হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : ১

সোনাপাখি : ১

সোনাপাখি : ১
868
0

পর্ব- ১

নাখালপাড়া খালের পাশে লম্বা এক টুকরো পতিত জমি। পাশে ধূলিধূসর আমবাগান।

সেদিন শ্রাবণী বিকালে পতিত জমিটায় এলাকার বালকরা যখন টেনিস বল আর ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে হৈচৈ করছিল, একটা মাটিকাটার গাড়ি এসে তাদের মন কেড়ে নিল। তারপর আরো এল পাইল ড্রাইভার, ক্রেন, ইত্যাদি।

তবে বালকদের বেশি আকর্ষণ মাটিকাটার গাড়িতে। এর বাকেটটা যেভাবে মাটি খাবলে ধরে, তুলে নিয়ে দূরে ফেলে—সে এক বিরাট রহস্য বৈকি!

“বাকেটটা যেন অবিকল একটা হাত, তাই না?” নাদুস-নুদুস শুভ বলল।

হাতের সাথে বাকেটের তুলনায় বালকরা মজা পায়। “কিন্তু কিভাবে এটা হাতের মতো কাজ করে?” প্রশ্নের ডিব্বা দিশু।

বালকদল দশ-বার সেকেন্ড চিন্তা করে কূল পায় না। আরো চিন্তা করারও তারা কোনো মানে দেখে না।

তাহলে অন্য প্রসঙ্গ।

“এই গাড়িটা দিয়ে কী করবে জানিস?” দিশুর প্রশ্ন।

উত্তরটা সবাই জানে। শুভ তড়িঘড়ি বলল, “এ গাড়ি দিয়ে ত গর্ত খোঁড়ে—এ কে না জানে?”

তা বটে, কিন্তু দিশু চোখ উজ্জ্বল করে বলল, “আরে বলদ, আমি জিগাচ্ছি যে এখানে এ গাড়িটা কী করবে?”


বালকদের কাণ্ড দেখে হাশেম আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না। একেকটা নির্মাণযন্ত্র একেকটা আজরাইল কিন্তু বালকরা তা বুঝতে চায় না।


এখানে আবার কী করবে? এমন গাড়ি ত তারা সময়-অসময় এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। শুভ বলল, এখানে এ গাড়িটা কী করবে এটা কোনো প্রশ্ন হলো নাকি?

“আঁআঁআঁ,” খানিক চিন্তা করে দিশু বলল, “গাড়িটা এখানে মাটি কেটে পুকুর বানাবে। হাদি ভাইয়া ‘সব মহল্লায় পুকুর চাই আন্দোলন’ করছে যে—!”

পুকুর বালকদের খুব আকর্ষণের জায়গা। এখানে যদি সত্যি সত্যি একটা পুকুর হয় তাহলে কী মজাই না হয়! তবে বালকরা বিভ্রান্ত হয় যে এটা কি গ্রাম নাকি যে এখানে পুকুর হবে।

“এখানে তাহলে কী হবে?” শুভ বলছিল।

এরই মধ্যে তিন তিনটে ট্রাক রড, টিন, শাবল, হাতুড়ি-বাটালি নিয়ে হাজির হলে সবাই সেখানে ভিড় করল।

“এসব দিয়ে কী করবেন, আঙ্কেল?” দিশুর প্রশ্ন এক শ্রমিককে।

শ্রমিক উত্তর দেওয়ার আগেই অন্য ট্রাক থেকে দৌড়য় এল মোচড়ানো মোচঅলা হাশেম শিকদার। সাইট ম্যানেজার হিসেবে বছর দশেক কাজ করতে গিয়ে বালকদের সম্পর্কে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। মোচ ঘুরিয়ে বলল, “এখানে আমরা দালান বানাব।” এমনভাবে বলল যেন খুব বিরাট একটা কাজ তারা করতে যাচ্ছে।

বালকদল ভাবল পতিত জমির পশ্চিমে অন্যান্য বাড়ির পাশে দেয়ালঘেরা প্লটে হবে নতুন দালানটা।

সে যাহোক, দিশু পাইল ড্রাইভার দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা দিয়ে কী করতে হয়, আঙ্কেল?”

