হোম গদ্য উপন্যাস তুমি শুনিতে চেয়ো না : ১

তুমি শুনিতে চেয়ো না : ১

তুমি শুনিতে চেয়ো না : ১
508
0

পর্ব- ১

সানি যখন আমার কবরের উপর কাঁদতে শুরু করল তখন আমি আর কথা না বলে থাকতে পারলাম না। অনেকদিন পরে ছেলেটিকে দেখে এমনিতেই আমার বুকের মধ্যে হু হু করে উঠল। আসলে বাবা হিসাবে আমি কতই-না তাদের উপর অবিচার করেছি। নোয়ার মতো আমিও একজন অক্ষম পিতা—পুত্রদের অনিবার্য মৃত্যু জেনেও তাদের কোনো সাহায্যই করতে পারি নি। কারণ আমারও ছিল অমরতার আকাঙ্ক্ষা। কবি ও নবির নিয়তি এ দিক দিয়ে এক সূত্রে গাঁথা। শরীরের অনিবার্য ধ্বংস জেনেও তারা তাদের আদর্শ প্রচারের কাছে অবনত। তাদের কিছু করার থাকে না। কেননা ততদিনে তাদের কথিত আদর্শের প্রতি সমর্পিত হয়ে যায় আরও আরও মানুষ। তখন তারা আর পিতা নন, স্বামী বা প্রেমিক নন।


মানুষ ভাবে ঈশ্বর এসেছে ধরায় নেমে। তাদের কষ্টও বিশাল।


আমি যখন ওদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তখন ওদের কতই বা বয়স—সানির বারো নিনির দশ। তখনো তারা নিতান্ত শিশু। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডিও পার হতে পারে নি। অথচ ওই বয়সেই তাদের নিতে হয়েছে জীবনের কঠোর বাস্তবতা। জীবন যদিও আমায় অনেক কিছু দিয়েছিল, তবু নিজের সন্তানেরা আমার জীবনের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার ভাগিদার হোক—তা আমি চাই নি। এ অভিজ্ঞতা যেন কোনো মানব শিশুকে নিতে না হয়—তার জন্যই তো আমার বিদ্রোহ, আমার প্রতিবাদ। অথচ নিজের সন্তাদের পথটুকু রচনা করার ক্ষমতা আমার ধূলায় মিশে গিয়েছিল। এমনকি আমার জন্য যে পথ খোলা ছিল, আমার সন্তানদের জন্য সেটুকুও আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমি যে তা ইচ্ছে করে দিয়েছিলাম, তা নয়। আমার খ্যাতি—সেসব করতে তাদের বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। যদিও খ্যাতি জিনিসটি ব্যক্তির নিজের কোনো কাজে আসে না।

খ্যাতিমান মানুষের পিছেও মানুষ ছোটে। মেডেলের মতো খ্যাতিকে বহন করে চলতে হয়। কখনো তা লাল অক্ষরের মতো অভিশাপের চিহ্ন হয়ে থাকে। লিবার্টি অব স্ট্যাচুর মতো রোদ-বৃষ্টি-জলে মুখ বন্ধ করে সব সয়ে যেতে হবে। তবু খ্যাতির মোহ মানুষের কখনো ফুরায় না। খ্যাতিমান কাউকে দেখলে মানুষ গড় হয়ে প্রণাম করে। তারা নিজেরাও নিজেদের সঙ্কীর্ণ জীবন থেকে মুক্তি পেতে চায়। যদিও তারা জানে না কিসে তাদের সুখ। তবু কোনো শিল্পী-সাহিত্যিক নেতা গায়ক—যাদের দেখলে এই অসহায় মানুষেরা মনে করে স্বয়ং ঈশ্বর তাদের মুক্তির জন্য স্বর্গ থেকে দূত পাঠিয়েছেন।

কিছুক্ষণ আগেও এখানে বেশ সরগরম ছিল। এখনো অনেকে আছে। বিশেষ করে সানির আসতে বিলম্ব হওয়ায় অনেকে রয়ে গেছে। সানির আসতে বিলম্ব হওয়া একটি রহস্যও বটে। সত্যিই কি তারা এমনটিই চেয়েছিল—সানি যেন তার পিতার মৃত মুখটি দেখতে না পারে। সত্যিই কি তার বিমানটি দেরি করে দেয়া হয়েছিল! অনেকে এখানে বলাবলি করছিল, তার কাছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমার মৃতদেহ ফিরিয়ে নেয়ার অফিসিয়াল আদেশ আছে। খ্যাতিমানের নানা সমস্যা। পিতার দাবি সেখানে খাটে না।

সানির জন্য আমার কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। কারণ ও তো পুত্র হিসাবে আমার চেয়ে বেশি কষ্ট সয় নি। অবশ্য তা-ই বা আমি নিশ্চিত করে কিভাবে বলি। ওর দুঃখ আমার চেয়ে কিছুটা বেশিও হতে পারে। আমার তো আট বছর বয়সে পিতা মারা গিয়েছিল। আর ওর—পিতা থেকেও না থাকার কষ্ট সইতে হয়েছিল। আমার বয়স থেকে আমার মতো অর্ধমৃত পিতার লাশ তাদের বয়ে নিয়ে চলতে হয়েছিল। যেটি আমায় করতে হয় নি। আমি চাইলেই পিতার শাসন থেকে মুক্ত বালক—যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারতাম। কিন্তু ওর পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। আমার অসুস্থতা তাদের বাধ্য করেছিল আমায় বয়ে বেড়াতে। আমি কেবল তাদের পিতার স্মৃতি হিসাবে আজ অব্দি বেঁচে ছিলাম। আমাকে কি অসুস্থ পিতা বলা যেত। কারো অসুস্থ পিতা আমার মতো নয়।

