ধানশি : ২

ধানশি : ২
177
0
১ পর্বের লিংক

৪.
তুষারপাতে তুষার যেভাবে ওড়ে, ছাইও সেভাবে উড়ছে। আজ কতদিন অভুক্ত, সেই কথা তো মনে নেই। বুড়ি বুঝতে পারল সে মারা যাচ্ছে। সে কাঁদে, কিন্তু চোখ থেকে পানি বের হয় না।

মৃত্যুর ভেতর জীবনের স্বপ্ন। কে যেন বলল, মরে যখন যাও নি বেঁচে থাকার চেষ্টা করো।

সাগর-মহাসাগরগুলো হাওয়া হয়ে গেছে। সেই হাওয়া থেকে উড়ে এসেছে একটুখানি শিশির-কণা। তা ঠোঁটের কোনায় লাগে। ছোটকালে খাওয়া আমৃত্তির মতো স্বাদ পায়। মৃত্যুর দিকে যেতে যেতে টের পায়, শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে ঢুকে গেছে শিশিরের রস। দেহের কোথাও মহাপ্রাণ আছে, সেখানে রস পৌঁছে যাচ্ছে।

পেট লেগে আছে পিঠের সঙ্গে। খাবারের জন্য ছটফট করতে করতে এদিক-ওদিক অনেকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করেছিল। এখন কি শক্তি আসছে? তার ভেতর কেউ বেঁচে থাকার কথা বলছে? মনে হলো, একটা পাখি ডাকছে। শালিকই কি ডাকল! চোখ মেলে। না, কোথাও কেউ নেই।


দুর্দশায় পড়লে নাকি নিজের দিকে মানুষের মনোযোগ বাড়ে। নিজেকে কিংবা যে তাকে সৃষ্টি করেছে তাকে বুঝতে চেষ্টা করে। 


এখনো সবকিছু ছাইয়ে ঢাকা। গত কয়েকদিন ধরে চোখটাও ঝাপসা হয়ে আসছে। বুড়ি সূর্য দেখার অপেক্ষায় আছে। সূর্য উঠলে একটু আশা মনের কোণে পাখা মেলত। আলো থেকেই তো আসে আশা। নানা রশ্মিতে কত কিছু ছুটে আসে। প্রাণের কণাও কি আসে না?

সূর্যকে মনে মনে সম্মান করে আকাশের দিকে তাকায়। বুকে হাত রাখে। ভেতরে একটু একটু আলো ফুটতে চাইছে। শীত লাগছিল। মনে হলো শীতও কমছে। ওই তাপকেই বলে, শরীরের, মনের সব শক্তি এক হও। শক্তি এসো বাতাস থেকে, পানি থেকে।

আশেপাশে কোথাও পানির চিহ্ন নেই। ছাইয়ের কণায় কণায় হাহাকার।

দুর্দশায় পড়লে নাকি নিজের দিকে মানুষের মনোযোগ বাড়ে। নিজেকে কিংবা যে তাকে সৃষ্টি করেছে তাকে বুঝতে চেষ্টা করে। মনে আধ্যাত্মিক ভাব আসে আর কি।

চার বছরের মরিয়ম, তার দুষ্টুমিভরা মুখটা মনে পড়ল। আর দুই বছরের শেখ সাদি! মরিয়মের ছোট ভাইটা, সে কোথায়? তাকে ছাড়া নাতনি কিছু খায় না। সারাক্ষণ আছে দাদু, দাদু। খোঁচাবে, আদর করবে, আবার রেগে গিয়ে বকা দেবে, কিলও মারবে।

মকবুল যখন স্কুলে, ওর বইয়ে শেখ সাদির একটা গল্প ছিল। সাধারণ পোশাকে যাওয়ায় আমিরের ঘরে তেমন কদর পান নি। এরপর দামি পোশাক পরে যান। তখন ভালো ভালো খাবার, সম্মান। সাদি খাবারগুলো না খেয়ে পকেটে ভরতে লাগলেন।

সেই গল্প তার খুব ভালো লেগেছিল। ভেবেছিল, মকবুল যখন বিয়ে করবে, যদি নাতি হয়, তার নাম রাখবে শেখ সাদি। বড় হয়ে ছেলে বটতলায় দোকান দিল। কয়েক বছর পর তো বিদেশেই চলে গেল। ছেলে কি বেঁচে আছে!

