হোম গদ্য কলোনিয়াল কবরস্থান থেকে ভেসে আসে মৃত ঘোড়ার ডাক

কলোনিয়াল কবরস্থান থেকে ভেসে আসে মৃত ঘোড়ার ডাক

কলোনিয়াল কবরস্থান থেকে ভেসে আসে মৃত ঘোড়ার ডাক
2.62K
0

সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে এমন সব নিম্নমানের প্রোপাগান্ডা চাউর হয় যে—সে-সম্পর্কে চুপ থাকাও মুশকিল। বাংলাদেশের মফস্বলের একটি ছেলে—যাকে কিছুদিন আগেও কেউ চিনত না, নিতান্তই বালক বয়স উত্তীর্ণ করেছে কেবল, ডাক নাম নোবেল। তাকে কলকাতার এক টিভি চ্যানেল তাদের সংগীত বিষয়ক রিয়েলিটি শো-তে নামিয়ে রাতারাতি স্টার বানিয়ে দিয়েছে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ঐ শো-টির মার্কেটিং করা। যথা সময়ে ছেলেটিকে ছুড়েও ফেলা হয়েছে।


এভাবেই ঊনবিংশ শতকে কলোনির কেন্দ্র কলকাতা থেকে ঘৃণার কেশর ফুলিয়ে—মিথ্যে দম্ভের চিঁচিঁ আওয়াজে—বাংলার জনমানসে নামে সাম্প্রদায়িকতার ঘোড়া।


সম্প্রতি বালক নাকি বলেছে—বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির চেয়ে জেমসের গাওয়া প্রিন্স মাহমুদের একটি গান (যা বালক ক্যালকেসিয়ান সেই চ্যানেলে গেয়েছিল) সেটি বাংলাদেশকে বেশি রিপ্রেজেন্ট করে। ব্যাস! আর পায় কে! এবার বালককে সক্রেটিস জ্ঞান করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে—পশ্চিম বঙ্গ থেকে রবীন্দ্রনাথ উদ্ধারের নামে ঝাড়তে শুরু করল হাজার হাজার পোস্ট। শ্লীল-অশ্লীল ভাষায় হাজার হাজার পদের গালি, ছেলেটির চৌদ্দগোষ্ঠীর পিণ্ডি চটকানোর ব্যাপার তো আছেই, সাথে সমগ্র বাঙালি মুসলমান কমিউনিটি—যাদেরকে এরা চিরকাল আদর্শ শত্রু মনে করেছে, সর্বোপরি বাংলাদেশকেও। এই হুজুগে বুঝে শুনে লাফিয়ে পড়েছে অনেক বাংলাদেশি দালাল এবং না বুঝেই কিছু অ-দালাল।

কেন তবে এই সামান্যের এত মূল্য! বালকের বাক্য থেকে রবীন্দ্র উদ্ধারের হই হই! রবীন্দ্রনাথের গান তো আমরাই আমাদের জাতীয় সংগীত বানিয়েছি, নিশ্চয়ই পশ্চিম বঙ্গের দাদা-দিদিদের ভোটে নয়। যারা নিজেরাই রাস্তাঘাটে বাংলা বলে না এমন কি খোদ শান্তিনিকেতনে গিয়ে দেখেছি তার সাইনবোর্ডটিও বাংলায় নয়। তাদের কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে এত রবীন্দ্র মার্সিয়া ক্রন্দন! যে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বিজেপি—রবীন্দ্রনাথের গান ‘জন গণ মন’ জাতীয় সংগীতের মর্যাদা থেকে সরাতে ইচ্ছুক তাদের বেলায় কেন চুপ! কেন অপরিণত এক বালকের সার্টিফিকেট দিয়ে হঠাৎ রবীন্দ্রনাথকে এমন নোংরাভাবে কচলানো! এর কি কোনো উদ্দেশ্য নেই? আছে!

বাংলাদেশ নিয়ে এক শ্রেণির ক্যালকেসিয়ানদের যে হিন্দুজাতিবাদী প্রতিহিংসা, নিরন্তর প্রোপাগান্ডা রচনার স্বাচ্ছন্দতা তা সম্প্রতি বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে, আমেরিকায় ডোনাল ট্রাম্পের সাথে প্রিয়া সাহার দেখা করে বিষদগার করার কাণ্ডে! বাংলাদেশের দালাল চক্রও বিষয়টি নিয়ে নীরবে অপান বায়ু ত্যাগ করছিল। এত দৈবদুর্বিপাক বন্যা মহামারি কিন্তু জনগণের মনোযোগ সরছে না! ফলে অখ্যাত ওই বালককে, যাকে স্টার বানিয়ে প্রথমে ব্যবসা করা হয়েছে, পরে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, খোসা ভেবে, তাকেই কাজে লাগাও। ব্যাস হয়ে গেল জমজমাট রিয়েলিটি শো-য়ের দ্বিতীয় পর্ব! দারুণ ক্যালকেসিয়ান ইতরামি, কতটা বিলো ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি থাকলে একটি বালকের বাক্য ধরে মানুষ রবীন্দ্রনাথকে কচলাতে নামে! কিন্তু তাতে কী—গোল্লায় যাক রবীন্দ্রনাথ। তালে তাল মেলালেন দেশীয় দালালরা। গালি দাও বালককে। যুক্ত করো রাজাকার শব্দ, তারপর গালি দাও বাঙালি মুসলমানদের, সাথে ইনিয়ে-বিনিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে। হোক ওরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই বিরক্ত হোক, তাতে কী! জমে যাক দ্বিতীয় পর্বের রিয়েলিটি শো।

