হোম গদ্য উপন্যাস রুজানা এখন কী করবে : শেষ পর্ব

রুজানা এখন কী করবে : শেষ পর্ব

রুজানা এখন কী করবে : শেষ পর্ব
296
0
৬ পর্বের লিংক

শেষ পর্ব :

রুজানা বলল, ‘আমাদের কত টাকা আছে তা বোধ করি আপনার চিন্তারও বাইরে। শুধু চাচা আর আমি জানি।’

‘এই টাকা দিয়ে কি আমি একটা নদী কিনতে পারব? পারলে আমি তোর সব কথা শুনতে রাজি আছি।’ আমি গম্ভীর হয়ে বললাম। কিন্তু রুজানা আমার দিকে চোখ বড় করে তাকাল। খানিক পরে বলল, ‘চাচা ঠিকই বলে, আপনার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।’

আমার তাহলে বাপের ব্যবসার হাল ধরা হচ্ছে না। এটা নিশ্চিত হয়েছে বলেই কি রুজানা ইদানীং আর আমার সাথে ব্যবসার বিষয়ে কথা বলে না। এখন বরং সে আমার সাথে মজা করার জন্য ফাউ আলাপ পাড়ে?

সে বলল, সে একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছে না। তা হলো বিয়ে প্রথা চালু হলো কেন।

কিসের মধ্যে কী বলছে বোঝার চেষ্টা করতে করতে আমি বললাম, পরিবার গঠনের জন্য বলেই ত জানি।

কিন্তু পরিবার ত বিয়ের আগেও ছিল, বলল সে।

এসব আমার ভালো লাগে না। এত চিন্তা আমার সয় না। কিন্তু কিছু একটা ত বলতে হবে। আমি বললাম, ‘ত এসব নিয়ে তুই এত মজলি কেন? মার্কেটিং ছেড়ে ইতিহাস গবেষণায় যাবি নাকি?’

সে বলল, সব বিষয় পরিষ্কার বোঝা উচিত। সে জড় হয়ে থাকতে পারে না। যখন যেটা সামনে আসে তখন সেটা তার জানা চাই। রফির বউ আর আমার বড় আপা তার মধ্যে এই ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।

রফির বউ আর বড় আপা দুই জনই গৃহিণী। দুইজনেরই স্বামী নিজেদের এলাকায় খুব ভালো মানুষটি বলে পরিচিত।

আমি চুপ।

রুজানা বলল, ‘কারা বিয়ে প্রথা চালু করেছে। নারী না পুরুষ?’

‘যারাই করুক। তাতে কী হয়েছে?’


মুরগি ও নারী, সাথে মদ আর বিড়ি—এর কোনো তুলনা হয় নাকি, বল—?


রুজানা চুপ। “ঘরে ঘরে প্রস্টিটিউশন” আমার মগজের ভিতরে হিমের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এই শোনা কথাটা আমি কখনও চিন্তা করি নাই। রুজানা কি এসব ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।

দুই মক্কেল এসে চেয়ারে বসল কিন্তু রুজানা উশখুশ করছে। অফিশিয়াল কোনো কাজে এখন তার মন সায় দিচ্ছে না। শিরিনারা সবাই কলেজে। তারা কেউ থাকলে ডেকে বসাতে পারত।

‘জি, বলেন,’ উশখুশ করতে করতেই লোকদুটোর দিকে চায় রুজানা কিন্তু তারা জমি বন্দক দিতে চায় শুনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে যেন, ‘এখন ত আর আমরা জমি বন্দক নিচ্ছি নে।’

আমি এখনও চোখ তুলতে পারছি নে। “বিয়ের পরে কী করবা সুনামনি” ইত্যাদি বলার পরপরই কি রুজানার মগজে ধাক্কা লাগত? সেসব এখন আমাকে লজ্জার মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমি ত—। এসব ত নিছক মজা করার জন্য বলা।

তাও বটে আবার এসব হলো মনের কথাও বটে।

বাস্তব আজব।

আজব বাস্তব।

রুজানা সেসব কথা সহজভাবে নেয় নি তা নিশ্চিত?

