হোম গদ্য কথাসাহিত্যে আবদুল হক 

কথাসাহিত্যে আবদুল হক 

কথাসাহিত্যে আবদুল হক 
649
0

তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাবন্ধিক হিসাবেই মূলত আবদুল হকের লেখকসত্তার পরিচিতি। তাঁর লেখার মূল শক্তি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও ইতিহাসচেতনায়; ‘অতীতের উপলব্ধি এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত’ তাঁর মধ্যে একযোগে আধারিত। বিজ্ঞানমনস্কতা তাঁর বিচারবোধের উৎস বলেই অতীত ও বর্তমানের ঘটনাবলি বস্তুনিষ্ঠভাবে তাঁর চেতনায় উপলব্ধ হয়। এ ধরনের গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ আমাদের সাহিত্যের অঙ্গনে চিরকালই বিরল। তার ওপর তিনি অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ। অনেকটা সে-কারণেই হয়তোবা আমাদের সাহিত্য-সমাজের কমসংখ্যক মানুষের দৃষ্টিসীমায় এসেছে তাঁর কর্মসম্ভার। তবে বাংলাদেশের বিদ্বন্মণ্ডলীতে তিনি যথেষ্টই শ্রদ্ধেয়।

আবদুল হকের সক্রিয়তা বাংলাসহিত্যের সৃজন ও মনন দুই ক্ষেত্রেই বিকশিত। কবিতা দিয়ে শুরু। জীবদ্দশায় ‘নিঃসঙ্গ আর্তনাদ’ নামে কবিতা-সংকলনের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থাকলেও গ্রন্থরূপে অপ্রকাশিত। সাহিত্যযাত্রার শুরু থেকেই প্রবন্ধের পাশাপশি গল্প-উপন্যাস-নাটক—সব মাধ্যমেই ক্রিয়াশীলতা তাঁর। দুটি পূর্ণাঙ্গ নাটক ও একটি নাট্য-সংকলন এবং দুটি গল্প-সংকলনের গ্রন্থরূপ প্রকাশিত, একটি উপন্যাস পত্রিকার পাতা থেকে এখনো গ্রন্থরূপ পায় নি। সব মিলিয়ে সংখ্যায় কম হলেও তাঁর এইসব রচনার সাহিত্যিক তাৎপর্য উপেক্ষণীয় নয়।


তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যিক সত্তার গুরুত্ব যথার্থভাবে অনুভবে তাঁর কেবল প্রাবন্ধিক সত্তাই নয় নাট্যকার, গল্পকার-সত্তা এমনকি ঔপন্যাসিক সত্তারও বিবেচনা জরুরি।


বর্তমান রচনার প্রথম স্তবকে তাঁর লেখার মূল শক্তি বলে যা নির্দেশিত তার প্রভাব তাঁর সৃজনশীল রচনাতেও স্পষ্ট। ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে তিনি শতবর্ষী। তাঁর নাটক ও ছোটগল্প নিয়ে কিছুটা আলোচনা হয়েছে ষাটের দশকে। ১৯৬০ দশকের ‘পাকিস্তানী খবর’ পত্রিকায় আতোয়ার রহমান আলোচনা করেছিলেন ‘রোকেয়ার নিজের বাড়ি’ গল্প নিয়ে। বইটি নিয়ে ‘বই’ পত্রিকার ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় মোসলেমা খাতুন, ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র ১৪ জানুয়ারি সংখ্যায় মাফরুহা চৌধুরী, ‘নাগরিক’ পত্রিকার ২য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা (কার্তিক-পৌষ ১৩৭৪) ‘উপভোগ্য গল্প’ শিরোনামে শাহানা বেগম, সমকাল পত্রিকার বৈশাখ-শ্রাবণ ১৩৭৪ সংখ্যায় জাহানারা হাকিম, ‘মাহে নও’ পত্রিকার মার্চ ১৯৬৮ সংখ্যায় জহুরুল হক আলোচনা করেন। ‘বই’ পত্রিকার ১৯৬৮ সালের মে সংখ্যায় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীও একটি আলোচনা লিখেছিলেন। দ্বিতীয় বই ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী নিয়েও একেবারে যে আলোচনা হয় নি তা নয়, দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’-এ (৬ ডিসেম্বর ১৯৮১) সন্তোষ গুপ্তের আলোচনার খবর পাওয়া যায়। (মাযহার, ২০০১) প্রকাশের সমকালে অনেক আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সমসাময়িক গল্পকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু রুশদ এই ত্রয়ী ছাড়া সমকালীন অন্য কথাসাহিত্যিকদের মতোই ছোটগল্পের লেখক হিসেবে মনোযোগের বাইরে রয়ে গেছেন তিনি।

