হোম গদ্য উপন্যাস ধানশি : শেষ পর্ব

ধানশি : শেষ পর্ব

ধানশি : শেষ পর্ব
115
0
১৩ পর্বের লিংক

শেষ পর্ব :

৪০.
হাতের কয়েক জায়গায় ক্ষত। এক জায়গায় একটা পোকা এমনভাবে লেগে আছে, যেন মাটিতে পড়া ধান। কেমন একটা অনুভূতি হয় বলতে পারবে না। নিজেকে মাটি মাটি মনে হচ্ছে।

মাটি তো সর্বংসহা। বুড়িও সইতে পারবে। ভাবে, এখন সবকিছু অ্যাসিডে পোড়া নারীর মুখের মতো। সে হাত মুঠো করে। বাহু ভাঁজ করে শক্তি পরীক্ষা করে। হ্যাঁ, এখনো শক্তি আছে। এই শক্তি দিয়ে কিছু করা যায়।

মানুষকে কিছু না কিছু করতে হয়। তাকেও করতে হবে। ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে—তা হবে না। ধানের আরো ছড়া লাগবে। গাছ খুঁজবে, গাছ লাগাবে। এসময় মনে হয়, মরিয়ম ও শেখ সাদি তার দিকে হেঁটে আসছে। ওই দূরে পিঁপড়ার মতো তাদের দেখা যাচ্ছে। সে দৌড় দেয়। কিন্তু কয়েকবার চোখের পলক ফেলার পর তাদের আর দেখে না।

জোবায়ের পিঁপড়ার কথা বলেছিল। কতগুলো পিঁপড়া আছে, ওরা চুপি চুপি আরেক এলাকায় গিয়ে শিশু পিঁপড়া চুরি করে। তারপর ওদের ক্রীতদাস বানায়। পরিশ্রমের যত কাজ আছে সব করায়। কিন্তু ঠিকমতো খাবার দেয় না।

বুকের গভীর থেকে উঠে আসে হাহাকার। মুখটা চেপে রাখে। ধানকে তা শুনতে দেয় না।


একবার চোখ মেলে মাটির ভেতরের অন্ধকার, বর্ণহীন পৃথিবীর দিকে তাকায়।


পৌষ মাসের রাতে ঘন কুয়াশায় হট্টিটি পাখিকে ডাকতে শুনেছে। কেন তারা ডাকে? একবার মকবুল তাকে পতেঙ্গা সৈকতে নিয়ে গিয়েছিল। এত পানি! ঢেউ দেখে বুকটা উথাল-পাথাল করেছিল। হট্টিটির ডাকেও বুকটা মুচড়ে উঠত।

বুড়ি কাঁদে। তার কান্না গড়িয়ে পড়ে ছাইয়ে। আজ তার অদ্ভুত অনুভূতি। কী পেয়েছে তা নয়, সে মানুষকে কী দিয়েছে তার কথা ভাবে। ভেবে একটা কথাও মনে পড়ে না।

হয়তো ছাইয়ের মধ্যে শেষ ঘুম ঘুমাতে শুরু করবে। কুয়াশা বাড়বে, বৃষ্টি পড়বে। হয়তো বহু বছর পর ছাইয়ের ভেতর থেকে তার মতো কেউ বেরিয়ে আসবে।

এসময় সে নতুন এক কণ্ঠস্বর শোনে। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারে এটি ধানের গলা। তার গলা এরকম পাল্টে গেল কিভাবে!

