ধানশি : ৭

ধানশি : ৭
96
0
৬ পর্বের লিংক

পর্ব- ৭

১৮.
বুড়ি ভাবে, তার প্রাণ কি কৈ মাছের প্রাণ? ওই যে একদিন স্বপ্ন দেখেছিল, জালের খোপে ডিমওয়ালা কৈ মাছ, পুকুরে গিয়ে ডিম ছেড়েছে। ডিমগুলো মনে হয় তার মনের মধ্যে ছেড়েছে। হাজার হাজার কৈ মাছের প্রাণ তার প্রাণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। না হয় সে বেঁচে আছে কিভাবে?

বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। ইদানীং বিষয়টা উপলব্ধি করছে। একেকটা ঘায়ে যখন চুলকানি ওঠে, তখন পাগলা মহিষের মতো হয়ে যায় তার অবস্থা। কেউ যেন লক্ষ লক্ষ মৌমাছির হুল ফোটাচ্ছে। মধু এত মজা, হুলে কেন বিষ? বিষে জর্জর, জ্বর-জ্বরও। সে থাকতে পারে না। লম্বা লম্বা কালচে ছাই রং নখ। নখ দিয়ে ইচ্ছে মতো চুলকায়। কিছুক্ষণের জন্য সুখ-শান্তি যা-ই হোক, তা আসে। অন্য কোনো চিন্তা থাকে না।

এরপর শুরু হয় আসল খেলা। চুলকানোর পর ঘা হয় দগদগে। চোখ ওঠা চোখের মতো লাল। তাকানো যায় না। রস বের হয়। আখের রসের চেয়ে গাঢ়। কিছুক্ষণ পর গড়িয়ে পড়ে। বারবার মোছে। তবুও বের হয়। চুলকানো স্থানে ভোঁতা একটা যন্ত্রণা। তার তখনই মরে যেতে ইচ্ছে করে। মরে গেলে শান্তি! একটু পর সে বিষণ্ন, কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায়।

যন্ত্রণা আর চুলকানি সইতে না পেরে ছাইয়ে কিল মারে। কিল মেরে হাত অবশ হয়ে যায়। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ যায় আকাশে। আগের মতো নীল আর সাদা আকাশ নেই। এখন ছাই আকাশ।


বুঝলি ধান, তোকে জন্মাতে হবে। একটা ধান থেকে হাজার ধান হবে। ধানে ধানে চারপাশ ভরিয়ে দিবি।


শরীরটা পাল্টে যাক। সে মনে মনে বলে। কোথাও তো পানি নেই। শরীরে অবশিষ্ট যা পানি আছে, তা ঘায়ে ঘায়ে ছড়িয়ে পড়ুক। সেখানে সে আরেকটু চুলকে নরম করে ধান রোপণ করবে। ধানগাছ বড় হবে। ধান আসবে। শস্যে, সবুজে ভরে উঠবে শরীর। বিষ মুছে যেতে থাকবে।

শরীর বিষমুক্ত হওয়ার স্বপ্ন থেকে মনে পড়ে একদিনের কথা। সেদিন সন্ধ্যায় এসেছে জোবায়ের। এসে বলে, মাউই মা, স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।

কেন? তুই তো বলেছিলি, পড়ানোর মতো মজার কাজ আর নেই।

না, ছয় মাস পড়িয়ে টের পেয়েছি, শুধু সিলেবাস শেষ করা। নিজের মতো কিছু করা যায় না।

কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই কিছুক্ষণ পর জোবায়ের বলে, এই পৃথিবীটা কোথাও হারিয়ে যাবে। বুঝেছেন? আমরা একে ধীরে ধীরে গুম করে ফেলছি।

বুড়ির মনে পড়ে, তার চাচাত ভাইয়ের ছেলে সরোয়ারও হারিয়ে গেছে। পেপারে খবর বেরিয়েছে, সে গুম হয়ে গেছে। প্রায় দুই বছর তার কোনো খবর নেই।

জোবায়ের তার স্কুলের গল্প বলে। তাদের এক ম্যাডাম বলেন, ডেমোক্রিটাস কি বলেছিলেন জানেন? তিনি বলেছিলেন, পারস্যের রাজা হওয়ার চেয়ে বরং প্রকৃতির নতুন নিয়ম আবিষ্কার করব।

