ধানশি : ১

ধানশি : ১
314
0

পর্ব- ১

১.
মরে যাওয়ার পর কেউ বেঁচে ফেরে? এটা কি সম্ভব? বুড়ি আশ্চর্য হয়ে ভাবতে চেষ্টা করে।

বাতাসে বোটকা গন্ধ। খুবই বিশ্রী। গোলার নিচে কুকুরের বমির যে গন্ধ, তার চেয়েও বেশি দুর্গন্ধ।

চোখ মেলে দেখল ছাই আর ছাই। পোড়া গন্ধটা আসছে কাছ থেকে। নাক টেনে বুঝল, নিজের শরীর থেকেও আসছে।

খুবই জ্বলছে। যেন মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে যাবে। তখন সে শরীর সম্পর্কে সচেতন হয়। আশ্চর্য হয়ে দেখল, শরীরে কোনো কাপড় নেই। সারা গায়ে ছাই, ছাইয়ের আস্তর পড়েছে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমে কাজ করার সময় ঘেমে একাকার হতো। গরুঘর পরিষ্কার, গরু বাঁধা, গরুকে কুঁড়া খাওয়ানো, এক ফাঁকে ঘরের পাশের পতিত জমি থেকে ঘাস কেটে আনা—কাজের কি শেষ আছে? ঘরে ঢুকলেই মরিয়মের মা এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে দিত। সে এক নিশ্বাসে খেত।


বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলত, বেঁচে থাকতে চাইলে উঠে দাঁড়াতে হয়। 


তলার দিকে একটু রাখত নাতনির জন্য। গ্লাস রেখে দম নিত। তৃপ্তিতে ‘আ’ বলে নিশ্বাস ছাড়ত। এখন সেরকম প্রশান্তি যদি একটু পাওয়া যেত!

চারদিকে তাকাল। সময়ের হিসাব ঠিক বুঝতে পারে না। তবে বেঁচে যে আছে এটা বুঝতে পারছে। অনুভব করে একটু শান্তি পায়।

আশপাশে তাকায়। কেউ নেই, কোনো জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। আছে কেবল ছাই। ভাবে, আমি একা নই; ছাই হলেও তো আছে।

ছাইও ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কেমন ফ্যাকাশে, একটু ভেজা ভেজা। চোখে-মুখে ঘুম লেগে আছে।

নিজের দিকে তাকায়। ডান হাতটা নেড়ে দেখে। পুরো নাড়াতে পারে না। প্রচণ্ড ব্যথা। বহুদূরে মনে হয় একটা পাখি ডাকছে। পাখির ডাক নাকি মানুষের আর্তনাদ!

বিয়ের পর প্রথম স্বামীর চোখে চোখ পড়ার পর আশ্চর্য অনুভূতি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল সে সাঁতার কেটে পুকুর পার হচ্ছে। পানি তাকে তুলার মতো ভাসিয়ে নিচ্ছে। সেই অনুভূতি অনেকদিন ঠিকভাবে বুঝতে পারে নি। এমনকি স্বামীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর যে আনন্দ পেত, তাতেও মন ভরত না। মনে হতো, আরো কিছু বাকি রয়ে গেছে। সেই কথা মনে পড়ল। স্বামী ছিল কবিরাজ। সে কখনো কবিরাজ বলত না। দুষ্টুমি করে ডাকত, কবিগাছ। কবিরাজ এখন কোথায়? গায়ে শিকড়-বাকড়ের গন্ধ, কবিরাজ কি হেঁটে হেঁটে তার কাছে আসছে!

কবিগাছের কথা ভাবতে ভাবতে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। পিঠ, পেট, কাঁধ, বাহু সব জায়গা চুলকায়। মনে হচ্ছে চুলকে চামড়া তুলে ফেলবে। ঘায়ের মতো হয়ে যায়। ওখান থেকে রস গড়িয়ে পড়ে। ভাবে, রস খেয়ে নেবে। ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে। কবিরাজের কাছে কি চুলকানির ওষুধ ছিল? মনে করতে পারে না।

ইচ্ছে হয় ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেতে। ঠান্ডা পানি খেতে পারলে কলজে জুড়াবে। শরীরে শক্তি আসবে।

