্ক করবে।

টয়লেট থেকে এসে, দীপন যেখানে শোয় বা শরীর রাখে, তার মাথার পাশের জানালা খুলল; ক্যাঁচ শব্দ হলো, কাক ও ঠান্ডানির্জন রাস্তায় তার চোখ পড়ল। সবাই তখনও ঘুমন্ত, অবশ্য পাশের ফ্ল্যাট থেকে কাশির কফমাখা শব্দ, টয়লেট থেকে প্লাস্টিকের বালতির তলায় পড়ন্ত ও পতিত ফোঁটা-ফোঁটা পানির শব্দ ভেসে আসছিল। এখন পর্দায় ঢাকা তার পিঠ; জানালায় হাত রেখে সে দাঁড়ানো; ক্লান্ত গর্ভিনীর নিঃশ্বাসের মতো বাতাস এসে দীপনের দুর্লক্ষ্যপশম বুকে ছড়িয়ে পড়ল। সহসা নিজের স্বর সে শুনতে পেল :

It is too late to start
For destinations not of the heart.
I must stay here with my hurt.

প্রায়-অবধারিত মৃত্যু থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মানুষের যা হয়—প্রথমে ভাবে যে, সে বেঁচে আছে। তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটল না। বাইরের সবকিছু স্পষ্ট হচ্ছিল, কাজের মেয়েটি, সে জানে—এখন জেগে উঠবে এবং আসন্ন সকালকে প্রতিরোধের কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায়, বিছানায় ব’সে কিছুক্ষণ ঢুলবে আর চোখে আঙুল ব্যবহার করবে। …একে-একে দীপন ভাবতে লাগল—সে বেঁচে আছে এই জন্য যে, তার মৃত্যু হয় নি; সে কি আদৌ নিশ্চিত ছিল যে, আর বেঁচে উঠবে না?… একটা বাজে অসুখ হয়েছে তার—বেশ্যার সঙ্গে মিলিত হওয়ার মুহূর্তে কি ভেবেছিল, সে ত মারা যাচ্ছে, জীবাণু তার কার্যক্রম শুরু করার আগেই তার মৃত্যু ঘটবে, বা, এই শরীরে বিপদ ঘটানোর কোনও সুযোগই থাকবে না? আর, সে ত মরতেই চায়, তো কোনো ব্যাধি যদি মৃত্যুর কারণও হয়, তাতে দীপনের আপত্তি থাকার কথা নয়।


লেকের চওড়া পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়াল সে এবং ঝুঁকে, নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল—তার প্রতিবিম্বের মধ্যে পোকারা কিলবিল করছে।


এই সব সে ভাবতে লাগল। হাওয়া বুকে এসে লাগছিল; নিজের বুকটাকে মাঠের উপর দিয়ে বাতাসে গড়িয়ে যাওয়া শূন্য ঠোঙার মতো মনে হলো। মনে হলো, এখন তার কোনো শোক থাকার কথা নয়, যে-কোনো অনুতাপ আজ অর্থহীন। সে বেঁচে আছে, টোপ গিলে ফেলা একটা মাছ শিকারির উদাসীনতাবশত যেরকম অন্যান্য জীবন্ত ও বিচরণশীল মাছের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। এখন একটা উদ্বৃত্ত জীবন নিয়ে তাকে একটা ব্যাধিসহ ভেসে বেড়াতে হবে, এতে তার আপত্তি থাকার কথা নয়। দ্বিতীয়ত মনে হলো, তার ত উপলক্ষ নেই কোনো; মানুষ ভালোবাসে, ঘৃণা ও উপেক্ষা করে, খুন করার প্রবৃত্তিও তার জাগে, সেক্ষেত্রে কেউ কেউ ঠান্ডা মাথায় সেই প্রস্তুতিও গ্রহণ করে। তার কিছুতেই কিছুর কোনো আর্জ হচ্ছে না, নিজেকে হত্যার চেষ্টায়ও এখন রুচি হচ্ছে না—ঠান্ডা মাথায়, তার শুধু এই কাজটি করার সামর্থ্য ছিল। তৃতীয়ত ভাবতে চাইল যে, সে মানুষের মতো ও অমানুষিক, ভালোবাসতে চেয়েছিল রুবিকে; কিন্তু ভালোবাসায় তার প্রয়োজন ছিল না, সে চেয়েছিল সংসার, আবহমান নারীর মতো এই আকাঙ্ক্ষায় আপত্তিহীন দু’বছর তার সঙ্গে মৈথুন ক’রে গেছে। তার কোঁকড়ানো ও স্ফীত চুলের মধ্যে মুখ রেখে দীপন শুধু নিজের জন্য, নিজের এই নশ্বর শরীরের জন্য ওই স্বপ্নকে সমর্থন করে গেছে। যায় নি কি? চ’লে যাওয়ার পর, না-হ’লে কেন মনে হলো তাকে ভালোবাসতে সে চেয়েছিল, অথচ রুবি চেয়েছিল সংসার—ক্লান্তিহীন দু’বছর একটা অর্থহীন ব্যায়ামের ভেতর দীপন প্রমাণ করেছে নিজের স্টুপিডিটি; না-চাইতেই মানুষ যখন কিছু পেয়ে যায় এবং না-বুঝে সেটা গ্রহণ করতে করতে একসময় নিজের বোকামি ধ’রে ফেলে শোচনীয়ভাবে, তখন তা কিরকম হৃদয়ঙ্গম করার মতো ব্যাপার হয়ে ওঠে, সে ভাবতে লাগল।