ভাবতে ভাবতে আবার কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের মতো আসে। ঘুম নয়, তার সামনে তাদের লাল গাভি। রশিটা তার হাতে। গাভিটা গাভিন। পেট দুলিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। রাস্তার পাশে মোমেনাদের শিমের লতা। জিহ্বা লম্বা করে টান দিয়ে মুখে পুরল। রশি টেনেও কাজ হলো না।

এসময় হাসির শব্দ শুনতে পেল। হাসছে মরিয়ম। ছবি এঁকে দাদুকে দেখাতে এসেছে। একটা পাহাড়। পাহাড়ে কয়েকটা গাছ। পাহাড়ের পাশে ছোট্ট ঘর। ঘরের পাশে গাছপালা; তারপর নদী। নদীতে নীল রঙের একটি নৌকা চলছে, কমলা রঙের কয়েকটি মাছ লাফাচ্ছে।

খাতা থেকে কাগজটা ছিঁড়ে সে দাদিকে দিল। বুড়ি হায় হায় করল। কাগজটা ছিঁড়লি কেন?

এটা আমি জমা করব। মরিয়ম বলল। কাগজটা ভাঁজ করে আরেকটা খাতার ভেতর রেখে দিল।

কাগজ ভাঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে কাউকে দেখল না। চারপাশে অমাবস্যার রাতের মতো অন্ধকার। নিজের গা-ও দেখা যায় না। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আল্লা মেঘ দে, পানি দে।

মরিয়ম সুর করে বলে, আল্লা মেঘ দে, পানি দে… তারপর হাসে। তার হাসির সঙ্গে চারপাশ আলোয় ভরে ওঠে। সে-আলোয় বুড়ি দেখে একটা বটগাছ। বিশাল তার ডালপালা। বটের নিচে সে শোয়। আহ! কী আরাম। আরামে চোখ বোজে।

যখন চোখ মেলে, কোথাও সবুজ নেই। সে আবার হাসির শব্দ শুনতে পায়। হ্যাঁ, ওই তো মরিয়ম দৌড়ে যাচ্ছে। যে পথে দৌড়ে সেই পথ সবুজ ঘাসে ছেয়ে যায়। সে নাতনির পেছন পেছন দৌড়ায়। বটগাছটাও তার সঙ্গে সঙ্গে চলে।

মরিয়ম ছাই ছোঁয়, সাথে সাথে ওখানে একটা গাছ ওঠে। সে খিলখিল করে হাসে। গাছটা বড় হয়ে যায়। গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়ে। ফুল কুড়িয়ে দৌড়ে সে দাদির কাছে আসতে থাকে। সে পিছিয়ে আসায় সবুজ মুছে যায়। সবুজ মুছে যেতে দেখে বুড়ি সামনে এগোয়। বলে, না, আমার কাছে আসিস না।

মরিয়ম তবুও দৌড়ায়। দাদির একেবারে কাছাকাছি। সে তাকে ধরতে যায়। হা হা করে হাসে মরিয়ম। তার হাতে জাদুর কাঠি। কাঠিটা নাড়ায় আর সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে যায়।

বুড়ির মনে হলো, সেও মুছে গেছে। মুছে গেছে মানে তার মৃত্যু হয়েছে। কোনো জনমানব নেই। তাই কারো কান্না নেই। মাঝে মাঝে গভীর রাতে কুকুর করুণ স্বরে কাঁদে। তখন বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। তার মনে হয়েছিল এরকম করে কেউ কাঁদবে।

হালকা একটা বাতাস। বাতাসে ছাই উড়ে কয়েকটা মানুষের রূপ পায়। ছাই-মানুষের দুই হাত দুদিকে ঝুলে আছে। চোখ আধ বোজা। পায়ের পাতা দুটি বাঁকা। একজন আরেকজনের দিকে ঝুঁকে আছে। কী একটা কথা বলতে চাইছে। তারা তাকে ছাই দিয়ে গোসল করায়। সাবান নেই। মুর্দার গোসল হয় সাবান ছাড়াই। গোসল করানোর পর তাকে ছাইয়ের বিছানায় শোয়ানো হয়। সে মরে গেলেও আবছা টের পাচ্ছে। তবে চোখ মেলতে পারছে না।

