হোম গদ্য কবি ফররুখ আহমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ

কবি ফররুখ আহমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ

কবি ফররুখ আহমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ
623
0

১.
কবি ফররুখ আহমদকে বাংলাদেশের বিতর্কবহুল সাম্প্রদায়িক দল ‘জামায়াতে ইসলামী’র কবি মনে করা হয় এবং তারাও কবিকে তাদের ‘দলীয় কবি’ হিসেবেই জনসমাজে তুলে ধরেন। এজন্য আমাদের প্রগতিশীল সাহিত্যের আসরে তাঁর আলোচনা অনেকাংশে কম। কিন্তু উক্ত তথাকথিত ইসলামি দলের দর্শন বা চিন্তাচেতনার সাথেই কেবল ফররুখ আহমদের কিছু দর্শন বা চিন্তাচেতনা সাদৃশ্যপূর্ণ; ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরিই তাদের বৈসাদৃশ্য। উক্ত দলের ধর্মীয় আদর্শ, দৃষ্টিকোণ, ভাবাবেগ সবকিছুর সাথে ফররুখ আহমদের বৈসাদৃশ্য মোটা দাগে চিহ্নিত—অর্থাৎ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের ঠিক বিপরীত আদর্শে আদর্শবান, বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ব্যক্তি ফররুখ আহমদের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক আদর্শ যথার্থরূপে বিশ্লেষণ করাই আলোচ্য প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।

অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন: “একবার আমরা কয়েকজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে একটি তরুণের প্রতি ক্ষুব্ধ হতে দেখি। রাজশাহীর তরুণটি তাঁর সাত সাগরের মাঝি পড়ে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে এবং কাব্য সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে কিছু অজানা বিষয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় আসে। ফররুখ নিজের প্রশংসা শোনা পছন্দ করতেন না। ছেলেটির প্রশংসা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো কিছু আলোচনা করতেই অস্বীকার করলেন। হতাশ হয়ে ছেলেটি চলে যায়। আমরা ফররুখের ঘরে ঢুকে দেখি তিনি রাগে ফুঁসছেন এবং বললেন, “আমি এ-সব সস্তা প্রশংসা শোনা পছন্দ করি না। আমি এ-ধরনের প্রশংসার জন্য কলম ধরি নি। আমি লিখেছি আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে। কোনো মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা পাওয়া তো আমার কাম্য নয়।” [ফররুখ আহমদ ব্যক্তি ও কবি : শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮৩, ৪১ পৃষ্ঠা]—এই যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে, সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির নিমিত্তে কবিতা লেখার অঙ্গীকার তা কি ফররুখ আহমদের সাহিত্য-জীবনের শুরু থেকেই ছিল? নাকি কোনো মাধ্যমে তিনি এ অঙ্গীকার অর্জন করেছেন?

কবিতনয়া সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু ‘আব্বাকে যেমন দেখেছি’ স্মৃতিচারণে বলেছেন, “প্রথম জীবনে আব্বা ছিলেন উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত মানবতাবাদী কমরেড এম. এন. রায়ের শিষ্য।” [প্রাগুক্ত, ২৪৮ পৃষ্ঠা] উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে যাদের জানাশোনা আছে তাদের কাছে কমরেড এম. এন. রায় একেবারেই পরিচিত মুখ—তিনি ছিলেন সত্যিকারের কমিউনিস্ট, ‘মানবতাবাদী’ খ্যাতি অর্জন করেন। কামরুল হাসান নামের একজন ফররুখ আহমদের ছোট ভাই মুশীর আহমদের সহপাঠী তাঁর ‘ফররুখ ভাই’ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “সে বোধহয় ১৯৩৫ সালের কথা। তখন স্বদেশী আন্দোলনের রেশ। আমরা কেবল এটা-ওটা শুনি আর থ্রিল অনুভব করি‌। এমনি একদিন মুশীর সন্ধ্যাবেলা আমাদের বেনে পুকুরের বাড়ীতে এসে, যেন সাংঘাতিক একটা ঘটনা এমনি ভাব নিয়ে, অতি গোপনে আমাকে ডেকে বলল, জানিস ফররুখ ভাই কম্যুনিস্ট হয়ে গেছে।” [প্রাগুক্ত, ৭২ পৃষ্ঠা] ফররুখ আহমদের প্রথম কবিতা ‘বুলবুল’—পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে; অর্থাৎ সাহিত্য-জীবনের সূচনালগ্নে তিনি কম্যুনিস্ট আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। কবিকন্যা এবং তাঁর ছোট ভাইয়ের সহপাঠীর স্মৃতিচারণ থেকে নির্গত বিধায় এ তথ্যটি সম্পর্কে সন্দেহ পোষণের কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কিভাবে এ মতাদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইসলামী মতাদর্শে দীক্ষিত হলেন?

কবিতনয়া সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু এক‌ই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, “আব্বার জীবনে এক অচিন্তনীয় পরিবর্তনের মূলে যে মহান আউলিয়ার দোয়া ছিল, তিনি হচ্ছেন আব্বার পীর মরহুম অধ্যাপক আবদুল খালেক—তৎকালীন যুগে ইংরেজি এবং আরবিতে এম. এ. ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট [গোল্ড মেডেলিস্ট]। বহু বিতর্কের মাধ্যমে আব্বাকে পরাস্ত ক’রে সেদিন তিনি আব্বাকে বুঝিয়েছিলেন যে, ইসলাম‌ই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান রয়েছে।” [প্রাগুক্ত, ২৪৮ পৃষ্ঠা] ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছতুরা দরবার শরীফের পীর সাহেব, যিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন—তাঁর মাধ্যমে‌ই ফররুখ আহমদ কম্যুনিস্ট মতাদর্শকে কবর দিয়ে ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট শান্তিপূর্ণ পথ—সুফিধারার অনুসারী হয়ে গেলেন। অধ্যাপক আবদুল খালেকের তিন খণ্ডের বিখ্যাত গ্ৰন্থ সাইয়েদুল মুরসালীন’র ভাষা পরিমার্জনায় কবি ফররুখ আহমদ সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফররুখ আহমদ রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন, “কবি-সমালোচক সৈয়দ আলী আহসানের মুখে শুনেছি, মওলানা আবদুল খালেকের বিখ্যাত রসুল সা.-চরিত সাইয়েদুল মুরসালীন গ্ৰন্থে ফররুখ আহমদের হস্তাবলেপ ছিল।” প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৪৫ সালে—তখনকার স্মৃতিস্মরণে তিনি বলেন, “এ সময়ে ফররুখ ভাই দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছিলেন। তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিসত্তাই তখন ভেঙেচুরে এক নতুন রূপ নিতে চলেছে। এক কথায় তখন তাঁর ‘কনভার্সন’-এর শেষ পর্যায়। ‘কনভার্সন’ একটি আত্মিক প্রক্রিয়া, এর কোনো বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই। আমি এই প্রক্রিয়া সম্বন্ধে শুনেছি ও পড়েছি; তবে অভিজ্ঞতা হিসেবে এটা এতই দূরবর্তী যে, এ বিষয়ে আমি কথা বলতে সংকোচ বোধ করি। যিনি ফররুখ ভাইয়ের এই ‘কনভার্সনের’ মুখ্য পুরুষ, সেই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটি ম‌ওলানা আবদুল খালেক—ঘটনাচক্রে—আমাদের টেইলর হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। তাঁর পরিচয় হিসেবে এটা একেবারেই তুচ্ছ। তিনি অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। তখন কোনো একটা গ্ৰন্থ রচনায় ব্যস্ত ছিলেন। এবং তাঁকে ভাষার পরিমার্জনায় সাহায্য করছিলেন ফররুখ ভাই। এ উপলক্ষে তাঁকে মাঝে মধ্যে টেইলর হোস্টেলে আসতে দেখেছি, এবং সবসময় তাঁর মধ্যে একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি।” [প্রাগুক্ত, ১২১ পৃষ্ঠা] কম্যুনিস্ট আদর্শকে তালাক দিয়ে ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারা অর্থাৎ সুফিধারায় যে ফররুখ আহমদ অধ্যাপক আবদুল খালেকের মাধ্যমেই পূর্ণোদ্যমে প্রবেশ করলেন তা উপর্যুক্ত জবানবন্দি থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে। কবিতনয়ার স্মৃতিচারণের একটি খণ্ড এখানে অনিবার্য উল্লেখ্য, “যিনি প্রথম জীবনে শরাব এবং কাবাবের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন, কিভাবে পরবর্তী জীবনে আবার তিনিই হলেন সাধক। এই বিস্ময়কর এবং অনিন্দ্যসুন্দর কাহিনী বলবার সময় আব্বার গভীর চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়তো।” [প্রাগুক্ত, ২৪৯ পৃষ্ঠা]


একটা সুনির্দিষ্ট মতাদর্শে প্রবলভাবে বিশ্বাসী থেকেও ফররুখ আহমদ বিশুদ্ধ কবি ছিলেন।


সুফিধারার ভাবাদর্শের দীক্ষা গ্রহণ করেই ফররুখ আহমদ রচনা করলেন তাঁর কাব্যজীবনের অন্যতম আলোকোজ্জ্বল সৃষ্টি সিরাজাম মুনীরা [১৯৫২]। এবং সর্বজনবিদিত যে, এ কাব্যগ্রন্থটি কবি ফররুখ আহমদ তাঁর জীবনের মোড় পাল্টে দেওয়া আধ্যাত্মিক গুরু অধ্যাপক আবদুল খালেকের ‘দস্ত্ মুবারকে’ উৎসর্গ করেন। কবিতায় ফররুখের প্রিয়তম ধারা—চৌদ্দ লাইনের একটি অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ সনেটে শোভিত উৎসর্গপত্রটি হুবহু তুলে দিচ্ছি—

পরম শ্রদ্ধাভাজন
আলহাজ্ব মৌলানা আবদুল খালেক সাহেবের দস্ত্ মুবারকে—

যে আলোক শামাদানে জ্ব’লেছিল অম্লান বিভায়
অফুরান প্রাণৈশ্বর্যে সমুজ্জ্বল করি অন্ধকার,
তারি আলোকণা বহি দীপ জ্বলে দীপাগ্নিতে; আর
প্রাণ পায় প্রাণের পাথেয়। নিশান্তের প্রত্যাশায়
জাগে সে অপূর্ব দ্যুতি প্রভাতের বর্ণ সুষমায়
নিরন্ধ্র রাত্রির বক্ষে, নিষ্প্রাণ মৃত্যুর কালঘুমে
[বিদ্যুৎ চমকে যেন—অথবা দুরন্ত সাইমুমে]
সিরাজাম মুনীরার জ্যোতির্লেখা মুক্ত ঝরোকায়।
তৌহিদী মশাল বহি চলে গেছে যারা যাত্রীদল
—পাথর চাপানো ভার, আঘাতের ভারী বোঝা টেনে,
অবিশ্বাসী শর্বরীর শিলা-বক্ষে সূর্য তীর হেনে
অগণ্য মৃত্যুর মাঝে নিষ্কম্প, নির্ভীক—অচঞ্চল ;
তাদের কাফেলা মাঝে নিঃসংশয় অভিযাত্রী জেনে
মানুষের মুক্ত স্বপ্ন রেখে যাই অশ্রু সমুজ্জ্বল।