হাত মুঠো করতে গিয়ে মনে হয় পুরো হাত খুলে পড়ে যাবে। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। সব শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে। বাবা বলেছিল, মানুষের মনে লুকানো থাকে অফুরন্ত শক্তি। তা খুঁজে পেতে হবে। বাঁচতে হবে। কী হয়েছে জানতে হবে। চুলকাতে চুলকাতে উঠে বসে।

বুড়ি মনে করার চেষ্টা করে, কী ঘটেছিল? কী থেকে কী হয়ে গেল! এটা কিভাবে সম্ভব? কেউ নেই, আমিই-বা কিভাবে রইলাম! কী এত শক্তি আমার! চারদিকে এত ছাই কোত্থেকে এল? কালচে, ধূসর, লালচে—নানা রঙের ছাই। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছাইকে মনে হলো শয়তানের লালা।

লালার উপর দিয়ে চলছে রিকশা। মাঝপথে রাস্তা নেই। বড় একটি গর্ত। এখন কী করবে? রিকশা থেকে নেমে হাঁটে। পুকুরের পাশে একটা বাড়িতে রাতা বাক দিল। গরুও হাম্বা ডাকল। সে করে কী, ওই বাড়িতে ঢোকে। বুঝতে পারে, এটা মরিয়মের নানার বাড়ি।

তার বেয়াইন, মরিয়মের নানি তার জন্য রাতাটা ধরতে যায়। কেননা বুড়ি ফার্মের মুরগি খায় না। সে মানা করে।

মোরগটা দৌড় দেয়। মোরগের দৌড়ের সঙ্গে ট্রেন আসে। সে রেলরাস্তার কাছে যায়। তার ইচ্ছে করে, ট্রেনে চড়বে। কিন্তু হাজার হাজার হাতির লাফালাফির মতো ঝমঝম আওয়াজ তুলে চলে যায় ট্রেন। ক্রমশ ছোট হতে থাকা রেলের পেছনের অংশ দেখে তার মন শূন্যতায় ভরে যায়।

তাকে রেখে সবাই কোথাও চলে গেছে। একা একা সে কী করবে? আবার মনে হয়, সে একা না। মানুষ একা হয় না। ভাবে, আমি নিজে আমার সঙ্গী, আমার মন আমার সঙ্গী। ছাইগুলো আমার সঙ্গী। ভাবতে ভাবতে জ্ঞান হারায়।

২.
ছাইয়ের গাদায় কাত হয়ে পড়েছিল। আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটাও ছাইয়ে ঢাকা। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সময় ছাইয়ের আস্তরণ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে সূর্যকে আড়াল করে দেয়। সে একবার টিভিতে দেখেছিল। এখানে তার চেয়েও বেশি ছাই।

দীর্ঘশ্বাস পড়ে। বুক ফেটে কান্না আসে। কান্নার শব্দ নিজের কাছে অচেনা লাগে। এরকম আওয়াজ কখনো শোনে নি। উঠতে চেষ্টা করে। পারে না। শরীরের সব কলকব্জা খুলে গেছে!

অনেকদিন পর যেন ঘুম থেকে উঠেছে। এখনো প্রবল ঘুম-ভাব। চোখ মেলতে কষ্ট হয়। হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। আড়ষ্ট চোখে আশপাশে তাকায়। কোথাও একটা মানুষ নেই, গাছপালা নেই। দুনিয়ায় কি কেয়ামত হয়েছে!

ওহ! এত ব্যথা। বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলত, বেঁচে থাকতে চাইলে উঠে দাঁড়াতে হয়। কর্ম করতে হয় আর স্বপ্ন দেখতে হয়। স্বপ্ন হলো অর্ধেক এগিয়ে যাওয়া। বাবা ছিল বলী। বলীখেলায় হারিয়ে দিত মানুষকে। মানুষের পিঠ মাটিতে লাগাতে পারলেই তার সুখ। তবে হেরে গেলেও তেমন আফসোস করত না। বাবার কথা ভেবে মনে জোর আনার চেষ্টা করে।

একটু একটু মনে পড়ছে। তখন সে গোলাঘরে, শুকানোর জন্য ধান নামাচ্ছিল। মরিয়মের আওয়াজ শুনতে পায়। দাদু, দাদু চিৎকার করে গোলার মুখে এসে কান্না শুরু করে দিয়েছে।

কী অইয়ি য্যা?

