হোম গদ্য উপন্যাস তুমি শুনিতে চেয়ো না : ২

তুমি শুনিতে চেয়ো না : ২

তুমি শুনিতে চেয়ো না : ২
351
0

পর্ব-১


পর্ব- ২

এখন আমি শুধুই একটি দেহ। এর আগে যা বলেছি, তা মূলত সেই দেহটাকে যেভাবে দাফন করা হয়েছিল তার কথা। একটি মৃতদেহ কিভাবে এতদিন মাটির উপরে অক্ষত থাকে, গলা পচা দুর্গন্ধ ছাড়া দিব্বি বয়ে বেড়ানো যায়, আমি তার প্রমাণ। হয়তো এটা ঠিক—আমি বলে দেহধারী যে মানুষটা পৃথিবীতে এসেছিল তার হয়তো জীবনাবসান হতে সময় লেগেছিল। কিন্তু যাকে নিয়ে এত কাণ্ড, এত কথা—আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা সেই মানুষটার আগেই মৃত্যু ঘটেছিল। আমার সমাহিত দিনের প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে ১৯৪২ সালের জুলাই মাসের দিকে।

সেই মানুষটির নাম নজরুল। কাজী নজরুল ইসলাম। যে আমার এই নশ্বর দেহকে ভর করেছিল। অন্য আর পাঁচজন মানুষের জন্য যা হয়, আমার ক্ষেত্রে মোটেও তা হয় নি। আমি সাতাত্তর বছর অব্দি বেঁচেছিলাম। আমার জীবন থেকে মাত্র বিশ-বাইশ বছর তুলে নিলে, বাকি পাঁচ ছয় দশকের দেহধারী জীবনকে নজরুলের জীবন না বললেও অসুবিধা নেই!


বাড়িতে কোনো নারী-শিল্পীদের আগমন আমার শাশুড়ি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতেন না।


আমার জন্মের প্রথম দুই দশক কারো পক্ষে এসব ভাবা সম্ভব হয় নি। কারো বেলায় তা ভাবা সম্ভব হয় না। কে জানত নজরুল বলে যে কবিকে মানুষ ভালোবাসে সে একদিন এতটা বিশিষ্ট হয়ে উঠবে। রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে যার নাম উচ্চারিত হবে। কবিগুরুর নোবেল প্রাপ্তির প্রায় এক দশক পরে আমার সাহিত্যে আগমন। আমাদের পার্থক্য কেবল সময়ের নয়, শ্রেণিরও। ইংরেজ শাসনে বাঙালি মুসলমান আর আমার ভাগ্য একই রজ্জুতে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল। কখনো এসব নিয়ে তর্কও হয়। কেউ আমায় হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত মনে করে। কেউ মানবতার কবি বলে সম্মান করে।

যার বাণী একদিন সত্যিই এক বিস্ময়-লোক থেকে এসেছিল আমার কাছে—এই কি সেই কবি! মাত্র দুই দশক সেই সৃষ্টিশীল নজরুল আমার এই নশ্বর দেহ আঁকড়ে ছিল। অথচ কবি নজরুলের অবসান হলেও আমাকে অনেক অনেক দিন সেই বিস্ময়-তরুণের স্মৃতি বহন করে চলতে হয়েছে। বিশেষ করে নজরুল-প্রতিভার ভক্তরা আমার এই দেহটিকেও সেই মর্যাদা দিয়েছে।

সেদিনের তারিখটি ঠিক মনে নেই। আগেই বলেছি, বিয়াল্লিশ সালের মে মাসের কোনো একদিন, জুলাই মাসের নয় তারিখেও হতে পারে। আমি সকাল সকাল রেডিওতে চলে এসেছি। যদিও প্রায় প্রতিদিনই রেডিওতে আমায় আসতে হয়। নিয়মিত কিছু অনুষ্ঠান পরিচালনা ছাড়াও নিজেকেও সরাসরি কিছু অনুষ্ঠানে যুক্ত রাখতে হয়। এটি আমার চাকরিও বটে। রেডিওতে আমার যেদিন অনুষ্ঠান থাকে, বিশেষ করে যেদিন আমার কণ্ঠ শোনা যায়, সেদিন দুলি ও আমার শাশুড়ি রেডিওর সামনে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। সানি আর নিনি তখন কেবলই স্কুলে যেতে শুরু করেছে। ওরাও কখনো কখনো মায়ের বিছানায় বসে রেডিওতে আমার গান-কবিতা-কথিকার জন্য অপেক্ষা করে।

প্রমীলার নিশ্চল জীবনে তখন রেডিও ওর নিত্য সঙ্গী। আমার কথা গান-কবিতা শোনা ওর একমাত্র বিনোদন। ছেলে দুটিকে ওর মায়ের স্থবিরতা আরো কাছে নিয়ে এসেছে। যদিও বাড়ির কাজে সহায়তা করার জন্য দু’জন লোক আছে, তবু আমার শাশুড়ি গিরিবালা দেবী না থাকলে কী যে হতো! দুলি যখন সুস্থ ছিল, তখনো ঘরকন্নার বিষয়ে ওর খুব একটা জড়িত হতে হতো না। বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান আশালতা দেবী ওরফে দোলন। তার একমাত্র নয়নের মণি। যক্ষের ধন। তার গায়ে সামান্য আগুনের আঁচ লাগুক সেটিও তিনি চাইতেন না। এসব আমাদের জন্য ভালোই হয়েছিল। আমারও মা ছিল না। নতুন বধূর জন্য পারিবারিক যে পরিবেশ দরকার হয়, সেটি আমার শাশুড়ি—দুলির মা নিজেই তাকে দিয়েছিল। আমার শাশুড়ি আমার মায়ের অভাবও কিছুটা পূরণ করেছিল। যদিও সংসারে তার অতিরিক্ত সক্রিয়তা আমাদের দাম্পত্য জীবনেও কিছু বাধা হয়ে থাকতে পারে। তবু মন্দের চেয়ে ভালোর পাল্লাই ছিল ভারি।

