হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ২

সোনাপাখি : ২

সোনাপাখি : ২
159
0

১ পর্বের লিংক


[প্রথম পর্বে যা ছিল : শুভ আর দিশু বিকালে বাসার নিচে খেলতে নেমেছিল। একটা লোক দিশুর ব্যাট ছিনিয়ে নিয়েছিল। সেই লোকটা পরে তাদের ফলো করছে ভেবে তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল।]


পর্ব- ২

১.
দিশুর মা শারমিন শেলি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে ফ্রিজ থেকে ছোট একটা কাচের বয়াম বের করল। ঘরে বানানো বেদানার জুস। রক্তশূন্যতার কারণে রিতিকে নিয়মিত খাওয়াতে বলেছে তার ডাক্তার।

চার বছরের রিতি এই মুহূর্তে ড্রইংরুমে সোফায় বসে টিভি দেখছে। ‘সারাক্ষণ টিভি দেখে আর কদিন পরপর চোখব্যথা চোখব্যথা করে,’—শেলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘কী করবে বাচ্চারা সারাদিন। চব্বিশ ঘণ্টা এই দুইটা রুমের মধ্যে’—রাগে-ক্ষোভে গুমরে মরে সে। তারপর কাপে জুস ঢালার আগে ড্রইংরুমের দিকে চোখ এক পলক, “আমি তোমাকে টিভি বন্ধ করতে বলেছি।”

কিন্তু রিতি যেন তার কথা শুনতে পেল না। সে বরং চ্যানেল পাল্টাল।

শেলির আরো রাগ হয়। তবে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আম্মাজান!”

“হুম!”

“তুমি কি শুনতে পাচ্ছ আমি কী বলছি?”

“হুম!”

“তাহলে বন্ধ করছ না কেন?”

রিতি চুপ। সব আদেশ, রাগ এখনও সে আমলে নিতে শেখে নি।

শেলি বলল, “আবার চোখ ব্যথা করলে এবার কিন্তু আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব না, বুঝেছ?”

“হুম!”


এর একটা নাম দিয়েছি। ঢাকা স্যুট। তবে এখনও চূড়ান্ত না। শেষ পর্যন্ত হয়তো নামটা হবে নোশপো—নোংরা শহরের পোশাক।


বারবার ‘হুম হুম’ শুনতে শুনতে রাগের মধ্যে হেসে ফেলে শেলি। মনে মনে গুনগুন করে, হুম হুম হুম। তারপর আপন মনে হাসে আর আধাকাপ জুস ওভেনে দিয়ে নরমাল করে নেয়। নয়তো খুসখুস করবে।

‘কিন্তু সে দিশুটা এখনও আসে না কেন?’ শেলি একা একা কথা বলতে বলতে রিতিকে জুসের কাপটা দিল।

রিতি বলল, “খাব না।” এমনভাবে বলে যেন বলার জন্য সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকে।

দিন-রাত ঘরের মধ্যে শুয়ে-বসে থাকলে খেতে ইচ্ছে করে না। রুচি আসে না। কিন্তু ‘খাব না’ বললেই কি হয়? শেলি তাকে মিনিট দশেক ধরে সোনাপাখি-ময়নাপাখি বলে বলে প্ররোচিত করে। তবে রিতি প্ররোচিত হয় না। সে নির্লিপ্ত থেকে গিলে ফেলে। বাধ্যতামূলক না কিন্তু বাধ্যতামূলক যেন।

‘আর দিশু আজ ধমক না দিলে বাসায় ফিরবে না,’ শেলি একা একা কথা বলতে বলতে আশপাশে চায়। সোফার পাশে তেপায়ার ওপর শুয়ে আছে তার গোলাপি মুঠোফোন। দিশু কল রিসিভ করতেই শেলি বলল, “তুমি কি আজ বাসার কথা ভুলে গেছ, বাবাজি?”

