হোম গদ্য উপন্যাস রুজানা এখন কী করবে : ৫

রুজানা এখন কী করবে : ৫

রুজানা এখন কী করবে : ৫
437
0
৪ পর্বের লিংক

পর্ব- ৫

রাতে ভাত খাওয়ার পর আমি রুজানাকে বলে রাখলাম, ‘সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমাকে ডেকে দিস ত।’ একেবারে হুকুম। ত এমন হুকুম আমি তাকে দিতে পারি বৈকি।

‘আপনার ঘড়িতে অ্যালার্ম নেই?’

‘অ্যালার্ম থাকলেও ডাকা যায়। অ্যালার্মের সঙ্গে ডাকাডাকির সম্পর্ক নাই।’

‘অত সকালে জেগে কী করবেন?’

‘আমার ইচ্ছা।’

‘আমার ইচ্ছা নেই। বিয়ে করেন। বউ ডেকে দেবে।’ বলল বটে, সময় মতো হাজির হবে আমি জানি। আমি ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে সোয়া পাঁচটায় উঠে দরজা খুলে রাখব।

রুজানা এসে পুরো এক গ্লাস পানি ঢেলে দিল আমার মুখের উপর।

আমি ত জেগেই ছিলাম। সুতরাং চুপ। এই মুহূর্তে ভাবলাম, ওকে আমি করব না। দরকার হলে শিরি ত আছেই।

‘দরজা যেহেতু খোলা সেহেতু আমি নিশ্চিত আপনি জেগে আছেন,’ বলল সে।

দরজা খুলে রেখে ভুল করেছি?

না খুললে হয়তো কড়া নেড়ে দরজা থেকেই ফিরে যেত।

তবু ডাকলে আসত ঠিক।

রুজানা কাতুকাতু দিতে শুরু করল। আমি খপ করে হাত বাড়াতে পারি। তবে আমি শুধু তার বুকের ঘ্রাণ নিতে চাই। শুধু নাক ঘষা আর চুমা।
সে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, ‘হচ্ছেটা কী শুনি?’

‘নষ্ট হবি না? আচ্ছা ঠিক আছে। যা।’


আমি একটা অপক্ব চোর? ভাবনা শেষ হবার আগেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।


আজ থেকে এই কাণ্ড চলবে সময়-অসময়। যত বার একা দেখা হবে। আমি ভাবলাম ওকে আমি অতিষ্ঠ করে তুলব। উমা, দিন দুই যেতে না যেতে আমার নাভির নিচে হাত বাড়িয়ে বলে কিনা, ‘এখানে কিছু নেই নাকি।’

‘আমাকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে?’

‘তবে কি ওই বাচ্চা মেয়েগুলোকে নষ্ট করা হচ্ছে?’

আমি চমকে উঠলাম। ওদের কথা মনে পড়ল কেন জিগাতে গিয়েও চুপ থাকলাম। কিন্তু কিছু একটা ত বলতে হবে। বললাম, ‘ওরা কেন? তুই ত আছিস। আছিস না?’

‘আপনি খুব ক্রিটিক্যাল। আপনার সাইকোলজি বোঝা মুশকিল।’

আমি চুপ। ভাবছি কী করা উচিত। এ সময় প্রথম চোখে পড়ল, সে তার ওড়না পরার স্টাইল বদলে ফেলেছে। মাঝখনটা ঘাড়ে বাঁধিয়ে দুই মুড়ো বুকের উপর দিয়ে নিয়ে ঊরু পর্যন্ত ঝুলানো। সাথে যোগ হয়েছে ছেলেদের বেল্টঅলা স্যান্ডেলের আদলে তৈরি শক্ত চামড়ার স্যান্ডেল। এই স্যান্ডেল তার হাঁটার গতি দ্বিগুণ বাড়িয়েছে।

‘এ রকম স্যান্ডেল কি বাজারে পাওয়া যায়?’

‘না। অর্ডার দিয়ে বানাইছি।’

‘তোদের দেখাদেখি ভবিষ্যতে বাজারেও আসবে নিশ্চয়।’

‘ভালো একটা গল্প মনে পড়ল।’

‘কী—?’

