হোম গদ্য কানাডীয় হাস্যরসের লেখক স্টিফেন লেকক

কানাডীয় হাস্যরসের লেখক স্টিফেন লেকক

কানাডীয় হাস্যরসের লেখক স্টিফেন লেকক
313
0

ব্যাংকে ঢুকলেই আমার বুক ধড়ফড় করে। কিন্তু তারপরও আমাকে ব্যাংকে যেতেই হলো কারণ সেবার আমার বেতন বেড়ে পঞ্চাশ ডলার হয়ে যাওয়াতে টাকা রাখার জন্য ব্যাংক ছাড়া আর কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না। ব্যাংকে ঢুকতেই সামনে যে কেরানিটার দেখা পেলাম তাকে বললাম, আমি ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে চাই। ম্যানেজারের রুমে সে আমাকে নিয়ে গেলে আমি ম্যানেজারকে বললাম, আমি তার সাথে একাকী কথা বলতে চাই। ম্যানেজার প্রথমে ভাবল, আমি বোধহয় কোনো গোয়েন্দা সংস্থার লোক। পরে যখন বললাম যে, আমার সব টাকা আমি ব্যাংকে রাখতে চাই, ম্যানেজার ভাবল, আমি বোধহয় কোনো মিলিয়নিয়ার। পরে যখন বললাম, মাসের বেতনের পুরো পঞ্চাশ ডলারই আমি ব্যাংকে রাখতে চাই, তখন সে আমাকে একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট দেখিয়ে দিল। অ্যাকাউন্ট খোলার পর অ্যাকাউন্টট্যান্ট টাকাটা জমা করলে আমার দ্বিধা কাটল না যে টাকাটা আসলে জমা পড়েছে কি-না। বললাম, টাকাটা আমি তুলতে চাই। টাকাটার পুরোটাই তুলতে চাইলে অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিস্মিত হলো। টাকাটা নিয়ে চলে এলাম এবং আর কোনোদিন আমি ব্যাংকে যাই নি।

উপরের গল্পটি আসলে তিন পৃষ্ঠা দীর্ঘ। পাঠকের সুবিধার জন্য সংক্ষেপিত একটা অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। গদ্যটির নাম ‘মাই ফাইন্যানসিয়াল ক্যারিয়ার’। ছাপা হয়েছিল ১৯১০ সালে। গ্রন্থটির নাম ছিল লিটারারি ল্যাপসেস। লেখক স্টিফেন লেকক [১৮৬৯- ১৯৪৪] কানাডীয় সাহিত্যের সর্বকালের সবচেয়ে সফল হাস্যরসের লেখক। ব্যঙ্গ ও কৌতুকের মিশেলের একাকার স্টিফেনের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ৩৭ বছর বয়সে। এলিমেন্টস অব পলিটিক্যাল সায়েন্স শিরোনামের গ্রন্থটির লেখক তার আগেই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত। ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী এই লেখক পরিবারের সাথে কানাডায় অভিবাসী হন সাত বছর বয়সে।


রসসাহিত্যের রচয়িতা হিসেবে তার যে প্রকাশ সেটির বিবরণ আছে দ্য লেটারস অব স্টিফেন লেকক গ্রন্থে।


রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এই অধ্যাপক দেরিতে বই লেখা শুরু করলেও একেবারে কম নয় তার গ্রন্থ সংখ্যা। প্রবন্ধ গ্রন্থের সংখ্যাই বাইশ। এছাড়া দুটি জীবনী, একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থও রচনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু জন্মের সার্ধশত বছরে এসে তিনি বোধ করি বেশি করে স্মরিত তার কথাসাহিত্য ঢঙের রচনাগুলোর জন্যে। হাসি আর ঠাট্টার ছলে, ব্যঙ্গ আর কৌতুকের ছলে গল্প বলার ধরনে রচিত স্টিফেনের গ্রন্থ সংখ্যা উনত্রিশ।

গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে স্টিফেন যে লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন না, তা কিন্তু নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকেই আমেরিকা ও কানাডা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় তিনি বেশ লিখতেন। সেসব লেখালেখির মধ্যে তার ধরনটি ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রসসাহিত্যের রচয়িতা হিসেবে তার যে প্রকাশ সেটির বিবরণ আছে দ্য লেটারস অব স্টিফেন লেকক গ্রন্থে। ২০০৬ সালের কানাডার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত সে গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে এ বিবরণটি বর্তমান। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খুচরো লেখাগুলোকে মলাটবদ্ধ করার প্রথম উদ্যোগ স্টিফেন নিজেই নিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে। তার লেখা পাঠ্যপুস্তকগুলোর প্রকাশককে পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু উত্তর ইতিবাচক হয় নি। এরপর ১৯১০ সালে স্টিফেনের ছোটভাই জর্জ এক প্রকাশকের সাথে কথা বলে তাদেরকে পঞ্চাশ ডলার দেন বইটি প্রকাশ করার জন্য। তিনি শর্ত দিয়েছিলেন ৩০০০ কপি বই ছাপা হবে এবং প্রতি বিক্রিত কপির বিপরীতে জর্জকে পাঁচ সেন্ট এবং লেখক স্টিফেনকে দুই সেন্ট করে দিতে হবে। বই প্রকাশিত হলো। আলবার্ট মরিটস এবং থেরেসা মরিটসের লেখা জীবনী থেকে জানা যায়, বই মুদ্রণালয়ে যাওয়ার আগেই স্টিফেন জর্জের টাকাটা ফিরিয়ে দেন [পৃ. ১২৮]।

কিন্তু বিস্ময়ের যে, দুই মাসের মধ্যেই বইয়ের তিন হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায় এবং স্টিফেন মোট দুই শ ডলার মুনাফা অর্জন করেন। কাকতালীয়ভাবে ওই সময়ই ইংল্যান্ডের এক বিখ্যাত প্রকাশক সে সময় মন্ট্রিয়লে বেড়াতে আসেন এবং রাস্তার পত্রিকার দোকান থেকে এক কপি ‘লিটারারি ল্যাপ্সেস’ কেনেন। ইংল্যান্ড গিয়েই তিনি স্টিফেনের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ব্যবসায়িকভাবে বই প্রকাশের চুক্তি করতে আমন্ত্রণ জানান। জন লেন নামের ওই প্রকাশকই কিন্তু এর আগে ১৮৯৫ সালে কানাডীয় লেখক পলিন জনসনের ওয়ামপাম, ১৯০৯ সালে রবার্ট সার্ভিসের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। আর সে সবেরই পরিণতিতে আরো দেখতে পাই স্টিফেন এরপর আমৃত্যু প্রতি বছর মোটামুটিভাবে একটি করে রসসাহিত্যের গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।

1
স্টিফেন লেককের বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছদ

১৯১১ সালে প্রকাশিত হলো ননসেন্স নভেলস। ১৯১২ এবং ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হলো স্টিফেনের লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত দুই বই সানশাইন স্কেচেস অব অ্যা লিটিল টাউন এবং আরকাডিয়ান অ্যাডভেঞ্চারস উইথ দ্য আইডেল রিচ। স্টিফেনের আরও যে সব গ্রন্থ বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশেষ গুরুত্বের সাথে পাঠ করা হয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মুনবিমস ফ্রম দ্য লার্জার লুনাসি [১৯১৫], ফারদার ফুলিশনেস [১৯১৬], এসেজ অ্যান্ড লিটারারি স্টাডিজ [১৯১৬], ফ্রেঞ্জিড ফিকশান [১৯১৮], দ্য আনসলভড রিডল অব সোশ্যাল জাস্টিস [১৯২০], মাই ডিসকভারি অব ইংল্যান্ড [১৯২২], দ্য গার্ডেন অব ফলি [১৯২৪], উইনোড উইজডম [১৯২৬], শর্ট সার্কিটস [১৯২৮], হিউমার : ইটস থিয়রি অ্যান্ড টেকনিক [১৯৩৫], টু মার্চ কলেজ [১৯৩৯], মাই রিমার্কেবল আঙ্কল [১৯৪২], হাউ টু রাইট [১৯৪৩] ইত্যাদি।

‘লিটারারি ল্যাপ্সেস’-এর যে গদ্যগুলো শতাব্দী পেরিয়ে আজও পাঠকের কাছে হাসির উদ্‌গাতা, সাহিত্যিক মূল্যের প্রশ্নে মূল্যবান সেগুলোর মধ্যে পূর্বোল্লিখিত মাই ফাইনান্সিয়াল কেরিয়ার ছাড়াও বোর্ডিং হাউস জিওমেট্রি’, দ্য অফুল ফেট অব মেলপোমেনাস জোনস, মেন হু হ্যাভ শেভড মি, অ্যা, বি অ্যান্ড সি বিশেষ মর্যাদার। এই বইতে ‘হাউ টু’ পর্বের চারটি রচনা ছিল। রচনাগুলোর শিরোনাম হলো : ‘হাউ টু মেক অ্যা মিলিয়ন ডলার’, ‘হাউ টু লিভ টু বি ২০০’, ‘হাউ টু এভয়েড গেটিং ম্যারেড’ এবং ‘হাউ টু বি অ্যা ডক্টর’-কে সমালোচকেরা শিল্পোত্তীর্ণ বলেই দাবি করে থাকেন।

