ধানশি : ৪

ধানশি : ৪
128
0
৩ পর্বের লিংক

৯.
বলীর ঘাম, নির্বলীর ঘুম। কথাটা বলেছিল বাবা। নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে সেই কথা মনে পড়ে।

বাঁচতে হলে ঘাম ঝরাতে হবে। এমনি এমনি তো কিছু পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো কিছু ছাড়া কিভাবে বাঁচা যায়?

বুড়ির মনে হয়, আশপাশে অনেক সৈন্য। তারা বিড়ি ফুঁকছে আর তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। একটা বুড়ি; পঞ্চান্ন-ষাট বছর বয়স, ক’দিন পর মরে যাবে। দেখি, সে কিভাবে বাঁচার চেষ্টা করে। বলছে, তোকে একটা দড়ি দেবো, তুই দড়ি লাফ খেলবি। তারপর দড়িটা গলায় দিয়ে মরবি।

নিজের ওপর তার খুব রাগ হয়। নিজেকেই যেন বলে, মরার বুড়ি, তোর কোনো কাজ নাই, শুধু বসে বসে ঝিমানো। হিম্মত থাকলে আয়, আমার সঙ্গে হাত লাগা। দেখি তোর বাহুতে কত শক্তি।

কিন্তু কোনো জবাব আসে না।

তখন ওষুধের থলেটা কাঁধে নিয়ে কাঞ্চুরহাট বাজার থেকে কবিরাজ আসে। উঠানে দাঁড়িয়ে বলে, এত রাগ কার সঙ্গে করো?

সে স্বামীকে মুখ ভেঙায়। কবিরাজ হেসে বলে, নিজের কাজটা করে যাও না। আরেকজন কী বলবে বা করবে সেদিকে তাকিয়ে থেকো না।


পৃথিবীটা আসলে একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটাকে প্রতিদিন আমরা একটু একটু ভেঙে দিচ্ছি।


বুড়ি ধান খোঁজার বদলে মাটি খুঁড়তে থাকে। নিজের কথা ভুলে গিয়ে মাটির কথা ভাবে। টলটলে জলভরা একটা দিঘির কথা ভাবে। কতক্ষণ খুঁড়েছে মনে নেই।

হাত-পা ছড়িয়ে ছাইয়ের উপর শুয়ে পড়ে। বড় বড় নিশ্বাস নেয়। তাকায় উপরের দিকে। কল্পনা করে, ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিতে ছাইগুলো ভিজছে।

বাতাসে জলীয় বাষ্পের গন্ধ টের পায়। এ তো বৃষ্টিরই গন্ধ। বুক ভরে নিতে চায়।

উঠে দেখে, তার খোঁড়া গর্ত থেকে একটু পানি বেরিয়েছে। কালচে পানি। বাড়ির পেছনের জলাশয়ের পচা পানিও এর চেয়ে ভালো। কিন্তু তার অত সব খেয়াল থাকে না। সে উঠে তালুয় নিয়ে খেয়ে ফেলে। ওষুধের চেয়েও তিতা। থাক, কিছু হবে না। মানুষ তো বিষ খেয়ে বিষ হজম করে।

বিষের কথা মনে হওয়ায় চোখ খোলে। এতক্ষণ ঝিমুনির মধ্যে ভাবনা আসছিল। সব কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। ধানের কথা মনে পড়ে। ওটা হারিয়ে ফেলেছে। এখন কোথায় খুঁজবে?

