হোম গদ্য গল্প অনুরণন : দুই

অনুরণন : দুই

অনুরণন : দুই
306
0

১.
মা আমাদের ছেড়ে চলে গেল! নৈঃশব্দ্যের ভেতর থেকে অন্তত একটা শব্দ শোনার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি। অতঃপর জল এল চোখ থেকে টুপ টুপ শব্দ নিয়ে।

জীবনের প্রয়োজনে বাবা বরিশাল যাবে চাচার কাছে—লঞ্চ বিয়োগচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল—ভেঁপুর হৃদয়ভেদী শব্দের মুহূর্তেই মায়ের প্রথম মৃত্যু হয়। বুঝতে পারি নি মা-আমার এ শূন্যতায় সমাধি গড়ে ফেলবে। অদ্ভুত এ জীবন! সুস্থ দেহে দেখি ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের গল্প! অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, চলে অনুপযুক্ত জীবনাচার। মায়ের মর্মান্তিক পরিণতি দেখে বাবার প্রতি খুব রাগ হয়। টাকা-পয়সাই কি জীবনের সব? ফুল না থাকলে সৌরভের রেশ থাকে কতদিন? বাবাকে চলে আসতে বলা হলেও তিনি আসেন নি। একটা মানুষ না থেকেও ঘাতক হয়ে ওঠে এ ছিল আমার ভাবনাতীত।

বাবা চলে যাবার পর মায়ের মুখ থেকে কয়টা শব্দ শুনেছি মনে করতে পারি না আজও। নির্বাক, জীবন্মৃত এক দেহ বয়ে বেরিয়েছিল মা। একি অভিমান নিয়ে চলে যাওয়া? মায়ের শেষ রাতের বলা কথা আমাকে আজও আকুল করে তুলে, অনুরণিত হয় অন্তরিন্দ্রিয়, প্রচণ্ডভাবে, আমার পৃথিবীই নড়ে ওঠে এখন, ‘বাবাকে ভালোবাসিস, বাবা।’ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা নেই। বিকট শব্দের চিৎকার খেলা করেছে ভেতরে, বাহিরে চোখের কোণ বেয়ে টুপ টুপ মৃদু নিনাদ। বাকশক্তিহীন ছিলাম—স্বরে স্বরে শব্দের আয়োজন হয় নি বহুদিন। সংবাদ পেয়ে বাবা ফিরে এসেছিল লঞ্চে করে। আবারও সেই ভেঁপুর শব্দ—মন আলোড়িত হয় নি তখন। প্রথম বারের মতো প্রিয়জনের কাছে আসার শব্দে আমি স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। নদীর দুরন্ত ঢেউও শরীর-মনে কোনো প্রবাহ জাগাতে পারে নি।


শব্দের মৃত্যু হলো। কী অদ্ভুত! মৃত্যুর কিছুটা সময় পরেই নৈঃশব্দ্যের গাঢ় রূপ বাবার শরীরে ফুটে উঠল।


নৈঃশব্দ্য আর শব্দ, স্মৃতি আর বিস্মৃতি নিয়ে চলে আমার আর বাবার সংসার। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করবে না। মায়ের স্মৃতি নিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকে নিরালায়। জীবনভার নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে। বাগানে যেয়ে ফুলে ফুলে খুঁজে মায়ের ঘ্রাণ। আমি বাবার হেঁটে চলার শব্দ শুনি—ভেতরের ক্ষরণ কি আর বুঝতে পারি? উপলব্ধি করি, বেঁচে থাকার কোনো আয়োজন নেই বাবার মাঝে। মৃত্যুময় এক শরীর বয়ে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন। এ জীবন দেখে আমি কান্না জমাই। বাবা আর মাকে নিয়ে, মৃতদের সাথে চলে আমার অভিমানের সংসার। মাঝে মাঝে মনে হয়, এ আমাদের বাড়ি? আমি আর শূন্যতা! আর কেউ কি বাস করে?

