হোম গদ্য কবিতার পেছনের জলছাপ

কবিতার পেছনের জলছাপ

কবিতার পেছনের জলছাপ
17
0

কখন যে কোন দৃশ্য, কোন ঘটনা বা পরিস্থিতি ভেতরে ভেতরে উসকিয়ে দেয় কোন ধরনের কবিতার স্ফুলিঙ্গ, তা এক রহস্যই বটে। গিজগিজ-করা যাত্রী আর ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টরের সঙ্গে খিটিমিটি-ভরা শামুকগতি মুড়ির-টিন বাস। তার ভেতরে বসে ভ্যাপসা গরমে সেদ্ধ হতে হতে অচঞ্চল চোখে ব্রাউজ করে চলেছি দুপুরের নিষ্করুণ নগরপৃষ্ঠায়। ঝাঁকি খেতে খেতে উল্টা দিকে বয়ে চলেছে ফুটপাত ভরা মানুষ, হকার, নুলা ভিখারি, ভিক্ষাপাত্র, পথশিশুদের ঝগড়া, নর্দমা, কাক, রিকশা, বস্তির ঝুপড়ি, দুলকি চালে ছোটা দুএকটি বিরল টমটম… এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ এক অজ্ঞাত কারণে, সূত্রহীন যোগসূত্রে, মনে ঝেঁপে এল সুদূর পাকশির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মানদী আর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির ভেতর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে ঝিকঝিক ছুটে চলা তুফান মেইলের কথা। মাথার ভেতরে একটু-একটু ঝাঁকি দিচ্ছে কবিতা লেখার তাড়া। তখন থাকতাম তেজগাঁয়। ডেরায় ফিরে এসে লিখে ফেললাম ‘নদী ও ট্রেনের গল্প’। বেশ কিছু দিন পরে কী এক কৌতূহলে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলাম একইসঙ্গে ঢাকার ‘দৈনিক বাংলা’ আর কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়। পরে দেখলাম, ছাপা হয়েছে দুই পত্রিকাতেই, কিছুদিনের ব্যবধানে। সেটা সেই ৮৭ সালের গোড়ার দিককার কথা। মনে পড়ে, খুব খুশি হয়েছিলাম তখন। আমার সেই সূচনাপর্বের কোনো কবিতাই যায় নি কোনো বইয়ে, সেই নিয়মে বাদ পড়ে গেছে ‘নদী ও ট্রেনের গল্প’টা। বাদ গেছে ‘কাশীনাথপুরের মেয়েরা’ও।


বাবার সেই আকস্মিক প্রস্থানসংবাদে এক অদ্ভুত বোবা বিষণ্নতায়, এক নির্বাক নিরশ্রু শোকে কাতর ছিলাম বেশ কিছুদিন।


সে-বছরেরই শেষের দিকে এক তুষারঝরা শীতকাল কাটিয়েছি অ্যান্টওয়ার্প শহরে। তিন মাসের এক কারিগরি প্রশিক্ষণে গিয়েছিলাম বেলজিয়ামে। প্লানতিন মরিতাস সড়কের এক স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম আমি আর বন্ধু আমিনুল হাসান। উইক-এন্ড শুরু হতে-না-হতেই বেরিয়ে পড়তাম। ট্রেনে-বাসে বেড়াতে যেতাম নানা শহরে—লন্ডন, প্যারিস, লুক্সেমবার্গ সিটি, ব্রাসেলস, হেগ, আমস্টার্ডাম…। তরুণ বয়স। নতুন সব দেশ, নতুন সব আলোঝলমলে স্বপ্নশহর… রূপকরাজ্যের জাদুডানায় ভর করে উৎফুল্ল উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছি—কোনো উইক-এন্ডে আইফেল টাওয়ার, শঁজে লিজে, প্লাস-দ্য-লা-কনকর্ড, ল্যুভ মিউজিয়াম, পম্পিদু সেন্টার, আবার কোনো উইক-এন্ডে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, মাদাম ত্যুশো-য়, কিংবা কোনোদিন ভ্যানগঘ মিউজিয়ামে।