সেদিনের সে-কষ্ট আমি এখনো ভুলতে পারি নি। সঙ্গে কিছুটা লজ্জাও। রাণু সোম এসেছিল আমাদের মসজিদ বাড়ি স্ট্রিটের বাসায়। সঙ্গে ওর মা সরযূবালা সোমও ছিলেন। নলিনীর বাসা থেকে আমিই ওদের স্টেশনে পৌঁছে দিচ্ছিলাম। নলিনী মানে নলিনীকান্ত সরকার। ওরা কোলকাতায় এলে আমি তাদের নিজের বাসায় না নিয়ে নলিনীর বাসাতে নিয়ে যেতাম। এক সময় সপরিবারে আমিও কিছুদিন নলিনীর বাসায় ছিলাম। আমার কনিষ্ঠপুত্র নিনি—ওর বাসাতেই জন্ম নিয়েছিল। নলিনীর কাছেও রাণু গান শিখেছিল। নলিনী বয়সে কিছুটা আমার চেয়ে বড় হলেও আমরা অবিচ্ছেদ্য আত্মার বন্ধু ছিলাম। নলিনীর কাছে আমার ঋণ অনেক। ওর আগ্রহে আমি বেতারে যুক্ত হয়েছি। ও বেতার জিজ্ঞাসার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিল। কিছুদিন আগে ও-ই আমার গানের প্রথম স্বরলিপি ‘সুরমুকুর’ প্রকাশ করেছে। সময় মতো নলিনীকে নিয়ে আরো অনেক কথা বলা যাবে। শুধু এতটুকু বলে রাখি নলিনীর কণ্ঠে হাসির গানে জুড়ি ছিল না।

রাণুও খুব গুণবতী মেয়ে। কেবল সংগীত-শিল্পী নয়, সাহিত্যিক হিসাবেও তার খুব নাম হয়েছিল। দিলীপ, হিমাংশু এমনকি কবিগুরুও তাকে কিছু গানের তালিম দিয়েছিলেন। তখনো রাণু প্রতিভা বসুতে পরিণত হয় নি। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে বিয়ের পরে রাণু সোম স্বামীর পদবি ধারণ করে। বুদ্ধদেব রাণু সোম, উমা মৈত্র ওরফে নোটন—এদের ঢাকার বনগাঁ জীবন নিয়ে একটা মজাদার উপন্যাসও লেখে। এসবই তার বিয়ের আগের ঘটনা। সেখানে দিলদার নওরোজ নামে আমার আদলে বেশ একটা চরিত্র এঁকেছে।

রাণুর মায়ের হাবভাবে বুঝতে পারতাম—ওরা আমার বাসায় যেতে চায়। প্রমীলার সঙ্গে একটু দেখা করে যেতে চায়। কিন্তু আমি তো সহজে কাউকে নিজের বাসায় আনতে চাইতাম না। আমার সঙ্গে যারা মিশতেন, তাদের ধর্ম-কর্ম জাতপাত ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার তত প্রকট ছিল না। এদের মধ্যে নারী-পুরুষ সকলেই ছিল। আমার শাশুড়ি ছিলেন আচার-নিষ্ঠ বিধবা। আমার প্রতি তার ভালোবাসার কমতি না থাকলেও তিনি তার নিজের জগতের মানুষ। সংসারে বাস করলেও মা-মুরগির ছানাদের মতো নিজ কন্যাকে আগলে রাখা এবং ধর্মাচার পালন ছিল তার অবলম্বন। আমার নিজের সংসারেও এ অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। আমার ছিল শাশুড়ি বাঁচিয়ে স্ত্রীর অধিকার।

আমি চাচ্ছিলাম না—রাণু ও তার মা আমার বাসায় আসুক। চলাচলের রাস্তায় পড়ে বলে একটি জরুরি কাজে বাসায় ঢুকতে হয়েছিল। রাণুর মা-ই বললেন, ‘এটি আপনার বাড়ি?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

রাণুর মা বললেন, ‘চলুন না, আমরা যাই আপনার সঙ্গে, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হবে।’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও  বললাম, ‘চলুন।’

অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে তাদের বেশ কষ্ট হচ্ছিল। বাড়ির ভেতরে জিনিস-পত্র গোছগাছ ছিল না। তখনো বুলবুল বেঁচে ছিল। আমাকে দেখেই বলে উঠল, ‘এই যে কাজীদা কোথায় ছিলে?’

বাবাকে কাজীদা বলার ছেলে বুঝি পৃথিবীতে একটাই জন্মেছিল।

এতটুকু ছেলে তার কথাবার্তা হাবভাব দেখলে কেউ আদর না করে পারবে না। আমি তাকে কোলে করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলাম। চুমু দিলাম। বললাম, ‘দুষ্টু আবার আমায় কাজীদা বলছিস?’