দিশু বলল, “এখনই আসছি।”

রিতি বলল, “আম্মু, চোখ ব্যথা করে।” সে শেলির কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে চোখ বুজল।

শেলির মুখ ভার হয়ে যায়। সে ত জানেই যে চোখ ব্যথা করবে। “তাহলে এখন খেলনা নিয়ে খেলাধুলা কর,” টিভি বন্ধ করে বলল সে।

কিন্তু “খেলনা ত সব পুরনো হয়ে গেছে।”

“পুরনো হবে কেন? পরশু একটা নতুন খেলনা কিনে দিলাম না?”

একটা খেলনায় কি দুই-তিন ঘণ্টার বেশি চলে? দৈনিক দুই-তিনটা আলাদা স্টাইলের খেলনা?

এভাবে হয় না। হয় না। চাই নিজে করার মত কিছু।

যান্ত্রিক এসব খেলনা যতই আলাদা হোক, কমন বৈশিষ্ট্যের একঘেয়েমিতে ক্লান্তিকর!

তবু শেলি তার মেয়েকে প্ররোচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। “এখন ব্লক দিয়ে একটা ঘর বানাও ত, সোনাপাখি। দেখি কেমন পার?”

রিতি সোফায় গা এলিয়ে দিল। শেলির আর বগবগ করার মুড নেই। সে বরং চা-নাশতা বানাতে যায়।

ড্রইংরুমের পাশে ডায়নিং টেবিলের কোনায় ইলেকট্রিক কেটলি। শেলি তাতে পানি ঢালতে গিয়ে থামল। তারপর হাদির ঘরের দিকে চোখ এক পলক। হাদি চেয়ারে হেলান দিয়ে পড়ছে। ‘একজনকে পড়ার টেবিল থেকে উঠাতে পারিনে, আরেকজনকে পড়ার টেবিলে বসাতে পারিনে,’ আপন মনে বিড়বিড় করে শেলি। আরেক জন মানে দিশু।

“বাবা আল হাদি!”

হাদি বই থেকে চোখ না তুলেই সাড়া দেয়, “শুনছি। বলো।”

“কী শুনছ?”

“কিছু ত বলো নাই।”

“সন্ধে লেগে যাচ্ছে। বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসো।”

ইন্টার পড়া হাদি এই মুহূর্তে সরদার ফজলুল করিমের দর্শনকোষ  খুলে তার মধ্যে ডুবে আছে। সে এতদিন বিভিন্ন বিষয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করেছে, কিন্তু সংজ্ঞারও যে সংজ্ঞা আছে, সংজ্ঞা লেখার নিয়ম-কানুন আছে, তা জানতে পেরে অভিভূত।

বইটাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও আছে আলোচনা। কী সাংঘাতিক!

হাদির ইচ্ছে করে বইটা এখনই পড়ে শেষ করতে। কিন্তু বেচারা বারবার অভিধান খুলতে গিয়ে গলদঘর্ম। আবার অভিধান থেকে যে সবকিছু বোঝা যাচ্ছে তাও না।

এটা আসলে বড়োদের বই। আবার সুলিখিত না।

শেলি বলল, “কী হলো? আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

হাদি চুপ। তার এখন ওঠার ইচ্ছা নাই।

তাকে চুপ দেখলে শেলি তার মনের কথা বুঝতে পারে। সে এগিয়ে এসে বলল, “আমি তোমাকে উঠতে বললাম। বইপোকা হবার দরকার নেই। রুটিন মতো সব কাজ করতে শেখ।”

কিন্তু বাইরে হাদি কই যাবে? “কোথাও কি যাওয়ার জায়গা আছে নাকি?” তার রাগ হয়।

হাদির কথায় শেলির আরো বেশি রাগ হয়। সে বলল, “সবাই কি ঘরে বসে আছে নাকি?”