রাস্তায়, পার্কে কুয়াশা ছিল। হেঁটে হেঁটে দীপন অনেক দূর, হ্যাঁ, বহুদিন পর সকালের শীতে একটা মাঠের প্রান্তে এসে দাঁড়াল। সকাল, অপরাহ্ণ ও সান্ধ্যভ্রমণের জন্য শহরের এই বিখ্যাত মাঠ সংসদ ভবনের পেছনে বাঁকা চাঁদাকৃতি কৃত্রিম জলাশয়ের পাশ ঘেঁষে ও ছাড়িয়ে পুবের রাস্তা ও বাড়ি পর্যন্ত প্রসারিত। মাঠে দাঁড়িয়ে সে লক্ষ করল, মানুষেরা এই সকালেও হাঁটে লঘুগুরু পদক্ষেপে, তাদের কেউ-কেউ আবার দৌড়ায়। এই মানুষদের তেমন দুঃখিত বলে তার মনে হলো না। মানুষেরা তেমন দুঃখিত নয়—এই ভেবে সে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারত, কিংবা নিজের দিকে তাকিয়ে, এমনকি ঈর্ষান্বিত হতে পারত; কিন্তু হঠাৎ সে একটি লম্বা লোককে ছোট একটি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল। দীপন যে বেঁটে, কেউ কেউ তাকে বলত, তার তা বিশ্বাস হতো না; অথচ এ নিয়ে সে হীনম্মন্যও কিছু কম বোধ করেছিল না। কিন্তু যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মাথার চুলশূন্য তালু দেখতে পেল, সেদিন উপলব্ধি করল, যারা তাকে বেঁটে বলে বা মনে করে, তারা এই ভদ্রলোককে কখনো দেখে নি। এখন সে একটা লম্বা গাছের মতোই যে-কোনও লম্বা মানুষকে পছন্দ করে। (ডায়েরিতে একসময় এ-বিষয়ে একটা কবিতা লিখেছিল : আমি ভালোবাসি লম্বা গাছ/ আর লম্বা মানুষ/ যদিও/ তারা আকাশ ছুঁতে পারে না) লম্বা হওয়ার উদ্দেশ্যে দীপন কখনও-কোথাও সচেতনভাবে ঝুলেটুলে নি।

না, লম্বা লোকটার মুখোমুখি সে দাঁড়াল না। পাশ ঘেঁষে হেঁটে, ‘কী দেখছি’ ভঙ্গিতে পেছন ফিরে তার দিকে তাকাল। ছোটবেলায় দেখা বাংলাদেশ বিমানের বিজ্ঞাপনদৃশ্য তার মনে পড়ায়, (‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী’র শেষ শব্দের জায়গায় মনে মনে উচ্চারণ করল ‘মানুষ’) এই লম্বাত্বকে সেই মুহূর্তে বিরল ও হাস্যকর ঠেকল তার কাছে। হঠাৎ জলাশয়ে একটা বালককে ঢিল ছুড়তে দেখল দীপন। বালকের পিঠের দিকে একটা বিজ্ঞপ্তি ছিল। এরকম :

লেকের পানিতে ঢিল ছোড়া, গোসল,
মলমূত্র ত্যাগ করা, কাপড় কাচা,
মাছ ধরা নিষেধ ও আইনত দণ্ডনীয়।

জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, ঢেউগুলো একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে। লেকের চওড়া পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়াল সে এবং ঝুঁকে, নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল—তার প্রতিবিম্বের মধ্যে পোকারা কিলবিল করছে; টয়লেটের আয়না, ঘুমভাঙা সেই বিকট শব্দপূর্ব স্বপ্নদৃশ্য, কমোড—এইসব তার মনে পড়ল এবং শিশ্নাগ্রে ব্যথা অনুভব করল।

॥ ২ ॥
রোদ কিন্তু তেমন তেতে উঠেছিল না। মানুষের চলাচল, গাড়িগুলোর রেখে-যাওয়া ধোঁয়া ও রাস্তার ওপর ভাসমান ধুলার মধ্যে ফার্মগেটের জনাকীর্ণ ফুটপাতে দীপন দাঁড়িয়ে ছিল। কথা সেটা নয়; যখন নিঃশোষিত হয়ে আসছিল সকালটা, সে লক্ষ করল উদ্যান শূন্য হয়ে যাচ্ছে এবং ক্রমে পঙ্গু ও ভিক্ষুক ছাড়া সবাই অন্তর্হিত হয়ে গেছে—বুঝতে চাইল, এই অদুঃখিত মসৃণ মানুষেরা কোথায় যায় শেষ পর্যন্ত? বাকি দিনক্ষণ কেমন ক’রে কাটে তাদের? মানুষেরা এক জায়গায় বেশিক্ষণ আনন্দিত নয় নিশ্চয়, তারা সে কারণে জায়গা বদল করে।… মনে হলো, অফিস থেকে হঠাৎ ছুটি নেয়া তার ঠিক হয় নি। নিশ্চিত, আত্মহত্যা এই ছুটির উপলক্ষ ছিল না; বেশ ক’দিন হলো শরীর ভালো যাচ্ছিল না, মনটাও না। একটু জ্বর ছিল আর একটা কিছু ঘটবে, একটা অদ্ভুত ও শোচনীয় কিছু ঘটবে—এরকম বোধ হচ্ছিল। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো ঘটনা আদৌ ঘটবার অসাধারণত্ব নিয়ে ঘটে না; বা, ঘ’টে যাওয়ার পর সেটিকে নিরীহ এক তামাশার মতো মনে হয়। আজ যদি অফিসে উপস্থিত হতো, বা, একটু নাটকীয়ভাবে বেলা ক’রে সেখানে হাজির হতো সে, তাহলে এই আত্মহত্যাচেষ্টার কথা গোপন করতে হতো। কেননা, প্রকাশ করলে সবাই তাকে পাগল সাব্যস্ত করত এই ভেবে যে, লোকটি আত্মহত্যা উপলক্ষে ছুটি নিয়েছে।