এই প্রোপাগান্ডাবাজি, এই ইতরামির বাঁশটি কী শুধু প্রতিপক্ষের দিকে যায়? যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, এটি যারা করে তাদের পশ্চাতের দিকেই ফিরে আসে। এর শুরু যে সাম্প্রতিক তাও না। ফিরে দেখা উচিত। ভেঙে-চুরে যাওয়া বাঙালির জাতীয় সংহতির বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে একটা ব্যাপার খুব গভীরভাবে লক্ষ করেছি—দূর থেকে দেখলে মনে হয় বাঙালি হিন্দু-মুসলমানে পার্থক্য খুব সামান্যই, এটা মিলিয়ে দেওয়া ব্যাপার না, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় দূরত্বটা প্রায় দেড়/ দুই শ বছরের।

১৭৯৩ সালে ব্রিটিশরা যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা করল, বাঙালি মুসলমান বলতে বাংলার বিরাট কৃষক জনগোষ্ঠী সম্পন্ন কৃষক পরিবারগুলো মুহূর্তেই ভূমিহীন হয়ে গেল। বাদ যায় নি বাঙালি হিন্দু কৃষকরাও। অন্যদিকে মুসলমানদের হাতে থাকা বাংলার সমৃদ্ধ বস্ত্র শিল্প আগেই ধ্বংস হয়েছিল ব্রিটিশদের হাতে। কিন্তু এবার জমির মালিক হলো কারা? ১৭৫৭’র পর থেকে বাংলা লুণ্ঠনে ব্রিটিশদের দালাল সহযোগীরা। মুষ্টিমেয় কিছু বাদে যাদের প্রায় সবাই ছিল হিন্দু। প্রতারণা লুণ্ঠন আর দালালি থেকে পাওয়া পয়সায় হঠাৎ ধনী এই লোকগুলো হলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হঠাৎ জমিদার। ১৭৫৭ সালের পর আপামর হিন্দু-মুসলমান বাঙালি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে গণবিদ্রোহ করে যাচ্ছিল—প্রথম তার রাশ টেনে ধরেছিল এই হঠাৎ জমিদারগণ। বিদ্রোহী কৃষকদের দমন এবং নিষ্পেষণের জন্য এরাই প্রথম হিন্দু কৃষকদের মধ্যে মুসলমান কৃষকদের প্রতি ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে শুরু করে। এই দেশীয় গণশত্রু ‘হঠাৎ জমিদারদের’ হাতেই ব্রিটিশরা শিক্ষালাভ করেছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুলের। এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ বপন ও পরিচর্যার জন্য হঠাৎ জমিদারগণ যুক্ত করলেন যোগ্য সারথি বর্ণবাদী হিন্দু পুরুত শ্রেণিকে। এদের সম্মিলিত নাম হলো বাবু সমাজ। রাঢ় বঙ্গের অভাবী হিন্দু, যারা দু’মুঠো অন্নের আশায় জড়ো হয়েছিল ইংরেজ বাণিজ্যকেন্দ্র কলকাতায়, তাদের পরবর্তী প্রজন্মও যুক্ত হলো এদের সাথে।

কৃষি বাংলার কৃষক নিষ্পেষণের জন্য চাই বিভেদ, বিভেদের জন্য দরকার বিভেদের সংস্কৃতি, বিভেদ মন্ত্র। সাদা প্রভু এবং তাদের সহযোগী জমিদারদের জন্য রচিত হতে শুরু করে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি। ইংরেজ কোম্পানির নিয়োগকৃত ইংরেজ পণ্ডিতরা সেই অশুভ তরীর পালে দিলেন তুমুল হাওয়া। আর পায় কে! এবার ঘৃণা চর্চা একাডেমিকভাবে হতে শুরু করে। আরও একটা লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল, এই বেওয়ারিশ বাবু সমাজ হঠাৎ বিত্তশালী হওয়ার সাথে সাথে অনুভব করেন ঐতিহ্যের অভাব। কেননা পূর্বতন রাষ্ট্রনায়করা ছিলেন সবাই মুসলমান। শুরু হলো নিজ নিজ পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের যোগ নিয়ে নানান উপকথা রচনার মৌসুম। কেউ কেউ পূর্ব পুরুষের খোঁজে একদম বর্গী মারাঠা অব্দি গেলেন। আবার নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য তো কাউকে ছোট করা দরকার। তা না হলে কিসের শ্রেষ্ঠত্ব! ইংরেজ সাদা প্রভুর বিরুদ্ধে তো আর শ্রেষ্ঠত্বের হেজিমনি চলে না। তাহলে তো পশ্চাৎ দেশের চর্ম রক্ষা মুশকিল হবে, অতএব ওই বিদ্রোহী বাঙালি মুসলমানের বিরুদ্ধেই এবার শ্রেষ্ঠত্বের হেজিমনি রচনা করো। অথচ আঠারো শতক অব্দি সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বাঙালি মুসলমানরা ছিল যথেষ্ট আত্মমর্যাদা সম্পন্ন এবং সচ্ছল।