আমাকে বিয়ে করতে হবে। বাড়ি জেগে উঠবে। নতুন প্রাণ-সঞ্চারের আয়োজন হবে। নতুন প্রাণের আকাঙ্ক্ষিত কান্নার বিকট শব্দে ভেসে যাবে আমাদের দুঃখ। হাসি ফুটে উঠবে চোখে। আগামীর প্রাপ্তির আনন্দ আমাকে বিহ্বল করে। বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকি। বাবার প্রত্যাশায় নিচে ডুবে যাই। ছেলেবেলার ভালোলাগা মেয়ে ছবির কথা মনে পড়ে। ছবির পায়ের নূপুর, রিনি ঝিনি শব্দময় ঝঙ্কার আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অবশ করে রেখেছে আজও। সেই ছবি, গোপন ভালোবাসার ছবি। আজ মেয়েটা স্মৃতিতে, হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্পে। ছবির কথা মনে হলে বন্ধু শ্যামলের কথাও মনে পড়ে। ছবির ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে ট্রেনের নিচে শ্যামলের ব্যথার জীবন, মৃত্যুময় আর্তনাদের চিৎকার কানে আসে।

ধূসর হয়ে যাওয়া সেই ছবি এসেছিল একদিন। শ্যামলের সপ্তম মৃত্যু বার্ষিকীতে। ছবি! ওর মুখের দিকে কতটা দরদ দিয়ে তাকিয়েছি? তারচেয়ে বেশি দরদ, ভালোবাসার দৃষ্টি ছিল ওর দু’পায়েতে। নির্মল দুটো পা কিভাবে এগিয়ে এসেছিল আমার পৃথিবীকে তছনছ করে দিতে। নূপুর ছিল—রিনি ঝিনি শব্দ যতটা পরিচিত, নূপুর ততটা পরিচিত নয়। ছবি কাছে এসে আচমকা হাত ধরে। নূপুরের ধ্বনি থেমে যায়—হৃদয়ের স্পন্দনও যেন থেমে যায় কিছুটা সময়। আমি চেয়ে দেখি নূপুর আর ছবিকে, বিষণ্ন দুই মুখ। নীরবতাও দগ্ধ করে। কী এক মৃত্যুময় আবহ জেগে ওঠে! পরিবেশ স্বাভাবিক করতে, জীবনকে ফিরে পেতে শ্যামলের সেই সময়ের জলে নামার মতো আমাকেও জলে নামতে হলো। বন্ধুর জীবন নিয়ে অভিনয় করে গেলাম, নিপুণ পদক্ষেপে। নীলকণ্ঠ আর পদ্ম ফুল পেয়ে ছবি মুগ্ধ হয়ে যায়। আমারও প্রাপ্তি ছিল—জলের ঘ্রাণ নিয়েছি, ফুলের সৌরভ দিয়েছি ছবিকে। তাতেই ওর দু’চোখে স্বস্তির স্ফূর্তি—যে দু’চোখের গভীরে হারিয়ে গেলেও নিজেকে ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষা আমৃত্যু দমিয়ে রাখা যায়।

দূর হতে ট্রেনের ঝিকঝিক ঝিকঝিক শব্দ আমাদের বায়বীয় মনকে আচ্ছন্ন করে দেয়। শ্যামল আমাদের দুচোখের স্মৃতিতে আচ্ছাদিত হয়—কান্না এসে জমা হয় স্বজন বিয়োগের ব্যথায়।

পুরোনো সব বিকেলকে অপ্রয়োজনীয় আর নিরানন্দ মনে করে আজকের পুরোটা বিকেলজুড়ে দুজনে ছিলাম পাশাপাশি। তখন, মেয়েটার দেহের সাষ্টাঙ্গে মুগ্ধ দৃষ্টি রেখে শ্যামলের বুকের হাহাকার প্রকাশ করলাম নির্ভয়ে অথচ আমার বুকের গোপনে ছবি-প্রেম অস্ফুট চিৎকার হয়ে জমা রইল। এ পরাজয়ে বাবার চাওয়াকে সফল করতে পারি নি। ক্ষমা করো মা, বাবার ভাবনাকে ভালোবাসায় রূপ দিতে পারি নি।

