ধানশি : ১২

ধানশি : ১২
208
0
১১ পর্বের লিংক

পর্ব- ১২

৩৩.
এরকম অনুভূতি আগে হয় নি। নিজেকে মনে হলো মোটা মোটা, ভার ভার। হাঁটতে গেলে কষ্ট হবে। একটা গাছ যেমন তার সব ডালপালা, পাতা নিয়ে এক জায়গায় শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেও তেমন দাঁড়িয়ে আছে।

সারা গায়ে, মাথায়, পায়ে, সব স্থানে গাছ জন্মেছে। দুই হাতের তালুয় দুটি গাছ। ডান হাতে ধানগাছটি। চোখ, মুখ আর কপাল ছাড়া সব জায়গা গাছে ভরা।

নির্জীব ছিল। আজ তার প্রাণ ফুঁড়ে বেরিয়েছে অনেক প্রাণ। শরীরের প্রতিটি স্থান সজীব, জীবনের স্পন্দনে ভরা।

বুড়ি কি গাছ? গাছ হয়ে গেলে এমন হবে? সে হাসে। কয়েক জায়গার ঘা আবার কাঁচা হয়েছে। হাসতে গিয়ে মুখে ব্যথা পায়। ব্যথা সামলে জিজ্ঞেস করে, হে ধান, তোর জ্বর নাকি সর্দি হয়েছে?

কেন?

এত সুন্দর একটা স্বপ্নের কথা বললাম, তুই কোনো আওয়াজ করলি না। গলায় কি কফ আটকে আছে?

কী করব? তোমার মাটিতে এমন দুর্গন্ধ, নাক বন্ধ করে বসে আছি।


সে দেখেছিল আশ্চর্য সুন্দর এক নারীকে। তার দশ হাত। সব হাতে অস্ত্র। চোখে-মুখে দৃঢ়তা।


বুড়ির গলায় কফ জমেছে। ছোটদের মতো সারাক্ষণ ঘড়ঘড় করছে। কেশে যে বের করবে সেই শক্তি পাচ্ছে না। ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, আমাদের একটা তুলসীগাছ ছিল। কবিরাজ রোপণ করেছিল। মরিয়মের কাশি হলে তুলসীপাতা নিয়ে সিদ্ধ করতাম। পাতার রস মধু দিয়ে ওকে খাওয়াতাম। বুকে কফ থাকলে দিতাম রসুনতেলা। রসুনতেলা কি জানিস? সর্ষের তেলের সঙ্গে রসুন চুলায় গরম করলেই রসুনতেলা। ওটা দেওয়া হয় বুকে।

তুলসীগাছ নিয়ে দুটি ঘটনা আছে। কবিরাজের রোপণ করা তুলসীটা মারা গেছে ওর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর। কবিরাজ নেই, ওর গাছটাও নেই। উঠানের কোণে গাছটার গোড়ার দিকে তাকাতাম। মনটা হাহাকারে ভরে যেত।

একদিন পাশের বাড়ি থেকে একটা চারা এনেছি। বিস্কুটের পুরনো টিন ছিল। মাটি ও গোবর ভালো করে মিশিয়ে টিনে রোপণ করলাম। মরিয়ম তখন আরো ছোট। ওকে বললাম, তুই এক কাজ করবি। প্রতিদিন গাছটার যত্ন নিবি। কথা বলবি গাছের সঙ্গে। বলবি, তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠো। তুমি আমার বন্ধু হবে।

বলার সঙ্গে সঙ্গেই সে দৌড়ে গাছের কাছে যায়। পাতায় হাত বুলায়।

বুড়ি বলে, বেশি নাড়িস না। গোড়া নড়ে যাবে।

মরিয়ম বলে, তুলসী ভাই, তোমার সঙ্গে অনেক কথা বলব। তোমাকে আমি পড়াব।

পড়াবি! কী পড়াবি?

কেন? ছড়া পড়াব, অ আ, ক খ পড়াব।

মা বলে, বাহ!