এসব চিন্তা কর না, মনু। বরং গা ঝাড়া দাও। “মুরগি ও নারী, সাথে মদ আর বিড়ি—এর কোনো তুলনা হয় নাকি, বল—?”

আর বড় আপার বিষয়টা হলো—।

যার বিষয় তাকেই ভাবতে দাও না কেন। এটা প্রথম কাজ। তারপর মার্কেটিংয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড় আর অন্য সবার মতো বাপের ব্যবসার হাল ধর।

কি ন তু। বাপ ত আমাকে ‘মাথা নষ্ট’ বলে—।

কোনো কিন্তু নাই।

মাথা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে ত।

মাথা ঝাড়া দাও।

আরো ব্যথা হলো।

পায়চারি শুরু করতে পার।

দেয়ালে মাথা ঠুকে গেল।

একটা দৌড় দাও না কেন।

কোথায় দৌড়োব।

প্রথমে ঘর থেকে বের হও। তারপর বাড়ি থেকে। এক দৌড়ে বিলে।

তাহলে সবাই আবার পাগল বলে শিকলে বেঁধে রাখে যদি—।

সেটা একটা ভাবনা বটে।

বুদ্ধি পাওয়া গেছে। কেউ সন্দেহ করলে রাগা যাবে না। সে যে সন্দেহ করছে এটা মোটে ভাবাই যাবে না। বরং ফুরফুর করে হেসে বলতে হবে, কী খবর, ড্যাশ ড্যাশ।

সত্যিই ত, রাতে দৌড়োতে কেমন লাগে দেখা যাক না কেন।

সাবধানে দরজা খোল। তালা খোলার সময় গ্রিলে লোহায় লোহা ছোঁয়া লাগলে যা ঝনঝন হয়, জানো ত—।

না, কোনো শব্দ হয় নি।

এবার হেঁটে রাস্তায়। সাবধান। এখনই দোড় দিয়ো না যেন। শব্দ হলে কেউ শুনে ফেলতে পারে।

এবার।

সত্যিই ত দোড়োতে মজা লাগছে। গতি বাড়ছে। আরো বাড়ুক।

আমি যেন একেবারে উড়ে চলেছি। গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বিলে এসে পড়লাম। এপাশ দিয়েও একটা রাস্তা হচ্ছে। মাটি কাটা শুরু হয়ে গেছে। এই রাস্তাটা বিলের উত্তর পাশে একা পড়ে থাকা পচাখালিকে জোড়া দেবে শিমুলগাঁর সাথে। পুব-পশ্চিমে আগেই আছে। ভবিষ্যতে দখিন দিকে আরেকটা রাস্তা গিয়ে মিশবে বাঁশবাড়ির সাথে।

ফকফকা জোছনা ভরা বিল। বিলের মধ্যে উড়তে উড়তে সারাগায় জোছনা মেখে ঘুরে বেড়াতে পারি না?

অবশ্যই পার। আবার দৌড় দাও।

একদল লোক টর্চলাইট ফোকাস দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। এত রাতে বিলের মধ্যে লোক আসে কেন। গ্রামের ভিতরে হলে ভাবা যেত ওরা হয়তো ডাকাত।

ওরা হয়তো খুনি।

কাউকে মুখ বেঁধে নিয়ে আসছে খুন করার জন্য?

তা ত হতেই পারে। মাঝে মাঝেই কি শোনা যায় না, এগ্রামে অমুক, ওগ্রামে তমুক খুন হয়েছে।

“খুনিদের চিনে ফেলায় বদির আলিকে খুন করা হয়েছে বলে ধারণা—।”

দোড় দাও। এখন খুন হবার দরকার নাই।

কিন্তু ওরাও ত দৌড়োয় আসছে। আমি কি ওদের সাথে পেরে উঠব।

চেষ্টা ত করতে হবে, তাই না?

যদি এমন হয় যে হিমেল আমাকে ফলো করছিল? শিরির সাথে আমার বেশি ভাব সে ত মেনে নেয় নি। শিরি তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলে সে খুব মাইন্ড করেছে। কিছুদিন হলো রুজানার সাথেও কথা বলে না। আমার দিকে কি চোখকটমট করে তাকায় নি দুএকবার?

