হোম গদ্য উপন্যাস সোনাপাখি : শেষ পর্ব

সোনাপাখি : শেষ পর্ব

সোনাপাখি : শেষ পর্ব
310
0

৭ পর্বের লিংক


[৭ পর্বে যা ছিল : অপহরণকারী দলের সদস্য শরিফা, হারুন ও মাসুদ। তাদের মধ্যে শুধু শরিফার বাসা চিহ্নিত করতে পেরেছে এসআই খায়ের। কিন্তু বাসাটা শরিফার স্বামী ফয়জুল ওরফে ফজার নামে ভাড়া নেওয়া। এসআই খায়ের তার বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েছিল। শুভ-দিশু আছে হাসপাতালে]


শেষ পর্ব :

মাওয়া ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে দিশুর মুঠোফোন থেকে তার মাকে কল করল হারুন। বলল, “বিকাশ এজেন্টের নাম্বার দেওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাবেন।” তারপর সে মাসুদের সঙ্গে মাওয়া বাসস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ায়।

দিশুর মামা-চাচারা মসজিদ মোড়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফটফট করছে। এসআই খায়েরও আছে তাদের সঙ্গে। সে তার মটরসাইকেলে তেলের ট্যাংকির ওপর উপুড় হয়ে ঝিমাচ্ছে। দিশুর মা মুঠোফোন কানে চেপে হ্যালো হ্যালে করছে। লাইন কেটে গেছে বুঝতে পারছে বটে। কান্নার চাপে তার ঠোঁট-মুখ বেঁকে যাচ্ছে। মুচড়ে যাচ্ছে। তবু সে হ্যালো হ্যালে করেই যাচ্ছে। তারপর সে কল ব্যাক করার চেষ্টা চালায়। সে বলতে চাচ্ছিল, বাবারা ভাইরা, আমার কথাডা এটটু শোন। তুমরা যা চাও তাই দেবো। আমার—। “ও আললা গো, আমি এহন কী করব গো!” কী করবে তা না জানলেও শেলি দোড় দিল। এক জায়গায় সে দাঁড়িয়ে থাকবে কী করে। তবে তার ভাই তাকে ধরে ঠেকায়।

মামা-চাচারা পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে। মামা গেল বিকাশ এজেন্টে টাকা পাঠাতে।

দিশুর বাবা নাবিস্কো থেকে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ৩৫ হাজার টাকা তুলে এনে রিকশা থেকে নামল। তার সহকর্মী সোহেল রানা ১২ হাজার টাকা আর নিজের মটরসাইকেল নিয়ে ইতোমধ্যে এসে পড়েছে।

তারা সবাই মিলে ৮৫ হাজার টাকা জোগাড় করতে পারল। কিছুতেই এক লাখ টাকা পুরোতে না পেরে তারা দিশুর খালা-ফুপুদের ফোন করে।


“তাহলে ঘণ্টা তিনেক আগে মারা গেল কিভাবে?” ডাক্তারের এমন প্রশ্নে শরিফা চোখে শর্ষেফুল দেখে।


সব মিলে এক লাখ নয় হাজার টাকা নিয়ে অপহরণকারীদের খুশি করতে চায়। বাসার সামনে মটরসাইকেল নিয়ে রেডি। অপহরণকারীরা বলার সঙ্গে সঙ্গে রওনা হবে।

তারা এখন হারুন-মাসুদের হুকুম মতো চলছে। হাজার হাজার বছর ধরে মেধাবী-সভ্যরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছে যেখানে তারা কাজের লোকদের ঠেঙিয়ে মাটিতে মিশিয়ে রাখে আর মাঝেমধ্যে তারা সুযোগ পেয়ে মেধাবী-সভ্যদের নাকে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে বেড়ায়।

