ধানশি : ৮

ধানশি : ৮
78
0
৭ পর্বের লিংক

২১.
চাষের কথা থেকে আসে খাজনার কথা। খাজনার জন্য বাজনা বাজে। বাজনদার বলে, তিনটা জিনিস ছাড়তে হবে। এগুলো হলো লোভ, হিংসা ও অহংকার। আর তিনটা জিনিস মনে রাখতে হবে। এগুলো হলো কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম, কোথায় যাব। মানে আমার যাত্রা কোথায়।

চোখ মেলে বুড়ি দেখে, বাজনদার হলো জোবায়ের। সে এক দরিদ্র বাবার কথা বলে। তার মেয়ে আয়েশা এখনো শিশু। ওকে ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা। বিচার চেয়ে ওই বাবা দ্বারে দ্বারে ঘোরে। বিচার না পেয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এ কথা শুনে বুড়ির খুব মন খারাপ হয়। ক্রোধে জ্বলে ওঠে। ব্যথা, বেদনা সেরে যায়। পশুদের কাছে মানুষের গন্ধ নাকি উৎকট। চিতা বাঘের মতো দুলে হাঁটতে হাঁটতে সেও মানুষের উৎকট গন্ধটা পায়।


বাতাসের ঘ্রাণ আর রোদের তেজে সে সময় চিনতে পারে। কখন সন্ধ্যা বা রাত তা-ও বলতে পারে। 


মাটির দিকে তাকায়। যদি দেখত, ধানের পাতা ফুটেছে, মনটা কত্ত বড় হয়ে যেত! হয়তো এক মাস হয়েছে, হয়তো এক বছর। কিন্তু ধানের কোনো খবর নেই।

সে বলে, তুই কি কানে খাটো?

ধান চুপ করে আছে। মনে মনে বলে, আমার কষ্টের কথা কিভাবে বোঝাই?

বুড়ির ঘা কোথাও কোথাও শুকিয়ে এসেছে। ভেতরে এখনো কাঁচা। প্রায় সময় পিড়পিড় করে। মনে হয় বিষাক্ত পিঁপড়া হাঁটছে। তখন ইচ্ছে করে ধারাল ছুরি দিয়ে কোরবানির গরু খালানোর মতো গা থেকে চামড়া তুলে ফেলতে।

সে বলে, একবার কী হয়েছে জানিস? তখন আমার বয়স ছয় বছর। বাবার লড়াই দেখতে গেছি। সঙ্গে আমার অন্ধ বোনটা। তোকে বলেছিলাম, টাইফয়েডে সে অন্ধ হয়ে গেছে। তবে, বাতাসের ঘ্রাণ আর রোদের তেজে সে সময় চিনতে পারে। কখন সন্ধ্যা বা রাত তা-ও বলতে পারে। আপন মনে হাসে, কথা বলে। তার হাসি খুব মিষ্টি।

শোন, আমরা লড়াইয়ের ময়দানে। মহিষের মতো কালো লোকটা বাবাকে তুলে একটা আছাড় দিল। আমি ভ্যা করে কেঁদে দিলাম। আমার কান্না শুনে প্রতিরোধ না করে বাবা তাড়াতাড়ি পরাজয় স্বীকার করল। তারপর দৌড়ে কাছে এল। আমি বাবার বুকে মুখ লুকালাম। খুব লজ্জাও পেলাম। বুঝলাম, কাঁদা ঠিক হয় নি।

আসার সময় মুখ নিচু করে হাঁটছি। মুখে কোনো কথা নেই। বাবা জিজ্ঞেস করে, সাজু মায়ের মন খারাপ?

আমি কিছু বলি না।

মন খারাপের কিছু নেই।

মোড় থেকে ঝালমুড়ি কিনে দিল। ঝালমুড়ির গন্ধ বুক ভরে নিলাম। এই গন্ধ পেলে আমি দুঃখ ভুলে যাই। আমার মুখে হাসি ফুটল।

বুঝলি? বাবা বলল, তুই মন খারাপ করিস না। দিনের পর কী আসে?

রাত।

রাতের পর?

দিন।

মানুষ কী চায়?