অন্যদিকে গজিয়ে ওঠা কলোনির শাসনকেন্দ্র রাঢ় বঙ্গের কলকাতা সাদা প্রভুর শহর, এর ঠাটই আলাদা, জমিদারগণ এখানে থাকে আর তাদের অধিকাংশ জমি-ধানখেত পূর্ববঙ্গে, যেখানে কৃষকরা থাকে। তার উপরে কৃষকদের অধিকাংশই আবার ধর্মে মুসলমান। ফলে বাঙালি মুসলমানদের সাথে কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গও ক্রমশ হয়ে ওঠে ঘৃণার উপাদান।

এভাবেই ঊনবিংশ শতকে কলোনির কেন্দ্র কলকাতা থেকে ঘৃণার কেশর ফুলিয়ে—মিথ্যে দম্ভের চিঁচিঁ আওয়াজে—বাংলার জনমানসে নামে সাম্প্রদায়িকতার ঘোড়া।

ঊনবিংশ শতক থেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিবর্তিত হতে থাকল বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি। কথা হলো সাম্প্রদায়িকতা কি বাঙালিদের মধ্যে আগেও ছিল না? ছিটেফোঁটা তো অবশ্যই ছিল কিন্তু এমন ভয়াবহভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চর্চিত বোধহয় কোনো কালেই ছিল না। প্রতিবাদহীন এক পাক্ষিক এই সাম্প্রদায়িকতার চর্চাটা কিন্তু ঊনবিংশ শতকের প্রায় শেষ অবধি চলছিল। এ সময় বাবু সমাজেও দুই রকম বাবু পরিলক্ষিত হয়। ১. বাবু অন্তঃপ্রাণ বাবু এবং ২. এন্টি বাবুইজমের বাবু। এই দুই দল বাবুদেরই চেতনায় প্রবাহিত হতো হিন্দু জাতিবাদ। কেউ একটু উদার, কেউ খুব কট্টর। কেউ আন্তঃদেশীয় হিন্দু জাতিবাদী, অধিকাংশই সর্বভারতীয় হিন্দু জাতিবাদী। এদের জাতীয় মেলার নাম হয় হিন্দু মেলা। এদের কাছে বাঙালি মানে হিন্দু, ভারতীয় মানে হিন্দু, এরা বাঙালি মুসলমানদেরও শনাক্ত করতে শুরু করেন হিন্দু-মুসলমান বলে। বাঙালি মুসলমানরা বাবুদের এই উদারতাকে ভালোচোখে নেয় নি। তারা নিজেদের মুসলমান পরিচয় নিয়ে কট্টর হয়ে ওঠে।


ইতিহাসের কি নিদারুণ সত্য, হিন্দু জাতিবাদের পদপৃষ্ঠ সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আমরা জাগতে দেখি ১৯৪৭-এর পর, তাও এই পূর্ববঙ্গে, ঢাকায়।


১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল বাঙালি মুসলমানদের জন্য সর্বহারা হওয়ার সময়, নিরন্তর লড়াইয়ের সময়। ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর বাঙালি মুসলমান সমাজ ধীরে ধীরে হতোদ্যম হতে শুরু করে। এ সময় ইংরেজ শাসনের ধরনটাও পাল্টে যায়। এতদিন বাংলা শাসন করেছে একটি ইংরেজ কোম্পানি—এবার শাসক স্বয়ং ইংল্যান্ডের রাজা। ফলে বিদ্রোহের সময় দেশি মানুষের বিরুদ্ধে দালাল বাবু সমাজ ইংরেজদের যে সহযোগিতা করেছিল তার পুরস্কার দানের কর্তৃপক্ষই গেল পাল্টে। ফলে ধীরে ধীরে অভিমান বাসা বাধে বাবু সমাজে। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষার দিকে এগুতে থাকে বাঙালি মুসলমান সমাজ।