যেমন দুলি ওর জন্মের বছর দশকের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পক্ষাঘাতে নিচের অংশটি অসার হয়ে যায়। ঠিক মৎস্য কন্যার মতো পায়ের উপস্থিতি ছাড়া এক মায়াবতী নারী। দুলিকে সানির মা হিসাবে মেনে নেয়া গেলেও পিতার অসুস্থতা আর দশজন পরিচিত মানুষের মতো নয়। ওর পিতাও আর দশজন মানুষের মতো নয়। যুগে যুগে আসা মানুষের একজন। যে মানুষ দেখে ধরার মানুষ ভাবে ঈশ্বর এসেছে ধরায় নেমে। তাদের কষ্টও বিশাল।

সানির সঙ্গে কল্যাণীও এসেছে। পিতার আগে পুত্রের প্রয়াণ মানব জীবনে এরচে কী দুর্ভাগ্য হতে পারে। চার পুত্রের মধ্যে তিন পুত্রই মারা গেছে আমার জীবদ্দশায়। বুলবুলের মৃত্যুতে আমার কী দশা হয়েছিল সে-কথা সবাই জানে। বিশেষ করে ‘শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে আমার গানের বুলবুলি’ গানটির জনপ্রিয়তার কারেণ বুলবুল মানুষের মনে এখনো বেশ জীবন্ত হয়ে আছে। ওর তখন বছর চারেক বয়স। আমার মনেও ভয় ধরে গিয়েছিল আমারই মতো আমার পুত্ররাও বুঝি দুখু মিয়ার ভাগ্য সাথে করে এনেছে। পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের অকাল মৃত্যুর পরে আমার বেঁচে থাকা। অনেকেই বলে তারাখ্যাপার আশীর্বাদে আমার জন্ম। তাই কেউ কেউ দুখু মিয়ার পাশাপাশি তারা-খ্যাপাও ডাকে।


আমিও সারা জীবন নারীকে খুঁজেছি প্রেমে ও মাতৃত্বে। কত নারীকেই যে আমি মা বলেছি! কত নারীর প্রেমে হয়েছি উন্মত্ত।


এ কথা সত্য বুলবুলের মৃত্যু আমার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল। পিতা হিসাবে আমি বিপন্ন হয়ে পড়েছিলাম। বলা চলে আমার বাকরুদ্ধতার সূচনা সেখান থেকেই। এমনকি কবিতা থেকে সুরের জগতে অবগাহন অনেকটা আমার বুলবুলকে ভুলে থাকা। আমার অসুস্থতার কারণে লোকজন ভুলেই গেছে—নিনিও মারা গেছে আমি বেঁচে থাকতেই। নিনি মানে অনিরুদ্ধ ইসলাম। আদর করে মিনিও ডাকতাম। ছেলেটা কী চমৎকার গিটার বাজাত। মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ওকেও পৃথিবীর মায়া থেকে বিদায় নিতে হলো। এর জন্য কি আমিও দায়ী নই। যে ছেলের বাবা তার সামনে প্রায় তিন দশক বাকরুদ্ধ হয়ে আছে—তার মরণই ভালো। কল্যাণী মিনির স্ত্রী। মিনি বেঁচে থাকলে সেও আসত নিশ্চয়। বাবার মৃত্যু কোন ছেলে আর মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে।

মিনির মৃতদেহ আমার দেখা হয় নি। তখন আমরা দু’দেশে থাকি। এক দেশে থাকলেও হয়তো এ দেখার কোনো অর্থ থাকত না। কারণ পিতা হিসাবে আরো তিন দশক আগে ওদের কাছে আমার মৃত্যু ঘটেছে। আমি হয়তো নতুন করে সন্তানের মৃত্যুর অর্থই বুঝতাম না। কিংবা অন্যরা আমায় জানানোর প্রয়োজন বোধ করত না।

যদিও সানি আমার উপর বেশ গোস্যা করে ছিল। থাকারই কথা। আমার এই অবস্থা না হলে তারও এমন দুর্দশা হতো না। আমার সেবাদানে তার স্ত্রী ঢাকায় আসায় সেও একা হয়ে গেল। স্বামীর জন্য এটা সুখকর নয়। আমি তাকেও দোষ দিই না। একটা জীবনে কম তো আর কষ্ট সয় নি সে। সানির কথাই বা কেন বলি! সানির স্ত্রী উমার মুখই আমার আজ বেশি মনে পড়ছে। এমনকি তার শাশুড়ি প্রমীলার চেয়েও। প্রমীলা অনেক আগেই গত হয়েছে। তার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমার এই দুঃসময়ে অসম্ভব কষ্ট নিয়ে যিনি সংসারটি কোনো মতো আটকে রেখেছিলেন, আমার সেই দুখিনী শাশুড়ি মাতাও একদিন বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। মেয়ের পক্ষাঘাত, জামাইয়ের উন্মাদগ্রস্ততা আর বাইরের লোকের নানা লাঞ্ছনা সইতে না পেরে তিনি একদিন বাতাসে হারিয়ে গেলেন। কেউ জানে না কি হয়েছিল তার পরিণতি।