প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর পরিচয় ব্যাপ্ত হয়ে উঠেছিল সমকালীন রাজনীতির চাঞ্চল্য সূত্রে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে তাঁর রচনার তীক্ষ্ণতা সরকারের গোয়েন্দা নজরদারিতে আসায় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁর সেসব বিবেচনার মূল্যের গভীরতা বেশি হওয়ায় তাঁর প্রাবন্ধিক সত্তার ওপর আলো কিছুটা বেশি পড়েছিল। রচনার অতিপ্রজতা ও প্রাসঙ্গিকতার প্রাধান্যে প্রাবন্ধিক সত্তাই পরিচিতির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সব সময়ই অগ্রাধিকার পেয়েছে। অনেকটা সে-কারণেই হয়তোবা পরবর্তীকালে তাঁর গল্প-উপন্যাস ও কবিতা একবারেই দৃষ্টির বাইরে থেকে গেছে।

বর্তমান লেখকের বিবেচনায় বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে তলিয়ে দেখতে গেলে আবদুল হকের কথাসাহিত্যের গুরুত্বকে এতটা উপেক্ষা করা চলে না। কেন চলে না প্রাথমিকভাবে তা বলবার জন্যই আবদুল হকের গল্প-উপন্যাস আলোচনায় প্রয়াসী এই রচনাটির অবতারণা। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যিক সত্তার গুরুত্ব যথার্থভাবে অনুভবে তাঁর কেবল প্রাবন্ধিক সত্তাই নয় নাট্যকার, গল্পকার-সত্তা এমনকি ঔপন্যাসিক সত্তারও বিবেচনা জরুরি।

সাহিত্যক্ষেত্রে ১৯৪১ সালে আবদুল হকের আত্মপ্রকাশ ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘লুৎফউন্নিসা’ নামে একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৫ পর্যন্ত প্রধানত ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকাতেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো। ছোটগল্পেরও প্রকাশনা সেখানেই। রোকেয়ার নিজের বাড়ি (১৯৬৭), ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী (১৯৮১) তাঁর প্রকাশিত দুটি ছোটগল্প-সংকলন। প্রথমদিকে লেখা ছোটগল্পগুলো এই দুই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত। উত্তর নক্ষত্র নামে একটি উপন্যাস পত্রিকায় [উত্তরাধিকার, ১৯৮৫] প্রকাশিত, যা এখনো অগ্রন্থিত। আবু আহসান ছদ্মনামে কালো মুখোশ (১৯৫৮) নামে একটি গোয়েন্দা উপন্যাসও রয়েছে তাঁর। (মাযহার, ২০০১) ছোটগল্প লেখক হিসেবে নিজের একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। জীবৎকালে অপ্রকাশিত তাঁর এক লেখায় তার আভাসও পাওয়া যায় :

ছোটগল্পে মানুষের জীবন ও মনোলোকের রহস্য উদ্ঘাটনই আমার লক্ষ্য। ছোটগল্পকে আমি প্রচার-মাধ্যম হিসেবে দেখি না, দেখি শিল্প হিসেবে, যার মধ্য দিয়ে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে জীবন-উপলব্ধি বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো উদ্ভাসিত হয় (হক, ২০১৭)।

দুটি গল্পগ্রন্থই নিজ অর্থব্যয়ে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। দুটি বইয়েরই প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হয়েছিল বেগম আনোয়ারা হকের। ঠিকানা দেয়া হয়েছিল ২০৭ মধুবাজার রোড ধানমন্ডি, ঢাকার। প্রথম বইটির পরিবেশক রাখা হয়েছিল বাংলাবাজারের নওরোজ কিতাবিস্তানকে। বইটির প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন দেবদাস চক্রবর্তী। ইনারসহ বইয়ের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৬৬। ছাপা হয়েছিল ডিআইটি এভিনিউর সিকান্‌দার আবু জাফরের সমকাল মুদ্রায়ণ থেকে, পাইকা টাইপে। দাম রাখা হয়েছিল তিন টাকা পঞ্চাশ পয়সা। বইটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন :

আমি ক্বচিৎ-কখনো গল্প লিখেছি: এত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যে হয়তো অনেকেরই নজরে পড়েনি। তারই মধ্যেকার কয়েকটি গল্প নিয়ে এই সংকলন।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রথম প্রকাশের সময় যে-রকম ছিল বেশিরভাগ গল্পই এখন প্রায় সেরকমই থাকল। কিন্তু গোটা চারেক গল্প নতুন করে লিখে দেওয়া সংগত মনে হয়েছে। তবে তাদের কাহিনী এবং বক্তব্য একই রয়ে গেল। (মাযহার, ২০০১)

রোকেয়ার নিজের বাড়ি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো হলো ‘রোকেয়ার নিজের বাড়ি’ (১৩৬৫), ‘সেলিমগঞ্জ রোড’ (১৩৭৩), ‘চক্র’ (১৩৬৩), ‘জিয়ারত’ (১৩৬৩), ‘বিস্বাদ’ (১৩৭০), ‘অন্তরীণ’ (১৩৬২), ‘বৃষ্টি’ (১৩৭১), ‘অপত্য’ (১৩৬৩), ‘দ্বিতল’ (১৩৬?), ‘কেয়ামত’ (১৩৬০)।