কিন্তু ভিড়, বলা যেতে পারে চলিষ্ণু এই ভিড় গাঢ় হয়ে উঠলে দীপন বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না; দু’দিক থেকেই কনুই ও পায়ের গুঁতা, চাপ-ধাক্কা বেসামাল করে তুলছিল তাকে। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছিল না, রীতিসিদ্ধ ‘স্যরি’ও বলছিল না। সকালে যাদের সে দেখেছে মাঠে জগিং ও মৃদু পদব্রজে, তাদের কারুরই চেহারা এখানে উপস্থিত নয়; অধিকন্তু, এরা একেবারেই আলাদা: গতিশীল আর নির্বিকার; উদাসীন পীড়নকারীও বটে। দুপুর তেতে উঠছিল তখন, ভাসমান ধুলা ও ধোঁয়ায় দীপনের চোখ জ্বালা করছিল। ভিড় ঠেলে, ফুট ওভারব্রিজের গোড়ায় দাঁড়ালে সে দেখল—সিঁড়ির পর সিঁড়িতে থালাসহ শুয়ে-থাকা হাত-পা-কাটা ও অন্ধ এমন জনা-দশবারো লোক অদ্ভুত স্বরের অবিরাম ওঠানামা নিয়ে চেঁচাচ্ছে, এই প্রথম বোঝার চেষ্টা করল—তাদের ধ্বনিপ্রবাহে অর্থবোধক কোনও শব্দ আছে কি-না; এমনকি, সে দেখল কেউ কেউ ওই থালাগুলিতে তাদের ওঠানামার মধ্যে সিকি ও আধুলি এমনভাবে ফেলছে, যেন শব্দটা জোরে হয়; তাতে দাতার তৃপ্তি ও লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ হচ্ছে কি? ‘অন্তত এরা ত আত্মহত্যা করতে পারত’… চিৎকাররত পঙ্গু ভিখারিদের দিকে সে তাকিয়ে রইল। ব্রিজের গোড়া থেকে নিচে, ছায়ায় এসে দাঁড়াল দীপন। এখানেও স্থিতিরহিত ভিড়, কিন্তু অন্যরকম। এই জন্য যে, পুলিশের সংখ্যা এখানে নগণ্য নয়, তাদের কয়েকজন গালে অতিরিক্ত রঙমাখা একটা মহিলার সঙ্গে কথা বলছিল। মহিলাটি হাসছিল খুব, যদিও তাতে শব্দ ছিল না; থাকলেও শোনা যাচ্ছিল না। ‘বেশ্যা’… ‘বেশ্যার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক বেশ ভালো যাচ্ছে’… ‘মন্দ কী’… নিজের কণ্ঠও সে শুনতে পেল না। পাশে কোথাও বেজে উঠল তখন :

ট্যাট ট্যা ট্যাট্যাং ট্যাট ট্যা ট্যাটাং
দেখা হ্যায় প্যাহলে বার…

গাড়ি ও হর্নের বিচিত্র শব্দ, হকারের চিৎকার—এসব কিছুকে পরাজিত করে, ভেসে, ভেসে ভেসে ভেসে আসছে… উদ্ধৃত দু’লাইন ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারল না; তদুপরি হিন্দি সে ভালো বোঝে না; তবে জানে—বাংলাদেশের মানুষ বাঙলার চেয়ে হিন্দি কিছু কম বোঝে না, কিছু কম ভালোবাসে না। জনগণের এই হিন্দিপ্রীতির কথা ভেবে দীপন হঠাৎ প্রবল ভাষাসচেতন হয়ে উঠল। ভাবল : বায়ান্ন সালের পর যদি দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা হিন্দির জন্য জনগণ আন্দোলনে নামে? পাইকপাড়ায় দীপনরা যখন থাকত, তখনকার প্রতিবেশী এক মাদ্রাসাছাত্র ও মহিলার ছবি মনে পড়ল। ‘ওরা নিশ্চয় খুশি হবে। হবে ত!’ প্রথমে মনে মনে, পরে প্রকাশ্যে মাথা ঝাঁকাল।… তখনও কালো ধোঁয়ায়, কোলাহলে গানটা ভেসে আসছিল।

পুলিশের সঙ্গে সহাস্য সেই নারী চ’লে যাচ্ছিল; দীপন তাকে অনুসরণ করছিল, হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো ট্যাট ট্যা ট্যাটাংয়ের অনুরণন যেন এই মহিলার নিতম্বের ওঠানামার ছন্দ থেকে সৃজিত হয়ে চলেছে। নিজের ভেতর, কোথায় যেন একরকম উত্তেজনায় সে স্থিরতারহিত এই জনারণ্যে সর্বশেষ সঙ্গমের স্মৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ল। অনুভব করলো, শিশ্নপ্রান্তে ব্যথা হচ্ছে।