সবার কথা উঠলে হাদি বলে, “সবাই অন্ধ বলে আমিও অন্ধ হব নাকি? মাইলের পর মাইল যেখানে যাও ঘিঞ্জি গলিতে নোংরা কিলবিল কিলবিল। ধুলো আর ধোঁয়ায় ডুবে আছে রাস্তাঘাট, দোকানপাট—সব! এর মধ্যে মানুষ কিভাবে হেঁটে বেড়ায়? খেলার মাঠ নেই, আড্ডার জায়গা নেই, বসার জায়গা নেই, পার্ক নেই, কোথাও বেড়াতে চাইলে তিন-চার ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকতে থাকতেই এনার্জি শেষ।”

নাহ, এই ছেলেকে নিয়ে শেলি আর পারে না। তার আরো রাগ হয়। কিন্তু সে এখনই হাল ছাড়বে না। “আমি তোমাকে বাপের মতো কথা বলতে নিষেধ করেছি,” কণ্ঠ শক্ত করে বলল সে, “যেখানে যে পরিবেশে আছে সেখানে মানিয়ে নিতে শেখ। এটা জরুরি।”

হাদি অগত্যা বই বন্ধ করে। তারপর দেয়ালের হ্যাঙ্গার থেকে টেনে নেয় তার স্পেস স্যুট টাইপের পোশাকটা।

দর্জির দোকানে ফরমায়েশ দিয়ে বানানো এই পোশাকটা পরেই হাদি দুই দিন ধরে বাইরে যাচ্ছে। প্রথম দিন সবাই হাঁ করে তাকিয়েছিল। শেলি তাকে মানসিক রোগীদের হাসপাতালে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু বিস্তর কথাবার্তা বলে তাকে তার অসুস্থ মনে হয় নি। তবে এই পোশাকটা সে মেনে নেয় নি, “আমি তোমাকে ওটা পরতে নিষেধ করেছি।”

হাদি জেদ ধরে। অবাধ্য হবার কথা ভাবে। তবে আগে সে যুক্তি দেখায়, “আমি তোমার সব কথা শুনি, রাইট?” মৃদু হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।

শেলির বুকের ভেতর হঠাৎ করে অতিরিক্ত ভালোবাসা উথলে ওঠে। ছেলেটা এই বয়সে কী দারুণ করে কথা বলা শিখছে! যেমন সে যুক্তি দেখায় তেমনি তার ভঙ্গি। শেলির ইচ্ছে করে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়। কিন্তু ছেলেটা মাঝেমধ্যে যা বেয়াড়া হয়ে ওঠে! এখন বেশি ভালোবাসা দেখানো ঠিক হবে না। শেলি বরং হেসে বলল, “তুমি ভালো ছেলে।”

“এটা আমি সপ্তাখানেক পরতে চাই,” হাদি তার বিশেষ পোশাকটা গায় চড়িয়ে বলল, “এটা একটা পরীক্ষা। এর একটা নাম দিয়েছি। ঢাকা স্যুট। তবে এখনও চূড়ান্ত না। শেষ পর্যন্ত হয়তো নামটা হবে নোশপো—নোংরা শহরের পোশাক।”

শেলি ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে যায়। বিচলিত হয়। ছেলেটা হয়তো অস্বাবিক অবস্থার মধ্যে চলে যাচ্ছে। কিন্তু শেলিকে চুপই থাকতে হয়। তার ভালো লাগে না।

পোশাকটার গলা থেকে কোমর পর্যন্ত বেশ কটা কাপড়ের জানালা আছে। এসি বিকল হয়ে গেলে কাজে লাগানো যাবে। এটা পরেই সে তার স্বাস্থ্যকর নগর আন্দোলন শুরু করতে চায়। আন্দোলনের কথাটা আম্মুকে বলা যাবে না, ভাবে সে।

শেলি আর কথা বাড়ায় না। বেশি ঘাঁটাতে গেলে জট পাকানোর আশঙ্কাই বেশি। সে শুধু দিশুকে পাঠিয়ে দিতে বলল।

হাদি চারতালা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দোতালায় এক বালিকার মুখোমুখি। বালিকা ভূত দেখার মতো চিল্লিয়ে উঠল। সে এখনও ঢাকা স্যুটের খবর জানে না। সবার জানতে সময় লাগবে। গলি দিয়ে হাঁটার সময় অনেকেই হাঁ করে চেয়ে থাকে। তবে এক বুড়ো হো হো করে উঠল, “তুমি কে গো? অলড্রিন না গ্যাগারিন?”