ছোটগল্পে তিনি প্রধানত ফুটিয়ে তুলেছিলেন গ্রামীণ পটভূমি থেকে নাগরিক জীবনে আসা উঠতি মধ্যবিত্তের জীবন সংকট ও টানাপড়েনকে।  প্রধানত ঘটমান মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই প্রথম বই রোকেয়ার নিজের বাড়ির গল্পগুলোর মূল লক্ষণ। মধ্যবিত্ত সমাজের চেতনাপ্রবাহ এই বইয়ের গল্পগুলোয় অন্তঃশীল। যে মনোভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে এই বইয়ের গল্পগুলো গড়ে উঠেছে তার অনেকটাই এখন বদলে গেছে। কিন্তু গল্পগুলোর উপস্থাপনায় যেন ধরা আছে সেই সময়ের মনস্তত্ত্বের সূত্রগুলো।

১৯৪৭ সালের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঢাকা নগরীতে নাগরিক জীবনযাত্রার বিস্তার ঘটাতে শুরু করে। পাশাপাশি রিক্ত হতে থাকে গ্রামীণ জীবন। ওই পরিপ্রেক্ষিতে সে-সময়ের নাগরিক জীবনবোধের শিল্পস্বরূপ হিসেবে সৃষ্ট ছোটগল্পে এই টানাপড়েনই মূলত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নামগল্প ‘রোকেয়ার নিজের বাড়ি’ গড়ে উঠেছে কেরানি হাবিবের স্ত্রী রোকেয়ার জীবন সংগ্রামের স্বভাবকে নিয়ে। দিনলিপির ‘অন্যান্য রচনা’ শীর্ষক ভুক্তিতে আবদুল হক নিজের প্রথম গল্পের বইয়ের প্রকাশনার অল্প আগে লেখেন—

…আমার চতুর্থ বই রোকেয়ার নিজের বাড়ি ছোটগল্পের সংকলন। ১৯৬৪ সালের মধ্যেই প্রেসে যাবে এবং প্রকাশিত হবে বলে আশা করা যায়।

নামগল্পের কাহিনি এইরূপ : সামান্য কেরানি হাবিবের স্ত্রী রোকেয়া। বিয়ের পর বাপের বাড়িতেই অনেকদিন থাকতে হলো। ঢাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া কঠিন, এবং পেলেও ভাড়া সাধ্যাতিরিক্ত। অনেক কষ্টে এক সহকর্মী কেরানির বাসার এক পাশে একটি ছোট কামরায় পাওয়া গেল, সেখানে তারা সংসার পাতল। কিন্তু নীড় বাঁধার আনন্দ বার বার ক্ষুণ্ন হলো কেননা খুদে মালিক আর তার বউয়ের কাছে ছোট হয়ে থাকতে হয়। তারা দেখতে পায়—অনেকেই এমনকি কেরানিরাও নানা রহস্যজনক উপায়ে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করছে। তারাও ঠিক করল, খেয়ে না খেয়ে এক টুকরো জমি কিনে তারাও বাড়ি তৈরি করবে। কিছু জমিয়ে, গয়না বিক্রি করে আর ধারকর্জ করে কিছু জমি তারা কিনলও, বেশ উঁচু জমি, তবে শহর থেকে অনেক দূরে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগের এখনো সুব্যবস্থা হয় নি। কিন্তু একদিন হবে। হলে তখন বাড়ি তৈরি হবে। মাঝে-মাঝে তারা গিয়ে জমি দেখে আসে এবং নিজেদের বাড়ি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এই করে বহু বছর কেটে গেল। টাকাও জোগাড় হলো না, বাড়িও তৈরি হলো না। ইতিমধ্যে সংসার অনেক বড় হয়ে গেছে। রোকেয়ার স্বাস্থ্য গেল ভেঙে। গুরুতর রোগে তার মৃত্যু হলো। তখন সর্বত্র প্রবল বন্যা। আজিমপুরার গোরস্তানে কবর খুঁড়তে গিয়ে পানি উঠতে লাগল। ওদের জমিটা কিন্তু খুব উঁচু। হাবিব রোকেয়াকে তার নিজের জমির উঁচু অংশটাতে কবর দিয়ে এল। ওইখানে বসে বসে কতদিন একটা নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখেছিল। ( হক, ২০১৭)

নামগল্পে তিনি যেমন এক নারীর ঢাকা নগরীতে বাস্তু প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নকে ধরেছেন তেমনি ধরেছেন নগরীর উন্নয়নশীলতার চাপে ঘটে চলা মানবিকতার নিষ্পেষণকে। এক বুড়ি ও তার মৃত্যুর পরে তার বেওয়ারিশ হয়ে যাওয়া কুকুরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি প্রতীকায়ন করেছেন মানবিকতার লাঞ্ছনার। ‘চক্র’ গল্পটিতে তুলে ধরেছেন নবদম্পতির জীবনদৃষ্টি অর্জনকে। ‘জিয়ারত’ গল্পে নগরের মধ্যবিত্ত পরিবারের বর্ষীয়ান মনের যাতনাকে দেখা হয়েছে অনুকম্পায়ী দৃষ্টিতে। ‘বিস্বাদ’ গল্পটিতে তুলে ধরা হয়েছে মধ্যবিত্তের জীবনে বেঁচে থাকার জন্য আপসের বিস্বাদকে। মধ্যবিত্ত সমাজে অন্তঃশীল মনোভঙ্গিগুলোর একটিকে অবলম্বন করা হয়েছে ‘অন্তরীণ’ গল্পে। একটি দম্পতির জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে গল্পটির বিষয়বস্তু।