যদিও র‌্যাব-পুলিশ বলে দিয়েছে, টাকা দিলেই শিশুদের পাওয়া যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এসআই খায়ের ত দিশুর মামা সেজে অপহরণকারীর কাছে যাওয়ার জন্য তৈরিও হয়ে আছে। কিন্তু স্বজনরা কেউ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

“পুলিশ যতই মামা সাজুক,” চাচা বলল, “সরকারি লোকজনের ভাবসাব দেখলেই বোঝা যায় লোকটা সাধারণ না অসাধারণ। তারপর তারা হয়তো খেপে গিয়ে বাচ্চাদের ক্ষতি করবে।”

এসআই খায়ের তার মুঠোফোনের রিং শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল। “হ্যালো!”

“সার, আমি এএসআই মইন, সারিয়াকান্দি থানা, বগুড়া।”

“হা, বলেন।”

“আমরা সার ফজার বাড়ি গিছিলাম। সেই ব্রহ্মপুত্রর চরে, সার। তা দেখি যে ফজা মাদারচোত দুকানের বেঞ্চে বসে আছে। দেখি যে হালায় ঠ্যাঙের পর ঠ্যাং উঠোয় দিয়ে চা-বিড়ি খাচ্ছে আর আড্ডা দেচ্ছে।”

“আসল ঘটনা বলেন। বাচ্চাদের বিষয়ে কী বলল?”

“তা সার, সে দেখি যে পুলিশ দেখে একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খায়া গেল। তবু সার আমি তার পাছার উপর মারলাম দুই লাথি। তা হালায় হাউমাউ কইরা কান্দে আর পুলিশের পা জড়ায়া ধরে সার।”

“আমি জিগাই বাচ্চাদের কথা কী বলল?”

“তা সার, সে কয় যে সে ত এক সপ্তা আগে বাড়ি আইছে। সে কিছু জানে না। তা সার, গ্রামের লোকজনও কয় যে, হা সে ত এক সপ্তা আগে বাড়ি আইছে সার।”

“ফোনটা তাকে দেন,” এসআই খায়ের বলল। তারপর ফয়জুলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তার স্ত্রীর নাম, শরিফা, ফোন নম্বর, বাপের বাড়ির ঠিকানা নিল। ফয়জুল-শরিফার সব আত্মীয়-স্বজনের ঠিকানা নিয়ে দিশুর বাপ-চাচাদের বলল, “কাজ হচ্ছে।”

খানিক চিন্তা করে খায়ের আরো বলল, তার এখন লৌহজং যাওয়া উচিত। কিন্তু—।

“আপনারা ত জানেন আমি সারারাত ঘুমাই নাই। এখন মটরসাইকেলে গেলে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। বাসে বহুত সময় নষ্ট হবে। ত একটা প্রাইভেট কার বা মাইক্রো-টাইক্রো কিছু একটা ভাড়া করলে ভালো হয়। কিন্তু সরকার ত এত টাকা দেবে না। এখন আপনারা—!”

দিশুর মামা চার হাজার টাকা দিল।

খায়ের বলল, “আর দুই হাজার দেন। খরচ না হলে ফেরত পাবেন।” তারপর সে মটরসাইকেলে উঠতে উঠতে শরিফাকে ফোন করে কিন্তু রিং হবার আগেই কেটে দেয়। ফোন করলে শরিফা সতর্ক হয়ে যাবে। খায়ের বরং লৌহজং থানায় যোগাযোগ করল।

পুকুর পারে লৌহজং থানায় ওসির রুমে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে কোমরে দড়ি বাঁধা শরিফা। দুই নারী সিপাই দড়িটা টানটান করে ধরে রেখেছে। ওসি মোবাইল ফোনে কথা বলছে।