মরিয়ম তখন টিভিতে দেখা মেয়েটার মতো গাছের প্রতি চুমু ছুড়ে দেয়। তারপর সকাল-বিকাল গাছটা নিয়েই পড়ে থাকে।

বুড়ি বলল, তোকে একটা গল্প বলি।

গল্পের কথায় ধানের চেহারা পাল্টে যায়। তবে কী গল্প বলবে তা ভুলে যায় বুড়ি। উদাসী হয়ে বসে থাকে। ভাবে, ছোটবেলায় বাবা তাকে দুর্গাপূজা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। সে দেখেছিল আশ্চর্য সুন্দর এক নারীকে। তার দশ হাত। সব হাতে অস্ত্র। চোখে-মুখে দৃঢ়তা। সে তো অবাক। বাবা বলেছিল, এটা দেবী, মা দুর্গা। শরৎকালে আমাদের দেশে বেড়াতে আসেন। কয়েকদিন পর চলে যান। সে ধানকে সব কথা বলে। তবে তার মন যে এখন খুব শূন্য, সে কথা বলে না।

একটু পর মনে পড়ে অন্য কথা। বলে, গত রাতে যে স্বপ্নটা দেখেছি, তা কি বলব?

ধান অনুচ্চ স্বরে বলল, বলো।

একটা বিয়েতে গেছি। আমাদের এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী নাসির এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে সে জেলে ছিল। তাকে দেখে সবাই অবাক। কেন এসেছ? সবাই একসঙ্গে জিজ্ঞেস করে।

সে আমাদের তাড়া করে। বড় বন্দুক দিয়ে গুলি ছোড়ে। এটা নাকি হাত অবশ করার অস্ত্র। আমার ডান হাতের আঙুলে লাল কী যেন পড়ে। একটু পর দেখি, কিছু হয় নি। এরপর সে ছোট অস্ত্র দিয়ে গুলি ছোড়ে। মনে করেছিলাম মরে গেছি। না মরি নি। বুকে শুধু একটুখানি ময়লা লেগেছে।

এরপর মহিলারা রেগে যায়। তারা সন্ত্রাসীকে তাড়া করে, তার দিকে আবর্জনা ছুড়ে মারে।

এসময় ছাই উড়ে আসে বুড়ির দিকে। নাক কুঁচকে চোখ-মুখ বন্ধ করে। ছাইয়ে শরীর ভরে যায়। সে গা ঝাড়ে। কিন্তু আগের মতো ছাই সরে না। বিরক্ত হয়ে ছাইকে গালি দেয়। বলে, গু নাইয়ে পোঁদত থাডার বেশি।

ধান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী বলেছ? কথাটা বুঝলাম না।

বুঝে কাজ নেই।

বলো না। মরিয়মের মতো বায়না ধরে ধান।

থাডার মানে বজ্রপাত। এখানে থাডার হলো পাদ, মানে বায়ু ছাড়া। বাকিটা তুই বুঝে নে।

বায়ু ছাড়ার কথায় ধান হি হি করে হাসে।

বুড়ি দেখছে, ইদানীং ছাই কেমন আটালো, আগ্রাসী হয়ে উঠছে। ঝাড়লেও গা থেকে সরে না। শেষ পর্যন্ত ছাই কি তাকে খেয়ে ফেলবে! আশঙ্কার কথা ধানকে বলে না।

৩৪.
ওর কপালে একটি টিপ। আসলে টিপ নয়, কবিরাজের চুমু। সেটি টিপ হয়ে ফুটে আছে। মনে হয়, এখনই দিয়েছে। ওর মুখটা মনে করতে চায়। পারে না।

যখন লড়াই করত তখন বাবার মুখটা কেমন থাকত? মকবুল রেগে গেলে কী করত? সব ভুলে যাচ্ছে।

একটা লোক সামনে দাঁড়ায়। লোকটা ছাই দিয়ে তৈরি। তাকে জিজ্ঞেস করে, বেঁচে থাকবি না?

সে কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। কয়েক কদম হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়ায়। মাটির গন্ধ শোঁকে। মাটিকে বলে, তোর কি মান-সম্মান নাই? কেন তুই ধানকে জায়গা দিচ্ছিস না?

মাটি হয়তো শরমিন্দা হয়।

বুড়ি বলে, ধান আর আমি তো তোর দিকেই তাকিয়ে আছি। ধানকে বাঁচিয়ে রাখতে একমাত্র তুই-ই পারিস।

মাটিতে আস্তে আস্তে চড় মেরে আদুরে ভঙ্গিতে ডাকে, মরিয়ম, ও মরিয়ম।

ধান বলে, মরিয়ম কোথায়?

