হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ৬

সোনাপাখি : ৬

সোনাপাখি : ৬
146
0

৫ পর্বের লিংক


[পঞ্চম পর্বে যা ছিল : শুভ-দিশুকে অজ্ঞান করে স্কুটারে তুলে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মার তীরে নিয়ে গেছে হারুন-মাসুদ-শরিফা। দিশুর ভাই হাদি, মা শেলি মসজিদ মোড়ে থাকলেও টের পায় নি।]


পর্ব- ৬

১.
তেজগাঁও থানায় এসআই খায়েরের টেবিলে স্তূপ স্তূপ ফাইল। মসজিদ মোড়ের চারটি গলির বাড়িগুলোর সব ভাড়াটিয়ার সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা।

খায়ের একেকটা ফাইল খুলছে আর ভাড়াটিয়াদের পেশা ও পরিবারের সদস্য সংখ্যায় চোখ বুলাচ্ছে। যেখানে শিশু নেই তাদের পেশা-পরিচয় বিবেচনা করছে। কারো কারো নাম-ঠিকানা আর ফোন নাম্বার টুকে নিচ্ছে। অনেক বাড়িঅলাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে কোনো ভাড়াটিয়াকে সন্দেহ হয় নাকি। সন্দেহ হলে সেগুলোর নোট নিয়েছে। রাত দেড়টার পর থেকে বাড়িঅলারা কদাচিৎ রিসিভ করছে বলে ফোন করা বাদ দিল। তারপর যখন শরিফাদের বায়োডাটায় চোখ বুলাবে তখনই দিশুর বাবার ফোন।

দিশুর বাবা এই নিয়ে অন্তত চারবার ফোন করল। খায়ের বিরক্ত। তবে সে জানে উদ্বিগ্ন বাবা-মা এটা করতেই পারে। “ভাই, আপনাদের কাজটাই করতেছি। সন্ধ্যায় যখন বাসায় যাব তখনই আপনাদের কাজটা ধরলাম।” একথা সে এর আগেও দুইবার বলেছে। খানিক চিন্তা করে বলল, “ওই মহল্লার সবার বায়োডাটা ঘাঁটতেছি। সন্দেহজনক লোকজনকে চিহ্নিত করতেছি। তাছাড়া সব জায়গায় নিখোঁজের খবর পাঠাইছি তা ত আপনাকে বললাম।”

“জি, ভাই,” দোকানের সিঁড়িতে বসে দিশুর বাবা বলল। তার পাশে শেলি দোকানের শাটারে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে আর থেকে থেকে আহাজারি, “ওরে আমার বাবারে। আমার বাবারে নিয়ে ওরা কী করতিছে, আললা গো!”

পুলিশের টহল গাড়ি এসে থামল তাদের সামনে। “কী হইছে?” জিজ্ঞেস করল এক এসআই।

“আমার বাবারে খুঁজে দাও, বাবা গো, ভাই গো! আমার বাবা কই। আমার বাবারে নিয়ে ওরা—!”

“কী নাম? শুভ আর দিশু?”

“হাঁ!”


নাফিসার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, ‘আমার ভাইকে ফেরত চাই।’


“সব পুলিশ আপনার ছেলেদের খুঁজতিছে! কী করব কন, দেশের আনাচে-কানাচে সব জাগায় শয়তান জন্মাচ্ছে। এত এত ক্রসফায়ার দিচ্ছি। জেল-জরিমানা হচ্ছে। তবু শয়তানের বাচ্চারা থামতিছে না।”

থামবে না। এটা থামবার নয়।

অন্তত ছয় হাজার বছর আগে মানুষ ‘অপরাধীর’ জন্য শাস্তির মাত্রা ঠিক করেছে। অপরাধ থামে নি।

শাস্তি নয়, অপরাধ বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু তা করতে গেলে যা খাজনা আদায় হয় তার সব ব্যয় হয়ে যাবে! শাস্তি দিতে বেশি ব্যয় হয় না। ব্যাপক উদ্বৃত্ত থাকে। সহজে পকেট ভারি করা যায়।

২.
সকাল হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে লোক চলাচল শুরু হচ্ছে। হাদি তার মামার সাথে নাখালপাড়া ক্ষুদ্র শিল্প এলাকার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাত রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। যাকে সামনে পায় তাকেই জিজ্ঞেস করে, নয়-দশ বছরের দুইটা শিশুকে দেখেছেন, ভাই?