ঘণ্টা খানেক আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার শুভকে মৃত ঘোষণা করলে শরিফা কান্নায় ভেঙে পড়ে বটে, কিছুক্ষণ পরে লোকের ভিড়ে পালানোর চেষ্টা করে। সে জানত না ডাক্তার তাকে নজরে রাখছিল। বাচ্চাদের ‘হাতে-পায়ে দাগ কিসের’ এ প্রশ্নে সে ঘাবড়ে গেলেও ডাক্তার খেয়াল করে নি। ফলে তার মনে সন্দেহ উঁকি দেয় নি। তারপর বাচ্চাদের নাম জিজ্ঞেস করলে শরিফা আবার ঘাবড়ে যায়। তবে দুটি নাম সে চটপট ঠিকঠিক বলে ফেলে। সে বলে, তাদের নাম রফিক-শফিক।

সে ধরা খায় যখন সে বলে, সে নদীর ঘাট থেকে ফিরে এসে দেখে যে বাচ্চারা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তখন ডাক্তার আবার প্রশ্ন করে, নদীর ঘাটে যাওয়ার সময় বাচ্চারা কী করছিল?

“খেলাধুলা করছিল!” শরিফার গলা কাঁপে। ডাক্তার খেয়াল করলেও সন্দেহ করে নি।

কতক্ষণ পরে শরিফা নদীর ঘাট থেকে ফিরে আসে?

“ঘণ্টা খানেক!”

এবার ডাক্তার নিশ্চিত, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। সে বলে ফেলে, “তাহলে ঘণ্টা তিনেক আগে মারা গেল কিভাবে?” ডাক্তারের এমন প্রশ্নে শরিফা চোখে শর্ষেফুল দেখে। সে তখন ‘ও আললা গো, আমার কী হবে গো’ বলে কানতে কানতে বসে পড়ে। তারপর লোকের ভিড়ে পালানোর চেষ্টা করলে নার্সরা ধরে পুলিশে দেয়।

থানার ডিউটি অফিসার হানিফ মিয়া দোড়োয় এসে ওসিকে একটা মুঠোফোন হস্তান্তর করল, “সার, ঢাকার তেজগাঁও থানার একজন এসআই ফোন করেছেন।”


শরিফা ভাবছে পুলিশ সব জানে। কিভাবে জানল? সে ভেবে পায় না।


ওসি মুঠোফোন কানে মিশিয়ে এসআই খায়েরের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে আসতে বলে। শিশুদের বাবা-মাকে নিয়ে আসার কথাও মনে করিয়ে দেয়। তারপর শরিফার দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সিপাইদের বলল, “উনাকে বাইন্ধে রাহিছেন ক্যা? ছাড়েন। উনি কোনো দোষ করে নি।”

সিপাইরা থতমত খায়। তারা শরিফাকে ছেড়ে দিলে ওসি তাকে চেয়ারে বসতে বলে আর পিয়ন ডেকে চা-নাশতার হুকুম। তারপর অমায়িক ভঙ্গিতে বলল, “ওরা যে আপনাকে ব্যবহার করছে তা কি আপনি টের পাচ্ছেন?” ওসি এমনভাবে বলে যেন সে নিশ্চিত শরিফা একা কিছু করছে না। এটা হলো চাতুরি। শাসন করতে হলে এমন নানা ছলাকলা শিখতে হয়।

শরিফা ভাবছে পুলিশ সব জানে। কিভাবে জানল? সে ভেবে পায় না। তবে সে নিজে মুক্ত হতে পারবে বলে তার মনে আশা জাগে।

পিয়ন চা দিয়ে গেলে ওসি নিজে একটা কাপ নিয়ে বলল, “নেন। চা খান।”

শরিফা হাত বাড়াতে সাহস পেল না। সে বরং কী বলবে তাই ভাবছে। তবে ওসি যখন বলল, শরিফার স্বামীকে মানে ‘ফয়জুলকে বগুড়ার সারিয়াকান্দির বাড়ি থেকে পুলিশ আটক করেছে’ তখন শরিফা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে পুলিশ সব জানে। তার বিস্ময়ের সীমা থাকল না।

“ত এতে আপনার কোনো সমস্যা নেই,” ওসি বলল, “ওরা আপনাকে ব্যবহার করছিল। চা খেয়ে বাড়ি চলে যান। এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলে ওরা আবার আপনাকে ধরবে।”

শরিফা গলে যায়। সে হাউমাউ করে উঠে ওসির পা জড়িয়ে ধরে, “সার, ওরা আমারে মাইরে ফেলবে। আপনি আমারে বাঁচান!”