বেশ্যালয় যদি সমাজের দর্পণ হয় তাহলে সমাজ হচ্ছে একটা বেশ্যালয়।


সেই নারী আনন্দ হলের সামনে একটা চটপটি দোকানের সামনে দাঁড়াল। উঁহু, দাঁড়াল না, ঠিক, দোকানের কাঠের ফ্রেমে ঠেস দিয়ে এক পা পেছনদিকে ভেঙে নিজেকে দাঁড় করাল। লক্ষ করল—আঙ্গিকে ও-মতোই প্রায়, জনা-পাঁচ-সাতেক মহিলা নানাভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবল : এদের খদ্দের নেই! একজনের কাছে যদি সে যায়, তাতে, খদ্দেরহীনতায়, পাশের বেশ্যারা কি নিজেদের মাংশমূল্য যতটা সম্ভব কমিয়ে, টানাহ্যাঁচড়া করবে না ত! হাসান আজিজুল হকের সরল হিংসা গল্পটি তার মনে পড়ল। দুপুরের শো শুরু হয় নি তখনও, কিউতে বিশাল লাইন, ভিড়, টিকিটব্ল্যাকার ‘ডিসি-তিরিশ-ডিসি-তিরিশ’ চেঁচাচ্ছে, কেউ-কেউ পোস্টারে বক্ষনিতম্বনাভি-সম্বলিত মহিলা ও নর্তকীর দিকে মুখ খুলে তাকিয়ে আছে। সিগারেট ধরিয়ে দীপন চটপটির দোকানে ঠেস-দেয়া মেয়েটির কাছাকাছি দাঁড়াল। মুখের রঙ ঘামে মিশে গেছে মেয়েটির, রুবির চেহারা তার মনে পড়ল, রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে ব’সে বাগেরহাট থেকে স্বামীর প্রেরিত চিঠির ভাববস্তু বর্ণনার পর সে ‘আমি তোমার কাঁধে মাথা রাখব’ ব’লে চোখ তুলে তাকিয়ে, কেঁদে মুখ ভাসিয়েছিল। তাতে মেকআপময় রুবির মুখের রূপ কেমন লেগেছিল? তখন কি এই সিদ্ধান্তে দীপন সন্তুষ্ট থাকতে চেয়েছিল যে, ফ্রাস্টেটেড মহিলারা বেশি সাজুগুজু করে, অথবা, এই প্রশ্ন কি তাকে স্তব্ধ ক’রে রেখেছিল তখন—দাম্পত্যব্যর্থ নারী কেন প্রসাধন এত পছন্দ বা ব্যবহার করতে পছন্দ করে? বা, নিজস্বগোপন ব্যর্থতাগুলো প্রকাশিত না-হওয়ার ক্ষেত্রে যে-মুখশ্রীর ওপর আস্থা রাখা যায়, তা তাদের নেই—এমন ধারণা থেকেই কি তারা অত রঙ মাখে চেহারায়? চোখ বাঁকা ক’রে মেয়েটি তার দিকে তাকাচ্ছে, দীপন দেখল; এবং ওই তাকানোর ভেতর নিজের লুব্ধতা অনুভব করল। ‘তুমি কি সিনেমা দ্যাখপা?’ কাছে গিয়ে, এমন ভঙ্গিতে সে বলল—যাতে মেয়েটির মনে হয়—এটাই প্রথম নয়, এ-ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আছে।

: হ। দুইটা টিকেট নিয়া-স।
: রেট?
: খুশি হইয়া যা দ্যান।

‘আস’র পর ‘দ্যান’ শুনে দীপন ঠোঁট চেপে হাসল; কিন্তু কিউতে গিয়ে পেছন-পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে পারল, মানিব্যাগ নেই।