আমার বাড়িতে যাদের আসা-যাওয়া ছিল তারা সবাই আমায় কাজীদা ডাকত। তাই বুলবুলও মাঝে মাঝে আমায় কাজীদা ডাকত।

রাণু ও তার মাকে আমি আমার শয়নকক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। সেটি ছিল প্রমীলা ও আমার শোয়ার ঘর। এরই মধ্যে আমার শাশুড়ি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘খবরদার নুরু, ওই ঘরে তুমি যাবে না। দুলুর অসুখ।’

আমাকে তিনি গ্রাহ্য করলেন না। মেহমানকেও নয়। তারা কে, তাদের সঙ্গে কী আমার সম্পর্ক সে-সব তিনি জানতেও চাইলেন না। আবার তিনি জানেন না এমনও নয়। রাণু সোম ও তার মা আমার বাসায় না এলেও আমার ঢাকা জীবনের কাহিনি তার কাছে অজানা নয়। রাণুকে হয়তো আমার শাশুড়ি সন্দেহের চোখে দেখতেন। হয়তো কিছু না ভেবেই এমন একটা কাণ্ড করে বসলেন। আজও আমি সেই অপমান ভুলতে পারি নি। আমি অনেক ব্যথা সয়েছি, নিজের ঘরে নিজের ভালোবাসার মানুষদের সামনে অপমানের চেয়ে কি আর বড় হতে পারে! অবশ্য আমিও জানি না দুলি সেদিন কী অবস্থায় ছিল। তখনো তো দুলি পঙ্গু হয়ে যায় নি। পঙ্গু হওয়ার পরে মাসিকের দিনগুলোতে আমার শাশুড়ি তার ঘরে প্রায়ই আমায় যেতে দিতেন না। আমাদের ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে আবেগের ঘাটতি না থাকলেও অধিকার কোনোদিন পুরোপুরি স্থাপন করা যায় নি। আমি আসলে ছিলাম নিজের সংসারে ঘর-জামাই।

প্রকৃতপক্ষে বাড়িতে কোনো নারী-শিল্পীদের আগমন আমার শাশুড়ি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতেন না। এতে অবশ্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। অধিকাংশ পরিবারে এই সমস্যা আছে। আমায় যেহেতু গান লিখে, গান গাইয়ে, নাটক সিনেমা করে জীবন ধারণ করতে হতো— সেখানে নারী-শিল্পীদের একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না।

যেদিনের কথা বলতেছিলাম, প্রমীলা ও আমার শাশুড়ি রেডিওর সামনে আমার অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা হঠাৎ লক্ষ করল—আমার কণ্ঠ কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে। জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। এটি সবচেয়ে আগে যিনি লক্ষ্য করল, তিনি আর কেউ নন, রেডিওতে আমার সহকর্মী বন্ধু এবং সংগীতের ছাত্র নিতাই ঘটক। নিতাই তখন রেডিওতে উপস্থিত ছিল। আমার প্রতিবেশী শিল্পী বরদা প্রসাদ গুপ্তও আমার এই অসুস্থতার সাক্ষী হয়ে আছে। অনেকেই ড. বরদা প্রসাদ গুপ্ত ও যোগী বরদাপ্রসাদ মজুমদারকে গুলিয়ে ফেলে।

এ সময়ে আমি রেডিওতে হারামণি নামে একটি অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। গ্রামোফোন কোম্পানির ফরমায়েশ রক্ষা, লুপ্তপ্রায় রাগের অনুসন্ধান। নানা রকম নাটক-গান-রচনায় অংশগ্রহণ। শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠান—যখন যেটা সামনে এসেছে, সব করতে হয়েছে। সব সময় যে ভালো লাগত তা নয়। রেডিওতে অনেক কাজ কেবল পয়সার জন্য করতাম।

এর পরে ’৪২ সালের ৯ জুলাই বিষ্যুদবার রাতে ছোটদের একটি অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। প্রমীলা ও আমার শাশুড়ি আমার অসুস্থতার জন্য আগে থেকেই বেশ উদ্বিগ্ন। হঠাৎ তারা লক্ষ করলেন আমার কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও আমি কোনো কথাই আর বলতে পারলাম না। ঘামে আমার কপাল মাথা ভিজে যাচ্ছিল। মুখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসতে চাইল। বুকের ছাতি ফেটে যাবার জোগাড়। গলা দিয়ে কেবল গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই অর্থপূর্ণ শব্দ বের হলো না। অথচ তখনো আমার চেতনা বিলুপ্ত হয় নি। কথা বলার আকাঙ্ক্ষা মরে যায় নি। কী বলতে হবে তার সম্পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। এটা ঠিক অনেকটা রাতে দুঃস্বপ্নে দম বন্ধ হওয়ার মতো।


যে রবির আলোয় আমি জেগে উঠেছিলাম, সেই রবিহারা আমি কিভাবে পথ চলব।


রেডিওতে ঘোষণা করা হলো আমার শরীর খারাপ। জানানো হলো অন্য কোনোদিন এই অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার করা হবে। যদিও আর কখনো অনুষ্ঠানটি পুনঃপ্রচার করা হয় নি। বাড়ি বসেই আমার স্ত্রী, শাশুড়ি ও বাচ্চারা জানতে পারল আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এতটা ভয়াবহ, এতটা করুণ—সেদিন কেউই তা ভাবতে পারে নি। তারা ভেবেছিল, এটি খুব সাময়িক অসুস্থতা।

আমার তখন নিজে চলার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে একরাশ হতাশা এসেও আঁকড়ে ধরল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তার রাত। কোলকাতার রাস্তায় জল জমে গেছে। রাত দশটার দিকে নৃপেন আমায় ট্যাক্সি করে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তখন বেশ তরুণ। শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান করে রেডিওতে বেশ নাম করেছে। শিশু-কিশোররা তাকে গল্প-দাদু বলে ডাকত। বাচ্চাদের জন্য রূপকথার কাহিনি লিখেও নাম করেছিল।