দুই ধরনের গল্প আছে এই বইয়ে। এক ধরনের গল্প গড়ে উঠেছে গ্রাম থেকে শহরে নতুন আসা মানুষদের নিয়ে যাদের মধ্যে গ্রামীণ জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্যের সংকোচ কাটে নি। আবার পরিশীলিত নগরজীবন নিয়ে লেখা গল্পও রয়েছে। প্রতিষ্ঠীয়মান নাগরিকতার মধ্যবিত্তীয় টানাপড়েন ও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বে রোকেয়ার নিজের বাড়ি বইয়ের নামগল্পটি অসাধারণ বলেই হয়তো সমকালের রসিক পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছিল।

রোকেয়ার নিজের বাড়ি বইয়ে স্থান পেয়েছে স্বাধীনতাপূর্ব কালে লেখা গল্প। সাতচল্লিশোত্তর প্রায় দেড় দশক সময় পরিসরে রচিত এই গল্পগুলোয় তাঁর নিজের রাজনীতি বোধের আলোকে প্রধান্য পেয়েছে মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ। গল্পগুলোর বেশিরভাগেই রয়েছে ট্র্যাজিক পরিণতি। সেটা যেমন রয়েছে নামগল্পে তেমনি রয়েছে ‘সেলিমগঞ্জ রোড’, ‘দ্বিতল’ কিংবা ‘বিস্বাদ’ গল্পেও।


তাঁর চেতনায় ও চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বে সমাজ পরিস্থিতিই ক্রিয়াশীল থেকেছে  সবসময়।


দ্বিতীয় বই প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বইয়ের প্রায় দেড় দশক পরে, ১৯৮১ সালের মে মাসে। ইনারসহ মনোটাইপে কম্পোজকৃত বইটির মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮০। প্রচ্ছদ মোহাম্মদ ইদরিস মিয়া কৃত। মুদ্রণে বর্ণযোজন ৫২ লক্ষ্মীবাজার ঢাকা ১। এই বইটির পরিবেশক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। (মাযহার, ২০০১) দিনলিপিতে ২৪ মে ১৯৮১ তারিখে তিনি লিখেছিলেন—

আমার দ্বিতীয় গল্প-সংকলন ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী শেষ পর্যন্ত বের হলো। দু-চার দিনের মধ্যে বাজারে পৌঁছবে আশা করছি। নিজের খরচে বের করতে হলো, কেননা প্রকাশক পাওয়া যায়নি। মাত্র একটি প্রকাশককে বলেছিলাম; তারা (মুক্তধারা) প্রকাশ করতে চায়নি, গল্পের বই চলে না বলে। গল্প-লেখক হিসেবে আমারও সুনাম নেই। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম। যদিও টাকার অভাব। উদ্যোগ নিয়েছিলাম কেননা আমি জানি এদেশে নিজের কবর নিজে খুঁড়ে না রাখলে কেউ হয়তো কবর খোঁড়ার কষ্ট করতে যাবে না। আমার অনেক বইই আমি নিজের খরচে প্রকাশ করেছি। হয়তো বাংলাদেশের মতো দেশে বাস করি বলে। আমি আলাপী নই, প্রকাশককে আমার বই নিতে রাজি করাতে পারি না বলে। সত্যি বলতে গেলে কোনো প্রকাশকের সঙ্গেই আমার তেমন আলাপ নেই। ‘মুক্তধারা’ ছাড়া আর কাউকে বলিনি।

নিজের গল্পের বই নিজে প্রকাশ করলাম কেন? নাটক এবং প্রবন্ধের বই প্রকাশ করেছিলাম কেন? হয়তো নিজের লেখার উপর আস্থা ছিল বলে। গল্প-লেখক বলে আমি তেমন পরিচিত নই, আমি নিজে প্রকাশ না করলে আর কেউ কখনো প্রকাশ করবে না বলে। প্রথম গল্পটি (নাম-গল্পটি) যখন প্রথম সমকাল-এ প্রকাশিত হয়েছিল তখন বেশ মজলিশি আলোচনা হয়েছিল। হয়তো এই কারণে।

[৫০০ কপি ছেপেছি। হিসাব করে দেখা গেল সব বই যদি বিক্রি হয় তবে তিন হাজার টাকা ফিরে আসতে পারে। চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে।] (হক, ২০১৭)

