ধানশি : ৩

ধানশি : ৩
118
0
২ পর্বের লিংক

পর্ব- ৩

৬.
মাটি খেয়ে বুড়ি কাশে। কাশতে কাশতে পানি খোঁজে। এখানে পানি কোথায়! কাশি আরো বাড়ে। এক পর্যায়ে বমি করে। কালচে বাদামি কফের মতো বেরোয়। কফের দিকে চেয়ে আবার বমি পায়। ওয়াক ওয়াক করে। নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে আসার অবস্থা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত; লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না।

স্বপ্নের মধ্যে বাবাকে দেখে। বাবা তাকে ডাকছে। কিন্তু ঘুমের জন্য, ক্ষুধার জন্য সে চোখ মেলতে পারে না। আবছা শুনতে পায়, বাবা বলছে, তোর ধানটা কোথায়? ওটা দেখছি না কেন? ওটায় রক্ত লেগে আছে কিনা দেখ তো।

সে জাগতে চায়। কেউ দুই চোখে টেপ লাগিয়ে দিয়েছে। খুলতে পারে না।

একটা গরুর গাড়ি, গাড়িটাতে চড়ে যাচ্ছে নানির বাপের বাড়ি। সেই কোন ছোটবেলার কথা; পথে লাল গরুটা পাগলামি শুরু করে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করে, কাঁধ থেকে জোয়াল সরাতে চায়। না পেরে আরো রেগে যায়। দৌড়ে কোথাও চলে যেতে চাইল। হেঁচকা-হেঁচকিতে গাড়ি উল্টে গেল।


ধানের যেন দুটি ডানা গজিয়েছে। ডানা মেলে উড়াল দিয়েছে অন্য কোনো দুনিয়ায়।


গাড়ি থেকে পড়ে নানি রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে বাড়ি খায়। মাথায় ও কোমরে আঘাত পেয়েছে। হাসপাতালে থাকতে হয় অনেকদিন। কিন্তু আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বেশিরভাগ সময় বিছানায় শুয়ে থাকে। সকালে ও বিকেলে পিঠে তিন-চারটা বালিশ দিয়ে বসানো হয়। তার ব্যবহার পাল্টে যায়। কেউ না কেউ সবসময় কাছে থাকা চাই, না হয় খিটিমিটি করে, অভিশাপ দেয়।

মামা বলে, মাকে শান্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

আত্মীয়-স্বজন, নাতি-নাতনি যত আছে, পালা করে কেউ না কেউ তার সঙ্গে থাকে। বাবা তাকে নিয়ে গিয়েছিল। সেবার সে প্রায় এক মাস ছিল।

অচল হওয়ার পর নানির সব শক্তি এসে জমা হয়েছিল মুখে। নানারকম কথা বলত। কথার কোনো আগা-মাথা থাকত না।

একদিন নানি বলল, এরকম পানি জীবনে দেখি নি। পানিরে পানি, যেন সায়গর। তোর মামা কৈ জালি বসিয়েছে। প্রথম দিন ধরা পড়ল একটা সাপ, ঢোঁড়া সাপ। সাথে কয়েকটা কৈ, তেলাপিয়া আর এক পোয়া ওজনের একটা রুই। পরদিন কী হলো জানিস? পানি কেন সরছে না তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। মাছ ধরার উৎসবও সমানতালে চলছে।

নানির কথা থামছে না। বলল, তোর মামা ভোরে উত্তর বিলে কৈ জালি বসিয়েছে। সকালে ঘরে এসে দুটো পানিভাত খায়। খেয়ে আবার যায়। জাল একটু তুলে মাছ আটকেছে কিনা দেখার চেষ্টা করে, পারে না। এত ভার কেন? দেখতে দেখতে একেবারে শেষ মাথায় যায়। গিয়ে দেখে এক কোনায় জাল কামড়ে ধরে আছে ইয়া বড় একটা বোয়াল মাছ। ওরে বাবারে! সঙ্গে সঙ্গে হৈচৈ পড়ে যায়।

নানি বলে, বোয়াল হলো রাক্ষুসে আর বোকা। যারা বেশি বড় আর শক্তিশালী, তারা একটু বোকাটে হয়। জানিস? নতুন পানি পেয়ে পুকুর থেকে বেরিয়ে গেছে ওটা। জালে মাথা আটকে গেছে। কোনোমতেই ছাড়াতে পারে না। সে তো রাগী। ছাড়াতে না পেরে জালটা জোরে কামড়ে ধরে। ওটার ওজন কত জানিস? চৌদ্দ কেজি। লম্বায় তোর চেয়ে একটু বেশি হবে।

আরো একটু স্বপ্ন, স্বপ্নের মধ্যে বুড়ি পায় পাকা আমের গন্ধ। আম ছুলে দেখে ভেতরে কালো পোকা। পোকাটা আস্তে করে বেরিয়ে যায়। আমে ছিদ্র ছিল না। তাহলে পোকা ভেতরে গেল কিভাবে?