“নড়াইলের শিমুলগাঁও গ্রামে নারীঘটিত কারণে মনু শেখ নামে এক যুবক খুন হয়েছে।”

এমন অপবাদ মাথায় নিয়ে খুন হবার কোনো মানে আছে?

না। ত—।

আরো জোরো দৌড় দাও।

“সকালে বিলের মধ্যে মইনের হাত-পা বাঁধা লাশ পাওয়া গেছে। গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা ছিল। “মানিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। “শরাফতকে শ্বাসরোধে…। “চান মিয়ার গায় লাঠির আঘাত দেখে ধারণা করা যায়… “বাশিরকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে…!”

এমন নিষ্ঠুর মৃত্যুর কোনো মানে হয় না।

তাহলে তুমি এখন কী করবে।

আমি আরো জোরে দৌড়োতে পারি। একটু ঘুরে পশ্চিম দিক দিয়ে গ্রামের জঙ্গলে ঢুকে পড়লে—।

একবার পেছন ফিরে তাকাও।

না। কেউ নেই।

গ্রাম থেকে কোলাহল ভেসে আসছে। আমাকে ঘরে না দেখে কেউ যদি হইচই করে উঠে থাকে, তাহলে—।

এত রাতে কে আমার দরজায় উঁকি দেবে।

কেউ ত জাগতেই পারে।

দরজা কি হাঁ করে খুলে এসেছি?

এবার ওঠা যাক।

এখন ক্লান্তি লাগছে। দৌড়োতে ইচ্ছে করছে না।

ঝিমাতে ঝিমাতে হাঁটতে পারো। মাতালের মতো পা টলতে টলতে হাঁটলে কেমন হয়।

এই মুহূর্তে কড়া কিছু পান করলে মজা লাগত?

তেমন কোনো সম্ভাবনা নাই। রাজধানীর বারগুলো পর্যন্ত এগারটায় বন্ধ হয়ে যায়।

“তারপর ঢাকার উত্তরাধুনিক কবিরা পর্যন্ত বউ কোলে করে ঘুমায়”—?

ঠিকই ত। গরমের দেশে আবার কড়া কেন।

এগারটা পর্যন্ত ঠান্ডা থাকে?

তুমি বড্ড বেশি প্যাঁচাল পারো।

হঅ, অনেক হয়েছে। এবার জোরে একটা  দৌড় দাও ত। শেখবাড়ির লোকেরা সারা গ্রাম তোলপাড় করছে, টের পাচ্ছ?

পাচ্ছি বৈকি।

এবার তাহলে চিন্তা কর ওরা কী ভাবছে।


সবকিছু না শুনেই চিক্কুর দিয়ে অজ্ঞান আর বাপ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। আমার বুকের ভিতর থরথর করছে।


রাত দুপুরে দৌড়োনো স্বাভাবিক না। আয়েশি ভঙ্গিতে হাঁটা যাক। বলা যাবে যে হাঁটতে গেছিলাম। ‘বিলে গেছিলাম জোছনা দেখতে’ কিছুতেই বলা যাবে না।

বাড়ির কাছে যেতেই সবাই আমার দিকে এমন করে তাকাতে লাগল যেন আমি এক আজব চিড়িয়া।

এখন—।

আমি যেন কিছুই জানি না এমন ভান করা ভালো। ‘কী হয়েছে রে? রাত দুপুরে সবাই বাইরে ক্যা?’

‘না, তেমন কিছু না।’ শিরিনা, ‘আপনি গেছলেন কুহানে?’

‘হাঁটতে গেছিলাম। সবাই বাইরে ক্যা? হয়েছে কী?’

‘রাত আড়াইটা বাজে। এত রাতে কেউ হাঁটতে যায় জীবনে শুনি নাই।’

‘খুবই স্বাভাবিক।’ স্মার্ট ভঙ্গিতে বলা যাক, ‘এতটুকু জীবনে তুই সব শুনে ফেলেছিস এমন মনে করার কোনো কারণ নাই।’

রুজানা ফিক করে হেসে ফেলল। তার কথা নকল করলাম বলে?