হাদি চুপচাপ মুচকি মুচকি হাসে।

“ওহ, তুমি তাহলে আর্মস্ট্রং,” লোকজন হাসে ত হাসেই।

হাদি ভাবে, যা বলে বলুক লোকে। হাসছে ত হাসুক।

গলির মোড় পার হওয়ার সময় একদল বালক ভয়ে পিছিয়ে যায়। তবে আরো একটু এগোলে তিন যুবক তাকে ঘিরে ধরল, “হ্যালো, ভাইয়া, আপনি কে? কী হয়েছে?”

“না। কিছু না।”

এবার বালক দল এগিয়ে আসে, “আপনি কোন গ্রহ থেকে এসেছেন, ভাইয়া?”


শুভ চিল্লিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটা তার নাক-মুখ এমন করে চেপে ধরেছে যে দম বন্ধ হবার জোগাড়। 


সবাই তাকে নিয়ে মজা করতে চায় কিন্তু হাদি তাদের পাত্তা দেয় না। সে বরং ঢাকা স্যুট পরেই কলেজে যাওয়ার কথা ভাবে। ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দিশুকে খোঁজে। একটা মোটরসাইকেল ধুলো উড়িয়ে আশপাশ ঢেকে দিয়ে চলে গেল। কিন্তু দিশু কই?

হাদি প্রথমে টিনের বেড়ায় ঘিরে রাখা মাঠটার কাছে যায়। সেখানে এখন কেউ নেই। পিছন ফিরে পশ্চিমে এগিয়ে আরেকটা গলি বরাবর তাকাল। সেখানেও এখন কেউ ক্রিকেট খেলছে না।

আরো খোঁজার চেয়ে হাদি বরং দিশুকে ফোন করার কথা ভাবে। তবে ডিভাইস অন করতেই অর্ধশতাধিক নোটিফিকেশন তার নজর কাড়ল। নোটিফিকেশনে ক্লিক। ফেসবুক ওপেন হচ্ছে।স্বাস্থ্যকর নগর আন্দোলন নিয়ে দেওয়া পোস্টে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট বাড়ছে ত বাড়ছেই।

মোড়ে ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ঢাকা স্যুট পরা অবস্থায় হাদি চার রকম ভঙ্গিতে চারটা সেলফি তুলল। কিন্তু একটাও তার পছন্দ হলো না। আবার তোলার আগে দিশুকে ফোন। আগের কাজ আগে করতে হবে।

২.
দিশু মসজিদ মোড়ে দাঁড়িয়ে হাদির ফোন রিসিভ করল। পথ চিনতে না পেরে তার গলা শক্ত হয়ে আছে। ‘হ্যালো, ভাইয়া’ বলার চেষ্টা করে কিন্তু শব্দ দুটো গলা থেকে বের হয় না। তার ওপর ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটা মনের মধ্যে আজরাইলের মতো ভর করে আছে। লোকটা আশপাশে আছে কিনা দেখার জন্য এদিক-ওদিক তাকাল সে।

হাদি বলল, “কই তুই?”

“এই যে আসছি,” এবার দিশু কথা বলতে পারল বটে, তার গলা জড়িয়ে গেল। হাদির কান এড়ায় না। তবে তার ভাবনায় আসে না গুরুতর কিছু কিনা। সে সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়, “কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?”

দিশু আবার আশপাশে চায়। পথ হারিয়ে ফেলেছে এ কথা সে বলে কী করে। তার ত একটা মান-সম্মান আছে। সে বলল, “এখনই আসছি!”

“আসছিস ত বুঝলাম। কই তুই এখন?”

“মসজিদ মোড়ে।”

“ওখানে কী?”

“এমনি ঘুরতে ঘুরতে আসলাম।”

“সাথে আর কে আছে?”

