হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ৩

সোনাপাখি : ৩

সোনাপাখি : ৩
272
0

২ পর্বের লিংক


[দ্বিতীয় পর্বে যা ছিল: শেলির ছোট ছেলে দিশু আর দিশুর বন্ধু শুভ কিছুক্ষণ আগে অপহৃত হয়েছে। বড় ছেলে কিশোর হাদি ফেসবুকে স্বাস্থ্যকর নগর আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত। অপহরণকারী দলে আছে হারুন-মাসুদ-শরিফা]


পর্ব- ৩ 

শেলি কিচেন থেকে কাপ-পিরিচ ধুয়ে এনে ডায়নিং টেবিলে রাখল। তারপর চিনির বয়াম খুলতে খুলতে দরজার দিকে চোখ এক পলক। দিশু এখনই আসবে বলে দরজাটা সে খুলে রেখেছে। কিন্তু সিঁড়িতে কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। শেলি চিনির বয়াম রেখে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। সিঁড়ির দিকে চেয়ে মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর ফোন।

‘আপনি যে নাম্বারে ফোন করেছেন…!’

শেলির বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে। ফোন বন্ধ হবে কেন? কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে সে যখন দ্বিতীয়বার ফোন করতে যাচ্ছিল তখন রিতি বলল, “আম্মু, চোখ ব্যথা করে।”

“চোখ বুজে শুয়ে থাক। কাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব,” শেলি বলল। তারপর কানে মোবাইল ফোন চেপে ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা।

কল যাচ্ছে না। আবার অপারেটরও কিছু বলছে না।

শেলি তৃতীয়বার আবার সংযোগ পাওয়ার চেষ্টা করলে অপারেটর বলল, বন্ধ রয়েছে।

কেন? কী হয়েছে? শেলি মনে মনে কথা বলে আর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।

বাচ্চারা বাইরে গেলে—যার সাথেই যাক, যেখানেই যাক—শেলির মনটাও তাদের সাথে সাথে যায়। তারপর ফোন করে না পেলে অশান্তি। অমঙ্গলের আশঙ্কা। প্রায় দৈনিক যেভাবে হত্যা আর অপহরণের খবর আসে মিডিয়ায়!

শেলি চতুর্থবার কল দিয়ে হাদির ঘরের দিকে তাকাল, “বাবা আল হাদি!” তার গলা কেঁপে উঠল।

হাদি তার ঘর থেকে বলল, “শুনছি। বলো।”

“দিশুর ফোন বন্ধ কেন?”

“উমমম—চার্জ নেই হয়তো।”

“চার্জ ত থাকার কথা। আমি বিকেলে ফুল চার্জ দিয়ে দিলাম।”

ধরা যাক, যেকোনো কারণেই হোক, দিশুর ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু মসজিদ মোড় থেকে আসতে ত তার তিন-চার মিনিটের বেশি লাগার কথা না। অথচ… শেলি মোবাইল ফোনের ‘ভিউ কল লগ’ চেক করল। নয় মিনিট আগে দিশু বলেছিল সে মসজিদ মোড় থেকে আসছে।

“হাদি, এদিক একটু আয় ত বাবা,” শেলির ম্রিয়মাণ কণ্ঠ।


শুভ-দিশু এখন যেখানে আছে, ওই বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিলে সেটা হবে সবচেয়ে নিরাপদ, আলোচনা শেষে হারুন-মাসুদ একমত।


হাদি আসে। তার চোখ মোবাইল ফোনের পর্দায়। স্বাস্থ্যকর নগর আন্দোলনের স্ট্যাটাস নিয়ে এক ব্যক্তি কমেন্ট করেছে, ‘নগর সমস্যার সমাধান করতে হলে স্বাস্থ্যকর বসবাসের জন্য জনপ্রতি কতটুকু জমি দরকার তা আগে বলতে হবে। সেভাবেই নগর পরিকল্পনার স্লোগান তুলতে হবে। এজন্য শুধু সোশ্যাল মিডিয়া যথেষ্ট না। রাস্তায়ও নামতে হবে!”