“পাইল করতে হয়,” হাশেম বলল বটে, কলপে কালানো মোচে তা দিয়ে বালকদের দিকে চোখ গরম করে তাকাল। সে তাদের এখনই তাড়াতে চায়। এখানে থাকলে বালকরা লোহালক্কড়ের কাছে যাবে, যন্তরপাতির কাছে যাবে। তখন একটু ঠুন লাগলেই ত হয়ে গেল!

কিন্তু বালকরা তার গরম চোখে ভয় পায় না। তারা বরং তার মোচ দেখে মজা লয়। তার ওপর দিশুর প্রশ্ন, “পাইল করতে হয় কিভাবে?”

হাশেম চুপ। আর কোনো উত্তর দেবে না। সে জানে, ‘কী’ ‘কেন’ ‘কিভাবে’ এসব প্রশ্নে বালকদের মোটেও অরুচি নেই। যতই উত্তর দাও, তারা প্রশ্ন করতেই থাকবে। ভাবতে ভাবতে বালকদের দিকে চেয়ে আপন মনে হাসে হাশেম শিকদার। “সোনাপাখিরা, এসব যন্তরপাতির কাছে আসবে না, ঠিক আছে?”

বললেই হলো? দিশুর প্রশ্ন, “এলে কী হয়?”

“বিপদ হয়।”

“কিভাবে বিপদ হয়?”

কী জ্বালা! হাশেম এসব কিভাবে বোঝাবে। সে বরং মুখ গোমড়া করে মজুর তদারকে মন দিল। সাইট এরিয়ায় বেড়া না দেওয়া পর্যন্ত বালকরা এখানে আসবেই। ধমক দিয়ে তাড়ালে তারা হয়তো শত্রুতা করবে। হয়তো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হিসু করবে, ইত্যাদি!

বালকরা তার চির প্রতিপক্ষ যেন।

“জলদি কর! জলদি কর!” হাশেম মেস্তরিদের তাড়া দিল।

দলে দলে মজুর-মেস্তরি পতিত জমিটার পাশে টিনের বেড়া দেওয়া শুরু করেছে। কংক্রিটের খুঁটি পুঁতছে কেউ কেউ। খুঁটিতে লোহার চ্যানেল নাট-বোল্ট দিয়ে আটকাচ্ছে কয়েকজন। চ্যানেলের ওপর দিয়ে ডেউটিন সাজিয়ে সাজিয়ে তাতে নাট-বোল্ট টাইট দেওয়ার কাজটায় তারা কী মজাই না পাচ্ছে!

শুভ ত বলেই ফেলল, বড় হয়ে সেও মেস্তরি হবে। তাহলে ইচ্ছামতো নাট-বোল্ট টাইট দিতে পারবে।

দিশু অবাক, “মেস্তোরি হওয়া কি ভালো নাকি?”

তা না হোক, শুভ বলল, তার ভালো লাগে। “তোরা সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিয়ার হ গিয়ে। ওসবে আমার শখ নেই।” সে মেস্তরিদের টুলবক্সের দিকে লোভী চোখে তাকাচ্ছে। স্লাই রেঞ্চ, পাইপ রেঞ্চ, সাঁড়াশি, আরো কত কত লোভনীয় জিনিস! সে এসব কিনতে চায়, টুলবক্স দেখিয়ে বলল সে।

“এসব দিয়ে কী করবি?”

