হোম গদ্য কলকাতার উত্থান : বসন্তকালীন দুর্গাপূজার শারদীয় রূপ

কলকাতার উত্থান : বসন্তকালীন দুর্গাপূজার শারদীয় রূপ

কলকাতার উত্থান : বসন্তকালীন দুর্গাপূজার শারদীয় রূপ
1.01K
0
ইংরেজ শাসনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ধারণাতীত সাফল্য বয়ে এনেছিল। তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে চরম আক্রোশ নিয়ে লড়াই করছিল বাংলার নির্যাতিত কৃষকরা। [মুসলমান মাত্রই রানির বিদ্রোহী প্রজা হিশেবে চিহ্নিত] মহীশূরের টিপু সুলতানের মরণপণ আজাদি-লড়াইয়ের ফলে ইংরেজ শাসকের যখন হৃৎকম্প উপস্থিত, তখন কলকাতার সদ্য-বিকশিত শ্রেণিটি প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণার মাধ্যমে প্রভুর শক্তি বৃদ্ধিতে মদত দিচ্ছিল। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে চক্রান্ত করে পরাজিত করার পর শুরু হলো কলকাতার সুযোগসন্ধানী কিছু হিন্দুর সাথে ইংরেজদের হিন্দুস্তান শাসন। পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের ব্রিটিশপ্রেম সর্বজন স্বীকৃত। ব্রিটিশদের তারা আশীর্বাদ-রূপে গ্রহণ করেছিল, যার পরিণতি স্বরূপ ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্তানকে ভোগ করতে হয়েছিল দুইশ বছরের গোলামির শাসন। আজও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা কেরানি-মনোবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারে নি। তারা এখন অবাঙালি প্রভু দ্বারা শাসিত। ব্রিটিশ জমিদারি বন্দোবস্ত ও রাজস্ব আদায়ের নতুন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ব্যক্তিগত অবৈধ বাণিজ্যে প্রচুর মুনাফা লুণ্ঠন করে এবং আরো নানা উপায়ে উৎকোচ ও উপঢৌকন নিয়ে চার্নব, হেজেস, ক্লাইভ, হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিসের আমলের কোম্পানির কর্মচারীরা যে পরিমাণ বিত্ত সঞ্চার করেছিলেন তা কল্পনা করা যায় না। দেখতে দেখতে প্রচুর অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে কোম্পানির সাহেবরা সত্যি সত্যি নবাব বনে গেলেন। তাদের মেজাজ চাল-চলন দিনে দিনে নবাবের মতো হয়ে উঠতে লাগল।

বাংলাদেশের হাজার বছরের শিল্পের গৌরব মাত্র পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে অবিশ্বাস্য কল্পকাহিনিতে পরিণত হলো। 


‘হঠাৎ নবাব’ এই ইংরেজ কর্মচারীরা এদেশে এসেছিল বার্ষিক পাঁচ দশ পনের কিংবা পঁচিশ পাউন্ড বেতনের রাইটার, ফ্যাক্টর, জুনিয়র মার্চেন্ট বা সেমি মার্চেন্ট হিশাবে। ‘সোফার’ শ্রেণির এই ইংরেজ কর্মচারীরাই স্বনামে বেনামে বাণিজ্যের নামে লুণ্ঠন, শোষণ করে কাড়ি কাড়ি টাকা পাচার করে নিজ দেশে ‘কিংবদন্তি রাজপুত্তর’ উপাধি অর্জন করেছিল। কোম্পানির ‘দস্তখত’ অপব্যবহার করে পাঁচ পাউন্ড বেতনের কর্মচারীরা এদেশে মুৎসুদ্দি-অর্থলগ্নকারীর মূলধনে বছরের পর বছর লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করেছিল। তার উপর ছিল নানা প্রকার ঘুষ ও উপঢৌকন। এদের ব্যবসায়িক লুণ্ঠনের প্রধান অবলম্বন এদেশীয় বেনিয়া, মুৎসুদ্দি, গোমস্তা, দালাল ও ফড়িয়ারা। তাঁতি আর কামার শ্রেণির গরিব উৎপাদকের কাছ থেকে টাকা লুট করেও তারা বারা তুলে দিত এসব ইংরেজ কর্মচারীর হাতে। এভাবেই কোম্পানির পাঁচ পাউন্ড বেতনের কেরানি হয়ে ১৭৫০ সালে ওয়ারেন হেস্টিং চৌদ্দ বছর পর দেশে ফিরেছিলেন ত্রিশ হাজার পাউন্ড সাথে নিয়ে। এরপর দ্বিতীয় দফায় গভর্নর জেনারেল-রূপে যখন তার প্রত্যাবর্তন ঘটে—বাণিজ্য থেকে সাম্রাজ্য রূপান্তরের তখন তিনিই প্রকৃত প্রতিনিধি।

