হোম গদ্য কবির স্বদেশে এক অন্ধ প্রজাপতি

কবির স্বদেশে এক অন্ধ প্রজাপতি

কবির স্বদেশে এক অন্ধ প্রজাপতি
416
0

এদেশে ভোর বলে কিছু নেই। রোশনাই আছে, যা সকালের মতো মনে হয়। বিরাট আকাশতলা বাড়িগুলোর নিচে মানুষের বস্তি মড়ার মতো জেগে থাকে। এই বস্তিতে হাওয়া আসে না। এখানে কোনো জানালা নেই। এখানে গুটিপোকা থেকে বড়ো হওয়া এক অন্ধ প্রজাপতি ঘুরে মরে দিবস-রজনী। এই বস্তির কোনো এক অচেনা গলির দেয়ালে একটি হারিয়ে যাওয়া কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি চোখে পড়ে—

“অসীম করুণা তার, ঐ বদ্ধমঞ্চ, যাকে বলি মাতৃভূমি :/ জহ্লাদেরা প্রেম বিলায় কোলের শিশুকে..”

আশ্চর্য ওই কবিতার গায়ে বসে থাকে সেই অন্ধ প্রজাপতি। সে তার শুঁড় বুলিয়ে ছুঁয়ে নিতে চায় প্রতিটি অক্ষর। সে তো দেখতে পায় না,  তাই বুঝে নিতে চায় ভারতবর্ষে কতটা অনড় এই রাত। ছুঁতে ছুঁতে সে টের পায়, কবিতার গায়ে এক মধুহীন কৃষ্ণ স্বদেশ জেগে আছে। সে স্বদেশ ভরে আছে জহ্লাদের প্রেমে, ধর্ষিত শিশুর লাশে, বধ্যমঞ্চের অসীম করুণায়।

“কবিরা কবিতা লেখে, দেশপ্রেম ক্রমে গাঢ়তর হয় গর্ভের/ ভিতর রক্তপাত”


বহুদিনের সেই আশ্চর্য কবিতাটি জেগে থাকে প্রাণের প্রহরায়।


এই গলিতে একদিন এক কবি আসতেন। তিনি এই ছেঁড়া ছেঁড়া মানুষের দুঃখ চিনতে চিনতে হেঁটে যেতেন বাতাসহীন বদ্ধ ফুটপাতে। দেখতেন এখানেও চাঁদ ওঠে, এখানেও বর্ষা আসে, “কালো মেঘের ফিটন চড়ে/ কালীঘাটের বস্তিটাতেও আষাঢ় এল।/ সেখানে যত ছন্নছাড়া গলিরা ভিড় করে/ খিদের জ্বালায় হুগলি-গঙ্গাকেই/ রোগা মায়ের স্তনের মতো কামড়ে ধরে/ বেহুঁশ পড়ে আছে।” দেখতেন, “ন্যাংটো ছেলে আকাশে হাত বাড়ায়/ যদিও তার খিদেয় পুড়ছে গা/ ফুটপাতে আজ জেগেছে জোছনা :/ চাঁদ হেসে তার কপালে চুমু খায়।/ লুকিয়ে মোছেন চোখের জল মা।” এই চাঁদ এই বরষার জল তাদের জীবনকে শীতল করে নি। তাদের সবকিছুই তো লুট হয়ে গেছে। কালো বস্তিতে আজো সূর্য আসে নাকো। কবি শুনতে পেতেন, তারা বলছে, “আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে/ কারা যেন আজো ভাত রাঁধে/ ভাত বাড়ে ভাত খায়।/ আর আমরা সারারাত জেগে থাকি/ আশ্চর্য ভাতের গন্ধে/ প্রার্থনায়, সারারাত।”

এখন কেউ এই গলিতে আসে না। নতুন কোনো কবিতাও কেউ টাঙিয়ে রাখে না দেয়ালে দেয়ালে। শুধু বহুদিনের সেই আশ্চর্য কবিতাটি জেগে থাকে প্রাণের প্রহরায়। নরকের চোখের দিকে আঙুল তুলে তার বিবাহকে ঘৃণা করে যায় একাকী। প্রজাপতি টের পায় কবিতার অক্ষরগুলো অনেক পুরোনো, তবু তার গায়ে মরচে ধরে নি।

বেচারা পতঙ্গটির চোখ নেই, তবু কবিতাটি ছুঁয়েই সে বুঝে ফেলে বস্তি পার হলেই বিরাট বাগান। বাগানের পাশে মলেমলে মাখামাখি আকাশি চাঁদোয়া, রাত সাজানোর বিপুল সার্কাস আর মেলায়-মঞ্চে কবিদের আত্মপ্রতারণা। কবিদের চোখ আকাশের দিকে। উপর থেকে কিছু গড়িয়ে নামলে তা ধরার জন্য প্রবল মৌলিক তাদের কাব্যময় হাত। এই বাতাসহীন গলিপথ তাদের কাছে অচেনা। তারা জেনে ফেলেছে, পায়ের নিচে কংক্রিট আর মাথার উপর রাষ্ট্রীয় প্রেরণাটি বড়ো দরকারি। অন্ধ গলিতে নেমে উনুনের আঁচে পোড়া কবিতার প্রয়োজন নেই আজ। তাতে ভয় আছে। দেশপ্রেমিকেরা জেগেছে এখন।

