ধানশি : ১১

ধানশি : ১১
194
0
১০ পর্বের লিংক

পর্ব- ১১

৩০.
পানি চাই, পানি। পানি খেতে হবে। পানি ছাড়া যে বুড়ি আর বাঁচবে না। পানির জন্য আশেপাশে অনেক হেঁটেছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে কতবার গড়িয়ে পড়েছে ছাইয়ে। ছাইয়ে মাখামাখি হয়ে ভুলে গেছে পানির কথা। মুখে যা লেগেছে জিহ্বা দিয়ে চেটে খেয়েছে। তারপর দুর্গন্ধে কুপোকাত হয়ে বেহুঁশ।

হুঁশ ফিরলে ছাই সরিয়ে ছোট্ট একটা গর্ত বানায়। ছাই দিয়ে বাঁধ দেয়। যদি বেশি কুয়াশা পড়ে, অকস্মাৎ বৃষ্টি হয়, তাহলে এখানে পানি জমবে। সকালে উঠে খেয়ে নেবে। পানি থাকলে পানি খাবে, না হয় ভেজা ছাই খাবে।

সে ভাবে, আসলে কী হয়েছে? বড় কোনো বিস্ফোরণ নাকি ঘূর্ণিঝড়? ওই ঘূর্ণি সবকিছু অন্য কোথাও উড়িয়ে নিয়ে গেছে? অন্য কোথাও চলে যাওয়া মানুষেরা তাকে খুঁজছে!

তার চোখে-মুখে দৃঢ়তা। ভাবে, আমি তাদের খুঁজে পাব। মাটিতে হাত রেখে অনুভব করার চেষ্টা করে ধানের স্পন্দন। আশা করে, তাড়াতাড়ি অঙ্কুরোদ্‌গম হবে। পাতা আসবে। শেখ সাদির দুষ্টুমির মতো পাতা বাতাসে দুলবে। গাছ বড় হবে। ফুল আসবে। তারপর ফুলটা খোলসে লুকিয়ে পড়বে। ধানে দুধ আসবে। দুধ ধান বড় হবে। কাঁচা ধানে সোনার রং ধরবে। তারপর হেমন্ত। অগ্রহায়ণের মৃদু হিমে এক সকালে চোখ মেলে দেখবে, তার ধান পেকেছে। সে একটা ধান ছিঁড়ে নেবে। খোসা ছাড়িয়ে মুখে দেবে। এসময় কবিরাজ এসে বলবে, সাজু!

সে চমকে যাবে। তখন হয়তো গোটা প্রান্তর সবুজে ভরে উঠবে। কেননা মানুষটা সঙ্গে করে আনবে নানারকম গাছগাছালি আর পাখি। পাখির কলকাকলিতে জায়গাটা মুখরিত হবে।

কিছুক্ষণ পর মরিয়ম এসে গা ঝাঁকুনি দিয়ে বলবে, দাআআআআদু…

তখন তার মনে পড়বে, গত বছর রোজায় সেহরি খাওয়ার সময় দুধ-কলা দিয়ে ভাত খাচ্ছিল। সাগর কলা এনেছে শুক্রবার। এখানে বলে গারাইন কেলা। বৈশাখী গরমে রোববার রাতে পচা পচা অবস্থা।

সে মরিয়মের মাকে বলল, বিয়ের আগে রোজায় আমরা প্রতিদিন ঘি দিয়ে ভাত খেতাম। বাবা শহর থেকে ঘি আনত। কী তার খুশবু! রাইচিকন চালের ভাত ঘি দিয়ে খেতাম। একেবারে ছোট ছোট, মুখের সঙ্গে মিশে যেত। আর ছিল বীজমালী। বীজমালী গোল গোল, ধানটাও দেখতে সুন্দর।

মরিয়মের মা বলে, এখন তো খাঁটি জিনিস পাওয়া যায় না। সব ভেজাল।

বুড়ি ভাবে, সবাইকে খুঁজে পাবে। রাতে স্বপ্ন দেখে, তার চেয়েও বয়স্ক এক মহিলা এসে বলছে, তুই তো একবার কল্পনা করেছিলি।

কিসের কল্পনা?

তুই কল্পনা করেছিলি, কোথাও কেউ নেই, দুনিয়ায় আমি একলা। এরকম হলে কেমন হয়?

