হোম গদ্য কালো নৌকা : একটি গল্পের পাঠ

কালো নৌকা : একটি গল্পের পাঠ

কালো নৌকা : একটি গল্পের পাঠ
307
0

জলদাসদের জীবন নিয়ে ইদানীং বেশ লেখালেখি হয়।

এই লেখালেখিকে আরো বেশি দূর টেনে নিয়েছেন হরিশংকর জলদাস। জলজীবন নিয়েই তার লেখালেখি। প্রথমে লিখলেন জলপুত্র। তারপর দহনকাল, কৈবর্ত কথা। এরকম কসবি ও আরো অনেক।

জলজীবন নিয়ে সর্ব প্রথম পড়েছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এ। পদ্মানদীর মাঝিতে অবশ্য নদীভিত্তিক জলজীবনের চিত্র। সমুদ্রগামী জেলেদের কথা প্রথম পড়ি আল মাহমুদের লেখায়।


এক বিকেলে রাসু ঘরে ঢুকে দেখে কালী শুয়ে আছে। গায়ে কোনো কাপড়-চোপড় নাই। রাসুর কাছে মনে হলো কালী নয়, সত্যবতী শুয়ে আছে।


গল্পের নাম ’কালো নৌকা’। এই নামের প্রতিই আমার যত আগ্রহ। সাধারণত সব নৌকা তো কালো-ই হয়। তাহলে আবার নতুন করে গল্পকারের ‘নৌকা’ না লিখে ‘কালো নৌকা’ লেখবার কারণ কী? এই নিয়েই আমার খানিক মাথা ব্যথা ছিল।

পরে সিদ্ধান্তে এলাম, নৌকা যেমন কালো হওয়াটা চিরায়ত, তেমনি আমাদের গল্পকারের গল্পটিও সম্ভবত চিরায়ত জীবনের গল্প। পড়তে পড়তে আবিষ্কার করি, এই গল্প আসলেই সব সমুদ্রগামী জেলেদের গল্প।

গল্পের শুরু ফৌজদার হাটের এক প্যাঁক কাদাময় বিচে পর্যটকদের ঘোরাঘুরির দৃশ্য দিয়ে। লেখক এক লাইনে পর্যটকদের শ্রেণি আলাদা করে দিচ্ছেন। যারা ধনী পর্যটক এবং হাতে পর্যাপ্ত সময় আছে তারা কক্সবাজারেই চলে যান। আর যারা শহরের মানুষ আর হাতে তেমন টাকা-পয়সা নাই, আবার সময়ও নাই তাদের চট্টগ্রাম শহরের আশেপাশের এই বিচগুলো পছন্দের। এর মধ্যে আছে পতেঙ্গা বিচ, হালিশহর বিচ, ফৌজদারহাট বিচ, এরকম।

আমাদের গল্প শহর থেকে খানিক দূরে ফৌজদারহাট বিচ নিয়ে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাছ ধরার কালো কালো নৌকাগুলো ধীরে ধীরে ফিরছে তীরের দিকে। প্রথমে ফিরল আমাদের নায়ক রাসু জলদাসের নৌকা। নৌকার মাছ অন্য দুজনের জিম্মায় দিয়ে লগিটা কাঁধে নিয়ে রাসু হাটা দিল বাড়ির দিকে।

লেখক পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছেন রাসুর হাঁটার। লেখক জানাচ্ছেন, রাসু হাঁটছে যেন হিসাব করে করে। তীর থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাসুর আর কোনো গন্তব্য নাই। লেখক আরো জানাচ্ছেন, রাসুর বয়স পঞ্চাশের উপরে কিন্তু পঞ্চাশ বছর বয়স্ক মানুষের শরীরে যে শক্তি থাকে রাসুর শক্তি সামর্থ্য যেন আর বেশি। কিন্তু দরজার তালা খোলার বর্ণনা দিতে গিয়েই লেখক আসল খেলাটা খেলেন।

লেখক জানাচ্ছেন, দরজা খোলার সময় রাসুর কোমরে খট করে শব্দ হয়। এই খট করা শব্দটি রাসু উপভোগ করে। তার বয়স বাড়ছে ধীরে ধীরে—এটা অনুভব হয়। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দেন, রাসুর এক সময় যৌবন ছিল। এখন যেমন রাসুকে একা একা ঘরের দরজা খুলতে হয় তখন ব্যাপারটা এরকম ছিল না। নৌকা থেকে হেঁটে বাড়ির দিকে আসার সময় রাসুর সাথে সাথে আসত রাসুর স্ত্রী সত্যবতী।

জেলেদের বউগুলো এমনিতে শক্ত-সমর্থ আর দীর্ঘাঙ্গী হয়। রাসুর বউ ছিল আরো বর্ণনাময়। রাসুর পাশে পাশে যখন বউ হেঁটে আসত তখন যুবকেরা তাকিয়ে থাকত বুভুক্ষের মতো। রাসুর সেই সুখের দিনগুলো এক সময় স্রেফ নাই হয়ে গেল। একদিন রাসু প্রতিবারের মতো সমুদ্রে গেল মাছ মারতে। সপ্তাহ-দশদিন পর ফিরে এসে শুনে সে ফেরার আরো চারদিন আগে মারা গেছে সত্যবতী। গ্রামে কলেরা লেগেছিল। এই কলেরার প্রকোপে গ্রাম উজাড় হয়ে গেল। সাথে গেল সত্যবতীও।