‘প্রাণের পাথেয়’ পেয়েছেন বলেই ফররুখ আহমদ তাঁর নিকট সুফিধারার সূত্রানুসারে ‘মুরীদ’ হয়েছিলেন। ‘মুরিদ’ বিষয়টিকে ফররুখ আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন।  কবি মুহম্মদ আবু তালিব তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, “আমি তখন আমার ব্যক্তিগত দেখা কয়েকটি স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বললেন,

—আপনি কোনো পীরের মুরীদ হয়েছেন?
—আমি বললাম, না।
—তিনি বললেন, অবিলম্বেই মুরীদ হোন।
—আমি বললাম, কেন?
—তিনি বললেন, আপনার স্বপ্ন খুব শুভ। তার নির্দেশ‌ই এইরূপ। মুরীদ না হলে জীবনের পূর্ণাঙ্গতা আসে না। আল্লাহ আপনার জন্য ইমামতী রেখেছেন, আর আপনি দূরে দূরে ঘুরছেন।
—আমি বললাম, ভালো পীর কোথায় পাই?
—তিনি বললেন, কামিল পীর কি আর ঘরে বসে পাওয়া যায়? তবে হাতের কাছে ফুরফুরা শরীফে যেতে পারেন। এ কালে কামিল পীরের সন্ধান পাওয়া মুশকিল।
—আমি সবিনয়ে বললাম, আমার মরহুম আব্বা ফুরফুরা শরীফের মরহুম পীর হযরত আবু বকর সিদ্দিকীর মুরীদ ছিলেন। আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদ আল্লামা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেব‌ও তাঁর মুরীদ‌ই নন শুধু, তাঁর অন্যতম খলীফাও ছিলেন। আমি জানি, তাঁর কয়েকজন মুরীদ‌ও ছিল। আমি তো ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সংস্পর্শে বহুদিন কাটিয়েছি। বর্তমানেও তাঁর আদর্শেই পথ চলতে চেষ্টা করছি; তাই যদি বলি, আমি তাঁর‌ই মুরীদ, তাহলে কি ভুল বলা হবে?
—তিনি বললেন, মনে মনে মুরীদ হলে চলে না। মুরীদ মানে বাইয়াত হ‌ওয়া। বাইয়াত হ‌ওয়া মানে বিক্রি হয়ে যাওয়া। মহাকবি হাফিজের ভাষায় ‘বামায় সাজ্জাদা রঙ্গিন কুন’ ইত্যাদি। মানে হাফিজ বলেছিলেন, পীর যদি নির্দেশ দেন তবে জায়নামাযে শারাব ঢেলে দাও। কারণ তিনি পথ দেখান, তাঁর পথের আদি-অন্ত জানা আছে। তাই কামিল পীরের সন্ধান‌ই কাম্য।” [প্রাগুক্ত, ১০৭-৮ পৃষ্ঠা]

এই যে আধ্যাত্মিকতা, সুফিধারার একনিষ্ঠতা তাঁর মধ্যে গাঁথা ছিল তা আমৃত্যু তিনি বহন করেছিলেন। আধ্যাত্মিকতার রঙে রঞ্জিত ছিলেন তিনি আমরণ—সেজন্য‌ই ফররুখ আহমদের প্রথম জীবনের প্রকাশক তৈয়েবুর রহমান যখন ইন্তেকালের মাসখানেক পূর্বে তাঁর খবরাখবর নিতে গিয়ে দুরবস্থা দেখে হতাশ হন তখন ফররুখ আহমদ ওলি-আউলিয়াদের বাণী উদ্ধৃতি করে বলেন, “তাঁরা বলেছেন, ভয় নেই। পরিস্থিতি বদলাবে।” আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ—ইসলামি পরিভাষায় ওলি-আউলিয়া—তাঁদের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আমরণ অটুট ছিল তাঁর। কবিতনয়া সাইয়েদা ইয়াসমিন বানুর বিশ্বস্ত কণ্ঠে শুনে আমরা আরও আশ্বস্ত হ‌ই: “আওলিয়া-দরবেশদের আলোচনা আব্বার অত্যন্ত প্রিয় প্রসঙ্গ ছিল। হযরত ফজিল আয়াজ (র), হযরত বিশর হাফী (র), হযরত হাবীব আজমী (র), রাজর্ষি ইবরাহীম ইবনে আদহামের প্রসঙ্গ ছিল আব্বার কাছে প্রিয়। আব্বা বলতেন, দাম্ভিক পরহেজগারের চাইতে অনুতপ্ত পাপী ভালো। আব্বা ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না ; সাম্প্রদায়িক তো ছিলেন‌ই না।” সাহিত্যিক আবুল ফজল যে বলেছেন, “একটা সুনির্দিষ্ট মতাদর্শে প্রবলভাবে বিশ্বাসী থেকেও ফররুখ আহমদ বিশুদ্ধ কবি ছিলেন”—সে মতাদর্শ যদি ধর্মীয় হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তা সুফিধারা বা ইসলামের আধ্যাত্মিক মতাদর্শ।

১৯৪১ সালে অধ্যাপক আবদুল খালেকের নিকট একটি চিঠি লিখেছিলেন ফররুখ আহমদ। সে চিঠির মধ্যাংশ হচ্ছে: “আল্লার রহমতে—আমি যে বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত পেয়েছি—তার মধ্যে আপনাকে জেনেছি উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্করূপে—হজরতের, উমর ফারুকের মহান আদর্শ আপনার বুকে সুপ্ত আছে… সেই আনন্দের সংবাদ আপনাকে জানালাম।” [ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য : আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৩, ৩২৩ পৃষ্ঠা] এ চিঠির টীকায় আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন: “মওলানা আবদুল খালেকের সংস্পর্শে এসে ফররুখ আহমদ আধ্যাত্মিকতায় দীক্ষিত হয়েছিলেন—যে-প্রভাব তাঁর ভিতরে শেষ-পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ‘সম্ভাবনার ইঙ্গিত’ তাঁর পরবর্তী কবিতায় ফলপ্রসূ হয়েছিল।”

“ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য” নামে ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের যে-গ্ৰন্থ প্রকাশিত হয় সে-গ্ৰন্থের ২৮৭ পৃষ্ঠায়, ফররুখ আহমদের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির একটি চিত্রের প্রতিলিপি উল্লেখ করা হয়েছে। ফররুখ আহমদের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির উক্ত প্রতিলিপিতে ‘ওসিলা’ শিরোনামে লেখা রয়েছে: “আল্লাহ্ লাভের জন্য পীরানে পীরদের ওসিলা যেরূপ কার্যকরী সেই রূপ আল্লাহ তা’য়ালার রহমত এবং ফয়েজে এলাহী লাভের জন্য পীরানে পীরদের সেলসেলার মাধ্যমে দো‌ওয়া এবং মোনাজাত‌ও বিরাট সহযোগী। এই জন্য বুজুর্গগণ আল্লাহ তা’য়ালার নিকট নিজেদের আবেদন নিবেদন পেশ করনার্থে সর্বদা নিজ নিজ পীর পীরান পীরানদের সেলসেলার ওসিলাকে মাধ্যম স্বরূপ পরিগ্ৰহণ করিয়া থাকেন এবং এই ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’য়ালার নিকট নিজেদের দোওয়া মঞ্জুর করার জন্য এই সেলসেলার ওসিলা তাফসিরে আজমের ন্যায় উপকার করাইয়া থাকে।”— এ প্রতিলিপি থেকেও ফররুখ আহমদের সুফিমানসের গভীরতা ও প্রোজ্জ্বলতা সম্পর্কে হলফ করেই—নিঃসন্দিহান ধারণা লাভ করা যায়। এতেই শেষ নয়! এ প্রতিলিপির নিচে আবদুল মান্নান সৈয়দ নিঃসঙ্কোচে লিখে দিয়েছেন: “আধ্যাত্ম চর্চার নিদর্শন। কবিতাচর্চার সূচনাকালেই ফররুখের আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটে। এ ক্ষেত্রে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন ম‌ওলানা আবদুল খালেক—যাঁকে কবি তাঁর সিরাজাম মুনীরা [১৯৫২] কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। তাঁর [ফররুখ আহমদের] পীর ছিলেন ফুরফুরা শরীফের পীর মুজাদ্দেদে হাসান হযরত ম‌ওলানা শাহ সুফী আবুবকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর খলিফা হযরত ম‌ওলানা শাহ সুফি প্রফেসার আবদুল খালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি। এই পীরের কাছ থেকে তিনি নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার বিভিন্ন সবক গ্ৰহণ করেন। একে একে তিনি সব ক’টি মকাম উত্তীর্ণ হন।”—স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্বস্ত এবং দক্ষ সম্পাদক হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দ অতুলনীয় বিধায় তাঁর প্রদত্ত তথ্য গ্ৰহণ করাতে সঙ্কোচের কারণ নেই। ‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া’ সংগীত রচয়িতা কবি যখন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের, তরিকার পীর-মুর্শিদের ‘ওসিলা’ ধরার কথা বলেন তখন তো আর এটাকে ‘সুফিমানসের সাক্ষ্য’ হিসেবে গ্ৰহণ না করে গত্যন্তর নেই।

ফররুখ আহমদ ব্যক্তিগত জীবনের ধর্মীয় বিশ্বাস—সুফি মতাদর্শ ও বিশ্বাসকে কবিতায় অবতীর্ণ করেছিলেন। তাঁর অনেক রচনা আমাদের এ দাবির পক্ষে স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়। ফররুখ আহমদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সবচেয়ে বেশি প্রবেশ যে কাব্যগ্রন্থে ঢুকেছে—সিরাজাম মুনীরা—এ প্রসঙ্গে ফররুখ আহমদের অন্তরঙ্গ বন্ধু সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন: “একসময় ফররুখ ও আমি আলোচনা করেছিলাম, রসূলের জন্ম-মুহূর্তে পৃথিবীব্যাপী যে সমস্ত তাৎপর্যবহ সংঘটনের বিবরণ মৌলুদগ্রন্থে আছে, সেগুলোকে বাংলা শব্দের ভাবার্থে রূপান্তরিত করা যায় কিনা। ইরানের অগ্নিপূজকদের চিরকালীন অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়েছিলো, কাবাঘরের মূর্তিগুলো ভেঙে পড়েছিলো, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের নিষ্ঠুর শাসকবৃন্দ অজানা আতঙ্কে কম্পিত হয়েছিলো, একটি অলৌকিক জন্মের তাৎপর্য জানবার জন্য সমস্ত প্রকৃতি যেন উন্মুখ হয়েছিলো। এ বোধগুলোকে বাংলা শব্দে কুশলতার সঙ্গে সমর্পণ করে একটি সুন্দর কাব্যনাট্য রচনা করা যায় এবং একটি সচল প্রশস্তির প্রদীপ্তি নির্মাণ করা যায়। ফররুখ বলেছিলো সে লিখবে, কিন্তু যখন লিখলো তখন সে সূফীতত্ত্বের অন্তর্লীন ভাবাবেগে নিমগ্ন। ‘সিরাজাম মুনীরা’ শীর্ষক কবিতাটিতে ফররুখ সূফী সাধনার পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য আবিষ্কারের কথা বলেছে, বলেছে যে রসূলে খোদা নবুঅত প্রাপ্তির পূর্বে হেরার গুহায় মোরাকেবালীন ছিলেন এবং সে অবস্থায়:

একাগ্রতার সকল সেতারা চেরাগে জ্বালায়ে মনের সাধ—
খোঁজো হে সাধক মৌন: পরম সত্যদ্রষ্টা আল-আহাদ,
খুঁজে ফেরো তুমি লা-শরীকের মহান সত্য অভিজ্ঞান!
মরুর পিপাসা অশ্রু ভিজায়ে জাগাও দু’চোখে কী সন্ধান?