কল্পনা করলেই কি তা বাস্তব হয়ে যাবে?

মানুষের আশংকা বা কল্পনা কখনো কখনো মিলে যায়।

বুড়ি হাউমাউ করে কাঁদে। বলে, আমি এখন কী করব?

ওই মহিলা বলে, ছাই খাবি আর বসে বসে কাঁদবি।

তার খুব রাগ হয়। উঠে দাঁড়ায়। হাতের কাছে কিছু পেলে ছিঁড়ে ফেলত। ছাই মুঠোয় নিয়ে মোচড়ায়।


আগুনে পুড়ে যায় মানুষ, মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সাথে সাথে মিউজিক বাজে।


রাতে ভালো ঘুম হয় না। মনে হয় হাড়গুলো খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে। সে খুঁজে এনে জোড়া লাগায়। জোড়া খুলে যায়। আবার খুঁজে আনে। এভাবে সারা রাত চলতেই থাকে।

দেখে, ধানের অঙ্কুরোদ্‌গম হয়েছে। মানে গেঁজ বেরিয়েছে। দুদিন পর পাতা ফোটে। তবে পাতা সবুজ নয়, ছাই রং। পাতার রং দেখে সে কাঁদে। ভাবে, ঘষে ঘষে ওই রং মুছে ফেলবে। ঘষতে শুরুও করে। ঘষাঘষিতে পাতা ছিঁড়ে যায়।

সে ছাই ওড়ায়। ছাই একটা পুকুরের আকার পায়। সেখানে ভাসছে জোবায়েরের মৃতদেহ।

মকবুলের দুটি সন্তান মারা গিয়েছিল। এরপরই তো মরিয়ম এল। বড় আদরের সে। মরে যাওয়া ওইসব শিশু যেন আধফোটা ফুল। তাদের জন্য তার মন কেমন করে।

তখন তার দেবর বাজার থেকে লইট্টা মাছ আনে। সে জিজ্ঞেস করল, মাছ কেমন?

দেবর হেসে বলল, ভাটিয়ারীর লইট্টা। একেবারে আপেলের মতন। কাঁচা খেতে পারবে।

ভাবে, ছাইগুলো যদি আপেল হয়ে যেত!

বুড়ি কর্মঠ। সারা দিন কাজ করত। এক মুহূর্তের জন্যও বসে থাকত না। থাকতে পারত না। এজন্য ছেলের কাছে, বউয়ের কাছে কত বকা খেয়েছে!

জমি যা আছে সব বর্গাচাষির হাতে। গোলাটা করেছিল কবিরাজ। উঠানে ধাইয্যে (চাটাই) বিছিয়ে ধান শুকাতে দিত। ভালো করে শুকিয়ে গোলায় তুলত। সেদিন ধান নিতে গোলায় না উঠলে, মরিয়মের কান্নায় গোবরের গর্তে না নামলে কী হতো?

গায়ের ফোসকা কয়েক জায়গায় আবার কাঁচা হচ্ছে। কয়েক জায়গার পোড়া অংশ ফোলা ফোলা। শরীরের ভেতর, মনের ভেতর কেউ আর্তনাদ করছে। তার কানে তা কান্নার মতো আসছে। সে এদিক-ওদিক তাকায়। কিছু দেখে না।

মরিয়ম দুষ্টুমি করে বলত, দাদু, সাত ভাই চম্পার গল্প বলো।

চম্পা মরিয়মের মায়ের নাম। ওর মা মোবাইলে গরুর লড়াই দেখছিল। মেয়ের কান টেনে দেয়। ও উঁকি দিয়ে মায়ের মোবাইলের স্ক্রিন দেখে। দৌড়ে এসে বলে, দাদু দেখছ?

কী?

একটা গরু না আরেকটা গরুর চোখে শিং ঢুকাই দিছে। রক্ত গড়ায় পড়ছে।

কোথায়?