বাবুদের এই কৃষক বিভাজনের সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি একদিকে ‘শাপে বর’ হয়েছিল বাঙালি মুসলমানদের জন্য। সুলতানি আমলের শেষ দিকে বাংলার গ্রাম প্রান্তরে প্লাবন হয়েছিল নানারকম হিন্দু পুরাণের। বিনোদনের দারুণ উপাচার। সে তো আর শুধু বিনোদন নয়! কাঁদতে কাঁদতে বর্ণাশ্রম ধর্ম বা হিন্দু ধর্মে ঢোকার ওষুধ। নানারকম এনিমিস্ট সম্প্রদায়, লোকায়ত দেবদেবীর পূজারিরা ঢুকে পড়েছিল ব্রাহ্মণদের ধর্মায়তনে। সাথে ছিল শ্রী চৈতন্যের আবেগে ভাসিয়ে নেওয়া বৈষ্ণব হিন্দু ধর্ম। ফলে মুসলিম শাসনের মধ্যেই বর্ণাশ্রম ধর্ম বিরাট আকার ধারণ করেছিল। রামায়ণ মহাভারত অনুবাদ করিয়ে—এতে মুসলমান শাসকদেরও কিছুটা অবদান ছিল বৈকি! কিন্তু ঊনবিংশ শতকে এসে বাবুদের কল্যাণে পাশার দান উল্টে যেতে থাকে। তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ থেকে সমস্ত বাঙালি মুসলামনদের লড়াইটা ছিল ইংরেজ এবং দালাল জমিদারদের বিরুদ্ধে, সাধারণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে ছিল না। বাবুদের কাছে নিষ্পেষিত হিন্দু কৃষক এবং বিদ্রোহী মুসলমান কৃষকের মূল্যমান ছিল আসলে একই। তাদের মুসলমান ঘৃণা যতটা না সংস্কৃতি, বই-পত্র এবং শিক্ষিত সমাজে কার্যকর হলো ততটা ওই দরিদ্র হিন্দু কৃষকের কাছে গুরুত্ব পেল না। সে দেখল নিষ্পেষিত মুসলমান কৃষকটি এবং সে একই মানুষ, একই রকম অত্যাচারিত। বরং বাবুরা তাকে প্রতিপক্ষের মর্যাদাও দেয় না, দেয় ঘৃণিত সেই বাঙালি মুসলমানটিকে। ফলে তার কাছে প্রতীয়মান হয় ইসলাম নিষ্পেষিতদের ধর্ম, অত্যাচারিতদের ধর্ম, বিদ্রোহীদের ধর্ম। ১৮৭২ সালে যখন বাংলায় প্রথম জনগণনা হলো দেখা গেল বাঙালি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মুসলমান। পরবর্তী প্রতিটা সেনসাসে দেখা গেল মুসলমানের সংখ্যা ক্রমশ জন্ম হারের চেয়েও বাড়ছে। তবে কারা ধর্মান্তরিত হচ্ছিল! বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯০১ সালের সেনসাসে দেখা গেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলমানদের বাস বাংলায়, ধর্মীয়ভাবে বাঙালিরা মুসলমান প্রধান জাতি। এমনকি তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের মোট মুসলমানদের চেয়েও অর্ধকোটি বেশি ছিল বাঙালি মুসলমানদের সংখ্যা।

মজার ব্যাপার হলো প্রায় উনিশ শতকের শেষাবধি বাঙালি মুসলমানরা মোটামুটি অসাম্প্রাদায়িক ছিল। শিক্ষা সংস্কৃতির দখল আগে থেকেই ছিল—বাবু সমাজের হাতে। সংকট ঘনীভূত হয় যখন বাঙালি মুসলমানরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে আগাতে থাকে। শিক্ষার উপকরণে প্রবল হিন্দু হেজিমনি নিয়ে ধন্ধে পড়ে যায় তারা। বিষয়টা এমন যে, কেউ বইতে লিখে দিল—তুমি ছোট লোক আর তুমি মুখস্থ করছ—‘আমি ছোট লোক’ বাক্য। ঘৃণার বিপরীতে জমা হতে শুরু করে ঘৃণা। হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঘৃণা। তারাও খুঁজতে লাগল ঘৃণার উপাচার, প্যান-ইসলামি ইজমের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার তাদের জন্য আগেই তোলা ছিল, মিলেও গেল। বিংশ শতকের শুরু থেকেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফণা তুলতে শুরু করে প্রবল ঘৃণার দুইটি সাপ।