এই বইয়ের (ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী) সামগ্র্যলক্ষণ একটু ভিন্ন। এখানে লেখক প্রতীকপরায়ণ। রাজনীতি চেতনা এ-বইয়ের গল্পগুলোর কেন্দ্রীয় প্রেরণা। আগের বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে এই বইয়ের গল্পগুলো পড়লে অনুভব করা যাবে যে তাঁর ছোট গল্পকার-সত্তাও তাঁর সামগ্রিক জীবনদৃষ্টিরই প্রতিফলক। সব মিলিয়ে আঙ্গিক সংগঠনের পরিশীলনের চেয়ে তাঁর জীবনদৃষ্টি অবলম্বী বিষয়বস্তু উপস্থাপনই প্রাধান্য পায়। তবে এই বইয়ের গল্পগুলোতে আগের বইয়ের তুলনায় আঙ্গিক নিরীক্ষাও কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে। পরিণত বয়সে যেন তাঁর রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গিও হয়ে উঠছে পরিণততর। তবে তাঁর চেতনায় ও চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বে সমাজ পরিস্থিতিই ক্রিয়াশীল থেকেছে  সবসময়। এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মোট ৭টি গল্প। গল্পগুলো হলো ‘ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী’, ‘লোকটার জানাজা’, ‘সর্পিল’, ‘খড়কুটো’, ‘এক টুকরো মাংস’, ‘নেতার জন্ম’, ‘অন্যপূর্বা’। বইয়ের ভূমিকায় আবদুল হক লিখেছেন—

অনেক দিনের ব্যবধানে আমার দ্বিতীয় গল্প সংকলন প্রকাশিত হল। এ-সংকলনের প্রথম পাঁচটি গল্প সাম্প্রতিককালে ‘সমকাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, শেষের দুটি বেরিয়েছিল অনেক দিন আগে (বিশেষ করে শেষেরটি) বিভিন্ন পত্রিকায়। ‘অন্যপূর্বা’ গল্পটি নূতন করে লিখে দেওয়া হল, তবে এর কাহিনীতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। (মাযহার, ২০০১)

দ্বিতীয় গল্প সংকলনের নাম গল্পটি একটু একটু চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। দিনলিপির ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬-এ ‘একটি গল্প’ শিরোনামের ভুক্তিতে  তিনি লিখছেন—

নব পর্যায়ে সমকালের ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত আমার একটি ছোটগল্প ‘ছিন্ন পত্রিকার গল্প’ আমাকে বেশ খানিকটা আশ্চর্য করেছে। গল্প ঠিক নয়, গল্পের প্রতিক্রিয়া। প্রায় গোটা মার্চ আমি ছিলাম দেশের বাড়িতে, ফিরে এসে শুনলাম অনেক নবীন লেখক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এই গল্পের ব্যাপারে। অভিনন্দন জানাতে? প্রশংসা করতে? না আলোচনা? ফিরে আসার পরেও বেশ কয়েকজন দেখা করলেন, এমনকি অভিনন্দন জানালেন। এ রকম প্রতিক্রিয়ায় লেখকমাত্রেরই খুশি হওয়ার কথা। আমিও যে হই নি তা নয়, তবে আমি বরং বিস্মিত হয়েছি। সত্যি কি গল্পটা ভালো হয়েছে? অথবা হলেও এ রকম সাড়া-জাগানোর মতো হয়েছে? একটা ‘অপূর্ব’ অথবা ‘দুর্দান্ত’ গল্প হয়েছে এটা আমি মনে করি নি।

আমার অবশ্য বেশ কিছু কৌতূহল ছিল গল্পটার কী অর্থ করবেন পাঠকসমাজ? বিশেষ করে যাঁরা অভিজ্ঞ? তাৎপর্যটা পুরোপুরি আমিই জানি কিন্তু কেউ কেউ বলেছেন শেখ সাহেব-হত্যাই এ গল্পে প্রতিফলিত। অথচ গল্পটা লেখা ১৫ আগস্টের অনেক আগে; যদিও তখন সমাপ্ত না করে ফেলে রাখা হয়েছিল। গল্পটা পরিকল্পিত আসলে একাত্তরেরও আগে সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৬৭ সালে। (হক, ২০১৭)

ছিন্ন পত্রিকার কাহিনী বইয়ের ‘সর্পিল’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের পতন নিয়ে রচিত। গল্পটি রচিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলির পরে। তাঁর দিনলিপি থেকে জানা যাচ্ছে গল্পটি বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। প্রত্যাখ্যানের কারণ এর শৈল্পিক অসামর্থ্য নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। ৩ ফেব্রুযারি ১৯৭৮-এর ভুক্তিতে তিনি লিখেছেন—

সমকাল পত্রিকায় আমার ‘সর্পিল’ নামীয় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি উত্তরাধিকার পত্রিকা কর্তৃপক্ষ অনেকদিন আটকে রাখে, তারপর গত মাসে ফেরত দেয়। এতে কিছু রাজনৈতিক ইঙ্গিত আছে: বাংলাদেশের মানুষ বছর দুই তিন থেকে আবার পাকিস্তানি প্রবণতা দেখাচ্ছে, এই কথাটা গল্পে প্রতিবিম্বিত। আশরাফ সিদ্দিকীই গল্পটি উত্তরাধিকারে না ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর কারণ, তিনি পাকিস্তানি প্রবণতা ছাড়তে পারেন নি, তা ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ নেয়ারও চেষ্টা করলেন হয়তো। বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের কথা তাঁর পক্ষে ভুলে যাওয়া কঠিন। (হক, ২০১৭)