এভাবেই স্বল্প বেতনভুক বণিক নাবিক আর সোফার ইংরেজ কর্মচারীরা ‘বেঙল নেইবার’-এ পরিণত হলো। আর তাদের এ দেশীয় লুণ্ঠন-সহচর দেওয়ান বেনিয়া-মুৎসুদ্দিরা দালালির মাহাত্ম্যে রাতারাতি পরিণত হলো রাজা মহারাজা। এই সম্মিলিত লুটেরা চক্রটির সম্পর্কে ডক্টর আহমেদ শরীফ লিখেছিলেন :

‘প্রথমে কলকাতার ইংরেজ কোম্পানির আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে কতগুলো ভাগ্যবিতাড়িত দুষ্টু চরিত্রভ্রষ্ট, ধূর্ত, পলাতক অল্প শিক্ষিত লোক বেনিয়া, মুৎসুদ্দি, গোমস্তা, কেরানি, ফড়িয়া দালালরূপে অবাধে অঢেল অজস্র কাঁচা টাকার অর্জন ও সঞ্চয়ে দেদার সুযোগ পেয়ে ইংরেজদের উপস্থিত ভগবানের আশীর্বাদরূপে জানল ও মানল।’

পলাশীর বিপর্যয়ের ফলে এই দাওবাজ মাস্তান শ্রেণির লোকরাই হলো ‘ভাগ্যবিধাতা’। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের দেওয়ানি লাভের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য  চলে গেল সম্মিলিত লুটেরা চক্রের একক কর্তৃত্বে। তাদের হাতে বাংলাদেশের হাজার বছরের শিল্পের গৌরব মাত্র পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে অবিশ্বাস্য কল্পকাহিনিতে পরিণত হলো। ইংরেজ-সৃষ্ট শুল্ক-পরিশোধ নীতির ফলে এ দেশে বিশ্বখ্যাত সুতি বস্ত্র, রেশম বস্ত্র, শিল্প ধ্বংস হয়ে গেল। কুটির শিল্প হলো বিপর্যস্ত। আগে বাংলাদেশের কাপড় বিলাতসহ বহুদেশে রপ্তানি হতো। এরপর ম্যাঞ্চেস্টারের বস্ত্র আমাদের বাজার দখল করল।


কলকাতার অবাক উত্থান, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে অন্ধকার :


