অন্যজন : ৮

অন্যজন : ৮
184
0

৭ম পর্বের লিংক

পর্ব- ৮ম 

১৪.
বাতাসে নড়ে উঠে ধানের চারা। গোল্লারে বলে চিৎকার দিয়ে ছোটকালের দিকে দৌড় দিই। দৌড়ে স্কুলের দেয়াল ছুঁই এবং গোল্লা খেলায় জিতে যাই।

গোল্লার ঘরে ফিরে আসতে আসতে দেখি কালো বড় ডেইয়া পিঁপড়ার মতো বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। পাশের বিলে একজন জাল মারে, পানিতে নড়াচড়া করে শাদা আসমান। নতুন পানিতে মাছের দৌড়ানোর মতো মানুষের মুখেও কথা ফোটে। কথাগুলো কই বিজুলি, মলা ও পুঁটি মাছ হয়ে জালে আটকে থাকে। স্রোতের সাথে ভাসে ডুলা ধরা শিশুর হাসি।

বিকালে নদীর পারে গেলে কিংবা বিলে মাছ ধরা দেখে মানুষের ভেতরটা কলকলিয়ে ওঠে। বর্ষা তাই রুপালি পুঁটি মাছের মতো লাফায়। ছোটবেলা যেন পুঁটিমাছকাল। আমরা পুকুরে বড়শি বাইতাম। বড়শির আধার থাকত আটার কায়, ভাত বা পাটিপাতায় ঘুমিয়ে থাকা ছোট পোকা। বড়শিতে গেঁথে ছুড়ে দিতাম। একটু পর ফুচিতে টান পড়ত। সাথে সাথে টান দিতাম, উঠে আসত ছোট বা বড় পুঁটি। আমরা একসাথে হেসে উঠতাম। ফজা লোটায় মাছ নিয়ে মাছের নড়াচড়া দেখত। ছোট পুঁটি এলে আশপাশের ছেলেমেয়েরা সুর করে বলত, টিট পুঁটি কপালের চান/ বড় পুঁটিরে ডেকে আন।


বেশিরভাগ পুকুর ডুবে যাওয়ায় বেরিয়ে গেছে মাছ। নতুন পানির গন্ধ পেলেই মাছেরা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো উতলা হয়। তাই চারদিকে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে।


বর্ষার হ্যাপাও তো কম না। কাদায় প্যাচপ্যাচ চারদিক, জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। তারপরও নতুন পানিতে নতুন কিছু আসে। আমরা নদীতে একটা চিহ্ন রেখে পারে মার্বেল, হাতগুটি বা ঘর এঁকে চাঁড়া খেলা শুরু করি। ওই চিহ্নে পানির ওঠানামা ধরে নদীর পানি মাপি। পানির ঘূর্ণির মতো মার্বেলের একেকটি টোকা। ঠাস ঠাস শব্দে মার্বেল ছড়িয়ে পড়ে। কত মার্বেল স্রোতের সাথে মিশে গেছে তা কি আর মনে আছে!

কোনো কোনো বিকালে বৃষ্টির পর রংধনু দেখা যেত। বৃষ্টির কণা হয়ে একজন বলত, এগর বেগর তাড়াতাড়ি। আরেকজন বলত, সূর্যের দিকে তাকালি।

এভাবে চলত : এং মাছ খাবে না ব্যাঙ মাছ/ হেঁদুর বিয়ে কদু খায়/ এত কদু কোথায় পায়/ মাদি হাটে গেলে পায়/ মাদি হাটের পানসুপারি/ বিবিরহাটের তেল/ সারা রাত পিঠা বানাই/ বেয়াই বাড়ি গেল/ অ বেয়াই বেয়াই/ ঝি দেবে না বউ দেবে/ ঝি দিলে কাঁদব/ বউ দিলে হাসব।

পাহাড় থেকে নেমে আসা ঘোলা পানির ঘূর্ণি কেবল ঘোর বর্ষায় দেখতাম। তাই আষাঢ়-শ্রাবণে আমাদের মধ্যে পলিজল খেলা করত। আমরা ডেইয়া পিঁপড়ার মতো হাঁটতাম। হাঁটতে হাঁটতে বলতাম, মারে মা সুতা কাট/ কাল সকালে গজের হাট/ গজের হাটে যেতে চাই/ চরকা চুড়ি আনতে চাই/ মামা গেছে ঘামানি/ ছাতা ধরে লামানি/ ছাতার উপর কুসুম ফুল/ ঝুমকো নদে নাদাম ফুল/ নাদাম ফুলের পাশে নানা/ হুক্কা ধরে তামাক খায়/ লাঠি ধরে দরবার যায়/ দরবার হলো হাছা-মিছা/ টুক্কুনি মার গায়ে বিছা।

এসব ছড়া বলে মজার খেলা খেলতাম। দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনের কান ধরত। তারপর ছড়া বলে উঠবোস করত। পানি নামতে শুরু করেছে। এক আঙুল দুই আঙুল কমে সেখানে পলিমাটির শাদাটে ছোপ লেগে আছে। পানি ও গাছপালার তরতাজা ভাব ছিল। রোদ উঠায় তা ম্লান হচ্ছে।

