হোম গদ্য কুকুর বিষয়ক দু-একটা কথা

কুকুর বিষয়ক দু-একটা কথা

কুকুর বিষয়ক দু-একটা কথা
297
0

আবারও মিতু শব্দ করে চুমো খায়। ওর চুমোর শব্দ প্রতিধ্বনি তোলে, এত বড় ফ্ল্যাটে তা অনেকক্ষণ রয়ে যায়। কয়েক বছর আগেও ও ছিল যথেষ্ট রকমের সরু, একহারা, দেখলেই মনে হতো, এমন কাউকে সহজেই পিষে মারা যায়। হয়তো চেষ্টাও করেছি বহুবার, কিন্তু অমন হত্যা পরিকল্পনা বা ক্রিয়া ওর দারুণ পছন্দের, তা জানার পর, নিজের জীবন বাজি ধরবার সাহস করি নি আর, কেন না খুনি হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া আমার নিশ্বাস যথেষ্ট ছোট ও জিহ্বা বড় করে তুলত অস্বাভাবিকভাবে, যা বের করে অসহায়ের মতো ওর খোলা বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ও চোখ বন্ধ করে তখন আধোঘুমে এমনভাবে শুয়ে থাকত যে, মনে হতো, ওর এমন প্রাপ্তিই আমাকে এখানে টেনে আনে বারবার। ফলে ওর অমন করে থাকাটাই আমাকে শান্ত করত দ্রুত, যার দরুন পূর্বের ভয় ও শঙ্কা ভুলে যাওয়া সহজ হতো আবার। মূলত, মেদহীন সরু নারীর শরীরে বুক খুবই স্বাস্থ্যবান ও লোভনীয় দেখায়, যা আমার কাছে বরাবর দুর্লভ ও দুর্বলতম বিষয়। এমন কী প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থা কিংবা মৃত্যু শয্যাতেও আমি অমন কিছুর সামনে ভুলে থাকতে পারি সব, আর যদি তা হয় নগ্ন ও সহজেই নাগালযোগ্য, তখন ও আবারও জিতে যায় এবং আমাকে অনায়াসেই ফিরিয়ে আনে খুনির ভূমিকায়। যদিও সেই সব খুন ও খুনের সময় পার হয়েছে অনেক আগেই, তারপরও ও সামনে এলে একটু-আধটু পুরোনো বাতাসের ঝাপটা লেগেই যায়।

ওকে মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিই সেই সব দিন ও সময়, আর ও ভাবখানা এখনও এমন করে, যেন ওর ব্রা’র সাইজ বত্রিশই রয়ে গেছে। ও হয়তো বোঝে, অথচ আমাকে বুঝতে দিতে চায় না, কিংবা নিজের আলস্য ও অবস্থা মেনে নিয়েই ও শান্তি পেতে চায়। কিন্তু আমার অস্বস্তি হয়, কেন-না ওকে বলতে পারি না ওর ক্রমশ ভারী হতে থাকা শরীরের মধ্যে আমার কষ্ট হয়, কষ্ট হতেই থাকে, যার দরুন অতীতের খুনিটা আরও বেশি মারা যায়। তারপরও ও জোর করে আর জোর করে বলেই আমি চুপচাপ থাকি। এতটাই চুপ থাকি যে ওর শরীরের মধ্যে মিইয়ে যাই যেন, অথচ ওর সবটুকু ভার ও শরীর আমাকে সম্পূর্ণ গিলে নেয়। ওভাবেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকে, ধরতেই থাকে, জোরে। দু হাতে মুখ ধরে ঠোঁট দুটো একটু পরপর নিজের মুখে মধ্যে টেনে নেয়। আমি ওর নিশ্বাসের ফোঁস ফোঁস কানে নয়, মাথার মধ্যে টের পাই। ওর জিভ আমার ঠোঁটের উপর ঘুরে বেড়ায়, কখনও-বা একটু ভেতরে ঢোকে, এদিক-ওদিক নড়াচড়া করে বের হয়ে আসে, আবারও ঢুকে পড়ে বা পূর্বের চেয়ে মরিয়া ঢুকতে চায়। এভাবে ও ততক্ষণ আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখে, যতক্ষণ না ওর গা থেকে কুকুরের ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমি একটু একটু নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করি, ওকে বুঝতে দিই না, যেন-বা গরম বেশি পড়েছে কিংবা পানি বেশি খেয়েছি বলেই টয়লেটে যেতে চাই।


মেনে নেওয়াই ওর জন্য প্রেম, ভালোবাসা, যা ও না বললেও বুঝতে পারি কিংবা ও নিজেও আমাকে তা বুঝতে দেয়। 