ওসি ‘আহা কী করে কী করে’ বলতে বলতে পিছিয়ে দাঁড়াল। নারী সিপাইরা শরিফাকে ধরে চেয়ারে বসালে ওসি আবার বলল, “তুমার কোনো ভয় নেই। তুমি বাড়ি চলে যাও।”

আহা কী অমায়িক!

শরিফা সসংকোচে উঠে দাঁড়াল।

ওসি বলল, “ওরা কারা?”

“একজন হলো হারুন। তার বাড়ি পাইকারা গ্রামে। আর একজন হলো মাসুদ। তার বাড়ি কনকসার বাজারের পাশে।”

“দুইজনই কাছাকাছি আছে দেখছি। ত এখন তারা কোথায়?”

“বাড়ি থাকার কথা সার।”

ওসির কথা মতো শরিফা মাসুদকে ফোন করল। তার গলাটা একটু কেঁপে উঠলেও মাসুদ খেয়াল করে না। “দুইজনই মাসুদের বাড়িত আছে,” ফোনালাপ শেষে শরিফা বলল।

ওসি সবার ফোন নম্বর আর ঠিকানা টুকল তার নোটবুকে। “ঠিক আছে,” শরিফাকে বলল সে, “আপনি এবার একটু রেস্ট নেন। আর আমি একটু আসতিছি।” ওসি তার রুম থেকে বের হয়ে এসআই আশরাফকে সব খুলে বলল। তারপর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার হস্তান্তর। “এবার সিভিল ড্রেসে দ্রুত চলে যান।”

পুলিশ তাদের হাতকড়ায় আটকে, কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে আসে। মানুষকে এভাবে অপদস্থ করার জন্যই কিছু লোক রাষ্ট্র গঠন করেছে যেখানে অপরাধ সৃষ্টির সব বন্দোবস্ত আছে। অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য আছে কঠোর প্রতিযোগিতা আর সংযম সাধনার বিধান।

আরো ঘণ্টা খানেক পরে আসে এসআই খায়ের। ওসিকে স্যালুট দিয়ে আসামিদের দিকে চায় বিজয়ীর হাসিমাখা চোখে। জাস্ট দেখে রাখার জন্য। অন্য কিছু না।

“শিশুদের বাবা-মায়েরা কই?”

“তারা হাসপাতালে গেল, সার।”

“চলেন, আমরাও যাই,”ওসি গাড়ির দিকে পা বাড়াল।

গাড়িটা হাসপাতালের বারান্দার সামনে গিয়ে শুভর মায়ের আকাশ বিদীর্ণ করা কান্নার মধ্যে ডুবে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

শুভ-দিশুর বাবা-মায়েরা একসঙ্গেই এসেছে। একসঙ্গেই হাসপাতালে ঢুকেছে। রোগীর বিছানায় কেবল দিশুকে দেখে শুভর মা ভেবেছিল শুভকে অন্য কোথাও রাখা হয়েছে। কিন্তু নার্সদের আলাপে ‘যে মরে গেছে সে মনে হয় উনার ছেলে’ শুনে সে উন্মাদের মতো ছুটোছুটি শুরু করে আর হাহাকার, “আমার শুভ কই? আমার শুভরে তুমরা কুহানে রাহিছো গো!”

