হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ৫

সোনাপাখি : ৫

সোনাপাখি : ৫
250
0

৪ পর্বের লিংক


[চতুর্থ পর্বে যা ছিল : দিশুকে না নিয়ে মা শেলি, ভাই হাদি রাতে ঘরে ফিরতে পারে নি। তার আগে, অপহরণকারী হারুন-মাসুদ-শরিফা দ্বন্দ্বে ভুগছিল। শরিফার বাসায় আটকা রয়েছে শুভ-দিশু]


পর্ব- ৫

১.
তীব্র গরম। আকাশে মেঘ গুড়গুড় করছে। সবাই বৃষ্টি আশা করছে।

মাসুদ মিসড কল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরিফা দরজা খুলল। মাসুদের হাতের দিকে তাকাল সে। না, মাসুদ তার জন্য কোনো খাবার নিয়ে আসে নি। বরং তার রুদ্রমূর্তি দেখে শরিফা ভয় পেয়ে যায়।

কিছুক্ষণ আগে মোবাইল ফোনে তাদের আলাপ হয়েছে।

“পিচ্চিদের সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিয়ে এখান থেকে ভাগতে হবে,” মাসুদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, “নয়তো নির্ঘাত ধরা পড়ব।”

“তারপর?” শরিফার প্রশ্ন।

মাসুদ বলল, “তারপর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে পদ্মার চরে দেখা করতে বলব।”

শরিফা রাজি হয় নি। শিশুদের মেরে ফেলবে আবার টাকাও নেবে—সে কি এতটা শয়তান নাকি।

মাসুদ কোনো কথা না বলে সরাসরি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় যখন শুভ-দিশু হাত-পায়ের বাঁধন খোলার পর কানে কানে পরামর্শ করছে। এই মুহূর্তে তাদের চিৎকার দেওয়ার চিন্তাটাই বেটার মনে হচ্ছে, কিন্তু বাইরে থেকে যদি কেউ শুনতে না পায়? আর খেপে গিয়ে মহিলাটা যদি তাদের গলা কেটে ফেলে? তারা সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খায়।

মাসুদ রান্নাঘরে ঢোকার আগে শরিফা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “এই যে, মিস্টার হিরো!” কোমরে হাত রেখে কনুই উঁচু করে হাসি দিল সে। তারপর বলল, “যেটা ভালো সেটাই ত আমরা করব, তাই না?”

মাসুদ চোখ বুজল। রাগ দমন করা উচিত এটা তার মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

শরিফা বলল, “হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কে কিরমিনাল পুলিশ তা কিভাবে বোঝে?”

মাসুদ চুপ।

শরিফা বলল, “লাশ পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশ এই বাড়ির সব বাসার সবাইকে জেরা করবে। কোনো খুনের আসামি পার পায় না। মুক্তিপণ নিয়ে বাচ্চাদের ফেরত দিলে পুলিশ আর এ নিয়ে মাথা ঘামাবে না। খুন করলে পুলিশ ঘাঁটাঘাঁটি করতেই থাকবে।”


দুই হাতে ধরে দুই মুখ। আর তাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে, “নড়াচড়া করলে খুন করে ফেলাব কিন্তু!”


মাসুদ চুপচাপ শরিফার বুকের দিকে তাকাল। ওড়না ছাড়া সে তাকে কখনও দাঁড়ানো দেখে নি। আর এখনকার ভঙ্গিটা যেন মোহনীয়। টিভির বিজ্ঞাপনের মতো। শরিফার লেকচার শুনতে শুনতে মাসুদ একটা হাত উঁচু করল।

শরিফা বলছে, তারা যদি দেখে যে বাচ্চাদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া রিস্কি হচ্ছে তখন যা করতে হয় করবে।

মাসুদ শরিফার দিকে তাকাতে তাকাতে আন্দোলিত হয়। সেপটিক ট্যাংকের চিন্তা গুলিয়ে ওঠে। শরিফার বুদ্ধিই তার ভালো মনে হয়। সে মুচকি হেসে হাত বাড়াল। সুঠাম দেহ শরিফাকে হাড় ঠনঠনে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু শরিফা জানে, “এসব পরেও করা যাবে। যখন যা কাজ তখন তাই করা উচিত।” মাসুদের কানে কানে বলল সে, “আমরা এখন বড় একটা বিপদজনক কাজ করতিছি,” যখন শুভ-দিশু কানে কানে কথা বলে ঠিক করেছে তারা চিৎকার দেবে যখন তাদের পাশের গলিটা দিয়ে তাদের বাবা-মায়েরা মসজিদ মোড়ের দিকে যাচ্ছে।