বুড়ি থমকে যায়। অনুচ্চ স্বরে বলে, অ…

তোমার কী হয়েছে?

আগে কত কিছু মনে থাকত! এখন সব ভুলে যাচ্ছি। জোবায়েরের পড়া অনেক কবিতা তোকে শুনিয়েছি। মনে আছে?

হ্যাঁ। বেঁচে থাকাও তো কবিতার মতো।

এ! বুড়ি এমন অবাক হয়, ধান লজ্জা পায়।


দুনিয়ার দেশগুলো ঝগড়ায় লিপ্ত। তারা পৃথিবীকে বিষাক্ত করছে।


বুড়ি মাটিতে হাত বুলায়। ধানের মনে হয়, তার গায়েই বুলিয়ে দিচ্ছে। ভাবে, যখন সে ফুল ছিল, পোকার আক্রমণ থেকে মা নানাভাবে তাকে রক্ষা করত। মা এখন কোথায়? মা কি এই মাটিতে, ছাইয়ে মিশে আছে? মা, মাগো, বলতে বলতে সে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে মাটিকে বলে, তুমি আমাকে সাহায্য করো। আমার অঙ্কুর আসুক, পাতা ফুটুক। একবার পাতা দোলাই। মা দেখবে, আমি বেঁচে আছি। মা খুব খুশি হবে।

ধানের কান্না শুনে বুড়ির মনে হয় রিমঝিম শব্দ হচ্ছে। প্রথমে সে আশান্বিত হয়। তারপর ভয় পায়। কানের কাছে কেউ বোমা ফাটিয়েছে। লক্ষ লক্ষ বোমার শব্দে কান উড়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত পর বুঝতে পারে তার শরীর নেই। নিজেকে খুঁজে পায় না।

জোবায়েরকে তুই নাকি তুমি বলে ডাকত ভুলে গেছে। মনে হয় তুই। বলে, জোবায়ের, তুই একদিন বলেছিলি, দুনিয়ার দেশগুলো ঝগড়ায় লিপ্ত। তারা পৃথিবীকে বিষাক্ত করছে।

আপনমনে বলল, দুনিয়ার কী হয়েছে আমি জানি। সেই কথা শোনানোর জন্য কাউকে পায় না। একটু পর মনে পড়ে, ধান তো এখনো বেঁচে আছে। ধানের প্রতি টান অনুভব করে। ছোটকালে মায়ের প্রতি যে টান ছিল, এ অনেকটা তেমন। সে আস্তে করে মাটিতে হাত রাখে। মাটির বুকে মুখ রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।

৩৫.
আগের দিনের সন্ধ্যার মতো সন্ধ্যা। একটা-দুটো পাখি ডাকছে। আসলে তার ভেতরেই ডাকছে। একটি পাখির নাম মরিয়ম।

মরিয়মের কথা ভাবতে ভাবতে অনেক পথ হাঁটে। কোথায় কতদূর যায় বুঝতে পারে না। পেছন ফিরে দেখে, সবকিছু একই রকম। তাহলে কি সে কোথাও যায় নি!

আচমকা ছাইয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। মুখ ছাইয়ে মাখামাখি। মুখ তুলে শুনে একটা টিয়ে ডাকছে। বুকটা মুচড়ে ওঠে। পাখিটা কি পথ হারাল? ভেবেছিল, পাখির সঙ্গে উড়বে। নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলবে।

খুব বেশি ভালো হওয়া ভালো না। ভালা খায় কেলা। তার দেবর একবার এ কথা বলেছিল। কথাটা ভাবতে ভাবতে আপনমনে বলে, সমস্যায় না পড়লে তো নিজেকে বুঝতে পারতাম না। বুঝলি? মনে হয় বেঁচে থাকার অনেক পথ আছে।

বুড়ির কথা ধান ভালো করে বুঝতে পারে না। ইদানীং তার শরীরটা একটু ভারী ভারী। ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। সে টের পায়। কিন্তু মুখ ফুটে মরিয়মের দাদুকে কিছু বলে নি। প্রায় স্বপ্ন দেখে, ছাইয়ের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে একটা দৈত্য। দৈত্যটাকে দেখলে মুখ ভেঙায়। বুড়ির মুখে শোনা ছড়াটা বলে, দুষ্টের শিরোমণি তুমি লংকার রাজা/চুপে চুপে খাও চানাচুর ভাজা?