‘সবার সামনেই বলি,’ রুজানা মুচকি মুচকি হাসছে।

আমি তাকে পাত্তা দিলাম না। গল্প ত গল্প।

‘আচ্ছা এখনই বলি। সবার সামনে বললে আপনি হয়তো লজ্জা পাবেন।’

‘তা হোক। সবার সামনে বলিস।’

‘না। এখন বলি। টিপুর গল্প শুনিছেন?’

আমি চমকে উঠলাম। বুকের ভিতর কেঁপে উঠল নাকি। কিন্তু রুজানা মুচকি মুচকি হাসছে। তার হাসির সাথে আমাকে এখন তাল মেলাতে হবে?

আমি মজা করে হাসি। ‘টিপুর কী গল্প বলতে চাস? নুনু কাটার গল্প?’

‘আপনি জানেন নাকি?’

‘ত ঠাস করে কেন ওই গল্পটা মনে পড়ল?’

‘যেভাবে শুধু হাতাহাতি করেন—! সন্দেহ করা অমূলক নাকি?’

‘আবার উসকে দেওয়া হচ্ছে?’

‘তাহলে আপনিই বলেন, আমার সাথে যে খেলাটা খেলছেন, সেটা কেন?’

আমি হাসি। আর সাথে সাথে আবার একবার। কিন্তু সে যেন তৈরি হয়েই ছিল। আমি তার নিচের ঠোঁটটা সুড়ুৎ করে মুখের ভিতর নিতেই হাত বাড়িয়ে ‘উয়াও’। বলে কিনা, ‘আছে ত। তবে কি এটা ড্যামেজ হয়ে গেছে?’

আমি ওকে ড্যামেজ হয়েছে কিনা দেখার সুযোগ দেবো না। প্রথমে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াব। ডানার নিচে দিয়ে হাত বাড়িয়ে পিঠের উপর হাতের তালু।

ছাড়ানো দশ আঙুল। বুকের সাথে বুক জোরে চেপে ধরব আর সারামুখে ঠোঁটের চিহ্ন এঁকে দেবো। কিন্তু রুজানা যেন ফুড়ুত করে উড়ে গেল। তারপর দেখা হলেই সুর তুলে বলতে লাগল, ‘বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। যেদিন পড়বা ফাঁদে সেদিন বুঝবা কত ধানে কত চাল।’

আমি চিন্তায় পড়ছি। শিরিকে যে করছি তা কি সে টের পাচ্ছে।

টের পেলে ত ক্ষুব্ধ বা মনঃক্ষুণ্ন হবার কথা।

তা ঠিক, আমি কি জানিনে আমি তার কে।

আরো কথা আছে। টের না পেলে এমন কথা কবে কেন।

ভারি চিন্তার বিষয়। সঠিক উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছিনে।

তুমি অযথা ভাবছ। চোরের মন পুলিশ পুলিশ।

আমি একটা অপক্ব চোর? ভাবনা শেষ হবার আগেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। ‘ঘুঘু ধান খাবে না ত—। ঘুঘু তাহলে খাবেটা কী?’

‘কিন্তু ফাঁদের বিপদটা ত তাকে ভাবতে হবে, নাকি হবে না?

‘এই ফাঁদটাই ত অন্যায়।’

রুজানা চোখ বড় করে তাকাল, ‘কোন ফাঁদটা অন্যায়?’

আমি মুখে খিল এঁটে দিলাম। বেশি কথা বলতে গেলে বেফাঁস কিছু বেরিয়ে যেতে পারে। সত্য বেরিয়ে পড়তে পারে? রুজানা হঠাৎ মুখ ভার করে বলতে লাগল, ‘ওদের হার্ট এখনও হার্ড হয় নি। আপনি যেভাবে ওদের সাথে মিশছেন, কথাবার্তা বলছেন, কেউ যদি প্রেমে পড়ে যায় তা কি ভালো হবে?’

‘কিন্তু আমি ত মনে করতাম যে ওরা যথেষ্ট হার্ড।’

সাথে সাথে রুজানার মুখ কালো হয়ে গেল। ‘আগে মনে করতেন। এখন মনে করেন না কেন?’

এই রে—! ধরা খেয়ে গেছি নাকি।

‘এখন কী ঘটেছে যে এখন আর মনে করেন না?’