“শুভ আছে।”

“আচ্ছা, শিগ্‌গির আয়। আম্মু রাগ করছে।”

মসজিদ মোড়ে তিনটি রাস্তা। উত্তর দিকের রাস্তাটাই তাদের বাসার দিকে গেছে, দিশু নিশ্চিত। কিন্তু সে মোড়ের কোনো দোকান চিনতে পারছে না কেন। এখানে কি সে এর আগে কোনো দিন আসে নি? পান-সিগারেটের দোকান, মুদি দোকান, মোবাইল ফোন রিচার্জ বা বিকাশ এজেন্ট—সবই অচেনা অচেনা লাগছে।

“চল, ওই দোকানে জিজ্ঞেস করি,” শুভ বলল।

কিন্তু শুভর ওপর দিশুর রাগ হয়। তা ত হবারই কথা। কাউকে কি বলা যায় যে ভাই আমরা আমাদের বাসা হারিয়ে ফেলেছি! আমাদের একটু বাসার পথটা দেখিয়ে দেন! দিশু বরং দোকানটার ওপরে সাইন বোর্ডের দিকে চায় ঠিকানা দেখার জন্য। আমির এন্টারপ্রাইজ, নতুন রাস্তা, নাখালপাড়া।

শুভর পরিবার নাখালপাড়া এসেছে বছর খানেক। দিশুরা এসেছে আরো পরে। তারা দৈনিক সকালে উত্তর দিকের রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায় আর বিকেলে নিচে নেমে বাসার কাছে ক্রিকেট খেলে।

“এবার কথা না বললে কিন্তু মার দেবো,” শুভ দিশুর কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকি দিল।

“আসলে আমি ভাবতেছি যে,” দিশু এতক্ষণে মুখ খোলে। শুভ হাসে। দিশু কথা বলছে দেখে তার সুখ সুখ লাগে। সে দিশুর হাত ধরে উত্তরের রাস্তায় পা বাড়াল। আর তারা আশপাশে তাকিয়ে দেখে নিল ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটা আছে নাকি। “লোকটাকে আমার ভালো মনে হয় নি,” দিশু বলল। লোকটার চওড়া থুতনি আর কোটরে বসা চোখ দুটো তাদের বুকে ভয় ধরায়।

“আর তার নাকটাও কেমন খাড়া, তাই না?” আস্তে অস্তে কথা বলতেও ভয়ে শুভর বুক কাঁপে।

মোড়ের দোকানটা পেরিয়ে গেলে এই গলিতে আর কোনো দোকানপাট নেই। গলির দুপাশে কোলাকুলি করে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর আবছা আলোয় পথ চলছে দুএকজন নারী-পুরুষ। খানিকটা সামনে গেলে, “ওই যে কি সেই ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটাই ওখানে দাঁড়িয়ে আছে?” শুভ থমকে দাঁড়াল। দিশুর বুকের ভেতর ঢিবঢিব করে ওঠে। তারা মোড়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবে। তারপর বাসায় ফোন না দিলে আজ আর ফেরার উপায় নাই! কী লজ্জা! কিন্তু তারা পা বাড়ানোর আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়। সবাই অন্ধকারে ডুব মারে। শুভ কেঁপে উঠে দিশুর দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু সে শুধু একটু গোঙানি শুনতে পায়। কেউ কি দিশুর মুখ চেপে ধরেছে? শুভ চিল্লিয়ে উঠল, “দিশু!”

দিশুর সাড়া নেই।

গলির পাশের বাড়িগুলোয় একটা-দুইটা করে মোমবাতি, চার্জার লাইট জ্বলতে শুরু করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।

শুভ আশপাশে তাকাল। না, দিশুকে দেখা যাচ্ছে না। শুভর দুই পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। মুখে কথা সরে না। তবে তার চিন্তা কাজ করছে। সে ভাবল এক দৌড়ে মোড়ে ফিরে বাসায় ফোন করবে। কিন্তু মোড়ের দিকে ঘুরতেই ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটাকে দেখে তার পিলে চমকে যায়। লোকটা তার সামনে পাথুরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। শুভ চিল্লিয়ে ওঠার আগেই সে তার মুখ চেপে ধরল।

আশপাশে কি লোকজন নেই?

অবশ্যই আছে। ওই ত একটা লোক বাজারের থলে হাতে এদিকেই আসছে। শুভ চিল্লিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটা তার নাক-মুখ এমন করে চেপে ধরেছে যে দম বন্ধ হবার জোগাড়। তবু সে ভাবছে, বাজারের থলে হাতে করে আসা লোকটা তাকে রক্ষা করবে। ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটার পরানে কি ভয়ডর বলতে কিছু নেই?