ধানের শরীর ভারী। শুধু ঘুম আসে। বুঝতে পারে মাটির উপর সে উঠবে।

মাটির অবস্থা করুণ। তার অবস্থা বেশি খেয়ে নড়তে চড়তে না পারা মানুষের মতো। কিছু রস, পানি যদি তার শরীর থেকে কেউ শোষণ করে না নেয়, তাহলে বাঁচতে কষ্ট হবে। তাই সে ধানকে সুযোগ দিয়েছে। নিজেও চেষ্টা করেছে। সে জন্যই তো ধানের মধ্যে নতুন প্রাণ এসেছে। ক’দিন পর সে উপরে উঠে আসবে।

এখন ধানের শক্ত সঙ্গী দরকার। ভাবে, বুড়িমা দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ছে। ভালো করে তাকায় না, কথা বলে না। তার ভালো লাগে না।

বুড়ি বুঝতে পারে না, সে কোথায় আছে। ধন্দে পড়ে ডাকে, মরিয়ম, অ মরিয়ম।

ধান বলে, তুমি মরিয়মকে কেন ডাকছ? তোমার পাশে আছি আমি। আমি তোমাকে ডাকছি।

কী বলছিস? সে নতুন পাতার সুবাস পায়।

বুড়িমা। ধান আবার ডাক দেয়।

কী? দীর্ঘায়িত স্বরে সে বলে। যেন বহু দূরের ওপারে কোনো দেশে ঘুমাচ্ছিল।

ধান বলে, তোমার কথায় এতদিন বেঁচে আছি। এখন তুমি কোথায় যাচ্ছ?

সে কিছু বলে না।

ধান বড় বড় নিশ্বাস নেয়। একবার চোখ মেলে মাটির ভেতরের অন্ধকার, বর্ণহীন পৃথিবীর দিকে তাকায়। এই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে অযুত-নিযুত প্রাণ। সে তার ঘ্রাণ পায়। সাহসে বুক বাঁধে।

ধান বলে, শোন, অনেক বছর আগের কথা। পাহাড়ের ধারে একটি জমি। পুরনো কালের মানুষেরা সেই জমিটি আবাদ করেছিল। সেই জমিতে ছিল দুটি ধান। একটি একেবারে ছোট, যেন ছোট্ট নাকফুল। তার গায়ে খুব সুগন্ধ। আরেকটি ছোট, তবে লালচে আর গোলাকার। দুটি ধানই যেমন তরতাজা, তেমন শক্তিশালী। তাদের মধ্যে গলায় গলায় ভাব। একদিন এক লোক এল। ধান দুটো দেখে তার পছন্দ হলো। নিয়ে গেল বাড়ি। ধান দেখে কৃষাণী খুব খুশি হলো। জিজ্ঞেস করল, এদের নাম কী?

কৃষক বলল, ছোট্ট নাকফুলের মতো ওটা রাইচিকন, আরেকটা বীজমালী।

ভালো করেছ, এই দুজনকে তুমি আমাদের জমিতে রাখবে।

কোনো সাড়া না পেয়ে ধান থেমে যায়। তার গল্প বুড়িমা শুনছে কিনা বুঝতে পারে না। তবে ফুলের সুবাস, মরিয়মের প্রাণখোলা হাসি, পরিচিত গানের সুরের মতো গল্পটা বুড়ির বুকের গভীরে ঢুকে গেছে। এ কথা ধান জানে না।

গল্প শুনে বুড়ি নড়েচড়ে বসে। নিজেকে ফিরে পেতে থাকে।


সে মুচকি হেসে মাটির গায়ে হাত বুলায়। বিস্তৃত ছাইয়ের দিকে তাকায়। ছাইয়ের ফাঁকে জীবনের ইশারা।


৪১.
বুড়ি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ঠোঁট দুটি মাটি ছুঁয়েছে। কপালও মাটিতে ঠেকানো।

মরিয়মের দাদু কি প্রার্থনা করছে! ধান কিছু বুঝতে পারে না। সে ভয় পায়। ও কি মরে গেল! মাটির ভেতর থেকেই ধান দেখতে পায়, বুড়ির শরীর দিন দিন শীর্ণ হচ্ছে। ওর মনে প্রবল একটা স্বপ্ন ছিল; তা রঙহীন হয়ে যাচ্ছে। ধান তা হতে দিতে পারে না। তাই সে গান গায়।