॥ ৩ ॥
একটা দ্রুতগামী ঘোড়ায় দীপন বসেছিল, পেছনদিক ভয়ানক লাফিয়ে উঠছিল, যেন তাকে ফেলে দিতে চাইছিল পিঠ থেকে—মাথা ঝাঁকিয়ে ঘোড়াটি তার হাতে-ধরা লাগামকে অস্বীকার করছিল—অবিরল হ্রেষাধ্বনি দীপনের মানুষিক-অমানুষিক মৃত্যু সম্পর্কে সাবধান ক’রে দিচ্ছিল; তখন সে নিজের কণ্ঠ শুনতে পেল : Why this talk of death? I know it; but for all that I will not cease till I give the trojans enough and more of war… ফিকে হয়ে আসছিল বিকালটা, চোখ কচলে খেয়াল করল যে সে শুয়ে আছে। জানালার ঈষৎ হলদে পর্দা আরও হলদে হয়ে উঠেছিল তখন, বাইরে কাকের আর দু’একটা গাড়ির মুছে যাওয়ার শব্দ শ্রুতিতে লাগছিল। পাখার বাতাসে দেয়ালের ক্যালেন্ডারটি পৌনঃপুনিক নড়ছিল। দেখল : একটা নৌকা, পালের আড়ালে সূর্য, তার বলয় থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে অনেক রেখায়, মাঝির অস্পষ্ট কালো শরীর চকচক করছে… ‘মাঝিটা ইম্পোর্টেস পাইতে পারত’… ‘তার মুখ’ … ‘পেশি’… ভাবল, শ্রেণিকে অ্যাভয়েড করে প্রকৃতির ইয়ে চুষছে—তারপর দীপনের ক্ষেত্রে যা ঘটে সাধারণত, নাম না-জানা ফটোগ্রাফারকে গালি দিল : কুত্তার বাচ্চা! তবে অদ্ভুত, তা অশ্রুত রইল। চোখ জ্বালা করছিল দীপনের, ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। বালিশে এতক্ষণ-রাখা মাথাটা তুলল এবং উঠে ব’সে আবার ঢোক গিলল : ব্যথা হচ্ছে। কিন্তু কই, প্রতিকারের কোনো ইচ্ছা জাগছে না ত! যে-শব্দের ধাক্কায় আজ তার ঘুম ভেঙেছিল, তার উৎস যে-রিভলবারটি—দীপন ভাবল—সেটি তার হাতে স্বপ্নের ভেতর, এল কিভাবে? রিভলবার একটা অবশ্য তার দরকার, সে ভাবল—অন্তত আত্মহত্যার জন্য রিভলবার দরকার; কিন্তু স্বপ্নে সে কাকে হত্যা করতে চেয়েছিল? নলটা নিজের মাথায় বা বুকে তাক করা ছিল না নিশ্চয়, তবে কার দিকে ছিল? জীবনে সে কার-কার মৃত্যু প্রত্যাশা করেছে, তার একটা তালিকা করতে চাইল। আর নিজের হাতে মৃত্যু? নাসিম ও রুবি ছাড়া আর কাউকে তার মনে পড়ল না। আর স্বপ্নে কার হত্যাকারী হিসেবে নিজেকে দেখেছিল? সে কি ওই গোঁফঅলা, ফর্সা, নিয়মিত লাল শার্ট ও কালো প্যান্ট-পরা লোকটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ট্রিগারে আঙুল প্রয়োগ করেছিল যে তাকে এক দুপুরে ইস্কাটনের চার তলায় চার্লস টমলিনসনের তাগড়া বেগুনি বইটি হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ‘অপেক্ষা ও নীরবতাই উত্তম’ বলেছিল? দীপন বলেছিল—‘কিসের জন্য অপেক্ষা? নীরবতা হয় স্টুপিড নয় কাওয়ার্ডদের ধর্ম।’ নাসিমের ঠান্ডা স্বর সে শুনেছিল, ‘অ্যান্টাগোনিস্টিক হওয়ার কিছু নাই। নারী আর টাকার বেলায় বন্ধুত্ব চলে না।’ দীপন প্রত্যুত্তর করতে পেরেছিল কি? আরও কিছু শোনার বাকি ছিল তার—‘জেনে রাখো, তুমি যাকে এতদিন, হ্যাঁ, সে আমাকে… আমার কিছু করার নাই।’

রিভলবার একটা তার দরকার বটে; তা পেয়েই যায় কোনোদিন যদি, নিজের হাতে সে দেখতে পেল একটা রিভলবার, সামনে নাসিম ও রুবি অসহায় ঠেস দিয়ে দেয়ালে দাঁড়ানো, কিন্তু সে হত্যা করছে না, কেবল রিভলবার উঁচিয়ে দেখছে তাদের অসহায়তা আর আতঙ্ক, যতক্ষণ দেখছে—উপভোগ করছে, আর ভাবছে একটু আগে তারা সঙ্গম সেরে এল কি-না, একটু আগে আনন্দিত ছিল, আর হঠাৎ অস্ত্রসমেত তাকে দেখে বাকরুদ্ধ, এমনকি পলায়নের জায়গাও খুঁজে পাচ্ছে না, তাদের বিস্ফারিত চোখ ভয়ে অশ্রুশূন্য, দীপন দেখল যে সে হোঃ হোঃ হোঃ হাঃ হাঃ আঃ আঃ প্রতিধ্বনির পর প্রতিধ্বনি তুলে হাসছে, আর ওরা কাঁপছে—কাঁপুক, দেখল যে সে হত্যা করছে না কাউকে, কেননা তাদের বাঁচিয়ে রাখা দরকার, জীবনভর তাদের আতঙ্ককে উপভোগ করার জন্য আর তাদের আতঙ্কিত করার জন্য দরকার একটা রিভলবার! এতক্ষণ বিছানায় বসেছিল সে এবং বুঝতে পারল যে বিছানায় সে ব’সে আছে এবং ওই দৃশ্যের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিছানা থেকে এক লাফে নেমে জানালার পর্দা তুলে বাইরে তাকিয়ে দেখল—ডাস্টবিন, কাক, দেয়াল, রাস্তা ও মানুষ ক্রমে নিস্তেজ হয়ে আসছে। ছোপ-ছোপ ম্রিয়মাণ হলুদ আলো মুখে ও মাথায় নিয়ে মানুষেরা হাঁটছে; তারা ক্লান্ত, বিষণ্ন। নির্বিকারও বটে।

