হোম গদ্য কী খুঁজি কবিতায়

কী খুঁজি কবিতায়

কী খুঁজি কবিতায়
320
0

ক্রোচের একটা কথা দিয়ে শুরু করা যাক, ‘কবিতা হচ্ছে ভাবের প্রকাশ।’ ‘ভাব’ প্রসঙ্গে সেই কথাগুলো বারবার ঘুরেফিরে আসে, যা দ্বারা মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে তাই ভাষা। ‘ভাব’ যখন ‘মনের ভাব’ হয়ে যায় তখন ক্রোচের কথাটা যদি এভাবে বলা হয়, কবিতা হচ্ছে মনের ভাবের প্রকাশ—তাহলেও অর্থটার নড়চড় হয় না। প্রাচীন ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রে উল্লেখ আছে : ‘কাব্য, অঙ্গবিক্ষেপ ও সত্তাদ্বারা কাব্যের সত্তা ভাবিত হয় বলিয়া ইহাকে ‘ভাব’ সংজ্ঞা দেওয়া হইয়াছে।’ আর এই কাব্যসত্তা হলো ‘বচন, তনুবিক্ষেপ, মুখচিত্রণ ও সাত্ত্বিকাভিনয়ের সাহায্যে কবির মনঃস্থিত ভাব।’ [যদিও ব্যাপারটি অভিনয়শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রভাববিস্তারী]। কবিতায় এই মনের ভাবটা শুধুই কি কবির? নাকি পাঠকেরও? তখন ব্যাপারটার সরলীকরণ করলে বলতে হয়, উভয়ের। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার।


কবিতা হলো নেহতাই মানব মনের অসংস্কৃত শিশুসুলভ প্রবৃত্তিগুলির সৃষ্টি।


যদি একজন কবিকে প্রশ্ন করা হয়, যে-কবিতাটা এখন লিখবেন তার কতটুকু তিনি জানেন? কিংবা কবিতাটা লেখার আগে তার মনে পাঠক নিয়ে পরিকল্পনা আছে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে কি-বা বলা যায়! পুরো ব্যাপারটাই সংবেদনশীলতার। ফলে কবিমাত্রই এটা উপলব্ধি করেন, তিনি যা লিখছেন সেটার একটা অস্তিত্ব আছে। কিন্তু এই অস্তিত্ব প্রচলিত প্রেক্ষাপটের না। ফলে তিনি যতই সাধারণ ধারণাকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হতে থাকেন ধীরে ধীরে সেটা আর সাধারণ থাকে না। তখন কবি কেবল কবিতার শুরুটা বলতে পারেন কিন্তু কবিতার মাঝখানে কিংবা শেষের দিকটা তার নিজের কাছেও অচেনা হয়ে ওঠে। এই অচেনা জগৎটাই ‘সীমার মাঝে অসীম’। আর এই অসীম ব্যাপারটা এতটাই অসীম যে, কবিতায় তা বিস্মৃত জগতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অর্থাৎ একটা বিস্মৃত অস্তিত্বের ধারণা তৈরি করে। সেই ধারণাটা নান্দনিক। কিন্তু কোনো যৌক্তিক শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামোতে সেই নান্দনিকতার অবয়ব ধরা যায় না। সেটা কেবলই একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই কবি ও পাঠক উভয়ের ভেতর সেতুবন্ধ তৈরি করে। আর এই সেতুটা অনুভূতির। তখন বলা যায়, কবিতা অনুভূতির ফসল। এই অনুভুতিও কোনো যুক্তি-তর্ক মানে না। ফলে কবিতার অনুভূতি যৌক্তিকতার মাপকাঠিতে ধরা যায় না। যখনই কবিতাকে এই যৌক্তিকতার দাবিতে ফেলা হয় কিংবা পাঠক একটা আবহ খুঁজতে চায় তখনই কবিতার মৃত্যু ঘটে। আর ওই মৃত্যুটা এতটাই ভয়াবহ যে, কবিতার অবয়ব মানে ভাব পুরোটাই হারিয়ে যায়। যা আর পুনরায় পাঠক কিংবা কবি কারো কাছেই আবির্ভূত হয় না।

কবিতায় যৌক্তিকতা খোঁজার প্রসঙ্গটা দুইভাবে আসে। এক এনলাইটেনমেন্টের কালে আরেকটা সর্বকালে। এনলাইটেনমেন্টের প্রতিপাদ্য হিসেবে যখন বিজ্ঞান আর যুক্তি প্রাধান্য পেয়েছে তখন কবিতার ক্ষেত্রেও সেটার প্রভাব খাটাতে দেখা যায়। ফলে ভিকো বলেন, ‘কবিতা হলো নেহতাই মানব মনের অসংস্কৃত শিশুসুলভ প্রবৃত্তিগুলির সৃষ্টি।’ ‘শিশুসুলভ প্রবৃত্তি’ ব্যাপারটার মধ্যে ভিকো আসলে কবিতার যৌক্তিকতার ব্যাপারটার দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর সর্বকালের ব্যাপারটার প্রসঙ্গে বলা যায় কবিতা না-বুঝতে পারার আক্ষেপ। কিংবা সর্বদাই রিয়ালিজম-কে ধরার প্রচেষ্টা। ফলে কথাসাহিত্য আর কবিতাকে একই ভঙ্গি দিয়ে বোঝার একটা প্রবণতা চলে। আবার এই প্রবণতাটা স্যোশাল রিয়ালিজমকে ইঙ্গিত দিয়ে করা হয়। ফলে কবিতার মধ্যে যৌক্তিকতা কিংবা রিয়ালিসটিক আবহ না পেলে সেটা খুব একটা বোধগম্য হয় না। তখন প্রশ্ন আসে, কবিতা কি বোধগম্য হতেই হবে? ‘আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’—এখানে পান্নার রঙ সবুজ হওয়াটা কতটা যৌক্তিক? কবি এখানে তার ‘চেতনার রঙ’ দিয়ে বাস্তবতার, যুক্তির জাল ছিঁড়ে ফেলেছেন। এই যুক্তির জাল ছিঁড়ে ফেলাটাকে ভাব, মনের ভাব, অনুভূতি কিংবা চেতনা যাই বলা হোক না কেন সেখানে একটা বেদনা আছে। এই বেদনাটা কবিতা। এই বেদনার আবার দুই ধরনের রূপ লক্ষ করা যায়। একটা হচ্ছে সহিহ্ রূপ আরেকটা বাজারি রূপ। বেদনার সহিহ্ রূপে আছে স্রষ্টার উপলব্ধি। ফলে কবি তার চেতনার জগতেই বিলীন হয়ে যান। আর বাজারি রূপটায় বেদনা কেবল পণ্য হয়ে ওঠে। সহিহ্ রূপটার কথা চিন্তা করা যাক।