কেউ হা বলে না।

মামা প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে যাচ্ছিল। হাদির মুখের দিকে তাকিয়ে থামল। হাদির চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে। এমনিতেই সে একটু রোগাটে। তার ওপর রাতে খায় নি। আর সারারাত পথে পথে ধুলোর মধ্যে। মামা আশপাশে তাকাল। মোড়ে ট্রাক স্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার পাশে একটা টং দোকান দেখা যাচ্ছে। ট্রাক শ্রমিকরা চা-বিড়ি খাচ্ছে। মামা এক প্যাকেট বিস্কুট আর একটা জুস নিল।

কিন্তু হাদি মাথা নেড়ে না করে। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে শুরু করল। দিশুকে রেখে সে খাবে কী করে।

মামা তার হাত ধরে বলল, “শরীর ঠিক না থাকলে দিশুকে খুঁজবি কিভাবে? নে। এটা খেয়ে ফেল।” মামা জুসের নলটা হাদির ঠোঁটে মিশিয়ে ধরলে তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে কান্না বের হয়ে আসে। জুস আর খেতে পারে না। মামা তাড়াতাড়ি একটা রিকশা ডেকে উঠে বসল। “শরীর ঠিক রেখে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। না হলে আমরা দিশুকে খুঁজে পাব না।”

হাদি এমন কাহিল যে সে ঠিক মতো সিঁড়ি টপকে বাসায় উঠতে পারছিল না। মামা তার হাত ধরে উঠায়। বাসার দরজা খুলল ছোট খালা। সে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে এখন ঝিমাচ্ছে।

মামা হাদিকে তার ঘরে নিয়ে যায়। একটু জোর দিয়ে বলে, “আমি ত ভালর জন্যই বলছি, তাই না?” কথা না বাড়িয়ে জুসটা সে তাকে গিলিয়ে দিল। “এবার ঘুমিয়ে পড়,” সে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর পা বাড়িয়ে বলে, “আমি দিশুকে খুঁজতে যাচ্ছি। আর তুই একটু ঘুম দে। তারপর খেয়ে চাঙ্গা হয়ে আবার বের হতে পারবি।”

মামা বের হবার আগে খালা বলল, “আপা-দুলাভাইকে এনে একটু খাওয়ায় দিবা নাকি?”

“আমি দেখছি কী করা যায়। তুই সময় মতো খেয়ে নিস। সবাই অসুস্থ হওয়া কোনো কাজের কাজ না।”

“তুমি কিছু খেয়ে যাবা নাকি?”

“পরে। দেখ ত খাবার-দাবার সব আছে নাকি?”

“আছে।”

মামা চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে দিশুর চাচা-ফুপা আর ছোট ফুপু আসে।

হাদি বালিশে মুখ লুকিয়ে দিশুর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। দিশু তাকে ঘুমের মধ্যে জড়িয়ে ধরছে। হাদি ঘুমিয়ে থাকলেও টের পায়। তার অস্বস্তি শুরু হয়। তার ওপর দিশু তার বুকের মধ্যে মাথা দিয়ে জড়িয়ে ধরে। সুড়সুড়ি লেগে হাদির ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে। আর সঙ্গে সঙ্গে তার রুমের সব দেয়াল তার কাছে এগিয়ে আসতে শুরু করল। হাদি অবাক। এটা কী হচ্ছে? সে মাথা ঝাঁকি দিল। দেয়ালগুলো আবার পিছিয়ে যাচ্ছে।

আসলে ঘরটার সব দেয়ালে সাঁটা দিশুর আঁকা ছবিগুলো হাদিকে আলোড়িত করছে। সে খাট থেকে নেমে দেয়ালগুলোর দিকে তাকাল। দেয়ালের প্রায় প্রতিটা ইঞ্চিতে দিশুর আঁকা ছবি। আর্ট পেপার, খাতার কভার, ক্যালেন্ডার, এমনকি মোড়কের কাগজেও আঁকে দিশু। আসবাব না থাকলে ঘরটাকে আর্ট গ্যালারি বলা যেত।

হাদি তার ঢাকা স্যুট পরে তৈরি হলো। ঘর থেকে বের হবার আগে ফেসবুকে চোখ এক পলক। কেউ কোনো সাড়া দিল কিনা।

কেউ সাড়া দেয় নি। বরং শিহাব একটা স্ট্যাটাস দিয়েছে। সে সবাইকে আর্ট পেপার আর মোটা মার্কার নিয়ে আটটার মধ্যে কলেজের সামনে যেতে বলেছে। স্ট্যাটাসটা তার বন্ধুদের শেয়ার করতে বলেছে।