একথা সত্য লিটারারি ল্যাপসেস ‘হট পপ কর্ন’-এর মতো বিক্রি হয়েছিল কিন্তু তারপরও কানাডীয় সাহিত্যের গবেষকদের অভিমত হলো ১৯১১ সালে প্রকাশিত ননসেন্স নভেলস হলো স্টিফেন লেককের শ্রেষ্ঠ কৌতুকগ্রন্থ। এত সাফল্য তার আর কোনো বই তাকে দিতে পারে নি। ১৯২৪ সালের এক রেকর্ডেই দেখা যায় বইটির ৭২,৩২২ কপি বিক্রি হয়েছিল তের বছরে। মোট ছত্রিশটির বেশি সংস্করণ হয়। বহু ভাষাতে অনূদিতও হয়েছিল ননসেন্স নভেলস। বইটির সাফল্য আকাশচুম্বী হয়ে গেল যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট তার এক বক্তৃতায় এই বইয়ের ‘গ্রাট্রুড দ্য গভর্নেস’ নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিলেন এবং লেখক স্টিফেন লেককের নাম ও সূত্র উল্লেখ করলেন।


সবাই এটি স্বীকার করতেন যে মানুষকে অধিকতর মানবিক করে তোলার জন্য স্টিফেনের রচনা অনন্য এক পাঠ।


ননসেন্স নভেলস বইতে দশটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা আছে। প্রতিটি রচনার একটি শিরোনাম ছিল, কিন্তু প্রত্যেকটির জন্যই নিচে আলাদা করে একটি উপশিরোনাম ছিল। যেমন প্রথম রচনাটির কথা যদি ধরি। সেটির শিরোনাম হলো ‘ম্যাডেনড বাই মিস্ট্রি’ উপশিরোনাম হলো : ‘দ্য ডিফেকটিভ ডিটেকটিভ’। দ্বিতীয়টি হলো; ‘কিউ’। উপশিরোনাম হলো: ‘অ্যা সাইকিক স্টোরি অব দ্য সুপারন্যাচারাল’। ইংরেজি বানানে যেহেতু সাইকি শব্দের শুরুতে ‘পি’ বর্ণটি রয়েছে, তাই লেখক ‘স্টোরি’ এবং ‘সুপারন্যাচারাল’ শব্দ দুটির শুরুতেও ‘পি’ বর্ণ লাগিয়ে দিয়েছেন।

2
স্টিফেন লেককের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের প্রচ্ছদ

২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর স্টিফেনের সানশাইন স্কেচেস অফ অ্যা লিটল টাউন বইয়ের নতুন সংস্করণ নিয়ে এক সমালোচনা লেখেন খ্যাতনামা অধ্যাপক এবং সাহিত্য গবেষক নিক মাউন্ট। গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকায় প্রকাশিত সে আলোচনা থেকে জানা যায়, ১৯৫৯ সালের ১৬ এপ্রিল টরন্টোর রয়াল ইয়র্ক হোটেলের কনসার্ট হলে সাহিত্যজনদের স্মরণীয় এক সমাগম হয়। সাতশর বেশি অতিথি সেদিন যে কারণে ওই স্থানে সমবেত হন সেটি হলো স্টিফেন লেককের স্মৃতিজড়িত বাড়ির পেছনের অংশ সংরক্ষণের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করতে। নিক জানিয়েছেন সে ফান্ড রেইজিং-এ উপস্থিত ছিলেন মর্লি কালাহান, মাজো ডি লা রচ, ই জে প্রাট, হিউ ম্যাকলেনানসহ বিশিষ্ট সব কবি-সাহিত্যিক। নিকের বক্তব্য হলো লেখক হিসেবে শতাব্দী পর স্টিফেনের যে বইটি এখন অবধি টিকে আছে সেটি হলো ‘সানশাইন স্কেচেস’।