“কাজ আছে,” শুভ হঠাৎ ভয়ডর ভুলে একটা রেঞ্চ তুলে নিল। তারপর বেড়ার কাছে গিয়ে নাট ঘোরানো শুরু। কাছেই কংক্রিটের খুঁটি, লোহার চ্যানেল, টিন প্রক্রিয়া করার মধ্যে বিপদ ওত পেতে আছে।

হাশেম শিউরে উঠল। হঠাৎ যদি এক টুকরো রড বা টিন ছিটে গায় লাগে! “এই যে নষ্টমতি বালকের দল!” সে তাদের ধমক দিয়ে সতর্ক করে, “আমি তোমাদের এসব লোহা-লক্কড়ের কাছে আসতে নিষেধ করেছি। বলছি যে এগুলো বিপজ্জনক।”

কেন বললে? বিপদটা কেমন দেখতে হবে না?

নিজের চোখে না দেখলে বালকদের মন ভরে না। একবার তাড়া খেলে কিছুক্ষণ রেশ থাকে। তারপর যে লাউ সেই কদু।

শুভ এবার পাইল মেশিনের উইঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়াল। আহ! কী মজা! “এই হিসু! এই দেখ কোথায় উঠেছি!”

উয়াও!

দিশু দোড়োয় গেল। সেও না উঠে পারে কী করে।

বালকদের কাণ্ড দেখে হাশেম আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না। একেকটা নির্মাণযন্ত্র একেকটা আজরাইল কিন্তু বালকরা তা বুঝতে চায় না। “এখানে কী আছে, হুম?” অগত্যা সে মুখ খিঁচিয়ে উঠল। সেই সঙ্গে রড উঁচু করে তাড়া।

বালকদল দৌড়য় পালাতে পালাতে পেছনে মুখ ঘুরিয়ে ভেংচি কাটে। তারপর আবার সেই টেনিস বলটাকে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে ঠেঙানোর খেলা। ঠেঙাতে ঠেঙাতে সন্ধে লেগে গেলে বাসায় ফিরবে।

পরদিন বিকেল। দিশু বিছানায় কিছুক্ষণ বাধ্যতামূলক গড়াগড়ি করে উঠে পড়ল। তারপর টেবিলের ড্রয়ার টেনে টেনিস বল বের করে। এবার দেয়ালে হেলান দেওয়া ক্রিকেট ব্যাট।

বাড়ি থেকে বের হতেই বালকদের পা নাচতে নাচতে মাঠের দিকে এগিয়ে যায়।

আজ দক্ষিণে খানিক এগিয়ে পুবদিকে মোড় নিতেই দিশুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। গলির মাথায় যেখানে খোলা মাঠে বন্ধুরা ছুটোছুটি করত এখন সেখানে টিনের ফটক দেখা যাচ্ছে। শুভ আর কয়েকজন বন্ধু ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। ফটকের ওপর দিয়ে মাটিকাটা গাড়ি, ক্রেন, পাইল ড্রাইভার দম্ভ করছে।

দিশু দৌড় দিল। তার বুকের ভেতর ঢিবঢিব করছে। শুভ আশপাশে তাকাল। গলির মুখে গেট হওয়ায় কেমন যেন বন্দি বন্দি লাগছে, “দালান বানানো হয়ে গেলে গেটটা সরিয়ে ফেলবে না?”

“তা ত ফেলবে,” দিশু ভাবছে। কিন্তু হঠাৎ গেট খুলে যেতেই তারা আকাশ থেকে পড়ল। গোটাতিনেক মাটিকাটার গাড়ি পুরো মাঠটা খুবলে ফেলছে। এখানে-ওখানে ছোট-বড় গর্ত। এখানে একটা খেলার মাঠ ছিল তা আর কল্পনাও করা যাচ্ছে না।

সাইট ম্যানেজার হাশেম চিকন চিরুনি দিয়ে মোচ আঁচড়াতে আঁচড়াতে গেটে এসে দাঁড়াল। তার মুখে মুচকি মুচকি হাসি। সে যেন খুব মজা পাচ্ছে।

বালকদের ভয় লাগে তার মোচড়ানো মোচ দেখে। তারা দূরে সরে দাঁড়াল।

শুভ চোরাচোখে মোচের দিকে চেয়ে দিশুর কানে কানে বলল, “এই লোকটা খুব খারাপ।”