পলাশীর বিপর্যয়ের পর বাংলার প্রধান শিল্পনগরী ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে দ্রুত ঘনিয়ে এল অন্ধকার। জনগণ শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল। এসব শহরের জনসংখ্যা কমেছিল দ্রুত আর অন্যদিকে কলকাতায় চলছিল সমৃদ্ধির জোয়ার।। লুটেরা কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য আর তাদের লুণ্ঠনবৃত্তির জুনিয়র পার্টনার এদেশীয় দেওয়ান, বেনিয়ান, গোমস্তাদের উদ্যোগে তখন সুতনটি, গোবিন্দপুর, কলকাতা চিৎপুর, চক্রবেড়ি গ্রামগুলোর ধানক্ষেত ও কলাবাগানের ভিতর থেকে দ্রুত বেড়ে উঠেছিল টাউন কলকাতা। কলকাতার এই উত্থান সম্পর্কে নারায়ণ দত্ত লিখেছেন, ‘জন্মের সেই পরম লগ্নের কলকাতা অস্বাস্থ্যকর জলাভূমির মানুষ—এক অসুস্থ ষড়যন্ত্রের চাপা ফিসফিসানিই তাদের একমাত্র আলাপের ভাষা।’ কাদের নিয়ে জাগল কলকাতা? এরা কারা? এই প্রসঙ্গে আব্দুল মওদুদ লিখেছেন : ‌’আঠারো শতকের মধ্যভাগে কলকাতা ছিল নিঃসন্দেহে বেনিয়াদের শহর। যত দালাল মুৎসুদ্দি বেনিয়া ও দেওয়ান ইংরেজদের বাণিজ্যিক কাজকর্মের মধ্যবর্তী দল। এই শ্রেণির লোকেরাই কলকাতায় সংগঠিত হয়েছিল ইংরেজদের অনুগ্রহপুষ্ট ও বশংবদ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিশাবে।’


কলকাতার বাবুজাগরণ :


কলকাতার লেখক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজদের সাথে যুদ্ধরত সিরাজ-উদ-দৌলাকে ‘অসুর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রাচীনকালে আমাদের পূর্বপুরুষ বঙ্গ-দ্রাবিড়গণ হানাদার আর্যদের আগ্রাসন দীর্ঘদিন পর্যন্ত রুখে দিতে সক্ষম হয়েছিল। বঙ্গ-দ্রাবিড়দের কাছে বারবার পর্যুদস্ত হয়েই আর্যরা এই এলাকার জনগোষ্ঠীকে অভিহিত করেছিল ‘অসুর’ নামে। আর্যরা দেবতা আর দ্রাবিড়গণ অসুর। এই অসুর পরিচয়ে আমাদের পূর্বপুরুষগণ দীর্ঘদিন আর্যদের কাছে পরিচিতি হয়েছেন। সেই ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই প্রাচীন আর্যদের অধস্তন পুরুষ ভবানীচরণ বাংলার নতুন যুগের প্রতিরোধ সংগ্রামের বীর নায়ক নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ‘অসুর’ আখ্যায়িত করেন। তাদের চোখে পলাশীর ‘দেবতা’ হলো ইংরেজ। ভবানীচরণ সিরাজকে অসুর বলেই থেমে যান নাই। মুখের কথার সাথে বাস্তব কাজের নমুনাও পেশ করেন। পলাশীযুদ্ধের কদিন পরই দেবসুর সাম্রাজ্যের উপজীব্য করে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। এর আগে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল না। শ্রী রাধারমণ রায় ‌’কলকাতায় দুর্গোৎসব’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘দুর্গাপূজা পলাশীর যুদ্ধের বিজয়োৎসব হিশাবেই ১৭৫৭ সালে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় নদীয়া ও কলকাতায়। এই উৎসবের আসল উদ্দেশ্য ছিল পলাশীর বিজয়ী লর্ড ক্লাইভের সংবর্ধনা।’


১৭৫৭ সালেই তারা বহু টাকা খরচ করে শরৎকালীন দুর্গাপূজার মাধ্যমে পলাশীর যুদ্ধের বিজয় উৎসব পালন করলেন।


নারায়ণ দত্ত লিখেছেন, ‘১৭৫৭ সালের ১৩ জুন পলাশীর রণাঙ্গনে মীর জাফরের বেইমানির দরুন ইংরেজ ক্লাইভের হাতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ে সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হয়েছিল নদীয়ার কৃঞ্চচন্দ্র আর কলকাতায় নবকৃষ্ণ। কোম্পানির জয়কে তারা হিন্দুদের জয় বলে মনে করলেন। ধূর্ত লর্ড ক্লাইভও তাদের সে-রকম বোঝালেন। ক্লাইভের পরামর্শেই তারা পলাশীর যুদ্ধের বিজয় উৎসব করার আয়োজন করলেন।

বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে তারা পিছিয়ে আনলেন শরৎকালে। ১৭৫৭ সালেই তারা বহু টাকা খরচ করে শরৎকালীন দুর্গাপূজার মাধ্যমে পলাশীর যুদ্ধের বিজয় উৎসব পালন করলেন। এরপর ফি বছর শরৎকালে দুর্গাপূজা করে তারা পলাশীর যুদ্ধের স্মারক উৎসব পালন করেছেন। অন্যান্য হিন্দু জমিদার ও ব্যবসায়ীদেরও তা পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। শোনা যায়, শরৎকালীন দুর্গাপূজা যে বছর প্রবর্তিত হয়েছিল, সেই ১৭৫৭ সালেই লক্ষাধিক টাকা পেরেছিলেন ক্লাইভের প্রত্যক্ষ কৃপায়। আগে এদেশে বসন্তকালে চালু ছিল দুর্গাপূজা আর শরৎকালে চালু ছিল নবপত্রিকা পূজা।

দুর্গাপূজার সাথে জড়িত ছিল মূর্তির ব্যাপার আর নবপত্রিকার সাথে জড়িত ছিল নয়টি উদ্ভিদের ব্যাপার। পরে এই দুটি ব্যাপারকে গুলিয়ে একাকার করে ফেলা হয়ছে। ১৭৫৭ নবপত্রিকা হয়েছিল দুর্গাপূজা। শরৎকালে দুর্গা বোধনের দরকার হয়—তাহলে দাঁড়াল ১৭৫৭ পলাশীর বিজয়োৎসব পালন করার জন্য বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে শরৎকালে নিয়ে এসে নবপত্রিকার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই কাজ করেছিলেন নদীয়ার কৃঞ্চ চন্দ্র ও কলকাতার নবকৃষ্ণ। তাদের উৎসাহিত করেছিলেন লর্ড ক্লাইভ। ক্লাইভ যে উৎসাহ দিয়েছিলেন তার প্রমাণ—নবকৃষ্ণের বাড়িতে ক্লাইভসহ তার পরিষদের উপস্থিতি। নবকৃষ্ণের ঠাকুর দালানটি তৈরি হয়েছিল ১৭৫৭ সালে। খুবই তড়িঘড়ি করে কাজটি করা হয়েছিল। দুর্গাপূজার চাইতে ক্লাইভকে তুষ্ট করা ছিল নবকৃষ্ণের বড় কাজ। তাই উঠোনের একপাশে হয়েছিল ঠাকুর দালান অন্যপাশে নাচ ঘর।

তিনি ভালো করেই জানতেন সাচ্চা সাহেব ক্লাইভ ধর্মে খ্রিস্টান। মনে মনে মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী। অতএব স্রেফ দুর্গা ঠাকুর দেখিয়ে ক্লাইভের মন ভরানো যাবে না। এটা তিনি বুঝেছিলেন তাই তিনি ক্লাইভের জন্য বাঈজি নাচ, মদ ও মাংসের ব্যবস্থা করেছিলেন। নবকৃষ্ণের কাছে দুর্গা ঠাকুর ছিলেন উপলক্ষ। ক্লাইভ ঠাকুর ছিলেন আসল লক্ষ্য। দুর্গাপূজার নামে তিনি ক্লাইভ পূজা করতে চেয়েছিলেন। পলাশীতে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ে এই উৎসব কেন? এই বিজয় কার বিজয়? তার জবাব ভবানীচরণের জবানিতেই পাওয়া যায়। তার মতে, পলাশীর লডাইয়ের ফলে উঠে এসেছে ‘অমৃত’ আর ‘বিষাদের হলাহল’ হর্ষের অমৃত পান করে কলকাতা হয়েছে ‘নিরুপমা ও সর্বদেশ মাতা’। কিন্তু বিষাদের হলাহল কার ভাগ্যে জুটল, সে-কথা কিছুই বলেন নি ভবানীচরণ। দেবাসুর সংগ্রামের বিষাদের হলাহল গিলতে হয়েছিল ঢাকা আর মুর্শিদাবাদকে। ভবানীচরণ লিখেছেন : ‘ধার্মিক ও ধর্মাবতার, ধর্ম-প্রবর্তক, দুষ্টু নিবারক সৎ প্রজাপালন, সদ্বিবেচক ইংরেজ কোম্পানি বাহাদুর।’