ধরা খেয়ে গেছি। কী বলি কী বলি। কিছু একটা ত বলতে হবে। ‘আগে মনে করতাম, এখন মনে করি না তা না। “করি” বলতে গিয়ে “করতাম” বলে ফেলেছি। অন্য কিছু না।’

রুজানা চুপ।

‘তুই মনে হয় কিছু একটা কল্পনা করে দুশ্চিন্তায় পড়েছিস।’

‘আমি কী কল্পনা করেছি?’

‘তা আমি কেমনে জানব’ মুখে এসে পড়লেও চেপে যেতে পারলাম। কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করা যাক। এবার বলা যায়, ‘রিল্যাক্স।’ আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম, ‘কী হয়েছে অথবা কী ভাবছিস খুলে বল।’


‘যেহেতু এটা, মূলত এবং প্রধানত, প্রজননের প্রশ্ন, মেয়েদের চাওয়া ও ইচ্ছাই প্রাধান্য পাওয়া উচিত।


রুজানা আবার আমার দিকে ক্যামেরার ক্লিকের মতো তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে চলে যাচ্ছে। সে আমাকে সরাসরি অভিযুক্ত করার কোনো ভিত্তি পাচ্ছে না। কিন্তু সে বুঝতে পারছে নিশ্চয়। সাংঘাতিক মেয়ে বলে কথা! বিষয়টা আমাকে চিন্তায় ফেলল। তার ওপর শিরিনার প্রশ্নটা, ‘দেহকে নিছক উপভোগের বস্তুরূপে ব্যবহার… এটা কি ঠিক হচ্ছে?’ অদ্ভুত প্রশ্ন। জীবনে কোনো দিন এমন প্রশ্ন শুনেছি? আবার একই প্রশ্ন পরপর দুইদিন। তবু পাত্তা দিই নি। বিষয়টা ভাবা দরকার।

‘তোর আসলে হয়েছেটা কী?’

শিরিনা অস্বস্তি বোধ করছে। তার মুখটা আগের মতো আর হাসিখুশি দেখি না। আমি তাকে আশা দিচ্ছি না, স্বপ্ন দেখাচ্ছি না, এটা একটা কারণ? আরো চাপাচাপি করলে শিরিনা বলল, হিমেল তাকে বিয়ের জন্য পাগল করে ফেলছে।

শিরিনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘ছেলেরা এটা এত বেশি চায় কেন?’

‘হিমেল চাচ্ছে?’

শিরি চুপ।

‘তুই চাস না?’

‘যেহেতু এটা, মূলত এবং প্রধানত, প্রজননের প্রশ্ন, মেয়েদের চাওয়া ও ইচ্ছাই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কিন্তু ছেলেরা—!’ শিরিনার চোখ আমার মুখের দিকে। এই চোখে বিমর্ষতা, বিষণ্নতা, হতাশা মাখা প্রশ্ন।

প্রশ্নটা আমাকে পীড়িত করছে। আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। সে কি একে এখনও উপভোগ মনে করতে পারছে না। তাই বা কেন। সে যেভাবে চুমু খায়, আমার মুখ থেকে বুক পর্যন্ত একেবারে যেন ললিপপের মতো খেয়ে ফেলতে চায়। আমার অস্বস্তি লাগলেও ত আমি তা প্রকাশ করি নাই। তবু—।

‘এটা এখন আর, মূলত বা প্রধানত, প্রজননের প্রশ্ন না। প্রজনন এখন, মূলত এবং প্রধানত, পরিকল্পনার অংশ। তাই এটা এখন উপভোগ্য।’ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ব্যাখ্যা করলাম। তবু শিরিনা আমাকে আমল দিল না অথবা আরো চিন্তায় পড়ল। তাকে সব সময় বিমর্ষ দেখতে দেখতে আমি থ হয়ে যাচ্ছি।

আমি কি তার এমন কোনো অভিজ্ঞতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি যা তার স্মৃতি না হয়ে দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে। সে কি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে? তা ত হবার কথা না।

