ধানশি : ১০

ধানশি : ১০
216
0
৯ পর্বের লিংক

২৭.
বেশ কিছুদিন ধরে শুধু ছাই উড়েছিল। ছাইয়ের কোনো শেষ ছিল না। নাকে-মুখে কত ছাই ঢুকেছে! এখন অবশ্য কমে এসেছে।

নিজের সন্তান হওয়া তো দেখা যায় না। ছেলের সন্তান হওয়ার সময় দেখেছে। মরিয়মটা একটা পুতুলের মতো, ওঁয়া ওঁয়া করছে। অসহায় শিশু যখন মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তারও কি কিছু স্মৃতি থাকে?

সে কয়েকদিন ছিল স্মৃতিহীন। অস্পষ্ট একটা হাহাকার; বেদনার মতো অনেকটা। শুধু তাকিয়ে থাকা। সূর্যের আলো নেই, চারপাশ ঠান্ডা। তীব্র শীত এসে ঘিরে ধরেছে। ভাগ্যিস ছাই ছিল। ছাইয়ের মধ্যে লুকিয়ে বেঁচেছে। গায়ে কোনো কাপড়-চোপড় ছিল না। পুরো শরীর ছাইয়ে ঢাকা, চোখ দুটো আর নাক-মুখ দেখা যেত।


 উপরে আকাশ নেই, আছে ভাসমান ছাই। দূর ছাই বলে চোখ বন্ধ করি।


এর মধ্যে একদিন স্বপ্ন দেখে : একটি গাছ উঠেছে। গাছের কাণ্ড, পাতা সবই ধূসর। পাতা থেকে বীভৎস পোকা বেরিয়ে কামড়াতে এল। সে বলল, মরার পোকা।

পোকাটা হেসে বলল, আমি পোকা নই, বোকা।

উঠে গাছটার কাছে যায়। পাতায় হাত বুলায়। তার ছোঁয়ায় পাতা চোখ মেলে তাকাল। কিছু বলতেও চাইল।

পাতাকে সে বলল, তুই সবুজ হয়ে যা।

পাতা বলল, পারছি না তো।

পাতার চোখ বেয়ে পানি গড়ায়।

সে দ্রুত দুই হাত মেলে দেয়। পানি নেয়। খাবে ভাবে। কী কথা মনে পড়ে। হাত সরায়। আরে! এটা তো তার কান্না। ভেজা হাত গায়ে বুলায়। লেগে থাকা ছাই শরীরে লেপ্টে যায়।

একটু পর বুঝতে পারে এটা স্বপ্ন। বুক ফেটে কান্না আসে। কিন্তু চোখে পানি নেই।

ভাবে, আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। দুনিয়ার কিছু একটা হয়েছে। না বাঁচলে জানব কিভাবে? আমার ছেলে কেমন আছে তা-ও তো জানতে হবে। এত্তগুলো মানুষ হারিয়ে যেতে পারে না। তারা নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, বিশাল এই দুনিয়ার মালিক কে?

তুই কোথায় বসে আমায় দেখছিস?

তার কথায় হয়তো ছাইয়েরা হাসাহাসি করে।

ছেলে দেশে করত মুদির দোকান। বিদেশে গিয়ে ট্রাকের ড্রাইভার হয়েছে। কবিরাজ বলত, অভিশপ্ত হলে একটা না একটা ঘটনা ঘটে। গাড়ি চালানোর জন্য মুরুব্বির দোয়া লাগে। যারা মা-বাবার সেবা করেছে, তারা মানুষ হয়েছে।

মকবুল যখন কাতার যাচ্ছিল তখন কবিরাজ পৃথিবীতে নেই। সে কাতারে ষোল চাকার ট্রাক চালায়। কফিলের একশটা উট আছে। দুদিন কফিলের উটের খাবার টানে। আগে কফিলকে টাকা দিতে হতো। এখন নেয় না।