দৈত্যটা তখন মানে মানে সরে বুড়ির কাছে আসে। মুখে কোনো কথা নেই। বুড়ি তার দিকে তাকায়। দৈত্য তাকে মুখ ভেঙায়।

বুড়ি তাকে চিনতে পারে না। হাঁ করে চেয়ে থাকে। তারপর নিজের হাতের চামড়া দেখে কেঁদে দেয়। বাবার কথা ভাবতে বসে। বাবা বলত, কখনো নিজের কাছে ছোট থাকবি না। লড়াই করতে যাওয়ার সময় সে বাবার সঙ্গে যেত। কোনো বলী যখন লুটিয়ে পড়ত, বাবার জন্য তার ভয় হতো। মনে হতো, বাবা-ই পড়ে গেছে। বুকটা কেঁপে উঠত। এখন বুক সেই রকম কাঁপল।

প্রচণ্ড কান ফাটানো শব্দ, তারপর ভূমিকম্পের চেয়েও তীব্র ধাক্কা। আগুনের হল্কায় গা পুড়ে যাচ্ছে। ভয় পেয়ে সে ছাইয়ের মধ্যে মুখ লুকায়। হাঁফাচ্ছে। মনে হয় সে এখন যুদ্ধের ময়দানে। চারদিকে তীব্র যুদ্ধ চলছে। মানুষ মানুষকে মেরে শেষ করে দিচ্ছে।

হঠাৎ বাতাসের মৃদু ঘূর্ণি। অনেকদিন পর এরকম বাতাস এল। বাতাসে বিভ্রম থেকে মুক্তি পায়। ছাই উড়ছে। আজ ছাইয়ের গন্ধটা অন্যরকম। কাশতে কাশতে হয়রান হয়ে যায়। বুকটা ফেটে যাবে যেন। এর মধ্যেও ভাবে, কোনো গাছপালা নেই, মানুষ নেই। ভয় ভয়, বুক ধড়ফড়। ধড়ফড়ানির মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।

বিদেশে মকবুল নাকি ষোল চাকার গাড়ি চালায়। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পানি টানে। ছেলের গাড়ির পানির ট্যাংকের ভেতর সে হাবুডুবু খায়। খুব ঠান্ডা। ঠান্ডায় প্রায় জমে যায়। ওই সময় ঘুম ভাঙে।

বেলা মনে হয় অনেক হয়েছে। চোখ মেলেই ঠান্ডার কারণ বুঝতে পারে। শাড়ির ছেঁড়া অংশটি মুখে লেগেছিল। কুয়াশায় সেটা ভেজা। গত রাতে খুব কুয়াশা পড়েছে। এখনো ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শেষ রাতে খুব ঠান্ডা পড়েছিল। কখন ছাইয়ের তলে ঢুকে গেছে নিজেও জানে না। শুধু মুখটা বাইরে আছে। মুখের ভেতর কয়েক ফোঁটা শিশির পড়েছে। স্বাদটা তিতকুটে। মনে হচ্ছে সে এক সাগর পানি খেয়েছে। তবু পানির জন্য ছটফট করে ভেতরটা।

আমার মরিয়ম এখন কোথায়? তার দুই চোখ অশ্রুতে ভরা। মনে হচ্ছে, ধানের ডিগ ফুটেছে। তা দেখে সে আরো কাঁদে। শাড়ির ছেঁড়া অংশটা কোমরে পেচাতে চেষ্টা করে। আশপাশে একটু হাঁটে। আশা করে, কেউ হয়তো ডাক দেবে, অ চাচি, কডে যঅর?

না, সে কোথায় যাচ্ছে তা কেউ জিজ্ঞেস করে না। উড়ে বেড়ানো কিছু ছাই তাকে জড়িয়ে ধরে। মুরগির ঘরে পায়খানা পরিষ্কার করার পর ছাই দিত। সেই কথা মনে পড়ে।

তার পুরো নাম সাজেদা বেগম। কবিরাজ ওকে ডাকত সাজু। কবিরাজের জন্য তার মন কেমন করে। নাক ধরে দেখে। আগে নাক-বালি ছিল। নাক ফুঁড়ানোর পর নানি দিয়েছিল। এখন খালি। কাঞ্চনপুরের খয়রাতিপাড়ায় গণকবর আছে। অনেক মানুষকে মেরে ওখানে কবর দিয়েছিল পাঞ্জাবিরা। পাশেই নানার বাড়ি।