মায়ের মোবাইলে আর কি। মা’টা না পচা, শুধু লড়াই দেখে।

সে জানে, বউয়ের মোবাইলে আরো ভিডিও আছে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের একটা ভিডিওতে দেখা যায়, লরি থেকে লম্বা লম্বা গাছ পড়ে যাচ্ছে। পেছনে আসা গাড়িগুলো একটার পর একটা দুর্ঘটনায় পড়ে। গাড়িতে আগুন ধরে যায়। আগুনে পুড়ে যায় মানুষ, মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সাথে সাথে মিউজিক বাজে।

৩১.
একদিনের কথা। তার খুব খিদে। পেটের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। জোবায়েরের বলা লোভ, হিংসা, ক্ষমতার ভেতরে এ তো আরেক যুদ্ধ। সে বলেছিল, যুদ্ধ মানুষকে নিচে নামিয়ে দেয়। শোনো মাউই মা, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ শিশু আহাজারি করছে।

শিশুদের কান্না শুনতে পায় বুড়ি। তবে এর কোনো শব্দ নেই। টিভির সাউন্ড বন্ধ করে দিলে যে অবস্থা হয়, এ-ও অনেকটা তেমন। সে গড়াগড়ি খায়। নিজের মধ্যেও আহাজারি শুরু হয়। মনে মনে দেখে, অবাক চোখ, চোখের নিচে বড় বড় গর্ত। হাড্ডিসার শরীর। শরীরের প্রতিটা অংশ কান্না করছে। কান্নাটা থামাতে পারে না।

দুই আঙুলে ভেজা ছাই নিয়ে মুখে দেয়। কয়লা দিয়ে অনেকবার দাঁত মেজেছে। কটু গন্ধের ছাই খেতে খেতে তা মনে পড়ে।

খাওয়ার কিছুক্ষণ পর পেট মুচড়ায়। বসতে পারে না। হাঁটু বুকের কাছে ভাঁজ করে শুয়ে পড়ে। মনে পড়ে কারবালার কাহিনি। যেন এক সিমার এসেছে। সে মাথা কাটার জন্য কাউকে খুঁজছে। কিন্তু পায় না। দেখে শুধু ছাই আর ছাই। কিছুক্ষণ ছাইয়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে। তারপর রেগেমেগে নিজের মাথাটাই কেটে ফেলে।

বুড়ির কোনো সাড়াশব্দ নেই। ও তো এখন ছাইয়ের সাগরে ভাসছে। নাক থেকে কি এক ফোঁটা রক্ত পড়ল! হাত দিয়ে দেখবে, শক্তি পায় না। মরিয়মকে ডাকে। মরিয়ম বলে, দাদু, আমি তো নাই।

ওর খুব ভয় হয়। ফুঁ দিয়ে কিছু সরাতে চায়। মনে হয়, জোরে ফুঁ দিলে ধানের অঙ্কুর ভেঙে যাবে।

জোবায়ের তখন পড়ছে,
ঈশ্বরের সন্তান আমি
পদচুম্বন করো,
প্রত্যাদেশ এনেছি
তোমাদের পরাধীনতা।

তারপর পড়ে,

মুখাগ্নি করে অনেকে
কিন্তু মন?
মনাগ্নি কেউ করে
এরকম শুনি নি কখনো।
অচল রাজনীতির দুপুরে
ফরমালিন মানুষের মতো
কত মনে অগ্নি দেয় কত?
কি জানি কেন এত বৃষ্টি
ডুবল কে কোথায়
আগুন তাই রয়ে যায়
কোণে কোণে জড়োসড়ো
বাইরে আসে না, পারে না ছড়াতেও।
কলে কৌশলে কেউ
গেছে কি নিজের কাছে
জরুরি কথার ছলে!
বলেছে কি, ছড়িয়ে দাও সবখানে
অযুত নিযুত কণার মতো!

অকস্মাৎ মন খারাপ করা গলায় বলে, মাউই মা, অনেক মানুষ খেয়ে মরে আর অনেক মানুষ মরছে না খেয়ে। লক্ষ লক্ষ শিশু ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সহ্য করতে পারি না।


এক সময় পৃথিবীতে যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের লড়াই হবে। লড়াইয়ের পর মানুষ থাকবে না, থাকবে কিছু যন্ত্রপাতি।