ও কি বুঝতে পারে, আমি ওর শরীর থেকে কুকুরের গন্ধ পাচ্ছি? হয়তোবা, কিংবা হয়তো অন্যান্য বারের মতোই ভাবতে থাকে পেঁয়াজ কিংবা রসুন পাত থেকে মুখে উঠেছিল, আজও। অথচ বিব্রত বোধ করে না এতটুকু, সামান্য হাসি প্রসারিত করে রাখে ঠোঁটের উপর এবং পরিপূর্ণ মায়া নিয়েই আমাকে যেতে দেয়, সাথে এও বলে, ডাক্তারের কাছে সে নিজেই নিয়ে যাবে এবার। এত অল্প সময়ে এই যে বারবার ওর ফ্ল্যাটে এসে টয়লেটে যাই, ও ধরেই নিয়েছে বিষয়টি অসুস্থতা, নতুবা কেন এভাবে, এতবার? অথচ আমি ওকে বলতে পারি না, আমার খুব টেনশন হয়, ফোর প্লে বা অন্য কিছুতে আমার মন বশে না একদম, আমার দ্রুত ঢুকে পড়তে ইচ্ছে হয়। এমন কি যদি কাপড়-চোপড় খুলতে না হতো, তবে হয়তো ঘরে ঢুকেই ওর মধ্যে ঢুকে পড়তাম। ও এসব বোঝে না বলেই দেরি করে, আর আমার টেনশন বাড়তে বাড়তে বেগ পায়। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে, যে মাত্রই ঢুকব, অমনি মনে হলো কয়েক ফোঁটা একদম ডগায় পড়ে যাবার অপেক্ষায়। আসলে মূল বিষয়টি আমি জানলেও ও জানে না, ও ভাবে কিংবা মনে করে, এ আমার কিছুটা মানসিক সমস্যাও বটে। অবশ্য ওর ভাবনা যে একদম ভুল তা নয়। মানসিক সমস্যাই বটে। এমন অনেক মানসিক সমস্যাই আমার মধ্যে কাজ করে, যা আমি লুকিয়ে রাখি সবার থেকে, বেশি রাখি ওর থেকে। পাছে ধরা পড়ে গেলে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য ওর ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু হয়।

ওই একমাত্র মানুষ যার ঘ্যানর ঘ্যানর আমার ভালো লাগে, কেন না ওকে এড়িয়ে যাবার যত রকম বাহানাই করি না কেন, ও শেষ পর্যন্ত যতদিন পারে তা চালু রাখে। ও হয়তো এমনটা করে শান্তি পায়। আমার উপর ওর অধিকার বোধ হয়তো এভাবেই জাহির করে স্বস্তি পায় কিংবা নিজেকে বোঝায়, এখনও আমার উপর অধিকার করা যায়, খাটানো যায়। পক্ষান্তরে আমি ওকে এড়িয়ে যেতে যেতে বিছানায় টান দিই। ও অভিযোগ করলেও বাধ্যবালিকার মতো মেনে নেয়, মেনে নেয় আমার সব গমন, গতি ও সময়। আমি ক্লান্ত হলেও ছাড়ি না, আর ও বারবার আমার ঘামে ভেজা শরীর মুছে দিতে দিতে খুব মায়া ও আন্তরিকার সাথেই উম্মা প্রকাশ করে, মানুষ কিভাবে এত ঘামে? অপরদিকে আমার এই প্রশ্ন কখনোই আমাকে ছেড়ে যায় না, কিভাবে সে আমাকে এভাবে, এইরূপে এতদিন মেনে নেয়? ও হয়তো খুব ভালো করেই জানে, এই মেনে নেওয়াই ওর জন্য প্রেম, ভালোবাসা, যা ও না বললেও বুঝতে পারি কিংবা ও নিজেও আমাকে তা বুঝতে দেয়। কিন্তু, ও কি বুঝতে পারে যে, ওর ফ্ল্যাটে এলেই আমি ভীষণভাবে কুকুরের গন্ধ পাই?

ব্যাপারটি হয়তো সেদিনই ওর বোঝা উচিত ছিল, যখন সঙ্গমরত দু জনের মানুষের পাশে খুব সন্তর্পণে এসে দাঁড়িয়েছিল কেউ এবং আচমকা খুব মৃদু স্বরে হাঁপাতে থাকা কালো কোনো অস্তিত্বের থেকে বেরিয়ে আসা লালচে জিভ থেকে কয়েক ফোঁটা জল আমার কিংবা ওর শরীরেও পড়েছিল। আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম, প্রচণ্ড ভয়ে, আচমকা, যা কিনা প্রচণ্ড রকমের গা ঘিন ঘিন করা অনুভূতিতে পর্যবসিত হতে শুরু করলে আমি ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। আমি দেখলাম ও নিজেও উঠে বসেছে এবং কোনো প্রকার জড়তা ছাড়াই প্রাণপ্রিয় কুকুরের গলা জড়িয়ে ধরে কী সব আহ্লাদী  শব্দে আদর করে চলেছে, গালে-মুখে চুমো খেয়ে চলেছে অনরবত। ওর যে শরীরে কাপড় নেই সে-দিকে ওর হুঁশ আছে কি না জানি না, এমনকি আমি যে সদ্যই কোনো ক্রিয়া থেকে হঠাৎ চমকে উঠে সরে এসেছি, সেদিকেও কোনো খেয়াল নেই। আমি ওকে কিছুক্ষণ ওভাবে দেখলাম, এর পর হঠাৎই নিজের দু ঊরুর মাঝখানে তাকিয়ে নতুন করে চমকে উঠেছিলাম। আমার মনে হলো, পাশাপাশি, কাছেই অনুরূপ কিছু যেন নড়ছে, অনবরত।