পানির মধ্যে প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত ধানের চারা ও জালাবিছান টিকে থাকে। অতিরিক্ত পানিতে শক্তি কিছুটা কমে গেলেও পানি সরে যাওয়ার পর নতুন উদ্যমে বেড়ে ওঠে। আগাম ধান রোপণ করে কিছুটা ভুলই হলো। মা বলেছিল, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের জোড়ায় খুব বৃষ্টি হয়। এবার বাবা ও ফজার হিশাব মিলল না।

বেশিরভাগ পুকুর ডুবে যাওয়ায় বেরিয়ে গেছে মাছ। নতুন পানির গন্ধ পেলেই মাছেরা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো উতলা হয়। তাই চারদিকে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে।

সকাল থেকেই বিলে ও হালদা নদীর পাড়ে লোকের ভিড়। কেউ মাছ ধরছে, কেউ মাছ ধরা দেখছে, কেউ গল্পগুজবে মাছের গন্ধ মাখছে। কয়েক জায়গায় পাড় খুব ঝুঁকিতে আছে। পাম্প মেশিনের গোড়ায় একেবারে শুকনা লোকের মতো হয়ে গেছে। ব্রিজের দক্ষিণ-পূর্বেও ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেল। পাড় ভাঙলে এদিকে কি কিছু রাখবে?

নদীর পানি নামছে। বানের পানির গন্ধে বিভিন্ন জায়গা থেকে পালিয়ে যাওয়া মাছেরা উজানে উঠছে। উজানে উঠতে নাকি খুব সুখ। ধুরে ধুরে মাছ চলে। উঠতে উঠতে কতবার তারা জালের বাড়ি খায়, কত যে ধরা পড়ে তার ঠিক নাই। যেগুলো একটু বড়, কেজি দুই কেজি ওজনের, জালবাড়ি খেতে খেতে সেয়ানা হয়ে ওঠে। মাঝখান দিয়ে চলে। খুশিতে চলতে চলতে ওরা অনেক দূর যাবে। কিছু ধরা পড়বে আর কিছু নদীর উৎসে পৌঁছে যাবে। পানি কমলে নিচের দিকে নামবে। আসার সময় মাঝ নদী দিয়েই আসে।

আসমানের বিলে জাল বাইছে কয়েকজন। জাল মারা, জাল বাছা, কয়েকটা পুঁটি ও কই বিজুলি জাল থেকে নিয়ে লোটায় রাখার মতো এই সন্ধ্যা। পল্লী বিদ্যুতের তার বেয়ে আঁধার আসছে। ধসে পড়া মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে খুইল্যে কাঁটার গাছ। শাদা শাদা ফুলগুলো ম্রিয়মাণ। এসব গাছে লালচে গোটা হয়। গোটার উপর কাঁটা থাকে। তবে ছোটবেলায় মজা ছিল লেরা গোটায়। হালকা সবুজ গোটাগুলোর চারপাশে কাঁটা থাকত। যাদের চুল লম্বা, বিশেষ করে মেয়েদের চুলে আমরা লেরা গোটা লাগিয়ে দিতাম। চুল থেকে ওটা নিতে অনেক সময় লাগত।


মাঠ সবুজ হতে শুরু করেছে। সবুজ প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশে। এক খণ্ড মেঘ দুষ্টু বালকের মতো দৌড়াচ্ছে।


মিয়া বলে, জাল না এনে ভুল করেছি। তিন খালের মাথায় নাকি প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে।

তিন খালের মাথা বাজার পেরিয়ে আরো সামনে। মদারি, ফইন্যে ও হালদা—এই তিন খালের মাথায় জাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কমছে কম ষাট-সত্তরজন মানুষ। কেউ জাল মারছে, কেউ জাল বাছছে, কেউ মাছের ঘাই দেখার আশায় তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। আর কেউ বড় মাছ ধরে তৃপ্তিতে হাসছে। সেইসব দৃশ্য কল্পনা করে মিয়া আফসোস করে। কয়েকটা মাছের চলে যাওয়া দেখল জুগিপাড়ার কাছে নদীর পাড়ে বসে। আমি, ছালাম ভাইসহ আরো কয়েকজন বসে আছি। আরেকটা মাছ গেল, সবাই তাকাল পানির দিকে।

মিয়া বলে, এটা কেজি দেড় কেজি হবে। সে বলে, পরশু একটা মাছ দেখে পাড়ে পাড়ে তালতল পর্যন্ত গেলাম। মাছটা আগে আগে যাচ্ছে। তালতলে গিয়ে দেখলাম জাল নিয়ে একজন দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, নড়িস না, জালটা দে। জাল নিয়ে খোপ মারলাম। ভালো করে পড়েও নি, এসে গেল। প্রায় দুই কেজি ওজনের কাতলা।