ঠিক গত বছর এই বর্ষা মৌসুমে কবিগুরুর মহাপ্রয়াণ ঘটে। আমি সেদিন বেতারে উপস্থিত ছিলাম না। তবু বেতার কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই মহীরুহ’র শেষ তর্পণ আমার কণ্ঠ ও বাণী দিয়েই সম্পন্ন করা হবে। এটি আমার জন্য ছিল যুগপৎ আনন্দ ও বেদনার। যে কবিকে আশৈশব আমার মনের দেউলে বসিয়ে অর্ঘ্য দিয়ে এসেছি, একলব্যের মতো তাকে গুরুর আসনে বসিয়ে সাহিত্যের শর-শিক্ষা করেছি। তিনি অবশ্য এ জন্য দ্রোণাচার্যের মতো অতটা নিষ্ঠুর হন নি। আছেই-বা কী আমার। আমি কী দিয়ে দেবো গুরুদক্ষিণা। ডান হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি আগেই হারিয়েছি। আমার কলমে শব্দের শর আগের মতো নিক্ষিপ্ত হয় না। অথচ আমার গুরু শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন দারুণ লক্ষ্যভেদী।

এই ঘটনাটি আমি এখানে এই জন্য উল্লেখ করছি যে, ২২ শে শ্রাবণ অর্ঘ্যদানের মূহূর্তে আমার এই রোগের বহিঃপ্রকাশ শুরু হয়েছিল। আমি সংসার-নির্বাহে এতটাই কাতর ছিলাম তদুপরি বিশ্বকবির মৃত্যুতে আমার আবেগের সেদিন বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। তার প্রবল স্রোতের ধাক্কা আমার সেই ভঙ্গুর দেহ সামলাতে পারে নি। একই সঙ্গে তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্যের জন্য কাব্য-রচনার চাপ, তদুপরি নিজ কণ্ঠে আবৃত্তি। সব স্মৃতি সব ব্যথার প্রকাশ এক সঙ্গে বের হয়ে আসতে চাচ্ছিল।

কবিগুরু’র সঙ্গে নিজেকে মেলানোর স্পর্ধা নিজে কখনো করি নি। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জীবনে বহুভাবে প্রকাশ করেছি। যদিও আমাদের সম্পর্ক সব সময় একই মাত্রায় থাকে নি। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কখনো অভিমানে তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। বিশেষ করে শ্রেণিগত পার্থক্য। কখনো মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে তার ভালোবাসার ব্যাপারে সন্দিহান হয়েছি। আমি যখন কারাবন্দি তিনি তখন আমায় বই উৎসর্গ করেছেন। যখন যে আবদার নিয়ে গেছি বিনা প্রশ্নে তা পূরণ করেছেন। সেই ঋণ আমি ভুলব না। তেইশ বছরের এক তরুণ কবিকে তার মতো বড় মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। তার এই উপহার আমার কবিজীবনে বড় প্রয়োজন ছিল। তার স্বীকৃতি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ থেকে যেতাম।

সজনীকান্ত দাস, মোহিতলাল মজুমদারসহ ‘শনিবারের চিঠি’-গোষ্ঠী যখন আমায় কবি বলতেই নারাজ তখন তিনি জাতির জীবনে বসন্তের সঙ্গে আমায় তুলনা করেছিলেন। শত্রুদের মুখ বন্ধ করার জন্য তার স্বীকৃতি কিছুটা কাজে এসেছিল।

তবু আমাদের সম্পর্ক অবিমিশ্র ছিল না। আমার বিরুদ্ধে তাঁকে, তাঁর বিরুদ্ধে আমাকে ভুল বোঝাবার লোকের অভাব ছিল না। আমায় বলা হলো তিনি কোনো এক সভায় উদীয়মান কবিদের ভাষা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তার উদ্দিষ্ট আমি। যেহেতু আরবি-ফারসির কথা এসেছে, যেহেতু খুন-ব্যবহার নিয়ে কথা। আমিই তো ব্যবহার করেছি মোহররম কবিতায়— ‘খুন কিয়া খুনিয়া।’ তাছাড়া আমি মুসলমান। ঐতিহ্যগতভাবেই আরবি-ফারসির পরিভাষা আমার মজ্জায়। হাজার বছরের বাংলা ভাষায় নানা উত্তরাধিকারের সঙ্গে আরবি-ফারসি বাদ দেয়ার উপায় নেই।

এটি যদিও এমন কিছু নয়। তবু সেদিন আমার অহং-এ আঘাত লেগেছিল। জাত্যভিমান ঘা খেয়েছিল। ভেবেছিলাম, তিনি যত বড় কবি হোন, যত বড় মানুষ হোন—তেল আর জলের মিশ খায় না। ক্রুদ্ধ অভিমানে লিখে ফেললাম—‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ।’ প্রমথ চৌধুরী মধ্যস্থতায় এগিয়ে এলেন ‘বাংলা সাহিত্যে খুনের মামলা’ লিখে।

কবিগুরু নিজেই আমার এই অভিমান মিটিয়ে দিলেন। বললেন, তিনি উদীয়মান কবিদের কথা বলেছেন। উদিত কবিদের কথা বলেন নি। যে কবিকে তিনি বই উৎসর্গ করেন, তিনি তো আর উদীয়মান কবি নন।

গুরু-শিষ্যের এই লড়াইয়ে অনেকেই আমায় বাহবা দিয়েছেন। পরে ভেবেছি, এটি আমার জন্য যোগ্য কাজ হয় নি। আমার ভাবা উচিত ছিল :

‘যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়
তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।’

সেদিন আমি ‘রবিহারা’ কবিতাটি পড়তে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলাম। কিছুটা পড়ার পর আমার কণ্ঠ রোধ হয়ে এল। যেন তৎক্ষণাৎ রচিত কবিতার চরণের মতো—

‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপথের কোলে
শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে’

আমিও অস্তাচলের পথে শ্রাবণ মেঘের ধাক্কা সইতে পারলাম না। আমার কণ্ঠের সঙ্গে মস্তিষ্ক অবশ হয়ে গেল। সেই প্রথম টের পেলাম, আমার বিদ্রোহীর বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। আমি চাইলেই আর আমার পক্ষে আকাশ-পাতাল ফুঁড়ে শির তোলা সম্ভব নয়। কবিগুরুর বিদায়ের সঙ্গে আমারও বিদায়ের বার্তা বেজে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, যে রবির আলোয় আমি জেগে উঠেছিলাম, সেই রবিহারা আমি কিভাবে পথ চলব। মনে হলো রবিহারা ধরণীতে আমার কাজের কোনো মানে থাকল না।

রবীন্দ্রনাথ যখন বয়সের মধ্য-গগনে ঠিক তখন এই ধরায় আমার আগমন। যখন তার বয়স পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, তিনি যখন ষাটের কোঠায় তখন আমার সাহিত্যাকাশে উদয়। বিশ্বকবির শেষ বিশ বছর ছিল আমার সাহিত্যের কাল। তার বিদায়ের দিনেই বলা চলে আমার বাঁশি সংগীতহারা হয়ে গেল।

হয়তো আমার আগমনে পড়ন্ত সূর্যের উপরে মুহূর্তে ক্ষণিকের ছায়া পড়েছিল। হতে পারে সেটা বাংলা সাহিত্যের রাহুগ্রাস। সূর্যের কক্ষপথে কিছু সময়ের জন্য চন্দ্রের বাড়াবাড়ি রকম ছায়াপাত। সেই সূর্যগ্রহণ জাতির জীবনে প্রয়োজন ছিল। এই ভারতে বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের যে বিভেদ; সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য—তারই যেন ছিটেফোঁটা পরিশোধের বার্তা নিয়ে এসেছিল আমার চন্দ্রের ছায়ালোক। তাই আমার আগমনে সাহিত্যাঙ্গণে পাণ্ডববর্জিত মুসলমানগণ কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিল। আমার নিন্দুকেরাও অবাক হয়ে দেখেছিলেন, সাময়িক হলেও রবির কিরণের উপরেও চন্দ্রের ছায়ার সপ্ত রঙের খেলা।

আমি হিন্দুর নই, আমি মুসলমানের নই—কথাটি যেমন সত্য, তেমন ইংরেজ শাসন-আমলের শোষণ ও বৈষম্যের শাসননীতির দ্বারা জাতপাত-ধর্মের পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গ মানুষের গর্ব করার মতো তুলনা করার মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তাই যারা আমায় মুসলিমবঙ্গের রবি বলে অভিহিত করেছে তাদের দোষ দেখি না। আমার জাতি এতটাই পেছনে পড়ে গিয়েছিল, আমার অসুস্থ হওয়ার পরে তাদের কেউ কেউ এমন প্রচারণাও চালিয়েছে, এর পেছনে কবিগুরুর হাত আছে। আমায় বান্দরের কলিজায় ধুতরায় বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছে। তিনি নাতি বিয়ে দিয়েছেন। তাদের অনেকের পক্ষে এ বিচার করাও সম্ভব নয় যে, তার মৃত্যুর পরে আমার অসুস্থতার সূত্রপাত।


ওর অসুস্থতা সত্ত্বেও আমাদের দাম্পত্য জীবন অসুখের ছিল না।


তাদের কাছে আমি এতটাই গর্বের, এতটাই মূল্যবান যে, তাদের কেউ এমন প্রচারও করেছে, আমার রচনা থেকে কবিগুরুর নোবেল এসেছে। এ সবের সত্যাসত্য বিচার বিবেচনা যুক্তিযুক্ততার প্রয়োজন তাদের কাছে পড়ে না। আমাকে নিয়ে তাদের যে কোনো দাবি মিথের কাহিনিকেও হার মানায়। ইংরেজের শিক্ষানীতি এ দেশের অধিকাংশ মুসলমান কৃষককে নিরক্ষর ও অদৃষ্টবাদীতে পরিণত করেছিল। আমার পরিবার তার শিকার। যারা বিহারের হাজিপুর থেকে এসে চুরুলিয়া আবাস গেড়েছিল।

হয়তো অনেকে বলবেন, এই ধরনের তুচ্ছ ঘটনা আমার বর্ণনায় কিভাবে সন্নিবেশিত হচ্ছে। না, কোনো ঘটনাই তুচ্ছ নয়। এ ধরনের অনেক তুচ্ছ কি এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে না! সব কিছুর পেছনেই থাকে উদ্দেশ্য। এগুলোকে কেবল মূর্খতা বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তের-চৌদ্দ বছরের পিতৃহীন দরিদ্র কিশোর যখন খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে নিজ জন্মস্থান ছেড়ে দূর দেশে, পরের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন এদেশের মুসলমান আধমরা কৃষকরা নোবেলের স্বপ্ন দেখছে। এর জন্য নিশ্চয় তাদের দায়ী করা যায় না। তাদের জন্যও তো নায়কের দরকার। কে তাদের এই দুর্গতি থেকে উদ্ধার করবে। মুসলমানরা যতই আমায় কাফের বলুক; মুসলমান ছাড়া কেইবা তাদের জাতীয় মুক্তিতে এগিয়ে এসেছে! এটা ধর্মের নয়, বেঁচে থাকার লড়াই, নৃগোষ্ঠীর চেতনা। অবশ্য সেই চেতনার আজ আর প্রয়োজন নেই। তারাও আজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে।