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে বাবু সমাজের প্রযত্নে দেখা দেয় হিন্দু পুনরুত্থানবাদ। প্রবল হতে শুরু করে সর্বভারতীয় হিন্দু জাতিবাদ। বাবুদের কাছে ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছিল এই মুসলিম প্রধান বাংলায়, অত্যাচারিত ওই মুসলমানরা যদি কোনো ক্রমে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে তবে হিসেব নিতে ভুল করবে না। কাজেই সমগ্র বাঙালি হিন্দু সমাজকে এইবার তাদের চাই। হিন্দুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টাও বেড়ে যায় বহুগুণ। আগ্রহ বাড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভারত রাষ্ট্র ধারণার প্রতি। অথচ কৃষি নির্ভর বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকদের যে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ সেখানে ব্রাত্য হয়ে থাকে বাঙালি মুসলামনদের মতো। ইতিহাসের কি নিদারুণ সত্য, হিন্দু জাতিবাদের পদপৃষ্ঠ সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আমরা জাগতে দেখি ১৯৪৭-এর পর, তাও এই পূর্ববঙ্গে, ঢাকায়।

বাবুদের দেশপ্রেম ওঠানামা করত তাদের স্বার্থের ওঠানামার উপর। তার একটা বড় প্রমাণ হলো প্রথম বঙ্গভঙ্গ। ১৮৭৪ সালে যখন সমগ্র ঈষাণ বাংলা তথা সিলেট এবং রংপুর জেলার একটা অংশ ভেঙে আসামে জুড়ে দেয়া হলো তখন কোনো বাবু ‘আমি নয়ন জলে ভাসি’ বলে গান লিখলেন না। আন্দোলন হলো না। হাহাকার হলো না। কোনো মুসলমান গোলাম রসুলকেও পাওয়া গেল না। কারণ কলকাতাকেন্দ্রিক কোনো জমিদারের ওখানে কোনো জমি ছিল না। ওখানকার জমিদাররা ভাবল কলকাতা গিয়ে বাবুদের কোঁচকানো মুখ দেখার চেয়ে গোহাটি যাওয়াই ভালো। এই তো কলোনিয়াল বাঙালির দেশ প্রেমের নমুনা!

কিন্তু এসব ছাপিয়ে একজন মানুষ বিংশ শতকের শুরুতেই বাঙালির ঐক্য প্রচেষ্টাকে সফল রূপ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বাঙালি রাজনীতিবিদদের প্রপিতামহ চিত্তরঞ্জন দাস, বুঝতে পেরেছিলেন কলকাতাকেন্দ্রিক বাবুদের সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধ ঘোড়াটিকে থামানো উচিত। ইতোমধ্যেই ১৯১১ সালে কলোনির রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি পাড়ি দিয়েছে এই ঘোড়ার তাণ্ডবে। সেই থেকে ক্রমশই খোঁড়া হয়ে যাচ্ছিল ঘোড়াটা।

কিন্তু ১৯২৫ সালে বেঙ্গল প্যাক্টের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সে প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। এরপর বাবুদের সাম্প্রদায়িকতার ঘোড়াটি তুমুল তুরঙ্গ হতে গিয়ে বেশ ক’বার আছাড় খেয়ে অচল হয়ে যায়। অতএব এই মুমূর্ষু ঘোড়াকে বহন করার জন্য চাই শূদ্র। বাঙালিদের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এবার শুরু হলো নতুন আয়োজন। যত আদিবাসী আছে, যত তফসিলি, অচ্ছুত আছে তাদের হিন্দু বলে দাগাও। ট্রাইবালদের ক্ষত্রিয় উপাধি দাও। অথচ সেই সেন আমলে যত বৌদ্ধ রাজকর্মচারী চাকরি বাঁচাতে ব্রাহ্মণ কর্তৃত্ব মানল, বর্ণাশ্রম ধর্মে যোগ দিল—হাজার বছরেও তারা একটা বর্ণ পেল না, নিরুপায় হয়ে সেই রাষ্ট্রের কায়ায় স্থীত-কায়স্থই রয়ে গেল। আর ১৯৩২ সালে বাঙালি মুসলমান ঠেকাতে বাবুদের প্রযত্নে ট্রাইবালরাও হলো ক্ষত্রীয়!


বাঙালি মুসলমানদের শোষণ করার পরিবর্তে তাদের দ্বারাই যে শাসিত হতে হবে এই নিয়তি একদমই মানতে পারে নি বাবু সমাজ। 