কথাটা ওকে ভাবায়। মনে পড়ে তাদের হেড মাস্টারের কথা। বিউটি ম্যাডাম তো প্রায় বলেন, হেড মাস্টার সাহেব কাউকে না বলতে পারেন না।

হাসনাহেনা ম্যাডাম বলেন, উনি তো নেপোলিয়নের বন্ধু। নেপোলিয়ন কি বলেছিলেন মনে আছে? আমার ডিকশনারিতে ‘না’ বলে কোনো শব্দ নেই।

আহ কী নির্মল বাতাস! জোবায়ের আপনমনে বলে।

বিউটি চাকমা বলেন, নির্মল দাস বাতাস।

হেড মাস্টারের নাম নির্মল দাস। তাকে নিয়ে প্রায় সময় এরকম হাসাহাসি চলে।

কথা ঘুরিয়ে হাসনাহেনা বলেন, বিউটি, তোর ছেলের নাকের উপর দিয়ে ট্রাক গেছে মনে হয়। নাকটা এত চ্যাপটা কেন?

বিউটি বলেন, ওর ফুফু বলে, সন্তু লারমার মতো নাক।

সবাই হু হু করে হাসে।

সব গল্প তার মনে পড়ে। কী একটা নাম যেন, সে ভুলে গেছে। লোকটার নাম বলে জোবায়ের বলেছিল, তিনি চেয়েছিলেন দুনিয়ার সব মানুষ সম্মানের সাথে বাঁচবে। কারো কাছে এক হাজার কোটি টাকা আর কারো কাছে মাত্র এক হাজার টাকা থাকবে, তা হবে না।

বুঝলি ধান, তোকে জন্মাতে হবে। একটা ধান থেকে হাজার ধান হবে। ধানে ধানে চারপাশ ভরিয়ে দিবি।

শোন, আমার চাচি ছিল রোহিঙ্গা। চাচা বার্মা মুল্লুকে গিয়েছিল চাকরি করতে। সেখান থেকে চাচিকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। তবে, শেষকালে চাচিকে দুঃখী দেখেছি। মা-বাবা, ভাইবোনদের জন্য কাঁদত।

ততদিনে রাখাইনে বার্মার সেনাদের ধর্ষণ, অত্যাচার থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। চাচি তাকে কাছে ডেকে বলেছিল, দেখেছিস! কত লোক দেশহারা হয়ে গেল।

চাচি শেষ মুহূর্তে বলেছিল, ভালোবাসা আর সম্মান ছাড়া বাঁচা যায়? মৃত্যুর আগে দেশে যেতে চেয়েছিল। বলেছিল, একবার বুক ভরে দেশের বাতাসটা টেনে নেব। সেই আশা পূরণ হয় নি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে, হে ধান, তুই আমার আশা পূরণ করবি?

ছাইয়ের উপর একটুখানি মাটি। সেখানে হাত বুলিয়ে বলে, আমি তোকে ভালোবাসা দেবো, সম্মান দেবো। তুই বাঁচ, আমাকেও বাঁচা।

মানুষ মরে গেলে হাত-পা, মুখ যেমন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, বুড়ির মন এখন তেমন। একেবারে মৃত্যুর মতন। স্বামীর মৃতদেহের কথা মনে পড়েছে। সেই ভোরে উত্তর-দক্ষিণ শোয়ানো ছিল। মুখটা একটুখানি হাঁ করা, যেন চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবছে। একটু পর চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে হাসবে।

কবরে যেরকম একা থাকতে হয়, মানুষ তো সেই রকম একা। কবিরাজের কথা ভাবতে ভাবতে এটাই মনে হয়। ধানটা যেখানে রুয়েছে, সেই স্থানটা একটু ছুঁয়ে দিতে চায়। কিন্তু ছোঁয় না। যদি বিষ লেগে যায়!