হাদি হাঁটা দিলে খালা তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করে।

হাদি বলল, “একদিন না ঘুমালে কিছু হবে না।” সে পা বাড়ায়। তারপর ঘর থেকে বের হবার সময় একদল বন্ধুর মুখোমুখি। বন্ধুদের মধ্যে নাফিসাকে দেখে হাদির বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। নাফিসার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, ‘আমার ভাইকে ফেরত চাই।’

কিন্তু সবাই হাদির দিকে অমন করে চেয়ে কেন।

“ও, হা,” হাদি তার ঢাকা স্যুটের মুখ খুলে বলল, সে এখন থেকে এটাই পরবে। তার কণ্ঠ শুনে বোঝা যায় সে খুব সিরিয়াস। তাছাড়া সবাই এখন দিশুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা অন্য বিষয়ে কথা বাড়াতে চায় না। তারা বরং ঢাকা স্যুট পরা হাদির সেলফি ও স্ট্যাটাসটার কথা স্মরণ করে, যা কাল সন্ধ্যায় তারা ফেসবুকে দেখেছে। সে সময় কমেন্টে খানিক ঠাট্টা-তামাশাও করে নিয়েছে। তবে এখন তারা সবাই অন্য রকম ভাবার চেষ্টা করছে।


শিহাব বলল, “শাহবাগ হলো আন্দোলন-সংগ্রামের জায়গা। ওখানে আমরা হয়তো আরো অনেককে পাব।”


বাড়ি থেকে বের হতেই খানিকটা ধুলো-বালি তাদের মাথার ওপর পড়ল। নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ছয়তালা থেকে। তারা আরো গম্ভীর হয়। তবে বন্ধু শিহাব ওপরের দিকে তাকিয়ে মুখ খিঁচিয়ে উঠল, “এই শুয়োরের বাচ্চারা!”

“মানিয়ে নেওয়া মানে হলো আবর্জনার মধ্যে আরো বেশি করে তলিয়ে যাওয়া,” বইয়ে পড়া কথা হাদি প্রায়ই হাত উঁচু করে ভাষণের মতো বলে, “ভাল কিছু দেখতে পাওয়া আর তার জন্য কাজ করে যাওয়াই মানুষিতা।“

বেশির ভাগ বন্ধুবান্ধব তার কথায় হাসাহাসি করে। তবে রাগী শিহাব, সিরিয়াস নাফিসা, ফানি আরিফসহ একদল বন্ধু যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রায়ই : “এটা অদ্ভুত যে সংকীর্ণ গলির দুইপাশে সবাই বহুতল ভবন বানায়। হাঁটার জায়গা পর্যন্ত থাকে না।” “গাড়ি কেনে কিন্তু গাড়ি চালানোর জায়গা রাখে না।” “এমনকি ভবনগুলোর মাঝখানে আলো-বাতাস চলার মতো ফাঁক রাখে না!” “তাদের কানের মধ্যে ফুঁ দিয়ে দিয়ে বলতে হবে, তুমরা যেমন রুচিহীন তেমনি অজ্ঞ! তুমাদের মানুষ হওয়া উচিত!”

“এখন আমরা কি হাঁটব নাকি রিকশা নেব?” শিহাব ধমকে উঠল।

তিব্বত স্কুল অ্যান্ড কলেজ বেশি দূরে না। রাস্তায় যানজট দেখে তারা হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে রিকশার চাইতে আগে যাওয়া যাবে। তবে প্রায় সব গলিতে এত ভিড় যে তারা দ্রুত হাঁটতে পারে না। “আমাদের ছোট্ট দেশ। মানুষ বেশি।” আহা, কী আহ্লাদি কথা। “মাদারচোতরা তবু ইঁদুর-বিড়ালের মতো জন্ম দিয়ে যাচ্ছে,” শিহাব হঠাৎ একটা অটোরিকশার পাছায় খড়াং করে লাথি মারলে বন্ধুরা হো হো করে উঠল। অটোচালক রেগে দরজা খুললেও কিশোরদের বেপরোয়া মুড দেখে আবার বন্ধ করে দেয়। তারপর জ্যাম ছাড়ানোর অপেক্ষায় থাকে।

৩.
কলেজে গিয়ে কিশোর বন্ধুরা হতাশ হলো। অধ্যক্ষ সবাইকে হুমকি দিচ্ছে, ক্লাসে না গেলে টিসি দিয়ে দেবে। কথায় কথায় টিসি দেওয়ার হুমকি ভালো প্র্যাকটিস না, হাদি মুখ খুলতে গিয়ে চুপ থাকল।

অধ্যক্ষ বলছিল, “পুলিশ আছে। র‌্যাব আছে। অভিভাবকরা আছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলা বাধাতে হবে না।”

হাদি বলল, “মাত্র একজন এসআই কাজ করছে। একজন পুলিশ কিভাবে তাদের খুঁজে বের করবে, সার?”