শুভ-দিশুর হার্টবিট বেড়ে যায়। চিৎকার দেবো দেবো করে কিন্তু দেয় না। তবে দিশু চুলার নিচে থেকে বের হয়ে আসে। শুভর হাত ধরে তাকেও বের হতে চাপাচাপি করে। শুভ নড়ে না। বরং দিশুকে টেনে বসাতে চাপাচাপি করে। সেই মুহূর্তে মাসুদকে এগিয়ে আসতে দেখে দিশু নিজের অজানতেই আঁআঁআঁ করে চিল্লিয়ে উঠল। মাসুদ সাথে সাথে তার মুখ চেপে ধরে আর শুভ বাকহীন হয়ে যায়। শরিফা দোড়োয় গিয়ে শুভর মুখও চেপে ধরল।

মাসুদের বুকের ভেতর ঢিবঢিব করছে। শরিফার সারা গা থরথর করে কাঁপছে। তারা দরজার দিকে কান সজাগ করে রাখে। “যদি কেউ শুনে থাকে?” কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর শরিফা ফিসফিস করে।

মাসুদ চুপ। কেউ এসে পড়লে কী করবে তা তার চেতনায় আসছে না।

“দ্রুত বান্ধা দরকার,” শরিফা বলল, “কেউ এলে দরজা ত খুলতেই হবে!”

কিন্তু কিভাবে বাঁধবে? দুইজন দুইজনকে ধরে রেখেছে যে!

“অজ্ঞান করে ফেলা ভালো!”

“কিভাবে?” তারা ত নড়তেই পারছে না। দুইজন দুইজনকে ধরে রেখেছে যে!

মিনিট খানিক পরে শরিফা বলল, “দুইজনকে দুই হাতে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে মুখ চেপে ধরো।”

মাসুদ মেঝেতে বসে দুই পা দিয়ে দুই বালকের চার পা জাপটে ধরে। তারপর দুই হাতে ধরে দুই মুখ। আর তাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে, “নড়াচড়া করলে খুন করে ফেলাব কিন্তু!”

শরিফা আবার তাদের বেঁধে ফেলল। মুখে টেপ এঁটে দিল।

মাসুদ তবু নিশ্চিন্ত হতে পারে না। সে শরিফার মুখের দিকে তাকাল, “এই পিচ্চিরা খুব চালাক। তুমি যা করছ তাতে সবাই ধরা পড়ে জেল খাটা ছাড়া পথ নেই!”

শরিফা চুপ। কিছুক্ষণ পরে বালকদের মুখের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতর হুহু করে ওঠে। সে টাকার জন্য একটা অন্যায় করছে। তাই বলে এই নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করতে পারে না। দুইজনেরই গাল বেয়ে অঝোরধারায় অশ্রু গড়ানো দেখে শরিফা বিচলিত হয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে থাকার পর বালকদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, “কান্দে না, বাবারা। কালই তুমরা বাসায় ফিরে যাতি পারবা।”

পিপাসায় বালকদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় নাশতা করে নি। রাতে খাওয়া হয় নি। সেসব শরিফার ভাবনায় আসছে না। সে নিজেও দুপুরে একটা কলা-পাউরুটি খাওয়ার পর আর কিছু মুখে দেয় নি। সন্ধ্যায় যখন দোকানে গিয়ে বাকিতে চাল আর দুটো ডিম আনার কথা ভাবছিল তখনই মাসুদ আচমকা মিশনে নেমে পড়ে। তার আগে সে মুঠোফোনে সম্ভাবনার কথা বলেছিল বটে। “যদি পিচ্চিরা ওই গলি দিয়ে ঢোকে আর ওই মুহূর্তে আশপাশে কেউ না থাকে, তাহলে…!” তারপর লোডশেডিং সুযোগটা আরো জুতসই করে দেয়। সেই থেকে শরিফার দুশ্চিন্তা-উৎকণ্ঠা শুধু বাড়ছেই। সে তার ওড়নার আঁচল টেনে বালকদের চোখের জল মুছে দিল।