মানুষের মনেও কি ওই রকম পোকা ঢোকে! খেয়ে শেষ করে দেয়! ভাবতে ভাবতে তার অসহায় লাগে। মাথা নাড়ে। মাথার আগায় মহিষের মতো দুটো শিং। শিং দিয়ে হয়তো ওই পোকাকে ঢুসি মারবে।

তখন মামা ডাকে, ডেকে বোয়াল মাছটা তাকে দিয়ে দেয়। সে খুশি হয়ে মাছ নিয়ে পুকুরে ছেড়ে দেয়। পানায় বসা সবুজ ফড়িং দেখে। ফড়িংটা ঘষে ঘষে তার গা থেকে সবুজ তুলে ফেলছে।

ধানটা পাওয়ার পর তার মনে হয়েছিল সে কিছু একটা পাবে। এভাবে মরে যেতে হবে না। কথাটা মনে মনে জপছিল। এখন দেখে, ফড়িংটা উড়ে গেছে। আর সে বুড়ি নয়, শিশু। পানিতে লম্বা লম্বা ধানগাছ। গাছের আগায় ধানের ভারে নুয়ে পড়া ছড়া পানি ছুঁইছুঁই। বাবা কাস্তে দিয়ে ধান কাটছে। সেও সমানতালে কাটে।

কাটতে কাটতে দেখে ধানগুলো উড়ে যাচ্ছে আর বাবা হাসছে। সে দৌড়ায়। ধানের ছড়া ধরবে। কিন্তু একটা ছড়াও ধরতে পারে না।

৭.
গত রাতে স্বপ্নের মাঝে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। তার সকালটাও শুরু হয় কান্না দিয়ে। সামান্য আলোয় রাত আর দিনের পার্থক্য হয়। মেঘলা আকাশ থাকলে যে আলো এখন দিনের আলোও তেমন।

একটু আগে ঘুম ভেঙেছে। গা টানা দিয়ে আলসেমি ঝাড়তে গিয়ে বুঝল সারা গায়ে ব্যথা। হাড়গুলো খুলে পড়ে যাবে মনে হলো। পাশ ফিরে শোয়।

উঠে বসতে অনেক কষ্ট হয়। ডান হাতের মুঠি খোলে। মুহূর্তে পুরো শরীরটা ঝাঁকি খায়। মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। না, ধানটা নেই। দুর্বলতা কোথায় চলে যায়! লাফিয়ে ওঠে সে। আশপাশ খোঁজে। ছাই উল্টে পাল্টে দেখে। মাটির আশপাশ ও গর্ত দেখে। নেই। ধানের যেন দুটি ডানা গজিয়েছে। ডানা মেলে উড়াল দিয়েছে অন্য কোনো দুনিয়ায়। সেখানে সবুজ ঘাস, হাঁসের ডাক, গাছপালার মৃদু হাওয়া, শস্য-শ্যামল, আম-জাম-কাঁঠালের মতো রসালো সব।

বুড়ি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। শুরু হয় কান্না। তার কান্না কে দেখবে? সন্তান মারা গেলেও কোনো মা বোধহয় এত কাঁদে না।

ধানটাকে কোথায় খুঁজবে সে? ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে। কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়। এলোমেলো পায়ে হাঁটে। এখনই যেন পড়ে যাবে, তবে পড়ে না।

কোথায় হারাতে পারে ওটা? ভাবতে ভাবতে এক বিকেলের কথা মনে পড়ে। আষাঢ়ের বিকেল। দখিনা বাতাস বইছে। একবার মকবুল তাদেরকে নিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিল। সমুদ্রের পাড়ে যে বাতাস ছিল, বিকেলের বাতাস সেই রকম।