শেলির রাগ হচ্ছে হাদিকে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত দেখে। কিন্তু সে শান্ত কণ্ঠেই বলল, “আমি নিচে যাচ্ছি। রিতিকে দেখিস।”

“ঠিক আছে,” হাদি ডিভাইস থেকে চোখ না তুলেই বলে।

রিতি আম্মুর সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরল কিন্তু শেলি বলল, সে দিশুকে নিয়ে এখনই চলে আসবে। “আর তুমি ওই ব্লকগুলো দিয়ে একটা ট্রেন বানাও ত। টিভি আর অন করো না। চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে,” টিভি বন্ধ করে বলল সে। যদিও সে জানে এসব বলে কোনো লাভ হয় না। বরং টিভি বন্ধ করতে বলাটাই অন্যায় মনে হয় মাঝেমধ্যে। তখন অস্বস্তি হয়।

শেলি দ্রুত সিঁড়ি ভাঙে। বাড়ির সামনের গলি দিয়ে পশ্চিমে একটু আগালে বাঁ দিকে একটা ঘুপচি গলি। এখান দিয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলে সেই মসজিদ মোড়। ঘুপচি গলিটার পাশের গলির ছয়তালা বাড়িতে শুভ-দিশুকে আটকে রাখা হয়েছে।

শেলি মোড়ে যেতেই একটা অটোরিকশা হর্ন দিল। সবাই পথ ছেড়ে দিলে গাড়িটা তাদের ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢেকে দিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ রুমালে, ওড়নায় নাক-মুখ ঢাকে। হাত দিয়ে ঢাকে কেউ কেউ। অনেকে খুসখুস করে। শেলি মনে মনে বলে, সবাই শ্বাসকষ্টে ভোগে।

মোড় দিয়ে সামনে আগাতে আগাতে ডানে-বাঁয়ে সব গলির দিকে চায় শেলি। তারপর পেছন ফিরে উল্টো দিকে যেতে যেতে অন্য গলিগুলো দেখে।

না, দিশুকে দেখা যাচ্ছে না। শেলি ভাবল, এতক্ষণে সে হয়তো বাসায় ফিরে গেছে। ভাবতে ভাবতে হাদিকে ফোন।

না, বাসায় ফেরে নাই।

শেলির ভালো লাগছে না। দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে। মোড়ে দাঁড়িয়ে খানিক চিন্তা করে এক চা দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, এদিকে নয়-দশ বছরের দুটো বাচ্চাকে দেখেছেন নাকি?”

“আঁআঁআঁ—হা, দেখলাম বলে ত মনে হলো। একজনের হাতে বোধহয় ক্রিকেট ব্যাট ছিল।”

“হা, ক্রিকেট ব্যাট ত থাকার কথা,” শেলির চোখের সামনে ভাসে দৈনিক বিকেলে দিশু ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছে।

তাহলে এইটুকু সময়ের মধ্যে তারা কই গেল? শেলি ভাবছে, এখন ত তাদের কোথাও যাওয়ারও কোনো কারণ নেই।

শেলি আবার এই মোড়টার আগে-পাছে হাঁটতে হাঁটতে ডানে-বাঁয়ে সব গলিতে খুঁজে ফেরে। তারপর আবার দিশুর নম্বরে ফোন।

বন্ধ।

শুভর মায়ের কাছে খোঁজ নেওয়া উচিত—ভাবতে ভাবতে মোবাইল ফোনের কল লিস্ট বের করে মা শেলি। ‘শুভর মা’ লেখা নাম্বারে ফোন।

‘…নাম্বারটি এই মুহূর্তে ব্যস্ত রয়েছে।’

শুভর মা রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সব গলির দিকে তাকাচ্ছে আর ‘রনির মা’ ‘সেতুর মা’ ইত্যাদি নাম্বারে ফোন করছে। তারপর দিশুর মায়ের কথা শুনে তার বুক শুকিয়ে যায়। সে দোড় দিল।

শাড়ি পরা নারীকে গলির মধ্য দিয়ে, লোকজনকে পাশ কাটিয়ে দোড়োতে দেখে সবাই বিপদ আঁচ করে।

একজন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, ও আপা?”

