হোম গদ্য কবির ক্যারাভান

কবির ক্যারাভান

কবির ক্যারাভান
182
0

hold infinity in the palm of your hand, and eternity in an hour.
                                                                                                   —Blake

১.
শিল্পের শর্ত কিভাবে একজন পূরণ করবেন, কিভাবে-বা রপ্ত করবেন শিল্পের অধিকার, তার মীমাংসা পূর্ব-নির্ধারিত পথ ধরে চলে না। পূর্বনির্দিষ্ট যা কিছু আমরা দেখি, শিল্পের ক্ষেত্রে, একথাও ঠিক যে, সবটাই তার হারানো ফুরানো নয়। এজন্য হাজার বছরের পুরোনো কোনও ফর্মে, নিজেকে গহিনে মগ্ন করে রেখে, অন্যকিছু, অন্যকিছু বলতে, প্রায় দেখতে একইরকম কিন্তু কোনোভাবেই একইরকম নয়—এমন এক অভিনব প্রাণসঞ্চারের কাজে লিপ্ত হতে পারেন কেউ। এ অনেকটা বহু পুরোনো ঘরে নতুন এক ‘আমি’র সত্য বা সত্যানুসন্ধান।

২.
মুজিব মেহদী-র হাইকু, বাইকু আর সেনরু-র জগতে ঢুকে কথাগুলো মনে এল। কেন হাইকু? প্রায় দু-যুগ তিনি যে-ধরনের কাব্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন, সেসবের থেকে অনেকখানি দূরের এই অতি-সংক্ষিপ্ত মনোলোভা ফর্মে কেন-বা মজলেন তিনি? তবে কি একথাই একভাবে সত্য যে, কবিজীবনের ক্রমপরিণতির দিকে যেতে যেতে, কবিতা থেকে কথার চাপ কমে এসে তা সৌন্দর্য-আকরিক হতে থাকে? অাত্মখননের এই পর্যায়ে, বিন্দুতে সিন্ধু উপলব্ধি করার এইই হয়তো শ্রেষ্ঠ উপায়। একটু উঁকি দিয়ে দেখি পাঠককে সঙ্গে নিয়ে, সেই খনন বা উড্ডয়ন কেমন—

              চৈত্রমাস
              জুমঘরে বিকেল
              রান্না হচ্ছে


দিকে দিকে, সমগ্র বিশ্বে, যোনির কূটনীতি! আশ্চর্য এক মোহমুদ্‌গর। ভোগবাদের সাথে মানুষের চিরকালের যোঝাযুঝি।


একটি নিটোল ঘরগেরস্থালির ছবি। যেন একটা শ্রমঘন জীবনের জৈব-জঙ্গমতা। শান্ত একটা ছবির মধ্যে প্রশ্নগুলো শান্তভাবে রাখা। রান্না যে হচ্ছে, এ কি রাতের কোনো আয়োজন? আবার পরক্ষণেই হয়তো মনে হবে, এরা হয়তো কাজের চাপে দুপুরে রান্নার অবকাশই পায় নি! এমন যে মনে হলো, তা হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নয়, সেইসব মানুষ, যারা সংখ্যায় অগণন, তাদের জীবন তো এভাবেই আবর্তিত হয়ে চলেছে, জীবনের ছোট-বড়ো কাজ সেইখানে সুন্দরের বেশে এসে ধরা দিতে থাকে। বিশেষ কিছু সংবাদ নয়, পেট পুরে খাবে, আনন্দ-বেদনায় ডুবে যেতে যেতে ঘুমাবে, আবার চৈত্রের দাবদাহকে গ্রাহ্য না করে নেমে পড়বে কাজে।