ঘরের পাশেই তার দেবরদের খোলা জায়গা। চারপাশে গাছপালা। আমগাছের বড় একটা শিকড় আছে। অবসরে মহিলারা সেখানে বসে গল্পগুজব আর পরচর্চা করে।

বেশিরভাগ জমিতে চাষ দেওয়া হয়েছে। এখন লাঙল কম, ট্র্যাক্টরেই বেশি চাষ হয়। তাই চষা জমি সমান। জমিতে জমা পানিতে আকাশের নীল-সাদা লেপ্টে আছে। কয়েকজন লোক কোদাল দিয়ে আল ছাঁটছে। দিগন্ত বিস্তৃত গাছপালা। কয়েকটা জমিতে বীজতলা। কোথাও ছোট, কোথাও বড় ধানের চারা।

একটা জমিতে মাছ ধরছে তার ভাসুরের দুই নাতি। তারা পেয়েছে টাকি, ছোট ছোট কৈ, পুঁটি ও মলা মাছ। ছোট নাইলোটিকাও আছে। বালতি দিয়ে পানি সেচা হয়েছে। কাদাপানি রয়ে গেছে। বড় বালতি দিয়ে ঘোলা পানি জোরে নাড়িয়ে দেয়। একটা-দুটো মাছ লাফিয়ে ওঠে। গাপুস করে খাবার খাওয়ার মতো ধরে সে। পাশের জমিতে কোথাও পানি, কোথাও শুকনো। ছোট মুরগিটা কী যেন খুঁজছে। একটা মলা মাছ পেয়ে ঠোঁটে নিয়ে অবাক চোখে একবার আকাশের দিকে তাকায়। তারপর গিলে ফেলে।

মরিয়ম পাশে দাঁড়িয়েছিল। সে ছাগলছানা দেখেছে। দাদির সঙ্গে ঘরে যাওয়ার সময় বলে, দাদু, আমার জন্য একটা ছাগলছানা কিনবে?

কেন?

স্কুল থেকে আসার সময় দুটা ছাগলছানা দেখেছি। একটা শিংওয়ালা, আরেকটা শিং ছাড়া। শিং ছাড়া ছাগলছানাকে আদর করেছি। নরম আর পাতলা।

পাতলা! দাদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

মরিয়মের কথা এখনো কানের আগায় উড়ে বেড়াচ্ছে। বুড়ি বসে পড়ে। দুই হাতে ছাই নাড়িয়ে দেয়। কোথাও ডুবে আছে ধানটা। তাকে খুঁজে পেতেই হবে। মাছ ধরার মতো ধরতে হবে।


তখন তো আমি কিশোরী। চুলে বাঁধা লাল ফিতার মতো ওড়ে আমার মন। 


তার দাদা প্রায় বারো বছর ঘরবসা ছিল। শেষের দিকে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। দাদার এক পাশে থাকত ওর বাবা, আরেক পাশে মা। মা শ্বশুরকে নিজের বাবার মতো সেবাযত্ন করত। রাতে ঘুমানোর সময় শ্বশুরের বুকে হাত রেখে ঘুমাত। যেন কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু একদিন ঘুমের মধ্যে মারা যায়। কখন মরেছে বলতেও পারে না।

মৃত্যু এসে দাদাকে নিয়ে গেছে। কেউ এসে ধানটা নিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার হলে কে আর তাকে ধরে রাখতে পারে?

হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে, সেদিন সম্ভবত হাটবার ছিল। সবাই হাটে চলে গেছে। সে কলসি নিয়ে পানি আনতে গেছে মসজিদের পুকুরে। টিউবওয়েলের পানিতে চা বানালে কালো হয়ে যায়। চায়ে পুকুরের পানি ব্যবহার করে। আশপাশে কোনো শব্দ নেই। পুকুরে ভাসছে কয়েকটি রুই মাছ। তাকে দেখে ঘাই মেরে ডুব দেয়।

মাছের ডুব দেওয়াটা এখন মনে ঘাই মারছে। সেও যদি ওভাবে ছাইয়ে ডুব দেয়, তাহলে ধানটা খুঁজে পাবে?