বাবা ফিরে এসে আর কামারের কাজ করে নি। তবু মাঝে মাঝে স্বস্তি পেতাম—বাবাই যেন এক জীবন্ত কামারশালা। বাবার চেহারায় হাপরের তেজ অনুভব করতাম আর হাতুড়ির আঘাতের শব্দময় জগৎ আমার ভেতরে জেগে উঠত। সেই বাবাও একদিন চলে গেল; অবেলায়। শব্দের মৃত্যু হলো। কী অদ্ভুত! মৃত্যুর কিছুটা সময় পরেই নৈঃশব্দ্যের গাঢ় রূপ বাবার শরীরে ফুটে উঠল। বাবাকে চিরতরে রেখে এলাম মাটির গহ্বরে।

বাবা চলে যাবার পর ধীরে ধীরে বাবাময় যাবতীয় শব্দের বিচিত্র প্রকাশ আমার জীবন থেকেই যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। অথচ একটা বিকট—নির্মম—বুক বিদীর্ণ করা—মর্মান্তিক শব্দ বাবাকে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে তুলে। এ স্মরণ অনাকাঙ্ক্ষিত, মর্মন্তুদ। মৃত্যু নিয়ে খেলার গল্পে ‘জীবন’ ফিরে এসেছে—বাবা ফিরে এসেছে।

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটা অডিও! বিচারবহির্ভূত হত্যা! একটা বিকট আওয়াজ—মৃত্যুর নির্মম সুর…

প্রতীক্ষারত মেয়ে বাবাকে ফোন দিয়ে বলছে, ‘আব্বু, তুমি কোথায়? কতক্ষণ লাগবে আসতে?’

বাবা : ‘বেশিক্ষণ লাগবে না, মা। ইনশাআল্লাহ আমি চলে আসব।’

কিছুক্ষণ পর মেয়ে আবার ফোন দিয়ে বলছে, ‘হ্যালো আব্বু।’

‘মা, আমি মেজর সাহেবের সাথে হ্নীলা যাচ্ছি।’

‘আব্বু, তুমি কি কান্না করছ?’

এরপর কিছুটা সময় চলে যায়। আব্বু আব্বু বলে মেয়ে কেঁদে চলে অবিরত। এমন সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে অনুচ্চ স্বরে অশ্রাব্য গালি শোনা যায়। ট্রিগার টানার শব্দ! গুলি! গুলির পর গুলি! বউ-মেয়ে একসাথে চিৎকারে বলে, ‘ইয়া আল্লাহ!। আমার জামাই কিছু করে নাই।’ ‘আমার আব্বু কিছু করে নাই যে…’

বাবার নির্মম মৃত্যুর এরকম শব্দ আগে কি কোনো সন্তান শুনেছে? ঘুমের মধ্যেও বাবা হাজির হয় নিথর দেহে। বুলেটে বিদীর্ণ হয় বুকের জমিন। বুলেটের স্তূপ বাবাকে ঢেকে ফেলছে। আতঙ্কিত হই—ঘুম ভেঙে যায়। বাবা নেই। তবুও ঘুরেফিরে আসে সারাবেলা। আপন করে পেতে মন উতলা হয়ে ওঠে। বাবার ঘ্রাণ খুঁজি সর্বত্র! শরীরের সুবাস কাপড়ের ঔজ্জ্বল্যে—পাটে পাটে ভাঁজে ভাঁজে। লুঙ্গিটা বুকে জড়াই—আজও বুক ধুকধুক করে। চটিগুলো বাইরে—পা নেই, শুধু শরীরের ভার! চশমা চেয়ে আছে চোখের দিকে! কোথায় লুকাব? সব কালো লাল হয়ে আছে রক্তের দেশে। একটা তীব্র কান্না চোখের কোণে এসে বিভ্রান্ত হয়—ফেলব কি এই রাষ্ট্রের শরীরে? লাভ কী? গভীরেই রেখে দেই বাবার স্মৃতিতে। বাবা, তোমার কলমটা আমার প্রয়োজন। আমি লিখব, প্রিয় জন্মভূমি আর তোমার কাহিনি… তুমি তো আর আসবে না। মায়ের কথা কি রাখতে পেরেছি? ‘বাবাকে ভালোবাসিস, বাবা’। জায়নামাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে যাই বাবার মতো—নামাজে রত বাবার মনোমুগ্ধকর সেই ভঙ্গি আমার খুব প্রিয়।