তবে আমার জীবনের অন্য রকম দ্বিতীয় পর্বে মাতৃরূপে আবির্ভূত হয়েছিল—সে উমা। জীবনে কখনো মায়ের আদর আমার জন্য অখণ্ড ছিল না। সংসারে মা কী, তা খুব একটা বোঝার সুযোগ পাই নি কখনো। একটি শিশুকে সামলানো মায়ের জন্য যত সহজ—আমার মতো পঞ্চাশ বছরের বাকরুদ্ধ অসার বুড়ো শিশুকে সামলানো তত সহজ নয়। এই অসাধ্য কাজটি উমা করেছিল প্রায় শেষ দুই দশক ধরে। যদিও আমার সেবা করার ব্রত নিয়েই এ সংসারে সে ঢুকেছিল। তাই আজ বিদায় কালে তার মুখ দর্শনে আমার পিপাসা কম নয়।

আমি ছিলাম পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। অবশ্য নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কেউ বলতে চেয়েছে আমি পিতার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। আমার তা মনে হয় নি। বেশির ভাগ মানুষই মনে করে—জাহেদা খাতুনই আমার মা। নিশ্চয় জাহেদা খাতুনই আমার মা। মানবশিশু জন্মের আনন্দে এতই বিহ্বল—কে তার মা আর কে তার পিতা—সে-সব জানার অবসর থাকে না। মানুষের নিজের পক্ষে জানা সম্ভবও নয় কে তার প্রকৃত বাবা-মা। এটি কিছু অনুমিত সমাজসাপেক্ষ। মা নিশ্চয় জানেন। ডিএনএ পরীক্ষা করে নাকি আজকাল সঠিক তথ্য পাওয়া যায়। কী জানি! মা-ই পৃথিবীতে শিশুর প্রথম খাবার। খাদ্যের প্রয়োজনে শিশু মায়ের কাছাকাছি আসে। এই খাবারের স্মৃতি মানুষ ধরে রাখতে পারে না। সারা জীবন চলে অনুসন্ধান। আমিও সারা জীবন নারীকে খুঁজেছি প্রেমে ও মাতৃত্বে। কত নারীকেই যে আমি মা বলেছি! কত নারীর প্রেমে হয়েছি উন্মত্ত। মনে হয় জন্মের মুহূর্তে কোনো এক প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই ‘যুগ যুগ ধরে লোকে লোকে মোর প্রভুরে খুঁজিয়া বেড়াই।’

আমাদের মতো ভুবনঘোরা মানুষের সঠিক খবর জানার উপায়ই বা কী। সংসারে মা একজন ছিল বটে, জন্মদানের সত্যতা স্বীকার করা ছাড়া আমার জীবনে তার ভূমিকা ছিল সামান্যই। সে বাবার প্রথম স্ত্রী হোক আর দ্বিতীয় স্ত্রী হোক—আমার জন্য একই কথা। আর পিতার ভূমিকা তো খুব গৌণ। মাত্র আট বছর বয়সে পিতাও ধরাধাম ত্যাগ করে যান। তারপর কেউ আমায় বলল, এবার তোমার বেরিয়ে পড়ার সময় হয়েছে। তাই আমি বেরিয়ে পড়লাম।


দুলির পেটে বাচ্চা এসেছিল বলে আমাদের এই তড়িঘড়ি বিয়ে।


দুলির সাথে আমার বিয়ে হলো এপ্রিলে আর কৃষ্ণ-মুহাম্মদের জন্ম হলো অক্টোবরে। কৃষ্ণ-মুহাম্মদের জন্ম অবশ্য এটকু আগেই হয়েছিল। প্রথম সন্তান প্রসবে এমন অনেক হয়। আমার জীবন অনেক বিভ্রান্ত তথ্যের সঙ্গে এটিও যুক্ত হয়েছিল। এক পণ্ডিত বলছে—বিয়ের সতের সপ্তাহ পরে আগস্ট মাসে কৃষ্ণ-মুহাম্মদের জন্ম। সে আমার বরযাত্রায় ছিল না। বরযাত্রায় ছিল নলিনীকান্ত সরকার। সে বলছে, এপ্রিলে আমার বিয়ে, অক্টোবরে কৃষ্ণ-মুহাম্মদের জন্ম। প্রিম্যাচ্যুউর ছিল, তিন মাসের মধ্যে আমাদের ছেড়ে সে চলে গেল।

সব কিছু ইঙ্গিতবহ—ওর জন্ম হয়েছিল ঠিক কৃষ্ণের জন্মতিথির দিনে। এত অল্প সময়ে বৈধ বাবার পক্ষে সন্তানের জন্ম দেয়া সম্ভব কি না—এ প্রশ্ন কৌতূহলীদের মনে খুব সহজেই জেগেছিল। যারা ওর আকিকাতে এসেছিল তাদের মনেও এ প্রশ্ন না জেগে পারে নি। মানুষ আজব প্রাণী! অনেকের ধারণা দুলির পেটে বাচ্চা এসেছিল বলে আমাদের এই তড়িঘড়ি বিয়ে। অনেকেই আবার এককাঠি এগিয়ে ভেবেছিল, কৃষ্ণ-মুহাম্মদ আমার সন্তান নয়। দুলি অন্য কারো সন্তান বহন করছিল।