বুক ফেটে কান্না আসে। কাঁদতে কাঁদতে ভাবে, মেয়ে হওয়ার আগের দিনও বাড়ির পাশে বিল থেকে গোবর কুড়িয়ে এনেছে। লম্বা কাঠিতে মেখে গোলার পাশে শুকাতে দিয়েছে। পরিশ্রম করতে সে কখনো পিছপা হয় না।

তাদের তো মাত্র দুটি সন্তান। কবিরাজকে অনেকবার বলেছে, ঘরভর্তি ছেলেপিলে না থাকলে কি ভালো লাগে! যতবার বলত ততবার হাসত কবিরাজ। কিন্তু কিছু বলত না। একদিন রাতে তাকে শক্ত করে ধরল। দুষ্টুমি করে ঠোঁটটা কামড়ে দিয়ে বলল, আজ বলতে হবে তুমি কেন চাও না। না বললে তোমার খবর আছে। তখন কবিরাজ উল্টো তার ঠোঁট কামড়ে দিয়ে বলেছিল পরিকল্পিত জীবনের কথা। দেশের জনসংখ্যা যে অনেক বেড়ে গেছে সেই কথাও বলেছিল।

সে বলেছিল, ছোটকাল থেকে বাড়িতে ঘরভর্তি মানুষ দেখেছি। কম মানুষ দেখলে ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

জবাবে কবিরাজ মুচকি হেসেছিল।

মাথার মধ্যে পিড়পিড় করছে। মনে হয় পিঁপড়া হাঁটছে। মাথায় তো ঘা। ধানটা কি ঘায়ের ভেতর দিয়ে মাথায় ঢুকে গেছে! ওখানে ধানগাছ উঠবে?

তার মুখে মুচকি হাসি ফোটে। আহ! বহুদিন পর মুখের রেখায় থাকা ছাইগুলো নড়ে উঠল। আশপাশে সরে গিয়ে ভাবল, বুড়ি কিভাবে হাসে একটু দেখি।

পরক্ষণে সে আবার চিন্তায় অস্থির হয়। বীজ কে জমা রাখে? ভাবে, নারীই তো রাখে। চারা গজিয়ে দেওয়ার কাজ কে করে? আমরাই তো করি। তা পুরুষের হাতে তুলে দিই। আল্লাহ তুমি আমার হাতে এই ধানটা তুলে দাও। কোথায় আছে আমাকে একটু পাইয়ে দাও। প্রার্থনা করে আর খোঁজে। বলে, ধানটার জন্য আমি মাটি খুঁজে নিয়েছি।

বুড়ি ভাবে, দুনিয়ায় যতগুলো গাছ ছিল সব আজ ছাই হয়ে গেছে। ছাইয়ের কোথাও না কোথাও জীবনের কণা নিশ্চয় লুকিয়ে আছে। তারা সবাই প্রার্থনায় বসেছে। বলছে, এই ধানটাকে বাঁচিয়ে দাও। আমাদের সকল কিছু তার কাছে পৌঁছে দাও। পৌঁছানোর জন্য ওরা বাহক খোঁজে। হয়তো পেয়েও যাবে।

আবার ভাবে, কার কাছে প্রার্থনা করছে? এই দুনিয়ায় কেউ কি আছে?

১০.
পৃথিবীটা আসলে একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটাকে প্রতিদিন আমরা একটু একটু ভেঙে দিচ্ছি।

এ জাতীয় একটা কথা জোবায়ের বা অন্য কেউ বলেছিল। বুড়ি ভাবে, আমার বেঁচে থাকাও তো একটা স্বপ্ন। যদি স্বপ্নের মধ্যে থাকা যায়, মন্দ কি? বুঝলি ধান, আমি তো নাই হয়ে যাচ্ছি। তবে আমার স্বপ্ন আছে।

স্বপ্নের পথ ধরে সে হাঁটে। পায়ের তলায় ছাই। উঠানে শুকাতে দেওয়া ধান দুই পায়ে নাড়াত। ছাইও সেভাবে নাড়িয়ে ধান খোঁজে।

দেখে একটা শালিক। ডানায় রোদ নিয়ে এসেছে। এনে ধানগাছের গায়ে ঢেলে দেয়। কলকলিয়ে হেসে ওঠে ধানগাছ। রোদের মাঝে সবুজ পাতা ঝিকমিক করে।

তখন জোবায়ের আপন মনে কবিতা পড়ছে :

দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে
দহন করে মারতে হবে।…

ধানের জন্য সে এমন অস্থির হয়ে আছে, এই সকালে সবকিছুই অসহ্য লাগছে। বাঁ হাতের তালুর যে স্থানে ধানটা লেগেছিল, সেখানে হাত বুলায়। ইশারায় অদৃশ্য ধানকে চুমু খায়। হয়তো তখনো ঠোঁটে লেগেছিল শুকনো রক্ত। ঠোঁটের বাম কোনার ঘা থেকে একটুখানি রস বেরিয়ে একবিন্দু শিশিরের মতো ফুটে আছে।

তার ছটফটানি দেখে ধানটা হয়তো কোথাও থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। কিছু বলতে চায়। কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।

হয়তো বুড়ি অচেনা একটা গন্ধ পায়। গন্ধ পেয়ে আউলা হয়ে যায় তার মাথা। সে নিজের সঙ্গে কথা বলতে চায়। জোবায়েরকে ডাকতে চায়। পাগলাটা যখন মৃদু হাসিমুখে তাকায়, শান্ত স্বরে কথা বলে, খুবই ভালো লাগে।

সে আবার হাঁটা শুরু করে। এই হাঁটা জোবায়েরের কবিতা পড়ার মতো। মনে মনে শক্তি পায়। বলে, ধানটা আমি খুঁজে পাবই।


আনন্দে থাকলে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে আর দুঃখে পড়লে ফিরে পায়। 


স্বপ্নে সে দেখেছিল, একটা ফড়িং ঘষে ঘষে নিজের গা থেকে সবুজ তুলছে। তারপর তা আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছোটবেলায় এক ভিক্ষুকের পায়ের ঘায়ে একটা পোকা দেখেছিল। স্বপ্নের মধ্যে সেই কথাও মনে পড়েছে। মনে পড়ে নিজের ঘায়ের কথা। সে ঘা হাতড়ায়। ওখানে কোথাও কি ওটা আছে! ব্যথাকে পাত্তা দেয় না। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পরপর কয়েকটা হাই তোলে। চোখ মেলতে পারে না। কে যেন আঠা দিয়ে আটকে রেখেছে। অনেকক্ষণ বসে থাকে। গরু হাম্বা ডাকছে। অনেকদিন পর সে গরুর ডাক শুনতে পায়। গাভিটা তার দিকে মরিয়মের মতো তাকাত।

তখন হঠাৎ ডান বাহুর দিকে চোখ যায়। ওখানে ঘা’টা একটু বড়। ঘায়ের ফাঁকে কী একটা আটকে আছে না! ধান! তাড়াতাড়ি বাম হাত বাড়ায়। লম্বা নখে চিমটি কেটে বের করে আনে। হ্যাঁ, সত্যিই তো, ধান। ঘায়ের রসে লেপ্টে ছিল। একটু ভেজা, ফ্যাকােশে।

সে তাড়াতাড়ি ছাই দিয়ে মেখে ধান থেকে দূষিত রস মুছে ফেলতে চায়। ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে। চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। নিজের ওপর রাগ হয়, আবার খুশিও হয়। এ এক অদ্ভুত অবস্থা।

১১.
আনন্দে থাকলে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে আর দুঃখে পড়লে ফিরে পায়। বুড়িও নিজের কাছে ফিরে আসে। মনের ভেতর যেন জোবায়েরের ল্যাপটপ। ল্যাপটপে সব ভেসে ওঠে। সে বুঝতে পারে তাকে কী করতে হবে।

প্রথম কথা, তাকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে কেন? এত কিছু ছাই হয়ে গেছে, সেও ছাই হয়ে গেলে কী হয়? না, ছাই সে হবে না। এই দুনিয়া এত সহজে ছারখার হতে পারে! হয়তো পারে, হয়েই তো গেছে। সত্যিই কি কেউ থাকবে না!

জোবায়ের কবিতা পড়ে। বুড়ি ছাইয়ের দিকে তাকিয়ে শোনে :

তোমার শৈশব এক গ্রাম
যত দূরে যাও তুমি, কখনোই
সে গ্রামের সীমানা পেরোতে পারবে না।
তারপর পড়ে,
জরায়ুর মতন ছোট্ট, গোপন এক গাঁয়ে
জন্মেছিলাম আমি।
কখনো যাই নি একে ছেড়ে।…

জোবায়ের বলে, পৃথিবী রয়েছে জেগে চক্ষু মেলে। আমি তার পথে হাঁটছি হাজার বছর ধরে। আহ! পৃথিবীর উঠত যদি খিঁচুনি, আরেকবার দেখে নিতাম নিজেকে।

বুড়ি কবিতা বোঝে না। তবে তার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। অনেক কিছুই মনে আছে। মনে হয়, আশা, ভালোবাসা এসব মিথ্যা। মিথ্যার কত কত পা থাকে! কোনো একটা পা ভুল করে সত্যের দিকে চলে যেতেও পারে। সে ভাবে, তেমনি তার এক পা জীবনের দিকে যাবে। খুঁজে পাবে প্রাণ। নিজেকে ফেরাবে সে।

এই আশায় বুকে হাত রাখে। ধুকপুক, ধুকপুক করছে। ছাই সরিয়ে তাকে কিছু খুঁজতে বলছে। খুঁজলে পাওয়া যায়। তুমিও পাবে। বেঁচে থাকার পথ তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে।

জোবায়ের বলে, নিজেকে রক্ষা করে নয়, বরং বিলিয়ে দিয়েই আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন।

সে ভাবে, জীবনটা কি আমরা অন্যের স্বার্থে যাপন করি? ধানের জন্য যদি তার হাত যায়, জীবন যায়, পরোয়া নেই। বাতাস লাগবে। বাতাস পেয়ে ধানের নতুন জন্ম হবে।

জোবায়ের হেসে বলে, মাউই মা, একটু নির্লোভ, ভালোবাসাময় না হলে বাঁচব কিভাবে?

সে বলে, আশা তো অদৃশ্য হয়ে গেল।

জোবায়ের বলে, গুজরাটে ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গেছে। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এ ডাইনোসর দাবিয়ে বেড়াত। এখন ডাইনোসর আছে? নেই।

বুড়ির মনটা দুঃখে ভারাক্রান্ত। বলে, বেঁচে থাকার মানে কী? কেন বেঁচে আছি?

জোবায়ের আপনমনে বলে, দেখ, পানি, বাতাস, গাছপালা সমস্ত কিছু তোমার জন্য। কিন্তু তুমি কাউকে বন্ধু বানাও নি। স্বার্থের জন্য তাদের ধ্বংস করছ। তাই তুমিও ধ্বংস হবে। তোমার জন্য কারো কিছু করার থাকবে না।

আর বুড়ি ভাবে, ছাইয়ের ভেতর থেকে উঠে আসবে জনবসতি। সেখানে ঘুরে বেড়াবে জোবায়ের। সে ওর ল্যাপটপ ছাইয়ে ফেলে দেয়। আকাশে একটু একটু মেঘ জমেছে মনে হয়। কালবৈশাখীর আগে উত্তর আকাশে ঘন হয়ে জমা মেঘের মতো এই মেঘ। দেখলেই ভয় লাগে।

চৈত্র মাসে বাতাসে হঠাৎ ঘূর্ণি উঠত। ঘূর্ণির কেন্দ্র ধুলোয় ভরে যেত। কিচ্ছু দেখা যেত না। এখন তেমন আঁধার। মনে হলো, একটা বক উড়ে গেল। ভালোভাবে তাকাল। বক নাকি বকের ছায়া! অনেক বছর পর সেই বকটার কথা মনে পড়ল।

ছোটবেলায় বাবা একদিন বাজার থেকে একটা বক নিয়ে এল। মা জিজ্ঞেস করল, বক কোথায় পেলে?