ঘুম বা জাগরণে এখানে কী ঘটছে দেখা যাক—

              নৈঃশব্দ্য
              লম্বা দিয়ে আছে
              অন্ধকারে

এর আগে শ্রমজীবী মানুষের ইতিবৃত্ত ভাবতে চাইছিলাম, আর এখানে নৈঃশব্দ্য নিজেই একটা চরিত্র হয়ে অন্ধকারে নিজেকে স্থাপিত করছে। বিমূর্ততা একটা মানুষী-রূপ ধরে থম মেরে আছে যেন রাতের ভেতর। কারও নৈঃশব্দ্য নয়, নৈঃশব্দ্য যেন সমাজপর্যুদস্ত কোনো ব্যক্তি। লম্বা দিয়ে আছে, ক্রিয়াপদের এই ব্যঞ্জনাই একে বিশিষ্ট করে তুলছে। নৈঃশব্দ্যের শুয়ে থাকাটা তাই দিগন্তবিস্তারী বলে মনে হচ্ছে এখানে। বিমূর্ততার এই এক ক্ষমতা, ব্যক্তি ছাড়িয়ে, সমাজ ছাড়িয়ে, তা সর্বব্যাপী হয়ে উঠতে চায়।

বিমূর্ততা কখনো কখনো ফের ছবি হয়ে ফিরে আসে।

              লৌহদ্বীপ
              রহস্যগভীর
              আত্রাইয়ে

ছবিই কেবল। যার ব্যাখ্যা করতে বসলে ভণ্ডুল হয় সৌন্দর্য। কী নেই এতে? চরাচরে ভেসে ওঠা লৌহদ্বীপ, তা তো আর লৌহদ্বীপমাত্র নয়, এ অন্যকিছু। কী সেই অন্যকিছু? একবার যাকে নিছক প্রকৃতি বলে মনে হবে, পরক্ষণেই মনে হবে যৌনতা। আবার সেটাই মুছে গিয়ে কারো মনে হতে পারে, এ বুঝি ক্ষমতাকেন্দ্রের কোনো আভাস।

যৌনতা, মুজিব মেহদীর এই লেখাগুলোতে ঘুরে ফিরে এসেছে, আর সেসব কোনো উস্কানো ব্যাপার নয়। একটি সেনরুতে দেখতে পাচ্ছি সেই চিহ্ন, যেখানে শরীরভাষা বোঝার ছলে, আসছেন কামের ঘাটে। বোঝার জন্য, আর কিছু নয়। অবলোকন, সময়ের নিজের চরিত্রই এই, অবলোকনের ভেতর দিয়ে অনুধাবনে পৌঁছে দেবার গোপন বাসনা। তবে এই যাত্রা রোমান্টিকতা বা ফ্যান্টাসির দিকে নয়—

              মাড়াইকাল
              নষ্ট হলো গাড়ি
              মদনপুর
বা
              জয় করেছে
              যোনির কূটনীতি
              কামবিশ্ব

দিকে দিকে, সমগ্র বিশ্বে, যোনির কূটনীতি! আশ্চর্য এক মোহমুদ্‌গর। ভোগবাদের সাথে মানুষের চিরকালের যোঝাযুঝি। দ্বন্দ্ব ও বেদনা। বা জয়। সবটাই ওই ফিজিক্যাল ফেনোমেনাকে ঘিরে। আবার কোনো মদনপুরে পৌঁছানো যে যাবে না, যেতে পারে না কেউ কেউ, তার যৌবনরূপ গাড়ির বিকল হয়ে পড়া, এ তো আছে, সমাজের মধ্যে না-বলা একটা চেহারা নিয়ে তা আছে, ওই অবদমিত সত্তা, তার মাড়াইকাল কেবলি বয়ে যায়। কখনো-বা, টোপর পরা/কিমাকার অদ্ভুত/ ভয়ের যোনি… পার হতে হয় বিষয়বাসনামথিত মানুষদের।

কখনো কখনো নিজেকেই পর্যবেক্ষণের বস্তু করে ভাবছেন তিনি—

              ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে যে জগৎ দেখা যায়
              ঝলমলে রোদে আমি তাহারে দেখি না
              আমাকে বিস্মিত করে এই হেন চোখের অসুখ

বা, কী কবিতা নয়, তার একটা সংজ্ঞা-সুরক্ষা খোঁজা—

              দর্শন হলো দূরের মাঠের শেষপ্রান্তের বুনোমঠ
              সকল বুনো রহস্যেই সরল সত্য ঘাপটি মেরে থাকে
              দর্শনে না-চুবানো কবিতারা কবিতা না