ফররুখের বিবেচনায় রসূলের সমগ্র অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো তাসাওফ এবং তাঁর ইশক-তত্ত্ব। এর প্রমাণস্বরূপ রসূলের যথার্থ অনুসারী হিসাবে সে নাম উল্লেখ করেছে হযরত আবদুল কাদের জিলানীর এবং হযরত ম‌ঈনুদ্দীন চিশ্‌তীর। ধ্যান-তন্ময়তার একটি একান্ত জীবনপদ্ধতিকে রসূলের সর্বস্ব-রূপ হিসাবে সূফি সাধকগণ চিহ্নিত করে থাকেন। ফররুখ‌ও তার বিবেচনায় সেটাকেই সত্যি বলে মেনেছিলো।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ৩২২-৩২৩ পৃষ্ঠা]


তিনি ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক তত্ত্বে অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ‘পাকিস্তানপন্থি’। 


সিরাজাম মুনীরা কাব্যগ্রন্থের সূচিতে দৃষ্টি ফেললেই যেকোনো পক্ষপাতমুক্ত পাঠক ফররুখ আহমদের সুফিমানসকে বিনা-ওজরে চিহ্নিত করতে পারেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং চার খলিফাকে বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করে প্রশস্তিসূচক কাব্য নির্মাণ করাকে যদি ‘সাধারণ মুসলমান’র কর্তব্যবোধক চিহ্ন বলে ধরি, তাহলে ‘গাওসুল আজম’ শিরোনামে বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর; ‘সুলতানুল হিন্দ’ শিরোনামে গরিবে নেওয়াজ খাজা ম‌ঈনুদ্দীন চিশ্‌তীর; ‘মুজাদ্দিদ আলফেসানী’ শিরোনামে হযরত মুজাদ্দিদ আলফেসানীর; ‘খাজা নকশ্‌বন্দ’ শিরোনামে হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দীর প্রশস্তিমূলক কাব্য রচনাকে কি একজন একনিষ্ঠ সুফির সাক্ষ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না? একান্ত সুফিতাত্ত্বিক মানস ব্যতীত সুফিধারার প্রধান-প্রদীপ্ত পুরুষবর্গ—উপর্যুক্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়ে ভিন্ন-ভিন্ন প্রশস্তিমূলক কাব্য রচনা কখনোই সম্ভব নয়। আর তাই তো অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইউমের দৃঢ় কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, “সিরাজাম মুনীরা গ্ৰন্থে ‘গাওসুল আজম’, ‘সুলতানুল হিন্দ’, ‘খাজা নকশবন্দ’, ‘মুজাদ্দিদ আলফেসানী’ প্রভৃতি আলাদা আলাদা কবিতায় তাঁর এল্‌মে তাসাউফের প্রতি গভীর আগ্রহের কথার উল্লেখ রয়েছে।” [প্রাগুক্ত, ৪৮৫ পৃষ্ঠা]

এছাড়াও আমরা তাঁর কাব্যসমগ্রের শিরোনামরাশিতে দেখি দিওয়ানা মদিনা, রুমি, জামী, সাদী, হাফিজ, তাজকেরাতুল আউলিয়া, কাসাসুল আম্বিয়া, চাহার দরবেশ, প্রেমপন্থী, শবে-কদর উপলক্ষে, মদিনার মুসাফির, দুই মৃত্যু, শেরে বাঙলার মাজারে, শবেবরাত পীলখানায়, ধ্যানীর প্রতি, আত্মবিক্রয়ের পন্থা ইত্যাদি—যেগুলো আমাদেরকে ফররুখ আহমদের গহিন সুফিমানসের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়।

সাত সাগরের মাঝি কাব্যগ্রন্থের একটি বিখ্যাত কবিতা ‘ডাহুক’—এ কবিতাটিকে অনেকে ইংরেজি সাহিত্যের ওয়ার্ডস‌ওয়ার্থ ও শেলীর অনুকরণ বলেছেন, কিন্তু আদৌ কি এটি অনুকরণের ফল? আমরা বিস্মিত হ‌ই যখন বরেণ্য সাংবাদিক ও কূটনীতিক, আখতার-উল-আলমের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এ কবিতার ব্যাপারে ফররুখ আহমদের বক্তব্য শুনি, “শোন, আমার ‘ডাহুক’ কবিতা নিয়ে দিগ্‌গজেরা তো মহাচিন্তায় পড়ে গেল। ‘ওড টু স্কাইলার্ক’ ‘ওড টু নাইটিঙ্গেল’—কোনোটার সাথেই মেলাতে পারে না। কিন্তু ওরা তো কথার বেপারী। তালে-গোলে মিলিয়ে দিয়ে সাব্যস্ত করে ছাড়ল যে, ‘ডাহুক’ আদৌ মৌলিক কবিতা নয়। ঠিক নকল না হলেও ভাবানুকরণ ইত্যাদি। আরে, ওরা কোথা থেকে জানবে, বল? ওরা তো খালি ব‌ইয়ের পাতায় জীবনের মানে খুঁজে বেড়ায়—ভুল মানেকে সঠিক মানে ভেবে নিয়ে বগল বাজায়। তুই তো জানিস, মুজাদ্দেদী তরিকায় জিকির কী জিনিস। ‘ডাহুক’ রাতভর ডেকে ডেকে গলায় রক্ত ওঠায়। মুজাদ্দেদী সাধক‌ও তেমনি রাতভর ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’ জিকির করে নিজেকে ফানা করে দেন। গভীর রাতে নীরব নির্জন কোনো গ্ৰাম্য মসজিদে মুজাদ্দেদী তরিকার কোনো সাধক যখন ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’ জিকির করতে থাকেন, তখন মনে হয় অবিকল যেন একটা ডাহুক এক মনে ডেকে চলেছে। আমার ‘ডাহুক’ কবিতা এই ধরনের মুজাদ্দেদী সাধকের জিকির নিয়েই রচিত। স্কাইলার্ক কিংবা নাইটিঙ্গেলের সাথে তার মিল থাকবে কোত্থেকে?” [প্রাগুক্ত, ১৯৮ পৃষ্ঠা]

ডাহুক কবিতার এ গূঢ় তাৎপর্য জেনে বিস্মিত না হয়ে একদমই উপায় থাকে না! সাথে সাথে ‘ব্যক্তি ফররুখ আহমদ সুফিধারার একনিষ্ঠ অনুসারী’ বলে আমাদের বিশ্বাসের ভিত আর‌ও বহুলাংশে মজবুত হয়।

উপর্যুক্ত বিশদ আলোচনা থেকে ফররুখ আহমদের ব্যক্তিগত এবং সাহিত্যিক জীবনের যে বিষয়গুলো আমরা লক্ষ্য করছি:

১. ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট শান্তিপূর্ণ মতাদর্শ—সুফিধারার একনিষ্ঠ অনুসারীরূপে সুফিদের বিশ্বাস এবং আচরণ আমৃত্যু আত্মস্থ রেখেছেন।

২. আধ্যাত্মিক পূর্ণাঙ্গতার জন্য পীর-মুরিদির পদ্ধতিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।

৩. নিজ-পীরের এবং সিলসিলা তথা তরিকার ঊর্ধ্বতন পীরদের ওসিলাকে আল্লাহ তা’য়ালার রহমত এবং ফয়েজপ্রাপ্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

৪. সুফিধারার প্রাণপুরুষদের প্রশস্তিগাথায় ভিন্ন-ভিন্ন শিরোনামে কাব্য রচনা করেছেন।

৫. কবি আমরণ আধ্যাত্মিকতার এমন‌ই চর্চা করেছিলেন যে, কবিকন্যা কবিকে ‘সাধক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ফররুখ আহমদ রাজনৈতিক আদর্শে উক্ত বিতর্কিত তথাকথিত ইসলামি দলটির সমর্থক থাকতে পারেন, কিন্তু কখনোই তাদের ধর্মীয় আদর্শের সমর্থক ছিলেন না। ফররুখ আহমদ ছিলেন তাঁদের মতাদর্শে আদর্শবান যারা উপমহাদেশে কেবল প্রেম, ভালোবাসা, সহিষ্ণু, মানবিকতা দিয়ে বৃহদাঙ্গনে ইসলামের বাতি জ্বালিয়েছেন; তাঁদের বিশ্বাসে বিশ্বাসী যাঁরা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি সর্বৈব শ্রদ্ধাশীল এবং কৃতজ্ঞ। অধ্যাপক আবদুল খালেকের মাধ্যমেই—ফররুখ আহমদ ‘বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত’ পেয়ে এমন‌ই সুফিধারার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাঁরা প্রকৃত অসাম্প্রদায়িকতার চর্চার মাধ্যমে উপমহাদেশে, বিশেষত বাঙলায় ইসলামের স্থায়ী সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। আর উক্ত দলটির সাম্প্রদায়িক কদর্যতম বিশ্বাস এবং কার্যক্রম সম্পর্কে প্রায় সকলেই অবগত আছেন বিধায় বলতে দ্বিধা নেই—ফররুখ আহমদ ধর্মীয় মতাদর্শের দিক থেকে তাদের বিপ্রতীপ কোণে সুফিধারার অসাম্প্রদায়িক নিশান নিয়ে দাঁড়িয়ে।

ফররুখ আহমদের অগ্রজ প্রতীম—সৈয়দ সিদ্দীক আহমদ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, “বিদ্রোহী কবি নজরুলের সাথে একদিন ফররুখের দেখা। কবি বললেন, ‘ফররুখ, তুই এসেছিস? ‘হ্যাঁ, এসেছি।’ বিদ্রোহী কবি বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, খিজির তোকে পথ দেখাচ্ছে। খিজির তোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা, ঠিক আছে।” [প্রাগুক্ত, ৪৫ পৃষ্ঠা]—কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ দিব্যদৃষ্টির ভবিষ্যদ্বাণী আক্ষরিক অর্থেই ফররুখ আহমদের জীবনে ফলেছিল বিধায় কবিকন্যা তাঁর বাবার ব্যাপারে স্পষ্ট ভাষায় আমাদেরকে জানিয়ে দেন, “পরবর্তী জীবনে আবার তিনিই হলেন সাধক”। সাধক ফররুখ আহমদ ‘সুফিতত্ত্বের অন্তর্লীন ভাবাবেগে নিমগ্ন’ থেকেই ‘প্রেমপন্থী’ কবিতায় লিখেছেন—