ওই রাতে আর আমি খেতে পারলাম না। ঘুমও এল না। প্রমীলা পা নিয়ে তেমন নড়াচড়া করতে না পারলেও আমার পাশে সারারাত জেগেই রইল। মাথায় হাত বুলাল। আমার শাশুড়িও সারারাত খোঁজখবর নিল। তবু ঘুম হলো না। খুব ভোরে উঠে পড়লাম।

আসলে ঘুম হওয়ার কথা নয়। আমার রোগ তো মস্তিষ্কে। রোগ ভয় ও সন্ত্রাসের। ইংরেজের যে পুলিশ আমায় ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় নি, রাতের পর রাত আমার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছে, যারা আমায় ঘুমের মধ্যে এখনো তাড়া করে ফেরে, যে বখাটেরা আমায় শারীরিকভাবে নাজেহাল করেছে, ঢাকার রাস্তায় রাতের আঁধারে যারা আমায় মাথায় আঘাত করেছে, মুসলিম নামধারী মোহাম্মাদী গ্রুপ আমায় কাফের আখ্যা দিয়ে কোলকাতার রাস্তায় আঘাত করেছে—তারাও কি আমার এই রোগের জন্য দায়ী নয়!

এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি আমার এই দুর্দশার শুরু বুলবুলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। শেষ হয়েছিল প্রমীলার স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণের মধ্যে। এ সবে ঘৃতাহুতি ঢেলেছিল আমার অস্থির মন আর বন্ধুদের প্রকৃতির রহস্যের প্রতি দুর্মর আকর্ষণ।

অবশ্য আমার পরিবারের ধারণা আমি যখন জেলখানায়, চল্লিশ দিনের অনশনে তখন ব্রিটিশ পুলিশ আমায় আর্সেনিকের মতো কোনো প্রাণঘাতী স্বাদগন্ধহীন বিষ প্রয়োগ করেছে। কথা বলার জন্য অতি প্রয়োজনীয় আল-জিহ্বার ক্ষতি করেছে। এসব ধারণার বাইরেও আর্থিক কষ্ট, পাওনাদারেরা আমাকে পদে পদে উৎকণ্ঠিত করেছে। একদিন কিছুই ছিল না, একদিন সব এল, আবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমার মনের মধ্যে এই ভয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল—আমিও একদিন মধুসূদনের মতো অন্যের গলগ্রহ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। রাজনারায়ণের পুত্র যেমন পরধর্ম গ্রহণ করে একদা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে পেয়েছিলেন পিতৃ-সম্পদ। দু’হাতে কামিয়েছিলেন অর্থ এবং খ্যাতি। কিছুই রক্ষা করতে পারেন নি। আমার মতো প্রথম স্ত্রীর হদিস চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাকি স্ত্রী ও সন্তানদের অর্থকষ্টে জীবনাতিপাত করতে হয়েছিল।

এ সবই নিয়তি। হতে পারে দৈব-নিয়ন্ত্রিত, হতে পারে নিজেরই কর্মের ফল। আমার ভাগ্যে যা আছে তা তো হবেই। আমি জ্যোতিষশাস্ত্রেও কিছুটা জ্ঞান অর্জন করেছিলাম। এমন সব ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গিয়েছিল, যা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। নলিনীর নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে আমি যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম, পরিণামে তা-ই হয়েছিল। বিয়ে-শাদি না করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিল।

গ্রামোফোনের রিহার্সেল রুমে সেদিন আঙুর বালা ছিল, ধীরেন দাস, জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী ছিল। রাসবিহারী শীল তার হাতটি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, কাজীদা আমার হাতে কি লেখা আছে দেখে দেন না। দেখলাম মৃত্যু লেখা আছে, কয়েক দিনের মধ্যে রাসবিহারী ইহলোক ছেড়ে চলে যাবে। হঠাৎ আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম, স্তব্ধ হয়ে গেলাম। উপস্থিত প্রত্যেকে বুঝে নিল কিছু একটা খারাপ হতে যাচ্ছে। আমি আর কিছু বললাম না। সাতদিনের মাথায় রাসবিহারীর মৃত্যু ঘটল সামান্য জ্বরে। এরপরে কেউ আর আমায় হাত দেখাতে সাহস পেত না। তবু নিজের হাতের রেখা দেখে কোনো জ্যোতিষীই নিশ্চিত হতে পারে না। আমিও পারি নি। পারলেই কি, আমি তো বিধির বিধান পাল্টে দিতে পারব না। কবিতায় যে সব বিধির দর্প নাশ করতে চেয়েছিলাম, তারা ঠিকই বুঝেছিল।

ঋণের কিস্তি দিতে না পারায় কোম্পানি আমার শখের গাড়িটিও কেড়ে নিয়ে গেছে। কী অপমান! গাড়ি তো কেবল আমার আনন্দ ও বিলাসের বাহন নয়। এ যে আমার মৃতপুত্রের স্মৃতি। যদিও আমার বিবেচনাহীনতা, বৈষয়িক বুদ্ধির অভাব আমায় এ ধরনের অক্ষমতার মধ্যে নিয়ে এসেছে। তবু এটা তো ঠিক, এই সব অক্ষমতা, মানবজীবনের অপরিমিত সম্ভাবনাকে আমি কাজে লাগাতে চেয়েছি। মানুষের সুপ্ত শক্তিকে উদ্বোধন করতে চেয়েছি।