আছে বৈকি। তারও বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। সে তার পরিকল্পনা মতো শুভকে আদর করে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গিতে মুভ করে। এক পা সামনে বাড়িয়ে ডান পাশে মোড় নিলে ছয় তলা বাড়ির খোলা ফটক। নিচ তলায় একটা বাসার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া লোকটার খালাত ভাবি, শরিফা খাতুন। বিদ্যুৎ গিয়ে তাদের একটা দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে।

লোকটা ভেতরে ঢুকে বাঁ হাত শুভর মাথার ওপর আর ডান হাত থুতনির নিচে দিয়ে এমন করে চেপে ধরে যে শুভর মাথাটা পুতুলের মতো পিষে যায়।

শুভ হাত নাড়াতে না পেরে মেঝেতে লাথি মারল। সিমেন্টের মেঝেতে তা নিতান্তই ফুলের ছোঁয়া মাত্র। শুভ তবু গলার মধ্যে শব্দ করে। কিন্তু লোকটা তার গলার সামনে বঁটি ধরে বলল, “শব্দ করলে—!” আর কিছু না বলে মুখটা ছুরির মতো করে পোঁচ দেয়। তারপর লোকটা তাকে মেঝেতে বসিয়ে ধরে রাখে আর শরিফা তার দুই হাত পেছনে নিয়ে মোটা, কড়া দড়ি দিয়ে বাঁধে। গিরা ঠিকমতো আঁটল কিনা তা আর দেখে না। এতটা দেখার বোধ নেই তার। সে বরং শুভর মুখে টেপ এঁটে দিতে ব্যস্ত হয়। তারপর লোকটা তাকে নিয়ে যায় রান্নাঘরে চুলার নিচে। বসিয়ে দেয় দিশুর পাশে।

দিশু চুপচাপ বসে আছে। যেন শান্ত বালকটা। শুভও চুপ। প্রচণ্ড ভয়ে দুইজনই হিসু করে দিয়েছে। আকস্মিক এই চাপে কারো মাথা কাজ করছে না।

“এখন,” শরিফা ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকাল। এই লোকটা তার দেবর। খালাত দেবর। মাসুদ মিয়া। ভারি করিতকর্মা লোক। মাত্র বছর খানেকের মধ্যে মটর গ্যারেজের সব কাজ শিখে ফেলেছে। এখন লাখ দুই টাকা হলেই নিজে একটা গ্যারেজ দিতে পারে। শরিফার খুশি খুশি লাগে। আর তার হাজবেন্ড? তার কথা মনে পড়তেই শরিফার মুখ ভার হয়ে যায়। বেটা ফজা গার্মেন্টের সুপারভাইজার। রাতে-দিনে ১৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। তবু তার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তারপর আবার চাকরি চলে যাওয়ায় দুই মাস ধরে বেকার। এখন ত তার হন্যে হয়ে চাকরি খোঁজার কথা। কিন্তু সে ছয়দিন ধরে বাড়ি গিয়ে বসে আছে। “চল, ওই পাশে চল,” মুখ ভার শরিফা, “এখন আমাগে কাজ হলো—!”

তারা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে ছোট্ট ঘরটার অর্ধেক জুড়ে থাকা খাটের কোনায় বসল।


“তাহলে এখানেই একটাকে—!” মাসুদের মুখটা যেন ছুরি পোঁচ দিল।


“তুমি আগে হারুনরে জানাও,” শরিফা বলল। “সে বেটা কুহানে গেছে তা ত জানিনে। তার আসতে কতক্ষণ লাগবে তার কি ঠিক আছে নাকি?”