॥ ৪ ॥
রাস্তা পার হয়ে সংসদ ভবনের পুবদিকের ফুটপাতে দীপন হাঁটছিল। স্পিডব্রেকারশূন্য, এমনকি বাঁকহীন এই ব্যস্ত রাস্তা পার হতে বেশ অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে, অনেকটা দৌড়ে ফুটপাতে পা-রাখা থেকে শুরু করে তখন পর্যন্ত হাঁপাচ্ছিল সে, হৃৎস্পন্দনের আধিক্যের ভেতর তার মনে হলো : সত্যি-সত্যি ম’রে যেতে পারত আজ, অথবা তার আগে যে-কোনও সময়। ঘুমের ট্যাবলেট কিছু কম উদরস্থ করে নি সে, তবু কেন এই স্টুপিড-বেঁচে-যাওয়া, কেন সে আজ দৌড়ে রাস্তা পার হলো! কেন এই সতর্কতা, সে কি বাঁচার ইচ্ছা পোষণ করে, স্রেফ বেঁচে থাকাটাই তার জীবনের নিরীহনির্জন উদ্দেশ্য ব’লে? নইলে, আত্মনাশ-চেষ্টার আগে সে যে দরজা বন্ধ করেছিল, তার ছিটকিনি যেভাবে সোজা ক’রে রেখেছিল—তাতে প্রমাণিত হয় না যে, মৃত্যুকে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে একটা খেলায় সে মেতেছে, অথবা, এসব চেষ্টার ভেতর খুঁজে নিচ্ছি বেঁচে থাকার তুচ্ছ-গোপন কৌশল! মৃত্যুর উপায়-উপকরণে ভরা এই সুন্দর পৃথিবী; ব্লেড, ছাদ, দড়ি, ধাবমান ট্রাক, কীটনাশক ইত্যাদি… মানুষ কিভাবে ম’রে যায়, যেতে পারে, দীপন তা জানে, যদিও সে মানুষের মৃতদেহ দেখেছে শুধু, মৃত্যু দেখে নি; যদিও মানুষের মৃত্যু ঘুমের মধ্যেই ঘটে, এমন ধারণা তার ভেঙে গিয়েছিল বালক বয়সেই : কিচ্ছু না, সে শুধু সহপাঠী শিবুলালের বোনের দেহ ভোরবেলার আমগাছ থেকে ঝুলতে দেখেছিল। এর আগের দিন বিজ্ঞানের ক্লাসে নিউটন ও মধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্পর্কে সবুজ পাঞ্জাবি-পরা শিক্ষক বজলেউদ্দিনের প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে দশ ঘা বেত-সওয়া দীপন বুঝতে পারল যে, আপেল যে-কারণে মাটিতে প’ড়ে যায়, গলায় রজ্জুবদ্ধ মানুষ সে-কারণেই নিম্নমুখী শরীর নিয়ে ঝুলে থাকে; কৌতূহলের চূড়ান্তে গিয়ে জেনেছিল—মাটিকে, মানে পৃথিবীকে ওই শরীর এত আকর্ষণ করতে চায় যে তাতে অ্যাংকলবোনই ভেঙে যায়। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার আফশোস হলো এই ভেবে যে, ওই বাড়ির কান্না-কোলাহল-শবদাহ এসব ঘনঘটার ভেতর সে জানতে পারে নি যে, শিবুলালের বোনের অ্যাংকলবেন ভেঙে গিয়েছিল কি-না। তার মনে পড়ল, এই কৌতূহল শিবুলালের কাছে প্রকাশ করলে সে ক্ষেপে উঠেছিল এবং ফুলো গাল ও উপচানো চোখ নামিয়ে শান্ত স্বরে সে বলেছিল—দিদি ম’রে যায় নি, আত্মহত্যায় কেউ ম’রে যায় না।

হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে উঠল, বাতাস বইতে লাগল জোরে, উদ্যানের ঘাস থেকে মুড়ি-চানাচুরের শূন্য ও ঈষৎ তৈলাক্ত ঠোঙা ও অন্যান্য কাগজের টুকরা, পাতা ও পলিথিন উড়তে শুরু করল একসঙ্গে, সান্ধ্য ভ্রমণ হঠাৎ দৌড়ে রূপ নিল, বুড়া থেকে শুরু ক’রে পথবেশ্যা পর্যন্ত দৌড়ে গিয়ে সংসদ ভবনের অ্যাপ্রোচ টানেলে দাঁড়াল। ততক্ষণে হাওয়া ক’মে গেছে; কেবল ইমারত-পথ-গাছ আড়াল-করা বৃষ্টি। বৃষ্টির ভেতর প্রায়ই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে সে, যৌনতা অনুভব করে। মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজতে কেন পছন্দ করে, সে সম্পর্কে শান্তার উত্তর মনে পড়ল এবং যথার্থ ব’লে মনে হলো : বৃষ্টিতে ভিজলে কাপড় খুব সেঁটে থাকে ত্বকের সঙ্গে, তাতে অদ্ভুত এক শিহরন পাওয়া যায়। শান্তার কথা মনে পড়তেই দীপন অন্য এক বৃষ্টির দুপুরে, সাভার চ’লে গেল, দেখল—স্মৃতিসৌধের পাশে আদিগন্ত মাঠের সবুজ দ্বিখণ্ডিত ক’রে প্রবাহিত সরু, দুর্বল ও শান্ত নদীটির পাশে ছাতার নিচে শান্তার সঙ্গে দাঁড়িয়েছে সে, তার জলপাই-সবুজ জামা ভিজে সেঁটে আছে ত্বকে, দেহ-অতিক্রমউদ্যত সেই গম্ভীর বক্ষপট ছাতা-ধরা সেদিনের বাহুকে স্পর্শ করছে, এই প্রকাশ্য স্পর্শের গোপন পুলককে আরও গোপন করতে গিয়ে কালো, দূরদৃষ্ট একটি নৌকার দিকে আঙুল তুলে বলছে: ওই যে! দেখতে পাচ্ছ?’ ‘ওই যে দেখতে পাচ্ছ’… ঠোঁট নড়ে উঠল দীপনের—তাতে শব্দ হলো না, উঠল না তর্জনীও; এই বৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে, এমনকি, তার মনে পড়ল মাহতাবকে, আত্মহত্যাচেষ্টার দিন-কয়েক আগে যে তাকে টানবাজার নিয়ে গিয়েছিল; সেদিন সন্ধ্যায় দু’জন বেশ মদ্যপান করেছিল, তার মনে পড়ল যেতে যেতে স্কুটারের তীব্র যন্ত্রগর্জনের ভেতর মাহতাব শুধু ‘আই কাম ফ্রম অ্যা প্ল্যানেট’ গানটি গেয়েছিল। ঝাপসা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিনেমা হলের পেছনে যৌথ মূত্রত্যাগ-শেষে তারা ঢুকে পড়েছিল তেতলার একটি ঘরে, মাহতাব তার রুচি নিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। বৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে সে অনুভব করল যে তার চোখে ফর্সা উরু ও স্তন মেলে দিয়ে মেয়েটি বিছানায় শুয়েছে, ঢাকা থেকে আগত দীপনকে বলছে : তুমি প্যান্ট না-খুইলে করবা? তার মনে পড়ল যে সে প্যান্ট না-খুলেই মিলিত হয়েছিল। এর আগে, সদ্য কেনা কনডমের প্যাকেট খুলে বলেছিল: অসুখ-টসুখ থাকলে বলো। মেয়েটি শরীর আছড়ে হেসেছিল, ‘তোমার আছে না-কি?’ তার রাগ হয়েছিল; কিন্তু বেশ্যার সঙ্গে আর যা-ই হোক, রাগ দেখানো চলে না ভেবে সেও সুবোধ হেসেছিল। ‘ঠিক আছে, আজ থাক’—বলে কনডমের স্ট্রিপ পকেটে রেখেছিল দীপন। কনডম ছাড়া, কোনও বেশ্যার সঙ্গে ওই-ই তার প্রথম সঙ্গম।