এই দেশের লোকদের অধিক ধনি হওয়ার অনেক পন্থা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, ইংরেজ তাই দেবতা। ক্লাইভ মা দুর্গার প্রতীক। এই দেবতাপূজার মাধ্যমেই পলাশী-উত্তর কলকাতাকে কেন্দ্র করে রাতারাতি একটি লুটেরা শ্রেণি পরিণত হয়েছিল রাজা-মহারাজায়। ভারত সরকারের জাতীয় মহাফেজখানার ১৮৩৯ সালের সরকারি নথিপত্র থেকে গবেষক বিনয় ঘোষ ‘সেকালের কলকাতার শ্রেষ্ঠ ভাগ্যবানদের কচড়া’ নামক বইতে এদের ফিরিস্তি দিয়েছেন। এই পরিবারগুলো শহর কলকাতার প্রাতঃকালীন গাত্রোত্থানের সাথে যুক্ত। তাদের কয়েকজন হলেন : ১) মীর জাফরের নবাবী আমলের ক্লাইভের দেওয়ান নবকৃষ্ণের পুত্র মহারাজা রামকৃষ্ণ বাহাদুর ২) নবকৃষ্ণের ভাতিজা বাবু গোপীমোহন ৩) কর্নেল ক্লাইভের বেনিয়ান লক্ষ্মীকান্ত ধরের উত্তর পুরুষ রাজা রামচন্দ্র রায় ৪) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুণ্ঠন-বৃত্তির কুখ্যাত সহযোগী মল্লিক পরিবার ৫) ওয়ারেন হেস্টিংস-এর রাজস্ব বোর্ডের দেওয়ান গঙ্গা গোবিন্দের নাতি বাবু শ্রী নারায়ন সিংহ ৬) গভর্নর ভান্সিটর্ট ও জেনারেল স্মিতের দেওয়ান রামচরণ রায়ের উত্তর-পুরুষ আন্দুনর রায় বংশ ৭) ভেরলস্ট প্রতিষ্ঠিত খিদিরপুরের গোকুল পরিবার ৮) হুইলার সাহেবের দেওয়ান দর্পনারায়ণ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর পরিবার ৯) ঠাকুর পরিবারের জুনিয়র ব্রাঞ্চ বা ‘নবীন শাখা’ নামে পরিচিত এবং কোম্পানি সরকারের এজেন্ট, পরবর্তীকালে ২৪ পরগনার কালেক্টর ও নিমক এজেন্টের সেরেস্তাদার থেকে নিমক মহলের দেওয়ান ও স্বল্পকালীন কাস্টমস ও সল্ট-ওপিয়াম বোর্ডের দেওয়ান দ্বারকানাথ ঠাকুরের (জন্ম ১৭৯৪) পরিবার। কার ট্যাগোর অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা দ্বারকানাথের প্রভাব-প্রতিপত্তির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তার সমসাময়িক কালে ছিল না। ১০) সুতানুটি বাজারের প্রতিষ্ঠাতা সেট পরিবার ১১) মেসার্স ফোরলান অ্যান্ড কোং-এর দেওয়ান রাম দুলাল দে ১২) ভুলুয়া (নোয়াখালি) ও চট্টগ্রামের নিমক মহলের এজেন্ট হ্যারিস সাহেবের দেওয়ান রামহরি বিশ্বাস ১৩) পাটনার চিফ দেওয়ান মিডলটন ও স্যার টমাস বামবোনড সাহেবের দেওয়ান শান্তিরাম সিং তার প্রতিষ্ঠিত জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার ১৪) কোম্পানির আমলের কলকাতার দেওয়ান গোবিন্দ বাজারের পরিবার ১৫) মুকারটুলির মিত্র পরিবার ১৬) কোম্পানির ঠিকাদার গোকুল মিত্রের পরিবার ১৭) পামার ব্রাহ্মণ ব্যানার্জি পরিবার ১৮) পাল চৌধুরী পরিবার ১৯) কুলীন ব্রাহ্মণ ব্যানার্জি পরিবার ২০) ওয়ারেন হেস্টিংস সরকার রাজলোচনের প্রতিষ্ঠিত পাথুরিঘাটার ঘোষ পরিবার ২১) ক্লাইভের দেওয়ান কাশীনাথের পরিবার ২২) কোম্পানির হুগলির দেওয়ান শ্যামবাজারের বসু পরিবার ২৩) কোম্পানি সৈন্যদের রসদ সরবরাহের ঠিকাদার ও কয়েকজন ইউরোপীয় ব্যবসায়ীর দেওয়ান এবং মুর হিকি অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মতিলাল শীলের প্রতিষ্ঠাতা নুটোলার শীল পরিবার ২৪) এককালের লবণের গোলের মুহর বিশ্বনাথ মতিলালের পরিবার ২৫) ঠনঠনিয়ার ঘোষ পরিবার ২৬) মেসার্স ডেভিসন অ্যান্ড কোম্পানির এক কালের কেরানি রসময় দত্তের প্রতিষ্ঠিত বাগবাগানের দত্ত পরিবার ২৭) প্রতিষ্ঠিত কমার্শিয়াল রেসিডেন্টের দেওয়ান বনমালি সরকারের প্রতিষ্ঠিত কুমারটুলির সরকার পরিবার ২৮) আফিমের এজেন্ট হ্যাবিসনের দেওয়ান দুর্গাচরণ মুখার্জির প্রতিষ্ঠিত বাগবাজারের মুখার্জি পরিবার ২৯) বেনিয়ান রামচন্দ্র মিত্রের পরিবার ৩০) বিভিন্ন বিলাতি কোম্পানির সাথে যুক্ত গঙ্গাধর মিত্রের প্রতিষ্ঠিত নিমতলার মিত্র পরিবার [টাউন কলকাতার কচড়া, পৃষ্ঠা ৭৭-৮] । কলকাতার এই অভিজাত পরিবার সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, ‘কেউ বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়ে, কেউ সর্দার-পোদ্দারি করে, কেউ দাদনি বণিক ও দালাল হয়ে, কেউ বেনিয়ানি করে, কেউ-বা ঠিকাদারি করে ও স্বাধীন ব্যবসা বাণিজ্য করে কলকাতার নতুন শহুরে সমাজের নতুন বড়লোক হয়েছিল।