হাদির দিকে চোখ পড়তেই অধ্যক্ষ হেসে ফেলল। “তুমি কে গো?” এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, “তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ হে?”

হাদি তার ঢাকা স্যুটের মুখ খুলল। কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা, “সার, আমি এখন থেকে এটা পরেই কলেজে আসতে চাই। যদি আপনি আমাকে টিসি না দেন।”

অধ্যক্ষ মুখ ভার করে নির্বাক হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আমি তুমার স্বাস্থ্যকর নগর বিষয়ক সব স্ট্যাটাস পড়েছি।”

শিহাব বলল, “সার, সময়-অসময় একেকজন মানুষ গুম হয়। নিখোঁজ হয়ে যায়। অপহৃত হয়। আর দিশু হলো আমাদের ছোট ভাই।” সে তার কথা শেষ করতে পারে না। তারও ছোট বোন, চাচাত-মামাত আছে। তাদের কথা মনে করে সে ক্ষুব্ধ হয়। সবাইকে সারাক্ষণ নজরে রাখার কড়াকড়ি সে কিছুতেই বরদাশত করতে পারে না।

অধ্যক্ষ এখনও গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুটা বিব্রতও বটে। অনেক লোক একসঙ্গে দাঁড়ালে জনমত-চাপ তৈরি হবে। প্রশাসন বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বাধ্য হবে তা সে জানে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা রাস্তায় গেলে মন্ত্রী-এমপিরা তাকে একটা ধাতানি ত দেবেই, উপরন্তু কে কোথা থেকে সুযোগ বুঝে চাকরিটা ধরে টানাটানি শুরু করবে তার ত ঠিক নেই।

“সার, আমার ভাই অপহরণ হয়েছে। আমি চুপচাপ ক্লাস করতে পারি না।”

অধ্যক্ষ চোখের ইশারায় অনুমতি দিয়ে মাথা নিচু করে পা বাড়াল। কিন্তু সব শিক্ষার্থীকে তারা দলে পেল না। শুধু তাদের শাখার ত্রিশ জনের মধ্যে উপস্থিত সাতাশ জন।

কলেজের সামনে ফুটপাতে সার দিয়ে দাঁড়ায় তারা। নাফিসা একেকটা আর্ট পেপারে মোটা মার্কার দিয়ে ‘আমার ভাইকে ফেরত চাই’ লিখে লিখে বিতরণ করছে।

মিনিট বিশেক যেতেই ‘ধুলো-ধোঁয়ায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না’ বলে বলে সাত-আটজন চলে গেল। একটু পরে রোদ তেতে উঠলে যায় আরো তিনজন।

নাফিসা বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। আমাদের শাহবাগ যাওয়া উচিত।”

“ঠিক,” শিহাব বলল, “শাহবাগ হলো আন্দোলন-সংগ্রামের জায়গা। ওখানে আমরা হয়তো আরো অনেককে পাব।”

“কিন্তু শাহবাগ ত অনেক দূর!” অনেকেই উশখুশ করতে লাগল। তবে শিহাব আর নাফিসা তাদের প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়। হাদি আরো ভালো পারত। কিন্তু তার এখন মন খারাপ। নাফিসা বলল, “এক জায়গায় দাঁড়িয়ে না থেকে মিছিল করতে করতে গেলে সেটা আরো বেশি কাজের কাজ হবে।”

কিঞ্চিৎ বাহাসের পর তারা রওনা হয়। তখন আরো কজন ফিরে গেলে আর থাকে বার জন।

“আর তোর স্পেস স্যুট আপাতত খুলে ফেলা উচিত,” আরিফ বলল। সে খেয়াল করেছে যে লোকেরা তাদের ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ডের দিকে না তাকিয়ে সবাই হাদির ঢাকা স্যুটের দিকে তাকাচ্ছে।”

কথা ঠিক। হাদি তাড়াতাড়ি ঢাকা স্যুট খুলে ফেলল। তারপর তারা ফুটপাত দিয়ে স্লোগান শুরু করে। রোদ, ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে স্লোগান, ‘আমার ভাইকে ফেরত চাই’ ‘ডার্টি সিটি ধ্বংস কর,’ ‘ইঁদুর-বিড়াল মানুষ হও!’