শরিফার ন্যাকামিতে মাসুদ বিরক্ত হয়। পিচ্চিদের এখান থেকে হারুনের স্কুটারে করে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল তা আর সে এখন মোটেই মানতে পারছে না। তার কথায় কান না দিয়ে শরিফা মোবাইল ফোনের পর্দায় সময় দেখে। তারপর তাকের ওপর থেকে একটা প্লাস্টিকের বোতল এনে মাসুদের দিকে তাকাল। “একজন করে মুখ ফাঁক করে ধরো। শব্দ করতে পারে না যেন।”

মাসুদ প্রথমে দিশুর মুখ চেপে ধরে টেপ খোলে। তারপর শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা পলিব্যাগের মতো ফাঁক করে। দিশু গোঙানোর চেষ্টা করল কিন্তু শরিফা বোতল কাত করে আস্তে আস্তে ঢেলে দিল ঘুমের বড়ি গুলানো পানি। তারপর শুভকে।

তারা এমনিতেই কাহিল ছিল। তার ওপর ঘুমের বড়ি। তার ওপর চেতনানাশক এসপ্রে।

কিন্তু শরিফা বলল, “যা হয় হবে।” সে হারুনকে ফোন করল, “কই তুমি?”

“আমি ত হাতির ঝিল।”

“চইলে আসো।”

“মাসুদ কিছু বলে নি?”

“আগের প্লান মতো করতে হবে।”

“আরেকটা কাজ করা যায়।”

“কী?”

“ঘরে তালা দিয়ে চলে আস।”

“তারপর?”

“আগে টাকাটা আদায় করি। ততক্ষণ দুই-এক দিন পিচ্চিরা ওখানেই থাকুক। আর তুমার আর ওখানে যাওয়ার দরকার নেই।”

“আর আমার মালপত্তর?”

“কয় টাকার মালপত্তর আছে? বড়োজোর দশ হাজার টাকার?”

“বাড়িঅলার কাছে বায়োডাটা দেওয়া আছে। ধরা পড়ে যাব।”

“পিচ্চিদের ছেড়ে দিলে ওরা তুমার বাসা খুঁজে বের করবে।”

“অন্ধকারে ওরা বাসা চিনতে পারে নাই। তুমি শিগ্‌গির চলে আসো। যা করার আগের প্ল্যান মতো করব,” শরিফা যেন হুকুম দিল।

রাত সোয়া দুইটা। আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গুড়ুম গুড়ুম করে উঠছে।

হারুন তার স্কুটার নিয়ে নাবিস্কো হয়ে ঘুরে আসে। রেললাইনের পথে একটু এগিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। এখানে নেমে স্কুটারের নাকে দড়ি বেঁধে টেনে নেওয়ার প্ল্যান তার। তাহলে কেউ দেখলেও সন্দেহ করবে না বলে সে ভাবছে। যদিও আশপাশে লোকজন নেই। তবু হঠাৎ কেউ এসে ত পড়তে পারে। শহর বলে কথা।

স্কুটারটা শরিফার বাসার সামনে পৌঁছানোর দশ সেকেন্ড আগে হারুন তার প্যান্টের পকেট থেকে মুঠোফোন বের করল। মাসুদকে মিসড কল দিতে হবে।

মাসুদ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল। আশপাশে তাকাল একপলক। কেউ নেই।

হারুন গেটের সামনে গিয়ে স্কুটারে উঠতে উঠতে মাসুদের চোখের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই মাসুদ ফিরে যায়।


এখন তারা দিশুর মায়ের নাম্বারে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে রাখতে বলবে।


ঘরের দরজার আড়ালে শরিফা অচেতন দুই বালককে একসঙ্গে খাড়া করে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। মাসুদ তাদের দুই হাতে দুইটা কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে পা বাড়ায়। আশপাশে তাকায় টালুমালু। তার বুকের ভেতর ধড়ফড় ধড়ফড় করতে থাকে। গেটের সামনে যেতেই হারুন স্কুটারের ভেতর থেকে দিশুকে টেনে নিল। তারপর উল্টো পাশ দিয়ে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আর মাসুদ শুভকে নিয়ে ভেতরে ওঠে। দুই বালককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রাখে।