দিশুও চোরাচোখে তাকাল। কাল যে মোচ দেখে মজা পেয়েছিল আজ তা দেখে ভয় লাগছে—দুই বিপরীত ভাবনা তাদের অবচেতন মনে গোল পাকায়।

“এখন আমরা খেলব কোথায়? মাঠটা ত নষ্ট করে ফেলল।”

“ওই গাড়িগুলো সব নষ্টের গোড়া।”

“আর ওই লোকটা হলো সবার সরদার,” মোচড়ানো মোচ দেখিয়ে দিশু বলল।

খানিক জল্পনা-কল্পনার পর দিশু দুরু দুরু বুকে গেটের দিকে এগিয়ে যায়। তার পাছে পাছে অন্যরা।

দিশু ভেতরে ঢুকতে চায় কিন্তু হাশেমের হাতের কাছ দিয়ে পা বাড়াতে ভয় লাগে। সে বরং হাশেমের অনুমতি চায়, “আমরা একটু ভেতরে যাব।”

“ভেতরে কী করবা?”

“দেখব।”

“কী দেখবা?”

“এটা আমাদের খেলার মাঠ।”

“এখানে আমরা দালান বানাব।”

“এই পুরো মাঠে?”

“হুম!”

বালক দল হাঁ হয়ে যায়। তারা কল্পনাও করতে পারে না যে মাঠটার চারদিকে বহু মাইলজুড়ে গা ঘেঁষে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লাখ লাখ দালানের নিচেও একদা এমন বহু মাঠ, ডোবা, জঙ্গল ছিল।

“তাহলে আমরা এখন খেলব কোথায়?” দিশু দুরু দুরু বুকে হাশেমের মুখের দিকে তাকাল। অন্যরাও।

হাশেম শক্ত করে বলে দেয়, “এত খেলাধুলা ভালো না। বাসায় গিয়ে পড়াশোনা কর। টিভি দেখ।”

“সারা দিন কি বাসায় বসে থাকা যায় নাকি?”

বালকদের সঙ্গে এই বাহাসের কোনো মানে হয় না। হাশেম গেট বন্ধ করে দিল।


স্রোতে ভেসে চলা মাছের মতো অভিভাবক। কেউ কি আছে তাদের মানুষ করে রুচি-সংস্কৃতি শেখাবে।


মুখের ওপর গেট বন্ধ করে দেওয়ায় বালকদের বুকের ভেতর ধড়াশ করে ওঠে। সাথে সাথে দিশু তার ব্যাট দিয়ে গেটে বাড়ি মারল। অন্য বালকরা আবার কেঁপে ওঠে। আর দিশু গায়ের বল উজাড় করে আরো জোরে বাড়ি মারে।

কয়েকবার বাড়ি মারার পর গেটটা আবার খুলল।

হাশেম বালকদের দিকে ঠান্ডা চোখে চেয়ে আছে। কয়েকজন শ্রমিকও এসে দাঁড়াল তার পাশে। তারাও বালকদের দিকে চুপচাপ চেয়ে। কী বলবে বুঝতে পারছে না।

দিশু মুখ ফুলিয়ে চোখ বড় করে দাঁড়িয়ে। মাথা নাড়ায় না। শুধু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রমিকদের মুখের দিকে চায়। হাশেমের মোচ দেখে আর হাতের মুঠোয় ব্যাটের হাতলটা পিষে ফেলে।

শুভ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে দেখল না। বল পেটানেরর জন্য তার হাত নিশপিশ করছে। সেই মুহূর্তে একজন বন্ধু বলল, “আয় আমরা এখানে খেলি।” সে গলির কোনার স্তূপ থেকে দুটি ইট টেনে নিল। তারপর গলির মাঝখানে দুই ইটের ফাঁকে লাঠি দাঁড় করানোর চেষ্টা।