“মুণ্ডহীন ধড়গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে, “রঙ্গিলা! রঙ্গিলা”!/ কী খেলা খেলিস তুই/ যন্ত্রণায় বসুমতি ধনুকের মতো বেঁকে যায়—”

পাহাড় নদী অরণ্য থেকে, খেত খলিহান থেকে, বসতি বাস্তু থেকে উৎখাত না হতে চাওয়া নিরন্ন মানুষের ছিন্নভিন্ন লাশের স্বদেশে এই আশ্চর্য কবিতারা জেগে থাকে। প্রবল ঘৃণায়, শ্লেষে উচ্চারিত হওয়া পঙ্‌ক্তিগুলোর তর্জনী ছুঁয়ে দেখে অন্ধপতঙ্গ আরেকবার, “আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে/ ছিঁড়ুক সর্বাঙ্গ তার ভাড়াটে জহ্লাদ/ উপড়ে নিক চক্ষু জিহ্বা দ্বিবা-দ্বিপ্রহরে/ নিশাচর শ্বাপদেরা; করুক আহ্লাদ/ তার শৃঙ্খলিত ছিন্নভিন্ন হাত-পা নিয়ে শকুনেরা। কতটুকু আসে যায় তাতে/ আমার, যে আমি করি প্রত্যহ প্রার্থনা,/ ‘তোমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’।” অক্ষরগুলো কথা বলে। তারা দেখায় এই দেশে মু্ণ্ডহীন ধড়েদের চৈতন্যলুপ্ত চিৎকার কী নিদারুণভাবেই না অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই গাঢ় আঁধারের ভেতর কুৎসিত ‘রঙ্গিলা’ উল্লাসে কেউ আর লজ্জিত নয়। ‘কবিতা আছে বড়ো অপমানে’।


আলোহীন এই দেশ যেন এক আস্ত জেলখানা।


সে টের পায়, আলোহীন এই দেশ যেন এক আস্ত জেলখানা। যারা মানুষের গান গায় তারা বন্দি। যারা আলোর কথা বলে তারা স্বরাষ্ট্রচিহ্নিত। আজ কে-ই বা বলবে সক্রোধে—তোমাকে ঘেন্না করি খুনি! তুমি চুলোয় যাও! কারাকুঠুরি ভেঙে আমরা ছিনিয়ে আনব প্রাণবন্ত হাসির স্বদেশ! তবু শূন্যতা ভরিয়ে সেই পুরোনো পঙ্‌ক্তিগুলোই জ্বলছে এখনো। সে তাতে শুঁড় বোলায়, বুঝতে পারে, অক্ষরে অক্ষরে আঁকা পুরোনো কবিতার ধ্রুবপদে সময়ের রক্ত ঝরে পড়ছে। “এই নরকে কীসের কবিতা,/ কার জন্য বা?/ যেদিকে যাই, মানুষখেকো লাফা;/ আকাশ কাঁপায়!/ মানুষ যারা, কেউ করে না রা!/ কী তার বাহবা!”

পতঙ্গের স্বপ্নের ভেতর অনেকদিনের শহর জেগে ওঠে। সে দেখতে পায়, একজন কবি হেঁটে যাচ্ছেন বোবা জনপদে। কিছুদিন আগে এই শহরে একজন কবিকে হত্যা করা হয়েছে। জেলখানায় আরেকজন কবিকে পিটিয়ে মেরেছে সেপাই। বহু তরুণের লাশে রঞ্জিত হয়ে আছে এ নগর। কবি হাঁটছেন, নিঃসঙ্গ, একাকী। তার হাতে কবিতার ইশতেহার। রাস্তার দুপাশে বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ। তারা গেছে পোয়েট্রি কনফারেন্সে। অথবা বিবেক লুকিয়ে রেখেছে চারদেয়ালের নিরাপত্তায়। তিনি প্রতিবাদ করে বলছেন, “যারা এই শতাব্দীর রক্ত আর ক্লেদ নিয়ে খেলা করে/ সেইসব কালের জহ্লাদ/ তোমাকে পশুর মতো বধ করে আহ্লাদিত?/ নাকি স্বদেশের নিরাপত্তা চায় কবির হৃৎপিণ্ড”  তীব্র ঘৃণা ঝরছে পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে, “গুলি চলছে, গুলি চলছে, গুলি চলবে—এই না হলে শাসন?/ ভাত চাইলে গুলি, মিছিল করলে গুলি,.. দেশের মানুষ না খেয়ে দেয় ট্যাক্স, গুলি কিনতে, পুলিশ ভাড়া/ করতে, গুন্ডা পুষতে ফুরিয়ে যায় তাই।/ একেই বলে গণতন্ত্র; এরই জন্য কবিতার সর্দার সাহিত্যের মোড়লরা/ কেঁদে ভাসান; যখন/ গুলিবিদ্ধ রক্তে ভাসে আমার ঘরের বোন আমার ভাই।” তীব্র ব্যাঙ্গে গূঢ় মৌনতার প্রতি উচ্চারিত করছেন তার তীক্ষ্ণ ধিক্কার, “যা লেখো যা ইচ্ছে লেখো কিন্তু খবরদার,/ দিও না সাপের লেজে পা,/ বোলো না, নরখাদক বাঘ মানুষের মাংস খায়—/… বদলেয়ার ভেঙে খাও, স্বপ্নে দেখো নাজিম হিকমত/ অনুবাদ করো পাবলো নেরুদা”।