শরিফা খরগোশের মতো চুপিচুপি এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বের হয়। ঘরে তালা দেয় নিঃশব্দে। তারপর তার ছোট ব্যাগটা নিয়ে স্কুটারে উঠতেই হারুন আবার স্কুটারের নাকে বাঁধা দড়ি ধরে টান দিল। তার কৌশল দেখে শরিফা মনের সুখে গদগদ হয়ে হেসে ওঠে।

হারুন নিরিবিলি একটা বাঁশি ফুঁকানো নৈশ প্রহরীকে পাশ কাটিয়ে গেল। সে ভাবছে, অলিগলি পার হয়ে মহাসড়কে উঠে স্কুটার স্টার্ট দেবে। তবে তার মনে হচ্ছে, প্রথম দিনই তারা ধরা পড়ে যাবে। কোথাও না কোথাও চেকপোস্টে র‌্যাব-পুলিশ গাড়ির ভেতরে উঁকি দেবেই দেবে। উঁকি দেয় সাধারণত একজন। উঁকি দেওয়ার আগেই তার হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে ঝেড়ে টান মারলে সাধারণত ধাওয়া করে না। এর আগে ফেনসিডিল পাচারের সময় সে এভাবে অন্তত তিনবার রেহাই পেয়েছে। আর কোনো দিন কোনো টহল দল তাকে থামায় নাই।

২.
বিপরীত পাশের গলিতে হাদি তখনও তার মামার সঙ্গে দাঁড়িয়ে। পুব পাশের একটা গলি ঘুরে এসে মসজিদ মোড়ে দাঁড়াল তার মা-বাপ।

“আবার একটু পুলিশে ফোন দিই,” জালাল শেলির দিকে তাকাল। শেলির সামনে তার সম্মতি ছাড়া জালাল কোনো কাজ করে না। এতে কাজে ভুল হলে শেলি আর রাগ করতে পারে না। কিন্তু এখন শেলি তার কথায় কান দিল না। সে তার মোবাইল ফোনের বাটন চাপাচাপি করেই যাচ্ছে। একবার দিশুর নাম্বার ধরার চেষ্টা করছে আরেকবার ফেসবুকে ঢুকে দেখছে কেউ কোনো সাড়া দিল কিনা।

হাদিও ফেসবুকে ঢুকল কেউ সাড়া দিল কিনা দেখার জন্য।

না। কোনো সাড়া নেই। তবে তার হাজার খানেক বন্ধু হারানোর খবরটা শেয়ার করেছে। একদম ওপরের কমেন্টটা পড়ল দিশু, ‘গুম খুন অপহরণ ছিনতাই রেপ এসব তুমার নগর আন্দোলনের ইশতেহারে থাকা উচিত।’

কিন্তু এসব এখন ভালো লাগছে না। হাদি তার ফোনটা পকেটে রেখে শেলির দিকে তাকাল, “আম্মু!”

শেলি চুপ।

গরমের মধ্যে হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস এসে সবাইকে ধুলোয় ডুবিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে দোড়োয় এল শুভর মা-বাবা।

শুভর মা বলল, শুভর বাবা র‌্যাব কর্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ দিয়ে এসেছে।

“র‌্যাব কী বলল?” হাদির প্রশ্ন।

শুভর মা কিছু বলার আগেই আরো বাতাস আর ঝপঝপ করে বৃষ্টি শুরু হলে সবাই দোড় দিল। তারা একটা দোকানের কোনায় গিয়ে দাঁড়াল। তারপর তারা ছয়জন তিন দলে ভাগ হয়। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুই দল যায় মসজিদ মোড়ের দুই পাশে আর অন্য দলটা যায় একটা গলি পার হয়ে উত্তর পাশের লম্বা রাস্তাটায়।

৩.
বৃষ্টির মধ্যে মহাসড়কে ওঠার আগেই হারুন স্কুটারে উঠে স্টার্ট দিল। একটু সামনেই নাবিস্কোর মোড়। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে পোশাক পরা জনা চারেক পুলিশ। বাঁয়ে মোড় নিয়ে স্কুটারটা চলে যায় মহাখালী বাস টার্মিনালে। ইউ টার্ন নেওয়ার সময় সেখানে কোনো পুলিশ দেখা গেল না। বৃষ্টির মধ্যে নিশ্চয় সামনে কোথাও চেকপোস্ট থাকবে না। হারুনের মনটা ফুরফুর করে উঠছে। যদি ঘণ্টা খানেক ভালো মতো বৃষ্টি হয়!