আবার সবাই যার যার ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আমিও আমার ঘরে। কিন্তু এখন আবার পায়চারি বাড়ছে কেন। ক্লান্ত শরীরে ঘুম আসার কথা না?

শেখপাড়া আবার নিঝুম। ঝিঁঝিঁ ডাকছে নির্ঘুম। আমি আর পায়চারি করব না। এখন ঘুমাতে হবে। কিন্তু শিরির জন্য আমাকে একটা সিদ্ধান্ত খুঁজতে হবে। শিরি বলছে, ‘ভালোবাসার জন্য মন সব সময় আকুলি-বিকুলি করে। কিন্তু ছেলেদের সাথে মিশলেই বিপত্তি।’ তাহলে—।

রুজানা আসছে, ‘কী ব্যাপার, ঘুমান নাই?’

‘না। ঘুম আসছে না।’

‘কেন, কী হয়েছে?’

‘তেমন কিছু না।’

‘তখন আসলে কোথায় গেছলেন?’ রুজানা আমার মুখের দিকে চেয়ে।

‘বড় আপাকে নিয়ে ভাবছি। তাকে আমি অশান্তির মধ্যে দেখতে পারি না।’ বড় আপা কি রফির বউর মতো? “ভালো” মানুষটির বিরুদ্ধে কোথাও নালিশ করতে পারছে না?

‘তখন আসলে কোথায় গেছলেন?’ রুজানা আমার কাঁধে হাত রাখল। কী বলি তাকে আমি। ‘জোছনা দেখতে।’

‘দেখি ত, দাঁড়ান ত। এত অস্থির হলে—।’ রুজানা আমার হাত ধরল শক্ত করে। যেন নড়তে দেবে না। কপালে হাত দিল। ‘শরীর ত ঠিক আছে মনে হচ্ছে। কোনো সমস্যা মনে করছেন?’

তার কথায়, প্রশ্বাসে নারীত্বের মিষ্টি ঘ্রাণ। শিরির মতো অত তীব্র না।

‘কী হলো?’

আমি মৃদু হেসে ব্যায়ামের ভঙ্গি করলাম। রুজানা যেন মজা পাচ্ছে। মৃদু হেসে আমার কানের কাছে মুখ এগিয়ে আনল। ‘কী ব্যাপার, করার জন্য মাথা বিগড়ে যাচ্ছে নাকি?’

‘ভাবছি।’

‘কী ভাবছেন?’

‘সেটাই ত ভাবছি।’

‘আপনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

আমি নিজের অজানতেই পায়চারি শুরু করলাম।

রুজানা ঠাস করে বেরোয় গেল। মিনিট খানেক পরে আবার ফিরে আসছে। ‘এটা খেয়ে ঘুম দেন।’

‘এটা লাগবে না। আমি ঠিক আছি।’

‘আপনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’

‘আমি কি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি?’

‘জানি না।’

‘জানিস ত। বল।’

‘আপনার লক্ষণ স্বাভাবিক না।’

‘আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?’

‘এটা খেয়ে ঘুম দেন, প্লিজ।’

এখন একটু হাসা দরকার। ওর দুশ্চিন্তা দূর করা উচিত। ‘প্রাচীন মুনি-ঋষিরা কেমন করে ধ্যান করত জানিস ত—।’

‘না,’ রুজানার গলা কাঁপছে।

আমি মেঝেতে আসন গেড়ে বসে পড়লাম। ‘বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে যা। সকাল দশটার পর খুলে দিস।’

‘কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনাকে ঘরে রেখে দরজা বন্ধ করলাম কেন তখন কোনো উত্তর দিতে পারব না।’

সব সময় সচেতন বুদ্ধির কথা ভালো লাগে না। “আন্দাজে চলা জীবন প্যাঁচানো জালের মতো জট পাকায়। তাই নিয়ে মেগা সিরিয়াল, ফ্যামিলি সাগা—,” রুজানার লেকচার।

‘দরজা বন্ধ করা লাগবে না। তুই এখন যা।’