বুড়ি দেখল, ওর চোখে পানি। ভাবে, পানি খেয়ে নেবে। আবার ভাবে, না থাক, দুঃখটা লেগে থাক। ভেতরে যদি দুঃখ না থাকে মানুষ কোনো কিছু ভালো করে বুঝতে পারে না। দুঃখটা থাকতে হয়। সে দেখে, গরুর বাছুর একটার পর একটা বাঁট থেকে দুধ খেয়েই যাচ্ছে। ব্যথা পেলেও গাভিটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে লেহন করছে বাছুরের গা।

ফিসফিসিয়ে ধানকে বলল, বেঁচে থাকতে হলে শক্তি খুঁজে নিতে হয়। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়।

সে চোখ বন্ধ করে। গভীর শ্বাস নেয়। ছাইয়ের তলে, মাটির তলে কিছু দেখতে চায়। হয়তো দেখেও। দেখে উঠে বসতে চায়।

ধান বলে, ধীরে উঠ।

সে আবার কাত হয়ে পড়ে যায়।

ধান বলে, তাড়াতাড়ি করো না, তাড়াতাড়ি করলে বিড়ালের মাথায় শিং উঠবে।

বুড়ি হাসে। ধান তাকায়, মরিয়মের দাদির সামনের পাটির দুটি দাঁত দেখা যাচ্ছে না। ছাই খেতে খেতে কালচে হয়ে গেছে? তাই দেখা যাচ্ছে না? সে দাঁত নিয়ে কথা বলতে চায়। কী মনে করে বলে না।

আমি কী করব? বুড়ি নিজেকে কিংবা বিশাল এ শূন্যতাকে প্রশ্ন করে। মন হাহাকারে ভরে যায়। বিরক্ত হয়ে বলে, তোর জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করব? এরপর সে ছাইয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়। হাউমাউ করে কাঁদে। কিন্তু বেশিক্ষণ কাঁদতে পারে না। মৃত মানুষের মতো নেতিয়ে পড়ে।

ধান কিছু বলে না। কেননা, সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না।

৩২.
পরদিনের কথা। তখন সম্ভবত সকাল। নিয়মের চক্রে সময় গড়ায়। সেও আগের মতো সময়কে ভাগ করে একটা হিসাব রাখে। চোখ ভালো করে মেলতে পারে না। পিঁচুটি জমেছে। কয়েকবার মেলে, বন্ধ করে স্বাভাবিক হয়। ছাই সরিয়ে মাটি ছোঁয়। অনুভব করে, ধান জেগেছে। তার মৃদু নড়াচড়া টের পাচ্ছে।

লম্বা হাই তোলে। হাই তুলতে তুলতে কী একটা কথা বলে। ধান বুঝে নি। চুপ করে আছে। হয়তো এখনো ঘুমের জড়তা কাটে নি।

বুড়ি বলে, আচ্ছা শোন, তোর মা-বাবা, দাদা-দাদি আর নানা-নানির কথা মনে আছে?

ধানও হাই তোলে। একটু ভেবে বলে, আছে।

দরকার হলে তুই সময় নে। ওদের কথা ভাব। ওরা কী করেছে, বেঁচে থাকার জন্য তোকে কী পরামর্শ দিয়েছে মনে কর। তোর সঙ্গী-সাথিরা কী বলেছে না বলেছে ভেবে দেখ।

ধান কোনো কথা বলে না।

হালকা একটু বাতাস এসে তার চুলে নাড়া দেয়। ছাই উড়ে এসে মুখে লাগে। দাঁতে দাঁত লাগলে ঘচঘচ আওয়াজ হয়। বলে, তুই হয়তো ভাবছিস, কেন মনে করব? মনে করবি এ জন্য, তোকে বাঁচতে হবে। বিরান এই ছাইয়ের জগতে মাটির উপর উঠতে হবে। ওঠার জন্য যা যা করা দরকার করবি। তোর ভেতরে, খোসায় অনেক কথা জমা আছে। সেসব কথা মনে কর।

ধান হাসে। হাসলেও কিন্তু সে চিন্তায় পড়ে। বুড়ির কথা তাকে ভাবনায় ফেলেছে। ভাবনা থেকে মনে পড়ে মায়ের কথা। কতগুলো পোকা কিলবিল করত তাদের আশেপাশে। পাতা খাবে, আগা খাবে। ওই সময় তাকে আগলে রেখে মা লড়াই করত। শরীর থেকে এক ধরনের পদার্থ বের করত। ওটার গন্ধে পোকারা সরে যেত।