দুটি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর বাইরের কয়েকটি গল্প সম্পর্কে জানা যায় তাঁর দিনলিপিতে। যেমন দিনলিপিতে ৯ মার্চ ১৯৮৪ তারিখের ‘গল্প’ নামীয় ভুক্তিতে তিনি লিখছেন—

পুরাতন পত্রিকা ঘাঁটতে ঘাঁটতে (মাসিক মোহাম্মদীতে) ‘ধূসর গোধূলি’ নামে আমার প্রথম পর্যায়ের একটি গল্প পড়লাম, কৌতূহলবশে। মন্দ যেন মনে হলো না (তখন নিজের নামের আগে মোহাম্মদ লিখতাম)। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘টহল’ কেমন হয়েছিল? কৌতূহলবশে হয়তো আবার কোনোদিন পড়ব। এসব গল্প পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু তার আগে সেই প্রথম গল্পগুলোর একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলাম এবং মালদহ শহরের ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’ লাইব্রেরিকে দিয়েছিলাম। গল্পগুলো পরে ‘মাসিক মোহম্মদী’তে বেশিরভাগ প্রকাশিত হয়েছিল, একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক আজাদের রবিবাসরীয় সংখ্যায়, নাম ঠিক মনে পড়ছে না, সেটা ছিল প্রেমের গল্প কিন্তু মূলে সে-প্রেম ছিল প্রতীক মাত্র, বেরিয়েছিল খুব সম্ভব ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে, সুভাষ বসু কলকাতা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন সেই সময়ে। এ ছাড়াও সেই পাণ্ডুলিপি বইয়ের আরো একটি গল্প বোধ হয় প্রকাশ করার উপযোগী আমি মনে করতে পারিনি বলে এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। যতদূর মনে পড়ে সংকোচের কোনো কারণ ছিল। কিন্তু গল্পটির নাম এখন মনে পড়ছে না।

১৩৪৮ সালের শ্রাবণ সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদী প্রকাশিত ‘টহুল’ গল্পটি বহুকাল পরে পড়ে দেখলাম। মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত এটি আমার প্রথম গল্প। আজকের দিনে খুব বড় ত্রুটি যা মনে হয়: এর সংলাপ-অংশ ছাড়া বাদ-বাকি অংশের সাধুরীতি। অবশ্যই এর মূল ত্রুটিটা হচ্ছে গল্পের প্রকৃতি; যেসব সমস্যা নিয়ে আধুনিক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়তো এর নয়, যেন রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের কালের মতোই হৃদয়াবেগকেই গল্পের মূল বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে সমাপ্তির বাক্যটার দু-একটি শব্দ না থাকলেই ভালো হতো, অন্যথায় একেবারে বাজে গল্প হয়েছে এমন যেন মনে হয় না। (হক, ২০১৭)

ঔপন্যাসিক-সত্তাকে সুদীর্ঘকাল ধরে লালন করলেও আবদুল হকের কোনো উপন্যাস গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় নি। নিজের অসম্পূর্ণ ও অপ্রকাশিত লেখাগুলোর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে দিনলিপির ৩ ডিসেম্বর ১৯৯১ তারিখে ‘উত্তর নক্ষত্র’ নামে তিন খণ্ডে সমাপ্ত হবে এমন কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে:

উত্তর নক্ষত্র নামে একটি (মানসিকভাবে উচ্চাঙ্গ) উপন্যাসের সূচনা তিন খণ্ডের লিখব ভেবেছিলাম কিন্তু পরে সেকথা ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রায় দেড়শতের কাছাকাছি পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছিলাম। প্রকৃতই একটি উপন্যাস হতে পারে এটি, এই মনে হয়েছিল। আরম্ভ করেছিলাম নভেম্বর ১৯৬০ সালে। কিন্তু ঐ পর্যন্ত লিখে আর লেখা হয়নি। (হক, ২০১৭)

আবার ২৮ এপ্রিল ১৯৯২ তারিখের দিনলিপিতে আরো লিখেছেন:

… সম্প্রতি পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে দেখলাম আমার অনেকগুলি রচনা অসমাপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে, অনেকদিন থেকে, তার মধ্যে গল্প নাটক এমনকি উপন্যাস। ‘উপন্যাস লিখব’ এই ছিল আমার প্রথম লেখক জীবনের উচ্চাশা, কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে আসার পর দেখছি উপন্যাসই লেখা হয়নি। পুরাতন কাগজপত্রের মধ্যে দেখলাম একটি কি দু’টি ‘এপিক উপন্যাস’ লেখার পরিকল্পনা করেছিলাম এক সময়। একটা এপিক উপন্যাস বেশ কিছুদূর লিখেও ছিলাম, কিন্তু সমাপ্ত করা হয়নি উপন্যাসটির নাম ছিল ‘উত্তর নক্ষত্র’। আমি ছাড়া এগুলো কেউ তো সম্পূর্ণ করতে পারবে না, কারণ আমি কী লিখতে চেয়েছিলাম তা শুধু আমিই জানি, শুধু আমার কল্পনাতেই আছে। কল্পনা সব সময়ে ব্যক্তিগত, এটা হয়তো অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, কিন্তু কল্পনা সবসময়ই ব্যক্তিগত। কিন্তু যা লিখতে চেয়েছিলাম না যা লিখতে চেয়েছিলাম তা কি এখন আমার কল্পনায় আছে? শুধু ‘চিন্তা’ যে আমরা ভুলে যাই তা নয়, ‘কল্পনা’ও আমরা ভুলে যাই। আজ এরকম কল্পনা করি, কাল অন্য রকম কল্পনা করি। বাইরের চিন্তা বা অন্য কল্পনা থেকে সব সময়ে আমাদের এখনকার কল্পনার উপর চাপ আসছে।