‘আপনার মুনি-ঋষি হওয়া লাগবে না। মুনি-ঋষি হতে হলে গুহা লাগে, বটগাছ লাগে। ঘরে বসে ধ্যান করা লাগবে না। ওঠেন ত।’ সে আমাকে জাপটে ধরে উঠিয়ে দিল। এই অনুভূতি মধুর। সুখময়। কিন্তু আমি আমার মনকে বেঁধে রাখলাম। আমি লাগাম ছেড়ে দিতে পারি না। আমি আসক্ত হতে চাই না।

তাহলে এখন আমাকে ঘুমাতে হবে। আমি বালিশে মুখ গুঁজে দিলাম। ঘুম না এলেও চোখ বুজে থাকতে হবে। কিন্তু ভাবনা বাড়ছে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম গভীর হওয়া ত দূরে, বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে। ভাবনাও আরো বাড়ছে। যত ভাবনা তত মাথাব্যথা। যতই ঘুমের ভান করছি ততই মাথাব্যথা বাড়ছে। কপালের একটা শিরা লাফাতে শুরু করল।

ফজরের আজান ভেসে আসছে মসজিদ থেকে। অনেক কাল নামাজ পড়ি না। নামাজ পড়তে যাওয়া যায়। ঠিকঠাক নামাজ-কালাম শুরু করতে হবে।

এখন বরং ঢাকার পথে রওনা হও।

ঢাকায় টিকতে পারি নাই বলে ফিরে এসেছি সে কথা আমি ভুলি নাই।

ভাবনা আরো ওলট-পালট হয়ে গেল একটা মটরসাইকেল আতঙ্কের মতো এসে থামলে।

বড় আপার চাচাত দেবর জাফর। তার চোখেমুখে উদ্বেগ। বড় আপা কি “বাপের সম্পত্তিতে ভাইয়ের তুলনায় বোনের দ্বিগুণ অধিকার থাকা উচিত” বলে আমরণ অনশন শুরু করল নাকি।

“তাই কি হওয়া উচিত না?”

‘কী হয়েছে, জাফর ভাই?’ রুজানা জিগাচ্ছে আর জাফর বলছে, ‘ভাবিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

সেকি! আন্দোলনের বদলে আত্মসমর্পণ?

নিখোঁজ মানে কি আত্মসমর্পণ নাকি।

ও, তা ত।

তবু হঠাৎ পত্রিকার খবর মনে পড়লে আমি বিছানা থেকে লাফ দিলাম। গা কাঁপতে লাগল। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী তাও জিগাতে পারলাম না। আমি বরং বড় আপার শ্বশুরবাড়ি নন্দখালির দিকে দৌড় দিলাম।

কিন্তু আগে সবকিছু ঠিকঠাক বোঝা উচিত।

আবার ফিরে আসতে হলো।

‘বাচ্চারা কোথায়?’

‘সাথে করে নিয়ে গেছে।’

“এক মা তার দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে—।”

না না। বড় আপা এটা করতে পারে না। কিছুতেই না। তার ত বিদ্রোহ করার কথা। কিন্তু আমি এখন কী করব।

‘কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?’ রুজানা নির্বিকার। সে যেন জানে কী হতে পারে। কিন্তু আমার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। বড় আপার মনের কথা আমার বোঝা উচিত ছিল। অবশ্যই।

চাচাতরা সবাই জাফরের মুখের দিকে উৎকর্ণ। জাফর বোতলের মুখ উপুড় করে ঢেলে দিল, ‘ভোর রাতে ভাই দেখে যে ভাবি ও ঝুমুর-নূপুর ঘরে নাই।’

মা সবকিছু না শুনেই চিক্কুর দিয়ে অজ্ঞান আর বাপ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। আমার বুকের ভিতর থরথর করছে। পা টলে উঠলে বসে পড়লাম। কিন্তু আমার মন বলছে, বড় আপা বিধ্বংসী কিছু করতেই পারে না।

মা বারান্দায় বিলাপ করছে। থেকে থেকে ‘ও আমার মা জননী, কুথায় গেলা তুমি’ আর থেকে থেকে আমার ঘরের দিকে চেয়ে ‘ও আমার বাপধন, তুমার কী হলো গো, বাপধন গো’।