গোসল করানোর সময় মুর্দারের মায়ের নাম লাগে। মায়ের মৃত্যুর পর দেখা গেল নানির নাম কারো মনে নেই। প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পর নাম পাওয়া গিয়েছিল। সেই কথা মনে পড়ায় একদিন সে মরিয়মের মাকে বলেছিল, আমার মায়ের নাম রশিদা বেগম। ছেলে তো কাছে নেই। তুমি লিখে রাখ। গোসলের সময় মায়ের নাম লাগে।

আচ্ছা, সে যদি এখন মরে যায়! কী হবে? ছাই দেখে, আকাশের কালোও দেখে। আর দেখে ধানের আত্মা। হালকা, একটু ঠান্ডা বাতাসের রূপ ধরে তার আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আত্মার আদর গায়ে মাখে। বুঝতে পারে ধান আসছে।

খুব আনন্দ হয়। মা, নানি, মৃত্যু আর ধানের কথা ভাবতে ভাবতে দেখে, ক্ষুদ্র একটি পোকা হাতের ঘা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এসময় মনে পড়ে, জোবায়ের একদিন মজার একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, মাউই মা, পিঁপড়ারা কিন্তু কম দুষ্টু নয়।

কেন? ওরা তো সারা দিন পরিশ্রম করে। ওদের কাছ থেকে মানুষকে শিক্ষা নিতে বলা হয়।

না, ওটা ভুল ধারণা। বেশিরভাগ পিঁপড়া ফাঁকিবাজ। ওরা অন্য বসতি থেকে শিশু পিঁপড়া চুরি করে।

কী!

হ্যাঁ। ওদের মধ্যেও চোর-ডাকাত আছে।

চুরি করে কী করে?

নিজেদের এলাকায় নিয়ে কামলা খাটায়।

শুনে অবাক হয় বুড়ি। কেন আজ এত কথা মনে পড়ছে? চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়। বাতাসে দুর্গন্ধ থাকলেও তার ভালো লাগে। সে ওঠে। এক পা, দুই পা করে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে জড়তা ভেঙে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার সামনে একটা পাহাড়। সে আস্তে আস্তে পাহাড়ে উঠবে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখবে, কিছুই হারিয়ে যায় নি।

জোবায়ের সামনে দাঁড়ায়। বলে, মন হলো একটা খালি পাত্র।

বুড়ি কথাটা শুনেও শুনে না। সে নিজের ভেতরটা একটু একটু দেখতে পাচ্ছে। মেঘেরা যেভাবে দৌড়ায়, সেই রকম কেউ ওখানে দৌড়াচ্ছে। সে কিছু একটা বুঝতে পারছে।

চোখ মেলে তাকায়। প্রশ্ন করে, তুই ওই রকম কেন?

জোবায়ের মৃদু হেসে বলে, কই রকম?

কোথাও মিলতে পারিস না।

সবার সঙ্গে মিলব কেন?

না মিলবে মিলাবি কিভাবে?


পানির চেয়ে নমনীয় কিছু কি পৃথিবীতে আছে? মানুষের জন্ম, বেঁচে থাকা, ভালোবাসা সবই পানির মতো মনে হয়েছে।


৩৬.
বুড়ি আশ্চর্য হয়। কবিরাজ এতদিন তার পাশে থাকলে অনেকবার সে রেগে যেত। কই, ধানের সঙ্গে তো একবারও রাগে নি। তার রাগ কি একেবারে পড়ে গেছে! মাটিতে হাত বুলায়। দীর্ঘক্ষণ ধানের কথা ভুলে ছিল। সে জন্য লজ্জিত হয়, ধানের কাছে ক্ষমা চায়।

ধানের মনে হয় ঝিমুনির মতো এসেছিল। চোখ মেলে বুঝতে পারে না কোথায় আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর মনে পড়ে, কয়েকদিনের মধ্যে মাটির উপর উঠে আসার কথা ভাবছিল সে।

মরিয়মের দাদু তখন পিঁপড়াদের চুরি করার কথাটা জানায়। চুপে চুপে বলে, তুইও এক কাজ কর, মাটির শক্তিটা চুরি করে নিয়ে নে।

আমি করব চুরি! আমার শক্তি আছে না!