যাক, আজ আর এসব কথা বলব না। আজ আমার কষ্টের প্রধান কারণ, আমার নিকটাত্মীয়রা কেউ আমার মৃতদেহটি শেষবারের মতো দেখতে পারল না। যদিও আগেই আমি তাদের কাছে মারা গিয়েছিলাম। থেকেও ওদের কষ্ট দেয়া ছাড়া আর যেহেতু কিছু করতে পারি নি; সেহেতু আমার কাছে তার মূল্য ছিল না। তবে ওদের জন্য বিষয়টি ভয়াবহ। তারা আছে অথচ তারা আমায় শেষ দেখাটি দেখতে পারবে না, তা কী করে হয়, আর এও তাদের নিয়তি। তারা যদি এই বিখ্যাত বাবার ছেলে না হতো তাহলে এই সমস্যা পোহাতে হতো না। পৃথিবীতে সকল বিখ্যাত ব্যক্তির পুত্র কন্যারা একই সঙ্গে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের শিকার।

কল্যাণীও কবরের মাটি জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। যদিও আমায় সুস্থ অবস্থায় কখনো দেখে নি সে। আমার বাকবন্ধ হওয়ার বছর দশেক পরে ও নিনির বউ হয়ে আমাদের ঘরে এসেছিল। মেয়েটা বেশ প্রাণবন্ত হাসি খুশি। আমায় নিয়ে বেশ মজা করত। প্রায়ই আমায় পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিত। প্রমাণ করতে চাইত আমার এই স্বেচ্ছা জাড্য। সময় মতো এ সব সবিস্তারে জানাতে চেষ্টা করব। তবে এটুকু জানিয়ে রাখি—কল্যাণী মাত্র দু’বছর আগে অনির্বাণকে নিয়ে ঢাকায় আমায় দেখতে এসেছিল। অনির্বাণ আমার নাতি, নিনি ও কল্যাণীর ছেলে। সেদিন ওরা ঠিক বুঝতে পারে নি, আমি এত তাড়াতাড়ি চলে যাব। ওদের কাছে তাড়াতাড়ি মনে হলেও প্রায় চৌত্রিশ বছরের স্থবির জীবন—যা আমার কর্মময় জীবনে চেয়েও বড়। জীবনানন্দ লিখেছিল—‘গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে।’ আমি সে-রকম ব্যাঙ নই।

সানি তখনো কবরের মাটি নিয়ে বসে আছে। কল্যাণী উপস্থিত লোকজনকে বলল, ‘বাংলাদেশ সরকার বড্ড বেশি তাড়াতাড়ি ওঁর অন্তিমকার্য সমাধান করলেন। অত তাড়াতাড়ি না করে ওঁর নিকটজনদের শেষ দেখার সুযোগটা পাইয়ে দিলে আমার মনে হয় তাঁরা সুবুদ্ধির পরিচয় দিতেন।’

সরকারের সুবুদ্ধি সর্বদা বিরল। সরকারের কাজ তো তার সামর্থ্যের প্রকাশ। আমি তো আর এখন আমার নই। আমি হলাম জনগণের সম্পত্তি। আর জনগণের সম্পত্তির উপরে সরকারের হক পুরো মাত্রায়। জনগণের মর্জি বুঝে সরকারের কাজ। আজ আমায় তাড়াহুড়ো করে মসজিদের পাশে কবর দেয়া হয়েছে সত্য। কিন্তু সত্যিই কি তা আমার চাওয়া ছিল। আমি কি চেয়েছিলাম, মসজিদের পাশে আমার করব দেয়া হোক। অবশ্য একজন মৃত মানুষের চাওয়ার দামই বা কি। যদিও এই জায়গাটি আমার কাছে নতুন নয়। আমি এর জন্য কাকে দায়ী করব।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আমার মৃতদেহ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল তার প্রমাণও স্পষ্ট নয়! আমার মৃত্যুর দিন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় কোলকাতায় ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমারই জন্ম-জেলা বর্ধমানের বার্নপুরে। চুরুলিয়া থেকে মাত্র বিশ মাইল দূরে। সব্যসাচীর পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব না হলেও চুরুলিয়া থেকে আমার আত্মীয়-স্বজন যারা গিয়েছিল তারা খুব সাড়া পায় নি। সেদিন মুখ্যমন্ত্রী কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল সেটি রহস্যই রয়ে গেছে। সব্যসাচীর বিমান বিলম্বের বিষয়টি যেমন রহস্যের। তেমন এটিও তো ঠিক, সানির পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল উত্তীর্ণ। কোনো সরকারের আগ্রহ আর কোনো সরকারের নিরুৎসাহ আমার আর প্রমীলার অন্তিমকালে মিলতে দিল না।


আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নি কো নজরুল।


এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কিছু আনন্দ ও কষ্টের স্মৃতি রয়েছে। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধবও এখানে শুয়ে আছে। তাছাড়া সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমায় ডি.লিট ডিগ্রি দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। আমি এখন সরকারিভাবে এ দেশের বৈধ নাগরিক। কি হাস্যকরই না এ সব কথা! আমি তো জন্মসূত্রে এদেশেরই নাগরিক। কারা আমায় নাগরিকত্ব বঞ্চিত করেছিল। যারা দেশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন করেছিল তারা কারা! অবশ্য আমার কিছুটা ভাগ্যই বলা চলে, রাজনীতির ভূগোল ভাগ হয়ে গেলেও কোনো পক্ষই আমার দাবি ছাড়ে নি। অন্নদা শঙ্কর ঠিকই বলেছিল—‘আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নি কো নজরুল।’