আমি চুপ করে আছি।

বাবা বলল, মানুষ শুধু আলো চায়। দেখ, তবুও রাত আসে। রাতকে কেউ আটকাতে পারে না। জয়-পরাজয়ও তেমন। চিন্তা কী? যদি সহজভাবে নিস, তাহলে সহজ। যদি কঠিনভাবে নিস, তাহলে সব কঠিন। সবকিছু আসলে একটা খেলা।

আমার ধান, আমি এখন চাই, তুই বলীখেলা খেলবি। পরাজিত করবি সবাইকে। আলোর মতো ফুটে উঠবি। পাতা বের হবে। তুই ধীরে ধীরে লম্বা হবি। ফুল ফুটবে। ফুলে বাতাস লাগবে। ফুলের সঙ্গে ফুল কথা বলবে। তারপর ধান হবে। তুই থোকায় থোকায় ছড়িয়ে পড়বি। তুই যদি বাঁচিস তাহলে আমিও বাঁচব।

দেখ, এই দুনিয়ার সৃষ্টি করার অশেষ ক্ষমতা আছে। আমি ছিলাম না, বাবা-মায়ের ভালোবাসায় এসেছি। একটু ভাব তো, তুইও ছিলি না। একটা অস্তিত্ব নিয়ে ফুলের ভেতর এলি। তারপর তোর জন্ম হলো। এখন তুই সৃষ্টি করবি।

বুড়ি বলল, শোন, একটু স্বপ্ন দেখ। তোর চেতনা, ইচ্ছা, কর্ম দিয়ে নিজেকে, মাটি, বাতাস আর আশপাশ ভরিয়ে তুলতে হবে। আস্তে আস্তে তোর নবজন্ম হবে। তুই সৃষ্টি করবি। আমি দেখতে পাচ্ছি, তোর মধ্যে নতুন প্রাণ আসছে।

অনেকক্ষণ কথা বলে সে ক্লান্ত। একটু থামে। বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চেষ্টা করে। শরীর জুড়ে ব্যথা। নিশ্বাসটাও ভালো করে টানতে পারে না। মনে হচ্ছে বুকের হাড় ক’খানা ভেঙে যাবে। চোখ বোজে। কচি ধানগাছের গন্ধ, মাটির গন্ধটা পেতে চেষ্টা করে।

ফিসফিসিয়ে বলে, লড়াই করে বেঁচে থাকতে হবে।

ধান কী বলে শুনে না। কেননা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।

ঘুম মানে স্বপ্নের রেলগাড়ি। কে যেন গান গায়, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না।

একজন বলে, হাসিস না, হাসলে তোর দাঁত দেখা যাবে।

মরিয়ম চিৎকার করে, দাদু আমার বল কোথায়?

বল নিতে লাফ দিয়ে গোবরের গর্তে নামে। হাতে কোদাল। কোদাল দিয়ে খোঁড়ে। এটাকে পুকুর বানাবে। তার সামনে একটা খাঁচায় ছাই। কোদালে ছাই লাগায়। কাদামাটি কাটে। খুঁড়তে খুঁড়তে একটু পানি বের হয়। মাটি আরো কাদাময় হয়। সে গায়ে কাদা মাখে।

মরিয়ম বলে, আমাকে দাও।

দুই হাতে দলা করে এক থাল মাটি ছুড়ে দেয়। মরিয়ম নিয়ে গায়ে মাখে। দুজনে কাদা মাখা, দেখতে ভূতের মতো, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।

২২.
একদিন কবিরাজকে স্বপ্নে দেখলাম। সেই যে মারা গেছে, বেশ কয়েক বছর পর প্রথম দেখা। কবিরাজ বলছে, এই দুনিয়া তোমার, আমার, আমাদের। মরিয়মের কথা বলার, স্বপ্ন দেখার বিরুদ্ধে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। যে দাঁড়াবে সে হবে শয়তান।

ও যখন মারা যায় তখন মকবুলের বিয়ে হয় নি। স্বপ্ন দেখার সময় মরিয়মের বয়স ছিল দুই বছর।