আঁর বঅল…

কান্না কান্না কথা থেকে জানা গেল, ওর বলটা গোবরের গর্তে পড়ে গেছে। দাদিকে এখনই ওটা তুলে দিতে হবে।

দাদি বলল, সবুর ল।

না-আ-আ বলে জোরে কান্না শুরু করল মরিয়ম।

কী আর করা। তাকে গোলা থেকে বেরুতে হলো। কয়েকদিন আগে খাঁচায় করে গোবর নিয়ে জমিতে দেওয়া হয়েছে। গোবরের সঙ্গে মাটিও কেটে নেওয়া হয়েছিল। ফলে গর্তটা আগের চেয়ে বড় ও সুন্দর হয়েছে। কাঠের ছোট একটা সিঁড়ি আছে। ওটা বসিয়ে গর্তে নামল। মরিয়ম উপরে দাঁড়ানো। ওই সময় কি কিছু হয়েছিল! সে মনে করতে পারে না। হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠে ভাবে, মরিয়ম কোথায়?


বিশ্ব চলছে ওর নিজস্ব নিয়মে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। 


প্রচণ্ড একটা আওয়াজ। কান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো কিছুই শুনছিল না। এসময় দেখল আগুনের হলকা। পুড়ে যাওয়ার অনুভূতি কেমন হয় জানে। তীব্র জ্বলুনি। পুড়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার গন্ধ, ধোঁয়ায় সব আচ্ছন্ন। তারপর তীব্র বাতাস, বাতাসের ঘূর্ণি পুরো দুনিয়াকে মুচড়ে ফেলছে। তার গায়ের উপর পড়ছে গরম গরম ছাই।

মরিয়মের মামা জোবায়ের একবার একটা সিনেমা দেখিয়েছিল। রুক্ষ কালো মাটিতে হঠাৎ পানির ধারা। চার-পাঁচ দিকে বয়ে চলেছে সেই ধারা। পানির ছোঁয়া পেয়ে মাটি ফেটে উঠতে থাকে গাছ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গাছগুলো বড় হয়ে বিশাল বনের রূপ পায়। এখন কল্পনায় দেখে সেরকম একটা বন তৈরি হয়েছে। বনে পাখপাখালি ডাকছে।

জোবায়ের বলত, মাউই মা, বিশ্ব চলছে ওর নিজস্ব নিয়মে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মানুষ সেই নিয়ম ভেঙে দিতে চায়।

বুড়ির চোখ পানিতে টলটল। কিন্তু ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে না। চোখের নিচেও জমেছিল অনেক ছাই। ক্ষুধার্ত ছাই শুষে নেয় সেই অশ্রু।

এখন সকাল না বিকেল, নাকি সন্ধ্যা! বোঝা যাচ্ছে না। জোবায়েরের প্রশ্নটা মনের মাঝে ঘুরছে, মানুষ জন্মে কেন? মরেও-বা যায় কেন?

পানির জন্য বুকটা ছটফট করে। চারপাশে শুধু ছাই। হাতটা কুয়াশায় হালকা ভেজা। মুখের কাছে নেয়। জিহ্বা দিয়ে লেহন করে। শিশিরবিন্দু খেতে গিয়ে ছাইও খেয়ে ফেলে।

ঘন কুয়াশায় অন্ধকার হয়ে আসে। বাতাসে ছাই ও জলকণা আছে। বুড়ি মুখ হাঁ করে রাখে। একটু জলকণা যদি ঢোকে, প্রাণটা যদি একটু জুড়ায়।

আল্লাহ! পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে প্রতিদিন তোর দরবারে মোনাজাত করেছি। তুই কেন এত বড় বিপদে ফেললি? আল্লাহ! তুই রহমত কর।

ছাইয়ের টাল, টালের মাঝখানে গর্ত। শুয়ে আছে সে। চোখ মেলে, কিন্তু আকাশটা দেখা যায় না। ছোটকালে তারাভরা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কত কিচ্ছা শুনেছে! এখন তাকে কে কিচ্ছা শোনাবে? মরিয়ম কোথায়? তার নাতনি! ওর মা কোথায়?