৮.
এক গাছ বাজে
এক গাছ সাজে
এক গাছ মরার মাথা
আরেক গাছে ছেঁড়া কাঁথা

উত্তরটা হবে কড়ই, শিমুল, বেল ও কলাগাছ। সেই কোন ছোটকালে মা বলেছিল, আজ কেন মনে পড়ল জানে না। আশপাশে শুধু গাছ দেখতে ইচ্ছে করছে।

হারিয়ে ফেলা ধানকে বলল, আমার বাবার কথা তোকে বলেছিলাম? বাবা বলী ছিল। বুঝলি? বাবা যখন মারা গেল, সাত-আট দিন কিছুই খেতে পারি নি। সবাই জোর করে খাওয়াতে চেষ্টা করত। আমি বমি করে দিতাম।

একদিন ঘুমের মধ্যে বাবা এসে ডাকে। বেঁচে থাকতে যেভাবে ডাকত, ঠিক সেভাবেই। ডাক পেয়ে আমার বুক ধড়ফড় করে।

বাবা বলল, তুই আমার মেয়ে?

আমি তো অবাক। তোমার মেয়ে না হয়ে কার মেয়ে হব?

বাবা তখন বলল, যখন আমি লড়াইয়ে নামি, পরপর পনেরোবার হেরেছি। সেই গল্প তোকে বলেছিলাম।

হ্যাঁ, বলেছ।

ওটা কি তোর মনে নেই?

আছে তো।

তাহলে!

বাবা কী বলতে চাইছে আমি বুঝতে পারি।

বাবা বলত, লড়াই করতে নামলেই বুনো এক হিংস্রতা আমার মনে ভর করে। তার লম্বা লম্বা ধারালো দাঁত। সেই হিংস্র লোকটা প্রতিপক্ষের চোখ, হাত, দাঁত, বাহু—সব দেখে। গভীর মনোযোগে এক পলক দেখে মনে গেঁথে নেয়।

একটু পরই ওর ওপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে। একেক আঘাতে প্রতিপক্ষের একেকটি অঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। মোট কথা তার অস্তিত্ব শূন্য করে দেবে।

বাবা বলে, গরমের সময় দমকা হাওয়া এলে শরীরে-মনে শান্তির পরশ লাগে। লড়াইয়ের শুরুতে কোত্থেকে দমকা হাওয়া আসে। তখন আমি প্রতিপক্ষের দিকে আবার তাকাই। ভাবি, ও লড়াই করতে আসার সময় ওর বউ কোন রঙের শাড়ি পরেছিল। ছেলে হলে কত বড়, মেয়ে হলে কতটুকু বয়স। তারপর আমার কেমন যেন লাগে। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকে কিভাবে কম আঘাতে তাকে পরাজিত করা যায়। ক্রোধ, আক্রোশ সব ধোঁয়া হয়ে উড়ে যায়। মনে বাজনা বাজে, খেলা, খেলা, খেলা।

তার চোখে চোখ রেখে বাবা বলল, বুঝলি সাজু, হার ছাড়া জীবন হয় না। জিতকে যেমন করে নিস, হারকেও তেমন করে নিতে হবে। যতক্ষণ জীবন আছে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে।

তখন তো আমি কিশোরী। চুলে বাঁধা লাল ফিতার মতো ওড়ে আমার মন। বাবা বলে, শান্ত হয়ে বস। মনের মধ্যে একটি ভাবনাগাছ রোপণ কর। দেখবি, একটু না একটু আশা সেই গাছে থাকবেই।

একদিনের কথা। আমার বিয়ে হতে তখনো চার-পাঁচ বছর দেরি। তোকে কানে কানে বলি, আমার বিয়ে হয়েছিল পনেরো বছর বয়সে। বাবা লড়াই করতে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে। প্রায় পনেরো দিন বিছানায় ছিল। দিন-রাত সেবা করেছি।

এক সন্ধ্যায় বলল, বুঝলি মা, তাগড়া শরীর, কুস্তি লড়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করত। সাহস করে একদিন আচমকা এক আসরে নেমে গেছি। কোনো কৌশল জানতাম না। প্রথম ধাক্কায় কুপোকাত।

বাবা বলে চলে, তারপর যখন বাড়ি এলাম, আমি অন্য মানুষ। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। কোনো আলো নেই, আশা নেই। গভীর অন্ধকারে বসে আছি। তারপরও মনের ভেতরে কেউ বলল, হ্যাঁ, তুই পেরেছিস। সাহস করে লড়াইয়ে নেমেছিস।