রোগীর বিছানায় দিশু তার মাকে জড়িয়ে ধরে শুভর মায়ের দিকে চেয়ে রয়েছে। ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসছে। শুভর কথা মনে পড়ছে একটু একটু। শুভ আর সে তাদের খেলার মাঠটা ঘিরে রাখা টিনের বেড়ার পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মোচঅলা লোকটা খুব খারাপ। সে তাদের খেলার মাঠটা নষ্ট করে ফেলল। হাদি ভাইয়া সব মহল্লায় পুকুর চাই আন্দোলন শুরু করছে। ‘কিন্তু পুকুরের চাইতে—!’ দিশু ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে অস্পষ্ট স্বরে বলে, ‘আগে একটা—!’ খেলার মাঠ তার মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠোঁটে এসেও আসছে না। আসছে শুধু ঘুম। আর ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া সেই লোকটা। সে তাদের সামনে এসে মূর্তির মতো দাঁড়াল। শুভ হাত বাড়িয়ে দিশুর একটা হাত চেপে ধরছে। আরো ঘুম আসছে। ঘুমে তলিয়ে গেল সে। ঘুম থেকে জাগার পর অন্তত একটা কাজ তাকে করতে হবে। বন্ধুর মৃত্যুর খবর শোনার কাজটা।


দিয়া-রহিম বাসচাপায় মারা পড়ার ঘটনায় শিশু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।


দিশুর মা শুভর মাকে কী বলবে ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়াল। দিশুর বাপকে ছেলের কাছে বসতে বলে সে গিয়ে শুভর মাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু শুভর মায়ের জান কবচ হতে থাকা দেহটা এমন ছুটোছুটি করে যে সে তাকে ধরে রাখতে হিমশিম খায়। কী বলবে বুঝতে পারে না। মৃত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কোনো মা বিলাপ করলে কারো কিছু বলার থাকে না। এমনকি সান্ত্বনা দেওয়াও অন্যায়! শেলি বরং চুপচাপ শুভর হৈচৈ শোনে। শুভ তার চোখের সামনে কোলাহল করে করে উঠছে। “এই হিসু!” দিশুকে হিসু বলে ডাক দিল জানালা বেয়ে উঠতে উঠতে। জানালার পর্দা ঝুলানো রডটা তার চাই! পর্দা ফেলে দিয়ে রড খুলে নেবে! কী সাংঘাতিক! এটা যেন তাদের বাসা! নিজেদের বাসায় মায়ের শাসন আছে। দিশুদের বাসায় কোনো শাসন নেই। শেলি কেবল ঠেকিয়ে দেয়। মুখ বুজে থামিয়ে দেয়। দিশু আর দৈনিক বিকেলে ক্রিকেট ব্যাট ঘাড়ে করে বের হয় না। ঘরের কোণে তার গোলাপি ব্যাটটায় ধুলোর স্তর জমছে। শেলি মাঝে মাঝে মুছে রাখে আর ভাবে বাথরুমের ওপরের লকারে ঢুকিয়ে রাখবে।

হাদির স্বাস্থ্যকর নগর আন্দোলন ঝিমিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে একটা স্টাটাস দেওয়ারও মুড নেই। যদিও শুভ তার কানের মধ্যে দৈনিকই বলে, ভাইয়া, খেলার মাঠ চাই আন্দোলন শুরু করবা কবে? দিশু কোনো আবদার করে না। সে সব সময় চুপ থাকে। হাদি এসব নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস লিখবে লিখবে করছিল। মুড আসছিল না।

এরই মধ্যে খবর এল, তাদের বন্ধু, সাবেক সহপাঠী, দিয়া-রহিম বাসচাপায় মারা পড়ার ঘটনায় শিশু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।

হাদি নড়েচড়ে বসল। আরো বহু শুভ আছে। দিশু আছে। ‘আমি এভাবে চুপ হয়ে যেতে পারি না,’ সে বিড়বিড় করতে করতে উঠে দাঁড়াল। ঢাকা স্যুট পরবে কিনা ভাবল কিছুক্ষণ।

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)