“আমার শুভ হারায় গেছে গো! কই গেল আমার—!” সে কেঁদে ফেলল।

এক তরুণ ওষুধ বিক্রেতা তার পিছু নেয়। অন্যরা ব্যথিত চোখে তাকানোর মধ্যে দায়িত্ব শেষ করে। তারাও প্রিয়জনকে হারানোর মতোই অন্যান্য জটিল সমস্যায় ক্ষতবিক্ষত। এমন করেই তৈরি হয়েছে নগরের সব আর্থ-সামাজিক নিয়ম-কানুন।

শাড়ি পরা নারী আর ওষুধ বিক্রেতা তরুণ দোড়োতে দোড়োতে শুভ-দিশুকে আটকে রাখা বাড়িটার পাশ দিয়ে চলে যায়। গলি ছেড়ে মসজিদ মোড়ে ওঠার সময় তাদের পাশ কাটায় দুই অপহরণকারী। মোটর মেকানিক মাসুদ আর অটোচালক হারুন। দিশুর মায়ের চোখের সামনে।

হারুন কিছু খেয়াল করে না। শুধু মাসুদ চিন্তায় পড়ে। দিশুর মায়ের উদ্‌ভ্রান্ত মুখ তার চোখে ভাসে। শাড়ি পরা নারীকে দোড়োতে দেখে তার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়। পা কাঁপতে শুরু করলে আমির এন্টারপ্রাইজের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

“কী হলো?” হারুন বলল।

মাসুদ কোনো কথা না বলে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে। তারপর দোকানের সামনে ঝোলানো লাইটার জ্বেলে লম্বা টান। “মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে হবে,” মোড়ের দিকে ঘুরে বলল সে। “চল ত দেখি ওখানে জটলা কিসের?”

জটলা মানে দিশুর মা, শুভর মা আর তিন তরুণ কথাবার্তা বলছে। ত এমন জটলা ত শহরের অলি-গলি যেখানে-সেখানে তাকালেই দেখা যায়।“এর কী দেখতে হবে?” হারুন বিরক্ত।

তবু মাসুদ গিয়ে দিশুর মাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হইছে, আপা? কোনো সমস্যা?”

শুভর মা কাঁদতে কাঁদতে ঘটনা বলে। শুনতে শুনতে মাসুদের চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। দূর থেকে আসা বিদ্যুৎ-বাতির হালকা আলোয় তা কেউ বুঝতে পারে না।

হারুন আর এখানে দাঁড়ানোর সাহস করল না। তাড়া করে বলল, “একেবারে ছোট ঝিপুত ত না। আবার দুইজন একসাথে আছে। দেখেন চইলে আসফেনে।” সে কাল বিলম্ব না করে পা বাড়ায়। মাসুদ তার পাছে পাছে।

তারা মোটর গ্যারেজে ফিরে যায়। কিন্তু এখানে দুই বন্ধু হঠাৎ এত ফুসুরফাসুর শুরু করলে কেউ হয়তো সন্দেহ করবে। “চল, ওদিকে যাই,” মাসুদ বলল।

তারা খানিকটা ঘুরে সেই টিনের বেড়াটার ওপাশ দিয়ে রেললাইনে যায়। আবছা অন্ধকারে বহু লোক দলে দলে বসে গপ্পসপ্প করছে। অনেকেই নিঃসঙ্গ। স্থানীয় কর্মজীবী মানুষ কালেভদ্রে যেদিন সন্ধ্যায় ছুটি পায়, এখানে বসে সময় কাটায়। এটা তাদের পার্ক যেন।

“কিন্তু এখানে বসব কই?” হারুন ডানে-বাঁয়ে তাকাল। গোপন কথা বলার মতো ফাঁকা জায়গা নেই। শুধু মানুষ আর মানুষ।