বৃষ্টি বাড়ছে। রাস্তা ফাঁকা। তিব্বত মোড়ে একটা র‌্যাবের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হারুনের বুকের ভেতর ছাঁৎ করে উঠল। সে স্কুটারের গতি সামান্য কমিয়ে দিয়ে নিরিবিলি পার পায়। মহাখালী চৌরাস্তায় ফ্লাইওভারের নিচে ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল। পুলিশ উঁকিও দিল। কিন্তু শরিফার ওপর থেকে চোখ ফিরিয়ে সে চালকের দিকে হাত বাড়ায়। “কাগজ,” একটা শব্দই বলল সে।

কাগজ মানে গাড়ির লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইত্যাদি।

হারুন ১০০ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়ে কাচুমাচু হয়ে বলল, “মেয়াদ নেই, বস। অফিসে যাওয়ার সময় পাচ্ছিনে।’

পুলিশ খুশি মনে ফিরে গেল।

বৃষ্টি আরো বাড়ছে। ফ্লাইওভারের নিচে আসায় পুলিশটা তাকে ধরতে পেরেছে। ১০০ টাকা গচ্চা গেল। ফ্লাইওভারের ওপর হারুনের রাগ হয়। গুলিস্তানেও একটা ফ্লাইওভারের নিচে দিয়ে যেতে হবে। তবে ১০০ টাকা কোনো ব্যাপার না। তারপর আর ঝামেলা নেই।

বৃষ্টি কমে যাচ্ছে।

গুলিস্তানে কেউ তাদের ধরল না। একটানে বাবুবাজার সেতু দিয়ে বুড়িগঙ্গা পার হয় তারা। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক দিয়ে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর। তারপর কয়েক মিনিটে শ্রীনগর-পাইকশা সড়ক পেরিয়ে গেলে মাওয়া-মুন্সীগঞ্জ সড়ক। আর অল্প একটু পথ। শরিফা হাত বাড়িয়ে মাসুদের একটা বাহু চেপে ধরল। তারা সব বিপদ কাটিয়ে ঠিকঠিক পরিকল্পনা মতো এগিয়ে এসেছে। আর মাত্র দুই মিনিটেই তারা শরিফার পৈতৃক বাড়িতে পৌঁছে যাবে।

মেঘ থমথম আকাশ। শোঁ শোঁ করে বৃষ্টি আসছে। আশপাশে আর কোনো আওয়াজ নেই। নিশ্চয় এই দুই মিনিটের মধ্যে কেউ তাদের দিকে এগিয়ে আসবে না।

তারা কনকসার বাজার পার হয়ে গেলে হৈচৈ করে বৃষ্টি শুরু হলো। আর সামান্য একটু সামনে হাতের ডানে গ্রামীণ ইটের রাস্তা। পাশের বাসার আউটার লাইটে বেশ দেখা যাচ্ছে। কয়েক শ গজ গেলেই পদ্মার তীরে শরিফার পৈতৃক বাড়ি।

বাড়ি মানে আড়াই শতক জমির একপাশে ছোট্ট দুটি ঘর। সামনে একটু ফাঁকা জায়গা। পাছে পদ্মা।

বাড়িটা ইটের দেয়ালে বানানো বটে। ওপরে টিনের ছাবড়া। বছর পনের আগে শরিফার অটোচালক বাবা বানিয়েছিল। ট্রাকের ধাক্কায় পা হারিয়ে ফেলায় প্লাস্টার আর করতে পারে নি। তারপর ত মরেই গেল। দুই বছর আগে মরল মা-ও। শরিফার বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।

“এই বিষ্টির মধ্যে নামব কিভাবে?” মাসুদ বিরক্ত।

শরিফা ভিজতে ভিজতে দোড়োয় গিয়ে ঘরের দরজা খুলল। মাসুদ গাড়ি থেকে নেমে দিশুকে একটা ব্যাগের মতো ধরে টান দিল। শরিফার ভালো লাগে না। সে দোড়োয় গিয়ে ওড়না দিয়ে দিশুর মাথা ঢেকে কোলে তোলে। শুভকেও সে একইভাবে নামায়।