অমৃতের এক ফোঁটাই যদি প্রার্থিত হয়ে থাকে, তার এই ঘরানার কোনো কোনো লেখা যেন তেমনই এক একটা পরম ফোঁটা।


৩.
উদ্ধৃতি আর সেসব কিছুটা অনুধাবনের চেষ্টার মধ্যে কবির এই পর্যায়ের কাজগুলোকে অনুভবের আওতায় আনতে চাইলে নিশ্চয় দরকার পড়বে সমগ্র পাঠের। ছোট একটা উদাহরণ দিলে একটু হয়তো স্পষ্ট হবে। নৈঃশব্দ্যের কথা শুরুতে বলেছি যেখানে, তারই অন্য একটা রূপ দেখতে পাচ্ছি আরেকটি বাইকুতে। মনে হতে পারে সিদ্ধান্ত টানছেন বুঝি, মূলত তা নয়। শব্দ যেভাবে শব্দাতীতে পৌঁছুবার অপেক্ষায় থাকে—

              নৈঃশব্দ্যের
              অন্ধগলির শেষ
              ধ্যানের বাড়ি

তার হাইকু/ বাইকু/ সেনরু পড়ে মনে হবে, প্রকাশ কখনো সরাসরি, কখনো-বা সংকেতাশ্রয়ী হয়েছে। যেখানে সরাসরি, যেন-বা কোনো সংস্কারের জগদ্দল পাথরে আঘাত করছেন। বা স্মিতভাবে প্রশ্ন বা বিস্ময় রেখে সমাপ্তিতে যাচ্ছেন। যদিও সমাপ্তি তার অভিপ্রায় নয়। সমাপ্তি শব্দটাকে পূর্ণতা হিসেবেও পড়তে পারেন কেউ, অপূর্ণতাও যেখানে পূর্ণতার রূপে উদ্ভাসিত।

আর সংকেতাশ্রয়ী লেখাগুলো এমন একটা চিরন্তনতা দিয়ে আবৃত করছেন যে মিনিং-এর পরিসর সেখানে মুক্ত, কোনো পাঠকের অভিজ্ঞতা যতখানি ব্যাপক, এসব তাকে ততখানি আনন্দ-বেদনার নির্যাস দেবে। বা ট্র্যাজেডির পরাভব।

কবিতার মাস্টারমশাইরা আর অদীক্ষিত পাঠক বাংলা কবিতার মূলধারা(?)-র স্মৃতি নিয়ে এগুলো পড়তে থাকলে ত্রিপদীর ভ্রমে পড়বেন। সতর্কতার জন্যেই কথাটা বলতে হলো, কেননা ছন্দ, ডিকশনের চর্চা এ-ধারার কবিতার জন্য যতখানি দরকার হয়, মুজিব মেহদী সেসব পুরোটাই আয়ত্ত করে লিখছেন। এই গান যা বেজে উঠবে অন্য কারো কণ্ঠে, একাত্ম হতে চাইলে এর স্বরলিপিও অনেকখানি অনুভব করতে হবে। কী সুর, কোথায় কথারম্ভ করে দূরবর্তী আর কোন কথায় চলে যাচ্ছেন কবি, সেই মুন্সিয়ানাটুকু বুঝে ওঠার ব্যাপার আছে।

অমৃতের এক ফোঁটাই যদি প্রার্থিত হয়ে থাকে, তার এই ঘরানার কোনো কোনো লেখা যেন তেমনই এক একটা পরম ফোঁটা।

মজনু শাহ

জন্ম ২৬ মার্চ ১৯৭০; গাইবান্ধা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
আনকা মেঘের জীবনী (১৯৯৯)
লীলাচূর্ণ (২০০৫)
মধু ও মশলার বনে (২০০৬)
জেব্রামাস্টার (২০১১)
ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না (২০১৪)
আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া (২০১৬)
বাল্মীকির কুটির (২০১৮)

ই-মেইল : maznushah@gmail.com

Latest posts by মজনু শাহ (see all)