গোসল করানোর পর মুর্দাকে পরানো হয় সাদা কাফন। এখানে কাফন কোথায় মিলবে? তাকে পরানো হয় ছাইয়ের পোশাক। কেউ কোনো দোয়া-দরুদ পড়ে না। তাকে কাঁধে করে একটা জায়গায় নিয়ে যায়। জায়গাটা অন্ধকার। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ছাই-মানুষেরা তাকে সেখানে ফেলে চলে আসে।

তখন ছাইয়ের পোশাক থেকে বেরিয়ে বুড়ি চোখ মেলে। দেখে সে মরে নি। তার কী যে আনন্দ হয়! চিৎকার করে মৃত্যুকে বলে, আয়, তোর সঙ্গে একটু হাডুডু খেলি : হাডুডু ভাই লক্ষণ/তোরে ধরতে কতক্ষণ…

মৃত্যু মুচকি হেসে ছাইয়ের আড়ালে চলে যায়।

তখন কি একটু আলো ছড়াল! এটা কি দিন! দিন শুরু হলো! বুড়ি নিজের দিকে তাকায়। তাকিয়ে লজ্জা পায়। গায়ে কোনো কাপড় নেই। ব্লাউজের একটা হাতা বাঁ হাতে ঝুলে আছে। চুলে জট পাকিয়েছে। হাত-পা শীর্ণ। একটু চাপ দিলেই মনে হয় ভেঙে যাবে। নখগুলো লম্বা লম্বা। নখের ফাঁকে সব ছাই।

ভাবে, একটু ছাই খাই। ছাই নিয়ে মুখে দেয়। তীব্র কটু গন্ধ কমে এসেছে। খিদের চোটে একটু খেয়ে ফেলে। দ্বিতীয়বার আর মুখে দিতে পারে না।

আশপাশের রং একটুও বদলায় নি। উঠে যে একটু হাঁটবে, সেই শক্তি খুঁজে পায় না। চুলকানি আবার শুরু হয়েছে। মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেছিল ঘাওয়ালা কুকুরকে। চুলকানি সহ্য করতে না পেরে সে ছাইয়ে গড়াগড়ি খায়।

৫.
হাঁটতে হাঁটতে বুড়ি আগের জায়গাটা হারিয়ে ফেলে। মনে পড়ে মোবাইলটা ছিল বুকের বাঁ পাশে ব্লাউজের ভেতর। ছেলে কিংবা আত্মীয়-স্বজনরা ফোন করে। ছেলে ফোন করে না পেলে রাগ করে। তাই কাজের সময়ও ওটা কাছে রাখে। তখন গোলা থেকে ধান নামাচ্ছিল। ছোট বোনের সঙ্গে গোলা থেকেই কথা বলেছিল।


বাতাসে দুর্গন্ধ রয়ে গেছে। দুর্গন্ধ নাকে টানতে টানতে মনে হলো, দূর থেকে ঝুপঝুপ করে দৌড়ে বৃষ্টি আসছে। 


বুকের বাম পাশে দগদগে ঘা। সেখানে মোবাইলের ছাপ। কিন্তু সেটা সে দেখে নি। ব্যথাটা আজ প্রথম টের পায়। বোমা ফাটার মতো তীব্র শব্দ তার কানে বাজে। মনে হলো আগুন উড়ে উড়ে আসছে।

প্রায় সারা দেহে ক্ষত। ক্ষতে-ছাইয়ে একাকার। রস পড়া বন্ধ হচ্ছে না। খিদে চাগিয়ে উঠলেই ইচ্ছে করে রসটা খেয়ে নিতে। পরমুহূর্তে বমি বমি ভাব হয়। ওয়াক ওয়াক করে। ছাই দিয়ে মুখটা বন্ধ করে রাখতে চায়। অথবা ছাইয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখবে। মাথাটা হয়ে যাবে গাছের গোড়া। সেখান থেকে আস্তে-ধীরে শিকড় বেরুবে। নারকেল গাছের শিকড়ের মতো আশপাশে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। গলা থেকে কোমর পর্যন্ত হবে গাছের মূল কাণ্ড। দুই হাতে শিকড়ের বিস্তার। আর একটু হেলান দেওয়ার মতো দুই পা দুদিকে ছড়ানো থাকবে। সেখান থেকে ডালপালা ছড়াবে, পাতা গজাবে। পাতায় বাতাস এসে লাগবে। ফুল ফুটবে, ফল ধরবে, পাকবে। খুশবু ছড়াবে। গাছ-বুড়ি তখন বাতাস আর সুগন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে দেবে।