বইতে মোট বারোটি স্কেচ আছে। শুরুতে আছে সেই ১৯১২ সালের জুন মাসে লেখা স্টিফেনের একটি প্রাককথন। সেখানে পাঠকের সুবিধার জন্য লেখক নিজের জীবনীমূলক একটি পরিচয় দিয়েছেন। শেষ দিকে বলেছেন, কিভাবে একটি তথ্যসমৃদ্ধ বা গবেষণামূলক লেখার চেয়ে একটি নির্ভেজাল কৌতুকময় রচনা তৈরিতে লেখকের বেশি মেধা এবং পরিশ্রম লাগে সেই বিষয়টি। আর জানিয়েছেন সাধারণভাবে তার চরিত্রগুলোকে সাধারণ পাঠক চারপাশের এক একজন আলাদা আলাদা চরিত্র বলেই বিবেচনা করেও, তিনি কখনো কখনো আট থেকে দশটি চরিত্রকে এক জায়গায় করে ‘সানশাইন স্কেচেস’-এর একটি চরিত্র বানিয়েছেন। টরন্টো স্টার পত্রিকায় ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলামিস্ট ক্যারল গোর লিখলেন স্টিফেন লেককের হাস্য-কৌতুকের পেছনের কথা। ক্যারল বলেন :

♦ কানাডায় ধনী ও দরিদ্রের যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব সেটি বোঝানোর জন্য স্টিফেন সেকালের একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও পরিসংখ্যানের সাহায্য নেন নি।

♦ ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২৮ বছর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেও তিনি রাজনৈতিক বিশেষণে যান নি।

কেননা তিনি বুঝেছিলেন এসব দিয়ে কানাডিয়ানদেরকে তাদের সন্তুষ্টির জায়গা থেকে সরানো যাবে না। আর সে কারণেই তিনি বেছে নিলেন সাহিত্য রচনার এমন এক ধারা যেখানে সামাজিক বিষয়গুলোকে সূক্ষ্মভাবে ব্যঙ্গ করা যায়। কৌতুকের ভেতর দিয়ে দোষ-ত্রুটিগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। ব্যক্তি মানুষ বা মানুষ জাতিকে তুলে আনা যায় ওইসব দুর্বলতার বাইরে। স্টিফেন লেককের সাফল্য এই যে তার প্রচেষ্টাকে মানবিক হিসেবেই পাঠক-সমালোচকেরা বিবেচনা করেছিলেন। সবাই এটি স্বীকার করতেন যে মানুষকে অধিকতর মানবিক করে তোলার জন্য স্টিফেনের রচনা অনন্য এক পাঠ।

স্টিফেনের রচনা যে কারণে বর্তমান আলোচকের ভালো লাগে তার একটি হলো : কৌতুকের বিষয়টি তিনি নিজের ওপর আরোপ করেন। যে স্টিফেন সমকালের কানাডার অগ্রগণ্য অর্থনীতিবিদ তিনি কত সহজে ব্যাংক, অর্থ বা অর্থনীতি নিয়ে নিজের অজ্ঞতাকে সবার সামনে উপস্থাপন করে পাঠককে হাসির খোরাক জোগান। নিজের পাণ্ডিত্য, দক্ষতা এবং গভীরতার ওপর অনেক বেশি আস্থা থাকলেই বোধ করি এমনটি করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ‘ফারদার ফুলিশনেস’ থেকে একটু উদাহরণ দিতে চাই। পাঠক খেয়াল করবেন বইয়ের শিরোনামেই তিনি যেন বুঝিয়ে দিতে চান তিনি হচ্ছেন বোকার হদ্দ একজন মানুষ। নিজের সেই রামবোকামির চিত্র তিনি অতীতেও লিখেছেন। কিন্তু পুরোটা তখন লেখা হয় নি। তাই আবারও লিখছেন। এই গ্রন্থের একটি রচনার নাম ‘আর দ্য রিচ হ্যাপি?’। সে রচনার প্রথম বাক্যটিই হলো : ‘আমি শুরুতেই এটি স্বীকার করে নিতে চাই, পুরো বিষয়টি পরিষ্কার জ্ঞান অর্জন না করেই আমি লিখতে বসেছি।’ এ তো গেল একটি বিষয়। এর পরেই সেকালের কানাডার অগ্রগণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক লিখলেন, ‘কোনো দিন কোনো বড়লোককে আমি চিনতাম না। কোনো বড়লোককে কোনোদিন দেখিও নি।’