মেটাতে পারেনি প্রজ্ঞা কোনদিন সে প্রাণ পিপাসা!
সৃষ্টির প্রথম কথা—শুধু প্রেম, শুধু ভালোবাসা।

২.
ফররুখ আহমদের রাজনৈতিক দর্শন এবং ধারা যেহেতু একান্তভাবে‌ই পাকিস্তানি তাই পাকিস্তান আন্দোলন থেকেই শুরু করতে চাই।

ফররুখ আহমদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালে—সাত সাগরের মাঝি—এ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়, পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমেই তিনি স্বপ্ন দেখেন হেরার রাজতোরণ’র। এ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই মুসলিম জাতিকে নিয়ে রচিত তাঁর স্বপ্নগাঁথা প্রকাশিত হয় প্রবলভাবে। এতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের চিহ্ন প্রকট; রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ অস্বচ্ছ। সে-সময়ে দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে রচিত ‘লাশ’, ‘আউলাদ’র মতো মানবিকবোধে আচ্ছন্ন কবিতা দেখে ফররুখ আহমদের মানবিক-মানস বুঝতে কারোই বেগ পেতে হয় নি। অর্থাৎ, ফররুখ এক‌ইসাথে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী এবং মানুষ-বিবেচনায় মানবিক। এ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা [রিভিউ] করেন জয়নুল আবেদীন এম.এ.—‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৫২ সংখ্যায়—তিনি লিখেছেন: “জাগরণের স্বপ্নে কবি বিভোর। তিনি মুসলিম জাতির উত্থানকে বাস্তবে রূপায়িত দেখতে চান। ইসলাম তরণীর কাণ্ডারী সিন্দাবাদ।” আর দুর্ভিক্ষপীড়িত কবিতা নিয়ে লিখেছেন: “লাশ এবং আউলাদ—কবিতা দুটি যেন দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাময় দৃশ্যকে অমর করে রেখেছে। কবিতা দুটির ভিতর দিয়ে বর্তমান মায়াময়ী সভ্যতার রুদ্ররূপ‌ও প্রকট হয়ে পড়েছে। কবি এ দুটি কবিতায় বর্তমান সভ্যতার মুখোশকে পূর্ণরূপে সমাজের সম্মুখে উদ্‌ঘাটন করে ধরেছেন।” [ফররুখ আহমদ রচনাবলী প্রথম খণ্ড : আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৫, ৫৪৯ পৃষ্ঠা]

১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ আজাদ করো পাকিস্তান। ১০টি কবিতা নিয়ে গঠিত এ কাব্যপুস্তক স্পষ্টভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেরণার আধার। বসুধা চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘মৃত্তিকা’ পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৫৩ সংখ্যায় এ কাব্যপুস্তিকার ব্যাপারে লেখা হয়েছে: “মুসলিম ভারতের বাঞ্ছিত পাকিস্তান আজ‌ও অলব্ধ, আজ‌ও তা বন্ধনমুক্ত নয়। কবি ফররুখ আহমদের কণ্ঠ তার‌ই মুক্তি আনবার আহ্বানে মুখর হয়ে উঠেছে। এ ব‌ইয়ে রয়েছে তার‌ই পরিচয়। বাহ্যত একে রাজনৈতিক প্রচারবাণী বলে মনে হবে, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনের পিছনে মানুষের যে ব্যাকুলতা কবির মারফত তার‌ই প্রকাশ যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব তখন আর এ-কাব্যকে প্রোপাগাণ্ডা মনে হবে না। পাকিস্তানে আছে কবির দূরপ্রসারী প্রয়োজন : ব‌ইয়ের শেষ কবিতা তিনটিতে তার‌ই অকুণ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে।” [প্রাগুক্ত,  ৫৬৭ পৃষ্ঠা]

বছরখানেক পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক ভারত-পাকিস্তার বিভক্তির সাথে সকলেই পরিচিত—ফররুখ আহমদের স্বাপ্নিক ‘পাকিস্তান’র সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে উৎফুল্লিত হবেন—এটাই স্বাভাবিক। এ স্বাভাবিকতার রূপায়ণ একটি বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিতে চাই—ফররুখ আহমদের আশৈশব অন্তরঙ্গ বন্ধু  সৈয়দ আলী আহসান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “ফররুখ আহমদ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই চিন্তায় খুবই উৎসাহিত বোধ করত।” [জীবনের শিলান্যাস : সৈয়দ আলী আহসান, ২০০২, ১৩৫ পৃষ্ঠা]

দেশভাগ হলো—ফররুখ আহমদ ঢাকায় আসলেন ১৯৪৮ সালে। কিন্তু তার আগেই অর্থাৎ দেশভাগের সাথে সাথেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। এ তোলপাড়ের প্রাথমিক লগ্নেই ফররুখ আহমদের ভূমিকা ছিল অনমনীয় এবং দৃঢ়। ‘মাসিক স‌ওগাত’ আশ্বিন ১৩৫৪ অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে—পাকিস্তান সৃষ্টির মাসখানেক পরেই ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে ফররুখ আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন: “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হ‌ওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপায়িত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি আগেই বলেছি যে, বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্ৰহণ করলে এই দেশে ইসলামী সংস্কৃতিকে হত্যা করা হবে।”—এ বক্তব্যে ফররুখ আহমদের দৃঢ় কণ্ঠে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্ৰহণ না করার প্রশাসনিক কুচক্রীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে দেখছি—তিনি ‘অসৎ’, ‘অসাধু’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তথাপি তাঁর সাথে আমাদের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত দুটি বিরোধ আছে:

ক. তিনি তাদেরকে অসৎ, অসাধু বললেও সর্বনামে সম্মানার্থে ঁ ব্যবহার করেছেন।

খ. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চেয়েছিলাম আমরা আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে, বাঙালি জাতীয়তার শিকড়ের রক্ষার্থে; কিন্তু তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চেয়েছেন ‘ইসলামি সংস্কৃতিকে হত্যা’ না করার জন্যে। তৎকালীন সময়ে, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমরা সকলেই চেয়েছিলাম—মূলত কারণ খুঁজতে গিয়ে তাঁর সাথে আমাদের বিরাট একটি তাত্ত্বিক প্রাচীর দাঁড়িয়ে যায়, যে প্রাচীর তিনি আমৃত্যু আঁকড়ে ধরেছিলেন।


ফররুখ আহমদ কখনোই সরকারি মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তোয়াক্কা করতেন না।


আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসগ্ৰন্থে ৪৭’র দেশভাগের পর আসে ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায়—৫২’র সে-সময়ে ফররুখ আহমদের ভূমিকা জানা গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারিতে রফিক, সালাম, জব্বার প্রমুখের শাহাদাতের খবর শুনে ফররুখ আহমদ প্রতিবাদ করেছিলেন ঢাকা বেতারে, তাঁর কর্মস্থলের মাধ্যমে। সকল শিল্পীকে নিয়ে ধর্মঘট করেছিলেন বলেও শোনা যায়। আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, “১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ফররুখ আহমদকে যথার্থ‌ই উদ্দীপ্ত করেছিলো।” সেই উদ্দীপনায় আমাদের সাথে ফররুখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখানেও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমাদের উদ্দীপনা বাঙালি জাতীয়তার প্রশ্নে; ফররুখ আহমদের উদ্দীপনা ইসলামি জাতীয়তার প্রশ্নে। ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি অসাধু এবং অসৎ শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান করায় ১৯৫৩ সালে ঢাকা বেতারের পনেরো জন শিল্পীকে বরখাস্ত করা হয়েছিল—ফররুখ আহমদ‌ও ছিলেন বরখাস্তের অন্তর্ভুক্ত। টানা সতেরো দিন ধর্মঘটের ফলে প্রত্যেকের সাথে ফররুখ আহমদের‌ও পুনর্বহাল হয়। পাকিস্তানি শাসকদের জুলুমের বিরুদ্ধে এমন প্রতিবাদ তিনি জারি রেখেছেন সর্বদা—তথাপি ছিলেন পাকিস্তানপন্থি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে তিনি প্রচুর লিখেছেন, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম, অসততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। তাঁর মতো প্রতিবাদকণ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে বিরল। প্রচলিত অর্থে—দালাল, স্বার্থবাদী, মোনাফেক, রাজাকার—তাদের মতো ‘পাকিস্তানপন্থি’ ছিলেন না; তিনি ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক তত্ত্বে অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ‘পাকিস্তানপন্থি’। তিনি চাইলে পাকিস্তানি শাসকদের মাধ্যমে গড়ে নিতে পারতেন সম্পদের সৌধ—অত্যুচ্চ পদে বসার মতো সামর্থ্য এবং সুযোগ কোনোটাই তিনি কাজে লাগান নি; কিন্তু গতানুগতিক দালাল, মোনাফেক কুচক্রী শাসকমহলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করতে বরণ করে নিয়েছেন দারিদ্র্যতা।

আইয়ুব খানের সামরিক সরকারের ইচ্ছায় যখন রাইটার্স গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হলো তখন সেখানে তিনি যোগ দিয়েছেন এবং তৎকালীন অনেক তরুণ লেখকদের এ সংঘের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এজন্য অনেকেই তাঁর উপর অভিযোগ তুলেছেন; কিন্তু সে অভিযোগ ধোপে টেকে না যখন কাজী গোলাম আহমদের স্মৃতিকথায় এ প্রসঙ্গে ফররুখ আহমদের বক্তব্য শুনি, “এই সংঘে সবার প্রবেশ করা উচিত। কারণ লেখকদের একত্রিত হ‌ওয়ার এই একটা সুবর্ণ সুযোগ। সরকারকে আমরা পছন্দ না করতে পারি, কিন্তু তাদের দেয়া ভালো জিনিসটাকে আমাদের গ্ৰহণ করা উচিত।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১২৪ পৃষ্ঠা]

রেডিওর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য একবার ঢাকা রেডিওতে ধর্মঘট হয়েছিল, সে-ধর্মঘটের নেতৃত্বে ছিলেন ফররুখ আহমদ। অধ্যাপক আবদুল গফুর স্মৃতিকথায় লিখেছেন: “রেডিও অফিস তখন নাজিমুদ্দীন রোডে। শিল্পীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগ্রাম শুরু হলো। কমিটির তিনি সভাপতি বা সম্পাদক কিছুই না—কিন্তু সকলেই জানত, এই সংগ্ৰামের পেছনে মূল প্রেরণা তিনি। রেডিওর জাঁদরেল মহাপরিচালক বোখারী সাহেব করাচী থেকে ছুটে এলেন। হুমকি আর প্রলোভনের মুখে সংগ্ৰামের পিচ্ছিল পথ থেকে বহু অফিসার আর নেতাই ভেসে যাবার উপক্রম। কিন্তু রেডিওর একজন ক্ষুদে কর্মচারী—যিনি বুক টান করে দাঁড়িয়ে থেকে শিল্পীদের দাবি-দাওয়া অজেয় প্রমাণ করেছিলেন তিনি ফররুখ ভাই।” [প্রাগুক্ত, ১১৫ পৃষ্ঠা]  ফররুখ আহমদের আরেক স্নেহধন্য আবদুস সাত্তার‌ও এ প্রসঙ্গে স্মৃতিস্মরণে উল্লেখ করেন: “সাবেক পাকিস্তান আমলে রেডিও অফিসে পে-স্কেল কিংবা অনুরূপ ব্যাপারে কর্মচারীদের মধ্যে গোলযোগ চলছিল। এই খবর গেল হেড অফিস করাচী পর্যন্ত। ওখান থেকে চলে এলেন ডিরেক্টর জেনারেল। তিনি এসেই ফররুখ আহমদকে ডেকে পাঠালেন এবং লম্বা গোঁফ নেড়ে নাকের পশম টানতে টানতে বললেন, শায়ের সাহাব, ম্যায় এ সোস রাহা কে আপ এ কলমবন্দ স্ট্রাইক কা লীড দেতা হ্যায়। আপ কা নোকরি টুট জায়েগা।” ফররুখ ভাই আলিফের মতো খাড়া হয়ে বললেন, “রিযিক কা মালিক আল্লাহ হ্যায়—আপ নেহী।” [প্রাগুক্ত, ১৩২ পৃষ্ঠা]

পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম এবং অনৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ফররুখ আহমদ ছদ্মনামে অঢেল পরিমাণে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখেছেন। এবং সেজন্য তাঁকে শাসক নামে শোষকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছিল। এ ব্যাপারে আবদুল মান্নান সৈয়দের বিবৃতি: “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর যে-স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিলো, সমাজের সর্বত্র ও রাজনীতিতে যে-চতুর ধূর্ত ব্যক্তিদের তিনি দেখেছিলেন, অজস্র ব্যঙ্গকবিতায় তিনি তাদের ছবি ধ’রে রেখেছেন। এ এক বিশাল আশ্চর্য চরিত্রচিত্রশালা। জীবদ্দশায় তাঁর কোনো ব্যঙ্গকবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় নি, কিন্তু তাঁর অনেক ব্যঙ্গকবিতার পঙ্‌ক্তি সাহিত্যমোদীদের মুখে আজও শোনা যায়, ‘তসবিরনামা’, ‘নসীহতনামা’, ‘ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য’র উল্লেখ অনেকেই করেছেন। ব্যঙ্গকবিতা পত্রিকায় প্রকাশকালে ফররুখ অনেকগুলো ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। সেগুলো এই : হায়াত দারাজ খান পাকিস্তানী, ইয়ারবাজ খান, মুনশী তেলেসমাত, কোরবান বয়াতী, গদাই পেটা হাজারী, আবদুল্লা বয়াতী, জাহেদ আলী ঘরামী, মানিক পীর, শাহ বেয়াড়া বাউল, ঘুঘুবাজ খান, সরফরাজ খান, মোহাম্মদ আবদুল জলিল, আহমদ আবদুল্লা, মাহবুব আব্দুল্লা প্রভৃতি।” [আবদুল মান্নান সৈয়দ, প্রাগুক্ত, ২১ পৃষ্ঠা] ফররুখ আহমদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতার সম্ভার না দেখলে বোঝা যাবে না, তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরাচারীদের কতটা ঘৃণা করতেন—সেই ঘৃণা উচ্চাঙ্গের তাচ্ছিল্যতা ও বিদ্রূপের মিশেলে নিঃসঙ্কোচে জনসমাজে প্রকাশ করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় প্রকাশিত ফররুখ আহমদ রচনাবলীর দ্বিতীয় খণ্ডে সমস্ত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতা উল্লেখ করা হয়েছে—উৎসাহী পাঠক দেখতে পারেন।

ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতা রচনার জন্য শোষকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন তিনি—১৯৫৮ সাল থেকে ’৬১ পর্যন্ত ৩ বছর তাঁর নামে পাণ্ডুলিপি প্রকাশনা নিষিদ্ধ ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর “পরলোকে ফররুখ আহমদ” শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায়—২২ অক্টোবর ১৯৭৪—যে সম্পাদকীয় লেখা হয় তাতে উল্লেখ আছে: “১৯৫৮ সালে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখে ক্ষমতার রোষানলে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তিনি। আবার আইয়ুব শাহীর শেষ পর্যায়ে একটি সরকারি খেতাব‌ও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। সে পারিতোষিক তিনি গ্ৰহণ করেননি, কিন্তু কি আশ্চর্য আমরা তাঁর এই মহৎ ত্যাগকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তাঁকে রেখেছিলাম কোণঠাসা করে।” ২১ অক্টোবর ১৯৭৪—দৈনিক বাংলা পত্রিকায় “কাব্যলোকে তিনি মৃত্যুহীন” শিরোনামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে: “১৯৫৮ সালে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখে ক্ষমতার রোষানলে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। একষট্টি সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল তাঁর পাণ্ডুলিপির প্রকাশনা।” বিশিষ্ট কাব্য-সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজ‌উল্লাহ্‌র স্মৃতিখণ্ডেও আমরা এ ব্যাপারে জানতে পারি: “ফররুখ আহমদের কাছেই শুনেছি, ঐ সময়ে তাঁকে কিছুটা গা ঢাকা দিয়ে সন্তর্পণে থাকতে হতো। তাঁর ‘হায়াত দারাজ খান পাকিস্তানী’ ছদ্মনামে লেখা ‘ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য’ সাপ্তাহিক আজ পত্রিকা প্রকাশের পর তাঁকে নাকি কর্তৃপক্ষীয় কেউ কেউ কম্যুনিস্ট বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ‌ও নাকি লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল। ঐ ব্যঙ্গ-কাব্যটিতে ফররুখ আহমদ ঐতিহাসিক চরিত্র মীর জাফরের জবানীতে তদানীন্তন শাসক-শোষক ও অন্যান্য সমাজবিরোধী ‘নীতিবিদদের’ তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সম্ভবত সেটাই ছিল তাঁর বিড়ম্বনার কারণ।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৩৮ পৃষ্ঠা] আবদুল মান্নান সৈয়দের জবানেও আমরা এ ব্যাপারে শুনতে পাই: “১৯৫৭ সালে তাঁর ব্যঙ্গকবিতা নিয়ে সরকারি উপর-মহলে একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, এমনকি তাঁকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছে কিছুদিন, এজন্যে তিনি কয়েকদিন নিজ বাসা ছেড়ে কমলাপুরে মামার বাসায় থাকেন।” [আবদুল মান্নান সৈয়দ, প্রাগুক্ত, ২১ পৃষ্ঠা] আমাদের নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ফররুখ আহমদ তৎকালীন পাকিস্তানি শোষকদের ঘৃণায়—তাদের জুলুম ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে এমন তাচ্ছিল্যকর পন্থায় প্রতিবাদ করেছেন যে স্বয়ং পাকিস্তান সরকারমহল পর্যন্ত তাঁর পেছনে উঠেপড়ে লেগেছিল। অনৈতিক, জালেম শাসকদের উপর ক্রুদ্ধ ফররুখ আহমদ ‘রাজরাজড়া’ নামে একটি প্রহসন‌ও রচনা করেছিলেন—অবশ্য‌ই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে। এ ব্যাপারে কবির ঘনিষ্ঠজন রফিকুল ইসলামের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়: “ফররুখ ভাই পাকিস্তান ও ইসলামী আদর্শের অনুরাগী ও অনুসারী বরাবর, কিন্তু তদানীন্তন পাকিস্তানী ও পূর্ব পাকিস্তানী শাসকেরা ইসলামের নামে যা করছিলেন, তাতে তাদের ওপরে সবচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ ছিলেন ফররুখ ভাই। তিনি এ শাসকদের ব্যঙ্গ করে ‘রাজরাজড়া’ নামে একটা নাটক লিখেছিলেন এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনীত হয়েছিল।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৫০ পৃষ্ঠা]

বিশিষ্ট ফররুখ-গবেষক মুহম্মদ মতিউর রহমানের ফররুখ প্রতিভা গ্ৰন্থের মাধ্যমে আমরা একটি বিচিত্র সংবাদ জানতে পারি: “ষাটের দশকের শেষের দিকে অবশ্য তৎকালীন ‘জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো’র [বি.এন.আর.] পক্ষ থেকে কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সবগুলো গ্ৰন্থ প্রকাশ ও পুনর্মুদ্রণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। কারণ তাতে এক ধরনের রেজিমেন্টেশন ও প্রতিক্রিয়াশীলতার‌ সৃষ্টি হ‌ওয়াই স্বাভাবিক। মনে পড়ে, কবি এই প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন যে, ‘বি.এন.আর.’র পক্ষ থেকে গ্ৰন্থ প্রকাশ করে নিজেকে একজন ‘সরকারি কবি’ হিসেবে পরিচিত হতে দিতে চাই না। আমি চিরকাল‌ই স্বাধীনচেতা এবং সাধারণের একজন হয়ে আত্মপ্রকাশের প্রবল তাড়নায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্য-চর্চা করেছি—আমরণ আমি তেমনি স্বাধীন ও সর্বসাধারণের একজন হয়ে থাকতে চাই।” [ফররুখ প্রতিভা : মুহম্মদ মতিউর রহমান, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ১৯৯১, ২২ পৃষ্ঠা]

ফররুখ আহমদ কখনোই সরকারি মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তোয়াক্কা করতেন না—তিনি তাঁর কথামতো আমরণ ছিলেন ‘স্বাধীন ও সর্বসাধারণ’। ঢাকা রেডিওতে তাঁর সহকর্মী শামসুল আলমের মারফতে জানা যায়: “পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার সচিব কুদরতুল্লাহ শাহাব কবি ফররুখ আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। কবিকে বলা হলো তার সাথে দেখা করার জন্য। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানে রেডিও পাকিস্তানের সামান্য স্টাফ লেখক। কেন্দ্রীয় তথ্য সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার যোগ্যতম ব্যক্তি প্রাদেশিক সচিব। রেডিওর একজন স্টাফ লেখক কেন কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে? কেন্দ্রীয় সচিবের কোন কাজ করিয়ে নেওয়ার দরকার থাকলে তিনি রেডিওর ডিরেক্টরকে বলবেন, ডিরেক্টর আমাকে নির্দেশ দিবেন। আমার তো তার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’ কেন্দ্রীয় তথ্য সচিব পুনরায় ঢাকা সফরকালে আবার ফররুখ আহমদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বললেন। প্রাদেশিক কর্মকর্তারা একথা-সেকথা বলে এড়াতে-ভুলাতে চেষ্টা করলেন। অগত্যা তাকে জানানো হলো যে, কবি ফররুখ আহমদ তথ্য বিভাগের কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ করেন না। শুনে কুদরতুল্লাহ শাহাব বললেন, ‘মায় সমঝ গিয়া।’ অতঃপর তিনি কবি গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে কবি ফররুখ আহমদের বাসায় যান। ফররুখ আহমদ তখন খালি গায়ে, গামছা কাঁধে গোসলখানায় ঢুকতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় দরজায় কড়া নড়ল। তিনি দরজা খুলে দিলেন। কবি গোলাম মোস্তফা কুদরতুল্লাহ শাহাবের পরিচয় করিয়ে দিলেন। ফররুখ আহমদ তাদেরকে বসতে বললেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্যুট-টাই পড়া কুদরতুল্লাহ শাহাব বসছি বসছি করছেন দেখে কবি ফররুখ আহমদ চেয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখেন চেয়ারে কিছু ধূলাবালি জমেছে। ফররুখ আহমদ কাঁধ থেকে গামছা নামিয়ে চেয়ার পরিষ্কার করা শুরু করলেন। কুদরতুল্লাহ শাহাব হাত ধরে তাঁকে থামালেন। কথাবার্তার সময় ফররুখ আহমদ এমন কোন ভাব দেখালেন না যে, তাঁর দীন গৃহে কুদরতুল্লাহ শাহাবের আগমনে তিনি ধন্য বা পুলকিত বা আনন্দিত হয়েছেন। আর দশ-পাঁচজন লোক তাঁর ঘরে এলে তিনি যেমন ব্যবহার করেন, তাই করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর এরূপ নির্বিকার ব্যবহারে খুব অস্বস্তি অনুভব করলেন।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৫৪-১৫৫ পৃষ্ঠা] সরকারি তথ্য বিভাগের একজন সচিবকে পর্যন্ত তিনি নৈতিকতার প্রশ্নে ছাড় দেন নি! কতটা আত্মপ্রত্যয়ী এবং তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী ছিলেন তিনি।