গান শুনে বুড়ি মুখ তোলে। ঠোঁটে একটুখানি মাটি লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে চেটে তা খেয়ে ফেলে। মাটি খেতে খেতে তার দুই চোখ বেয়ে পানি পড়ে। কয়েক ফোঁটা হয়তো পড়েছে। মুখে লেগে আছে এখনো। আঙুল দিয়ে নিয়ে মুখে দেয়। লবণাক্ত অশ্রু মুখে পড়ায় ভালো লাগে।

সে ভাবে, পানি থেকেই মানুষের জন্ম। কিভাবে? নিজেকে প্রশ্ন করে। উত্তর হাতড়াতে থাকে। কবিরাজের কথা মনে পড়ে। স্বামীর সঙ্গে তার যা যা হয়েছে সব একেক করে ভাবে। মুচকি হাসেও।

হ্যাঁ, সবকিছুর মূলে তো ওই পানি। ইশ! একটুখানি পানি যদি পেত বেশ হতো। পানি ছাড়া যে সব শূন্য! একটা গাছ আছে, পানিতে রাখলেই শিকড় ছড়ায়। তার গা থেকে যদি ওই রকম শিকড় ছড়াত, শক্ত করে দাঁড়াতে পারত।

শাড়ির ছেঁড়া অংশটা নিয়ে সে মাটির আরো কাছাকাছি হয়। দুই হাতে নিংড়ে শাড়ি থেকে পানি বের করার চেষ্টা করে। পানি নেই। শুধু হাতটা একটু ভিজে। ভেজা হাত মাটিতে বুলায়। পানির স্পর্শ মাটি বেয়ে ধানের কাছে যদি যায়, তাহলে ধানটা তাড়াতাড়ি আসবে।

বুড়ি এখন ভালো করে হাঁটতে পারে না। কথা বলে কম। ইশারায় মাটির সঙ্গে, ধানের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করে। দুই চোখে শুধু খোঁজে। তার বিশ্বাস, খুঁজলে পাওয়া যায়।

অনেকদিন পর আজ একটু হালকা লাগছে। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। আকাশের দিকে চোখ। দুটি ডানা যদি থাকত, উড়ে উড়ে দেখত ছাইয়ের বিস্তার কতদূর।

একটা দীর্ঘশ্বাস নাকের আগায় এসে আটকে যায়। আসলে সে পড়তে দেয় না। হাতের দিকে তাকায়। কিছু ঘা শুকিয়ে গেছে, রঙটা শুকনো গোবরের মতো। আর কিছু ঘা নতুন করে হচ্ছে।

বেঁচে যে আছে এর জন্য আশ্চর্য লাগে। প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে থাকে আশার একেকটি কণা। বুক ভরে নিশ্বাস নিতে নিতে ভাবে, শেষ পর্যন্ত আমি একা থাকব না। মাটিতে হাত বুলায়। ধানের গায়েই সে হাত বুলায়। কুয়াশার কারণে কয়েক জায়গায় ছাই নাড়ুর মতো। কিছুদিন পর তা মাটি হয়ে যাবে!

এসময় ধান বলে, এই দুনিয়ায় আমি একা, তুমিও একা। তোমার জন্য আমি বেঁচে থাকব, আমার জন্য তুমি বাঁচবে?

বুড়ি চুপ থাকে। কিছুক্ষণ পর বলে, আচ্ছা, আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে কেন?

ধান বলে, তোমার তো মায়া বেশি। স্মৃতি তোমাকে মরতে দেবে না।

স্মৃতি!