অবশ্য ভাগ না হওয়াতে আজ শেষ বিদায়েও আমার দাবি ছাড়তে কেউ রাজি নয়। ভাগের মা গঙ্গা পায় না। তাই আমার পুত্রের হাতের মাটি আমার জন্য অবাধ ছিল না। কারণ তাদের দেশ একটি হলেও আমার দেশ দুটি। যদিও রবীন্দ্র-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ও আমায় ডিলিট উপাধি দিয়েছে। সুতরাং কেবল এই সম্মান-সূচক ডিগ্রি দানের মাধ্যমে আমি দাবি করতে পারি না, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কবর হওয়া উচিত। এখানে আমার কবর দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমার লেখাই আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। যেহেতু আমি গান লিখেছিলাম— ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।’ আর এতেই কর্তৃপক্ষ ধরে নিল এরচে আর ভালো জায়গা কি হতে পারে কবিকে কবর দেয়ার জন্য। এটা তো কোনো যুক্তি হতে পারে না। আমার গান কবিতা যদি কেবল আমার ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের উপায় হিসাবে দেখা হয় তাহলে তো আমার কতই চাওয়ার ছিল। তার কোনটিই বা পূরণ হয়েছে। বরং আমার লেখাকে বিকৃত করে পছন্দ মতো রাজনৈতিক খায়েশের পক্ষে রায় দেয়া হয়েছে।

যদি মসজিদের পাশেই আমার কবর দেয়া হবে সেটি তো চুরুলিয়ার হাজি পালোয়ানোর মসজিদের পাশে হওয়া সবচেয়ে জরুরি ছিল। আমার যে বাড়িতে জন্ম, সে-বাড়িতেও তো মসজিদ ছিল, সেখানেই আমার শৈশব শুরু হয়েছিল। সেই মসজিদে আমি আজান দিয়েছি, নামাজ পড়েছি। সেই তো আমার জন্মভূমি। আসলে আমার কোনো জন্মভূমি নেই। হয়তো মানুষের জন্মভূমি বলে কিছু থাকে না। যা থাকে তা হলো তার হৃদয়ভূমি। সেখানে সে সঙ্গে করে নিয়ে চলে তার শৈশবের জন্মভূমি।

আমি শুধু কষ্ট পাচ্ছি প্রমীলার কথা ভেবে। আমার দুখিনী স্ত্রী আশালতা দেবী ওরফে দুলি ওরফে প্রমীলা। আমারই মতো সে ব্যক্তিগত জীবনে এক হতভাগ্য নারী। শৈশবে তারও বাবা মারা গিয়েছিল। নিজের জন্মস্থান তেঁওতা ছেড়ে বিধবা মায়ের সঙ্গে চলে যেতে হয় অন্য জেলায় খুল্লতাতের সংসারে। আমার সঙ্গে বিয়ে—এটিও কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না। ভিন্ন ধর্ম অসমবর্ণ হওয়ায় পরিত্যক্ত হতে হয়েছিল নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে। বাকি জীবনে তার আর দেখা হয়ে ওঠে নি স্বজনদের মুখ। এমনকি আমি যাকে মা বলেছি সেই বিরজাসুন্দরী দেবী, তার স্বামী ইন্দর কুমার—এই আমাদের বিয়ের অপরাধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দুলির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। শিকড় ছিন্ন আমার সঙ্গে দুলি আর দুলির মা মহিয়সী গিরিবালা দেবী কচুরিপানার মতো ঘাটে ঘাটে নোঙর করেছে। কোথাও আমাদের নিজস্ব আবাস ছিল না। কত জায়গাতেই না আমরা গড়ে তুলেছি সংসার। তার অধিকাংশ ছিল বন্ধুদের গলগ্রহে কিংবা সরকারের অনুগ্রহে। আবার একদিনের নোটিশে ভাসিয়ে দিয়ে নতুন জায়গায় বাসা বেঁধেছি। বাড়ি থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। সুখ যদি কপালে না থাকে তাহলে পৃথিবীর দেবতাদের কি সাধ্য!

একটি সুস্থ সবল মানুষ, রোগশোক খুব একটা দেখি নি কখনো। অথচ সেই মাত্র তিরিশ বছর বয়সের মধ্যে আকস্মিক পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গেল। পায়ের নিচের দিকে থেকে কোমড় অব্দি অসাড় হয়ে গেল। আর কখনো বিছানা থেকে, মাটি থেকে উঠে দাঁড়াতে পারল না। তখন সানির বয়স দশ, মিনির আট। আমিও তখন চল্লিশের কোটায়। এরপরে আমার আর কী করার ছিল। আমার হাসি-কান্না সংসার জীবন পুত্রদের ভবিষ্যৎ তখনই তো পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। যদিও অনেকে ধারণা করেন—আরো কয়েক বছর আমি সুস্থ ছিলাম। আসলে না আমি দুলির সঙ্গেই পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলাম। আমি মনের দিক দিয়ে আর কখনো সুস্থ হয়ে দাঁড়াতে পারি নি। আমার বিদ্রোহী মন তখন থেকেই নানা রকম সংস্কার কুসংস্কার পেয়ে বসেছিল। শুধু মনের একটু সুপ্ত বাসনা কিভাবে দুলি সুস্থ হয়ে উঠবে। যে যা বলেছে, কোনো বাছ-বিচার ছাড়া তাই করেছি। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে।