বাবা বলল, কিনে এনেছি। বকের সুক (ঝোল) খেলে শক্তি বাড়ে।

বকের চোখের দিকে তাকাল সে। এমন মায়া! সে তো পাগল। করল কী, বাবার কাছ থেকে ওটা নিয়ে নিল। ভাত দিল, চাল দিল, পানিও দিল।

বাবা মাকে বলল, কাল সকালে জবাই করিও।


গোলাপের গন্ধের ভেতর সেই বকটাই যেন উড়ে এসেছে। তাকে জিজ্ঞেস করছে, কেমন আছ?


ছোট্ট একটা বেতের খাঁচা। খাঁচার এক কোনায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে বক। তার খুব কষ্ট হলো।

তখন বিকেলের আলো মুছে যায় নি। সে উঠানের পাশে জামগাছের নিচে বসল। একটুখানি রোদ এসে বকের গা ছুঁয়েছে। রোদে হাত বুলায়। যেন বকের গায়ে বুলিয়ে দিল।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে ঘরে ঢোকে। বকের দিকে তাকায়। কী করে না করে সব দেখে। রাতে শোওয়ার সময় আরেক কাণ্ড। সে বককে পাশে নিয়ে শোবে। কিন্তু মায়ের আপত্তি। ওটা পায়খানা করে দেবে। সে বলে, নিচে একটা পুরনো কাপড় দেবো।

এই বায়নার জন্য মায়ের চড় খায়। কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে, আঁই বক লই শুইয়ুম।

সে সবার ছোট আর আদুরে। তাই কোনো নিষেধ শুনতে চায় না। শেষে বাবা বলল, ঠিক আছে।

ভোরে মসজিদে যখন ফজরের আজান দেয়, তার ঘুম ভাঙে। সঙ্গে সঙ্গে সে লাফিয়ে ওঠে। দেখে, বকটা তখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বক কি সারা রাত নির্ঘুম ছিল! মা-বাবার জন্য কেঁদেছে?

তার মনও কেঁদে ওঠে। সে মোড়াটা নেয়। দরজার কাছে মোড়া রেখে হুক খোলে। জামগাছের কাছে গিয়ে খাঁচার রশিটা খুলে দেয়। বক নড়ে না। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বকটা ধরে। ওটা তার হাতে কামড় দেয়। তবুও সে গা করে না। উড়িয়ে দেয়। বক মনে হয় বিশ্বাস করে নি। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। সে ফিসফিসিয়ে ‘শি শি’ করে। আরো কাছে গিয়ে হাত দিয়ে তাড়ায়। একটু পর বকটা উড়াল দেয়। প্রথমে জাম গাছে, তারপর কোথায় যায় সে আর দেখে না। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজাটা চেপে দিয়ে শুয়ে পড়ে। তবে খাঁচাটা আনতে ভুলে যায়। তার জন্য আফসোস হয়। খাঁচা পাশে থাকলে একটা মিথ্যা বলা যেত।

এখন একটা পালক আঁকা-বাঁকা উড়ে এসে তার নাক ছুঁয়ে যায়। পড়ে ছাইয়ের উপর। সে তখন গোলাপ ফুলের গন্ধ পায়। গোলাপের গন্ধ স্নিগ্ধ। তার মনও স্নিগ্ধ হয়।

গোলাপের গন্ধের ভেতর সেই বকটাই যেন উড়ে এসেছে। তাকে জিজ্ঞেস করছে, কেমন আছ?

সে বলছে, আছি।

বেঁচে আছ—এটাই বড় কথা।

কিভাবে বলি? মরে তো যাই নি। মরার পর ভালো না মন্দ তা তো জানি না। জানলে বুঝতে পারতাম।

বকটা মৃদু হেসে উড়ে যায়। বলে, পালকটা রেখে দিও।

সে আশপাশে তাকায়। কিছু ছাই উড়ছে। কিন্তু কোথাও পালক খুঁজে পায় না। তার মনে হয়, দয়া-মায়ার একটা ঘর আছে। কারা যেন সেই ঘরে তালা মেরে দিয়েছে। সে চাবিটা খোঁজে। ধান যখন খুঁজে পেয়েছে, চাবিটাও নিশ্চয় পাবে।


৫ পর্বের লিংক 

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)