দেখলাম, পানি আর পানি, একেবারে সাগরের মতো। একটা ভেলা ভাসছে। পুকুরে হাতজাল দেওয়ার সময় কলাগাছ কেটে ভেলা বানানো হয়; সেরকম ভেলা। ভেলায় দাঁড়ানো লোকটা জাল মারল। জাল নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। কাছিতে টান পরল।

অনেক কষ্টে টেনে তোলা হলো। ইয়া বড় একটা মাছ। মাছটা দাঁড়িয়ে কবিরাজ হয়ে গেল। মুচকি হেসে চুমু খেল আমাকে। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে হাত বাড়িয়ে ওকে এক গ্লাস পানি দিলাম। আড়চোখে দেখলাম, সে জোয়ান হয়ে গেছে। একেবারে বিয়ের সময়ের মতো।

বুড়ির ঘুম ভেঙে গেছে অনেক আগে। সময় ফুরাচ্ছিল না। এখনো আঁধার। এতক্ষণ আঁধার অথবা ধানের সঙ্গে কথা বলছিল। আকাশের ফাঁকে একটা তারাও দেখা যাচ্ছে না। বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এরকম একটা রাত, বিয়ের পরের দিনের রাত। স্বামী কিভাবে, কত রকম আদর করেছিল, সব স্পষ্ট মনে পড়ল।

মকবুলের বাবা বলেছিল, তুমি আমার পানি, আমি তোমার গ্লাস।

ধানকে জিজ্ঞেস করে, তোর ঘুম ভেঙেছে? শোন না, তখন কবিরাজ সপ্তায় অথবা পনেরো দিনে একবার শহরে যেত। আন্দরকিল্লায় শ্রীদুর্গা ঔষধালয় নামে একটা দোকান ছিল। ওখান থেকে ওষুধ আনত। একদিন আসার সময় ওষুধের সাথে আনল একটা চারা। আমি তো চিনি না। বললাম, এটা কী?

সে বলল, শিউলি ফুলের চারা।

ওটা কী করব?

সে বলল, উঠানে লাগাও।

উঠানের এক কোণে লাগালাম। দুজনের কত যত্ন! ধীরে ধীরে সেই গাছ বড় হলো। শরৎকাল এলে এমন ফুল ফুটত, পুরো গাছটা পরির মতো হয়ে যেত। যেদিন চাঁদনি রাত থাকত, উঠানে বসে গল্প করতাম। সে বিড়ি খেত। আমি কেড়ে নিয়ে ফেলে দিতাম। সে কিছু বলত না, শুধু হাসত।

কবিরাজ বলল, শ্রীদুর্গা ঔষধালয়ের পেছনে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। দেখে কৌতূহল হলো। ছোট্ট উঠান। এক পাশে বড় শিউলিগাছের গোড়া। শিউলিগাছ কাটা হয়ে গেছে। আশপাশে অনেক চারা উঠেছে। তারা যেন কাঁদছে আর তাদের মাকে খুঁজছে। আরেক পাশে একটা শরিফাগাছ। বড় বড় শরিফা ঝুলছে। পাশে একটা আমগাছও আছে। একটু বড় হয়ে থমকে গেছে।

পেছনে একটি পাহাড়। দোকানের দাদা বলল, ওই পাশে জেনারেল হাসপাতাল। হাসপাতালের লাশঘর পাহাড়ে। ওখানে ডোমেরা থাকে। বেঁচে থাকার জন্য ওরা লাশ কাটে।


ধান হাই তুলল। বলল, আমিও তো যুদ্ধ করছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না? বাতাস কমে যাচ্ছে, মাটি শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে।


ডোমের কথায় নিজেদের দুরবস্থার কথা মনে পড়ল বুড়ির। ধানকে বলল, তখন আমাদের অবস্থা ছিল খারাপ। কবিরাজ দোকান দেয় নি। শুধু চাষবাসের ওপর নির্ভর করতে হতো। বছরের শেষ দিকে টান পড়ত। বোর্ড অফিস থেকে সিদ্ধ চাল পেতাম। কী দুর্গন্ধরে বাবা! রাঁধার আগে দুপুরে পানিতে ভিজিয়ে রাখতাম। তারপর বিকেলের দিকে চুলায় দিতাম। ভাত সিদ্ধ হয়ে এলে নামিয়ে রাখতাম। অন্য তরকারি জাল দেওয়ার পর ভাত আবার চুলায় দিতাম। তাতে সহজে হয়ে যেত, লাকড়িও কম লাগত।