“রাবিশ আইডিয়া,” বলল বটে, শুভ নিজেও দুই ইটের ফাঁকে লাঠি দাঁড় করানোর চেষ্টায় নামল।

দুই ইটের ফাঁকে তিনটি লাঠি কিছুতেই দাঁড়াতে চায় না। লাঠিগুলো তারা যতই এপাশ-ওপাশ করে, দুটি দাঁড়ায়, আরেকটা নড়বড় করে। অগত্যা দুই লাঠিই সই।

কিন্তু শুভ ব্যাট হাতে উসখুস করে। রাস্তার ওপর খেলায় কি মজা আছে নাকি? বারবার মানুষ আসে। জানালা ভাঙে। বল বারবার বাড়ির ভেতর চলে যায়। ঢাকার অন্য অনেক মহল্লায় যেমনটা সে দেখেছে।

তবু। “রেডি?” বন্ধু বল করার ভঙ্গিতে প্রস্তুত।

শুভ ছক্কা মারতেই বলটা গিয়ে এক শ্রমিকের মাথার ওপর পড়ল। বেচারা এক মনে লোহা কাটছিল। ভুত দেখার মতো চিল্লিয়ে উঠলে বালকরা ভয় পায়। তবে মজাও লাগে তাদের। সেই সঙ্গে তারা হাশেমের মুখের দিকে চেয়ে তার প্রতিক্রিয়া দেখে।

হাশেম এখনও তাদের দিকে চেয়ে আছে। খেলা দেখছে? শুভ তার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারল না। তবে বলটা গিয়ে যদি তার মোচের ওপর পড়ে তাহলে কেমন হবে ভাবতেই হাসি পায়। হাশেম লাফ দিল! কলপে কালানো মোচ ধূলিধূসর!

শুভ নিজের অজানতেই হো হো করে ওঠে।

“কী হয়েছে রে? হাসছিস কেন?”

শুভ দৌড়য় গিয়ে বন্ধুর কানে কানে পরামর্শ করল।

“উয়াও! গ্রেট আইডিয়া!”

শুভ ব্যাট নিয়ে তৈরি। কিন্তু দিশু এখনও এভাবে দাঁড়িয়ে কেন? “এই দিশু!” ডাকল সে।

দিশু নড়ল না। সে তাহলে কী করতে চায়?

“এই নে,” বন্ধু বল উঁচু করে কায়দা-মতো ফেলে। শুভ বারবার চেষ্টা করে বলটা যেন হাশেমের মোচের ওপর গিয়ে পড়ে। কিন্তু হাশেম লাফ দিয়ে দিয়ে সরে যায়। পরে বলটা এক শ্রমিকের কপালে গিয়ে লাগলে হাশেম আবার গেট বন্ধ করে দিল।

দিশু বন্ধ গেটের দিকেও আগের মতোই চেয়ে থাকে। আর হাতের মুঠোয় ব্যাটের হাতলটা পিষে ফেলে।

“এই দিশু!” শুভ তার হাত ধরে নাড়া দিল।

দিশু নড়ে না।

“এই! তুই কি মূর্তি হয়ে গেলি নাকি?” শুভ তার পিঠে চাপড় দিল। দিশু তবু নড়ল না। সে কি আর নড়বে না? শুভ ভেবেও ভাবে না। সে বরং আবার বল পেটাতে মন দেয়। কিন্তু মোড় দিয়ে একটা পিকআপ ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢেকে দিয়ে চলে গেলে তারা আগে কিছুক্ষণ খুসখুস করে।

দিশু প্রায় আধা ঘণ্টা মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে। কী ভাবছে সে? শুভ অস্থির হয়ে তার হাত চেপে ধরল। দিশু থতমত খায় কিন্তু কথা বলে না। হঠাৎ সে বরং ব্যাট ঘাড়ে তুলে হাঁটা দিল।