তারপর আঁধার হয়ে আসে। একা একা একটি রাত। ঝিঁঝিঁ পোকা বা অন্য কোনো পোকার শব্দ নেই। একেবারে শূন্য, নিঃশব্দ। যেন ও আসছে; সাপের মতো হেঁটে এগিয়ে আসছে। ওর নাম মৃত্যু। সে অনুভব করে, হাতে কিসের যেন ঠান্ডা ছোঁয়া। চোখ বন্ধ করে প্রস্তুত হয়। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু… পড়তে পারে কিনা বুঝতে পারে না।

কানের কাছে এসে মা জিজ্ঞেস করে, সাজু, কোথায় যাচ্ছিস?

সে জবাব দিতে পারে না। ছাইয়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। মিশে যেতে যেতে ভাবতে চেষ্টা করে মরিয়মের দুষ্টুমিভরা চোখ দুটির কথা। মেয়েটা দাদুর জন্য চিৎকার করে কাঁদছে। সে চেষ্টা করে, তারপরও চোখ মেলতে পারে না। মৃত্যুর সময় কি চোখ ভেঙে ভেঙে পড়ে!

৩.
আট-দশ দিন ধরে বৃষ্টি। এতটুকু ফাঁক নেই। দুনিয়াটা যেন হযরত নূহ (আ.) এর দুনিয়া। শুধু চলছে একটা কিস্তি। আর সব ভেসে যাচ্ছে।

একদিন সকালে ফকফকা রোদ। রোদে সবকিছু হেসে উঠেছে। মৃত্যু থেকে বেঁচে ফেরা কি এই রোদের মতো! বুড়ি নিশ্চিত নয়। সারা গায়ে পোড়া চামড়া। পুড়ে যাওয়া গমের রুটির মতো ফোসকায় গা ভর্তি। কেউ যেন ছ্যাকা দিয়েছে—শরীর জুড়ে এমন ব্যথা।

একটা স্বপ্ন দেখেছিল মনে হয়। কবিরাজের মতো কাঁধে জাল নিয়ে খাল থেকে আসছে সে। জালের খোপে ডিমওয়ালা একটা কৈ মাছ। সামনের পুকুরে নেমে জাল ছুড়ে মারে। সুন্দর করে খোপ পড়ে। জাল টানার পর দেখা যায়, রুই, কাতলাসহ বেশ কয়েকটা মাছ এসেছে। একটা বড় তেলাপিয়াও আছে। সঙ্গে ভাতের দলা। সে তেলাপিয়াটা কায়দা করে লোটায় ভরে। অন্য মাছগুলো ছেড়ে দেয়। এসময় কৈ মাছটা জাল থেকে বেরোয়। কানে হেঁটে পুকুরে নেমে ডিম ছাড়ে।

ঘুমিয়ে পড়েছিল নাকি জেগেছিল বুঝতে পারে না। আড়মোড়া ভেঙে দেখে, শরীরের ক্ষতে ছাই জমাট বেঁধেছে। রস শুকিয়ে গেছে, তবে চুলকাচ্ছে।

একটু পর চুলকানো স্থান থেকে রস পড়ে। ক্ষতে কিলবিল করছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা। ঘৃণায় শরীর রি-রি করে। ফুঁ দিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে। ফুঁ দেওয়ার শক্তিও নেই।

বুড়ি আবার নেতিয়ে পড়ে। দেখে, পানিতে ভাসমান একটা ঘর। বাঁশের তৈরি। সে বুকের কাছে হাঁটু নিয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে ছাইয়ের ভেতর মুখ ডুবিয়ে দেয়।

ছাইয়ের মধ্যে তো মরণের জগৎ। সেখানে একজন থাকে। ওর খুব কাছের। তাকে দেখেছিল বছর পাঁচেক আগে। সে হলো মৃত্যু। মৃত্যু তো এক বুড়ো। চেহারা কামারশালার আগুনের মতো। আগুনবুড়ো তাকে বলল, কত আর ঘুমাবি? চল এবার যাই। আমার হাতটা ধর।

সে মনে মনে বলে, বাঁদরর ছা বাঁদর, পরপুরুষুর হাত ধরন ন যায়, তুই ন জানছ?