সে গন্ধটা পায়। ওই গন্ধ কি তার শরীরে আছে? সে খোঁজে। দুপুর যখন গড়ায়, খুঁজে পায়। চিৎকার করে বুড়িকে ডাকে। বুড়ি তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

ধান চিন্তা করে কিভাবে মাটির দুর্গন্ধ কাটিয়ে উপরে উঠবে। তার ভেতরে থাকা জিনিসটা নাড়ায়। নাড়ালে কি তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে? তখন কেউ তাকে আটকে রাখতে পারবে না। তার শখ, বুড়ির মুখটা ভালো করে দেখবে। যখন অঙ্কুরোদ্‌গম হবে, পৃথিবীতে আসবে, তাকে দেখে ওর মুখে যে হাসি ফুটবে, সেটা সে দেখতে চায়।

ধান তখন বুড়ির সঙ্গে কী কথা বলবে আর বুড়ি কী করবে তা ভাবে। ভেবে শক্তি পায়। মনে হলো, অনেকদিন পর ঝাঁকুনি দিয়ে শরীরটা জেগে উঠেছে। ছাই ও মাটির দুর্গন্ধ তত কড়া মনে হয় না। ভাবে, আমি তো অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এবার বেরোব। মরিয়মের দাদু, একটু অপেক্ষা করো।

বুড়ি ভাবছিল, মানুষের জন্মের আগে কি দুনিয়া এমন ছিল? ভাবনা জোড়া লাগাতে পারে না। একবার ঈদের সময় শহরে থাকা তাদের বাড়ির এক ছেলে এসেছিল সালাম করতে। কী একটা কথা থেকে বলেছিল, এক সময় পৃথিবীতে যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের লড়াই হবে। লড়াইয়ের পর মানুষ থাকবে না, থাকবে কিছু যন্ত্রপাতি।

এটা কি সেই সময়! তাহলে যন্ত্রপাতি কোথায়? সবই তো ছাই। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে। ধানের কথা শুনতে পায় না। দেখে, ধানে আবার পাতা গজিয়েছে। সেই পাতার রং লাল। লাল রঙা পাতা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শেষে তুই এমন হলি!

গাছের কাছে গিয়ে বসে। জিহ্বায় হাত রাখে। ভেজা হাত পাতায় ঘষে। লাল রং মুছে ফেলতে চায়।

জেগে ওঠার পর স্বপ্নের প্রতিটা ঘটনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে। একটি শব্দও বাদ দেয় না। স্বপ্নের স্বাদ, গন্ধ ধানকে দিতে চেষ্টা করে। আর স্বপ্নের কথা শুনে ধান ঝিমুনি ছেড়ে চোখ মেলে তাকায়। একটু হাসে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা পুনরায় ভাবে।

যদি আমি বাঁচতে চাই কেউ আমাকে মারতে পারবে না। ধান এ কথা বুড়িকে জানায়। তার কথা কি বুড়ি শুনতে পেয়েছে? মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে পায় নি। হতাশায় ধান মাটিতে মুখ ঘষে। একটু বেশিই ঘষে। মাটিকে কাতুকুতু দিতে চেষ্টা করছে।

মাটি হয়তো সাড়া দেয়। মৃদু হাসে। তার আগের স্মৃতি মনে পড়ে। ভাবে, এ ধানটাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে তো মান থাকবে না। একে মাটির উপর দাঁড় করাতেই হবে। একটা প্রাণও যদি ধারণ করতে না পারল, তাহলে তার ছাই হয়ে যাওয়া উচিত।

ধান মাটির সাড়া টের পায়। তার খুব আনন্দ হয়। সে এক পাক নাচে। তার নাচুনিতে মাটিতে সাড়া পড়ে।

এদিকে বুড়ি তখন স্মৃতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অনেকদিন পর বাছুরটার কথা মনে পড়ে। ওটা একেবারে লাল। সারাক্ষণ আছে লাফালাফিতে। মরিয়মকে দেখলে লাফায়, তাকে দেখলে লাফায়। গাছের পাতা পড়লেও লাফায়। মায়ের দুধ যখন খায়, এমন টান মারে বোঁটা যেন ছিঁড়ে চলে আসবে।