সে বলে, মকবুল আয়, আমার কাছে আয়। গাছ হয়ে হলেও চলে আয়। আমার আর একা থাকতে ভালো লাগছে না।

দাদুর কথা শুনে মরিয়ম ‘বাবা’, ‘বাবা’ বলে কান্না শুরু করে। সে তার কান্না মুছে দিতে চায়। হাত বাড়িয়ে কাউকে পায় না। ছাইয়ে ঘুষি মারে। বুকে হাত দিয়ে শুয়ে পড়ে ছাইয়ের বিছানায়। নড়বড়ে বুকের ঘড়ি, ধুপধুপ লাফায়। মাটিতে হাত দেয়। ওর বুকের মতো একটা আওয়াজ ধানের বুক থেকেও কি আসছে!

২৮.
তুই তো চুলের মধ্যে ছিলি। তোকে পাওয়ার আগে কী হয়েছিল জানিস? একদিন মনে হলো, কে যেন আমার পিঠে টোকা দিচ্ছে।

আমি বললাম, মরিয়ম নাকি!

আওয়াজ না পেয়ে পেছনে তাকাই। মরিয়মই তো এরকম টোকা দেয়। তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি মরিয়ম। আমার ছেলে মকবুলের মেয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, পান্তাবুড়ি।

পান্তাবুড়ি বললে আমি রেগে যাই। রেগে গিয়ে তাকে তাড়া করলাম। মরিয়ম খিলখিল করে হাসে আর দৌড়ায়।

আগে একবার দেখেছিলাম। ওইদিন আবার দেখলাম, নাতনি যে পথে যাচ্ছে সেই পথে ঘাস গজাচ্ছে। লম্বা লম্বা সবুজ ঘাস। আমি আরো তাড়া করি। মেয়েটা দৌড়াক আর চারপাশ ঘাসে ভরে যাক।

ঘাসে ঘাসে চারপাশ ভরে গেছে। দৌড়ে আমিও ক্লান্ত। সেই সময় ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে বুঝতে পারি, এতক্ষণ কোথায় ছিলাম। খিলখিল হাসিটা অনেকক্ষণ কানে লেগেছিল।

বুড়ির কথা শুনে ধান খুব মজা পায়। বলে, তারপর কী হলো?

ভাবছি, এখান থেকে চলে যাব।

কোথায় যাবে?

দূরে, অন্য কোথাও। হয়তো ওখানে মানুষজন আছে, গাছপালা আছে। কিন্তু শক্তিতে কুলায় না। শরীরটা দিন দিন কাহিল হয়ে যাচ্ছে। একবার ইচ্ছে করে, কুটার সময় কৈ মাছ ছাই দিয়ে যেভাবে ধরে, সেভাবে কিছু ছাই নেব। মুঠো থেকে একটু একটু ছাই খাব। পেট আর খালি থাকবে না। তবে সমস্যা হচ্ছে এ ছাই চুলার ছাইয়ের মতো নয়। এতে উৎকট গন্ধ।

বুড়ি বলে, উপরে আকাশ নেই, আছে ভাসমান ছাই। দূর ছাই বলে চোখ বন্ধ করি। নাতনির কথা মনে পড়ে। ও বলে, পান্তাবুড়ি পান্তাবুড়ি, যাচ্ছ কোথায় তুমি?

আমি পান্তাবুড়ির মতো করুণ কণ্ঠে বলি, চোর বেটা প্রতিদিন আমার পান্তাভাত খেয়ে ফেলে, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি। তুই কোথায় গিয়েছিলি?

আমার শহরে।

তোর শহর!

হ্যাঁ, আমি ড্রয়িং করে তোমাকে দেখাইছি।

ও আচ্ছা। আমার মনে পড়েছে। কয়েকদিন আগে মরিয়ম পাতা জুড়ে একটা শহর এঁকেছিল। সেখানে ছোট্ট সুন্দর একটি ঘর। ঘরের পেছনে পাহাড়। সামনে নদী, নদীতে মাছ। আশপাশে গাছপালা। কলাগাছও আছে।

আমাকে নিস নি কেন?

