ধানশি : ৬

ধানশি : ৬
109
0
৫ পর্বের লিংক

পর্ব- ৬

১৫.
একবার কবিরাজ শহরে গিয়েছিল। আসার সময় কী মনে করে তার জন্য ফুল নিয়ে আসে। এক তোড়ায় পাঁচটা গোলাপ। বড় বড়, সতেজ। নাটকীয়ভাবে তার হাতে দেয়।

সে তো অবাক। ওর আবার কী হলো? একটু পর মনে পড়ল, আজ তাদের বিয়ে বার্ষিকী। গোলাপগুলোর সুবাস যে মনে রয়ে গেছে, টের পেল একটু আগে। গন্ধটা পেয়ে তার মন ভরে। খিদেও কমে গেছে।

সে বলে, বুঝলি ধান, কোনো এক মুহূর্তে আমিও ঢুকে যাব তোর ভেতর।

ধান হাসে। ঢুকে কী করবে?

তোকে কাতুকুতু দেবো।

কাতুকুতু! কেন?

ওমা! দেবো না, না দিলে তুই তাড়াতাড়ি মাটি ফেটে বের হবি?

ধান বলে, আমার জন্য গোলাপের গন্ধ আনবে।

আনব।

আর তোমার কবিরাজের হাসিমুখ।

আনব।

তার ওষুধের প্রস্তুত প্রণালি।

আনব।

তার একটা শুভ ইচ্ছা।

আনবরে আনব। ওর সবকিছুই তো আমার মধ্যে আছে। ও আদর করার সময় আমাকে সব দিয়ে দিত।


অনেকদিন পর সে স্বামীর শরীরের গন্ধ পায়। মনে হয়, শীতের ভাপাপিঠার মতো তার শরীর থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আঁকাবাঁকা রেখা হয়ে উড়ছে।


ধানের চেহারা কেমন যেন হয়; কিছুটা লজ্জিত, রং পাল্টানো। বুড়ি দেখতে পায়। সে হাসে। কেননা কবিরাজের সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তের কথা তার মনে পড়েছে। একবার হয়েছিল কী… না, থাক। ওই কথা এখন ভাববে না। কেন যেন সেও লজ্জা পায়। মুখ ফেরায় ধান থেকে। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। অনুভব করে, পাশে কেউ একজন আছে। অনেকদিন পর সে স্বামীর শরীরের গন্ধ পায়। মনে হয়, শীতের ভাপাপিঠার মতো তার শরীর থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আঁকাবাঁকা রেখা হয়ে উড়ছে। বুক ভরে শ্বাস নেয়। শরীরে সেই পরিচিত নাচন। বুক বেয়ে হাতটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে যায়। নিচের ওই রহস্যময়তাকে কবিরাজ বলত বাঁকা নদী। সে বোঝে, বাঁকা নদীর পাড়ে কবিরাজের স্বপ্নের গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। গাছের পাতা ছোঁয়। আহ! গাছের হাওয়ায় তার মন জুড়িয়ে যায়।

এসময় মকবুলের কথা মনে পড়ে। ছেলেটা তার মনের কাছে থাকে না। দূরে দূরে থাকে। সে চায় নি ও বিদেশ যাক। একমাত্র ছেলে, চোখের সামনে থাকবে—এটাই ছিল প্রত্যাশা।

তার অন্ধ বোনটা বলত, বেশি আশা করলে ওই রকম হয়।

মকবুল আজ সকাল থেকে মনের মধ্যে ‘মা, ও মা’ ডাকছে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বলল, মা, আমি বিদেশ যাব।

সে চিতই পিঠা বানাচ্ছিল। অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল। তখন মকবুল তার স্বপ্নের কথা বলে। দেখলাম, আমার বিদেশ যাওয়ার সবকিছু ঠিকঠাক। রওনা দেওয়ার আগে ভিসার কাগজটা খুঁজে পাই না। পুরো ঘর ফাত্তা ফাত্তা করি। কিন্তু পাই না। তখন আমি বের হই। একটা ভ্যানগাড়ি যাচ্ছিল। ওটায় উঠি। আমার পাশে একটা মেয়েও আছে। গাড়িটা পানির উপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে চলেছে। আমাদের যে জায়গায় নামিয়ে দেয় সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