মৃত্যুবুড়ো হাসে। হাসলেই আগুনের হলকা বেরুয়। হলকায় বুড়ির ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে সে কিছু দেখে না। একটা শব্দ শোনা যায় না, তারাও দেখা যায় না।

এরকম ‘নেই’-এর ভেতর তার মনে পড়ে এক বুধবারের কথা। গভীর রাত। কেউ ডাকছে, সাজু, সাজু। এত রাতে তাকে কে ডাকবে? অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারে, এটা কবিরাজের কণ্ঠ। তার বুক ধুকপুক করে। সে লাফিয়ে ওঠে সামনের রুমে যায়।

কবিরাজ শোয় সামনের রুমে। বলে, আমার খারাপ লাগছে। পায়খানা করব।


কবিরাজ মারা যাচ্ছে। তখন তার কী যে হয়, ভেতরটা এমন ফাঁকা হয়ে যায়, যেন বিরাট একটা মাঠ। 


কারেন্ট চলে গেছে। দিয়াশলাই ছিল দরজার চৌকাঠে। তাড়াতাড়ি চেরাগটা ধরায়। স্বামীকে ধরে পেছনে পায়খানায় নেয়। বসিয়ে দিয়ে সে দরজার সামনে আলো আড়াল করে দাঁড়ায়। মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ে।

কবিরাজ দেরি করছে দেখে বলে, অইয়ি না?

কোনো জবাব পায় না।

বুড়ির হঠাৎ খুব ভয় হয়। সে বাতি নিয়ে কাছে যায়। বদনাটা নিয়ে বলে, আঁই পানি ঢালি দিই।

পানি খরচ করিয়ে কোনোমতে ঘরে ঢোকায়। প্রথমে রান্নাঘর। তারপর মাঝের ঘর, এরপর সামনের ঘর। রান্নাঘরে ঢুকেই ওয়াক ওয়াক, বমি করে কবিরাজ। ঘর ভাসিয়ে দিয়েছে। সে বিরক্ত হলেও কিছু বলে না। প্লাস্টিকের মগে পানি এনে ওর মুখ মুছে দেয়, কুলি করায়। সামনের রুমে নিয়ে বসায়।

এসময় উঠে আসে মকবুল; তাদের একমাত্র ছেলে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে ছয় মাস আগে। মকবুল মাকে তেনা দেয়। মা বমি পরিষ্কার করে।

মুখ-হাত ধুয়ে সামনের রুমে আসে। মকবুলকে শুয়ে পড়তে বলে স্বামীকে পানি এনে দেয়। একটু পানি খেতে বলে। ওর ততক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে। বছর দুয়েক আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তারপর থেকে এই শ্বাসকষ্ট। একবার উঠলে পনেরো-বিশ মিনিট থাকে।

সে স্বামীর পিঠ, বুক ঘষে দেয়। ছেলেকে বলে এনজিস্টটা দিতে। ওটা নিয়ে জিহ্বার তলায় দেয়। প্রায় পনেরো মিনিট পর কবিরাজ একটু স্বস্তি পায়।

ঘেমে গোসল করে ফেলেছে একেবারে। ঘাম মুছে, গেঞ্জি পাল্টে শুইয়ে দেয়। নিজেও শোয়। চোখ একটু বুজে এসেছে, আবার ‘সাজু, সাজু’ ডাক। সে লাফিয়ে ওঠে। কবিরাজ পাতলা পায়খানা করেছে। একেবারে কাপড়ে-চোপড়ে। পায়খানার সঙ্গে বমিও।

ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অনেক কষ্টে পরিষ্কার করল। তারপর শুইয়ে দিল। কবিরাজ তার হাতটা ধরে। কী যেন বলতে চায়, কিন্তু বলতে পারে না।

ততক্ষণে ভোর হতে চলেছে। একটি-দুটি পাখি ডাক ছাড়ল। পাখির ডানার আওয়াজও পাওয়া গেল। কবিরাজ তার হাত ছেড়ে দেয়। চোখ উল্টে ফেলে। দৃষ্টি ঘোলাটে। সে মকবুলকে পাঠায় ওর চাচাকে ডেকে আনতে।

চোখ উল্টে ফেলার পর বুড়ি বুঝতে পারে, কবিরাজ মারা যাচ্ছে। তখন তার কী যে হয়, ভেতরটা এমন ফাঁকা হয়ে যায়, যেন বিরাট একটা মাঠ। সেই মাঠে কেউ-ই নেই, তার শরীরও নেই। শুধু মনটা ধড়ফড়িয়ে কাঁদছে। জীবন আর মরণের মাঝে কতদূর ফারাক টের পায়। সে কাঁদে, হাউমাউ করে কাঁদে।


২ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)