আমার কী হয়েছে? আমি কি পাগল হয়ে গেছি? কিন্তু আমি ত সবকিছু বুঝতে পারছি। আমি কি ঠিকঠিক চিন্তা করছি না? রাস্তার ধারে, বিলের পারে সেই সব শিমুল-জারুল ফিরে চাই, এসব বলা কি পাগলের লক্ষণ? আমি সেই সব ডোবা আর স্বচ্ছ নদীনালা ফিরে চাই, এসব বলাও কি পাগলের লক্ষণ নাকি। খামার পাড়ে দাঁড়িয়ে নুনু উঁচু করে মুতা কি পাগলের লক্ষণ? কিন্তু আমাকে ত শেকলে বান্ধে নাই। তাহলে নিশ্চয় আমি পাগল হই নি।

বাপের কোনো সাড়া পাচ্ছি নে। রুজানা, শিরিনা, ওরা কই গেল। আমার কি পায়চারি বেড়ে যাচ্ছে নাকি। সারাদিন ঘরের মধ্যে পায়চারি করা কি পাগলের লক্ষণ?

আশপাশের বনজঙ্গল, পানিচুনি সব ঘেঁটে ফেলার পর, জিডি আর মিডিয়ায় খবর আসার পর চাচাত রায়হান খবর দিল, বড় আপা মডার্ন ক্লিনিকের কুক হয়েছে।

দুই দিন পর বোরকা পরে কাজে গেলেও খবরটা প্রথম দিনই চাউর হয়ে যায়। তবে ‘কুক’ শুনে প্রায় সবাই আকাশ থেকে পড়ল। শুধু রুজানা বলল, ‘তাও ভালো।’

বাপ রুজানার মুখের দিকে অবাক চেয়ে। রুজানা সান্ত্বনা দিল, বড় আপা চিরকাল কুক থাকবে না। কিন্তু রফির বউকে আরো বহুদিন মধ্যরাতে খাট থেকে পড়তে হবে? “রফির বউ শিক্ষিত হলেও একেবারেই সেকেলে বাঙালি নারীদের মতো। দেখলেই রাগ লাগে,” রুজানা বিরক্ত। মাঝে মাঝে নাকি ধমকও দেয় সে তাকে। সে চায় সব নারী তার মতো হোক। সে বড় আপার খুব ভক্ত। আর সে শায়লা ফুপুকে একেবারে যেন দেবীর মতো পূজা করে।

কিন্তু আমার পায়চারি কমছে না কেন। এখন কি একটা দৌড় দেওয়া উচিত। না, এই দিনের বেলা—। রাত হলে দৌড়োতে পারতাম। তাহলে এখন পুকুরে সাঁতার কাটা যাক।

আবার কেন পুকুরের কথা মনে পড়ছে। পুকুরের যুগ চলে গেছে। সেসব এখন মাছের খামার। নীলচে কেমিক্যালের মতো পানিতে মাছ বড় হচ্ছে। মার্কেটিং নলেজ ছাড়াই এই জিনিসটা এখনও সব বিক্রি হয়ে যায়। হাভাতে ক্রেতারাই খুঁজে বের করে।

তা হোক। সাঁতরানো ত যাবে। ওখানে মুতা মোটেই ঠিক হয় নাই। ওই মুতের মধ্যেই আমি এখন সাঁতার কাটব। এটাও কি পাগলের লক্ষণ নাকি। তবু আমাকে এখনই ঘর থেকে বের হতে হবে। জোরে একটা সাঁতার দিতে হবে। কিন্তু বারান্দার গ্রিল তালাবদ্ধ কেন। আমি কি ইতিমধ্যেই একটা দৌড় দিয়েছি নাকি। আমাকে ধরে আটকে রেখেছে?

রুজানা এদিকে আসছে। কেন আসছে? সে বলল, ‘কী হয়েছে? এত ছটফট করছেন কেন?’

তাই নাকি? আমি তাহলে পাগল হই নাই। তাহলে মা আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন। আমি এখন কী বলব। নির্লিপ্ত থাকা যাক। অথবা বড় আপার কথা জিগাতে পারি। ‘বড় আপা এটা কী করল?’