সৃষ্টির পয়লা দিনে ছিল নিঃশব্দ, আখেরি দিনেও থাকবে নিঃশব্দ। মাঝখানে এই কদিন আমরা তৈরি করেছি শোরগোল—শব্দ। 


এমন কি কখনো হয় যে, কবিতার মর্মোদ্ধার না হলেও একটা রেশ ভাবজগতে ক্রিয়া করে? যদি ক্রিয়া করে তাহলে ভাবজগতের এই রেশটাই কবিতা। কিংবা কাব্যরস। কবি কিংবা পাঠক কবিতায় এই রেশ নিয়েই পরস্পরের সাথে একটা বায়বীয় যোগাযোগ তৈরি করে। ফলে কবিতা রচনার কালে কবি পাঠক নিয়ে ভাবুক আর না-ভাবুক কিংবা পাঠক কবির ভাব কবিতায় উন্মোচিত করতে পারুক আর না-পারুক উভয়ই একটা আত্মতৃপ্তির রেশ পায়। এই আত্মতৃপ্তির ব্যাপারটা স্বমেহন করার মতো। তখন প্রশ্ন আসে—কবির কাজও কি মানুষভজন মানে ‘মানুষ ধরা’? কবি যখন পৃথক আরেকটা অস্তিত্ব কিংবা জগতের মধ্যে নিয়ে যান তখন সেটার মধ্যে কী সন্ধান করে মানুষ? ধরা যাক সেই জগতে মানুষ পিরিতি খোঁজে। যে পিরিতির মধ্যে কবি বিলীন হয়ে গেছে সেই পিরিতিতে পাঠকও বিলীন হতে চায়। এই পিরিতির রূপটা একটু সহজিয়া পন্থায় উল্লেখ করা যাক :

                                                 “সখি পিরিতি আখর তিন
                            পিরিতি আরতি যেজন বুঝেছে সেই জানে তার চিন।
                                                 নয়নে নয়নে বাণ বরিষণে
                                                             তাহাতে জন্মিল ‘পি’
                            অধরে অধরে সুধা পরশনে
                                                       তাহাতে জন্মিল ‘রি’
                                                আর হৃদয়ে হৃদয়ে ভাব বিনিময়ে
                                                          তাহাতে জন্মিল ‘তি’।”

কবিতার মধ্যেও কি নয়ন, অধর আর হৃদয় দিয়ে পিরিতি পাওয়া যায়? নাকি অন্যকোনো অবস্থায় তা বিরাজ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপারটা তখন সামনে চলে আসে। কবিতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা থেকে দেখতে চাইলে সেটা আবার যুক্তির দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু কবিতা তো যুক্তির ধার ধারে না। আর সেটাই কবিকে করেছে ‘বাক্সিদ্ধ’ অর্থাৎ ‘যার বাক্য ফলে যায়।’ এটার সূত্র ধরেই বলা যায়—‘সকলেই কবি নহে কেহ কেহ কবি।’ কবির বাক্য ফলে যায় তবে এই বাক্য মানে তো শব্দের জাল। আর ‘শব্দ তো একটা ভাব। সেই ভাবের আড়ালে আছে বস্তু। বস্তুকে জানো, তাহলেই শব্দের খোসা খুলে শাঁস বেরিয়ে যাবে।’ আর এই শাঁসের সন্ধান পাওয়ার জন্য পাঠককে হতে হয় সাধনসিদ্ধ। তা না হলে শব্দের খোসা খোলা কখনোই সম্ভব হয় না। কারণ কবিতায় যতটা শব্দ থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে ‘নিঃশব্দ’। এই ‘নিঃশব্দ’ ধরতে পারাটাই সাধনসিদ্ধ হওয়া। লালন তো গানেই বলেছেন, ‘যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে।’ ফলে ‘দৃষ্টির গভীরে ডুব দেওয়া আর চেতনার অতলে’ গিয়ে কবিতায় এই নিঃশব্দই খোঁজ করা হয়। ‘শেষপর্যন্ত সেই নিঃশব্দই সার। সৃষ্টির পয়লা দিনে ছিল নিঃশব্দ, আখেরি দিনেও থাকবে নিঃশব্দ। মাঝখানে এই কদিন আমরা তৈরি করেছি শোরগোল—শব্দ। শব্দও থাকবে না।’ তাই নিঃশব্দের ভেতর দিয়েই শব্দের সন্ধান করতে হবে কবিতায়।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj

Latest posts by মাসুদ পারভেজ (see all)