১৯.
ধানকে জোবায়েরের কথা বলে বুড়ি। ছেলেটা তো আধা পাগল। তবে ভালো কবিতা পড়ত। ছোটদের জন্য অনেক অনুষ্ঠান করেছে। ওর গলাটা শরতের নীল আকাশের মতো। চোখে খেলা করত আষাঢ়ের বৃষ্টির ফোঁটা। হাসিটা ছিল একেবারে সকালের কোমল আলো।

তার মনে হয়, ছাইয়ের আড়ালে একটা ধানবীজ। বীজের মধ্যে জোবায়ের ঘুমিয়ে আছে। বাস্তবে তো ছুঁতে পারব না, মনে মনে তোকে একটু ছুঁয়ে দিই। এই বলে সে তাকে ছোঁয়। তার ছোঁয়ায় জোবায়ের কেঁপে ওঠে। মনে হয় বৈশাখী বাতাস বইছে।

জোবায়ের বলে, ছোটবেলায় মাকে পাই নি। বড় হয়ে আপনাকে পেয়েছি। আপনিই আমার মা।

তখন জোবায়ের স্কুলে শিক্ষকতা করত। যতীন স্যারকে ডাকত বাঘা যতীন। স্যারের মুখ ছিল গল্পের মুখ। স্বদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন যত মানুষ, সূর্য সেন থেকে শুরু করে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, নূর হোসেন—একেকদিন একেকজনের কথা বলতেন।

একদিন জোবায়ের জিজ্ঞেস করল, স্যার উপনিষদ পড়েছেন?

তিনি বলেন, প্রায় বারোটা উপনিষদ আছে। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে ঈশ উপনিষদ। এর প্রথম শ্লোকটা হচ্ছে, এই গতিশীল বিশ্বে প্রত্যেকের মধ্যে ঈশ্বর আছেন। তোমরা তাকে উপলব্ধি করতে পারলে জ্ঞানের উন্মীলন হবে। ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করো, পরধনে লোভ করো না।

কাছেই একটা মন্দির। সেদিন সে মন্দিরের সেবায়েতের কাছে গেল। ধর্ম, মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে অনেক কথা হলো।

সেবায়েত অত পণ্ডিত নন। তবে চোখ-মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি গভীর অনুভবের মানুষ। তার হাত ধরেন, হাতের পিঠ ছুঁয়ে দেন।

জোবায়ের লোকনাথের ছবিটার দিকে তাকায়। অশ্বত্থগাছের পাতা নড়ে। সে মনুর কথা, মানুষের কথা ভাবে। মহাপ্লাবনের কথাও মনে আসে। ভাবে ব্রহ্মা, বৌদ্ধ, যিশু, আদম (আ.), নূহ (আ.) ও মোহাম্মদের (সা.) কথা। ভাবে, মানুষ কেন জন্মে? বাঁচেও-বা কেন? মনে হয়, মানুষ জন্মে নিজের অজান্তে, ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে। তার মন কি জন্মের আগে থেকে থাকে? নাকি শরীর তৈরি হওয়ার পর মন গড়ে ওঠে!

এটা লোকনাথের মন্দির। নারায়ণগঞ্জে লোকনাথ বাবার জন্মস্থানের কথা শুনেছে। ওখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই যায়। কোনো ভেদাভেদ নেই।

বেঁচে থাকতে কেমন লাগে? সেবায়েতকে জিজ্ঞেস করে।

সেবায়েত মৃদু হেসে তাকান আকাশের দিকে। সামনের তুলসী গাছটাও দেখেন। যেন ওই গাছের পাতায় জবাব লেখা আছে।

তার হাসি দেখে ভালো লাগে জুবায়েরের। সেবায়েত বুকের বাঁ পাশে হাত রাখেন। বলেন, বাবা, একটু জোরে শ্বাস নাও।

জুবায়ের নিশ্বাস নেয়। বুকটা ফুলে ওঠে।

শ্বাস ছাড়ো।

সে ছেড়ে দেয়।

কী বুঝলে?

সে কিছু বলে না।


মানুষের জীবন তো শেষ হয় পরাজয় দিয়ে। মানুষ মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয়।


সেবায়েত বলেন, জীবন তো এ রকম স্ফীত হওয়া আর চুপসে যাওয়া। নাই আর আছি। স্রষ্টা তোমাকে সব দিয়েছেন। এখন এর মধ্যে তোমাকে বুঝে নিতে হবে; হৃদয় আর মস্তিষ্ক দিয়ে যতটুকু বুঝে নিতে পারো।

জুবায়ের চোখ বন্ধ করে। মনে হচ্ছে বহু দূর থেকে কেউ কথা বলছে। চোখ খুলে সে হাসে। বলে, আমি বুঝে গেছি।

একটু পর বলে, সেদিন এক হুজুরের কাছে গিয়েছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হুজুর, বেঁচে থাকতে কেমন লাগে? তিনি কি বলেছিলেন জানেন?