আবদুল হকের পারিবারিক সংগ্রহে পত্রিকায় প্রকাশিত কিন্তু অগ্রন্থিত  তাঁর কয়েকটি গল্প পাওয়া গেছে। সেই গল্পগুলো হলো: মাসিক মোহাম্মদী, ১৫শ বর্ষ, ৩য় সংখ্যায় (পৌষ ১৩৪৮) প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’, ১৫শ বর্ষ, ৫ম সংখ্যায় (পৌষ ১৩৪৮) প্রকাশিত ‘বিয়ে বিয়ে খেলা’, ১৪শ বর্ষ ১০ম সংখ্যায়, (শ্রাবণ ১৩৪৮) প্রকাশিত ‘টহুল’, ১৫শ বর্ষ, ৯ম সংখ্যায় (আষাঢ ১৩৪৯) প্রকাশিত ‘নেকেনু’, ১৫শ বর্ষ, ১০ম সংখ্যায় (শ্রাবণ ১৩৪৯) প্রকাশিত ‘উমি’, এবং সওগাত পত্রিকার ৩৬ বর্ষ. ১লা সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ ১৩৬০) প্রকাশিত ‘কেয়ামত’। এই গল্পগুলোতে হৃদয়াবেগই প্রধান্য পেয়েছে। গল্পগুলো এখনো বেশ সুখপাঠ্য!

খসড়া আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন,

মাসিক মোহাম্মদীতে (এবং মাসিক পত্রিকায়) প্রকাশিত আমার প্রথম ছোটগল্প ‘টহুল’ (শ্রাবণ ১৩৪৮)। আমি তখন কুমারগঞ্জের (পশ্চিম দিনাজপুর) কাছাকাছি মাস্টারি করছি। বোধহয় পরের বছর বেশকিছু ছোটগল্প ঐ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু ‘নেকেনু’ (আষাঢ় ১৩৪৯) গল্পটার প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। এটা ঠিক গল্প নয়, আত্মজীবনীমূলক এবং সাধুরীতিতে লিখিত, বোধহয় এ কারণেই এর কপালে উপেক্ষা জুটেছে। এর কিছু আগে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ‘মনের গোপন কোণে’ নামে আমার একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এটি অবশ্য মানসম্মত হয়নি। (হক ২০১৭)

বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় (এপ্রিল-জুন ১৯৯৩) প্রকাশিত উপন্যাস ‘উত্তর-নক্ষত্র’ই তাঁর এ যাবৎ প্রকাশিত একমাত্র উপন্যাস।


তাঁর প্রাবন্ধিক-সত্তার অন্যতম মূল বিষয় এই জাগরণ-চেতনা। সেদিক থেকে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তা ও মননসত্তা একে অপরের পরিপূরক।


‘উত্তর-নক্ষত্র’ এক অর্থে আত্মজৈবনিক উপন্যাস। প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁর পরিকল্পিত একটি দীর্ঘ উপন্যাসের প্রথম খণ্ড। শেষপর্যন্ত অন্যান্য খণ্ড তাঁর পক্ষে আর লেখা সম্ভব হয়নি। গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকায় একটি কিশোরের বেড়ে ওঠাকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি রচিত। একদিক থেকে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীঅপরাজিত উপন্যাসের স্বভাবের সঙ্গে উত্তর-নক্ষত্র-এর স্বভাবগত মিল রয়েছে। পথের পাঁচালী-অপরাজিত উপন্যাসের উপজীব্য যেখানে গ্রামীণ হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া একটি কিশোরের আধুনিক জীবনের জেগে ওঠার কাহিনি সেখানে উত্তর-নক্ষত্র উপন্যাসে উদ্ধৃত হয়েছে গ্রামীণ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া একটি কিশোরের চেতনায় আধুনিকতার জাগরণের ইতিবৃত্ত। উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে গেছে সরল ভঙ্গিতে। কিন্তু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইউসুফের অন্তঃশীল চেতনা বিকশিত হয়েছে তার মননশীল পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তির চেতনাকে উপন্যাসে উপস্থাপনের জন্য সমাজ জীবনের যে বিস্তৃত পটভূমিকা উপন্যাসে সাধারণ বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত উত্তর-নক্ষত্র উপন্যাসে তার উপস্থিতি ঘটেছে। তবে সে পটভূমি চিত্রিত হয়েছে সংহত ভাষ্যে। এই দিক থেকে তারাশঙ্কর-আশাপূর্ণা-বিমল মিত্র-এর ধারায় না চলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নির্দেশিত ধারায় চলেছেন।