“কই যাস?” শুভর জিজ্ঞাসা।

দিশু চুপচাপ হাঁটে। বাঁয়ে টিনের বেড়া আর ডানে উঁচু উঁচু দালান। মাঝ বরাবর রাতারাতি গড়ে ওঠা গলিটা কোথায় গেছে সে সম্পর্কে এখনও তারা কিছু জানে না।

প্রতিদিন এ রকম দুচারটা গলি গড়ে ওঠে ঢাকায়। হাজার হাজার গলিতে কিলবিল করে দ্বিপদ প্রাণীরা। আরো আছে অসংখ্য দাঁতাল শুয়োর, চিতা, শিয়াল, ভালুক। তাদের সঙ্গে নিত্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ইঁদুর, বিড়াল, তেলাপোকা, কাক, কুকুর। ‘ঢাকার কাকসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে!’

শুভ কিছু না ভেবেই দিশুর পিছু নেয়। তারপর আবার প্রশ্ন, “কোথায় যাচ্ছিস?”

দিশু কথা না বলে টিনের বেড়ায় একটা বাড়ি মারল।

শুভ কেঁপে ওঠে। পথিকরা কেঁপে ওঠে।

দিশু চুপ। আবার হাঁটতে শুরু করল। টিনের বেড়া ঘেঁষে হাঁটছে। বেড়ার ওপর তার চোখদুটো যেন আঠার মতো লেগে আছে। অন্যদিকে নজর নেই। হঠাৎ দাঁড়িয়ে আবার একটা বাড়ি মারল টিনের বেড়ায়। পথিকরা কেঁপে উঠে তাকালেও সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বরং একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। তারপর ব্যাটটা মাথার ওপর তুলে তুলে গায়ের বল উজাড় করে বেড়াটাকে পিটাতে শুরু করল।

দিশুর কাণ্ড দেখে শুভর হাসি পায়। “এই দিশু! খেপে গেলি নাকি?”

কজন পথিক দাঁড়িয়ে পড়ল। “কী হয়েছে গো?” জিজ্ঞেস করল এক হ্যাংলা তরুণ।

দিশু চুপচাপ আরো খানিক পিটিয়ে কাহিল হয়ে যায়। এদিকে পথিকের জটলা বাড়ছে। তারা মজা দেখছে। শুভ তাড়াতাড়ি দিশুর হাত ধরে টান দিল।

একটু এগিয়ে বেড়ার এক জায়গায় ফুটো দেখে দিশু ব্যাট ঢুকিয়ে চাড় দেয়। কিন্তু এই টিন খুব শক্ত। বেড়া ফাঁকা হয় না। বরং ব্যাটের ছাল উঠে যায়। এতে দিশুর আরো রাগ হয়। সে বেড়ার ফুটোর ওপর আরেকটা বাড়ি মেরে আবার হাঁটা দিল। গলির এখানে-ওখানে দলা দলা গু, মুত। তাতে কারো গা নেই। সবাই পা বাঁচিয়ে হাঁটছে। পা বাঁচলেও নাক বাঁচে না তা তারা জানে। তারা নাকে হাত চাপে। তাতে রুচি বাঁচে না তা তারা জানে না। তা তাদের জানার দরকার নেই। তাদের পেট বাঁচানোই বড় দায়। অন্য সব জানোয়ার যেমন। মানুষও এক প্রকার জানোয়ার বৈকি।

তবে শুভ দিশুকে সতর্ক করে দেয়, “ওই যে, গু দেখিস।”

গলিটা এখানে আরেকটা গলির মোড়ে মিশেছে। আর টিনের বেড়াটা একটা দালানের সঙ্গে প্রায় ছুঁয়ে আছে। ফাঁক গলে আগানো কঠিন। দিশু তবু একটা পা গলিয়ে দিল।

ভেতরে ঢুকতে না পেরে টিনের বেড়ায় আবার একটা বাড়ি।

”ওওও, তুমি তাহলে এই কাণ্ড করছ?” মোচঅলা হাশেম এসে পড়েছে।

শুভ ভয় পায়, কিন্তু দিশু চুপ। ব্যাট ঘাড়ে করে মোচের দিকে তাকাল। শুভ আরো ভয় পায়। দিশু কি লোকটাকে পিটাবে নাকি?