শাহবাগ পৌঁছাতে পৌঁছাতে তীব্র গরমে চার বন্ধু প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাদের বটতলায় একটা ফুলের দোকানের সামনে নিয়ে বসাতে বসাতে শিহাব বলল, “তোদের মনোবল নেই। মন শক্ত কর।”

“এবার আমরা কী করব?” নাফিসার প্রশ্ন।

হাদি আশপাশে তাকাল। সব জায়গা মানুষের কোলাহলে ভরপুর। গরম ধুলোর সাগরে ডুবে থাকা চারদিকের চারটি রাস্তায়ই জ্যাম। গাড়িগুলো দুই মিনিট চলছে ত চার মিনিট থেমে থাকছে।

“আমরা ওই সড়ক-দ্বীপটায় গিয়ে দাঁড়াতে পারি,” হাদি পা বাড়াল।


তারা জানে তারা আহাম্মক। তারা রাম সাম যদু মধু। এই আন্দোলনকারীরাই একদিন তাদের প্রভু হবে। এখন থেকেই তাদের পথ ছেড়ে দেওয়া ভালো।


জাতীয় জাদুঘরের সামনে সড়ক-দ্বীপের ওপর গোল হয়ে দাঁড়ায় তারা। তারপর প্ল্যাকার্ড উঁচু করে স্লোগান। কিন্তু মানুষজন সবাই যেন ছুটোছুটি করছে। কিশোর বন্ধুদের দিকে কেউ তাকাচ্ছেও না। শুধু কয়েক দল পুলিশ একটু চোখ বুলায়। স্কুল ড্রেস পরা আটজনের দলটা পুলিশের কাছে এতটাই তুচ্ছ যে তারা বটতলার ছায়া থেকে ওঠে না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শ-খানেক কোটা আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে এসে পড়লে সব পুলিশ শোরগোল করে উঠল। সাংবাদিকরাও ছুটে গেল। এটা এখন হট কেক। মার্কেটে দারুণ বিকোচ্ছে। ছুটোছুটি করা আমজনতাও রাস্তা ছেড়ে ফুটপাত ধরছে। তারা জানে তারা আহাম্মক। তারা রাম সাম যদু মধু। এই আন্দোলনকারীরাই একদিন তাদের প্রভু হবে। এখন থেকেই তাদের পথ ছেড়ে দেওয়া ভালো।

“ওদের আমরা আমাদের বিপদের কথা বলতে পারি,” নাফিসা।

হাদি প্ল্যাকার্ড উঁচু করে চিল্লিয়ে উঠল, “আমার ভাইকে ফেরত চাই!”

সবাই প্ল্যাকার্ড উঁচু করে চিল্লিয়ে স্লোগান দেয়।

কয়েকজন কোটা আন্দোলনকারী তাদের দিকে তাকাল বটে, তারা ধুলোর সাগরে এসি গাড়িতে ডুবোজাহাজের মতো চলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। এখন পথের কাঁটা সরাতে আন্দোলন করছে। অন্য কিছু তাদের চোখে মাখে না। কানে ঢোকে না। হৃদয় ত দূরে। তাদের সামনে কিশোর বন্ধুরা অসহায় বোধ করে। তবু তারা স্লোগান দিতে থাকে যা কোটা আন্দোলনকারীদের স্লোগানের নিচে চাপা পড়ে গুমরে মরে।

একদিকে হতাশা আরেকদিকে ধুলো-ধোঁয়া আর তীব্র খরাদাহে কিশোররা অসুস্থ হয়ে পড়ল। আট বন্ধুর মধ্যে আরো তিনজন বসে পড়তে বাধ্য হয়।

“তুরা ফিরে যা,” হাদির ভগ্ন কণ্ঠ।

কিন্তু বন্ধুদের বিবেচনা আছে। তারা তাকে একা রেখে চলে যেতে পারে না। তারা বরং বটতলায় গিয়ে ঠান্ডা হতে হতে মনের জোর বাড়ানোর ধ্যান করে। আর চিন্তা করে দেখে তারা এখন কী করতে পারে। তারা জানে, বই-পুস্তক পড়তে পড়তে চিন্তা করতে হয়। সেই সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো ফল মেলে। “আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে,” আরিফ হাদির দিকে তাকাল, “তুই এখন বটতলায় বসে একটু রেস্ট কর। তারপর আবার চিন্তা করতে হবে।”


৭ পর্ব আগামী সোমবার

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)