ভুলে গেছি।

মরিয়ম, এদিকে আয়।

মরিয়ম পেছন ফেরে হাঁটে। সঙ্গে সঙ্গে সবুজও মুছে যেতে থাকে। জিজ্ঞেস করে, চকলেট খাবে?

আমি খুশি হয়ে বলি, দে।

সে একটা মুখে পুরে, আমি একটা খাই। চুষতে চুষতে দেখি, সব সবুজ গলে গেছে।


মানুষ মরে যায়। কেনই-বা মরে যাওয়া? স্বার্থ, সংঘাত কি মানুষের নিয়তি! মানুষ কতদূর যাবে? কোথায় যাবে?


বুড়ির মুখটা শূন্য হতে দেখে ধান নড়েচড়ে ওঠে। বলে, আমার মা আমাকে বলেছিল, বেঁচে থাকতে হলে বুকে সাহস আর ভালোবাসা রাখতে হয়। আর থাকতে হয় ধৈর্য।

ধানের কথা শুনে বুড়ি অবাক হয়। বলে, আমার মনে পড়ছে, ওই যে মরিয়মের মামা জোবায়ের, ও একবার আমাদের চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিল।

কোন কোন প্রাণী দেখলে?

বাঘ, হরিণ, চিতাবাঘ, বানর, ভালুক সব দেখলাম।

ভয় করে নি?

বাঘের খাঁচার সামনে গিয়ে বুক গুড়গুড় করছিল। আর কুমিরের ওখানে গিয়ে দেখলাম, বেটার নড়াচড়া নেই, মরার মতো পড়ে আছে।

ওরা তো বন্দি, ওদের আসল রূপ চিড়িয়াখানায় দেখবে না।

অনেকক্ষণ ধরে পশুদের দেখলাম। একটা জিনিস বুঝলাম, মানুষের সঙ্গে পশুদের বেশি পার্থক্য নেই। যা আছে তা-ও মানুষ মুছে দিচ্ছে।

কিভাবে?

বুড়ি কিছু বলে না। তার মনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে। অনেক বছর আগের দেখা তরুণ-তরুণী বড় একটি বাগানে হাঁটছে। বাগানের মাঝখানে ফুলে ভরা গন্ধরাজ। গাছের দুই পাশে দুজন। তাদের মুখে বিকেলের আলো। গন্ধরাজের সুঘ্রাণে প্রেম-চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে।

ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে সেই দৃশ্য। সুখস্মৃতি বেশিক্ষণ মনে রাখা যায় না। ভয়ংকর সেই সকাল, পোড়া শরীর, ধূসর দুনিয়া আবার হানা দেয়। ভয়ে সে কুঁকড়ে যায়। বুকটা ধড়ফড় করে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মনে হচ্ছে এখনই মরে যাবে।

তার নিশ্বাসের কষ্ট ধানও টের পায়। সে চায়, বুড়িকে বাতাসের একটু পরশ দেবে। কিন্তু সে তো এখনো মাটির উপরে আসতে পারে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দীর্ঘশ্বাসে মাটিতে কাঁপুনি ওঠে।

বুড়ি কাঁপুনি টের পায়। ভাবে, মাটির নিচে আবার কী হলো? আশংকায় তার বুক কেঁপে ওঠে। দুষ্টু নাতনি তখন মনের কোনায় ফড়িং হয়ে ওড়ে। সে ফড়িংটা ধরতে চায়। ওর উপরের পাটির দাঁত তো পোকায় খাওয়া। সেই কথা মনে পড়ে। ওকেও সবাই বুড়ি বলে ডাকে। বুড়ি ডাকলে সে রেগে বলে, তুই বুড়ি। তারপর মারতে যায়।

তার হাসি পায়। দেখে, ঝাঁক ঝাঁক পাখি এসে ছাইয়ের উপর দাঁড়িয়েছে। ওরা ছাই খেতে শুরু করেছে। ততক্ষণে ও ঘুমিয়ে পড়ে।