হাশেম কী বলবে বুঝতে পারে না। মোচে আঙুল বুলাতে বুলাতে চিন্তা করে। দিশুর কাণ্ড সে অন্য বালকদের সঙ্গে মেলাতে পারছে না।

বালকরা সাধারণত কাজ দেখার কৌতূহলে লোহালক্কড়ের কাছে যায়। কেউ কেউ যায় বল কুড়াতে। একবার রামপুরায় এক খেলার মাঠে দালান বানাতে গেলে একদল কিশোর-বালক ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছিল। পরে অভিভাবকরা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। স্রোতে ভেসে চলা মাছের মতো অভিভাবক। কেউ কি আছে তাদের মানুষ করে রুচি-সংস্কৃতি শেখাবে।

“তুমি কী করতে চাও?” হাশেম বলল।

দিশু তার ব্যাটটা মাথার ওপর তুলে জোরছে এক বাড়ি মারল টিনের বেড়ায়। হাশেম হেসে ফেলে। এতে দিশু বিচলিত হয়েও হয় না। সে বরং আবার বাড়ি মারে। ক বার মারার পর মোড় থেকে এগিয়ে এল স্থানীয় কাউন্সিলর আদম উল্লাহ আর তার এক সঙ্গী। তারা মোড়ের দোকানে এমপি ওসমান আলির সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল।

“কী হয়েছে এখানে?” আদম ধমকে উঠল।

দিশু কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে যায়, কিন্তু আবার বাড়ি মারে।

আদমের ধৈর্য থাকলেও তার সঙ্গী যুবকটা রেগে ওঠে। সে ক্ষিপ্র হাতে ব্যাটটা ছিনিয়ে নিল।

শুভর ভয় লাগে। আদমদের লক্ষণ তার ভালো মনে হয় না। আর দিশু কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে আদমের পথের দিকে।

“চল ফিরে যাই,” খানিক পরে শুভ বলল। তার গলা কেঁপে ওঠে। কিন্তু দিশু ঘাড় শক্ত করে মোড়ের দিকে পা বাড়াল।

মোড়ে ফুটপাতজুড়ে মালেকের চা দোকান। কাঠের বেঞ্চে বসে পায়ের ওপর পা তুলে চা-বিড়ি খাচ্ছে এমপি ওসমান আলি। তার পাশে কাচুমাচু আদম উল্লাহ চায়ের কাপ হাতে। ব্যাটটা তার চেয়ারে হেলান দেওয়া।

দিশু গিয়ে ব্যাটটা যেন ছো মেরে তুলে নিল। এক মুহূর্ত দেরি না করে হাঁটা দিলেও এমপির ইশারায় এক যুবক তাকে ধরে থামায়।

এমপি হেসে বলল, “তুমি এমন রেগে আছ কেন, সোনাপাখি?”

দিশু চুপ। তার মাথার মধ্যে কেবলই ঘুরছে, খেলার মাঠটা কেমন করে খুবলে ফেলল।

এমপি আবার কিছু জিগ্যেস করার আগেই ভুঁউঁউঁউঁ করে একটা প্রাইভেট কার আসে। ধোঁয়া আর ধুলোয় আশপাশ ঢেকে দিয়ে গেলে এমপি আগে হাতটাকে পাখার মতো করে মুখের সামনে বাতাস দেয় আর খুকখুক করে। শীঘ্রই উঠে টিউবে ঢুকে পড়তে হবে, ভাবে সে। তার আগে কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, “কী ব্যাপার, তুমি কি মুখে তালা দিয়েছ নাকি?”