অন্যদিকে কলকাতায় ১৮৮৫ সালে যখন জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়, তৎকালীন পীর রশিদ গাঙ্গুলির মতো মুসলমান ধর্মনেতাদের অনুমতিতে বাঙালি মুসলমানরাও তাতে অংশ নেয়। কিন্তু ১৯২৫ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিজ্ঞতা হয়—প্রবল হিন্দু বাবু হেজিমনি তাদের বিকাশের পথ রুদ্ধ করে আছে। অসাম্প্রদায়িক কোনো বিকাশের পথ তাদের জন্য নেই। বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদরাও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে এগুতে বাধ্য হলো। তবুও ফজলুল হকের মতো কেউ কেউ জাতীয় রাজনীতিকেই ধ্যান জ্ঞান করেছেন। যদিও তা বাবু স্বার্থের অনুকূলে ছিল না। ত্রিশের দশকে ক্ষয়িষ্ণু জমিদারির অর্থনীতি, বাংলার রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থা—বাবু সমাজকে দিশেহারা করে তুলেছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর থেকেই তা আরও স্পষ্ট হয়। বাঙালি মুসলমানদের শোষণ করার পরিবর্তে তাদের দ্বারাই যে শাসিত হতে হবে এই নিয়তি একদমই মানতে পারে নি বাবু সমাজ। দর্পিত অস্তিত্ব রক্ষার নিমিত্তে আগেই তারা রাঢ়বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি করিয়েছিল নানা নামের হিন্দু মিলিট্যান্ট গ্রুপ। বাবুদের সাম্প্রদায়িকতার মুমূর্ষু ঘোড়াটি তখন সমগ্র বাঙালি হিন্দুদের কাঁধে। ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক প্রচার পত্রগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায়—মুসলমানদের নিয়ে নানা রকম গুজব ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, হেয় করা, নানা রকম প্রোপাগান্ডার বিষয়। কীর্তনে আর কে কম নাচে! বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও জোয়ার আসে সাম্প্রদায়িকতার। ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টিকে উতরে ভোটে ভাসে সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগ।

দুখের বিষয় যারা এ বাস্তবতায় কিছুটা সুরাহা নিয়ে আসতে পারতেন সেই সুভাষ বসু এবং শরৎ বসু দুজনেই ছিলেন কংগ্রেসের কাছে ব্রাত্য। ১৯৩৭ সালে জাতীয়তাবাদী নেতা ফজলুল হককে শরৎ বসুর কংগ্রেস সরকার গঠনে সমর্থন দিলে মুসলিম লীগ তার ঘাড়ে চড়ে বসতে পারত না। সে-ক্ষেত্রে মুসলিম লীগকে ক্ষমতায়ন করায় শরৎ বসুর কিছু দায় ছিল বটে। যদিও ৪৭-এ তিনি গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলেন দেশ ভাগ হবে বাঙালির চিরকালের দুঃখ এবং বিশেষ করে হিন্দুদের জন্য। তাই বিরোধিতায় এগিয়েও এসেছিলেন কিন্তু হালে পানি পান নি। অন্যদিকে সুভাষ বসুর রাজনীতি ছিল সর্বভারতীয়। যার উপযোগিতা বাংলার ক্ষেত্রে খুব একটা ছিল বলে মনে হয় না। ভারতবর্ষ একটি মহাদেশীয় খণ্ড, প্রাচীন কাল থেকেই এখানে নানা দেশ, নানান জাতির বাস। ঐতিহাসিক কালে এর বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু সাম্রাজ্যেরও জন্ম হয়েছিল। আবার ইন্ডিয়ান পরিচয়টিও প্রকৃতার্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কারাগার থেকে সৃষ্ট। দিল্লি থেকে বাংলা শাসনের নজিরও মুসলিম আমলের দেড় দুই শ বছর মাত্র। ঐতিহাসিক কালজুড়ে দিল্লি যেমন একটি রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্র—বৃহত্তর বাংলা বিহারও ছিল তাই। ফলে সুভাষের সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের চেয়ে আপন ভূমি বাংলাকেন্দ্রিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদ্যোগই সফল হতো বলে মনে হয়।

১৮৭৪ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গের সময় যে বাবু সমাজ নীরব রইল, ১৯০৫ সালের দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গের সময় সেই বাবু সমাজ নয়ন জলে ভাসল, আবার ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকে সেই বাবু সমাজই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভেঙে এক টুকরো হিন্দু বাংলা চাইল, প্রস্তাবিত ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে সমগ্র বাংলা থাক বা নাই থাক, এক টুকরো হিন্দু বাংলা চাই-ই-চাই। সেই দাবির পক্ষে সমগ্র বাঙালি হিন্দু এবং আদিবাসীদের উত্তেজিত করতে সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছিল বাবু সমাজ। ততদিনে সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছিল কিছু ভারতবর্ষীয় হিন্দু মুসলমান ব্যবসায়ী। তখন বাংলা ভাগের দাবিতে বাংলার প্রতিটি জেলা থেকে একাধিক আবেদন পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের হাই কমান্ডের কাছে, বাংলার হিন্দুরা। আজকের প্রিয়া সাহার জেলা তৎকালীন বাকেরগঞ্জ থেকে ১৪টি আবেদন পত্র পাঠানো হয়েছিল, তখন বাকেরগঞ্জ জেলার হিন্দুদের সংখ্যা ছিল ২৬ পারসেন্ট। তারা কি জানত না বাংলা ভাগ হলে তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পড়বে?