স্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠে প্রজাপতি। সে অনুভবে দেখে কিছুই বদলায় নি চারপাশে। শুধু জেলখানার পাঁচিলগুলোর পালটে গেছে রং। নিয়নের ভণ্ডামি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে রাতের নরক। রাষ্ট্র হয়েছে আরো বেশি নগ্ননখর, গণহত্যাকারী। আর এখানে ওখানে ‘দেড়-আঙুলে বামনের আড়াই বিঘত লম্ফে ডগমগিয়ে’ উঠেছে কবিসভাগুলো। এদেশে “রাজা আসে রাজা যায়/ শুধু পোশাকের রং বদলায়/ শুধু মুখোশের ঢং বদলায়..” দিন বদলায় না। যারা বদলে দেবার কথা বলেছিল একদিন, আজ তারা অনেকেই ক্ষমতার স্বপ্ন মেখে হয়ে গেছে রাষ্ট্রদোসর, “লালটুকটুকে একটুকরো কাপড়/ সময় তাকে রাজা বানায়/ আবার, সময় যখন দুঃসময়/ সেই কালবেলায়/ লাল নিশানকে নিয়ে কী খেলা,/ কী সর্বনাশের ভয়ংকর খেলাই/ তোমরা দেখাও!  তোমরাই!  যারা একদিন/ আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়েছিলে”। তবুও দেয়ালজুড়ে আঁকা সেই কবিতার আগুনে কিছু মানুষ পথ হাঁটছে। তারা গুলি খেয়ে মরছে। তারা ভরিয়ে তুলছে কারাগারগুলো। মানুষের কবি বলছেন” যতদিন/ বিনাবিচারে/ বিচারের নামে/ বিচারকে উপহাস করে/ এই দেশের জেলখানায়/একটি মানুষকেও/ কুকুর-শেয়ালেরা নির্যাতন করবে,/ ততদিন/ তোমরা স্বীকার করো না/ এই দেশে/ গণতন্ত্র বলে/ ব্যক্তি-স্বাধীনতা বলে/ শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতা বলে/ কিছু আছে :/ তোমরা/ কিছুতেই মেনে নিও না/ মানুষ/ এবং মনুষ্যত্বের/ এতবড়ো অপমান।”


ঘুমের মধ্যে জলভরা মেঘ, জাগরণে, জন্মভূমির মাটি।


প্রজাপতি ঘাড় উঁচু করে অনুভব করে, তার মাথার উপর এক শতবর্ষ প্রাচীন নক্ষত্র এসে দাঁড়িয়েছে। সে শোনে, সেই নক্ষত্র তাকে বলছে, “তুই সমস্ত রাত জেগে/ নতুন করে পড়,/ জন্মভূমির বর্ণপরিচয়!” তুই-ই তো আমার বিকলাঙ্গ স্বদেশ। ভোর দেখবি বলে জন্মেছিলি, তাই তোর চোখ ফুটল না। তবু সারা রাত তুই ভোরের স্বপ্ন দেখ—

“তোর কি কোনো তুলনা হয়?/ তুই/ চোখ বুজলে হিম সাগর, চোখ মেললে অনন্ত নীল আকাশ!/ বুকের মধ্যে সমস্ত রাত তুষার ঢাকা পাহাড়/ সমস্ত দিন সূর্য-ওঠার নদী../ তোর কি কোনো তুলনা হয়?/ তুই/ ঘুমের মধ্যে জলভরা মেঘ, জাগরণে, জন্মভূমির মাটি!”


কবিতাংশগুলো উল্লিখিত হয়েছে ‘বীরেন্দ্র সমগ্র’ [অনুষ্ঠুপ, ১৯৮৮] ও বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘নির্বাচিত কবিতা’ সংকলন থেকে।

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

পুরস্কার :

এপার-ওপার সাহিত্য সম্মান [২০১৮]

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com