দিশু তবু চুপ। এই লোকগুলো তাকে মার দেবে নাকি? শুভ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল। তারপর ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল। “চল, দৌড় দিই,” দিশুর হাত ধরে কানে কানে বলল সে।

এমপির হাসি পায়, “তোমরা কী শলাপরামর্শ করছ গো?” বালক-আচারে তার কৌতূহল হচ্ছে।

একটা কভার্ড ভ্যান এসে ধোঁয়া আর ধুলোয় আশপাশ ঢেকে দিয়ে থামল।

শুভ চুপ। ভাবছে কী বলবে।


দিশু পেছন ফিরে চায়। অমনি তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটা এখানে কেন?


দিশু হঠাৎ মুখ খোলে। “খেলার মাঠটা… এখন আমরা,” এটুকু বলে থামে চার ক্লাস পড়া দিশু। তারা এখন খেলবে কোথায় এমন কিছু তার চেতনায় ঘুরপাক খায়। ঠোঁটেও এসে পড়ে অনেকখানি। কিন্তু সে চুপই থাকে। এমন কিছু বলার কোনো মানে খুঁজে পায় না যেন। হঠাৎ বরং ব্যাটটা ঘাড়ে তুলে হনহন করে হাঁটা দিল। তারপর গলিটার অর্ধেকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা প্রাইভেট কারের পাছার ওপর জোরছে এক বাড়ি।

শুভ কেঁপে ওঠে। তার বুকের ভেতর থরথর করে। আশপাশে টালুমালু চায়। কারঅলা যদি এখন তাকে মার দেয়? সে তাড়াতাড়ি দিশুর হাত ধরে বলল, “চল, আমাদের মহল্লায় ফিরে যাই।”

দিশু দশ সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়ালেও আবার হাঁটা দেয়। নির্বিকার হাঁটে। একটু এগিয়ে বাঁদিকের একটা গলিতে মোড় নিল। এ গলিটাও তাদের সেই খেলার মাঠে গেছে তা সে জানত। কিন্তু গলির পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা গোটা দশেক সবজি আর ফলের দোকান তাকে বিভ্রান্ত করে। সে ভাবে সে ভুল পথে এসে পড়েছে। তারপর একটু পিছিয়ে বাঁদিকে মোড় নিল। তার মনে হচ্ছে, খেলার মাঠটা এদিকেই আছে। মাঠের পাশে টিনের বেড়াটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু কই সেই খেলার মাঠ বা টিনের বেড়া?

শুভ বলল, “এদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”

দিশু চুপ।

আরো খানিক হাঁটার পর স্ট্রিট লাইট না থাকায় তারা খেয়াল করে সন্ধে লেগে আসছে। এখানে লোকজন বেশি নেই। তারা আবার পেছন ফিরল। কিন্তু সব যেন অচেনা অচেনা লাগছে।

”আমরা কি পথ হারিয়ে ফেলেছি?” শুভ বলল।

দিশু দাঁড়িয়ে আশপাশে চায়। তারপর দিক ঠিক করতে না পেরে আবার পেছন ফেরে। খানিক আগানোর পর দুটি গলি দুদিকে গেছে। দুটি গলিরই দুপাশে আট-দশ তালা বাড়ি। একটার গা ঘেঁষে আরেকটা দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার বাসিন্দাদের আলো-বাতাস লাগে না যেন।

“আমরা এদিকে কোথায় যাচ্ছি?” শুভ দিশুর দিকে তাকাল। কিন্তু দিশু ত মুখই খুলছে না। “এই দিশু! কথা বলিস নে ক্যা?” শুভ তার হাত ধরে ঝাঁকি দিল।দিশু তবু চুপ। সে বুঝতে চেষ্টা করছে সন্ধে লেগে গেছে নাকি। পকেটে মোবাইল ফোনে ঘড়ি আছে। তা তার মনেও পড়ছে না।

আরো একটু হাঁটার পর পশ্চিম দিকের গলিতে ঢোকার সময় দিশু পেছন ফিরে চায়। অমনি তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটা এখানে কেন? দিশু পেছনে তাকাতেই লোকটা উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতে লাগল।


২ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)