মৃত্যুর জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে; এই কাজে তোমার যতটুকু সময় ও জায়গা দরকার, জীবন নিশ্চয়ই তা থেকে তোমাকে বঞ্চিত করবে না।


‘আই কাম ফ্রম অ্যা প্লানেট’—গানটি মনে পড়ল। ওইখানে যাওয়ার আগের রাতে জঁ জেনের ‘দ্য বেলকনি’ সে পড়েছিল। রিকশায় ফিরতে ফিরতে মাহতাবকে বলেছিল, ‘বেশ্যালয় যদি সমাজের দর্পণ হয় তাহলে সমাজ হচ্ছে একটা বেশ্যালয়।’ মাহতাব বলেছিল, ‘হ্যাঁ, এই যে রিকশাঅলাও বেশ্যাা।’ ঘাড় ফিরিয়ে সে অন্যমনস্ক তাকিয়েছিল চলিষ্ণু ও স্থির মানুষের ভিড়, ফুটপাত আর দোকানের দিকে, ‘কারণ, তার শরীরও আমরা ব্যবহার করছি। তুই, আমি, আমরা সবাই বেশ্যা, আমরা কোথাও-না-কোথাও ব্যবহৃত হচ্ছি।’ ‘ব্যবহৃত—ব্যবহৃত-ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংস’… ওই মেয়েটিকে, অঙ্গসংযোগের পুনঃপৌনিকতায় যার স্তন কেঁপে উঠেছিল, তাকে দেখেও দীপনের এইরকম মনে হয়েছিল, ব্যবহৃত-ব্যবহৃত-ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংস… একথা মনে পড়লে কি সে-মুহূর্তে মৈথুনক্রিয়া স্থগিত হয়ে যাওয়ার কথা নয়? কিন্তু সে চালিয়ে যেতে পেরেছিল।

বৃষ্টি থেমে গেলে, ক্রিসেন্ট লেকের দক্ষিণঘেঁষা রাস্তার পাশে দাঁড়াল দীপন। ঠান্ডা আর ভেজা বাতাস তার গায়ে এসে লাগছিল। গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল। তাতে পত্রপ্রান্তে জমে-থাকা জলবিন্দুগুলি একে-একে, হয়তো একসঙ্গে ঝ’রে পড়ছিল; ভেজা আর ভারী থাকায় বাতাসে চুল নড়ছিল না দীপনের; কিন্তু সোডিয়াম বাতির আলোয় মাথা ভৌতিক রকমের চকচক ক’রে থাকবে। এও মনে হতে পারে—গোসল ক’রে এইমাত্র সুবোধ বালকের মতো, তেল মেখে, কোটি কোটি অংশে বিভক্ত সূর্যের কোটি কোটি কণার একটির সামান্য নিচে রোদ পোহাবার জন্য দাঁড়িয়েছে সে।

হঠাৎ গতিষ্মান একটা পুলিশবাহী ট্রাকের তীব্র আলোয় দীপন লক্ষ করল রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা দু’তিন (জন অথবা টা?) পথবেশ্যা পাঁচিল টপকে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। ভাবল, এই পলায়িত(শরীর?) দেও সে চেনে; মনে হলো—মানুষেরা পরাজিত, আত্মরক্ষার জন্য তারা পলায়নপরও বটে!