নিশ্বাস আটকে আসছিল এমন বোধে ছুটে বাথরুমে গেলাম। দাঁড়িয়ে থাকলাম দরজা বন্ধ করে, আর অনেক চেষ্টা করেও পারলাম না এক ফোঁটাও তরল বের করতে, কেন-না যতবারই চেষ্টা করছিলাম, ততবারই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম ওর যথেচ্ছ আদর ও আদরের স্বর এবং ওই আড়াল থেকেও দেখতে পাচ্ছিলাম ও কাপড় পরে নি তখনও বরং কুকুরের মুখের সাথে মুখ ঘষে চলেছে বারবার। হয়তো এতক্ষণে ওর সারা মুখে লেগে গেছে কুকুরের লালা। জীবনে সেবারই প্রথম বমি পেয়েছিল এবং করেওছিলাম অনেকক্ষণ ধরে। আর যখন নিজেকে নির্ভার মনে হলো তখন ফ্ল্যাশ করার আগে নিজেরই বমনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। জীবনের প্রথম সব কিছুর প্রতি মানুষের দুর্বলতা থাকে, দেখে রাখা ভালো, যাতে প্রথম স্মৃতি ও বোধ ভুলে না যায়। ফ্ল্যাশ করে বেরিয়ে এলাম এবং ওকে দেখলাম নগ্ন, অন্য ঘর থেকে এ ঘরের দিকে হেঁটে আসতে। মুখে হাসি [তৃপ্তিও হতে পারে] যেন-বা দারুণ মজার কিছু ঘটেছে,  যার দরুন সে ভীষণ আনন্দিত এবং এখন হয়তো বিষয়টির যাবতীয় তারিয়ে তারিয়ে আমাকে শোনাতে চায়।


সঙ্গমরত আমি ওর শরীরের উপর, চুমো খাচ্ছি, খেয়েই চলেছি, ও শব্দ করছে, করেই চলেছে একটানা, যা একসময় অচেনা হতে শুরু করে।


ওকে সুযোগ না দিয়েই প্যান্ট পরতে পরতে বললাম, ভালো লাগছে না, বাসায় ফিরব। ও বলল, কেন, কী হলো? কিছু যে হয় নি এটাই তো ওর জন্য স্বাভাবিক আর আমি নিজেকে বোঝালাম, কুকুর বিষয়টা আসলেই এমন, তা মানুষ হোক কিংবা কুকুর, ভাবলেই মানুষ নতুবা কুকুর। আমি ওর কাছে ঘেঁষতে চাইছিলাম না, কেন না ও কাছে পেলেই আমাকে জড়িয়ে ধরবে, অসমাপ্ত কাজটি আবার শুরু করতে চাইবে নতুবা করতে উদ্বুদ্ধ করবে, এরপর মুখ নামিয়ে আনবে আগের চেয়েও বেপরোয়াভাবে আর আমার মনে হবে, ও নয় ওর কুকুর আমার মুখে মুখ রাখছে আর সমস্ত মুখ চটচটে হয়ে উঠছে লালায়। আমি অনেকটা সেদিন একরকম পালিয়েই এসেছিলাম, একবারও পেছনে না তাকিয়ে। যদিও জানতাম ও তখনও তাকিয়েই আছে বা থাকবে আমার দিকে, পথ ধরে, যতক্ষণ দেখা যায়।

এরপর টানা ছয়মাস ওর ধারে কাছেও যাই নি। এত এত ফোন, অনুনয়, কান্না-কাটির পরও আমি ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, আমার ভালো লাগে না ওর ফ্ল্যাটে যেতে, কেমন যেন অস্বস্তি হয়। বিশেষ করে দরজায় ঢুকতে গেলে প্রতিবারই দারুণ অস্বস্তি মনের মধ্যে চাপ বাড়ায়। তাছাড়া, ওকে বলতে পারি নি, যতবার ওর ফ্ল্যাটে যাবার কথা ভেবেছি, যতবারই মনে হয়েছে, সঙ্গমরত আমি ওর শরীরের উপর, চুমো খাচ্ছি, খেয়েই চলেছি, ও শব্দ করছে, করেই চলেছে একটানা, যা একসময় অচেনা হতে শুরু করে, মনে হয়ে ও নয়, ওর কুকুর শুয়ে ওর জায়গায়। আমি উঠতে পারি না তারপরও, কেমন যেন ঘোর লাগা বোধ ও চরম আক্রোশে আরও ক্ষিপ্ত, নির্মম ও দ্রুত হই। হতেই থাকি, আর একসময় এও মনে হয়, ও ঠিক আমার নিচেই পড়ে আছে তখনও, পড়েই থাকে পূর্বের নিয়মে আর ওর কুকুর সাবলীল ফিরে আসে আমার জায়গায়।

২৩.০৬.২০ইং

(297)

অরণ্য