“চল, ওদিকে যাই,” মাসুদ হাঁটা দিল।

রেললাইন ধরে খানিকটা হাঁটার পর তারা একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে লোহার পাতে পাছা পেতে বসে। রেলযাত্রীদের গু-মুত, সিগারেটের পাছা, পানের পিক, মুরগির নাড়িভুঁড়ি, বমি—সবই আছে এখানে। আশপাশের বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের গৃহবর্জ্য আছে রেললাইনের পাশ দিয়ে। মুক্ত ময়লাখানার মতো।

“যা বলছিলাম,” মাসুদ বলল, “ভাবসাব ত ভালো মনে হচ্ছে না। পিচ্চিদের লোকজন যদি মসজিদ মোড় থেকে না সরে?”

“সরবে না ক্যা? পিচ্চিদের বাসা কোন গলিতে?”

“তা ত জানি নে।”

“জানলে ভালো হতো। যদি ওই গলিতে হয়—!”

“ওই গলিতে না তা আমি নিশ্চিত।”

“তাহলে লোকজন ওখানে দাঁড়াল ক্যা?”

“তাই ত ভাবি।”

তারা সিগারেট টানতে টানতে ভাবে। সিগারেটের সঙ্গে ময়লার গন্ধ টানতে টানতে ভাবে। তখন তারা বাচ্চাদের স্কুটারে করে লৌহজং নেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দেয়। তারা ভেবেছিল, গভীর রাতে খুব সহজেই অজ্ঞান করে স্কুটারে তুলতে পারবে। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা রিস্কি মনে হচ্ছে।

“সহজ উপায় হলো বিকাশ,” হারুন বলল। সে ভাবছে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ৪০-৫০ হাজার টাকা খুব সহজেই দিয়ে দেবে। কিন্তু মাসুদ বলল, বিকাশ এজেন্টের কাছে টাকা নিতে গিয়ে গোয়েন্দার হাতে ধরা পড়ার খবর সে অনেক শুনেছে।

হারুন নড়েচড়ে বসল। তার মনে হচ্ছে, “ধরা পড়ার কারণ হলো ওই গাধারা আগেই বিকাশ এজেন্টের নম্বর দিয়ে দেয়। আমরা এজেন্টের নম্বর দেওয়ার পর কব যে, তিন মিনিটের মধ্যে বিকাশ করতে হবে। নয়তো ঘ্যাচাং! এতে বাপ-মার পরানে ভয় ধরবে না?”

“তা অবশ্য ভালো বুদ্ধি!” মাসুদের খুশি খুশি লাগে। সে হারুনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, “তোর মাথায় সত্যি সত্যি মাল আছে!” কিন্তু সে দিশুদের ছাড়ার উপায় খুঁজে পায় না। “ছাড়তে গেলে যদি ধরা খাই?”

তবে হারুনের সহজ উত্তর, “থাক না দুই দিন আটকা! এত টেনশন কিসের? দরকার হলে হাত-পাউ বাইন্ধে সেপটিক ট্যাংকে ফেলায় দিলেই ত ঝামেলা মিটে গেল!”

মাসুদের বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। যদিও সে নিজেও এমন কিছু ভেবেছে কিছুক্ষণ আগেও।

হারুন বলল, “নাচতি নাইমে ঘুমটা দিয়ার কোনো মানে হয় না। ইডাও অন্যায় উডাও অন্যায়।”

শুভ-দিশু এখন যেখানে আছে, ওই বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিলে সেটা হবে সবচেয়ে নিরাপদ, আলোচনা শেষে হারুন-মাসুদ একমত।

কেউ নিজেকে বোকা মনে করে না। টিভির সামনে বসে পাঁচটা-দশটা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন দেখতে দেখতে অপরাধীরা ভাবে, আহা লোকগুলো কী বোকা। তারা পলাতে পারল না।

সেপটিক ট্যাংকে ফেলার পর পচে গন্ধ হবার বিষয়টাও তারা আলোচনা করে। কিন্তু পুলিশ কাকে ধরবে? ছয়তালা বাড়ির চব্বিশটা ফ্ল্যাটের চব্বিশ পরিবারে আছে শতাধিক সদস্য।


শরিফা বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। খানিক পরে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চায়, “ওরা কি কিছু বুঝতি পারিছে? 