পাকিস্তানি শাসকদেরকে তিনি মোনাফেক বলে সম্বোধন করতেন।


তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর কত অফার তিনি পা দিয়ে মাড়িয়েছেন! কত দুর্লভ সুযোগের গায়ে থুতু নিক্ষেপ করেছেন! সব‌ই করেছেন অনৈতিক, জালেম সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ। ফররুখ-গবেষক মুহম্মদ মতিউর রহমান জানাচ্ছেন: “আলতাফ গ‌ওহর এবং সেই সাথে প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা সেদিন সরকারি খরচে ফররুখ আহমদকে বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে প্রস্তাব শুনে ফররুখ আহমদ সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, আমি কবি মানুষ, সাহিত্য-কর্ম‌ই আমার কাজ; সরকারি প্রতিনিধি সেজে দেশে-বিদেশে সফর করে সরকারি প্রচারণার দায়িত্ব পালন আমার কাজ নয়। আপনি এ কাজের জন্য উপযুক্ত অন্য কোন ব্যক্তির সন্ধান করুন। ফররুখ আহমদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক কবি গোলাম মোস্তফাও সেদিন ফররুখ আহমদকে সম্মত করাতে পারেননি।” [মুহম্মদ মতিউর রহমান, প্রাগুক্ত, ২৪ পৃষ্ঠা] ভাবতেই বিস্মিত হতে হয়, তিনি পাকিস্তানি স্বৈরাচারীদের এতটাই ঘৃণা করতেন যে, প্রচুর আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কখনোই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে যান নি! কাব্য-সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ বলেছেন: “বস্তুত তিনি আইয়ুব খানের কাছ থেকে আদমজী পুরস্কার আনতে করাচি যেতে রাজি ছিলেন না। পাকিস্তানী শাসকদের ইসলামের নামে অনৈসলামিক কার্যকলাপে ফররুখ ভাই এত‌ই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তাঁকে কখনো রাইটার্স গিল্ডের কোন কনফারেন্সে পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া যায়নি।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৫১ পৃষ্ঠা] এ ব্যাপারে তাঁর একান্ত সহকর্মী শামসুল আলম আর‌ও একটি খবর দিয়েছেন: “একটা বিদেশী সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ফররুখ আহমদকে মনোনীত করা হয় এবং ফেরার পথে সরকারি খরচে হজ করার বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, “সরকারি পয়সায় হজ হয় না। আর এরূপ সরকারি ঘুষ‌ও আমি খাই না।” [প্রাগুক্ত, ১৫৭ পৃষ্ঠা]

এ প্রসঙ্গে আরও সাক্ষ্য আমাদের হাতে রয়েছে। আইয়ুব আমলে ঢাকা রেডিওর পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরীর জবানে শোনা যায়: “আইয়ুব আমলে আমি যখন রেডিওর পরিচালক তখন সরকারি খরচে ফররুখকে হজে গমন করতে এবং পরে তিন মাস মুসলিয় দেশ ভ্রমণের আহ্বান জানানো হলো। আমি তাঁকে এ সংবাদ জানিয়ে মিষ্টি দাবি করলাম। ফররুখ কিছুক্ষণ নির্বিকার থেকে বললেন যে, আইয়ুব সরকারের খরচে হজে যোগ দেবার ও মুসলিম বিশ্বভ্রমণের কোন ইচ্ছাই তাঁর নেই। পরে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়েও তাঁকে রাজি করতে পারিনি।” [প্রাগুক্ত, ৭৮ পৃষ্ঠা]  তাঁর স্নেহধন্য আশরাফ সিদ্দিকী লিখেছেন: “অর্থ, পদ বা বাহবা নেয়ার মোহ তাঁর ছিল না। বহুবার তিনি তদানীন্তন রাজধানী করাচী বা পিন্ডি যাওয়ার দাওয়াত পেয়েও যান নাই। উৎসাহ দেখান নাই ইউনেস্কোর টাকায় বিদেশ সফরের ইশারা পেয়েও।” [প্রাগুক্ত, ৮৭ পৃষ্ঠা] কবি জসীমউদ্‌দীন ডক্টর সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে বলেছেন: “ফররুখের কবি-প্রতিভার উপর আমি খুব আশাবাদী। ঐ পাগলার জীবনে এমন আশ্চর্য ঘটনা আছে। ইউনেস্কো থেকে তাকে স্কলারশীপ দেওয়া হয়েছিল। বছর খানেক বিদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে মিলতে মিশতে। কিন্তু পাগলা গেল না।” [মুহম্মদ মতিউর রহমান, প্রাগুক্ত, ২৪ পৃষ্ঠা] আইয়ুব আমলের শেষদিকে ফররুখ আহমদকে সরকারিভাবে “সেতারা-ই-ইমতিয়াজ” খেতাবে ভূষিত করা হয়, কিন্তু তিনি ঘৃণাভরে সে খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। [আবদুল মান্নান সৈয়দ, প্রাগুক্ত, ২৭ পৃষ্ঠা] আর তৎকালীন অনৈতিক, জালেম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ তাঁর এসব নিদর্শনাবলি দেখেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন স্পষ্ট ভাষায় আমাদেরকে জানিয়ে দেন: “রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন বা বিপ্লবের পথ সম্পর্কে তিনি যে ধারণা পোষণ করতেন তদ্বিষয়ে আমি বা অন্যেরা একমত পোষণ না করলেও তাঁর বিশ্বাস ও নিষ্ঠা সম্বন্ধে সন্দেহের কোন সুযোগ তিনি কখন‌ও দেননি। তিনি নিজে যা বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তিগত জীবনেও তা পালন করতেন। তাঁর কবি খ্যাতি নিয়ে আইয়ুবী আমলে ধনৈশ্বর্যের মালিক হ‌ওয়া অত্যন্ত সহজ ছিল। তার চাইতে অল্প খ্যাতিমান অনেক লোক সে আমলীয় সুযোগের সদ্ব্যবহার করে যার যার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন; কিন্তু তিনি সে পথ ঘৃণাভরে বর্জন করেন। রাও ফরমান আলী, আলতাফ গ‌ওহর প্রমুখ ব্যক্তি তাঁর মালিবাগের অন্ধকার খুপরিতে নানা প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এসব ঘটনার দু’একটি জানি, কিন্তু তিনি ঘৃণাভরে সেসব উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন কি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের অতি সাধারণ প্রস্তাব‌ও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ৪৮ পৃষ্ঠা]

পাকিস্তানি শাসকদেরকে তিনি মোনাফেক বলে সম্বোধন করতেন। তাদের প্রতি যে ঘৃণা তার মনে জন্মেছিল সে-ঘৃণার একটি ক্ষুদ্র রূপ দেখি কবির রাজনৈতিক সহযোগী ফারুক মাহমুদের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে: “ন‌ওয়াব-নাইট, খাজা-গজা, জমিদার-জোতদারদের সংগঠন মুসলিম লীগ ইসলামের নাম নিয়ে ইসলামবিরোধী জুলুমে লিপ্ত। এদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু দেশের তরুণ সমাজ আর অশিক্ষিত জনসাধারণ মুসলিম লীগের সাথে ইসলাম ও পাকিস্তানকে এক করে দেখছে। মুসলিম লীগ কায়েম করছে পুঁজিবাদ আর এর প্রতিবাদে প্রসার লাভ করছে কমিউনিজম। এ স্রোতকে রুখতে না পারলে দেশ, সমাজ সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” [ফররুখ আহমদ সংকলন : বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি., ২০০৯, ৯৭ পৃষ্ঠা] কবির অন্তরঙ্গ অনুজ শেখ তোফাজ্জল হোসেনের জবানবন্দিতে শোনা যায়: “উনিশ শ’ একাত্তরের আগে তিনি কথায় কথায় পাকিস্তান সরকারকে মোনাফেক সরকার বলে গালি দিতেন। ঠিক নিজ সন্তানকে বিপথে যেতে দেখলে যেমন পিতা সোচ্চার হন। একাত্তরে সেই ফররুখ আহমদ হয়ে গেলেন নীরব। তাঁর সমস্ত বিশ্বাস আর ভালোবাসার শরীরে কে যেন থাবা বসিয়ে দিয়েছিল। তিনি পাঞ্জাবি-পাঠানদের কাজ-কারবারকে ঘৃণা করতেন, কিন্তু পাকিস্তান থাকুক এটা চাইতেন।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ২৪৩ পৃষ্ঠা]