তুমি তো স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছ। না হয় কবেই মরে ভূত হয়ে যেতে।

ভূতের কথায় সে হাসে। ভাবে, সত্যিই তো, আমার ভেতরে অনেক মানুষ।

ধান তাকে একটি ধানের গল্প বলে। এ ধান পানিতে ডুবলে মরে যায় না, আবার সমুদ্রের লবণ পানিতে নষ্ট হয় না। ঘূর্ণিঝড়েও কিছু হয় না।

ধানের গল্প শুনতে শুনতে বুড়ির দুই চোখে নেমে আসে ঘুম। ভাবে, আজ সে একটা স্বপ্ন দেখবে। স্বপ্নের মধ্যে মরিয়ম বলবে, দাদু উঠো, সকাল হয়েছে।

চোখ মেলে সে দেখবে, সত্যি সত্যি ভোর হয়েছে। মোরগ বাক্‌ দিচ্ছে, পাখিরা ডাকছে। বাড়ির পেছনেই তো ধানখেত। উঁকি দিয়ে দেখবে, ধানগাছ বাতাসে দুলছে। আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। এসব দিন অনেক ইশারা দিয়ে শুরু হয়। আলোর প্রতিটা কণায় ইশারার রং।

সে মুচকি হেসে মাটির গায়ে হাত বুলায়। বিস্তৃত ছাইয়ের দিকে তাকায়। ছাইয়ের ফাঁকে জীবনের ইশারা। বলল, ও আমার ধান, তোর মধ্যে কেউ নড়ছে। আমি গন্ধ পাচ্ছি।

ধান মুচকি হাসে।

অকস্মাৎ শরীর পিড়পিড় করে। চুলকানিটা শুরু হয়। সে দাঁতে দাঁত চিপে, চোখ-মুখ শক্ত হয়। এসময় নাক দিয়ে টুপ করে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ছাইয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগে এক মুহূর্ত দেখেছে। লাল নয়, কালচে লাল কিংবা মেরুনও নয়, মানুষের ঘৃণার মতো এই রং। ভয়ে সে শিউরে ওঠে।


শেষ রাতে গাওয়া একটি রাগিণীর নাম ধানশি। ধান নিজেই ধানশি হয়ে ওঠে।


অনেকক্ষণ পর চোখ মেলে দেখে, আকাশে হাজার হাজার তারা ফুটে থাকলে যে আলো পাওয়া যায়, এখন সেরকম আলো। আরেকটু পর হয়তো রাতের অন্ধকার আনারের মতো ফেটে যাবে। ধীরে ধীরে বেরুবে দিনের আলো।

গায়ে কিছু নেই। কাত হয়ে শুয়েছিল। স্তন থেকে এক ফোঁটা কুয়াশা পড়ল মাটিতে। অথবা স্তন থেকে গড়িয়ে পড়েছে বহু বছর আগে জমে থাকা এক ফোঁটা দুধ। সে খেয়ালই করে নি। দুধের স্পর্শ পেয়ে মাটি কেঁপে উঠল। আর তার নিচে ধানটিও। মাটির পুরনো স্মৃতি জেগে উঠেছে। পাগলের মতো নড়াচড়া করা মাটির আত্মার স্পর্শ পাচ্ছে ধান। ধানের শ্রী আসছে।

গর্ভবতী ধান গুনগুন করে। শেষ রাতে গাওয়া একটি রাগিণীর নাম ধানশি। ধান নিজেই ধানশি হয়ে ওঠে। বেজে ওঠে বুড়ির মনে, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তার মনে হয়, অনেকদিন পর কবিরাজ এসেছে। সে মৃদু হেসে মুখ ভেঙায়। বলে, কবিগাছ।

কবিরাজ তাকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখ ছোঁয়, ঠোঁট ছোঁয়, আর সব ছোঁয়। ওর ছোঁয়ায় তার শরীরটা গলে গলে মাটির মতো হয়ে যায়। সেই মাটিতে কবিরাজ রোপণ করে একটি ধান।

একটু পর সকাল হবে। হয়তো দেখা যাবে সূর্যের আলো। বুড়ি মাটিতে হাত রাখে। কানটাও পাতে। ধান গাইছে, অপূর্ব কোমল এক রাগিণী। সেই সুরে কাঁপছে মাটি।

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪; হাটহাজারীর ধলই গ্রামে। নিজ গ্রাম ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদ, চট্টগ্রাম।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই—

খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্যজন [উপন্যাস, বাতিঘর, ২০১৮]

শিশুদের বই :
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)