হারুন বলল, “বিকাশই ভালো। নিরাপদে অল্প অল্প করে—!” একটা ট্রেন এসে পড়লে তাকে থামতে হয়। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে নাকে-মুখে হাত চাপে। ট্রেনটা সবাইকে বিষাক্ত ধুলোয় ঢেকে দিয়ে চলে যায়। তারপর আবার সবাই লোহার পাতে পাছা পেতে বসে।

“আর দেরি করার দরকার নেই,” মাসুদ তার প্যান্টের পকেট থেকে দিশুর মোবাইল ফোনটা বের করল। অন করার সঙ্গে সঙ্গে শেলির ফোন। ‘আম্মু ইজ কলিং—!’

মাসুদ কল রিসিভ করতেই শেলির উদ্বিগ্ন কণ্ঠ, “দিশু!”

মাসুদ ঘাবড়ে যায়। কিন্তু হারুন ঠুন্না দিয়ে ফোনটা নিয়ে নিল। নারী কণ্ঠ শুনেই বলল, “খালাম্মা, ভালো আছেন?”

“কিডা তুমি? আমার দিশু কই?”

“সব ঠিক আছে,” হারুন আশপাশে তাকাল। এই মুহূর্তে কাছাকাছি কেউ নেই। তবে দুটি লোক রেললাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই আসছে। ত এখান দিয়ে ত সব সময় কত কত লোকজন চলাফেরা করে। হারুন তবু রেললাইন থেকে নেমে গেল।

দিশুর মা কাঁপা কাঁপা গলায় ‘হ্যালো হ্যালো’ করেই যাচ্ছে। কথা বলতে গেলে হারুনেরও গলা কেঁপে ওঠে। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। মাসুদ তাড়াতাড়ি একটা স্টিক টেনে নেয়। হারুন সেটা ঠোঁটে চাপলে মাসুদ আবার হারুনের পকেট হাতড়ে গ্যাস লাইটার বের করে।

হারুন লম্বা করে একটা টান দিয়ে বলল, “কুড়ি মিনিট পরে আমি একটা বিকাশ নম্বর দিচ্ছি। দেওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে বিকাশ করবেন। নয়তো ঘ্যাচাং!” সে আর দেরি না করে লাইন কেটে দিল। তার বুকের ভেতর ধড়ফড় করতে লাগল।

তারা রেললাইন ধরে সিগারেট টানতে টানতে মহাখালির দিকে পা বাড়ায়। প্রতিটা নিশ্বাসে ধুলো, ধোঁয়া আর বর্জ্যের গন্ধ নিয়ে ফুসফুস ভরতি করতে করতে হাঁটে। অন্য পথচারীদের মতো। দৈনিক লাখ লাখ পথচারী এই পথে হাঁটে। তাদের মধ্যে আছে আরো নানা রঙের হারুন-মাসুদ, ভদ্দর লোক অফিসার, ইত্যাদি।

মহাখালি রেলক্রসিংয়ের কাছে বেশ কটা বিকাশ এজেন্ট। ফ্লাইওভারের নিচে একটা এজেন্টের কাছে যেতেই হারুনের মাথায় যেন বাজ পড়ল। দোকানটার এক কোনায় আঠা দিয়ে লাগানো সাদা কাগজে লেখা, পাঁচ হাজার টাকার বেশি তুলতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র লাগবে।

তারা আরেক এজেন্টের কাছে যায় যেখানে এই মুহূর্তে কোনো খদ্দের নেই। তারা দুই হাজার টাকা ঘুষ দিতে চায় কিন্তু এজেন্ট তাদের দিকে এমন করে চায় যে তারা আর সেখানে দাঁড়ানোর সাহস করে না।

“তাহলে,” হারুন বলল, “এক এক এজেন্ট থেকে পাঁচ হাজার করে নিলে কেমন হয়?”

“এত ছ্যাচড়ামি করে কি পারা যায় নাকি?”