“আমি খিদেয় মরে গেলাম,” শরিফা মাসুদের দিকে তাকাল।

হারুন-মাসুদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কিন্তু এখন কোনো উপায় নেই। “সকাল পন্ত কষ্ট কর,” মাসুদ বলল।

হারুন-মাসুদ চলে যায় যার যার বাড়ি। এখন তারা দিশুর মায়ের নাম্বারে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে রাখতে বলবে। ‘তারপর বিকেলে আমি ফোন করার সাথে সাথে রওনা হবেন। মটরবাইকে করে আসবেন। বেশি দেরি যেন না হয়। আগেই বাইক রেডি করে রাখবেন।’


চার-পাঁচ লাখ? শরিফা বিশ্বাস করতে পারে না। তারপর সেখান থেকে হারুন-মাসুদ তাকে কত দেবে? 


শরিফার এখন আর ধরা পড়ার ভয় করছে না। সে ফুরফুরে মনে ঘরের জানালা খুলে পদ্মার দিকে তাকাল। অন্ধকারেও সে সবকিছু দিব্যি দেখতে পায়। সামনেই একটা বড়সড় বালুচর। এই চরের মাঝামাঝি তাদের ভাগ্য পরীক্ষা হবে। এখন আবার পিচ্চিদের হাত-পা বেঁধে মুখে টেপ মারা দরকার। কিন্তু বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকাতেই শরিফার বুকের ভেতর হুহু করে উঠল। ওরা অমন মড়ার মতো পড়ে আছে কেন? মরে গেল নাকি?

ঘুমের বড়ি বা স্প্রেতে মরার কথা না তা শরিফা বোঝে। ‘কিন্তু মাসুদ তাদের ঘুমের বড়ি দেছে না অন্য কিছু দেছে তার ঠিক কী। যে শয়তানের শয়তান সে! তাছাড়া আছে স্প্রের অ্যাকশান।’

শরিফার বুক ধড়ফড় বেড়ে যাচ্ছে। সে বালকদের নাকের কাছে আঙুল ধরে। বুকের ওপর কান রাখে। না, ঠিকঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবু পিছমোড়া করে হাত বাঁধে। দুই পা একসঙ্গে বাঁধে। আর মুখে টেপ মারতে গিয়ে দেখে সেটা আনা হয় নি। তাহলে এখন কী করা যায়, কী করা যায়—সে তার গামছা ছিঁড়ে মুখ বাঁধে। তারপর একেকজন করে নিয়ে যায় পাশের ঘরে। কিন্তু খাটের নিচে ঠেলে দিতে গিয়ে তার অস্থির লাগে। শিশুদের এভাবে কষ্ট দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? যদি মরে যায়!

তার দুশ্চিন্তা-হতাশা বাড়তে থাকে। ভাবছে, কত টাকা পাওয়া যাবে যে দুইটা বাচ্চাকে সে এতটা কষ্ট দিচ্ছে। দুই-এক দিনের মধ্যে তাদের পরিবার কত টাকা জোগাড় করতে পারবে? বড়োজোর তিন লাখ। চার-পাঁচ লাখ? শরিফা বিশ্বাস করতে পারে না। তারপর সেখান থেকে হারুন-মাসুদ তাকে কত দেবে? যা-ই আদায় হোক, হারুন-মাসুদ যদি বলে, এক লাখ পাওয়া গেছে! না, মাত্র ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে! তার তিন ভাগের এক ভাগ! আর মাসুদকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরুর যে স্বপ্ন শরিফা দেখছিল তাতেও এখন আর তার মন সায় দিচ্ছে না।

শরিফা আরো হতাশ হয়। উবু হয়ে খাটের নিচে উঁকি দিল। তার ভালো লাগছে না। বাচ্চাদের এভাবে কষ্ট দেওয়া যায় না! যদি মরে যায়! সে ভগ্ন মনে জানালা দিয়ে পদ্মার দিকে চেয়ে রইল। পদ্মা দেখা যাচ্ছে না। একে ত রাত, তায় মেঘে ঢাকা আকাশ। তবে বিরাট ফাঁকা আকাশ, অন্ধকার, বিশাল শূন্যতা অনুভব করে শরিফা।


৬ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)