॥ ৫ ॥
আজ কত তারিখ? একুশ। না, বাইশ। না না না, একুশই হবে। হ্যাঁ, একুশ। উঁহু, বাইশই তো হওয়ার কথা।

[স্টুপিডও এটা জানে যে, সময় একটা বহমানতা। নদীর তবু উৎস আছে। বা, সে সম্পর্কে কিছু বলা যায়। এমন-কি, তার পরিণতি ও গন্তব্য সম্পর্কেও : সময়ের শুরু তো একটা আছে, তবে আমরা তা আজও ঠিকমতো জানি না, যদিও বৃহৎ বিস্ফোরণের কথা এরই মধ্যে আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের প্রশ্ন তবু শেষ হবে না।]

একটা সিগারেট ধরিয়ে, চিত হয়ে শুয়ে-থাকা দীপনের মাথা ক্লান্তিতে হেলে পড়তেই বাঁধানো বিশাল হিস্ট্রি অব আমেরিকান ড্রামা বইটির দিকে চোখ পড়লো, যার ভেতর নীলক্ষেত ফুটপাত থেকে কেনা নরনারীর যৌনদৃশ্যসম্বলিত দু’ফর্মার পুস্তিকা রেখেছিল সে। শেলফ গোছাতে গিয়ে সেটা বেরিয়ে পড়ছে দেখে, তার মা তেমন কিছু বলেছিল না, ‘এই ঘরে কেউ থাকতে পারবে না’ বাক্যটি ছাড়া; বইটির দিকে তাকাতেই দীপনের মনে পড়ল। আর মনে হলো—এই ঘরে, সেই দিন থেকে সে বহিরাগত ছাড়া কিছু নয়। মেঝেয় সিগারেট ছুড়ে শিশ্নে হাত রাখল সে : ব্যথা হচ্ছে। লুঙ্গি তুলে দেখবে, এমন মুহূর্তে বাতাসে জানালায় ক্যাঁচ শব্দ শুনতে পেল এবং মনে হলো, কেউ যেন তার এই শঙ্কিত ও বিস্রস্ত-গোপনীয় কাণ্ড ও ব্যথার উৎস দেখে ফেলেছে। লাফ দিয়ে, বিছানা থেকে জানালার দিকে যেতে পারত সে; কিন্তু লুঙ্গি ধ’রে প্রায়-দৌড়ে টয়লেটের দরজা খুলল। বাড়িতে তখন নিদ্রার জড়তা।

আচ্ছা, আজ কী বার? শনি। হ্যাঁ, না, হ্যাঁ, শনিই ত। রোববার না? না, রোববার। উঁ-হু। শনিবার। না।…

[যেভাবে সময়কে আমরা নির্দিষ্ট মাপে ভাগ ক’রে দিই সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন-মাস ধ’রে, তাতে বাঁধুনিটা শক্ত মনে হয়; কিন্তু সেই বন্ধন থেকে মানুষ কি ছিটকে পড়ে না? পড়ে গেলে, নদীর প্রতিভায় একটা সচল নৌকা উল্টে গেলে, অথবা, অন্ধকারে কোনও ডুবোচর তাকে আটকে ফেললে নদী চলে যেতে থাকে যেতে থাকে আর যেতে থাকে… তাকে কি আর তখন প্রশ্ন করা চলে না : তুমি কোথা হইতে কোনদিকে বহিতেছ? বলা কি যায় না তাকে—আমাকে লইয়া যাও!]

কমোডে বসেছিল দীপন। খুব মূত্রবেগ তার… তবে কেন যে ঝ’রে পড়তে চায় না শেষ বিন্দুগুলি…

হেই, ইজ ইট ইওর পেনিস?

নট সো, নাউ, ইট ইজ অ্যা হিল অব অ্যাকিলিস…

নিরীহ-ব্যথাবিপন্ন শিশ্নপ্রান্তে এবং স্তব্ধনির্জন টয়লেটের মেঝেয় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, জলসংযোগ না-ক’রেই, কমোড থেকে দ্রুত পায়ে বিমর্ষ ও আতঙ্কিত দীপন আয়নার সামনে দাঁড়াল। এই চতুষ্কোণ প্রতিবিম্বদাতার মধ্যে নিজেকে দেখতে না-পেয়ে বিস্মিত হলো না সে; বরং সন্দেহ অনুভব করল—সকালবেলার জলাশয় (যেখানে সে দেখেছিল বিম্বিত ঢেউভাঙা মুখের ভেতর পোকাদের কিলবিল বিচরণ) এবং দর্পণের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে। তাকিয়ে থাকার এক পর্যায়ে দেখল তার মুখ ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং এত যে, তাতে হাড়, দাঁত, শূন্য অক্ষিকোটর, সম্মুখ-উপড়ানো মাংসরহিত নাক—সব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে; এই ধ্বস্ত কাঠামোজুড়ে পোকাদের পর্যটনও শুরু হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক নিষ্ঠায় সে লক্ষ করল, ঠোঁট ও বাগযন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া, হাড়ের কোনও আলোড়ন ছাড়া আয়নায় চৌচির ওই মুখ তাকে বলছে—এই হচ্ছো তুমি, তোমার আর কোনও অবস্থান নেই; কোনও অনুতাপ কিংবা শোক এর জন্য যথেষ্ট নয়, তোমার জন্য জীবন একটা বিষয়ই বরাদ্দ করেছে শেষ পর্যন্ত : মৃত্যুর জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে; এই কাজে তোমার যতটুকু সময় ও জায়গা দরকার, জীবন নিশ্চয়ই তা থেকে তোমাকে বঞ্চিত করবে না।…

বাইরেও রাত তখন। আর, স্তব্ধতা।

চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalpoetry@gmail.com
চঞ্চল আশরাফ