হিন্দু-মুসলমানের এমন অমানবিক সম্পর্ক বৃটিশজাত সৃষ্টি করে গেছে যে, মানুষের অন্তরে বিভেদের লেলিহান আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে।


সেকালের নবাবী আমলের বড়লোকরা নবযুগের সামাজিক রাজনৈতিক বিপর্যয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল বলা যায়। কোম্পানির আমলে যারা নতুন বড়লোক হলেন, তাদেরকে একপুরুষের বড়লোক বলা যায়। উপরের তালিকায় একপুরুষের বড়লোকদের ত্রিশ পরিবারের সবকটি বাঙালি হিন্দু। তাদের অধিকাংশই উচ্চ বর্ণজাত। মুসলিম শাসনের অব্যবহিত পরের এ তালিকা। অথচ এতে একটিও মুসলিম পরিবারের নাম নেই। এখানেও চিরায়ত ঐতিহ্যের বিব্রতকর অনুশীলনে পাল, সেন, তুর্কি, পাঠান, মোগল শাসনামলে সকল উত্থান-পতনের রাজনৈতিক বিবর্তনে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ—উচ্চবর্ণের হিন্দুর এই সম্মিলন-শক্তিই শাসন-যন্ত্রের ছত্রছায়ায় তৈরি করেছিল ঔপনিবেশিক সমাজ, একটানা প্রাধান্য বজায় রেখেই। ব্রিটিশরাজ ক্ষমতা দখলের আগে এই দেশটি যে সোনার দেশ ছিল তা কিন্তু নয়, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান মিলেই বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা ভাগ করেছিল। মুর্শিদাবাদ না হয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী যদি ঢাকা হতো, তাহলে মনে হয় না ব্রিটিশ বেনিয়া তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পালে হাওয়া এত ত্বরিত গতিতে বইত। মোক্ষম স্থানে তারা বন্দুকযুদ্ধ অনায়াসে সমাপ্ত করতে পারঙ্গমতা অর্জন করেছিল। ইংরেজরা এসে বাঙালিকে তথা ভারতবাসীকে শিক্ষিত করল। যেন এর আগে হিন্দুস্তানীরা অশিক্ষিত জাতি ছিল। অথচ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করেও পৃথিবীতে মহান জাতিসমূহের বিকাশ হয়েছে।

আমাদের ভারতবর্ষে রাজভাষা ছিল ফার্সি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আরবি-ফার্সি-সংস্কৃত ভাষায় পৃথিবীর সকল জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষা লাভ হতো। বাংলা ভাষা অপরিহার্যভাবে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতো। হয়তো এখন যে বাংলা চর্চা হয় তার চেয়ে আরো সমৃদ্ধ বাংলা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করে নিতাম। আমাদের ভাষার মালিক আমরাই থাকতাম। কারো কাছে ঋণী হয়ে থাকতাম না। হিন্দু-মুসলমানের এমন অমানবিক সম্পর্ক ব্রিটিশ জাত সৃষ্টি করে গেছে যে, মানুষের অন্তরে বিভেদের লেলিহান আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে—যার দায়ভার গ্রহণ করতে হবে তাদেরকেও, যারা ইংরেজদের হাতকে শক্তিশালী করতে সমিধ জোগান দিয়ে গেছেন, যাদের আত্মসম্মানবোধ লোপ পেয়েছিল। চতুর ব্রিটিশ ক্ষমতা ছাড়ার আগে বাঙালিকে ফেলে গেছে ব্যাক টু দ্য পেভিলিয়ানে। বাবুরা হেনকালে চিন্তা করে নাই মুসলমানদের কথা। মুসলমান জাতি কয়েক পুরুষ ধরে ভারতবর্ষে তার নিজভূমিতেই ছিল। তাদের থেকে ভারতবর্ষ গ্রহণ করেছে অনেক। ভারতবাসী নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে বহুমুখী ধারায়। সাম্য, ভালোবাসা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে তারা দেশ শাসন করতো। নিষ্ঠুর ব্রিটিশ হিন্দুস্তানের শেষ বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরের ছয় পুত্রের কর্তিত মস্তক বাদশাহর সামনে পেশ করে। তবুও তিনি আত্মসমর্পণ করেন নি। সুদূর রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেয় বাদশাহকে ব্রিটিশরাজ।

আজও মানুষ বাহাদুর শাহ জাফরের শায়েরি পড়ে চোখের জল ফেলে। একেই বলে দেশপ্রেম। তারা ধর্মের মোড়কে ভারতবর্ষ শাসন করেন নি। ব্রিটিশদের দেশ এই ভারতবর্ষ ছিল না। তারা শোষণ এবং লুণ্ঠন করেছে। দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন ছোট করেছে আমাদের মনকে। মানুষ এখনো কলোনিয়াল মানসিকতার ঊর্ধ্বে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে নি। আজও তাই গোরা লোকের পূজা করতেই ভালোবাসে তারা। ব্রিটিশদের গড়া কলকাতা নেই তবু বাঙালির হাতে। অবাঙালি ভারতীয়দের নিচে পিষ্ট আজ ব্রিটিশ-অনুরক্ত কলকাতার বাঙালি।

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman