হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ৭

সোনাপাখি : ৭

সোনাপাখি : ৭
236
0

৬ পর্বের লিংক


[ষষ্ঠ পর্বে যা ছিল : পুলিশ মসজিদ মোড়ের সব বাসিন্দার বায়োডাটা ঘেঁটেছে। সন্দেহজনক সবার নোট নিয়েছে। শুভ-দিশুকে নিয়ে অপহরণকারী হারুন-মাসুদ-শরিফা লৌহজং রয়েছে]


পর্ব- ৭

১.
মসজিদ মোড়ের গোটা তিনেক বাড়িতে হানা দেওয়ার পর পুলিশ গেল শরিফাদের বাসায়।

দরজা বন্ধ।

এসআই খায়ের ফোন করার জন্য নোটবুক খুলল। যে নাম্বারটা তার কাছে আছে তা শরিফার স্বামীর। তাকে ফোন করলে অপারেটর বলল, বন্ধ রয়েছে।

খায়ের মিনিট খানেক চিন্তার পর বাড়িঅলাকে ডেকে আনে। বুড়ো বাড়িঅলা অবাক চোখে পুলিশের দিকে চেয়ে যেন অবশ হাতে বাড়িয়ে দিল শরিফার বাসার চাবিটা। তারপর সে আরো অবাক হলো পুলিশ নির্বিকার ভঙ্গিতে দরজা খুললে।

শরিফার ঘরে ঢুকে আশপাশে তাকানোর আগেই পুলিশের চোখে পড়ে লাল-নীল স্টিকার লাগানো গোলাপি ব্যাটটা। দরজার পাশেই দেয়ালঘেঁষে মেঝেতে পড়েছিল বড় অনাদরে। মাসুদ-শরিফা খেয়াল করে নি।

ব্যাটের সারা গায় নানা রঙে ও ঢঙে দিশুর নাম লেখা। এমনকি তার ফোন নাম্বার আছে দুই জায়গায়। এসআই চৌকির তলে আর আশপাশে তাকাল। তার মুখ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে বাড়িঅলাকে জিজ্ঞেস করল, সেপটিক ট্যাংক কোথায়?

বাড়িঅলা সেপটিক ট্যাংক দেখিয়ে দিলে পুলিশ লাইট আর লম্বা লাঠি আনতে বলল বাড়িঅলাকে। লাইট জ্বেলে উঁকি দেবে। লাঠি দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখবে। তারপর বাড়ির সামনে নর্দমার নালার ঢাকনা খুলে দেখবে।

কোথাও কোনো আলামত মিলল না।

এবার কি পুলিশ শুধু ব্যাটটা ফিরিয়ে দেবে? দিশুর মাকে তারা কী বলবে?

খানিক চিন্তা করে খায়ের বরং তার ওসিকে ফোন করল। তাকে ঘটনা জানানোর পর অনুমতি নিয়ে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানায় ফোন করবে। সেখানকার পুলিশ শরিফার স্বামীকে খুঁজে বের করবে।


আমাগে ভুল হয়ে গেছে। যার বাপ নেই, কিডা তারে লাখ টাকা দিয়ে ছাড়াতি আসবে?


কথাবার্তা বলার পর খায়ের যখন শরিফার স্বামীর নাম-ঠিকানা ও ফোন নাম্বার এসএমএস করছিল তখন এল র‌্যাবের গাড়ি। খবর পেয়ে ছুটে আসে দিশুর বাবা-মায়েরা। “এই ত আমার দিশুর ব্যাট। কই, আমার দিশু কই?” দিশুর মা বলছিল। ঠিক সেই সময় তার মোবাইল ফোনে রিং হলো। মনিটরের দিকে তাকিয়ে ‘দিশু মাই হার্ট ইজ কলিং’ দেখেই তার বুকের ভেতর ধড়াশ করে ওঠে। ‘তারা ফোন করছে’ বলতে বলতে খায়েরের মুখের দিকে তাকাল দিশুর মা।

খায়ের নিঃশব্দে ডিভাইসটা নেয়, “হ্যালো!”

ওপাশ থেকে মাসুদ বলল, “কিডা?” সে ভাবছিল কাল রাতের মতো এখনও দিশুর মা রিসিভ করবে।

“আমি দিশুর মামা,” খায়ের বলল, “দিশুর মা ত অজ্ঞান হয়ে রইছে।”

“দিশুর বাপরে দেন।”

“দিশুর বাপ ত মারা গেছে,” খায়ের বোঝার চেষ্টা করছে অপহরণকারীরা পেশাদার কি অপেশাদার। দিশুর পরিবার সম্পর্কে তারা কিছু জানে কিনা, ইত্যাদি।

মাওয়া স্পিডবোট ঘাটের কাছেই বালুচরে দাঁড়িয়ে হারুন-মাসুদ-শরিফা।

মাসুদ ঘাবড়ে গেল। খোঁজখবর না নিয়ে এ তারা কাদের ধরে আনল! তার গলা কেঁপে উঠলে হারুন ডিভাইসটা নিয়ে সরাসরি বলল, “টাকা রেডি করিছেন? আমরা আবার ফোন করার দুই ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবেন। না আসলে ঘ্যাচাং!”

“কোন জাগায় আসব, ভাই?” খায়ের বলছিল।

হারুন ফোন বন্ধ করে দিল। তার বুকের ভেতর ঢিবঢিব করছে।

মাসুদ বলল, “আমাগে ভুল হয়ে গেছে। যার বাপ নেই, কিডা তারে লাখ টাকা দিয়ে ছাড়াতি আসবে?”

হারুনের চোখমুখ শুকিয়ে যায়। শরিফা ধপাশ করে বালুর ওপর বসে পড়ে। মাসুদও বসে তার পাশে।

“তাহলে এখন কী করা যায়?” হারুন শরিফার পাশে বসতে বসতে বলল, “এমনও ত হতে পারে যে তারা আমাগে বোগাস দেচ্ছে।”

“তা অবশ্য হতে পারে। আর একটা কথা হলো যে ওরা বারবার দিশুর কথা কচ্ছে। তার মানে এমনও হতে পারে যে অন্যজন অন্য কারুর ছাওয়াল।”

“আমারও তাই মনে হচ্ছে। কাল সন্ধ্যায় যখন মসজিদ মোড়ে… আমার মনে হলো যে দুইজন দুই মহিলার ছাওয়াল।”

“তাহলে দুইজনের বাপ-মা মিলে দুই-তিন লাখ টাকা জোগাড় করতে পারবে না?”

“অবশ্যই পারবে। ছাওয়াল ফিরে পাওয়ার জন্যি সবাই এইডা করবে। চল। ওঠ।”

হারুন উঠে দাঁড়াল।

শরিফা বলল, “বিষয়টা আমার…!” হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে বলল, “বিষয়ডা হলো… মানে এখন আমরা কী করব?”

“যা প্লান তাই। এখন আমরা স্পিডবোট ঠিক করব।”

কিন্তু শরিফা বলল,“তুমি অটো চালাও। অটো বাড়ি থুয়ে এখন আবার স্পিডবোট ভাড়া করলে লোকে সন্দেহ করবে না?”

“তুই বাল খালি দুশ্চিন্তায় ফেলিস। এত ভাবলে কি কাজ করা যায় নাকি?”

“আচ্ছা, ঠিক আছে, কর যা করবা, “শরিফা মৃদু হাসল, “আর পিচ্চিদের কিছু খাওয়ানু লাগবে না?”

“একদিন না খালি কিছু হবেনানে। সন্ধের মধ্যে ফয়সালা না হলে রাতে দেখা যাবে কী করা যায়।”

“আচ্ছা, তাহলে আমি এখন বাসায় গেলাম,” শরিফা পা বাড়ায়। স্ট্যান্ডে গিয়ে অটোরিকশায় উঠবে। সেখান থেকে পাঁচ কিলো গেলে তার বাড়ি। তাকে এখন আর আগের মতো উদ্বিগ্ন লাগছে না। বিষয়টা মাসুদের চোখ এড়ায় না। “ওকে আমার ভালো মনে হচ্ছে না,” বলল সে।

“কেন, কী মনে হচ্ছে?”

“মনে হচ্ছে ও কিছু একটা প্লান করিছে।”

“ও আবার কী প্লান করবে? তু্ই বাল কী সব চিন্তাভাবনা করিস বুঝি নে।” হারুন বিরক্ত।

মাসুদ বলল, স্পিডবোটের প্ল্যান এখন আর তার ভালো মনে হচ্ছে না। ওরা যখন টাকা নিয়ে আসবে তখন ত পুলিশও আসতে পারে। পুলিশেরও ত স্পিডবোট আছে।

“তাহলে তু্ই এখন কী করতে চাইস?”

“সব চাইতে ভালো উপায় হলো বেচে ফেলা। হাসানরে একটা ফোন দিয়ে শুনি কী কয়। ও ত একবার ইঙ্গিত দেছল।”

“হাসান যে এসব করে তা কি তুই কনফাম?”

“কনফাম! তাছাড়া ও আমাগে সাথে শয়তানি করার সাহস পাবেনানে। ওর সব কুকীর্তির খবর জানি আমি।”

“ঠিক আছে। ফোন করে দেখ।”

“তার আগে শরিফারে আর এক হাজার টাকা পাঠায় দিই। এক হাজার টাকা দিলাম—তাতে ওর মন ভরল না। ওরে খুশি রাখা দরকার।”

২.
লৌজংয়ে পদ্মার আকাশ মেঘে ঢাকা। দিশুদের আটকে রাখা ঘরটা প্রায় অন্ধকার।

দিশুর ঘুম ভাঙল আগে। প্রায় অন্ধকারে ডুবে থাকা চোখে ঘুম জড়িয়ে থাকায় চেতনা বদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দিশুর হাত-পা নড়ে ওঠে কিন্তু বাঁধা থাকায় থেমে যায়। সে বুঝতে পারে না সে কে, এখন কোথায়, কী করছে। সে একটা এককোষী প্রাণী যেন। তবে প্রাণ সক্রিয় হয় ধীরে ধীরে। গা মোড়ামুড়ি করে একটু পরেই। অভ্যাসবশে আম্মু শব্দটা লাফিয়ে উঠল মনের গহিন থেকে। মুখ বাঁধা বলে শব্দটা শুধু গলায় ধাক্কা খায়। গো গো করে। শরীর দুর্বল থাকায় ক্ষীণ কণ্ঠ বটে।

কিছুক্ষণ পরে মেঘ কেটে যায়। দেয়ালে ফিতার মতো এক ফালি রোদ উঁকি দিলে দিশুর চেতনা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বুঝতে পারে না তার হাত-পা আর মুখও বাঁধা রয়েছে। তবু অদূরে রোদের ফালির দিকে চেয়ে থাকে সে। ‘দিশু বাবা!’ আম্মু ডাকছে! দিশুর আধাচেতন মনে মায়ের শুধু কণ্ঠটাই অস্পষ্টভাবে ধ্বনিত হয়। সে নড়াচড়া দিয়ে ওঠে কিন্তু প্রায় অন্ধকার ঘরে হাত-পা বাঁধা বলে চেতনা সক্রিয় হতে পারে না। তাছাড়া ওষুধের প্রতিক্রিয়া ত আছেই।

দিশুর পাশে শুভ লাশের মতো পড়ে আছে। এখনও প্রাণ আছে তার দেহে। কিন্তু ফুসফুস ঠিক মতো কাজ করতে পারছে না।


দুইজনই কেমন মড়ার মত পড়ে আছে। শরিফার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। 


৩.
একটা ঝোপালো বটতলায় শরিফা অটোরিকশা থেকে নামল। তার হাতে নাশতার প্যাকেট। পিচের রাস্তা থেকে ইটের রাস্তায় পা বাড়াতেই পাশের বাড়ির ভাবি আটকে দিল। অনেক দিন পর বাড়ি ফিরলে প্রতিবেশীরা কুশলাদি জানাজানি করতে চায়। ভাবি বলল, “কন্নে আসলি, ও শরিফা?”

শরিফার মন অস্থির ছিল। সে কেঁপে ওঠে। তবে তাড়াতাড়ি সামলে উঠে বলল, “রাত্তিরি আসলাম। ভালো আছেন, ভাবি?”

কুশলাদি জানাজানি করতে মিনিট চারেক ত লাগেই। এর মধ্যেই শরিফা আরও অস্থির হয়ে যায়। তবে ধৈর্য ধরার কথা মনে পড়ে তার। মিনিট দশেক ধরে ভাবির কথা শোনে আর নিজের কথা বলে। সে সুখে আছে বলেও হাসিমুখে জানায়।

ভাবি তাকে সন্ধ্যায় দাওয়াত দিয়ে কাজে ফিরলে শরিফা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু পার্স থেকে চাবি বের করেও সে তার ঘরের তালা খুলতে পারে না। মন সাড় দেয় না। সে পিছিয়ে ইটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমবাগান ঘেরা চাচার বাড়ির দিকে তাকাল। তারপর বাড়ির পেছনে পদ্মার তীরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শৈশবের নানা রকম স্বপ্ন আর ঢাকার ময়লাখানার মধ্যে দুই বছর ধরে ডুবে থাকার কথা মনে পড়ে তার। আর সব সময় চোখের সামনে ভেসে থাকে বাবার তৈরি এই ছোট্ট, গরিবি বাড়িটার ছবি।

এলাকায় চাকরি মেলে নি বলে গেছল ঢাকার শহরে। কিন্তু পোশাক কারখানায় চোদ্দ-পনের ঘণ্টা কাজ করতে গিয়ে সে হাঁফিয়ে ওঠে। সারাদিন যদি কাজই করতে হবে তাহলে এই জীবনের মানে কী। বরং সুপারভাইজার ফয়জুলের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাওয়া ভালো।

ফয়জুলের সঙ্গে মাস খানেক সুখেই কাটে তার। তারপর সে-জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নিত্য অভাব। নিত্য খিটিমিটি। মা হওয়ার স্বপ্ন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এই অভাবের মধ্যে সে বাচ্চা মানুষ করতে পারবে না। অন্যদের দেখেই হতাশায় মুষড়ে পড়ে।

মা হওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ল শুভ-দিশুর কথা। হাতের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর হুহু করে। কিন্তু নাশতা না খেয়ে বালকরা যদি চিল্লিয়ে ওঠে!

তাহলে শরিফা এখন কী করবে? টাকা আদায়ের জন্য সে তাদের কতক্ষণ না খাইয়ে রাখবে?

শরিফা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বালকদের ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবে সে। কিন্তু তখন হারুন-মাসুদ তাকে ছাড়বে না। তবে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের দমানো যাবে তা শরিফা নিশ্চিত। যদিও সে নিজে রক্ষা পাবে কিনা তা নিশ্চিত না। হয়তো বালকরা তার বাড়ি-বাসা খুঁজে বের করতে পারবে। তারা হয়তো ছবি আঁকতে পারে।

এসব বিষয় আগে এতটা মনে হয় নি। তবে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলে পুলিশ হয়তো শরিফাকে ধরবে না। শাস্তি হলেও নিশ্চয় বেশি হবে না।

শরিফা ভেবে ভেবে আকুল। তার বুকের ভেতর কষ্ট জমছে। সে আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ঢাকায় আর না ফেরার কথা ভেবে দেখল। বাড়িটা আর বাড়ির পেছনে পদ্মার দিকে তাকাল এক পলক। এলাকাটা তার কতই না আপন! আর এত সুন্দর! আগে কখনও চোখে পড়ে নি যেন। গরিব কুটির হলেও নিরিবিলি। প্রশান্তির ছায়া আছে সবুজ মায়ায়। এসব গাছপালার মালিক সে না হলেও ছায়া ত সে-ই পায়। কিন্তু এখানে চাকরি নেই। তবে হোটেলে ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না ত করা যায়, শরিফা নতুন করে ভেবে দেখছে। তারপর হাজার দশেক টাকা জমলে মাওয়া ঘাটে পান-বিড়ির দোকান।

দোকান দিলে সে অন্যদের চেয়ে বেশি বেচতে পারবে বলে তার মনে হচ্ছে। অনেক বিক্রি মানে অনেক লাভ। অনেক বিক্রির উপায় নিয়ে ভাবতে ভাবতে শরিফার মনটা ফুরফুর করে উঠল। তারপর ভাবল ঘরের দরজা খুলে রেখে বালকদের মুখ খুলবে। তারা কানতে গেলে বলবে, দরজা ত খোলাই আছে। যাও, চলে যাও।

নাশতা খাওয়ানোর পর আবার একবার ভেবে দেখবে মুক্তিপণ নেবে কিনা, ভাবল সে।

ঘরের দরজা খুলতেই গুমোট গন্ধে শরিফার নাক-মুখ কুঁচকে যায়। রাতে আতঙ্কে থাকায় গন্ধটা টের পায় নি। কিন্তু বালকদের কোনো সাড়া নেই কেন? তারা কি এখনও জাগে নি? ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে দরজা বন্ধ করল। তারপর পা টিপে টিপে পাশের ঘরে গিয়ে লাইট জ্বালায়। ধুলো আর মাকড়সার জালে একাকার হয়ে আছে সারা ঘর। ছোট্ট সোনাপাখিদের এই ঘরের খাটের নিচে শুইয়ে রাখায় শরিফার খারাপ লাগে। বুকের ভেতর টিপটিপ করতে করতে খাটের নিচে উঁকি দিল সে।

বালকদের যেভাবে রেখেছিল সেভাবেই আছে। দুইজনই কেমন মড়ার মত পড়ে আছে। শরিফার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। আরো ভাবার আগে তাদের জাগানোর চেষ্টা করে সে। গায় হাত দিয়ে নাড়া দেয়। আগে দিশু। তারপর শুভ। কেউ নড়ছে না কেন? সে তাদের একে একে ডানা ধরে টেনে আনে খাটের নিচে থেকে। আগে তাদের পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে। পরে হাত। তারপর দিশুর মুখ খুলে নাড়া দিল। দিশু মাথা তুলে চোখ খোলার চেষ্টা করলে শরিফা প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু শুভ মোটেও নড়ে না কেন?

“ওঠো! বাবা!”

বাবা শব্দটা শরিফার অন্তরের অন্তস্তল থেকে উঠে আসে। তার মন কেঁদে ওঠে। তারপর চোখ থেকে টপটপ করে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

তিন-চারবার নাড়া দিলেও শুভ সাড়া দিল না। চোখও খুলল না। শরিফা তাকে বসিয়েও রাখতে পারছে না। কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। দিশু চোখ না খুললেও বসে আছে। তবে কিছুক্ষণ পরে সেও ঢলে পড়ে। শরিফা তাকে তাড়াতাড়ি ধরে সামলায়।

শরিফার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হচ্ছে। দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে। খানিক চিন্তার পর বালকদের চোখেমুখে পানির ছিটা দিল সে।

দিশু এতক্ষণে চোখ খোলে। তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে ‘আআমমুউউ’ বলতে বলতে আবার বন্ধ করে। শরিফা তাকে ধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করল। কোনো কাজ হলো না। সে মণ্ডের দণ্ডের মতো নেতিয়ে পড়ে। আর শুভ ত মোটে সাড়াই দিচ্ছে না। ‘যদি এমন হয় যে একজন মারা গেছে আর অন্যজনও যাচ্ছে!’ ভাবতেই শরিফার মাথা আউলানোর জোগাড়। সে তড়িঘড়ি আবার তাদের চোখে পানির ছিটা দিল। কিছুতেই কাজ না হলে নাড়ি বোঝার চেষ্টা। মিনিট চারেক চেষ্টা করেও নিশ্চিত হতে না পেরে শরিফা ছুটে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। আশপাশে টালুমালু চেয়ে দেখল লোকজন আছে কিনা।

নেই!