মকবুল সিদ্ধ চালের ভাত খেতে পারত না। কত বেলা না খেয়ে বা এক মুঠ খেয়ে থেকেছে! একদিন ওকে ভাত খেতে দিয়ে বেত নিয়ে সামনে বসে আছি। ওর চোখে পানি। ভাতের বাসনে চোখের পানি পড়ে। তখন পুবের বাড়ির বশর শাশুড়ির মেজবানের দাওয়াত দিতে আসে। এক বাড়ি পর তার শ্বশুরবাড়ি।

দাওয়াত দিয়ে চলে যাওয়ার পর বললাম, হায়রে বশর, তুই এসেছিস শাশুড়ির দাওয়াত দিতে। যখন তোর মা অসুস্থ ছিল, গু-মুত হাতে ঘেঁটেছে, গু নিয়ে ছুড়ে মারত, তখন কোথায় ছিলি? গন্ধে তো মায়ের কাছে যাওয়া যেত না। দুনিয়া এরকম!

আমার মায়ের কথা তোকে বলেছিলাম? তার নাম রশিদা খাতুন। নানা আশরাফ আলী। মামা হলো বাদশা বৈদ্য। অল্প বয়সে মা মারা যায়। তখন আমরা এক ভাই, দুই বোন। বাবা আবার বিয়ে করল। ওই মা-টাও আমাদের নিজের মেয়ের মতো দেখতে পারত। সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা কি জানিস? আমার সৎ মায়ের নাম রশিদা, সৎ মামার নাম বাদশা আর সৎ নানার নাম আশরাফ। এমন মিলও হয়! ওরা আমায় এমন ভালোবাসত, মায়ের মারা যাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সৎ মায়ের চার ছেলে। আমি যে সৎ বোন ওরা জানতই না।

আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল বারো বছর বয়সে। আমার কখন বিয়ে হয়েছে জানিস? তোকে বলেছিলাম। বলে বুড়ি মুচকি হাসে। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলাম। তারপর আর পড়া হয় নি। অথচ পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। আমার ছেলের বেলায় দেখ, ওকে বেশি পড়ালেখা করাতে পারি নি। ওর বাবা মারা যাওয়ায় তাড়াতাড়ি বিয়ে করিয়েছি। আসলে মানুষ যা ভাবে, স্বপ্ন দেখে, তা সবসময় পূরণ হয় না।

ধান একমনে মাটির দিকে চেয়ে বুড়ির কথা শুনছে। তার তাকানো দেখে মাটি ভয় পাচ্ছে। বলছে, আরেকটু সবুর কর।

বুড়ি এসব অনুভব করে। বলে, আমার স্মৃতিশক্তি ভালো হলেও মনে করতে পারছি না, কখন আমার জন্ম হয়েছিল। আচ্ছা, তোর মনে আছে?

তার প্রশ্ন শুনে ধান অবাক হয়। বলে, আমি কিভাবে বলব?

বাবা অনেকবার গল্প করেছিল। আজ কিছুই মনে করতে পারছে না। মনে করতে চাইলেই তার চোখে ভেসে উঠছে একটি দৃশ্য। বড় একটা দিঘিতে ভাসছে পানিপোকা। ওগুলোর গায়ে পানি লাগে না। সেও পোকা হয়ে গেছে। টলটলে পানিতে দৌড়াচ্ছে।

মা বলেছিল, পৌষ মাসের হাড় কাঁপানো শীতের রাতে তার জন্ম। ওটা মনে আছে।

হাতের দিকে তাকায়। সব আঙুল সমান নয়। ভাবে, তাহলে সবকিছু খারাপ হতে পারে না। একটা না একটা পথ আছেই।

একা থাকলে মন দুর্বল হয়। তবে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা, চিন্তা করার সময় পায়। সে টের পায় তার ঘ্রাণশক্তি বাড়ছে।

ধানকে বলল, সেদিন একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের মধ্যে এক যন্ত্রমানুষ বলল, ছাইয়ের মুড়ি খাবে?