“আচ্ছা, আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করতে হবে।”

তারা আবার লৌহজং-পদ্মা-স্পিডবোট সামনে নিয়ে আসে।

“পদ্মায় সুবিধে হলো,” হারুন বলল। যেমন তারা আগেই প্ল্যান করেছে। মোবাইল ফোনে হারুন বলবে, লৌহজং থানা জামে মসজিদের ঘাট থেকে একটা ডিঙিনৌকো নেবেন।

দিশুর বাবা জালাল সরদার একটা ডিঙিনৌকো ভাড়া করল। প্রথম চরটার পরের চরের সামনে দিয়ে এটকু উজানে গেলে ফাঁকা এলাকা। বেলা ডুবার আগে আগে বালুচরে টাকার ব্যাগ হাতে দাঁড়াল দিশুর বাবা। একা। একজন কিন্তু। কাছাকাছি আর কেউ থাকলে ছেলেকে পাবেন না। বেলা ডুবে গেলে দেখা হবে।

দিশুর বাবা টাকার ব্যাগ হাতে একা দাঁড়িয়ে আছে। বেলা ডুবে যাচ্ছে।

হারুন-মাসুদ একটা স্পিডবোটে করে এসে থামল।

হারুন আগে এখানে স্পিডবোট চালাত। মাসুদ ছিল তার সহকারী। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলে তারা আগেভাগে ঢাকায় পাড়ি জমায়। তাছাড়া কার ড্রাইভারদের বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। যদিও দালাল খরচ জোগাড় করা কঠিন।

“কিন্তু,” মাসুদ বলল, “পিচ্চদের আত্মীয়-স্বজন না হয়ে ওই লোকটা ত পুলিশও হতে পারে। দিশুর বাবা সেজে যদি পুলিশ আসে? তাহলে তার কাছে পিস্তল থাকবে তাও নিশ্চিত।”

“ভালো কথা মনে করেছিস,” হারুন বলল। একজন গিয়ে চেক করতে হবে। সব কাপড় খুলে ন্যাংটা হয়ে দাঁড়াতে বলবে। হাফ প্যান্ট পরা থাকলে তাও খুলতে হবে। তারপর মাথার ওপর হাত উঁচু করে দাঁড়াতে বলবে।

লোকটা হাত উঁচু করলে মাসুদ টাকার ব্যাগ নিয়ে পিছিয়ে যাবে। তারপর একটানে মাওয়া স্পিডবোট ঘাট। সেখানে প্রতিমুহূর্তে পাঁচটা-দশটা স্পিডবোট আসে-যায়।

“খুব রিস্কি। পিচ্চিদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে সবচাইতে ঝক্কির কাজ।”

“এক-দুই দিনের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা কি আর অত সহজে মেলে রে বেটা। কাজটা করতে পারলে তোর গ্যারেজ আর আমার বিদেশ যাওয়া কনফাম।”

“তবু আবার একবার এক এক এজেন্টের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে নেওয়ার বিষয়টা আলোচনা করা উচিত—!”

বস্তুত সব প্রক্রিয়ায় অপরাধীকে ধরা যায়। পদ্মার চরের দুপাশে গোটাদুই স্পিডবোটে জন দশেক কোস্টগার্ড সদস্য অবস্থান নিতে পারে। মসজিদ মোড়ে ও আশপাশে জন দশেক গোয়েন্দা পুলিশ অবস্থান নিতে পারে। ভিকটিম একটা নির্দিষ্ট এজেন্ট থেকে টাকা পাঠায়। টাকাটা কোথায় যাচ্ছে, বিকাশ সিস্টেম নজরে নিয়ে পুলিশ তা সহজেই শনাক্ত করতে পারে।

কিন্তু।

বিকাশ বা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকার বা রাষ্ট্র যারা গঠন করেছে এবং এটা যারা চালায়, অস্ত্রধারী বাহিনী, আমলা, রাজনীতিবিদ, তাদের সে রকম কোনো উদ্দেশ্য নেই। যদি থাকে, যা খাজনা আদায় হয় তা সব চলে যাবে নিরাপত্তায়। তাহলে তারা বেতন বাড়াবে কিভাবে। আরাম-বিলাস করবে কিভাবে। তারা নিরাপত্তা নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য রাষ্ট্র গঠন করে নি।

“যা হোক,” মাসুদ বলছে, “এখন তাড়াতাড়ি ঠিক করতে হবে যে—!”