কিছুক্ষণ পর ওই অন্ধকার একটি বাস হয়ে যায়। আমি বাসে উঠি। বাসে ছাদ নেই। গাড়িটা যায় উল্টো পথে। চালকের সঙ্গে রাগারাগি করে নেমে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে দেখি একটি ষাঁড়। ষাঁড়টা শিং ঘুরিয়ে হুমকি দিচ্ছে। রাস্তা পার হতে পারি না। ঘুরপথে বারমাসিয়া চা বাগানে ঢুকি। বাগানে কোনো চা গাছ নেই। কার্তিক মুণ্ডা নামে এক শ্রমিক লাঠি হাতে একা হাঁটছে।

চিতই পিঠা খোলা থেকে নামিয়ে বিরক্ত চোখে সে ছেলের দিকে তাকায়। কেউ স্বপ্নের কথা জানালে বলতে হয়, ভালো দেখেছিস। কথাটি বলবে কিনা ভাবে।

মনটা খারাপ। মরিয়মের কথা, শেখ সাদির কথাও মনে পড়ল। মরিয়মের মা নরমে-গরমে মেশানো। তবে তার মধ্যে নরমটা বেশি। ওর শান্ত দুটি চোখ, যখন তাকায়, ওকে খুব ভালো লাগে।

যেন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিতে পুকুর-বিল ভরে গেছে। সেই পানিতে তার ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি কাতাল মাছের মতো সাঁতার কাটছে।

সে মাছের পেটি খুব পছন্দ করত। মাছ কিনলে তার জন্য পেটি রেখে দিত মরিয়মের মা। তবে মরিয়ম কম দুষ্টু নয়। সে-ও পেটি খাওয়ার জন্য বায়না ধরত। কম পড়লে কান্নাকাটি করত। পেটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেউ না দেখে মতো ভাতের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। বলত, জাদু দেখ, পেটি নেই। একটু পর বের করে অর্ধেক দাদুকে দিত, অর্ধেক নিজে খেত। বলত, দাদু, তুমি মাছের পেটি খাচ্ছ, তোমার বুকে মাছ গাছ উঠবে।

বুড়ি বুকে হাত দেয়। ক’খানা হাড় বেরিয়ে এসেছে। ভাবে, মাছ গাছ না উঠলেও কোনো একটা গাছ যদি উঠত! কিংবা সে নিজেই যদি গাছ হয়ে যেত, কেমন হতো?

১৬.
বুড়ির মনে সায়গর। সেখানে জোবায়ের ভাসছে। তার কোমরে বয়া। সে সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ছে আর কবিতা পড়ছে :

ও পারমাণবিক বোমা
খেলা আছে তোমার সাথে,
বরফের গোলা বানিয়ে
ছড়াব তোমায়
এন্টার্কটিকায়।
আর কী কত কত চাই?
দরকার নেই তোমার
অহংকার, সংঘাত!
চলে যাও; পরমাণু
ছাড়াই হোক কিছুটা
মাতামাতি, হাতাহাতি।

জোবায়ের তাকে কত কত কথা বলেছিল! সব মনে আছে। দুনিয়ার কান্না থেকে এ ছেলেটা জন্মেছে বলে মনে হয়। তার এত দুঃখ ছিল! দুঃখজলেই শেষ পর্যন্ত মুখ লুকিয়েছে। পুকুরে ডুবে মারা যাওয়ার খবর শুনে সারা দিন সে কেঁদেছিল। ওর মৃত মুখ দেখতে যায় নি। ওই মুখ দেখলে যে তার নিষ্পাপ হাসিমাখা, ভালোবাসায় জড়ানো মুখটার কথা ভুলে যাবে।

শহরে একটা স্কুলে চাকরি করত। সেটা ছেড়ে দিল। কোথায় থাকবে, কী খাবে? কঠিন অবস্থা। পরে একটি দলের অফিসে থাকত। ওই এক বছর বাড়িতেও যায় নি। পরিবারের বড় ছেলে, কিন্তু বাড়ির খবর নেয় নি। ওর বাবা অবসরে। ওরা কিভাবে আছে, জানার গরজ ছিল না। এরপর আসে তাদের বাড়ি। ওর আপা প্রতিদিন ঘ্যানঘ্যান করত। সে পাত্তা দিত না। বলত, বেশিদিন থাকব না, চিন্তা করো না।