তোকে তো বলেছি, অন্ধ বোনটা আমার বড়। ওর বিয়ে হয়েছিল এক পঙ্গু লোকের সঙ্গে। একবার ওর শ্বশুরবাড়ি গেছি। তাদের বাড়ির একজনের ঘরে গিয়েছিলাম অসুস্থ এক বুড়িকে দেখতে। তারা বসার ঘরে বসায়। তখন টিভি চলছিল। টিভিতে দেখেছি যন্ত্রের কিছু মানুষ যুদ্ধ করছে।

ধান হাই তুলল। বলল, আমিও তো যুদ্ধ করছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না? বাতাস কমে যাচ্ছে, মাটি শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে।

বুড়ি বলল, মরিয়ম টিভিতে মারামারি দেখত। ওখানে একজন আরেকজনকে কিভাবে মারে সেই কথা তোকে বলেছি? এখন আমার ইচ্ছে করছে সেভাবে মারতে।

কাকে?

কাকে আবার? মাটিকে। সে হাত পাকায়। রাগে ফুঁসে বলে, তুই মুঠি শক্ত কর, মাটিকে শাসন কর। বেঁচে থাকলে কী লাভ তাকে বুঝিয়ে বল। বল, সে যেন তোর কথা শোনে। না শুনলে সে নিজে মরবে, তুইও মরবি।

ধান প্রশ্ন করে, লাভ হবে?

কয়েকদিন কথা বলে বুড়ি বুঝেছে, মাটিতে হাত রেখে বললে ধান ভালো সাড়া দেয়। একটু দূর থেকে বললে শুধু হু হাঁ করে। তাই বেশিরভাগ সময় মাটিতে হাত রেখেই কথা বলে। ধানের সঙ্গে তার যোগাযোগ গড়ে উঠেছে বলে মনে হয়। সে দেখতে পাচ্ছে মাটির নিচে ধানের অবস্থা। ধানটা এপাশ-ওপাশ করছে। নির্ঘুম মানুষের মতো তার কষ্ট।

সে মাটিতে হাত বুলায়। বলে, বেঁচে গেলি তো রয়ে গেলি।

ধান প্রশ্ন করে, মরলে?

বুড়ি কিছু বলে না। চোখ বন্ধ করে। আনন্দ নাকি কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করছে বোঝা যায় না। একটু পর হেসে বলে, তোকে লাঙল, জোয়াল আর এক জোড়া ষাঁড় দেবো।

ধান হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।

আমি আরেকটু সোজা হই। ছাইয়ের দুনিয়াকে লাঙলের তলায় ফেলব। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাঙা সুরে গায়, আবাদ করলে ফলত সোনা।

এই গান কবিরাজের মুখে অনেকবার শুনেছে। ছাইয়ের দুনিয়ায় একা এক বুড়ি, তার মুখে এটাই প্রথম সুর।

২৩.
বুড়ি বলল, ও কেমন করে কবিরাজ হয়েছে সেই কথা তোকে বলা হয় নি। আমার মামা ছিল বৈদ্য। মানে কবিরাজ। বাদশা বৈদ্য এক নামে পরিচিত। বিবিরহাট বাজারে তার দোকান ছিল। মামার কাছে কয়েক বছর যেতে যেতে মকবুলের বাবাও কবিরাজি শুরু করে।

মামা বলতে চাইত, ঠিকভাবে জমি আবাদ করাই তোমার কাজ।

কবিরাজ কাচুমাচু করত। স্পষ্ট করে কিছু বলত না। মানুষটার মধ্যে একটা ফাঁকি ছিল। কিন্তু এমন কৌশলে ওষুধ দিত, কারো ক্ষতি হতে দেখি নি।

ও পাস করা কবিরাজ না হওয়ায় আমার মনে কাঁটা বিঁধে থাকত। হয়তো আগাগোড়া চাষা থাকলেই ভালো লাগত। কিন্তু ওদিকে টুকটাক পয়সাও আসত, তাই কিছু বলতে পারতাম না।

আমি কিছু বলতে চাইলে কবিরাজ বলত, বায়ু, পিত্ত, কফ—এই ত্রিদোষের ওপর ভিত্তি করে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা চলে। বুঝলে?