তার কথা শেষ হবার আগেই শরিফার ফোন, “কী ব্যাপার, তুমার কোনো খবর নেই ক্যা?”

মাসুদ আগে-পাছে চিন্তা না করেই বলল, “মোড়ে দেখলাম যে ওই পিচ্চিগের মা-ভাই কারা কারা দাঁড়ায় রইছে।”

খবর শুনে শরিফার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে। সে খাটে বসে ছিল। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল। তার পায়ে পা বাড়ি খায়। তবু সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জানালার সামনেই অন্য বাড়ির দেয়াল। অন্য জানালার দিকেও তাকাল। তার সামনে রয়েছে সীমানা প্রাচির।

শরিফা বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। খানিক পরে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চায়, “ওরা কি কিছু বুঝতি পারিছে? মানে ওরা কি আমাগে সন্দ করতিছে?”

মাসুদ তাকে আশ্বস্ত করে, কেউ কিছু বুঝতে পারে নাই। তবু শরিফা খাট থেকে নেমে মেঝেতে বসে। টালুমালু চোখে আশপাশে চায়। উঠে গিয়ে দরজার খিল চেক করে। তারপর পা টিপে টিপে রান্নাঘরে। চুলার নিচে উঁকি মারে কিন্তু জানালা দিয়ে আসা হালকা আলোয় কিছু বুঝতে পারে না। শুধু ভাবে পিচ্চিদের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা আছে। পা বাঁধা আছে। মুখে টেপ মারা আছে।

শরিফা ফিরে গেলে দিশু শুভর দিকে তাকাল। শুভ বেশি ভয় পেয়েছে। সে এখনও কাঁপছে। দুজনেরই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তারা সব সময় ভাবছে তাদের কি মেরে ফেলবে! টিভিতে তারা বহু শিশুকে মেরে ফেলার খবর দেখেছে। ফেসবুকে শিশুর লাশের ছবি দেখে কাঁপতে কাঁপতে স্তব্ধ হবার কথা মনে পড়ছে। দিশুর যদিও নিজের আইডি নেই, একদিন হাদির ল্যাপটপ খুলতেই সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার বয়সী দুই শিশুর লাশের দিকে তাকিয়ে নিশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়। হাদি হঠাৎ খেয়াল করে তাকে সরিয়ে নিলেও সে জ্ঞান হারাল। সেই দৃশ্য মনে করে দিশুর বুকের ভেতর ধড়ফড় করে। সে মরিয়া হয়ে মুক্ত হবার উপায় খোঁজে।

প্রথম কাজ হলো হাতের বাঁধন খোলা। কিন্তু কিভাবে? হাতও বাঁধা পাও বাঁধা। আবার মাথা নাড়াতে গেলে উপরে কংক্রিটে ঘাই লাগে। নড়াচড়ার শব্দ হলেও মুশকিল। আর মশারা সবচেয়ে বেশি ঝামেলা বাধাচ্ছে। এত মশা কামড়ালে এখনই ত—দুইজনই অবিরাম গা মোড়ামুড়ি করছে। হাত টানাটানি করছে। মশারা নড়ছে না। আরো আসছে। ভুঁ ভুঁ।

তাদের কান্না পায়। মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হুহু করে। বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা বাইরে থেকে এসেই বলছে, দিশুবাবা কই? আব্বু কই? ভাইয়া ডাকাডাকি করে দিশুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। আর রিতি এখন কী করছে? কিন্তু ওরা যদি তাদের মেরেই ফেলে! দিশু ধড়ফড় বুকে শুভর দিকে তাকাল। শুভ তাকে কতবার ফিরে যেতে বলল। তার কথা শোনা উচিত ছিল।