পাখি এসে ওর বুড়ো আঙুলে গুঁতা দেয়। ও তখন আম, কাঁঠাল, বাঙ্গির সুবাস পায়। পাখি গভীর চোখে ওর দিকে তাকায়। কিন্তু ওর চোখ বন্ধ। পাখি চোখে গুঁতা দেয়। তবুও ওর ঘুম ভাঙে না।

পাখিরা যখন ডানা মেলে উড়ে যায়, সে ডানার আওয়াজ শোনে। ডাক দিতে চায়, পারে না। মাটি থেকেও হাত সরে যায়। হাতে ছাই জমে।

এর মধ্যে মরিয়ম টিভি ছেড়ে দিয়েছে। মোটো পাতলু দেখছে সে। জনকে সে বলে ‘জন চোরা’। জন লুটপাট করার জন্য ফুরফুরি নগরের বনে আগুন ধরিয়ে দেয়। সবাই আগুন নেভাতে ব্যস্ত। এ ফাঁকে জন আর তার দুই সঙ্গী ব্যাংক, স্বর্ণের দোকান সব লুট করে।

পাতলুর মাথায় আইডিয়া আসে। তারা বিচিত্র উপায়ে আগুন নেভায়। চোরও ধরা পড়ে।

মরিয়ম দাদুকে তার পাশে সোফায় বসায়। তার হাতে মায়ের মোবাইল। এটা বাবা বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে। সে গেমসটা শুরু করে। দাদু দেখে, সাগরের মাঝখানে একটি রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে গাছ। কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝখানে ফাঁকা। সেখানে সাগরের পানি ঢেউ তুলছে। ওই স্থান লাফিয়ে পার হতে হয়।

নীল জামা গায়, পায়ে লাল জুতা, দুই হাতে ধূসর রং, মনে হয় রোবট। ওটা লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে। ওই পথ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে তার জানার কথা না।

কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা যায়, একটা দৈত্য আসে গোলাকার ছোট উড়ন্ত যানে চড়ে। দৈত্যটা রোবট ছেলেটাকে গুলি ছুড়তে থাকে। নানা ধরনের গোলা মারতেই থাকে।

এই গেমস মরিয়ম প্রায়ই খেলে—কখনো সে নামাজ পড়ার সময় তার জায়নামাজের পাশে শুয়ে, কখনো বিছানায় গায়ে হেলান দিয়ে পাশে বসে।

বুড়ি ওই রকম একটা রাস্তা খোঁজে। যে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছে যাবে বাড়ি। যত বালা-মুসিবতই আসুক, থামবে না। যে মৃত্যু নিয়ে ভয়ে নেই, তাকে কে থামাতে পারে?

নাতনি সবুজ রং নিয়ে আসে। রং দেখার জন্য চোখ মেলতে চায়। আস্তে আস্তে খোলে। আশপাশে বিষণ্নতার মতো রং। মনে হয় সন্ধ্যা। নারকেল গাছের পাতা যেভাবে নড়ে, সেও সেভাবে ওঠে। আলসেমি ঝাড়ে। তখন পাখিগুলোর কথা মনে পড়ে।

আশপাশ শূন্য। বুড়ির মনের মধ্যে একটি রব, হায় হায়। পানির ভুড়ভুড়ির মতো আর্তনাদের মধ্যে সে ভাসে। আগে রং ছিল তামাটে, এখন কয়লাটে। মানে কয়লার মতো।

কয়লা রঙের বুড়ি কুঁজো হয়ে হাঁটে। তার খুব খিদে পেয়েছে। খিদে তাড়ানোর জন্যই হাঁটছে। সে চায় তার দুটি ডানা গজাক। এক্ষুনি উড়ে চলে যাবে। যেদিকে দুই চোখ যায় যাবে। অথবা কল্পনার বড় কোনো পাখি আসবে। পাখিটি ডানায় করে তাকে নিয়ে যাবে।

ধান তুই এখনো আসছিস না কেন? আর যে সইতে পারছি না। আমি মরে যাচ্ছি। কেঁদে কেঁদে বলে, আমায় কে বাঁচাবে?