3
বর্তমান সময়ের বিখ্যাত কানাডীয় কবি এ এফ মরিৎজ এবং থেরেসা মরিৎজ রচিত স্টিফেন লেককের জীবনী

এই প্রবন্ধ শেষ করার আগে রসসাহিত্য নিয়ে স্টিফেনের বিশ্লেষণ নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই। ১৯৩৫ সালে তিনি ‘হিউমার : ইটস থিয়োরি অ্যান্ড টেকনিক’ নামে আরও একটি বই লিখেছিলেন। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সে বইটির পুরো নামের শেষে ছিল ‘উইথ এগজামপলস অ্যান্ড স্যাম্পলস’। বোঝা যায় হাতে-কলমে  কাটাছেঁড়া করে স্টিফেন বোঝাতে চান রসসাহিত্যের ভেতরের কলকব্জা। পাঠকের সুবিধার জন্য সে গ্রন্থের কয়েকটি অধ্যায়ের শিরোনাম উল্লেখ করলে বোঝার খানিকটা সুবিধা হবে। ‘অ্যান এনালিসিস অব হিউমার’, ‘ফান উইথ ওয়ার্ডস’, ‘প্যারোডি, বার্লেক্স অ্যান্ড মিসট্রান্সলেশন’, ‘টেকনিক অব দ্য গ্রেটার হিউমরিস্ট’, ‘কমিক অ্যান্ড সুপার কমিক ভার্স’, ‘স্টোরি টেলারস অ্যান্ড স্টোরি কিলারস’, ‘হিউমার থ্রু দ্য এজেস’ ইত্যাদি। এই বইয়ের পাতায় পাতায় রসসাহিত্য নিয়ে স্টিফেনের গভীর পাঠ, পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের ছাপ বর্তমান। স্পষ্ট হয় একজন সত্যিকারে রসসাহিত্যের স্রষ্টা হতে প্রকৃতপক্ষে স্টিফেনকে কতটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় লেখা শত শত গদ্য ও পদ্য রচনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে স্টিফেন সেগুলোতে নিহিত রসের সূত্র ও প্রকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন।


১৯৬৯ সালে স্টিফেনের জন্মশতবর্ষে কানাডা পোস্ট তার ছবি সংবলিত একটি স্ট্যাম্পও বাজারে প্রকাশ করে।


মৃত্যুর ঠিক আগের বছর প্রকাশ করেছিলেন অসামান্য আরেক গ্রন্থ হাউ টু রাইট। বারোটি অধ্যায়ের শুরুটি হলো ‘দ্য ডেজায়ার টু রাইট’। আর পরে আছে ‘হাউ টু রাইট হিস্ট্রি’, ‘হাউ টু রাইট হিস্টরিক্যাল নভেলস’, ‘হাউ নট টু রাইট পোয়েট্রি’, ‘হাউ নট টু রাইট মোর পোয়েট্রি’, ‘হাউ টু রাইট হিউমার’, ‘হাউ টু রাইট মোর হিউমার’। দুই শ পৃষ্ঠার বইজুড়ে তিনি কাজটি করেছেন রসমিশ্রিত উপাদান দিয়ে, পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা গবেষণামূলক উপাত্ত দিয়ে নয়। আর সে কারণেই বইয়ের ভূমিকাতে স্টিফেন লিখেছেন :

The purpose of this book is to help people to write and not to offer criticism of authors attempts to do so.

সেসব কথা বলতে গিয়েই ১৯৪২ সালে জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে স্টিফেন নির্দ্বিধায় বলেছেন, কেন লেখক হতে তার চল্লিশ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও স্টিফেন সফলতা পেয়েছিলেন। অনেক লেখককে সফল লেখক হবার প্রণোদনা জুগিয়েছিলেন। আর সে কারণেই হয়তো বহু পুরস্কারে ভূষিত কানাডীয় লেখক, নাট্যকার ও অভিনেতা টিমথি ফিন্ডলে [১৯৩০- ২০০২] বলেছিলেন :

এটাই বোধ করি যথার্থ হবে যদি বলা হয় স্টিফেন বাটলার লেকক ছিলেন আমাদের সকলের পিতামহ।