এসব ভাবতে ভাবতে বমির ভাবটা কমে আসে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কিন্তু বাতাসে দুর্গন্ধ রয়ে গেছে। দুর্গন্ধ নাকে টানতে টানতে মনে হলো, দূর থেকে ঝুপঝুপ করে দৌড়ে বৃষ্টি আসছে। এখনই তাকে ভিজিয়ে দেবে। কানে রহস্যের বাজনা বাজছে। একটু পর কোনো শব্দ শুনে না। এত নিস্তব্ধ যে, তার খুব ভয় হয়। বুকের ভেতর ধড়ফড় করে। ভয় কাটাতে কী করবে বুঝতে পারে না।

মাথায় কুট কুট কামড়াচ্ছে। উকুন নাকি! চুলে তো জট পাকিয়েছে। উকুন হতেই পারে। সারা মাথা আঙুল দিয়ে চুলকালো। চুলের ফাঁকে ফাঁকে অনেক দেখল। না কিছু নেই। হঠাৎ এক জায়গায় আঙুলে কী একটা আটকালো। থেমে গেল আঙুল। ওখানে জট বেশি। কোনোমতেই বের করে আনতে পারছে না। জিনিসটার কোনা মনে হয় ধারালো। আঙুল বের করে দেখল, একটুখানি ছিঁড়ে গেছে। কালচে রক্ত বেরিয়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর অবশেষে বের করতে পারল। দুই আঙুলে নিয়ে বাঁ হাতের তালু’য় রাখল। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে নি। ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখল, ধান! সত্যিই তো, একটা ধান। ছোট্ট শিশুর মতো চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

চুলের ফাঁকে ঘুমানো ধানটা মুঠোয় চেপে ধরে বুড়ি। বুক তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে। আনন্দে, উত্তেজনায় ওঠানামা করছে। মকবুল জন্মানোর সময় সে কী কষ্ট! পাশের বাড়ির দাইটা দক্ষ ছিল। তবুও কত কষ্ট। প্রথম যখন শিশুর কান্না শুনল, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। এখন সেরকম নিশ্বাস ফেলল।

দাই বলল, অডি, তুর ফোয়া অইয়ি।

তার মনে হলো দাই এখন কথাটা বলেছে। এখনো ওর হাতে লেগে আছে রক্ত।

চোখ মেলে সে আবার দেখে, একটা ধান। চুলের জটায় থাকায় গায়ে ছাই লাগে নি। রঙটা এখনো সোনালি। কাত হয়ে পড়ে আছে। যেন তার নাতনি মরিয়ম; দুই মুখ টেনে ওর দিকে ফিরিয়ে বলছে, বুড়ি, ও বুড়ি/ খাবে কি মুড়ি?

বুড়ি ধানের উপর হাত বুলাল। মনে হলো, ধানটা কথা বলতে চাইছে। ওর ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক ধান। তাদের ঘুম ভেঙেছে। সবাই উঠে বসেছে। সে এখন গল্প বলবে। গল্প শোনার জন্য ওরা অপেক্ষা করছে।

বুড়ি দুটি গাছের গল্প বলে। বলে, সেই এক কাল ছিল। সেই সময় দুনিয়ায় গাছপালা, পাহাড়-পর্বত ছিল অনেক বেশি। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। নদীগুলোতে তখনো দস্যু মানুষের হাত পড়ে নি। দখল হয় নি, দূষণও হয় নি।

তখন এক দেশে নদীর ধারে ছিল একটা পলাশ আর একটা শিমুল গাছ। বসন্ত এসে গেছে। পলাশ গাছে ফুল ফুটেছে। কিন্তু শিমুলে ফোটে নি। শিমুল মনে করেছিল, এবার আরো বেশি টকটকে লাল ফুল ফুটবে। লালে লালে রাঙিয়ে দেবে মানুষের মন।