জমির আল ধরে হাঁটত, ধানের ছায়ায় বসত। দিনের শেষে এসে আপনমনে বলত, এই আলে আর ধানে কত ইতিহাস, কেউ লেখেনি তা। এইবার আমি চাষা হব। লিখব জমির ইতিহাস।

একটা মেয়েকে ভালো লাগত। কবিতার মতো ছুঁতে চাইত তার হৃদয়। মেয়েটা রাজি হতো না। সেই কথা মাউইকে বলেছিল।

তার মনে হয় না জোবায়ের ডুবে মরেছে। সে নিশ্চয় সাঁতার জানত। একবার কি তাকে কাটতে দেখে নি! আসলে সে অতল জলের রহস্য ছুঁতে গেছে।

জোবায়ের আপনমনে পড়ে :

একটি সকাল
একটু রোদ
জেগে ওঠা পাখি
দরকার মতো
ধরতে দাও
অস্থি মজ্জা
রস
রসের গড়িয়ে পড়া;
একবার হয়তো
দেখব স্বপ্ন
ধরতে চাইব ওড়াউড়ি
তোমাকে
কান্না
একটুখানি নুন
নুনের সমুদ্র…


শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপুনি। মনে হচ্ছে, কাঁপতে কাঁপতে শরীরটা হারিয়ে যাবে।


সকাল হয়েছে। জেগে উঠেছে জোবায়ের। শুয়ে শুয়েই কবিতায় ডুবে যায়। বলে, সর্বনাশের আরো কাছাকাছি যাওয়ার জন্য একটু পর তুই দৌড়াবি। নিজের পেছনে বাঁশ দিয়ে তুই বলবি, বাহ! বেশ।

তারপর সে আড়মোড়া ভাঙে। পাখির কিচিরমিচিরের মতো বলে যায় :

আমার তোমার আর্তনাদে
ফুটে ওঠে ফুল
আমি ভুল ভেবে
সন্তানের মুখে তাকাই
তারপর হত্যা করি।
হে হন্তারক
এবার হবে বৈঠক
জলের তলে
জলের মৃত্যুর মতো
তুমি আমাকে বলবে ঘুম
আমি মৃত্যুকে চুমু দিয়ে
উদ্বাস্তু যেসব চোখ
পৃথিবীর আনাচে কানাচে
উড়ে বেড়ায়, কাঁদে
সেখানে ঠিক লুকাব।
আমাকে খুঁজে নিও অশ্রুয়
অবেলায় অবহেলায়।
তারপর বলে,
পৃথিবী একটি কবিতা
মাত্র চার লাইনের,
বুঝতে পারি নি
একটি লাইনও।

প্রায় তিন মাস ছিল। তারপর একদিন সকালে কিছু না বলে চলে যায়। যাওয়ার আগে এক লাইনের একটা চিঠি লিখেছিল। মরিয়ম ভেঙে ভেঙে তা পড়ে শুনিয়েছে, ‘মাউই মা, আরেক জনমে তুমি আমার মা হইও।’

সে মনে মনে মা হয়ে যায়। মা হয়ে যায় শহরে। মুরাদপুর থেকে টেম্পোতে ওঠে। আন্দরকিল্লার মোড়ে নামে। একবার কবিরাজের সঙ্গে এখানে এসেছিল। শক্তি ঔষধালয়সহ আরো কয়েক জায়গায় গিয়েছিল। শাহী মসজিদের প্রবেশপথটা দেখে। তার মনে পড়ে, জোবায়ের বলেছিল, এটা প্রথমে ছিল মুঘলদের কেল্লা। তারপর ব্রিটিশরা দখল করে। ব্রিটিশদের ঘোড়ার আস্তাবল ছিল এখানে। হাজারি লেইনে পার্টি অফিসের বেঞ্চে শুয়ে শুয়ে ও নাকি অনেকবার ঘোড়ার ডাক ও নাক ঝাড়ার শব্দ শুনেছে।