সেবায়েত কোনো কথা বলেন না। একটুখানি বাতাস তাদের ছুঁয়ে যায়।

হুজুর বলেছেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। একটু চুপ থেকে বলেন, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন। এখন ঝোলায় যে যতটুকু নিতে পারে।

আরেকটা কথা বলেছিলেন। সবকিছু দিল থেকে বুঝে নিতে হয়।

জুবায়েরের ভেতর কে যেন বলে, ফিল, ফিল, ফিল।

সেবায়েত বলেন, ঠিক, অনুভব করাটাই আসল। আমরা যদি সবকিছু ঠিকভাবে অনুভব করতে পারি, আরেকজনের বেদনা বুঝতে পারি, এত হানাহানি থাকে না।

বুড়ি বলে, ধান, আমি তোকে অনুভব করছি। তুইও আমাকে একটু অনুভব কর।

তার কথা শুনে ধান গভীর নিশ্বাস ফেলে বলে, অনুভব করো।

২০.
আমরা পৃথিবীর কলিজায় হাত দিয়েছি। জোবায়ের একদিন এ কথা মরিয়মের দাদুকে বলেছিল। পানে চুন লাগিয়ে বুড়ি তার দিকে তাকিয়েছিল। বুঝতে চেষ্টা করছিল, কথাটার মানে কী।

তার মনে হয় এখন একটু একটু বুঝতে পারছে। মানুষের জীবন তো শেষ হয় পরাজয় দিয়ে। মানুষ মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয়।

ধানের গেঁজ কবে বেরুবে? সে শুধু অপেক্ষা করে। তার অপেক্ষার, কষ্টের শেষ নেই। ওর মনের কথা হয়তো ধান টের পায়। ধান ভাবে, এই মাটি, ছাই আর বিষের সঙ্গে সে সংগ্রাম করছে, বুড়ি কি তা জানে না? মনে হয় জানে না। সে বলে, তোমাকে একটা গল্প শোনাব। মরিয়মের দাদু, তোমার কি মনে আছে?

বুড়ি বলে, কী?

মরা খাওয়ার জন্য শকুন কিভাবে নেমে আসে? কিভাবে মাংস খায়?

মনে আছে, আমাদের বাড়ির পাশে জমিতে কয়েকবার দেখেছিলাম।

তোমার বাবা একবার বলেছিল, শকুনের দোয়ায় গরু মরে না।

হ্যাঁ, মনে আছে।

এখন এই মাটি, ছাই, বাতাস বলছে, ধান তুই মরে যা, ছাই হয়ে যা। আমি কি মরে যাব?

না। তুই কি মশকরা করছিস?

ধান ম্লান হাসে।

বুড়ি বলে, একবার চোখ মেলে আমাকে দেখ।

ধান দেখে, রোগে-শোকে জর্জরিত এক বুড়ি। কিন্তু তার চোখে-মুখে এমন দৃঢ়তা, এই দৃঢ়তা দেখে ধানের জড়তা, ভয় কেটে যায়। সে বলে, একটা গল্প বলো।

তুইই তো গল্প শোনাবি বলেছিলি।

ভুলে গেছি।

আমিও তো ভুলে গেছি।

একটু পর বুড়ি ছাই নাড়াচাড়া করে। বলে, আচ্ছা, তুই এক কাজ কর, তুই আমার নাতনি হয়ে যা।

ধান হাসে। বলে, হয়ে গেলাম।

চল আমরা পালাই।

কোথায়?

এখান থেকে পালাতে হবে।

কোথায় যাবে?

তুই হাঁটবি আর পথটা সবুজ হয়ে যাবে। আমি তোর পেছন পেছন সেই পথ ধরে যাব।

যেন মজার কোনো কৌতুক শুনেছে, ধান হাসে।

বুড়ি ভাবে, হাতে যদি একটি লাঠি থাকত, ছাইগুলোকে পিটিয়ে গাছপালা বানিয়ে দিত। গাছের ঝিরঝিরে বাতাস মনের উপর দিয়ে বয়ে যায়। শীতে তো বিলে পানি থাকে না। বর্ষায় অবিরাম বৃষ্টিতে পানি জমে। সেখানে মাছ কোত্থেকে হয়? আমি তো মরে যাব। অনেকদিন পর যদি বৃষ্টি হয়, পানি জমে, এখানে কি কোনো মানুষ জন্মাবে?