এখানে একটা বিষয়ে আলাপ করা জরুরি। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ফররুখ আহমদের মতো সোচ্চার, প্রতিবাদী কণ্ঠ সমকালীন সাহিত্যিকদের মধ্যে দ্বিতীয়জন হয়তো পাওয়া যাবে না—তাদের প্রতি অন্তরে জন্ম নেওয়া ঘৃণার জঞ্জাল তাঁর মতো আর কেউ তেমন উগড়ে দিতে পারে নি—তথাপি তাঁর সাথে আমাদের বিরাট একটি তাত্ত্বিক প্রাচীর দাঁড়িয়ে যায়। পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম, অনৈতিকতা—সর্বোপরি শোষণের বিরুদ্ধে তিনি তীব্রতর, কিন্তু তিনি চান নি পাকিস্তান খণ্ডিত হোক, তিনি চান নি বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রের জন্ম হোক, তিনি সর্বদা চেয়েছেন পাকিস্তান শোষণমুক্ত হোক এবং অবশ্যই অখণ্ড থাকুক। আর আমরা চেয়েছিলাম, শোষণমুক্ত শাসক, মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন একটি সমাজ এবং শেষ প্রান্তে—বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রের জন্ম দিতে। তৎকালীন অখণ্ড পাকিস্তান শোষণমুক্ত হোক—এটা আমাদের সকলের চাওয়া, কিন্তু তিনি শোষণের নির্মম পরিণতি চান নি, আমরা চেয়েছিলাম—এখানেই তাঁর সাথে আমাদের বিরাট পার্থক্য। এখানেই তিনি আমাদের থেকে আলাদা হয়ে যান, আমাদের মাঝে থেকেও তিনি হয়ে যান পৃথক, আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েও তিনি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে নিরুত্তর। তিনি ধর্মীয় তথা ইসলামি জাতীয়তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতীয়তাকে ভ্রূক্ষেপ পর্যন্ত করলেন না! ইসলামকে এবং পাকিস্তানকে তিনি এক দৃষ্টিতে দেখেছেন—যে দৃষ্টিভ্রমের ফলে বাঙালি জাতির প্রতি তিনি কখনোই অনুরাগী ছিলেন না, ছিলেন না বাঙালি জাতীয়তার একজন ক্ষুদ্রতম সমর্থক‌ও। এর মূল কারণ, পাকিস্তান এবং ইসলামকে তিনি অভিন্ন ভেবেছেন এবং বাঙালি জাতীয়তার তত্ত্ব-ধারণাকে ইসলামবিরোধী ভেবেছেন। সৈয়দ আলী আহসানের আত্মজীবনীতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে, ফররুখ আহমদের এ দ্বান্দ্বিক ভাবনার ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস আর‌ও পোক্ত হয়: “১৯৭০-এর শেষে এবং ৭১-এর শুরুতে আমি ঢাকায় প্রায়ই আসতাম। তখনকার দিনে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটটি ঢাকায় খুব সুস্পষ্ট ছিল। ঢাকায় এলে সিকান্দার আবু জাফরের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতাম। ফররুখের সঙ্গেও দেখা হত। তখন ফররুখ কেমন যেন হতাশাগ্ৰস্ত হয়ে পড়ছিল। সে পাকিস্তানকে ইসলামের সঙ্গে সমার্থক ভেবেছিল, কিন্তু তার স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছিল। এই স্বপ্নভঙ্গের কারণে সে তখন নিজের পথ ঠিক করে নিতে পারে নি। একবার আমার সঙ্গে দেখা হলে বলেছিল, ‘আলী, আমাদের এখন চেষ্টা করতে হবে ইসলামকে রক্ষা করবার জন্য।’ আমি হেসে উত্তরে বলেছিলাম, ‘একজন মুসলমান হিসাবে আমি বিশ্বাস করি যে ইসলাম কখন‌ও বিপদগ্ৰস্ত হয় না। ইসলাম থেকে বিচ্যুতি ঘটলেই মুসলমানদের পতন ঘটে। মনে রাখতে হবে পাকিস্তান এবং ইসলাম এক নয়। পাকিস্তানে ইসলামকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু ইসলামকে কখনও অবলম্বন করা হয় নি।’ সেদিন ফররুখকে খুব ক্ষুব্ধ এবং হতাশাগ্ৰস্ত মনে হয়েছিল।” [সৈয়দ আলী আহসান, প্রাগুক্ত, ৩৭০ পৃষ্ঠা] ফররুখ আহমদের এমন পাকিস্তান-ভাবনার আর‌ও একটি সাক্ষ্য পাওয়া যায় আশরাফ ফারুকীর স্মৃতিচারণে: “পাকিস্তান আমলের শেষ নভেম্বরে কবির সাথে আমার দেখা তাঁর ইস্কাটনের বাসা-সংলগ্ন মসজিদে। আসর নামাজের ওয়াক্ত। নামাজের পর কবি আমাকে তাঁর বাসায় ডাকলেন। স্বাভাবিকভাবেই কথা উঠলো: দেশের ভবিষ্যৎ কি? আলাপ প্রসঙ্গে কবি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন: পাকিস্তানের মৃত্যু নেই। ইসলামের প্রবাহের মতোই এ দেশ চিরঞ্জীব একটি জাতির আবাসভূমি। এ আবাসভূমি আল্লাহ মিটিয়ে দিতে পারেন না। বহু মুজাহিদের জিহাদ, মুজাহিদের সংগ্রাম, শহীদের রক্তদান আর অগণিত মুমিনের দোয়ার বরকতে অর্জিত এ পাকিস্তান মিটে যেতে পারে না।” [ফররুখ আহমদ সংকলন, প্রাগুক্ত, ৯২ পৃষ্ঠা] এই যে পাকিস্তান নিয়ে তাঁর এমন পর্বতপ্রমাণ আত্মবিশ্বাস, এত নিটোল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এমন নিঃশঙ্ক ভাবনা—এসব কিছুর মূলে রয়েছে ইসলাম এবং পাকিস্তানকে অভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনার ভ্রান্তিপূর্ণ মনোজগৎ।

একটি প্রশ্ন থেকে যায়: ৪৩’র দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাময় দৃশ্যকে শব্দের আবরণে যে কবি ‘লাশ’, ‘আউলাদ’ প্রভৃতি গভীর মানবিকবোধসম্পন্ন কবিতা লিখতে পারেন সে কবি কেন ৬৯ থেকে ৭১ পর্যন্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি ‘মোনাফেক’দের জুলুম, বর্বরতার কোনো প্রতিবাদ করলেন না? কেন প্রতিবাদস্বরূপ দুয়েকটি কবিতার আশ্রয় তিনি নিলেন না? উত্তর খুব সহজ নয়। শেখ তোফাজ্জল হোসেনের ভাষায় বলতে গেলে, “একাত্তরে সেই ফররুখ আহমদ হয়ে গেলেন নীরব। তাঁর সমস্ত বিশ্বাস আর ভালোবাসার শরীরে কে যেন থাবা বসিয়ে দিয়েছে।” একটু চিন্তা করে দেখলে, আসলেই তাই! যে ফররুখ আহমদ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কখনোই পিছপা তো দূরের কথা, কুণ্ঠিত‌ও হন নি—সেই প্রতিবাদী ফররুখের দীপ্ত কণ্ঠস্বর একাত্তরে নিথর হয়ে গেল। কাব্য-সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজ‌উল্লাহ্‌র স্মৃতিখণ্ডে আমরা দেখতে পাই, ফররুখ আহমদ কবিতার খরা প্রসঙ্গে বলেছেন: “কলম কামড়িয়ে আমি কোনদিন কবিতা লিখিনি, কিন্তু অধুনা লিখতে গিয়ে বেশ ভাবতে হচ্ছে। তাই আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে আর ভাবনাকে ভাষা দিতে পারছি না। চারপাশের অবস্থা দেখে মন বেদনায় বিষিয়ে যাচ্ছে।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৩৭ পৃষ্ঠা] দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও গবেষক, একসময়ের জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জবানেও এ প্রসঙ্গে ফররুখ আহমদের বক্তব্য শোনা যায়: “ফররুখ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো, লেখার প্রসঙ্গে বললেন, কি আর লিখব বল্, দেশের এই তো অবস্থা—কিছু লিখতে ইচ্ছা করে না।” [প্রাগুক্ত, ১২২ পৃষ্ঠা] কিন্তু এটাও তো সত্য, তিনি হানাদার, রাজাকার, পাকিস্তানি যোদ্ধাদের জন্য‌ও কিছু লিখেন নি—তিনি ছিলেন নীরব, তাঁর কলম ছিল নিথর—মূলত তাঁর এ আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত নীরবতার জন্য‌ই তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়, দোষী করা হয়। অধ্যাপক আখতার ফারূক বলেছেন: “একাত্তরের সামরিক পদক্ষেপের পর মাঝে মাঝে আমরা মিলতাম। তিনি একদিকে পাঞ্জাবিদের মূর্খতাজনিত বাড়াবাড়ি ও অন্যদিকে ভারতের ষড়যন্ত্রমূলক কারসাজি, দুটার‌ই তীব্র সমালোচনা করতেন। বলতেন, “এ শয়তানীর খেসারত দু’পক্ষকেই দিতে হবে।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ৭৬ পৃষ্ঠা] ৭১’র নৈতিক প্রশ্নে—পাকিস্তান এবং ইসলামকে অভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনার ভ্রান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তে অটল থেকে একটি দ্বন্দ্বপূর্ণ ভাবনার দোলাচলে ফেঁসেছিলেন ফররুখ আহমদ, যে দোলাচলেই তিনি কাটিয়েছেন আমৃত্যু।

এখানে একটি মজবুত প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়: তাঁর প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কি তিনি মেনে নিয়েছিলেন? বাঙালি জাতীয়তার প্রশ্নে অর্জিত এ স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা কী ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আশরাফ ফারুকীর বক্তব্য হচ্ছে: “বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তিনি যে এর বাস্তবতাকে কবুল করে নিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ বেতারে’ তাঁর চাকরি গ্ৰহণ করার মধ্য দিয়েই তা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।” [ফররুখ আহমদ সংকলন, প্রাগুক্ত]  মনে রাখতে হবে, এ বক্তব্য ফররুখ আহমদের নয়; একান্তই আশরাফ ফারুকীর। এ বক্তব্যের যৌক্তিকতা‌ও ওজনে কম নয়—যদি বাংলাদেশকে বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে তিনি কবুল‌ই না করবেন তাহলে সে দেশের অধীনে বেতারকেন্দ্রের চাকরি কবুল করবেন কেন? ১৯৭২ সালে বেতারের চাকরিতে বহু গোলযোগের পর—তরুণ আহমদ ছফার একটি তীক্ষ্ণ ধারাল প্রতিবাদী প্রবন্ধের জোর এবং তৎকালীন অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের চেষ্টায় ১৯৭৩ সালের জুন-জুলাই মাসে সকল গোলযোগ কাটিয়ে যখন তিনি বেতারকেন্দ্রের চাকরিতে পুনর্বহাল হন তখনই কি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকার করে নেন নি? অত্যন্ত শক্ত প্রশ্ন। সরকারি বেতারকেন্দ্রের চাকরি গ্ৰহণের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়ার দাবি অগ্রাহ্য করা যায় না; কিন্তু আমাদের চিন্তার মোড় ঘুরে যায় তখন, যখন আমরা কবি ও ছড়াকার ফজল-এ-খোদার স্মৃতিচারণে দৃষ্টিপাত করি: “কথার ফাঁকে আমার এক সঙ্গী ফররুখ ভাইকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে, আপনি খুশি হননি?’ লক্ষ্য করলাম, ফররুখ ভাইয়ের মুখটা আর আগের মত স্বাভাবিক নেই, কেমন থমথমে আর শক্ত। মুহূর্তেই তিনি যেন বদলে গেলেন। বললেন, ‘আমার ব্যক্তিগত খুশি-অখুশিতে কি আসে যায়! আমি আগেও যা ভাবতাম, এখনো তাই ভাবি। আমি মুসলমান, এ কথাটাই আমার কাছে বড়।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ২১৫ পৃষ্ঠা] দেশের স্বাধীনতায় খুশির কথা জিজ্ঞেস করায় মুখের থমথমে আর শক্ত ভঙ্গিমায়, মুহূর্তেই বদলে যাওয়ায় এবং ‘আমি মুসলমান’ কথাটাকেই বড় বলে প্রকাশ করার মধ্যে কি কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না? আমরা সচেতন দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তিনি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ স্বাধীনতার পর কবিতা লেখার খরা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কবি জবাব দিয়েছিলেন: “কবিতা লেখায় আর উৎসাহ নেই। দেখিস না, এখানকার সিলেবাস থেকে আমার কবিতা বাদ দিয়েছে।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ১৯০ পৃষ্ঠা] জবাবখানায় কবিতা না লেখার ‘কারণ’র চেয়ে বেশি দেখা যায়, স্বাধীনতার পর সিলেবাস থেকে কবির কবিতা বাদ দেওয়ার কারণে অন্তরে সৃষ্ট হাহাকারের আর্তনাদ। কবি ফজল-এ-খোদার স্মৃতিচারণ থেকে আমরা এ ব্যাপারে আরও সাক্ষ্য পাচ্ছি: “কথায় কথায় মুকুল ভাই ফররুখ ভাইকে বাংলাদেশের উপর অন্তত একটি গান লেখার অনুরোধ করলেন। উত্তরে ফররুখ ভাই বললেন, মুকুল, তুই আমাকে এ অনুরোধ আর করিস না। আমার এখন লেখার মতো মানসিকতা নেই।” [উপরিউক্ত, ২১৬ পৃষ্ঠা] আসলেই কি তখন মানসিকতা ছিল? যাঁর একান্ত বিশ্বাসকে জবাই করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন তাঁর বাংলাদেশকে নিয়ে গান লেখার মানসিকতা থাকবে না—এটাই কি স্বাভাবিক নয়? ফররুখ আহমদের এ স্বাভাবিক মানসিকতাকে আমাদের মেনে নিতে হবে; না মেনে উপায় নেই।


পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের পতন তিনি চাইতেন সবসময়, কিন্তু সাথে পাকিস্তান অখণ্ড থাকুক এটাও চাইতেন—ধর্মের দোহাই দিয়ে। 


স্বাধীনতার পর অধ্যাপক আখতার ফারূক গিয়েছিলেন ফররুখ আহমদের সাথে দেখা করতে। আখতার ফারূকের জবানবন্দিতে আমরা শুনি ফররুখ আহমদের বক্তব্য: “দেখ ফারূক, আমরা বড় অপ্রয়োজনীয় কাজে মেতে উঠেছিলাম। আল্লাহ তাই আমাদের এক থাপ্পড় দিয়ে বসিয়ে দিলেন কাজের কাজ করার জন্য। এই দেখ, আমি শিশুদের অ, আ, ক, খ থেকে এম. এ. ক্লাস পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ের পরিকল্পনা দাঁড় করিয়ে ফেলেছি। শুধু ইসলাম-ইসলাম স্লোগান‌‌ই চলেছে এতদিন। ইসলাম বাস্তবায়নে নিখুঁত পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। নেবে কে? নেবেই বা কেন? পঁচিশ বছর তো শুধু মোনাফেকের রাজত্ব চলেছে। আল্লাহ মোনাফেকদের বিদায় দিয়েছেন, এবার সঠিক ইসলামের অভ্যুদয় ঘটবে; তার‌ই প্রস্তুতিপর্ব আমাদের সম্পাদন করতে হবে। সময় কম, কাজ অনেক। পুরোদমে কাজ করে যাও।” [শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, প্রাগুক্ত, ৭৬ পৃষ্ঠা] স্বাধীনতার পর‌ যেভাবে তিনি পাকিস্তানি শাসকদের মোনাফেক বলে গালি দিচ্ছেন, তদ্রূপ সঠিক ইসলামের অভ্যুদয়ের জন্য ‘ইসলাম বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের স্বপ্নেও তিনি পূর্বের মতোই বিভোর। বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের পর‌ও তিনি ইসলামি আদর্শের বাস্তবায়নকল্পে পূর্বের মতোই স্বপ্ন দেখেছিলেন, কাজ চালু রেখেছিলেন—ফররুখ আহমদের ‘ইসলামি জাতীয়তাবাদ’র দর্শন ও বিশ্বাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চিড় ধরাতে পারে নি। ফররুখ আহমদের “আমি আগেও যা ভাবতাম, এখনো তাই ভাবি” বক্তব্যের দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, স্বাধীনতার পর তাঁর অখণ্ড পাকিস্তানের সাথে ইসলামকে অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার  ভাবনা, মানসিকতা দুমড়ে মুচড়ে গেলেও ‘ইসলামি জাতীয়তাবাদ’র ভিত্তিতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশ্বাস আমরণ অটল, অবিচল ছিল। ফররুখ আহমদ অবশ্যই মানবিক ছিলেন, মানবিকবোধে সর্বদাই ফররুখ-মানস ছিল আচ্ছন্ন; কিন্তু ‘কবি ফররুখ মানুষের মুক্তির ও মানবিক বিকাশের পথ সন্ধান করেছেন ইসলামি আদর্শবোধ থেকে।’ ফররুখ আহমদ রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে অবশ্যই আমূল পাকিস্তানপন্থি ছিলেন, কিন্তু প্রচলিত অর্থে নয়—হেয় বা তাচ্ছিল্যকর অর্থে ও উদ্দেশ্যে তাঁকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ বললে অবশ্যই অবিচার হবে।

ফররুখ আহমদের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক মানসের ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহিত্য-সমালোচক আবদুল হকের তত্ত্বনিবিষ্ট ও সৎ আলোচনা আমাদের সকলেরই অবশ্যপাঠ্য: “খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে পাকিস্তানের আদর্শ হিসেবে গ্ৰহণ করলে সে রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র‌ই হবে, অধিকন্তু কমিউনিজমের জড়বাদ থেকে মুক্ত হ‌ওয়ায় পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উন্নততর রাষ্ট্র হবে—এই ছিল ফররুখ আহমদের দৃঢ় বিশ্বাস। ইসলামি আদর্শের রূপায়ণ এবং প্রচার পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতির অঙ্গ হ‌ওয়া উচিত, এই ছিল ফররুখ আহমদের দৃঢ় অভিমত। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সমগ্র পৃথিবীতে কমিউনিজম প্রচারের নীতি গ্ৰহণ করতে পারে তাহলে পাকিস্তান সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামি আদর্শ প্রচারের নীতি গ্ৰহণ করবে না কেন, এই ছিল তাঁর যুক্তি। নিজের রচনায় এই কাজ‌ই তিনি আমৃত্যু করেছেন। কোনো একটা বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাত এবং ধর্মীয় আদর্শ প্রচার কোনো ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্রের‌ই উচিত নয়, এটা তিনি কোনোদিনই স্বীকার করেন নি। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শে এবং সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণায় যে কোনো ভ্রান্তি থাকতে পারে, এ কথা জীবনের শেষদিন অবধি‌ও তিনি বুঝে ওঠেন নি, এমনকি হয়তো ভেবেও দেখতে চান নি। ফররুখ আহমদের কাব্য বিচারকালে সবসময় মনে রাখতে হবে, বস্তুত তাঁর সমালোচকদের মনে রাখতে হবে, তিনি একান্তভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের সৃষ্টি। কিন্তু এ আন্দোলনের যাবতীয় তাৎপর্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন একথা বলা কঠিন। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল সাম্প্রদায়িক জাতীয়তার আবরণে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন, ধর্মীয় আন্দোলন নয়। এর মূল কথা ছিল প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের সংঘাত। তথাপি ফররুখ আহমদ শেষ অবধি বিশ্বাস করেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অর্থ‌ই ইসলামি আদর্শাবলির পুনরুজ্জীবন। কালের দূরত্বে সাম্প্রতিকতা এবং আধুনিকতার বৈষম্য এক সময় মসৃণ মনে হ‌ওয়া সম্ভব, তথাপি তাঁর মানসপ্রকৃতি এবং কাঙ্ক্ষিত আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যতটা পাকিস্তানের কবি, ততটা বাংলাদেশের নন। কখনো সক্রিয় রাজনীতি না করলেও ফররুখ আহমদের চেতনার শিকড় এ দেশের রাজনীতিতে প্রোথিত, কিন্তু সে এক বিশেষ রাজনীতি : বাংলাদেশের দিক থেকে দেখতে গেলে তাঁর চেতনা চল্লিশের দশকের পাকিস্তান আন্দোলনের লক্ষণগুলিকে অতিক্রম করে আর বিশেষ অগ্রসর হতে পারে নি। তিনি ওই এক বিশেষ কালের শিকার।”

সারকথা হলো, ফররুখ আহমদ কখনোই বাঙালি জাতীয়তাকে মেনে নেন নি—বাংলা ভাষার পক্ষে তিনি যথেষ্ট সোচ্চার ছিলেন, ‘ইসলামি সংস্কৃতি হত্যা’ না হ‌ওয়ার জন্যে। পাকিস্তান ছিল তাঁর ইসলামি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নের দেশ—কিন্তু অখণ্ড পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সর্বপ্রকার জুলুম, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সর্বদা শক্ত প্রতিবাদী। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের পতন তিনি চাইতেন সবসময়, কিন্তু সাথে পাকিস্তান অখণ্ড থাকুক এটাও চাইতেন—ধর্মের দোহাই দিয়ে। ফররুখ আহমদের রাজনৈতিক দর্শনের মূলভিত্তি ধর্ম তথা ইসলাম—ইসলামি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং আমূল বিশ্বাসী ফররুখ তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মেনে নেন নি, নিতে পারেন নি। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাঠামোতে দাঁড়ানো বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ফররুখ আমরণ অস্বীকার করেছেন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে, বিশ্বাসে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র দর্শন “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি”; ফররুখ আহমদের দর্শন এক্ষেত্রে, “আমরা বাঙ্গালি যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা মুসলমান”—এ দর্শন ফররুখ আহমদ আমৃত্যু বহন করেছিলেন বলেই বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন দেশকে তিনি ‘বিজয়’ হিসেবে গ্ৰহণ করতে পারেন নি, গ্ৰহণ করেছেন অখণ্ড পাকিস্তানকে নিয়ে জন্মানো তাঁর বিশ্বাসের ‘ঘাতক’ হিসেবে।

৩.
ফররুখ আহমদ ধর্মীয় মতাদর্শের দিক থেকে, ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট শান্তিপূর্ণ পন্থা সুফিধারার একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। রাজনৈতিক দিক থেকে, ধর্মীয় তথা ইসলামি জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। ফররুখ আহমদের ক্ষেত্রে, ধর্মীয় মতাদর্শের সাথে রাজনৈতিক মতাদর্শের মিল ঘটে নি, ধর্মীয় মতাদর্শে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ পরিশোধিত হয় নি—কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, সুফিরা কখনোই ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠা জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন নি। আর সেজন্যই, ফররুখ আহমদের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ স্বচ্ছ হলেও একটি অপরটির বিপ্রতীপ কোণে অবস্থিত।


১. ফররুখ আহমদ রচনাবলী প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড : আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৫
২. ফররুখ আহমদ ব্যক্তি ও কবি : শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮৩
৩. ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য : আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৩
৪. জীবনের শিলান্যাস : সৈয়দ আলী আহসান, ২০০২
৫. ফররুখ প্রতিভা : মুহম্মদ মতিউর রহমান, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ১৯৯১
৬. ফররুখ আহমদ সংকলন : বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি., ২০০৯

(623)