শিমুলের মন খারাপ। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে দেরিতে। ওদিকে পলাশ সকাল সকাল উঠে যায়। তার ফুলগুলোর কলকাকলিতে মুখর চারদিক। তাদের আওয়াজে শিমুলের ঘুম ভাঙে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মুখ লুকায়। তার খুব লজ্জা, নিজের কাছে অপমান। কেন ফুল ফুটল না? বসে বসে কাঁদে।

পলাশ সব খেয়াল করে। সে তার ফুলগুলোকে বলে, তোমরা শিমুলের জন্য দোয়া করো। ফুলেরা প্রার্থনা করতে বসে যায়। তাদের প্রার্থনার সুর ছড়াতে ছড়াতে শিমুলকে জড়িয়ে ধরে। শিমুল তবুও চোখ মেলে না।

একদিন ভোরে পলাশ তার ফুলগুলোকে নিয়ে শিমুলের কাছে যায়। ঘুম ভাঙার আগেই ওর সারা গায়ে বুলিয়ে দেয় স্বপ্ন, আশা আর কল্পনা। তারা সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে। বলে, মহান প্রভু, তুমি আমাদের ডাকে সাড়া দাও। আমাদের আশা পূর্ণ করো। তুমি তো দেখছ, আপন কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত শিমুল। এভাবে আর কিছুদিন থাকলে ও মরে যাবে। তুমি ফুলে ফুলে শিমুলকে পূর্ণ করে দাও। ফুল ছাড়া ও কিভাবে বাঁচবে! একজন সুখ পাবে, আরেকজন দুঃখে ভাসবে, তা কি হয়!

পলাশের কথা, ফুলগুলোর কথা প্রভু শুনেছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই ফুলে ফুলে ভরে যায় শিমুল। কিন্তু সে জানল না কিভাবে ফুল ফুটেছে।

গল্পটা বলে বুড়ি থামে। তখন কলকলিয়ে হেসে ওঠে ধান। বলে, আমার প্রাণ ঘুমিয়ে আছে। ওকে জাগাও, ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো।

সেই কথা শুনতে পেয়ে বুড়ি ধানের গায়ে হাত বুলায়। তখন সকাল না বিকেল বোঝা যায় না। পরিবেশের কথা ভুলে গিয়েছিল। আশপাশে তাকিয়ে হতাশ হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কোথাও তো মাটি নেই। এই ধান নিয়ে সে কী করবে?

তার কান্না আসে। কান্না চেপে মুঠোয় ধানবীজ নিয়ে হাঁটে। হাঁটতেই থাকে। কত যে হেঁটেছে খেয়াল নেই। হাঁটতে হাঁটতে পা ভাঁজ হয়ে আসে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে চায়। কিন্তু মাটি পায় না।

দুনিয়াটা পুরো ছাই হয়ে গেছে। ছাইয়ের দুনিয়ায় সে এখন কী করবে? মনে মনে বলে, আমি মাটি চাই, ধানটা রোপণ করতে চাই। বলতে বলতে উপুড় হয়ে পড়ে যায়।

কতক্ষণ এভাবে পড়েছিল জানে না। যখন ঘুম ভাঙে, চারপাশ একটু উজ্জ্বল মনে হয়। তার চোখে-মুখে সেই উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। সে ডান হাত বাঁ হাতের উপর বুলায়। এখন ভেজা কম। কুয়াশা উবে গেছে। ভেজা যা একটু পায় মুখে লাগায়। ছাইও ঢুকে যায়।

বড় বড় নিশ্বাসে বুক ভরে বাতাস নেয়। আবার বের করে দেয়। দমের খেলা খেলছে। গত রাতে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি মাটি খুঁজছ না কেন? মাটি তো তোমার কাছেই আছে।

স্বপ্নের কথা মনে পড়ায় সে বাম হাতে ধান রাখে। ডান হাতের পাঁচ আঙুলকে কোদাল বানিয়ে ছাই সরাতে থাকে। যতক্ষণ শক্তি পায়, সরায়। কিন্তু মাটির দেখা নেই। তর্জনী আর কনিষ্ঠা আঙুলের নখ ভেঙে গেছে। রক্ত পড়ছে। সে পাত্তা দেয় না।