তা ঠিক। হারুন স্কুটার চালায়। যাত্রী নিয়ে দূরে কোথাও যেতেই পারে। তবু মাসুদ বলল, “আস্তে আস্তে আগাও। এক পা আগানোর আগে দুই পা চিন্তা কর।”

“চিন্তা ত সব করাই আছে,” শরিফা দরজা-জানালার দিকে তাকাল। সব বন্ধ আছে। তবু একবার চেক করা ভালো। চেক করার পর আস্তে আস্তে বলল, “নতুন করে আর কিছু চিন্তা করতে হবে না। হারুনরে ফোন কর।”

“আমাগে একটু ভুল হয়ে গেছে,” মাসুদ ফিসফিস করে, “দুইটা বাচ্চা একসাথে—!”

“যা হবার হইছে। এখন আর কিছু করার নেই। হারুনরে ফোন কর।”

“আবার পিচ্চি দুইটা বেশি বড়। এত বড় হলে—!”

“বেশি বড় না। ঠিক আছে। বেশি ছোট হলে কান্নাকাটি করে। আবার মরে যাবার ভয় থাকে।”

“তবু—!”

“কাঁটায় কাঁটায় সবকিছু মেলে নাকি? দুশ্চিন্তার কিছু নেই। হারুনরে ফোন কর।”

মাসুদ প্যান্টের পকেট থেকে মুঠোফোন বের করল। কিন্তু “তার ফোন ত বন্ধ!”

“মানে কী?” শরিফার গলা কেঁপে ওঠে। সে নিজেও হারুনকে ফোন করে।

‘আপনি যে নম্বরে ফোন করেছেন তাতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না।’

“ত তাই বলে কি তুমি চুপচাপ বসে থাকবা নাকি?” শরিফা তীব্র উৎকণ্ঠায় কাঁপতে শুরু করে। তারপর মাসুদকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে দেয়, “এক দোড় দিয়ে গ্যারেজে চলে যাও।”

মাসুদ গেটে গিয়ে ফিরে আসল। “এখনও কারেন্ট আসে নাই। একজনকে বাইরে নিয়ে ছাইড়ে দিই।”

“তুমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? পরিস্থিতির কারণেই ত দুইজনকে ধরতে হলো।”

“গলির মাথায় নিয়ে ছাইড়ে দিলি কেউ টের পাবেনা নে।”

“কারুর চোখে পড়াই স্বাভাবিক।”

“তাহলে এখানেই একটাকে—!” মাসুদের মুখটা যেন ছুরি পোঁচ দিল।

শরিফার বুকের ভেতর ধড়াশ করে ওঠে। সে বুকের ওপর হাত চেপে ধরে। মাসুদের মুখের দিকে চেয়ে বলল, “আমরা কি খুনি নাকি?”

মাসুদ বলল, “অত ভাবলে কিছু করা যায় না! অবস্থা দিয়ে ব্যবস্থা করা লাগে!”

“ঠিক আছে। আগে শিগ্‌গির গ্যারেজে যাও। হারুনরে ধর। তারে না পাওয়া গেলে তখন দেখা যাবে কী করা যায়।”

মাসুদ টিপটিপ বুকে পা বাড়ায়। আশপাশে টালুমালু চায় আর হাঁটে। মসজিদ মোড় থেকে একটু পশ্চিমে গেলে তাদের গ্যারেজ।

হারুন একটা চিত করে রাখা টায়ারের ওপর পাছা পেতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গপ্প করছে। মাসুদ দূর থেকে হাত ইশারা করলে উঠে আসে।

“তোর মুবাইল কই?” হারুন তীব্র বিরক্ত।

মাসুদ বলল, বন্ধ হওয়ার পর চার্জে দিয়ে রেখেছে। পরে আবার চালু করতে ভুলে গেছে।

সব শুনে হারুন বলল, “শাব্বাশ বেটা বাপের বাচ্চা! এতদিনে একটা কাজের কাজ করিছিস! চল দেখি।”

তারা পা বাড়াল।

হারুন বলল, “আমি সারাদিন গাড়িতে থাকি। মহল্লায় নজর রাখা কঠিন। তুই যেহেতু মহল্লায় থাকিস, তুই এটা করতে পারিস। বাকিটা আমি সামলাব।”

তারা একটা কাজ শেষ করার আগেই ভবিষ্যতের জন্য আরো পরিকল্পনা শুরু করে।


৩ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)