স্টিফেনের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছিল তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী দ্য বয় আই লেফট বাহাইন্ড মি। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত সে গ্রন্থে স্টিফেন ধরেছিলেন তার জন্ম, শৈশব, কৈশোর এবং কলেজ জীবনের সময়কে। পাঠক খেয়াল করবেন এই বইয়ে অনেক প্রসঙ্গই আমরা পাই যেগুলো স্টিফেন অতীতে লিখেছেন। সত্যি কথা বলতে কি এই বিষয়টি কিন্তু আত্মজীবনীতেই প্রথমবার ঘটে নি। শেষ জীবনের অনেক রচনাতেই খেয়াল করলে চোখে পড়ে যে তিনি পৌনঃপুনিকতা করছেন। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তার রচনায় পুনরাবৃত্তির এই দোষকে অস্বীকার করা চলে না। হয়তো সে দোষের প্রধান কারণ হবে লেখা এবং বলার জন্য তার ওপর সৃষ্ট চাপ। কিন্তু এত কিছুর পরও স্টিফেন কানাডীয় ইংরেজি ভাষার সাহিত্য জগতে অনন্য এক কৌতুক স্রষ্টা। তার রসসাহিত্য ১৯৩৭ সালে ‘ননফিকশন’ ক্যাটাগরিতে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার এনে দিয়েছিল তাকে। মৃত্যুর পর মহান এ লেখকের স্মৃতিকে ধারণ করতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্টিফেন লেকক পুরস্কার। ১৯৬৯ সালে স্টিফেনের জন্মশতবর্ষে কানাডা পোস্ট তার ছবি সংবলিত একটি স্ট্যাম্পও বাজারে প্রকাশ করে।

সুব্রত কুমার দাস

উদ্যোক্তা at bangladeshinovels
জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক।

প্রকাশিত বই :
১. শ্রীচৈতন্যদেব [ঐতিহ্য ২০১৮, ২০১৬ (টরন্টো)]
২. আমার মহাভারত (নতুন সংস্করণ) [মূর্ধন্য, ২০১৪]
৩. নজরুল-বীক্ষা [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১৩]
৪. অন্তর্বাহ [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১৩]
৫. রবীন্দ্রনাথ: ইংরেজি শেখানো [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৬. রবীন্দ্রনাথ ও মহাভারত [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৭. আলোচনা-সমালোচনা [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৮. রবীন্দ্রনাথ: কম-জানা, অজানা [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১১]
৯. প্রসঙ্গ শিক্ষা এবং সাহিত্য [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৫]
১০. বাংলাদেশের কয়েকজন ঔপন্যাসিক [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৫]
১১. নজরুল বিষয়ক দশটি প্রবন্ধ [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৪]
১২. বাংলা কথাসাহিত্য: যাদুবাস্তবতা এবং অন্যান্য [ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০২]
১৩. নজরুলের ‘বাঁধনহারা’ [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০০]


সম্পাদনা—
১. সেকালের বাংলা সাময়িকপত্রে জাপান (সম্পাদনা) [নবযুগ, ঢাকা, ২০১২]
২. জাপান প্রবাস (সম্পাদনা) [দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১২]
৩. অগ্রন্থিত মোজাফফর হোসেন (সম্পাদনা) [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১১]
৪. কোড়কদী একটি গ্রাম (সম্পাদনা) [কলি প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১১]

অনুবাদ—
১. Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspectives [ইন্ডিয়া সেন্টার ফাউন্ডেশন, জাপান, ২০১১]
২. Parobaas (ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস। অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের সাথে) [অনন্যা, ঢাকা, ২০০৯]
৩. Christian Religious Studies - Class V (এ এস এম এনায়েত করিমের সাথে) [এনসিটিবি, ঢাকা, ২০০৭]
৪. In the Eyes of Kazi Nazrul Islam: Kemal Pasha (অনুবাদ প্যানেলের সদস্য) [সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ২০০৬]
৫. Kazi Nazrul Islam: Speeches (অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের সাথে) [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০৫]
৬. Kazi Nazrul Islam: Selected Prose [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০৪]

এমাজন কিন্ডল এডিশনে বই :
১. Kazi Nazrul Islam: Selected Prose www.amazon.com/Kazi-Nazrul-Islam-Selected-Prose-ebook/dp/B00864ZCLY/
২. Rabindranath Tagore: less-known Facts http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৩. Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspective http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৪. Worthy Reads from Bangladesh http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৫. (Not) My Stories http://www.amazon.com/Not-Stories-Subrata-Kumar-Das-ebook/dp/B00880XDP8

ওয়েবসাইট : www.bdnovels.org
ই-মেইল : subratakdas@yahoo.com