সে নজির আহমদ চৌধুরী রোড দিয়ে হাঁটে। কাটা পাহাড় পেরিয়ে হাজারি লেইনে ঢুকতেই হাতের ডানে কুয়াটি ছিল। কুয়া খুঁজে পায় না।

পার্টি অফিসে ঢোকার মুখে একটা কুকুর অলস বসে আছে। এক বুড়ো, কিছুটা শূন্য তার দৃষ্টি; প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে পেছনের যজ্ঞডুমুর গাছের দিকে তাকিয়েছিলেন। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ান।

বুড়ি জোবায়েরের কথা বলে। তখন বুড়ো তাকে আপনজনের মতো খাতির করে বসান। একজনকে পাঠান চা আর সিঙারা আনতে।

সে আশেপাশে চোখ বুলায়। দেয়ালে লেখা আছে : দুনিয়ার মজদুর ও নিপীড়িত জাতিসমূহ এক হও। চারপাশে অনেক ছবি। মণি সিংহ, অনঙ্গ, কল্পতরু, বেগম রোকেয়া, কমরেড ফরহাদসহ বিদেশি কয়েকজনের ছবি।

ছবি থেকে চোখ সরিয়ে বুড়োর দিকে তাকায়। চোখে-মুখে কেমন নিস্পৃহতা। জোবায়েরের কথা বললে বিষণ্ন লোকটার মুখে আরো বিষণ্ন হাসি ফোটে। লোকটা ওর মৃত্যুর কথা জানতে চান। সে বিস্তারিত বলে। তখন দেখে, লোকটার চোখ পানিতে টলটল। তার চোখও ভরে ওঠে। এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে।

বুড়ো বলেন, সেই ১৯৭০ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলাম। তারপর জীবনটা এখন যেখানে এসে থেমেছে সেখানে গ্রামের ভিটা, শহরের জায়গা কিছুই নেই। একজন সর্বহারা বলতে পারেন। এখন আমার বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। ছোট ভাই আছে। ও আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। স্কুলে মাস্টারি করে।

বুড়ি বউ-ছেলেমেয়ের কথা জানতে চাইলে মৃদু হেসে বলেন, দুই ভাইয়ের কেউ বিয়ে করি নি।

শুনতে শুনতে দুঃখে বুড়ির মনটা শূন্য হয়ে যায়। ডুমুর গাছটা দেখে। এই গাছটার কথা জোবায়ের অনেকবার বলেছিল। তার মনে হয়, এই যে ভাঙাচোরা লোকটা তার সামনে বসে আছেন, লোকটা হলদে হয়ে যাওয়া ডুমুর।

টেবিলের এক পাশে ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে একটা ডায়েরি। লোকটা ভেতরে গেলে সে তুলে নেয়। প্রথম পাতা খুলেই দেখে জোবায়েরের নাম। চমকে তাকায়। তাড়াতাড়ি শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছে। পাতা উল্টায়। এক জায়গায় লেখা আছে : গরিবি তো এখনো হটে নি…

একটা পৃষ্ঠায় কবিতা :
অমর এইসব দীর্ঘশ্বাস;
জীবনের জয়গানে
আজ নেই
শিশুর মতো বেহালা,
পুঁজির পুঁজে লুকিয়েছে সব
কোথাও তো নেই কেউ
শুধু লাল লাল শব।

হাজারি লেইন থেকে বেরিয়ে এই গলি, ওই গলি, লালদিঘির পাড়, জেলখানার গেট—নানা জায়গা ঘোরে। সিনেমা প্যালেসের সামনে দেখে, কয়েকটা মেয়ে মুখে রং মেখে সিনেমার পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

পুলিশ দেখে মেয়েগুলো দৌড়াতে থাকে। কোনো মেয়েকে এভাবে দৌড়াতে দেখে নি। সে কিছু বুঝতে পারে না। হাঁ করে চেয়ে থাকে।

১৭.
শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপুনি। মনে হচ্ছে, কাঁপতে কাঁপতে শরীরটা হারিয়ে যাবে। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। শোনে, একটি ঘোড়া টগবগ করে যাচ্ছে। ঘোড়ায় চড়া লোকটার কণ্ঠ বাবার মতো, বলছে, সাবধান! অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল সেই আওয়াজ।