এক গ্লাস পানি খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। কিছু খাওয়ার জন্য তোর দাদি ডাক দেয়। আমি পেছনে তাকাই না। হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে যাই। নদীর বাতাস আমাকে পাগল করে দেয়। বয়ে চলা অন্ধকার নদী আর আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। ভেতর থেকে কেউ বলল, তোর সাহস আছে। তুই পারবি। আমি ঘাসের উপর শুয়ে পড়ি।

ঘাসে শুয়ে থাকা বাবাকে দেখছে বুড়ি। বাবা বলছে, তারপর থেকে আমার মধ্যে শুধু একটাই গান, লড়াই, লড়াই, লড়াই। যেখানে প্রতিযোগিতা হয় সেখানে আমি হাজির। ময়দানে নেমে পড়ি, লড়াই করি আর পরাজিত হই। পরাজিত হতে হতে ভুল কোথায় হচ্ছে জানার চেষ্টা করি। কৌশল শিখতে থাকি।

সেদিন ছিল আমার পনেরোতম লড়াই। লড়াইয়ে জিততে জিততে হেরে গেছি। মন খারাপ করে বসে আছি বটগাছের নিচে।

কিছুক্ষণ পর এক লোক এসে আমার কাঁধে হাত রাখেন। নিজের বাহুটা দেখিয়ে বলেন, এককালে আমিও লড়তাম। তার বাড়ির ঠিকানা দেন। বলেন, আমার বাড়িতে আসবে।

একদিন তার বাড়ি যাই। তিনি অনেক কথা শোনান। প্রতিদিন আসতে বলেন। আমি যাই। তিনি শেখান। লড়াই আর জীবনের মানে উপলব্ধি করতে শেখান। আমি বুঝি, লড়াইয়ে জেতাটাই সব নয়। এর বাইরেও কিছু আছে।

এ নিয়ে পনেরোবার হেরেছি। ওস্তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিন-চার মাস কোথাও যাই নি। নিজে নিজে চর্চা করেছি। প্রায় পাঁচ মাস পর লড়াইয়ে নামি। ষোলবারের বার প্রথম জিতি। বুঝলি, জেতা খুব সহজ, আবার একেবারেই কঠিন। জয়ের স্বাদ কেমন তা বুঝলাম। সকালে পুকুরে জাল মেরে বড় কাতলা মাছ ধরা হলো। তোর দাদি রান্না করল। দুপুরে সেই মাছ, মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে যেরকম মজা, এই মজা তার চেয়েও উপাদেয়।


জোবায়ের বলে, ওরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। বাঁচার জন্য লড়াই করে।


ছোটবেলায় অপরিচিত মানুষ দেখলে বুড়ি ভয় পেত। আড়ষ্টতা কাজ করত। কাছে যেত না। বাবা ধীরে ধীরে তার মধ্যে সাহস তৈরি করেছে। স্বপ্নের ভেতর সেই কথা মনে পড়ে।

বুড়ি বলে, বাবা, আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। লড়াই কী আমি এখন বুঝতে পারছি। একসময় না একসময় এ ছাই থেকে বেরুব।

এ কথা শুনে বাবা তাকে একটা মেডেল দেয়। সে বলে, মেডেল দিয়ে কী করব? সেটা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। একটা বড়শিতে মেডেলটা গেঁথে যায়।

মেডেলের ফিতাটা যখন পতাকার মতো উড়ছে, তখন তার ঘুম ভেঙে যায়। সে লাফিয়ে ওঠে। চারপাশে গভীর অন্ধকার।

নিজের গা-ও দেখতে পাচ্ছে না। ডান হাতে ছাই নাড়াচাড়া করে। আপনমনে বলে, আল্লাহ! তুমি আমার ধানটা খুঁজে পেতে সাহায্য করো।

চোখে এক ফোঁটা পানি। বসে থাকতে পারছিল না। পেটটা পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। ভেতরে ডাক ছাড়ছে। যেন কয়েকটা রাক্ষস পেটের ভেতর লাফালাফি করছে। একটা পাথর বাঁধতে পারলে বেশ হতো। খিদার চাপ কমে যেত।

কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ে। জোবায়ের তার কানের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, মাউই মা, জীবন আছে এমন যেকোনো প্রাণী কী করে জানেন?

সে চুপ করে অন্ধকারের দিকে চেয়ে আছে।

জোবায়ের বলে, ওরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। বাঁচার জন্য লড়াই করে।


৪ পর্ব আগামী বৃহস্পতিবার

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)