দিশু সামনে ঝুঁকে হামাগুড়ি দিল বের হবার জন্য। কিন্তু শুভর চোখের সামনে ভেসে উঠল ধারালো বঁটি। 


আচ্ছা, সেই ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটার সাড়াশব্দ নেই কেন? লোকটা কি বাসা থেকে বের হয়ে গেছে? আর সেই মহিলাটা বাসায় এখন একা? মহিলা মানে শরিফা। দিশুর মন চনমন করে উঠল। তাড়াতাড়ি যদি হাতের বাঁধনটা খোলা যায়! ভাবতে ভাবতে শুভর দিকে তাকাল। শুভও ভাবছে। সে গা মুড়িয়ে ঘুরে বসল। বেঁধে রাখা হাতদুটো বাড়িয়ে দিশুর একটা হাত ধরে টান দিল। দিশুও গা মুড়িয়ে হাতদুটো বাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু দেয়ালে তার কনুই ছড়ে যায়। চামড়া উঠে রক্ত বের হচ্ছে। এখন আম্মু থাকলে ডেটল নিয়ে দোড়োয় আসত। ভাইয়া গজ-ব্যান্ডেজ নিয়ে আসত। কাঁপা কাঁপা হাতে বেঁধে দিত। তারপর হেসে বলত, “কেমন লাগে?” দিশু মুখ ভার করে ভাইয়ার দিকে তাকাল। তার এখন কান্না পাচ্ছে অথচ ভাইয়াটা হাসছে। আর সেই ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটা তাদের এভাবে বেঁধে রেখে কষ্ট দিচ্ছে। আর ওই মহিলাটা—ওরা এটা কেন করছে!

মুক্তিপণ শব্দটা দিশুর কানে বাজলেও তা তার উপলব্ধিতে আসে না। সে শুধু ভাবে, টিনের বেড়ায় বাড়ি মারার কারণে ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটা খুব রেগে আছে। ত টিনের বেড়ায় বাড়ি মেরেছে বলে কি সে তাদের এভাবে বেঁধে রাখবে নাকি।

দিশুর ভাবনা শেষ হবার আগেই শুভ তার বাঁধন খুলে ফেলল। দিশু অবাক। সে মুক্ত হাতে তাড়াতাড়ি করে শুভর বাঁধন খুলে দেয়। তারপর তারা মুখের টেপ খুলে ফেলে। পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে। আর তারা কানে কানে কথা বলে।

ভয়ের মধ্যেও এতক্ষণে তাদের একটু খুশি খুশি লাগছে। দিশু সামনে ঝুঁকে হামাগুড়ি দিল বের হবার জন্য। কিন্তু শুভর চোখের সামনে ভেসে উঠল ধারালো বঁটি। দিশুকে সে টেনে ধরল। “আগে আমাদের একটা প্ল্যান করতে হবে,” কানে কানে বলল সে, “জবাই করে ফেলবে বলেছে, মনে নেই?”

দিশুর মনে পড়ে। সে চুপ হয়ে যায়। কিন্তু কোনো বুদ্ধি তার মাথায় আসছে না। “কী প্ল্যান করব?”

“চিন্তা কর,” শুভ বলল। কানে কানে ফিসফাস।

“এক কাজ করা যায়। তুই ওই মহিলাকে ধরবি আর আমি দরজা খুলে ফেললেই ত হয়ে গেল!”

“ঠিক আছে,” কিন্তু শুভর বুকের ভেতর ধড়ফড় বেড়ে যাচ্ছে। সে কি পারবে মহিলাটাকে ধরে রাখতে? সে ভরসা পায় না। সে এখনও অনেক ছোট। তবে তার মনে পড়ে আম্মুর কোমর জড়িয়ে ধরলে আম্মু আর নড়তে পারে না। এ পর্যন্তই তার ভাবনা-কল্পনা। তার ভাবনায় আসে না যে আম্মু তাকে ব্যথা দিতে পারে না। আম্মু তাকে কষ্ট দিতে পারে না। এই মহিলা দিতে পারে কিনা। সে এখনও এত দূর ভাবা শেখে নি।


৪ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)