আমি পুরোপুরি অসুস্থ হওয়ার মাত্র বছর চারেক আগে প্রমীলা এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তার পায়ের পাতা থেকে ঝিনঝিন করে রোগটি শরীরের উপরের দিকে উঠে আসতে থাকে। পায়ের নিচের অংশ থেকে অনুভূতিসমূহ অবশ করে উপরের দিকে ওঠে। বিবাহিত জীবনে আমাদের দুঃখকষ্টগুলো প্রায় একই রকম। মা হয়ে তাকেও সইতে হয়েছে, পরপর প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রের মৃত্যুর যন্ত্রণা। বাসস্থান ও খাদ্যের অভাব। পুলিশ ও পাওনাদারের চাপ। মাত্র তিরিশ বছর বয়সের মধ্যে স্ত্রীর এই ভয়াবহ অসুস্থতাও আমাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় তার রোগের শুরুতে দেখতে এসে বলেছিল, এই রোগীর আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই।

কয়েক দিনের মধ্যে রোগটি তার পা ছাড়িয়ে সমস্ত শরীর নিথর করে উপরের দিকে উঠে আসবে। রোগটি হার্টে পৌঁছলেই মৃত্যু অনিবার্য। অথচ ডাক্তারি বিদ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে প্রমীলা আরো অনেক বছর বেঁচে থাকল। তার পায়ের নিচের দিকের কিছু অংশ বল হারিয়ে সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে রইল। রোগটি কোমরের উপর অব্দি উঠতে পারল না। আর এর ফলেও আমার ডাক্তারি বিদ্যার প্রতি বিশ্বাসে চিড় ধরল। এত বড় ডাক্তার—ভারতজুড়ে নাম। পরবর্তীকালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি নিয়মিত রোগী দেখার কাজ করেছেন।

আমার রোগের শুরুর দিকে ডাক্তাররা সন্দেহ করেছিল, প্রমীলা থেকে আমার মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। তার পা থেকে শুরু হলেও আমার মাথা থেকে শুরু হয়েছে। প্রমীলা পায়ের বলহীনতার কারণে শয্যাশায়ী থাকলেও বহুদিন শরীরমনে অনেক সুস্থ ছিল। বরং অসুস্থতার দিনগুলোতে সে আরো সুন্দর হয়ে উঠছিল। অনেকটা মৎস্যকন্যার মতো। নিচের অংশ ছেঁচড়ে চললেও উপরের অংশ ছিল হৃদয়হরা। ওর অসুস্থতা সত্ত্বেও আমাদের দাম্পত্য জীবন অসুখের ছিল না।

দিলীপ ও নলিনী আমার অভিন্ন আত্মার বন্ধু হলেও তাদের বৈরাগ্যের দীক্ষাও আমার জন্য সাময়িক বিভ্রম তৈরি করেছিল। বিশেষ করে লালগোলার মহেশ নারায়ণ স্কুলের এক হেডমাস্টার, যোগী বারিদবরণ মজুমদার আমায় হ্যালুসিনেশনের জগতে নিয়ে গিয়েছিল। তার সংস্পর্শে কিছু সময়ের জন্য লুপ্ত হয়েছিল আমার বাহ্য হিতাহিত জ্ঞান। আমি আমার মৃতপুত্রের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। যোগী বারিদবরণ আমায় সশরীরে বুলবুলের দর্শন করিয়েছিল। বারিদবরণ মজুমদারের নাম বরদাচরণ মজুমদারও হতে পারে। তার ভক্তরা তাকে স্বয়ং ভগবান শিবের দেহরূপে আবির্ভাব হিসাবে দেখতেন। দিলীপের মতো নলিনীর মতো আমিও তার পায়ের কাছে বসে যোগের দীক্ষা নিয়েছি। আমার পায়ের নিচ থেকে যখন সকল আশ্রয় সরে যাচ্ছিল তখন খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছি। এ সবের পূর্ণ বিবরণ পরে কোনো রচনায় দেয়া যাবে। তবে এই পর্যায়ের একটি ঘটনা বলে আপাতত রাখছি।

আমার এই অসুস্থতার সূত্রপাত অনেক দিনের হলেও প্রথমে কিন্তু নলিনীই টের পেয়েছিল।

কবিগুরুর প্রয়াণ-দিবসের পর থেকে আজকের এই দিনে স্থায়ীভাবে প্রায় বাকরুদ্ধ হওয়ার মাঝখানে আমার খুব একটা রেডিওতে যাওয়া হয় নি। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল তখন আমি বাড়িতেই করতাম।

এর মধ্যে নলিনী এল। সে ঢুকতেই আমি বললাম, ‘এসো এসো নলিনীদা। তোমায় একটা কথা বলার আছে। কথাটি বেশ গোপন।’

নলিনী বলল, ‘বেশ বলো কাজী দা। তোমার লোকজন তো সব বিদায় হয়েছে।’

আমি বললাম, ‘তুমি যোগসাধনে কতদূর এগিয়েছ? কোন স্তরে পৌঁছেছ?’

নলিনী বলল, ‘না, ভাই এখনো আমি কোনো স্তরে পৌঁছতে পারি নি।’

আমি বললাম, ‘কেন গুরু বরদাচরণ তোমায় এসব শেখায় নি! আমি তো সচ্চিদানন্দ স্তরে পৌঁছে গেছি।’

নলিনী বলল, ‘তাই নাকি। সে-টা আবার কী?’