মনে পড়ে, আষাঢ় মাসের এক রাত। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ব্যাঙ ডাকছে, অনেক অনেক ব্যাঙ। কবিরাজ মকবুলকে নিয়ে বিলে যায়। তার হাতে পলো, মকবুলের হাতে টর্চলাইট।

বাবাও বিলের কৈ আর মাগুর মাছ খেতে পছন্দ করত। বলী বলে তাকে খেতে হয় বেশি। কুস্তির জন্য শরীর ঠিক রাখতে হয়।

একদিন বলল, এই যে এত এত খাচ্ছি, এটা তো অপরাধ।

মা বলল, কথা না বললে ভাত হজম হয় না?

বাবার চেহারা গম্ভীর। মায়ের কথায় কান দেয় না।

অপরাধীর কণ্ঠে বলে, মাঝে মাঝে ভাবি, ছেড়ে দেবো। এসব লড়াই, বেশি খাওয়ায় বিরক্তি এসে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ একবেলা খেতে পায় না, অনেকে সারা দিনে হয়তো একমুঠো খায়। শেষ পর্যন্ত বাবা সময়ের আগেই খেলা ছেড়ে দিয়েছিল।

একটা তারা দেখবে বলে বুড়ি আকাশের দিকে চোখ রেখেছিল। ছোটবেলার কথা হৈচৈ করে মনের কোনায় ভিড় করল। নিজের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইল। বলতে চাইল বাবার সঙ্গেও।


মা বলছে, এই ছাইয়ের মধ্যে তোকে হাল চষতে হবে। লাঙলের গুঁতায় ছাই সরে মাটি দেখা দেবে।


বাবা জীবনকে খেলা হিসেবেই নিয়েছিল। এ কথা অনেকবার তাকে বলেছে। বাবা বলত, আনন্দ হলো বড় কথা। আনন্দ পেলাম না, শান্তি পেলাম না, তাহলে কী করব? তবে লড়াই করব। লড়াইয়ে মজা আছে। লড়াই করতে না জানলে কিসের মানুষ?

ধানকে বলল, তুই আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?

ধান হয়তো আশপাশে তাকাতে চেষ্টা করছে।

সে বলল, মরার ছা মরা, দুনিয়ার অভিশপ্ত মানুষের জন্য আজ আমার এরকম সং সাজা।

ধান মুচকি হাসে।

বুড়ির মনে পড়ে সরোয়ারের কথা। ওর মতো তাকেও কি কেউ গুম করে অন্য জগতে পাঠিয়ে দিয়েছে! এই চিন্তায় অস্বস্তি বাড়ে। মায়ের ডাক শুনতে চায়।

দূর থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে আসছে। মা বলছে, এই ছাইয়ের মধ্যে তোকে হাল চষতে হবে। লাঙলের গুঁতায় ছাই সরে মাটি দেখা দেবে। সেখানে রোপণ করবি ধান। কিভাবে হাল চষতে হয়, রোপণ করতে হয়, না জানলে তোর বাবাকে ডাক দিবি। ও দেখিয়ে দেবে।

রাতে স্বপ্ন দেখে, অনেক দূরের এক গ্রামে যাচ্ছে। সেখানে নাকি মহিষের খামার আছে। কিন্তু মহিষ খুঁজে পায় না। যার কাছে যায়, সে তাকে ধর্ষণ করে। এরপর একটা কোলা ব্যাঙ দেয়। বলে, এটা মহিষ। নিয়ে যা। মহিষ দিয়ে চাষ করবি।

আশ্চর্য কাণ্ড, দিনে দিনে কোলা ব্যাঙটা মহিষ হয়ে যায়। সে দেখে, অদূরে বড় একটা মহিষ। কালো, তেলতেলে গা। পেছনের অংশ দেখা যাচ্ছে। মহিষটার বাচ্চা হবে। প্রথমে দেখা গেল পা। পরে পা ঘুরে গেল; বেরিয়ে এল মাথা।

জন্মের পরপরই দুলে দুলে হাঁটে। জিহ্বা দিয়ে ছাই ছুঁয়ে দেখে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ছাই খাওয়া শুরু করে।

আশেপাশে আরো মহিষ। ওরাও ছাই খাচ্ছে। মহিষের ছাই খাওয়া দেখে ভাবল, এই মহিষগুলো দিয়ে সে চাষ করা শুরু করবে। হাল চষতে চষতে ছাই সরিয়ে দেবে।


৮ পর্বের লিংক
জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)