তারপর থেকে এই একলা জীবন। ছেলে দামোদর বড় হলে তার জন্য বউ নিয়ে এল রাসু। নিজের শ্বশুরবাড়ির এলাকা সন্দীপেই ছেলের বিয়ে দিল সে। দামোদরের স্ত্রী কালী। অনেকটা দেখতে সত্যবতীর মতোই। সবাই বলতে লাগল, সত্যবতী এই জন্মে কালী হয়ে ফিরেছে।

আরেকটা জীবন শুরু হলো রাসু জলদাসের। ছেলে দামোদর আছে। তার স্ত্রী কালী আছে। দামোদরও এখন সমুদ্রে যায়। বেশির ভাগ জেলে স্ত্রীদের ভাগ্যে যা লেখা থাকে সেই একই কাহিনি ঘটল কালীর জীবনে। দামোদর সমুদ্রের ঝড়ে ডুবে গেল একদিন।

বাড়ির লোকেরা এসে কালীকে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। রাসু একটু ভারহীন হলো। তার মুখেই আমরা শুনি, ‘যাক, ভালোই হলো। মানুষের সাথে আমার আর সম্বন্ধ রইল না’। কিন্তু মানুষ চাইলেই কি মানুষের থেকে পালাতে পারে? লেখক বুঝালেন—পারে না। রাসুও পারল না।

একদিন কালী এসে দাঁড়াল রাসুর বাড়ির সামনে। সবাই বলাবলি করতে লাগল সন্দীপের কোনো এক গয়নায় চেপে চলে এসেছে মেয়েটি। রাসুও আর কালীর বাড়িতে খবর পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করল না। কালী মোটামুটি অপ্রকৃতিস্থ। যখন তখন গায়ের কাপড় খুলে ফেলে। যুবক ছেলেরা আড় চোখে তাকায় কালীর শরীরের দিকে। কালীর এই সবে কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই। খালি সমুদ্রের দিকেই চলে যেতে চায় মেয়েটি। পাশের বাড়ির বউটি কোনো রকম সামলে রাখে কালীকে।

এক বিকেলে রাসু ঘরে ঢুকে দেখে কালী শুয়ে আছে। গায়ে কোনো কাপড়-চোপড় নাই। রাসুর কাছে মনে হলো কালী নয়, সত্যবতী শুয়ে আছে। এই শরীর সত্যবতীর শরীর। রাসু কালীকে ঢেকে দেয়। হাতে তুলে দেয় শাড়িটা। কালী ঘর থেকে বের হয়ে শাড়িটা পেয়ারা গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে হাঁটা ধরে সমুদ্রের দিকে। রাসু ঘরের দরজায় বসে দেখে, কালী হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছে সমুদ্রের কাছাকাছি। এক সময় কালী আবছায়া হয়ে আসে। তীরের কাছে একটা নৌকার পাড়ে দাঁড়ায় কালী।


শুধু গল্প দিয়েও আল মাহমুদ বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের সমান বয়স।


রাসুর মনে হয় এই মেয়ে কালী না। এই মেয়ে সত্যবতী। রাসুর মন হঠাৎ করে ভালো হয়ে যায় সম্ভবত। কারণ রাসু মদ খায়। আমরা পড়েছি রাসুর মন ভালো থাকলে কিংবা বেশি মাছ পড়লে সে মদ খায়। আজকেও রাসু মদ খেলো। মদ খেয়ে কালীকে যখন আনতে গেল তখন রাসু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কালীর উদোম শরীরে রাসু ঘ্রাণ পেল সত্যবতীর। কালীকে আড়কোলা করে নৌকার ভেতরে নিতে নিতে বলল, ‘দামোদর তো আমার রক্ত থেকেই তৈরি কালী। আমারই সন্তান। চেয়ে দেখ, আমিই দামোদর।’

কালী রাসুকে শক্ত করে পেষণ করতে করতে শব্দ করল, ‘দামোদর…’।  আমাদের গল্প এখানে শেষ।

কিন্তু এই জলজীবনের গল্প আদৌ এখানে শেষ নয়। হাজার হাজার বছর ধরে এই গল্প চলছে। এই যে কালীর ভেতরে রাসুর লীন হওয়া, এই গল্পও আজকের নয়। মানুষের আদিম চাহিদার ইতিহাস মানুষের সমান পুরানো।

এরকম বেশকিছু ভিন্ন ভিন্ন মানবজীবনের গল্প শুনিয়েছেন আল মাহমুদ। অনেকের কাছে তিনি বড় কবি। আমার কাছে তার কবিতার চাইতে গল্প বেশি পছন্দের। কবিতা অনেকেই লিখেন। কিন্তু এই যে জীবনের গল্প, কয়জন শক্তিমান তুলে ধরতে পারেন এইসব জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত? আল মাহমুদ অল্প কিছু গল্পে এই দুঃসাধ্য সাধন করতে পেরেছেন।

শুধু গল্প দিয়েও আল মাহমুদ বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের সমান বয়স।

অনন্ত আরফাত

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২; বরইতলি, চকরিয়া, কক্সবাজার। পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই :
প্রণয়িনী অথবা ভুলের লিরিক [কবিতা; বিদ্যানন্দ, ২০১৮]

ই-মেইল : aunontoarfat@gmail.com

Latest posts by অনন্ত আরফাত (see all)