বাছুরটা তার গায়ের কাছে এসে লাফাত। একসময় স্থির হয়ে আরো কাছে এসে মরিয়মের মতো চোখ তুলে তাকাত। সে তখন নড়ত না। বাছুর তার গন্ধ শুঁকত।

গন্ধটা সে পায়। বুক ভরে শ্বাস টানে। নিশ্বাসের সঙ্গে সব স্মৃতি এসে হাজির হয়েছে। কোনটা রেখে কোনটার কথা ভাববে, দিশা পায় না। তার মন খারাপ হয়। তাই স্মৃতিগুলো মনের এক পাশে রেখে দেয়। আপন মনে বলে, কবিরাজ, বাবা বা মরিয়মের কথা এখন ভাবব না। ভাবতে না চাইলেও প্রতিটা সুখস্মৃতি, প্রতিটা কথা মনে পড়ে। সে করে কী, মাটিতে আদরের মতো হাত বুলায়। যেন সব সুখ, ভালোবাসা মাটিকে দিয়ে দিচ্ছে।


এই মাটি জীবনভর অনেক পানি খেয়েছে। সেখান থেকে নে। যদি দিতে না চায় কেড়ে না।


এতক্ষণ পর তার ধানের কথা ভাবার সময় হলো। ধানটা মুখ গোমড়া করে শুয়েছিল। সে বলে, রাগ করিস না। মন কি সবসময় নিজের কাছে থাকে!

ধান মাটিতে আরেকটু মুখ গুঁজে দেয়।

বুড়ি বলে, তোকে তো জোবায়েরের কথা বলেছিলাম। আহা! ছেলেটা অকালে চলে গেল। আমার কেন জানি মনে হয়, সে যায় নি। সবসময় আশপাশে তাকে দেখি। সে একবার এক ডুমুরগাছের গল্প বলেছিল। গল্পটা মনে পড়েছে। শুনবি?

ধান হয়তো মাথা নাড়ে।

শোন, এক দেশে একবার যুদ্ধ বেঁধেছিল। যুদ্ধে তো মানুষ হিংস্র হয়ে যায়। রক্ত ছাড়া আর কিছু চিনে না। সেই সময় মারা গিয়েছিল অনেক মানুষ আর ঘরছাড়া হয়েছিল লক্ষ লক্ষ। সেই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল এক লোক। কিন্তু তার কথা কেউ জানত না। জানা গেল অনেক বছর পর। কিভাবে জানিস?

ধান আড়চোখে তাকায়।

লোকটার মৃত্যুর খবর দিল পাহাড়ের গায়ে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ডুমুরগাছ। তুই তো জানিস, পাহাড়ি এলাকায় ডুমুরগাছ দেখা যায় না। এক জ্ঞানী লোকের চোখে পড়ে তা। তিনি করলেন কী, লোকজন ডেকে গাছের চারপাশে মাটি খুঁড়তে শুরু করেন। তারা দেখে, গাছের নিচে একটি কঙ্কাল।

কিন্তু গাছটা জন্মাল কিভাবে? কৌতূহলী হয়ে ধান জিজ্ঞেস করে।

মারা যাওয়ার আগে নাকি লোকটা ডুমুর খেয়েছিল। ওর ভেতরে থেকে গিয়েছিল ডুমুরের বীজ। ওই বীজ থেকেই গাছটা জন্মায়। পানি আর আলো পেয়েছে, তাই গাছটা জন্মেছে।

পানি!

ধান এমন জোরে চিৎকার করল, বুড়ির বুক কেঁপে উঠল।

ধান বৃষ্টির শব্দ শোনে। ইশ! এখনই যদি ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ত।

তাই তো! বৃষ্টির কথা, সূর্যের কথা বুড়ি ভুলেই গিয়েছিল। সে নাক টানে। আহ!

ধান বলে, পানি ছাড়া কিভাবে উপরে উঠব?

চিন্তা করিস না। এই মাটি জীবনভর অনেক পানি খেয়েছে। সেখান থেকে নে। যদি দিতে না চায় কেড়ে না।

কেড়ে নেব!

অবশ্যই। তোকে তো বাঁচতে হবে।

ধান আপন মনে বলল, বাঁচতেই হবে।


১২ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)