আমার কবরটা আসলে দুলির পাশে হওয়াই উচিত ছিল। আমার প্রকাশের ক্ষমতা বা গুরুত্ব থাকলে হয়তো তা-ই বলতাম। দুলি তো নিজেই ইচ্ছা পোষণ করেছিল, চুরুলিয়ায় তার কবর দেয়া হোক। দুলির তো কখনো চুরুলিয়ায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি। এমনকি আমার সুস্থ জীবদ্দশায়ও। যদিও ষাটের দশকে আমায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় মন্মথ রায়ের একটি ডকুমেন্টরির সূত্রে চুরুলিয়ায় গিয়েছিল দুলি। তখন সেও ছিল শয্যাশায়ী, আমিও ছিলাম অথর্ব। প্রমিলা ভালোবেসেছিল আমার সকল সত্তা; দুঃখ বেদনা সব আকড়ে ধরেছিল। আমরা দুই পঙ্গুত্বে মিলে অনেক দিন সুখে জীবন যাপন করেছি। তার কাছে থাকার এরচেয়ে উত্তম উপায় আর কী হতে পারতো। আমি কখনো তাকে সময় দিতে পারি নি। তাই হয়তো সে মিথ্যাচ্ছলে অসুস্থ হয়েছিল। আর আমার অসুস্থতা তো লোকজন মেনেই নিতে পারে না। তারা মনে করে, আমি এক গভীর আধ্যাত্ম্য-চেতনায় মহাস্থবির হয়ে আছি।


বিদ্রোহী কবি ‘নম নম নম বাংলাদেশ মম’ গানটি দেশ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর আগে লেখেন।


এ আমার চূড়ান্ত সাধনার ফল। তবে লোকজন যাই বলুক; আমার পঙ্গুত্ব আর দুলির পঙ্গুত্ব আমাদের কখনো আলাদা হতে দেয় নি। আমাদের সকল প্রেমের শুরু সেখান থেকেই। সেটিও বেশি দিন থাকল না। মাত্র তিপান্ন বছর বয়সে পঙ্গুত্ব নিয়ে বীরাঙ্গনা প্রমীলা চিরবিজেতার দেশে চলে গেল। আমি আবার একা হয়ে পড়লাম। স্বামীর জন্ম ভিটায় সে আমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। তার পাশে শায়িত হওয়ার মতো জায়গা রেখে এখনো সে অপেক্ষায় আছে। কিন্তু আর তা পূরণ হওয়ার নয়। দুঃখিনী কন্যা, পিতৃ-মাতৃ বঞ্চিত কন্যা—স্বামীর ভিটা পাহারায় তুমি একাই জেগে থাকো অনন্ত নক্ষত্রের নিচে। যারা চুরুলিয়ায় যাবে তারা অন্তত তোমার স্নেহসুধায় স্নাত হয়ে ফিরতে পারবে। তাদের বলো—কবি তো বোহিমিয়ান; কবেই বা সে বাড়িতে ছিল। তোমরা এখানে দুদণ্ড বসো, হে বিদ্রোহী কবির ভক্তকুল, একটু আপ্যায়িত হয়ে যাও। আমি হিন্দু কন্যা জন্মেছিলাম মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে; মুসলমান কবির স্ত্রী হয়ে এসেছি হিন্দু প্রধান ভারতবর্ষে। যে কবি জাতের, ধর্মের, সীমান্তের বাঁধা মানতেন না—সেই বন্ধন উন্মোচনের জন্য আমরা দুই দেশে দুই জন অতন্দ্র প্রহরী হয়ে শুয়ে আছি। যেখানে হিন্দু নেই, মুসলমান নেই। আছে বাঙালির বাংলা। জাতপাতহীন উপনিবেশহীন সীমান্তহীন মানুষের দেশ।

এখানে আমার কবরের বিষয়টি বলা চলে সেদিনই নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল, যেদিন আমি বাংলাদেশের মাটিতে পা দিয়েছিলাম। শেখ মুস্তাফা কামাল যেদিন আমার ক্রিস্টোফার রোডের বাসায় গিয়ে সব্যসাচীকে প্রস্তাব দিল—তারা আমায় তাদের স্বাধীন দেশে নিয়ে যেতে চায়।

কামাল বলেছিল, কবির চিরস্বপ্ন ছিল যে স্বাধীনতার, যে ধর্ম নিরপেক্ষতার—বাংলাদেশের বাঙালিরা তা অর্জন করেছে। আজ আমার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নজরুলের সেই চিরকাঙ্ক্ষিত দেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আমি তাঁর পক্ষ থেকে এসেছি। সেই দেশে কবির যাওয়া একান্ত জরুরি। সে-দেশের কোটি কোটি মানুষ কবিকে সশরীরে একটু দেখতে চায়। আমার পিতারও অভিপ্রায়—স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার কবিকে নিয়ে তার প্রথম জন্মদিন পালিত হোক।

শেখ কামাল বলেছিল, বাংলাদেশ নামটিও তো এসেছে কবির লেখা থেকে। কাজী নজরুলের আগে বাংলাদেশ শব্দটি কেউ আগে এভাবে বলেন নি। সেই দেশ আজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে; কবিকে আমরা সেখানে পেতে চাই।

সব্যসাচী অবশ্য বলেছিল, বঙ্গভঙ্গের সময় কবিগুরু একটা গানে বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

শেখ কামাল বলেছিল, তা ঠিক। বিদ্রোহী কবির কথায়—‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে—”বাঙালির বাংলা” সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালির মতো জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তি এশিয়া কেন, বুঝি পৃথিবীর কোনো জাতির নেই। কিন্তু কর্ম-শক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে।’ নিজ জাতি সম্বন্ধে এমন আত্ম-বিশ্বাস আর কোনো কবির ছিল না।

কামাল বলেছিল, বিদ্রোহী কবি ‘নম নম নম বাংলাদেশ মম’ গানটি দেশ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর আগে লেখেন। তাছাড়া ‘বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।’—এ থেকে জয় বাংলা স্লোগান সেদিন বাঙালির মুক্তির স্লোগানে পরিণত হয়েছিল। আমারাও সেদিন গেয়েছিলাম, ‘বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ।’