গ্রামীণ পটভূমি থেকে আসা একজন মানুষের শৈশব থেকে যৌবনের সূচনাকাল পর্যন্ত জীবন পরিসর এখানে চিত্রিত। কেন্দ্রীয় চরিত্রটির মধ্যে পল্লবিত হয়ে উঠছে আধুনিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। আবদুল হকের চৈতন্যের স্বাভাবিক লক্ষণ মননশীলতা এখানেও অন্তঃশীল। গ্রামীণ পটভূমিতে মুসলিম সমাজে জন্ম নেয়া একজন মানুষের চেতনার আধুনিক জীবনবোধের জাগরণকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি রচিত। তাঁর প্রাবন্ধিক-সত্তার অন্যতম মূল বিষয় এই জাগরণ-চেতনা। সেদিক থেকে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তা ও মননসত্তা একে অপরের পরিপূরক।

আবুল আহসান ছন্দনামে কালো মুখোশ (২৯৫৮) নামে একটি গোয়েন্দা উপন্যাসও লিখেছিলেন তিনি। তাঁর লেখকসত্তার ধারাক্রম পর্যবেক্ষণ করলে এই উপন্যাস লেখার ঘটনাটিকে আকস্মিক বলেই মনে হয়। কারণ আর কখনো এই ধরনের রচনা লেখেন নি। নিজের আবদুল হক পরিচয়ে বইটি কখনো প্রকাশও করেন নি। তবে দিনলিপির ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩ তারিখে তিনি লিখেছিলেন—

সম্প্রতি কালো মুখোশ পড়ে দেখলাম। আবুল আহসান এই ছদ্মনামে ডিটেকটিভ উপন্যাসটি কয়েক বছর আগেই লিখেছিলাম এবং তা ছাপা হয়েছিল। এর সম্বন্ধে আমার ধারণা খুব উঁচু নয়। তবে মনে হল শেষের পরিচ্ছেদ বাদ দিয়ে এবং একটু পরিমার্জন করে বিশেষত শেষের পরিচ্ছেদের আগের পরিচ্ছেদ একটু কাটছাঁট করে নতুন করে লিখে বইটি আমি একদিন স্বীকার করতে পারি।

পরিমার্জনা করার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত তা তিনি করে উঠতে পারেন নি। এ ছাড়াও খসড়া আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, তরুণ বয়সে একাধিক উপন্যাস লিখলেও সেগুলো তিনি নিজেই নষ্ট করে ফেলেছেন অথবা হারিয়ে ফেলেছেন। জলপাইগুড়ির দ্বারিকমারিতে, দ্বারিকমারি এম.ই. স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় ‘কন্যা’ নামে একটি ছোট উপন্যাস লিখেছিলেন। উপন্যাসটি ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় পাঠালে সেটি ছাপাও হয় নি এবং হারিয়ে যায়!


সূত্র :
১ . আহমাদ মাযহার, আবদুল হক, বাংলা একাডেমি, ২০০১, পৃ. ৯৩-৯৪
২ . আহমাদ মাযহার, আবদুল হক, বাংলা একাডেমি, ২০০১, পৃ. ৪৮
৩. আবদুল হক, ‘আমার কথা: জীবন ও সাহিত্য’, আহমাদ মাযহার সম্পাদিত আমার জীবনকথা: স্মৃতিকথা ও দিনলিপি, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১৬, পৃ. ২১২
৪. আহমাদ মাযহার, আবদুল হক, বাংলা একাডেমি, ২০০১, পৃ. ৬০
৫. আহমাদ মাযহার, ‘অন্যান্য রচনা, আমার কথা: জীবন ও সাহিত্য’, আহমাদ মাযহার সম্পাদিত আমার জীবন কথা: স্মৃতিকথা ও দিনলিপি, ২০১৭, পৃ.. ২১৭,
৬. আহমাদ মাযহার, ‘২৪ মে ১৯৮১’, আহমাদ মাযহার সম্পাদিত আমার জীবন কথা: স্মৃতিকথা ও দিনলিপি,  ২০১৭, পৃ.. ১২৭,
৭. আহমাদ মাযহার, ‘একটি গল্প’, আহমাদ মাযহার আমার জীবন কথা: স্মৃতিকথা ও দিনলিপি, ২০১৭, পৃ.১২২
৮. আহমাদ মাযহার সম্পাদিত আমার জীবন কথা: স্মৃতিকথা ও দিনলিপি, ২০১৭, পৃ.১২৫
৯.  ঐ, ২০১৭, পৃ. ১৩০
১০. ঐ, ২০১৭, পৃ. ১৩৯
১১. ঐ, ২০১৭, পৃ. ১৪০
১২. ঐ, ২০১৭, পৃ. ৫৩
১৩. ঐ,  পৃ. ৫২

(649)