এরকম উচ্ছ্বাসের দিনে পেলাম পিতৃবিয়োগের খবর। বাবার বয়স তখন আর কতই-বা হয়েছিল! ৫৫ বা ৫৬ বছর। সেই বয়সেও বাবা ছিলেন ভাইবোনদের তুলনায় দীর্ঘদেহী, সুঠাম, টগবগে। গ্রামে থাকতেন। রাতে চা-খানায় আড্ডা দিয়ে এসে বাড়ি ফিরে হঠাৎ স্ট্রোক করেছিল। কাতরাতে কাতরাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি দেহত্যাগ করেন বাবা। সহ-প্রশিক্ষণার্থীরা খবরটা পেয়েছে সপ্তাহখানেক আগে। কিন্তু কেন জানি-না খবরটা দিতে চায় নি সঙ্গে-সঙ্গে, সম্ভবত আমার উচ্ছ্বাস-উৎফুল্লতার দিনগুলির ওপর মলিন যবনিকাপাতকে বিলম্বিত করতে। এক রাত্রিতে পরিস্থিতি বুঝে তারা এসে খবরটা জানাল। বাবার সেই আকস্মিক প্রস্থানসংবাদে এক অদ্ভুত বোবা বিষণ্নতায়, এক নির্বাক নিরশ্রু শোকে কাতর ছিলাম বেশ কিছুদিন।

শীত জাঁকিয়ে বসেছে সে-সময়টায়। একা-একা হাঁটতাম পার্কে, দেখতাম শাদা শাদা রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে জলাশয়ে, শাদা তুলার মতো ঝিরঝির তুষার ঝরছে তাদের শাদা শাদা ডানায়, পালকে। গাছপালাগুলি সব নিষ্পত্র, বিশীর্ণ। নীরবে শোক পালন করছে সার-সার দাঁড়ানো উইপিং উইলো গাছেরা। পাকা চত্বরগুলি কবুতরশূন্য। আজানুলম্বিত কালো ওভারকোট আর কালো হ্যাট পরে আনমনা মাথানিচু হাঁটছি ফুটপাথ ধরে। পথচারীবিরল ফুটপাত। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ধাক্কা খাচ্ছি ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে, কিংবা কখনো কোনো পথচারীর সঙ্গে। বিষণ্ন মুচকি হাসি হেসে ‘স্যরি’ বলে পা বাড়াচ্ছি আবার। নিজের মতো করে নিঃসঙ্গতায় উদ্‌যাপন করছি অন্তর্গত শোক ও বিষণ্নতা। অথচ কী এক অজানা কারণে সেই শোকবিধুর মাথার ভেতরে তখন উঁকি দিচ্ছে, গুঞ্জন করছে ‘সার্কারামা’ কবিতার এইসব লাইন :

ঝাঁক বেঁধে মাঠে ভ্যান্ডালদল নামে
দষ্ট ফসল চিৎকার ছোড়ে দীর্ঘে এবং বামে
সাদা হিংসায় গতি থমকায়
প্রবাহিত মানুষের।
শস্যকীটের লাল থেকে ঝরে তেজ
পানকৌড়ির দিকে তেড়ে আসে বন্যবহ্নিলেজ।

সহসা শূন্যে সালফার মুঠে উড়ে যায় ক্রীতদাস
বায়ুমণ্ডল পুড়ছে খুব তখন
আকাশে আকাশে রক্তকাণ্ড, হঠাৎ বিস্ফোরণ
ক্রীতদাস ফেটে বীজাণুর মতো অসংখ্য ক্রীতদাস
আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

আকাশের থেকে হাঁস নেমে আসে হাঁস
মধ্যরাত্রে বুদ্ধ জড়ায় গাত্রে
পশমীর মতো ছাইরঙা সন্ন্যাস।
আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

সার্কারামায় আসে উপসংহার
স্থিত গৌতমও গতির আহার, বোধির পাশেই অগ্নিপাহাড়
জ্বালামুখে জ্বলে মানুষের স্নায়ু, মগজ এবং স্নেহ
নিথর রেটিনা ধরে রাখে সাত রশ্মির মৃতদেহ।

গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার
কাঁধের ডানে বামে আণব শীতকাল
চুলের হিসহিসে পতিত ইতিহাস
অন্ধকার দিয়ে গঠিত প্রস্তর।
জাগছে কালে কালে ইচ্ছা অদ্ভুত
ধাতব মুদ্রার, বিরামচিহ্নের।
মেঘের কশ বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসে
গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার
অন্ধকার দিয়ে গঠিত শিলাকাল
প্রতিদ্বন্দ্বিতা টোটেম ও মনীষার।

এইবার এই অবেলায়, হে জ্ঞাতি, হে রহস্যের উপজাতি,
অন্তহীন শিবলিঙ্গের প্রহরী,
গলমান গ্রাফাইট-স্তরের ওপর গড়াগড়ি দাও
পুনর্বার পাপ করে ফিরে এসো
পুনর্বার মুদ্রণযন্ত্র ভেঙে ভূমিসাৎ করে দাও হে অর্জুন
স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যাধ, স্মরণকালের হে অবিস্মরণীয় ব্যাধি।

পঞ্চভূতের শাসিত নিয়তি
পৃষ্ঠদেশের ক্ষত আর ক্ষতি
তীব্র ক্ষুধা ও খাদ্যের গতি
বিস্মৃত হও, বিস্মৃত হয়ে যাবে।

বৃত্ত ঘোরে মহাবৃত্ত
বিনাশ, মহামারী নৃত্য
মনুকুলের শেষকৃত্য
প্রাণী এবং পতঙ্গের সাথে।

শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া!
শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় …… ……. …..
শ্রবণ বধির …… ……. ……. ……. …….
শ্রবণ …… ……. ……. ……. ……. ……

[সার্কারামা : পাখিতীর্থদিনে]

তারও বহু বছর পরের কথা। এক খাঁ-খাঁ দুপুরে ঢাকা থেকে গাড়িতে করে জয়দেবপুর পার হয়ে যাচ্ছিলাম শালজঙ্গলের ভেতর দিয়ে। দুপুর বেলার জনমানবহীন বন। রাস্তা থেকে একটু দূরে বনের ভেতরে হঠাৎ দেখি ছিমছাম পরিপাটি নতুন একটি কুঁড়েঘর। আর একঝলক দেখতে পেলাম, শাড়িপরা একটি মেয়ে ঢুকল সেই ঘরের ভেতর। ব্যস, ওইটুকুই, আর কিছু নয়। আশেপাশে আর কোথাও কোনো বসতি বা লোকজন কিছুই দেখলাম না। গাড়ি চলছে। অনেকক্ষণ চললাম, কিন্তু নাহ্, কেউ নেই, কিছুই নেই। কোনো ঘরবাড়ি, বাংলো, জনমানুষ কোথাও কিছু নেই। এলোমেলো শালজঙ্গলের ভেতর হঠাৎ-দেখা কুঁড়েঘরটিকে মনে হয়েছিল যেন ইতস্তত ছড়ানো-ছিটানো প্রচুর কাঁটাগুল্মের ভেতর আচমকা এক পরিপাটি গোলাপ কেয়ারি।


আমার অনেক কবিতাতেই রয়েছে কাহিনি কিংবা কাহিনির ইশারা।


ব্যাপারটা কি সত্যি! নাকি দৃষ্টিবিভ্রম! অবিশ্বাস্য ঠেকল অনেকটা, আর কেমন-যেন এক অচেনা অনুভূতি! নির্জন সুনসান দুপুরে কখনো-কখনো এরকম হয়-না, যে, আচমকা কে যেন নাম ধরে ডাকল, স্পষ্ট এবং দু-দুবার, কিন্তু তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, কিংবা ধোঁয়া-ধোঁয়া কাউকে একটু দেখলাম মনে হলো, কিংবা কেউ কি একটা খামচি দিল পিঠে!? সেই ধরনের একটা অনুভূতি।