শক্তি থাকলে এখনো ম্যাদা মেরে পড়ে আছিস কেন? রাগের কথা ভাবার পর সে ধানের সঙ্গে রেগে যায়।

এ কথায় ধানেরও খুব রাগ হয়। সে কোনো কথা বলে না। নিজের শরীরে হাত দিয়ে দেখে। একটা কিছু টের পায়, কিন্তু সে কথা বুড়িকে বলে না।

সাড়া না পেয়ে বুড়ি চুপসে যায়। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। আকাশের দিকে চোখ। পিঠের নিচে চুলকাচ্ছে। তাকে উঠতে হয়। পিঠ চুলকাতে চুলকাতে আবার অধৈর্য হয়ে যায়। তখন মনে পড়ে জোবায়েরের সঙ্গে সে কখনো রাগে নি। মানুষের সঙ্গে মেলামেশার কথা বলায় জোবায়ের তাকে আশ্চর্য এক লোকের কথা বলেছিল।

বুড়ি ধানকে বলল, বুঝলি! একবার সে সন্দ্বীপ যাচ্ছিল।

ধান একটু নড়েচড়ে বসে। তবে তার মুখ কালো।

সদরঘাট থেকে স্টিমারে উঠেছে। স্টিমার ছেড়ে দিল। পেছনে উড়ছে গাঙচিল। পানিতে ফেনা। ফেনা থেকে ওরা খাবার খুঁজে নিচ্ছে।

জাহাজ তখন মাঝ দরিয়ায়। সে দাঁড়িয়ে সাগরের ঢেউ দেখছে। কিছুক্ষণ পর এক বুড়ো এসে তার কাছে দাঁড়ায়। কোনো কথা নেই। দরিয়ার পানি দেখছে। কাঁধে কাপড় দিয়ে মোড়ানো একটা থলে। দেখতে ভিক্ষুকের মতো; তবে কাপড়-চোপড় পরিষ্কার।

হাতের নখ দেখল। নখে ময়লা নেই। দাঁত ঝকঝকে। তার চোখ দেখলে দিঘির টলটলে জলের কথা মনে পড়বে।

জোবায়ের তার দিকে তাকায়। লোকটাও তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর মৃদু হাসে। অস্বস্তিতে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

আরেকটু কাছে এসে বুড়ো তার কাঁধে হাত রাখল। বলল, তুই এত উতলা কেন?

জোবায়ের চমকে ওঠে।

দেখ, সাগর দেখ, তার জল দেখ। মনটা ওই সাগরের মতো। ওটা খালি রাখতে নেই। সাগরকে কখনো খালি দেখেছিস? দেখিস নি। সে সবসময় পূর্ণ বলেই তার এত ঢেউ।

বুড়ো বলল, মন কিসে পূর্ণ রাখবি সেটা তোর ব্যাপার। যদি ভালোবাসায় পুরাতে পারিস দেখবি আর উতলা হবে না।

পরে জোবায়ের মাউই মাকে বলেছিল, বুঝলে, সেদিন আমি শুধু পানিই দেখেছি। পানির চেয়ে নমনীয় কিছু কি পৃথিবীতে আছে? মানুষের জন্ম, বেঁচে থাকা, ভালোবাসা সবই পানির মতো মনে হয়েছে।

বুড়ি চুপ। চারদিক আঁধার হতে শুরু করেছে। নীরবতা ভেঙে ধান বলে, একবার অনেক পোকা আমাদের আক্রমণ করল। আমার মায়ের অবস্থা ছেড়াবেড়া। আমাকে রক্ষা করার জন্য তার সে কী সংগ্রাম! এক সন্ধ্যায় মা চুপি চুপি আমাকে বলেছিল, সবকিছু হারিয়ে গেলে, সব উপায় বন্ধ হয়ে গেলেও একটা গোপন পথ থাকে।

আমি দেখলাম, দুই পায়ের একটা প্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। ও ধানের ছড়া ছিঁড়ল। ব্যথায় কাঁদছিল ধানগাছটা।

মা বলল, সেই পথটা হলো আশা। যতদিন বাঁচো বাঁচার মতো বাঁচো, আশা নিয়ে বাঁচো।

বুড়ি বলল, বড় ভালো কথা বলেছিস। তোর কথাটা শুনে মন ভরে গেল।


১৩ পর্বের লিংক
জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)