এক ফোঁটা পানি ছাইয়ে পড়েছে কি পড়ে নি বুঝতে পারে না। ভালো করে দেখে। ছাই কি একটু ভেজা! বাঁ হাতে নিয়ে মুখে পোরে। ভাতের মতো চিবোয়। ভেতরে ঢুকতে চায় না। ওয়াক ওয়াক করে। তারপর ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে বসে থাকলে বমি করে দেবে। কয়েকবার জোরে ঢোক গিলে। অন্য কিছু মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু শুধু ছাইয়ের কথা মনে পড়ে। পোড়া গন্ধ পায়। যেন তার শরীরটা পুড়ে ছাই হচ্ছে। সেই ছাই-ই সে খাচ্ছে।

এত প্রচেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত বমি করে দেয়। নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে এসেছে যেন। কিছু বমি তখনো মুখে। বের হতে চায়, কিন্তু বের করবে না। আবার গিলে ফেলে।

ভাদ্র মাসের প্রচণ্ড গরম। সকালে বৃষ্টি হয়েছে। এখন গরমের মুখ ফেটে যাচ্ছে। আরো তীব্র হয়েছে তার তেজ। ধানগাছ রোদে চিকচিক করছে। দেখতে পাচ্ছে সব। কেননা সে বাসে করে যাচ্ছে। বাসটা জোরে চলছে। বাতাসে তার চুল এলোমেলো। শরতের নীল-সাদা আকাশ, রোদ-বৃষ্টি, বাতাস মিলে আশ্চর্য ঘ্রাণ। ঘ্রাণটা নিতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার আবার বমি হয়। রান্নার সময় ভাতের পানি যেভাবে বলকে ওঠে, সেভাবে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সব।

২৯.
শুনছিস?

ধান কোনো কথা বলে না।

বুড়ি চায় ধান জেগে থাকুক। জেগে জেগে বাড়ুক আর মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসুক। তারপর দুজনে মুখোমুখি দাঁড়াবে।

বুঝলি? এ কথা বলে সে নরম চোখে মাটির দিকে তাকায়। অনেক ছাই জমেছে। ফুঁ দিয়ে, অনেকটা ইশারার ভঙ্গিতে ছাই সরায়। হালকা তুষারপাত কিংবা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো আজ সকাল থেকে ছাই ঝরছে। কোথাও কি নতুন করে কিছু পুড়েছে! খুব ভয় হয়। ভয়ে ভেতরটা ক্ষয়ে যেতে চায়।

মাটিতে হালকা হাত ঘষে সে বলে, জোবায়ের একদিন কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আমাকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা মাউই মা, বলেন তো, আমরা যে চলাফেরা করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, আপনি গরুর যত্ন নেন, ধানের কাজ করেন, আবার মরিয়ম বা শেখ সাদিকে আদর করেন, নামাজ পড়ে ছেলের জন্য দোয়া করেন—এসব কেন? এই বেঁচে থাকা কেন?

আমি কিছু বলতে পারি না।

জোবায়ের বলে, কিছুদিন পর মানুষ মরে যায়। কেনই-বা মরে যাওয়া? স্বার্থ, সংঘাত কি মানুষের নিয়তি! মানুষ কতদূর যাবে? কোথায় যাবে?

ও ধান, আচ্ছা বল তো, আমি সাধারণ একজন মহিলা, অত পড়ালেখা নেই। আমি কীভাবে এসব ভারী কথার জবাব দেব?

ধান বলে, আমার তো মনে হয়, মানুষ তার গন্তব্য জানে না। সে ছুটছে আন্দাজে।

বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখ বন্ধ করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে।

ধান বলে, তোমার কি শরীর খারাপ?

নারে। ভাবছি।

কী?