দেশ ভাগের উদ্দেশ্যে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, সেই দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় নোয়াখালীর দাঙ্গা নিয়ে বিস্তর ঐতিহ্যবাহী প্রোপাগান্ডা আজও নানাভাবে ইতিহাস বলে চালানো হয়। কত দিন? এতে কি আখেরে বিজয়ী হওয়া যায়! বিভ্রান্তি আর চালাকি রচনা করে মুক্তি লাভ করা যায় না। ১৯৪৭-এ বাঙালি মুসলমানরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চায় নি। কারণ হিন্দু হেজিমনি। ব্রিটিশ শাসনের মধ্যেই বাবু হিন্দুদের হাতে তারা যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে খোদ হিন্দুদের শাসনে কি অবস্থা হবে সেই ভেবেই থাকতে চায় নি। কিন্তু বাংলা ভাগও চায় নি। বঙ্গীয় আইন পরিষদের ভোটাভুটিতে মুসলমানরা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছিল। বিকল্প ছিল সমগ্র বাংলা পাকিস্তানের মধ্যে যাওয়া অথবা স্বাধীন বাংলা ডমিন হওয়া।

কিন্তু সেদিন আইন পরিষদে বাঙালি হিন্দুরা বাংলা ভেঙে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের পক্ষেই ভোট দিয়েছিল। বাংলায় শিল্প সমৃদ্ধ পশ্চিম টুকরোটি হলো পশ্চিমবঙ্গ, যোগ দিল ভারতে। অন্যদিকে একটি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, একটি কেরু নামক মদ কোম্পানিসহ বাকি বাংলাদেশ হলো পাকিস্তানের অংশ। ঘটল ইতিহাসের হৃদয়-বিদারক প্রত্যাবাসন। সাম্প্রদায়িক সীমান্ত পাড়ি দিল কোটি কোটি মানুষ। পূর্ববঙ্গ থেকে গেল লক্ষ লক্ষ আবার এলও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিহার থেকে। কিন্তু এ বিষয়ে বেদনার গল্প চাউর হয় শুধু বাঙালি হিন্দুদের। এপারে যারা এসেছে তাদের নিয়ে কোনো প্রচার প্রোপাগান্ডার আওয়াজ নেই। অথচ এসেছে স্ট্রাগল করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বাংলাদেশের পুরো বর্ডার লাইন ধরে খুঁজলে হেন কোনো জেলা নেই যেখানে এই হাজার হাজার রিফুজি পরিবারের বসতি হয় নি।

মুসলমান নেতারা ভেবেছিলেন পাকিস্তানের মধ্যে গেলে একদিন না একদিন স্বাধীন হওয়ার সুযোগ আসবেই কিন্তু ভারতে বিলুপ্ত হলে সে আশার গুড়েবালি। অতএব পাকিস্তানে যোগ দেয়াই শ্রেয়। এর ফলও মিলল। অবদমিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ৪৭-এর পরপরই জেগে উঠতে থাকে পূর্ব বঙ্গে। ভাষার প্রশ্নে তা বিস্ফারিত হয়। যেন এক মহাকাব্যিক উত্থানের চিৎকার।

৪৭-এ দেশ ভাগের পর দু’এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে স্বাবলম্বী এবং বর্ণ হিন্দুদের প্রায় পুরোটাই ভারতে চলে যায়। ৪৭-এ বাঙালি মুসলমানরা যে মানচিত্রটুকু পেল অচিরেই তা হয়ে উঠল পাকিস্তানের কলোনি। এতদিন ধর্মীয় আগ্রাসন থেকে রেহাই পেতে যে পাকিস্তানে যোগ দিল সেখানে বাঙালি মুসলমানরা পড়ল পাঞ্জাবিদের জাতিগত আগ্রাসনের মুখে। পূর্ববঙ্গের হিন্দু মুসলমান সবার উপরই সেই আগ্রাসন ছিল সমান। নমুদের নেতা যোগেন মণ্ডল পালিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নিলেন কিন্তু শেখ মুজিবরা যাবে কই! অতএব তাদের স্থান হলো জেলে। কত রক্তনদী পেরিয়ে একটি বাংলাদেশের জন্ম হতে পারে সে ইতিহাস বোধ করি সকলেরই জানা।

তবে যে জাতি সাম্প্রদায়িক তাড়নায় নিজ দেশকে ভাগ করে তারা হয় অভিশপ্ত। ৭১-এ বাঙালি মুসলমানদের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে কিন্তু হিন্দুদের? এটা বোধহয় দীর্ঘ হবে।


২৮ ভাগ বাঙালি মুসলমানকে পায়ের তলেই রেখেছ, সরকারি চাকরিতে ২ পার্সেন্টও সুযোগ দাও নি। 