গলিটার দুপাশে গোটা পাঁচেক বাড়ি থাকলেও পাঁচিল দেওয়া। এখানে তাই সচরাচর কাউকে দেখা যায় না।


শরিফার মনে হয় হাসপাতালের সবাই তার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে রয়েছে।


একটু এগিয়ে পাকা রাস্তায় যেতেই সে একটা অটোরিকশা পেয়ে যায়। এখন সব পাকা রাস্তায় প্রতি মিনিটে গাড়ি মেলে। ‘আমাগে এটটু তাতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলেন ভাই’ বললে অটোচালক ভাড়ার কথা না বলেই রাজি হয়।

“হায় খুদা!” ঘরের সামনে গিয়ে চালক হাহাকার করে উঠল, “কী হইছে এগে?” প্রশ্ন করলেও উত্তরের আশা না করে সে প্রথমে দিশুকে, পরে শুভকে পাজাকোলে তুলে অটোয় নিয়ে বসায়। হাত-পায়ের দাগ তার চোখ এড়ায় না বটে, কোনো কথা না বলে আগে রওনা হয়। চলতে চলতে শুকনো মুখে পেছন ফিরে চায় একবার। “কী হইছে এগে? কিছু খাইছে নাকি?”

“এটটু তাড়াতাড়ি চালান, ভাই,” শরিফার আতঙ্কিত কণ্ঠ। ভয়ে তার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দিশু কি ঢলে পড়ছে? শুভর হাত-পা কি শক্ত হয়ে যাচ্ছে? শরিফা কিছু বুঝতে পারছে না।

“কারেন্টে শট করিছে নাকি?” জানতে চায় অটোচালক।

“হরে, ভাই,” শরিফা এতক্ষণে কথা বলার একটা উপায় খুঁজে পেল। “নাকি সাপে কামড়াইছে তা ত কিছু জানিনেরে ভাই। আমি গিছিলাম এটটু নদীর ঘাটে। ফিরে আইসে দেহি যে—!” শরিফা কাঁপতে কাঁপতে আশপাশে চায়। পরিচিত কেউ আসছে না! অটোচালক এখনও সন্দেহ করে নি। কিন্তু পথে যদি পরিচিত কেউ সামনে পড়ে!

শরিফা দুই হাতে দুইজনকে জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করে রাখল। পরে তাতেও ভরসা না পেয়ে দিশুকে ঊরুর ওপর শুইয়ে দিয়ে ওড়না টেনে মাথা ঢাকে। আর ভাবে, কেউ যদি সামনে পড়েই এবং যদি জিজ্ঞেস করে বাচ্চারা কারা, তাহলে—! খানিক ভেবে সে সিদ্ধান্ত নিল, “ভাসুরের ছাওয়াল রে ভাই! বেড়াতি নিয়ে আইছিলাম!” কিন্তু কেউ যদি মরে যায়! দিশুও এখন আর নড়ছে না, আর শুভ—! শরিফার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে উঠল। মাথার মধ্যে চক্কর দিল।

মিনিট দশেক লাগে তাদের হাসপাতালে পৌঁছাতে।

শরিফার মনে হয় হাসপাতালের সবাই তার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে রয়েছে। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপে। শিশুরা কেউ মারা গেলে তাকে সারা জীবন পালিয়ে বেড়াতে হবে। হয়তো জেলে কাটাতে হবে। এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সে কানতে ভুলে যায়।


শেষ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)