‘ঠিক করেছে,’ রুজানা ফুরফুর করছে। বড় আপার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বলল, কাল তারা তাদের এনজিওর দ্বিতীয় শাখাটা চালু করবে।


আমারে তালা দিয়ে থুইছে কোন শালায়? তালা খোল শিগ্‌গির, নয়তো—!


তা করুক গা। কদিন আগে তার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন পুরোদমে ব্যবসা করতে যাচ্ছে। ত আমাকে কেন সেই খবর দিতে আসছে। শক্ত করে একটা ধমক দেবো নাকি।

‘আপনি থাকবেন কিন্তু। বড় অনুষ্ঠান করব।’

আমি থাকব? আমি তাহলে কোন ঘেন্নায় বার বছর মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলাম।

‘ম্যানেজার দিয়ে একটা ব্রাঞ্চ ঠিকমতো চালানো শিখতে পারলে প্রতি মাসে ব্রাঞ্চের সংখ্যা হুহু করে বাড়বে।’ তা নিশ্চয়।

“আমাদের কত টাকা আছে তা বোধ করি আপনার চিন্তারও বাইরে। শুধু চাচা আর আমি জানি।”

তখন আমি আর দ্রুত পায়চারি করব না? ঢাকা থেকে আমি তাহলে কী করতে ফিরে এলাম।

‘এত অস্থির হচ্ছেন কেন। এখানে সোজা হয়ে বসেন দেখি।’ রুজানা আমার হাত ধরে নিয়ে খাটে বসিয়ে দিল। কিন্তু আমি উঠে পড়লাম।

‘আপনার সমস্যাটা কী বলেন দেখি?’

‘আমার কোনো সমস্যা নাই।’

‘তখন দৌড়োয় কোথায় যাচ্ছিলেন?’

‘কখন? আমাকে পাগল পাইছিস নাকি হুম?’ আমি ধমকে উঠলাম। রুজানা হেসে ফেলল।

‘আমি ত পুকুরে সাঁতরাতে যাচ্ছিলাম।’ আমি পায়চারি থামিয়ে খাটের কোনায় বসলাম। রুজানা চুপচাপ আমার চোখের দিকে চেয়ে। আমি উঠে বারান্দার দিকে পা বাড়ালাম।

‘এখন কুহানে যাচ্ছেন?’

‘পুকুরে সাঁতরাতে যাচ্ছি।’

‘পুকুর কুহানে?’

‘পুকুর কুহানে মানে?’ আচ্ছামতো একটা ধমক দিলাম, ‘পুকুর কি আকাশে উড়ে গেছে নাকি?’

‘সোয়েটার পরে গোসল করতে যাচ্ছেন?’

আমি সোয়েটার খুলে রুজানার মুখের উপর ছুড়ে মারলাম।

‘তোয়ালে না নিয়ে গোসল করতে যাচ্ছেন?’

‘চুপ!’ আবার একটা ধমক, ‘বেশি পটর পটর করবি না কিন্তু।’ আমি বারান্দায় গিয়ে গ্রিল ধরে ঝাঁকি দিলাম আর সেই সাথে গগনবিদারী চিৎকার, ‘আমারে তালা দিয়ে থুইছে কোন শালায়? তালা খোল শিগ্‌গির, নয়তো—!’

এক চিৎকারে পাড়ার লোক ছুটে এল মুহূর্তের মধ্যে।

‘এই শালার বাচ্চারা, আমার সামনে থেকে সরিস কিন্তু, নয়তো—!’

রুজানা তাড়াতাড়ি চাবি নিয়ে এল। চাচাত মনির দোড়োয় আসছে ‘তালা খুলিসনে তালা খুলিসনে’ বলতে বলতে। কিন্তু ততক্ষণে তালা খোলা সারা।

আর আমাকে পায় কে।

ঝেড়ে দৌড় বিলের দিকে। আহ্ কী শান্তি! দৌড় দ্রুত, আরো দ্রুত, আরো দ্রুত—! আমি যেন বুনো ঘোড়ার মতো ছুটে চলেছি বিলের মধ্য দিয়ে। দৌড়োতে দৌড়োতে লাফ দিলাম পাখির সাথে উড়ব বলে।

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com