বললাম, ‘বসো, তোমায় শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি আমার কপালের দিকে তাকিয়ে থাকো। আমি তোমায় সচ্চিদানন্দ স্তরে প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছি।’

এই বলে আমি কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে গভীর ধ্যানস্থভাবে বসে রইলাম।

বললাম, ‘যাও, তোমাকে আমি সচ্চিদানন্দ স্তরে প্রতিষ্ঠা করে দিলাম।’

তখনই নলিনী বুঝতে পেরেছিল, আমার মধ্যে কোনো একটা গণ্ডগোল তৈরি হয়েছে। সেদিনই সে রেডিওতে গিয়ে প্রথমে শিল্পী সুরেশ চক্রবর্তীকে আমার এই অস্বাভাবিক আচরণের কথা বলেছিল। সুরেশ চক্রবর্তী আমার গান গেয়ে বেশ নাম করেছিল। ওর গাওয়া ‘কতযুগ পাই না তোমার দেখা/ থাকিতে পারি না আর একা একা।’ এই গানটি আর শুনতে পাওয়া যায় না।

এরপর থেকে আমার মস্তিষ্ক বিকৃতির কথা মোটামুটি পরিচিত মহলে চাউর হয়ে গেল।

সজনীকান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্য কুশল জানাতে পত্র লিখল।

আমি দু’লাইন কবিতা লিখে দিলাম—

‘ভালোই আমি ছিলাম এবং ভালোই আমি আছি—
হৃদয়-পদ্মে মধু পেল মনের মৌমাছি।’


আমিও তো একদিন তার সশস্ত্র আন্দোলনে দীক্ষিত হয়েছিলাম।


আমার এই উত্তর পেয়ে সজনীকান্ত সবাইকে বলে বেড়ালো, আমার অসুস্থতার খবর একটি গুজব। কারো মস্তিষ্ক বিকৃত হলে, এমন ছন্দোবদ্ধ কবিতায় জবাব দিতে পারে না।

এই ঘটনার দু-একদিন পর দুপুরবেলা আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কেউ আমায় খুঁজে পাচ্ছিল না। সবাই চিন্তিত। অবশেষে কোলকাতার বাইরে পানহাটি থানার কর্মকর্তা আমায় উদ্ধার করে শ্যামপুর থানায় জানিয়ে দেয়।

সে ঘটনাটিও আমার বেশ ভালোভাবে মনে আছে। তখন যে কেবল আমার জীবনে ভয়ংকর দুঃসময় নেমে এসেছিল এমন নয়। ভারত যেমন স্বাধীনতা আন্দোলনে, এমনকি নিজের দেশ বিভাজনে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল; তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর থাবায় ভারতসহ পৃথিবীর মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ছিল।

ব্যারাকপুরের ট্রাঙ্ক রোডের উপর দিয়ে চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমরসম্ভার। ট্রাঙ্ক, লরি, বড় বড় জলপাই রঙের গাড়ি বোঝাই দেশি ও শাদা চামড়ার সৈন্যবাহিনী। এসব উপেক্ষা করে প্রবল ভিড়, উত্তেজনা ও ভয়ের মধ্যে আমি নিঃশঙ্ক চিত্তে হেঁটে চলেছি।

চিনতে পেরে একজন পথচারী আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, কাজী সাহেব কোথায় চলেছেন?’
আমি বললাম, ‘পণ্ডিচেরি যাচ্ছি।’

এখানেই গণ্ডগোল পাকিয়ে গেল। কোলকাতা থেকে পণ্ডিচেরির দূরত্ব প্রায় বারশ মাইল। আমি পায়ে হেঁটে পণ্ডিচেরি যাচ্ছি, এ কথা তার কাছে বিশ্বাস হয় নি। তাই থানাতে অবহিত করেছে।

কারণ এটিই ছিল সত্য। ততদিনে আমার মস্তিষ্ক থেকে পরাধীন ব্রিটিশ রাজের অবসান হয়েছে। আমি মনের সচ্চিদানন্দ পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। জাতপাত ধর্মাধর্ম দুষ্ট অবাস্তব ভারতের ভাগাভাগির রাষ্ট্রের অবসান হয়েছে। এক আধ্যাত্মিক আনন্দজগৎ আমার মস্তিষ্কে ভর করেছে। যার সন্ধানে বন্ধু দিলীপ আগেই ঘর ছেড়েছে, নলিনী অধিকাংশ সময় সেখানে কাটাচ্ছে। জানি না কী আছে সেই দেশে, যেখানে ব্রিটিশের খাতায় সন্ত্রাসী অরবিন্দ ঘোষ পরমানন্দে ঋষি অরবিন্দ রূপে দিন কাটাচ্ছে। অথচ আমিও তো একদিন তার সশস্ত্র আন্দোলনে দীক্ষিত হয়েছিলাম। যে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় অরবিন্দকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলাম—

‘মহেশ্বর আজ সিন্ধুতীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে
অরবিন্দ চিত্ত তাহার ফুটবে কখন কে সে জানে।’

তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বারীন্দ্র ঘোষকে আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ ‘অগ্নিবীণা’ উৎসর্গ করেছিলাম। অথচ আজ তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া সৈন্য। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অপরিবর্তনীয় জগতের দুঃখকষ্টের চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে এক রহস্যময় রোমান্টিক ভাবের জগতে আশ্রয় খুঁজছে। আমিও আজ বাহ্যচেতনাহীন লোকাতীত জগতের বাসিন্দা।

নিজের কবিতা ভুলে তখন অরবিন্দের কবিতা আওড়াচ্ছি—

‘চিরমুক্তিদাতা দৈবী ঐশ্বর্য এ-জীবনে
আসুরী সম্পদই জীবে বাঁধে বিশ্বময়।
জন্ম অধিকার যার অভিজাত-সম্পদে ভুবনে
সে-তোমার হে মহৎ, কোথা দুঃখ ভয়?’

(351)

মজিদ মাহমুদ