আমি বলতাম, সংসার ছেড়ে একদিন যেতে হবে। মৃত্যুর কাছ থেকে লুকাতে চাইলেও সে তোমাকে ধরবে। অত লোভ রাখিও না।

কবিরাজ বলত, লোভ কোথায়? সামান্য কবিরাজি করি, মানুষের ক্ষতি তো করি না।

আমি আস্তে করে বলতাম, ভুয়া কবিরাজ।

সে রেগে যেত।

তোর মা-বাবার মনে থাকলেও থাকতে পারে, তখন ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বর বেশি হতো।

ধান বলে, একবার মায়ের কাছে একটা পোকা এসেছিল। সে কালাজ্বরের কথা বলেছে। আমি শুনেছি।


এত সহজে হার মানা চলবে? এত বছর কাটালাম। কিছুই কি শিখি নি? কিছুই কি দেখি নি?


বুড়ির পেটের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা। ইচ্ছে করে কবিরাজকে ডাকতে। খিদে না লাগার কোনো ওষুধ তার কাছে ছিল কিনা কে জানে। আপন মনে বলে, কবিরাজ, আমার চামড়ার জন্য একটু ওষুধ দাও না। চুলকানি তো আর সইতে পারছি না।

ভাবে, কবিরাজ হয়তো তাকে মৃতসঞ্জীবনী দেবে। তা খেয়ে সে নতুন করে বেঁচে উঠবে। সে তরমুজ ও বাঙ্গির গন্ধ পায়। সেবার কবিরাজ চাষ করেছিল। এমন ফলন হয়েছে, খেয়ে শেষ করা যায় নি। কত বিক্রি করেছে আর কতজনকে দিয়েছে, হিসাব নেই।

তারও কিছু একটার চাষ করতে ইচ্ছে করে। সে কি ছাইয়ের চাষ করবে! আবার মনে হয়, বাঁচারই-বা দরকার কী? ছাইয়ে মিশে গেলে তাকে কে খুঁজে পায়!

জোবায়ের একবার বলেছিল, আবার যুদ্ধ হবে। ওই রকম কোনো যুদ্ধ হয়েছে? মানুষ ছাড়া এরকম ধ্বংস কেউ করতে পারে! বাবা দুষ্টুমি করে বলত, মানুষ অতিশয় হারামজাদা আর গফরগাদা। হিংসা, অহংকার তাকে খেয়ে ফেলছে। একাত্তর সালের কথা ভাব। পাকিস্তানি মিলিটারি কতকিছু করল, পারল থাকতে? হিটলারের কথা ধর। শেষ পর্যন্ত সে কী করল?

বুড়ি ব্যোমকেশ বা ফেলুদাকে চিনে না। তবে তার হওয়া দরকার ছিল কোনো গোয়েন্দা। তাহলে এই অবস্থার জন্য যে দায়ী, তাকে খুঁজে বের করতে পারত।

ভাবে, এত সহজে হার মানা চলবে? এত বছর কাটালাম। কিছুই কি শিখি নি? কিছুই কি দেখি নি?

কিভাবে কেয়ামত হবে, কেয়ামতের পর কী হবে, হুজুর ওয়াজ করেছিলেন। সেই কথা মনে পড়ে। দুনিয়ায় আসার মুহূর্তের কথা ভাবে। জন্মের পর শিশু কাঁদে। সেই কান্নায় কেউ বিচলিত হয় না। সবাই হাসে।

মানুষ আশা বেশি করে নাকি তার হতাশা বেশি? ওই পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ থেকে শুরু করে সব জীব কিভাবে বাঁচে? আর গাছপালা! সে ধানকে বলে, আমাকে অবশ্যই বাঁচতে হবে।

বুঝতে পারে, মনের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। শরীরে তার ছায়া পড়ে। কোত্থেকে মৃদু বাতাস আসে। আহ! আরাম লাগে। আকাশে চোখ বোলায়।


৯ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)