যাই হোক, ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের গ্রাউন্ড রিয়েলিটিটা তৈরি হয়েছিল প্রায় দেড় শ বছর ধরে। এক অপকর্ম আরও একটি বড় অপকর্মের জন্ম দিয়ে গেছে দীর্ঘদিন। বিদেশি লুটেরাদের সহযোগী হয়ে যারা দু’টাকার মালিক হলো, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর সেই অকামের পয়সায় কিনল জমিদারি, হঠাৎ ভূমিহীন বিদ্রোহী কৃষক দমনে এল সাম্প্রদায়িক বিভাজন, জন্ম হলো বিভাজনের সংস্কৃতি, বিষাক্ত হলো ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাহিত্য। শত বছর দাবড়ে বেড়াল সাম্প্রদায়িকতার ঘোড়া। ৪৭-এর আগেই সেই ঘোড়ার মৃত্যু হলো। কিন্তু বাবুরা ততদিনে সেই মৃত ঘোড়াকে পবিত্র জ্ঞান করিয়ে তুলে দিল সমস্ত বাঙালি হিন্দু সমাজের কাঁধে। দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে কলোনিয়াল কলকাতায় কবর হলো সেই ঘোড়ার। কিন্তু কী বিস্ময়কর ব্যাপার! এখনও সেই মৃত ঘোড়ার ভৌতিক আওয়াজ ওঠে বাঙালি হিন্দু মানসে। যদি সে কোনো প্রকারে বাঙালি মুসলমানকে শত্রু মনে করার সুযোগ পায়, তখনই যেন মনের ভেতর আধ্যাত্মিক শক্তিতে ডেকে ওঠে সেই মৃত ঘোড়ার আত্মা। বাঙালি হিন্দু জেগে ওঠে বাঙালি মুসলমানের বিরুদ্ধে অথচ কোনো গুজরাটি, মারাঠি, উত্তর প্রদেশি বা পাঞ্জাবি লোকের সামনে সে বড় ম্রিয়মাণ।

কেন ভাই! সেই দেশ তো নেই! ভাগ হয়ে গেছে কত আগে। তুমি আজ এক সাম্রাজ্যের প্রান্ত সীমার নাগরিক, আলাদা কোনো পরিচয় নেই, সাম্রাজ্যের পরিচয়ই তোমার পরিচয়। আবার পূর্ব বঙ্গের লোকেরাও এখন আলাদা দেশের নাগরিক। দু’দলের মাঝখানে স্রেফ কাঁটাতারের ব্যবধান নয়—এক সার্বভৌমত্ব প্রমাণ দূরত্ব। বিদেশি হিসেবে একজন বাংলাদেশের মানুষকে একজন মারওয়ারি, তামিল বা পাঞ্জাবি আজ যেভাবে সহজে নেয় তুমি কেন নিতে পারছো না; কেন তোমার মুখে ভেসে ওঠে আজও শত্রুর মুখ! যে বাংলাদেশি হিন্দুকে নিয়ে তুমি প্রোপাগান্ডায় মুখর হও—তারা তো এখানকারই দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষ ছিল, এদেশই তাদের শিক্ষিত করেছে, স্বাবলম্বী করেছে। দশ ভাগ হিন্দুকে তেত্রিশ ভাগ চাকরি দিয়েছে। অথচ তোমার পশ্চিমবঙ্গে প্রগতিশীল বাম শাসনও ছিল ৩০ বছর, সেখানকার ২৮ ভাগ বাঙালি মুসলমানকে পায়ের তলেই রেখেছ, সরকারি চাকরিতে ২ পার্সেন্টও সুযোগ দাও নি। এই তো অসাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডাবাজির নমুনা। আবার তোমার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বর্ণহিন্দুদের এত কেন নেইম প্লেট! কেন ছোটলোক হিন্দুদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল! অথচ বাংলাদেশের সচিবালয়ে ঢুকলে দেখা যায় উল্ট চিত্র। অর্থাৎ বাংলাদেশের হিন্দুটি একান্তই বাংলাদেশের লোক। তাকে এদেশে থাকতে হবে সংখ্যাগুরু বাঙালি মুসলমানদের সাথেই। তবে তার জন্য কেন তোমাদের এত মায়া কান্না! নগর কলকাতা এখন আর সেই কলোনির শাসন কেন্দ্র নয়, সেই স্মৃতির কবরস্থান মাত্র। তবে কেন আজও তোমাদের কণ্ঠে ডেকে ওঠে সেই সাম্প্রদায়িকতার মৃত ঘোড়া! বিভাজনের এতকাল পরেও কি জেগে ওঠে না—জাতিগত ভ্রাতৃত্ব বোধ?

রাজু আহমেদ মামুন

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৪; তালতলী, বরগুনা। এমএসএস, সমাজ বিজ্ঞান। পেশায় সাংবাদিক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক ধাবমান।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
দহন সংক্রান্তির কবিতা [ম্যাগনাম ওপাস, ২০০৬]
ওঁ নিরর্থকতা ওঁ গতিশাশ্বত [বলাকা, ২০০৮]
ম্যানগ্রোভ মন [কাগজ প্রকাশন, ২০১৭]

ই-মেইল : razumamun@gmail.com