আজ মনে হয় বুঝতে পারছি।

কী বুঝতে পারছ?

জোবায়েরের কথা। ওর সব কথা আজ আমার কাছে স্পষ্ট। বুঝলাম, অত পড়ালেখা না করলেও এসব বোঝা যায়, অনুভব করা যায়। শুধু মনটা থাকতে হয়।

ধান বলে, ছোট মুখে একটা কথা বলি।

বল।

মানুষের কাজ হলো মানুষ হওয়া। ঠিক?

হ্যাঁ।

কিন্তু সে কেন অমানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত? তুমি কিছু মনে করো না, আমার মায়ের কাছেও মানুষ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি।

তোর মা ভালো মানুষের গল্প বলে নি?

ধান বলে, এখন খারাপটাই বেশি মনে পড়ে।

একটু পর বুড়ি বলে, মানুষ কোথায়?

ধান হেসে বলে, ছাই হয়ে গেছে।


মাটিতে মিশে আছে সূর্যের আলো। তুই বুক ভরে নিশ্বাস নে, তাহলে সূর্যের আলো পাবি।


বুড়ির মুখে করুণ হাসি। এ হাসি অনেকটা কান্নার মতো। কান্না-হাসির অদ্ভুত কণ্ঠে বলে, মকবুলের এক বন্ধু মাছের খামারে চাকরি করত। সে একদিন আমাদের বাড়িতে এসেছে। ভাত খেতে দিয়েছি। ওর পাতে পাঙ্গাস মাছ দেওয়ার সময় বলল, খালা, খামারে মাছকে খাবার দেওয়ার সময় আমরা কি করি জানেন? টিনের একটা বাক্স আছে, ওটাতে ঘণ্টা বাজাই। সঙ্গে সঙ্গে মাছগুলো হাজির। তখন খাবার দিই। মাছ লাফালাফি করে খায়।

মাছ ঘণ্টার শব্দ বোঝে!

ও বলল, বোঝে।

সেদিন খুব আশ্চর্য লাগলেও আজ লাগছে না। ভাবে, আমিও তো ঘণ্টার শব্দ শোনার অপেক্ষায় আছি।

ধান ম্লান কণ্ঠে বলে, সূর্যটা যদি ভালো করে উঠত, রোদে চারদিক ঝিকমিক করত, তাহলে ঘণ্টার শব্দ শুনতাম।

বুড়ি আফসোস করে, আহা! কতদিন সূর্যের আলো দেখি নি।

ধান বলে, সূয্যিমামা থাকলে অনেক আগেই আমি আসতাম। এখন যে ঘুমে চোখ খুলতে পারি না। মনে হচ্ছে এটা মরার ঘুম।

সে বলে, আমার কী মনে হয় জানিস? এই যে এত এত ছাই, এসব তো মানুষ আর গাছপালা পুড়ে হয়েছে।

হ্যাঁ, আমি জানি।

মানুষ, গাছপালা সূর্যের আলোয় বড় হয়েছে না?

ধান ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে মাথা নাড়ে।

তাহলে!

কী? অনেকক্ষণ পর ধান জিজ্ঞেস করে।

এই ছাইয়ে, মাটিতে মিশে আছে সূর্যের আলো। তুই বুক ভরে নিশ্বাস নে, তাহলে সূর্যের আলো পাবি।

তার মনে হয়, ধান ঝিমিয়ে পড়ে গেছে। সে এখন গভীর ঘুমে। মাটিতে চড় মেরে বলে, তাড়াতাড়ি উঠ। বেরিয়ে আয়। একবার চোখ মেলে দেখ। আমি আর তুই, আমরা দুজনে মিলে গড়ে তুলব…

ধানের ঘুম ছুটে যায়। বুড়ির কথায় খুশি হয়। লাফিয়ে ওঠে, আড়মোড়া ভাঙে। হাই তুলতে তুলতে বলে, আমি আসছি।


১১ পর্বের লিংক 
জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)