‘রফির বউ—!’ শিরিনা কদিন চিন্তার পর মুখ খুললেও কথা শেষ না করে চোখ নামিয়ে নিল।

মধ্যরাতে খাট থেকে পড়ে রফির পোয়াতি বউ এখন হাসপাতালে। পাকা রাস্তা হবার আগে তার মতো অবস্থায় পড়লে পোয়াতিরা গরুর গাড়িতে হাসপাতালে যেতে যেতে মারা পড়ত। কাঁচারাস্তা হবার আগে নৌকায়। হাসপাতাল হবার আগে ঘরেই।

ত মানুষের খারাপ অবস্থায় মাুনষের ত খারাপই লাগে। তাই বলে এ মুহূর্তে আমরা যা নিয়ে চিন্তিত তার মধ্যে কি রফির বউ আসতে পারে? আমি ভাবলাম শিরিনা হয়তো প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। তাই আপাতত রফির বউই আলোচনার বিষয়। ‘রফির বউর অবস্থা খারাপের দিকে?’

কিন্তু শিরিনা আবার প্রসঙ্গ পাল্টাল। ‘আপনাকে না বলতে পারি না কেন?’ তার মুখে লাজুক হাসি।

আমি বিরক্ত হই বারবার এক প্রসঙ্গের মধ্যে আরেক প্রসঙ্গ আনে বলে। তবু জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আমাকে তোর না বলতে ইচ্ছে করল কেন? না বলতে পারছিস না কেন?’

শিরি চুপ। খানিক চাপাচাপি করেও তার মুখের খিল খুলতে না পেরে আমি আরো দুশ্চিন্তায়। আমাকে ‘না’ বলতে পারে না বলেই দিয়ে যাচ্ছে—! তার মানে তার ইচ্ছা নাই। আমার এখন কী করা উচিত।

কদিন চিন্তার পর শিরিনা বাদ। রুজানা ত আমার দিকেই চেয়ে আছে। ‘এই রুজা, ঘুমানুর আগে আসিস ত, লক্ষ্মীসুনা।’

রুজানা চোখ বড় করে তাকাল। আমার মতলবটা কি বুঝতে পারছে?

আগের দিনের কথা মনে আছে নিশ্চয়।

দেখা যাক কী হয়।

রুজানা ঠিকই আমার ঘরে ঢুঁ মারল।

তা ত সে মাঝে মাঝেই মারত। কদিন বিরতি ছিল এই যা।

‘চলেন, ছাদে যাই।’

‘চল, বিলে যাই। অনেক কাল জোছনা দেখি না।’

‘লাইট অফ করে ছাদেও জোছনা দেখা যায়,’ বলল সে।

কিন্তু সে মোটে একবার। দ্বিতীয়বার রুজানা কিছুতে নড়ল না। পরের দিনও না। দিন দশেক পরে একদিন মূলত সে-ই আমাকে, একেবারে টায়ে টায়ে করল। আমার ঠোঁট দুটো যেন সে একেবারে চকলেটের মতো খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল।

কে বলে নারীরা ভোগ করতে শেখে নাই। দু-একজন শিখেছে?

আমি ভাবলাম সে হয়তো দেখতে চায় আমি তাল দিই কিনা। সুতরাং ভালো না লাগলেও চুপ থাকতে হলো। সমান অধিকার বলে কথা। যদিও আমি ভয়ে থাকি যে, তার সাথে এই মাখামাখি আমার বাপ-মার নজর এড়াচ্ছে না নিশ্চয়। তারা অপেক্ষায় আছে, যদি একটা কিছু হয় ত হয়ে যাক। তাহলে আমি সংসারী হয়ে তাদের মনে শান্তির কারণ হতে পারি। আর তারা তাদের বংশরক্ষার দুশ্চিন্তা দূর করতে পারে। আর রুজানা আমাকে আটকে ফেলতে পারে?