বাবার কণ্ঠ শুনে চোখ মেলতে চায়, হাত-পা একটু নাড়াতে চায়। কিন্তু পারে না। তার খুব শীত করে। পৌষের ঘন কুয়াশায় মোড়ানো শীত। কাঁপতে কাঁপতে মারা যাচ্ছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। আরেকটু হলে জিহ্বা দিয়ে হাত চাটত। কিন্তু তার আগেই দুর্বল হাত গড়িয়ে পড়ে। তাতে ছাই লাগে। জ্বলুনি আরো বেড়ে যায়।


রাতে ঘুমাতে গেলে ব্যথা ছাপিয়ে একটু দোলা টের পেয়েছিল। তবে সেদিনের দোলায় ছিল অস্বস্তি।


মারা যাওয়ার আগে কিছু একটা দেখতে চায় সে। তখন সম্ভবত শেষ রাত। মাটিতে হাত বুলায়। বুঝল, মাটি একটু একটু নড়ছে। মৃদু আওয়াজও হচ্ছে। মাটি কি ফাটছে! ধানগাছ বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে!

একটু একটু আলো। দিন শুরু হচ্ছে। অনেকক্ষণ গড়াগড়ির পর চোখ মেলতে পারে। বুঝতে পারে সে মরে নি। রোপণ করা ধানটার একটু দূরেই শুয়েছিল। কাছে গিয়ে দেখে, মাটিতে একটু ফাটল। কিন্তু ধানের অঙ্কুরের কোনো চিহ্ন নেই।

বুড়ি আবার ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্নের মধ্যে দেখে, মাটি ফেটে চারাটা উপরে উঠেছে। মরিয়মের মতো সে নাচে। তার নাচ দেখে মরিয়ম মুখে হাত দিয়ে হাসে। বলে, একটা বুড়ি নাচে। তারপর সেও নাচতে থাকে।

ঘুম থেকে উঠে দেখে, চারপাশ আরো ফ্যাকাশে। প্রথম যখন ধানটা পায়, সেদিন কী বার ছিল? মনে করতে পারে না। চোখ মেলে সবে আকাশের দিকে তাকিয়েছে। এক ফোঁটা পানি এসে ঠোঁটের কোনায় পড়ে।

পাখি উড়ে যাওয়ার সময় পায়খানা করে। তা নাচতে নাচতে নিচে পড়তে দেখেছে। মাথায় কাক, শালিকের গু-ও কয়েকবার পড়েছে। তার হঠাৎ গুয়ের কথা মনে পড়ল। বিশ্বাস হতে চাইল না ঠোঁটের ফাঁকে ওটা পানির স্পর্শ। মনে হয় পানি নয়, পানির স্বপ্ন। স্বপ্নের মধ্যে সে তাকাল। অদূরেই ধানটা মাটিতে একটুখানি চাপা দিয়েছিল। সেখানে গেল। দেখল, মরিয়মের মুচকি হাসি একেবারে। হ্যাঁ, ফুটে উঠেছে জীবনের আভাস। একটুখানি গেঁজ বেরিয়েছে। ধানের পাতা মুখ তুলে দুনিয়ার পানে তাকিয়েছে।

তখন কী যে হলো, কেঁপে উঠল বুকটা। বহু বছর আগে মামাত ভাইয়ের স্পর্শে এরকম কেঁপে উঠেছিল।

স্পষ্ট মনে আছে, তখন সে কিশোরী। বেড়াতে গেছে নানাবাড়ি। এক সন্ধ্যায় ঘরে একলা পেয়ে মামাত ভাই জোর করে চুমু দিয়েছিল। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে তার ঠোঁট কামড়ে দিয়েছে। সে ব্যথা পেয়েছিল।

রাতে ঘুমাতে গেলে ব্যথা ছাপিয়ে একটু দোলা টের পেয়েছিল। তবে সেদিনের দোলায় ছিল অস্বস্তি। আজ একেবারে অন্যরকম। আজ যেন ধ্যানীর ধ্যান ভেঙেছে। বহুদিনের অভুক্ত শরীর, মরতে বসা শরীর। অনেকদিনের কষ্ট ভেঙে ভেঙে গড়িয়ে যাচ্ছে। ভেতরে নেচে নেচে কেউ ডাকছে, আয়।


৭ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)