দৃশ্যটা এখনো মুদ্রিত হয়ে আছে চোখে। অনুভূতিটাও সেরকমই অটুট, এই এতদিন পরেও। ভাবছিলাম ফেরার পথে হয়তো দেখব, কুঁড়েঘরটাই আর নেই ওখানে। কিন্তু না, আছে। তবে মেয়েটিকে বা অন্য কাউকে আর দেখলাম না। মেয়েটি হয়তো ঘরের ভেতরে। কিংবা হয়তো জঙ্গলের সরু হাঁটাপথে, শুকনো পাতা, ডালপালা কুড়াতে। একবার ভেবেছিলাম, গাড়ি থামিয়ে যাই, দেখি গিয়ে ব্যাপারটা কী, কারা থাকে ওখানে, এবং কেন? পরে ভাবলাম, নাহ্, থাক। থাক না রহস্যটা ওরকমই, যেমনটা অনুভব করলাম। যাওয়া হলো না আর ওদিকটায়।

ওই বাস্তব-অধিবাস্তব-মেশামেশি দৃশ্য আর ওই অনুভূতিটুকু স্ফুলিঙ্গ আকারে কাজ করেছে নিচের কবিতাটি লেখার ক্ষেত্রে। তা ছাড়া, কবিতা ও আখ্যানের মধ্যে ভেদরেখাগুলি কীরূপ, কবিতার ভেতরে আখ্যান আর আখ্যানের ভেতরে কবিতা কিভাবে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে যায়, অর্থাৎ যে-অভিন্ন শিল্পবস্তু কবিতা ও কথাসাহিত্য এই দুই ভিন্ন জনরার ভেতর সঞ্চার করে সৌন্দর্য, দীপ্তি ও প্রাণ, তার স্বরূপটা কেমন, সেসবের একটা বোঝাবুঝি, একটা নিরীক্ষার চেষ্টা রয়েছে আমার আগাগোড়াই। আমার অনেক কবিতাতেই রয়েছে কাহিনি কিংবা কাহিনির ইশারা। আর, কেন যেন মনে হয়, পাঠক হিসাবে আমরা বোধহয় কখনো কখনো এরকম চাইও যে, কবিতায় হঠাৎ-হঠাৎ ঝিলকে উঠুক কাহিনিচূর্ণ বা আখ্যানের আভাস।

একজন বর্ণদাসী ও একজন বিপিনবিহারী সমাচার

বনের কিনারে বাস, এক ছিল রূপবর্ণদাসী
আর ছিল, বনে বনে একা ঘোরে, সেই এক বিপিনবিহারী।
কন্যা তো সে নয় যেন বন্য মোম, নিশাদল-মাখা, বন্য আলোর বিদ্রূপ
রাতে মধ্যসমুদ্রে আগুন-লাগা জাহাজের রূপ
অঙ্গে অঙ্গে জ্বলে—
দূর থেকে তা-ই দেখে কত রঙ্গে, কতরূপ ছলে ও কৌশলে
মূর্ছা যায়-যায়-প্রায় কত যে বামন গিরিধারী
আর যত অন্য-অন্য অর্বাচীন বিপিনবিহারী।

কন্যা তো সে নয়, বুনো সুর, বুনো তান, আর উপমান, অরণ্যশোভার।
আঁচলে কূজন আঁকা তার, আমাদের সেই বহুবল্লভার।

বনের কিনারে বাস, ছিল এক রূপবর্ণদাসী
আর ছিল বনে বনে একা ঘোরে সেই এক বিপিনবিহারী।
অসবর্ণ তারা, অসমান, অসবংশের জাতক
তবুও দুজনে আহা একসঙ্গে একই বুনো বৃষ্টিতে স্নাতক।
তবু সেতু গড়ে ওঠে সন্ধ্যাবেলা দূর দুই তটে
সেতু, দেহকথনের গোধূলিভাষ্যে তা ফুটে ওঠে।

[একজন বর্ণদাসী ও একজন বিপিনবিহারী সমাচার : নদীকূলে করি বাস]

(17)

Masud Khan