আমার বাবা মাঠের কবি আর আপনার বাবা কবিতার কবি।


সেদিন সব্যসাচীকে শেখ কামাল আরো কিছু কথা বলেছিল। যেমন আমার চরিত্রের সঙ্গে শেখ মুজিবের চরিত্রের অনেকটা মিল আছে। আমার মানসলোকে যে স্বপ্ন উজ্জীবিত হয়েছিল, আমার লেখায় যেমন প্রকাশ পেয়েছিল, বাঙালিদের জন্য সে-রকম উপনিবেশ মুক্ত শোষণ মুক্ত একটি দেশ প্রতিষ্ঠা ছিল তার স্বপ্ন।

তবে শেখ কামাল এক অদ্ভুত কথা বলেছিল। আমার প্রথম ছেলে কৃষ্ণ-মুহাম্মদ, যার আসল নাম আজাদ কামাল। এই নামটিই আমার পছন্দের ছিল। তুর্কি বীর কামাল পাশা আমার মনে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আমার স্বপ্ন তখন কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই। কামাল পাশা কবিতার মধ্যে আমি আমার প্রাণ মন ঢেলে দিয়েছিলাম।

কামাল বলেছিল, ‘আমার নামও রাখা হয়েছিল স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে মুস্তাফা কামাল। আমার পিতাও নব্য তুর্কি কামালের ভক্ত ছিলেন।’

আরো বলেছিল, নিনির মতো কামালও সেতার বাজনায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে। একজন রাজনীতিকের সন্তান, নিজেও সৈনিক আবার সুর ও সংগীতের চর্চা করছে—এসব জেনে আমার মন ভরে গিয়েছিল।

সব্যসাচীকে কামাল বলেছিল, আমার বাবা মাঠের কবি আর আপনার বাবা কবিতার কবি।

শেখ কামালের বলিষ্ঠ উপস্থাপনা আর অকাট্য যুক্তির কাছে সব্যসাচী কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, নজরুল তার পিতা হলেও সে বাঙালি জাতির; আর সেই জাতি যদিও রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডে বিভক্ত, তবু তাকে পাওয়ার সবারই হক আছে।

সব্যসাচী বলেছিল, ভারত সরকার অনুমতি দিলে, আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।

শেখ মুজিব ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

এর পরের ইতিহাস সবার জানা।

আজ সকালে আমার মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়তেই হজার হাজার মানুষ পিজি হাসপাতালের দিকে জড়ো হতে থাকে। সেই সমাবেশ শাহবাগ ছেড়ে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিক্রম করে যায়। তারা সবাই তাদের প্রিয় কবির এই বিদায় মুহূর্তটি স্মরণে অম্লান করে রাখতে চায়। যদিও সশরীরের দেখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়; তবু নজরুলের প্রয়াণ দিবসে, শবযাত্রায় তারা শরিক হতে পেরেছিল, সেই স্মৃতিও একদিন তাদের কিছুটা সান্ত্বনা ও শ্লাঘা দিতে পারে।

এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তির নয়। একটি জাতির আবেগের সঙ্গে জড়িত। তাই রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরাও সকাল থেকে এখানে আনাগোনা শুরু করেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সায়েম, উপ-সামরিক রাষ্ট্র প্রধান মেজর জেনারেল জিয়া তাদের দল বল নিয়ে উপস্থিত আছে। তাদের দৃশ্য ও অদৃশ্য প্রোটোকলে সাধারণের পক্ষে আমার মৃতদেহের কাছে পৌঁছানো সহজ নয়।

তখন আমার শিয়রে বসে অনেকের মধ্যে ফিরোজা বেগম ওর সুমিষ্ট সুরে মৃদৃ উচ্চারণে কোরান তেলাওয়াত করছে। এরই ফাঁকে একজন এসে তাকে জানাল, জিয়াউর রহমান তাকে নিচে ডাকছেন। এতে ফিরোজা একটু চমকেই উঠল।

জিয়া তখন পিজি হাসপাতালে প্রথম ফটকের পাশে কাঁঠাল গাছের নিচে কালো চশমা, একজোড়া পরিচিত গোঁফ এবং সামরিক পোশাকে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।

ফিরোজা তার কাছে পৌঁছলে জিয়া জানতে চাইল, মান্যবর শিল্পী বিদ্রোহী কবির কবরের জন্য আমরা যে স্থানটি নির্ধারণ করেছি, আপনি মনে হয় এতক্ষণে জেনে গেছেন?

ফিরোজা বেগম ঘাড় নাড়াল।

জিয়া বললেন, আপনার কি অন্য কোনো পছন্দ আছে?

ফিরোজা বেগম বললেন, না।


আমার কবরে যে ব্যতিক্রম ঘটনাটি ঘটে গেল—পুরুষের পাশাপাশি গানের পাখি ফিরোজা বেগমও এক মুঠো মাটি ছিটিয়ে দিল।


তিনি জানেন, এসব কথার কথা। তারা তো সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছেন, তার কথাতে কোনো পরিবর্তন হবে না। আর তিনিও তো চান আমি চিরদিনের জন্য এখানেই থেকে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহি মসজিদের পাশের প্রাঙ্গণটিই নির্ধারণ হয়েছিল। যেখানে আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষক বুদ্ধিজীবীর কবর ছিল।