না, এসব ভাবতে ভালো লাগে না। বিষয়টা কেমন অরুচিকর। নোংরাও বটে। একই জিনিস আমার কাছে এক রকম আর তাদের কাছে আরেক রকম। মাদারচোত দর্শন।

ভালো লাগে না।

আমি বাড়ি এলাম যেজন্য সেসব কিছুই হচ্ছে না। সকালে চাষবাস দেখা অথবা দাবা খেলা, বিকেলে ফুটবল অথবা বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, সন্ধেয় বাউল গানের আসর অথবা—। সেসবের কোনো পরিবেশই তৈরি করতে পারছি না। সবাই বাজারের দোকানে বসে টিভি দেখেই বেশি মজা পায়। আমার ভালো লাগে না। ভালো লাগে না। আমি এখন কী করব।

এই বয়সে সব সময় এতগুলো মেয়ে আশপাশে ঘুরঘুর করলে অন্য কিছু ভালো লাগে নাকি।

তাহলে আমি এখন কী করব।

রুজানাকে বিয়ে করে ফেল।

কেন।

এত কেন কেন কর কেন, হা?

তাহলে এখন আমার কী করা উচিত।

শিরিকে বিয়ে করে ফেল।

তারপর?

পরের ভাবনা পরে কর না কেন।

মাদারচোত চিন্তা একখান।

আসলে আমার দরকার হলো—। আমার আসলে কী দরকার।

ভাবা যাক।

শিরিকে সেই প্রশ্নটা করতে পারি। আগে তুই তীব্রভাবে চাইছিস। এখন চাস না ক্যা?

এমন প্রশ্নের কোনো মানে হয় না। হয়তো কৌতূহল হয়েছিল। হয়তো উসকানি পেয়ে ভালো মতো চেখে দেখার লোভ হয়েছিল।

তবু আরেকটা প্রশ্ন, ‘মন চায় না?’

‘মন ত কত কিছু চায়। পাগল মন—।’

আমি চুপ। ভুল হয়ে গেছে। এমন প্রশ্নের কোনো মানে হয় না।

‘মন হয়তো চায় না। হয়তো মোহিত হয়। হয়তো আকৃষ্ট হয়।’ শিরিনা লাজুক হাসে, ‘নিসর্গের সান্নিধ্যে মন কী করে? মোহিত বোধ করে, তাই না?’

‘বাঃ তুই ত দেখছি রুজানার মত অনেক কথা বলা শিখেছিস।’


শিরিনার চোখের দিকে তাকালাম। তার আবেগ, অনুভবের বোধ, চিন্তার ক্ষমতা আমাকে অভিভূত করছে।


‘গান গাইতে পারেন?’ শিরিনা হঠাৎ হেসে ফেলল যখন একদল কচিকাঁচা হাজির। সে তাদের দৈনিক বিকেলে গান শেখায়। অবশ্য শেখানোর চাইতে নিজেই বেশি গায়। মাঝে মাঝে “আমি কার পথচেয়ে” দুইতিন কলি গেয়ে ফেলে। তাও কি আপন মনে, রীতিমতো স্টেজের মতো গলা ছেড়ে। এই গানে আমি খুব চিন্তিত হই।

‘কে সে যার পথচেয়ে থাকিস?’

‘জানি না,’ শিরিনা লাজুক হাসে কিন্তু তার চোখ থেকে পানি ঝরে পড়ল টপটপ করে। এই পানি আমাকে অবাক করল। তার মনের মধ্যে কিসের কষ্ট লুকিয়ে আছে যা সে বলছে না আর আমি কিছু অনুমানও করতে পারছি না।

ওড়নায় চোখ মুছে আরো জাঁকিয়ে গেয়ে উঠল, ‘তুরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই—।’ কিন্তু সাথে সাথে আবার চুপ।

‘কী হলো?’

‘হঠাৎ মনে হলো বাচ্চাদের এই গান শেখানো ঠিক না।’

‘আমরা করব জয়—’।

‘মন সায় দেয় না।’

‘কেন?’

‘আমরা কী জয় করব?’

‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই—।’

‘মন সায় দেয় না।’

‘মন কী বলে?’

‘সেটাই ত খুঁজছি।’

আমি শিরিনার চোখের দিকে তাকালাম। তার আবেগ, অনুভবের বোধ, চিন্তার ক্ষমতা আমাকে অভিভূত করছে। ‘আমার মনে হয় তুই একটা অসাধারণ কেউ হবি।’

শিরিনা আবেগে টইটম্বুর হয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। আমার চোখে পানি আসছে। টপ করে ঝরে পড়ার আগেই ঘুরে পা বাড়ালাম।


৬ পর্বের লিংক

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com