আমার মেয়েও কি একদিন পিতা হন্তারকের প্রলয়-শব্দ শুনবে? কেঁপে উঠি। টলোমলো হয়ে যায় চোখের ভুবন।


২.
বিয়ে করতে হলো। সংসার এক মায়াময় পৃথিবী। একাকিত্ব স্থির নদীর মতো—নারীর স্নানে প্রবাহ জাগে। মাঝে মাঝে ভাবি, নদী আর নারী কে স্নান করে কার শরীরে? ছবি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের অবয়ব কল্পনাতেও আসে নি, কিন্তু কী অদ্ভুত, কল্পনাতীতভাবে শরীরে এসে ঐশীও ছবিময় হয়ে গেল। একজোড়া নূপুর কিনে দিয়েছি, শব্দ নিয়ে ছুটোছুটি করুক আমার ভেতরে। অথচ আমরা নৈঃশব্দ্যের ভেতরে করেছি ভালোবাসার চুক্তি, গড়েছি প্রেমের রঙমহল। তবুও গহিনে শব্দ থেকে যায়। ভালোবাসায় জন্ম নেয় নতুন এক শব্দের জগৎ।

মেয়ের কান্নার শব্দ আমার কানে এসে পৌঁছাল। কী মধুর কান্না! কান্নার এরকম মধুর শব্দ পূর্বে কোনোদিনই আমার কান শুনে নি। হৃদয়ের শীতলানুভূতি শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে হিম হিম ভালোলাগায় সতেজ হয়ে গেল। আজান দিলাম মেয়ের কানের কাছে। আজানের মধুর ধ্বনি শুনে মুগ্ধ হয়ে যাক আমার রাজ কন্যা। বাবার শ্রুতিময় কণ্ঠস্বরে শীতল হোক সর্বাঙ্গ। কানে কানে প্রতিধ্বনিত হোক নির্মল শব্দ, আজীবন।

টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছি প্রকৃতির কাছাকাছি। প্রকৃতির বিমুগ্ধকর রূপে আকাশের উজার করা উল্লাসের প্রস্তুতি। এমন মায়াময় আর স্বপ্নময় পরিবেশে আমি শব্দ শিকারে মেতে উঠি। শব্দ-অন্বেষণের এক নিপুণ মাতন খেলা করে আমার সারাদেহে।

আমার স্বস্তিময় জীবনে শব্দের প্রভাব এতটাই যে, বাবার হাতুড়ি পেটার প্রলঙ্কর শব্দ-স্মৃতিও আমাকে নাড়া দেয়। মায়ের শেষ বলা কথা ‘বাবাকে ভালোবাসিস, বাবা’ আমাকে অস্থির করে তোলে। ভালো কি বাসতে পেরেছিলাম বাবাকে? আজ আমিও বাবা। মেয়ের বাবা ডাক শোনার প্রতীক্ষায় ছিলাম বহুদিন। প্রাণ উজাড় করা সেই শব্দ কানে এসেছে। এরকম প্রেমময় শব্দ আমার কান আগে কোনোদিন শোনে নি নিঃসন্দেহে—আর কোনোদিন শুনবেও না হয়তো। ইদানীং বাইরে গেলে আমার মা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাবা, তুমি কখন আসবে?’ আমার মেয়েও কি একদিন পিতা হন্তারকের প্রলয়-শব্দ শুনবে? কেঁপে উঠি। টলোমলো হয়ে যায় চোখের ভুবন। মেয়ে আবার বলে, ‘বাবা, তুমি কি কান্না করছ?’ হারিয়ে যায় আমার অস্তিত্ব। সামলে উঠে মেয়েকে জড়িয়ে ধরি। কপালে চুম্বন এঁকে বলি, ‘মা, শীঘ্রই ফিরে আসব ইনশাআল্লাহ।’ মেয়ের হাসির শব্দ শুনে আশ্বস্ত মনে বাহিরে পা রাখি।


অনুরণন : এক

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)