জাতীয় পতাকায় মোড়ানো আমার মরদেহ শায়িত রয়েছে একটি কাঠের খাটিয়ার উপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। শবযাত্রার মহাসমাবেশ সামাল দিতে কর্তৃপক্ষের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকেই মতামত দিচ্ছে সব্যসাচী এখনো দমদম এয়ার পোর্টে অপেক্ষা করছে। বিমান ঠিক সময়ে উড্ডয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও আমার মৃত্যুর মাত্র ঘণ্টা সাতেক পার হয়েছে; তবু আমায় দাফনে সব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ঢাকা থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার উড়াল পথে পুত্র আমার পিতার শেষ দর্শনের প্রহর গুনছে। কিন্তু সবার মধ্যে যেন একটিই তাড়া সব্যসাচী পৌঁছানোর আগেই কবরস্থ করতে হবে। না জানি নতুন কোনো বিপত্তি ঘটে।

এটাও এক নির্মম পরিণতি সদ্য স্বাধীন দেশের সামরিক প্রশাসকগণ আমার শবাধার নিজ স্কন্ধে বয়ে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ সংলগ্ন সমাধিস্থলে পৌঁছাল। খাটিয়ার সামনের দিকটাতে আবু সায়েম আর জিয়া, পেছনের অংশে আরো দুই উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। তাদের গায়ে সামরিক উর্দি। মানুষের নিয়তি কেউ ঠেকাতে পারে না। মানুষ নাকি শেষ পর্যন্ত তার মূলে প্রত্যাবর্তন করে। আমিও সেই মূলে যাত্রা করছি। জীবনের প্রথম পর্বে সাধারণ সিপাহি থেকে হাবিলদার পদে উন্নীত হওয়ায় কী যে আনন্দ হয়েছিল। আজ যাত্রা কালে মনে হচ্ছে এরপরে আমার আর কোনো পদোন্নতি নেই। সেই বাঙালি পল্টন, সেই করাচিতে কুচকাওয়াজ করছি।

তারা আমায় ধরাধরি করে কবরে নামালেন, কামান গর্জে উঠল, রণ সংগীত বেজে উঠল, চল চল চল ঊর্ধ্বে গগন বাজে মাদল …। যদিও একদিন বিদ্রোহের স্পর্ধায় বলেছিলাম ‘আমি সেই দিন হব শান্ত…।’ সেই দিন আর এল না। এমনিতেই শান্ত হয়ে গেছি। কেবল ব্যক্তিগত রোমান্টিক বেদনা হিসাবে দূরে মাইক্রোফোনে করুণভাবে বেজে চলেছে, ‘আমি চির তরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে।’ কখনো কখনো—‘মসজিদের পাশে আমায় কবর দিও ভাই…’

আমার কবরের উপর মাটি নেমে এল। কেউ কেউ জোরে জোরে পড়তে থাকল—‘মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’—যার অর্থ এই মাটি থেকে তোমরা উৎপন্ন হয়েছ, এই মাটিতেই তোমরা বিলীন হবে আবার এই মাটি থেকেই তোমাদের পুনরায় উঠানো হবে। অন্য ধর্মের উপস্থিত লোকজন তাদের নিজ নিজ ধর্মের কিংবা নিধর্মের রীতি অনুযায়ী নীরবে আমার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাল।

এত লোকের পক্ষে এক মুঠো করে একটি কবরে মাটি দেয়া সহজ নয়। তবু আমার কবরে যে ব্যতিক্রম ঘটনাটি ঘটে গেল—পুরুষের পাশাপাশি গানের পাখি ফিরোজা বেগমও এক মুঠো মাটি ছিটিয়ে দিল। মনে মনে গেয়ে উঠল—‘আমি যার নুপুরের ছন্দ, বেণুকার সুর…’ তার দেখাদেখি আরো কয়েকজন মেয়ে এক মুষ্টি করে মাটি ছিটিয়ে দিল।


সুবৃহৎ একটি শ্বেত বিহঙ্গ পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আকাশ গঙ্গার মধ্যে হারিয়ে গেল।


আর ধীরে ধীরে আমার বহুকাল স্থবির স্মৃতি ভিড় করে ঝাপসা হয়ে যেতে থাকল। কানের কাছে ভেসে এল লেটো দলের বাদ্যের সুর, সৈনিক জীবনের কুচকাওয়াজ, চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত ভেসে যাচ্ছিল হাজি পালোয়ানের মাজার, তারাখ্যাপার ডিবি, লালামাটির ধ্বংসস্তূপ, কয়লার খনি, শৈলজা, অচিন্ত্য, নলিনী, মুজাফ্‌ফর, নার্গিস, দুগিয়া, দুলাল শেখ, মঞ্জু, মিলিতা, সাহু, কাট্টুর মুখগুলো কেমন বিকৃত মিলিয়ে যেতে লাগল । এক শাদা চামড়ার ট্রিগাড সাহেব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল—ওই যায় ব্রিটিশ জাত শত্রু, বিদ্রোহী! অনেক দূর থেকে দরিরামপুর স্কুলের পাশে ধানের ক্ষেতের মধ্য দুই হাত প্রসারিত করে আমার দিকে ছুটে আসছে বুলবুল। ডাকছে ‘বাবা! বাবা!…’ পরক্ষণেই কানে এল—‘কতদিন তুমি বাড়ি আসো না কাজী দা!’

এতদিন সকল জমানো দুঃখ মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে জেগে উঠল এক চিলতে হাসি। তারপর সুবৃহৎ একটি শ্বেত বিহঙ্গ পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আকাশ গঙ্গার মধ্যে হারিয়ে গেল।


পর্ব- ২ 

(508)

মজিদ মাহমুদ