কেউ কাজ করতে না চাইলে বা না পারলে উৎসাহ দেওয়ার জন্য মা বলত, আঁই কিচ্ছু ন জানি/ মইল্যা মাছর কানত ধরি জাআঁছ চালাইত জানি। (আমি কিছু জানি না। মলা মাছের কান ধরে জাহাজ চালাতে জানি।) সেই কোন কালের কথা, কথাটা মনে পড়ল।

তারপর মা বলত, মনারে কইয়ি খাঁচা বানাইতু/ মনা বানাইয়ি ডোল/ মনার বউয়ে রাঁধি এইয্যি/ মইল্যা মাছর ঝোল। (মনাকে বলেছে খাঁচা বানাতে, মনা বানিয়েছে ঢোল। মনার বউ রান্না করেছে মলা মাছের ঝোল।)

সে মৃদু হাসল। তার মনোবল আরেকটু বাড়ল।


খাবারের কথা মনে আসতেই পেট ‘কুলফু আল্লা’ পড়ে। কোনোমতে একবার পেট ভরে খেতে পারলে হয়তো এক মাস কিছু খেতে হবে না।


পরদিন আঁধার কেটে গেলে ঘুম ভাঙে। আঙুলে প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যথা নিয়ে খুঁড়তে থাকে। সকাল, দুপুর, বিকেল, থেমে থেমে খুঁড়তে থাকে। একসময় জ্ঞান হারায়। গভীর অন্ধকারে জ্ঞান ফেরে। বাম হাত মেলে ডান হাতের আঙুল দিয়ে ধানটা ছুঁয়ে দেখে।

ডান হাতের আঙুলে প্রচণ্ড ব্যথা। ধানটা ডান হাতে নেয়। আঙুলগুলো ভালো করে ভাঁজ করতে পারে না। আধ মুঠোয় ধান রেখে বাঁ হাতে খোঁড়া শুরু করে। যতক্ষণ পারে খোঁড়ে, তারপর নেতিয়ে পড়ে।

বুড়ির যখন ঘুম ভাঙে তখন হয়তো দিন। কেননা আশপাশ দেখতে পাচ্ছে। তবে বৈশাখ মাসের শেষ বিকেলের মেঘের মতো অন্ধকার লেপ্টে আছে। সে বাঁ হাতে আবার খুঁড়তে শুরু করে।

পরদিন খোঁড়ে। এর পরদিনও। যতটুকু পারে খোঁড়ে। ক’দিন খুঁড়েছে বলতে পারবে না। মনে হলো পাঁচ-দশ দিন খুঁড়েছে। একটা গর্ত হয়।

তখন মনে হয় ভোর। হালকা ঠান্ডা। চারপাশ একটু স্নিগ্ধও। ফজরের নামাজ পড়ে দুয়ারটা মেলে দিত। তখন যেরকম আলো ফুটত, এ অনেকটা সেরকম। মাটির আভাস পায়। হ্যাঁ, তাদের ঘরের পেছনের খোলা জায়গাটার মাটির মতো একটু ভেজা। এরকম মাটি সে দেখে নি।

মনে পড়ে, কার্তিকের এক বিকেলে দেখা ধানের জমির কথা। কিছু পাকা, কিছু কাঁচা। সেই পাকা রঙে হলুদ মাখানো। আমলকী গাছ থেকে দোয়েলটা তার দিকে তাকিয়েছিল। এখানেও কি কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে!

মাটির গন্ধ বুক ভরে নেয়। মনে হচ্ছে এখন সে পান্তাভাত খাবে। পোড়া মরিচ আর পিঁয়াজ দিয়ে পান্তাভাত কতদিন খায় নি! খাবারের কথা মনে আসতেই পেট ‘কুলফু আল্লা’ পড়ে। কোনোমতে একবার পেট ভরে খেতে পারলে হয়তো এক মাস কিছু খেতে হবে না।

একটুখানি মাটি, কালচে আর ধূসর মিলে একটা রং। সেটাই তুলে আনে। বাঁ হাতের আঙুলও ক্ষতবিক্ষত। আঙুল থেকে রক্ত লেগেছে মাটিতে। সেই মাটি ছাইয়ের উপর রাখে। ভেজা মাটি হাতের তালু’য় নিয়ে শিমের বিচির মতো গোল করে মুখে পোরে। তারপর গভীর কালো মেঘ বা ঘন ধোঁয়ায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিবাতে থাকে।


৩ পর্বের লিংক
জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)