সন্ধ্যা আমাদের ঢেকে ফেলেছে। পাড় থেকে উঠে দাঁড়ালাম। পানি সরে যাওয়ায় আসমানের বিলে কয়েকটা জমিতে আগে রোপণ করা ধানের আগা দেখা যাচ্ছে। চারাগুলো সার দিয়ে লম্বা করা হয়েছিল। তবে অল্পবয়সী চারা রোপণ করলে ঝামেলা। ধানের থোড় আসার আগে পোকা আক্রমণ করে, কাণ্ডের রস খেয়ে ফেলে। লেদা পোকার মতো কিছু পোকা খায় পাতা।

কয়েকদিন পর বিবিরহাট যাওয়ার সময় দেখি, পাঁচ পুকুরিয়ার দিকে হালদার পাড় নেই। নদীর পানি দেখা যাচ্ছে। বন্যায় পাকা রাস্তা এলোমেলো পড়ে আছে। কয়েক জায়গায় বস্তা দেওয়া হয়েছে। অ্যাক্সিডেন্টে যেমন মানুষের চামড়া ছুলে যায়, রাস্তার চামড়াও তেমন ছুলে গেছে। আশপাশে লোকজন এখনো জাল বাইছে। অনেক জায়গায় জালাবিছান লালচে হয়ে গেছে। পানি সরে যাওয়ার পর বিলে শুরু হয়েছে উৎসব। কেউ হাল চষছে, কেউ জালাবিছান থেকে জালা তুলছে আর কেউ ধান রোপণ করছে। মাঠ সবুজ হতে শুরু করেছে। সবুজ প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশে। এক খণ্ড মেঘ দুষ্টু বালকের মতো দৌড়াচ্ছে।

গতকাল ছিল প্রখর রোদ, আজ রোদ-বৃষ্টির খেলা। কয়েকটা জমিতে কচুরির গাঢ় বেগুনি ফুল ফুটে আছে। ডিগিসহ ফুল তুলে কিশোরীটা যেন শ্রাবণ মাসের মন খারাপ করে দিচ্ছে। রান্না করলে ডিগি সাবানের ফেনার মতো নরম হয়ে যায়। খুব মজা।

পরশু ছালাম ভাই বলেছিল, চাষ করেও তো টানাটানি যায় না। তাহলে লাভ কী? সে কথা মনে পড়ে আর কচুরি ফুলের মজার মতো আমার স্বপ্ন দিন দিন গাঢ় হয়। বিদেশ যাবই যাব। যেতে না পারলে শহরে চলে যাব। বাড়িতে ভালো লাগছে না।

বাড়িতে ঢুকতেই শুনি কাক জোরে ডাকছে। নাক কাটা অন্ধ ভিক্ষুকটাও এসেছে। ‘আল্লাহ আল্লাহ রহম করো’ বলে বাম্বুদের ঘরের সামনে দাঁড়ায়।

বাম্বুর বাড়ি দোতলা হচ্ছে। শ্রমিকেরা লোহা পিটায়। তিনি ফোনে একজনকে বলছেন, ভাই আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিউর। পরিস্থিতি বহুত খারাপ। বুঝতে পারছি, হ্যাঁ, বাস করা কঠিন। চিন্তা করবেন না। কয়েকজন ক্যাডারের সাথে আমার পরিচয় আছে। এক লাখ লাগবে না, পঞ্চাশ দিলেই চলবে।

ছোটকাল হলো সূর্যের আলো। কখনো ফুরায় না। তাই মনে মনে সেদিকে চলে যাই। হালদার পাড়ে খেলি। নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করে গায়ে কাদা ও বালি মেখে লাফাই। তীরে উঠে একজনকে বানাই রাজা। একেকদিন একেকজন রাজা হয়।

বলি, রাজা আমাদের ভাত-কাপড় দিচ্ছে না। কাদাবালির দলা মেরে রাজাকে তাড়া করি।

একজন বলে, কী হলো, কী হলো?

আমরা বলি, রাজার পেটে পীড়া হলো।

কেন? কেন?

রাজা আমাদের ভাত খেয়ে ফেলেছে।

রাজাকে তাড়িয়ে নদীতে ফেলে আমরাও ঝাঁপ দিই। তীরে উঠে জিয়লগাছের তলে দাঁড়ায়। কানের লতি থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে। রাজাও পানির ফোঁটা হয়ে হারিয়ে যায়।


গান শুনে পানিতে বৈঠার বাড়ি মেরে মাঝি বলে, আমার সন্তান কি দুধে-ভাতে থাকবে না!


গল্পদাদা পাড় থেকে নামে। গাছের গোড়ায় জুত করে বসে বলে, একবার এই চরে ছালামের বাপ তরমুজখেত করেছিল। বাদুড়ের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য খেতে জাল বিছিয়ে দিয়েছিল। এক সকালে এসে দেখে, জাল নাই, তরমুজও নাই। সে বাম্বুর কাছে যায়। বাম্বু বলে, আমি কম সুদে টাকা দিই। আমার মতো ভালো মানুষ এই তল্লাটে পাবি? অসুবিধা নাই, কিছু টাকা নিবি আর কি।

দাদা বলে, হায়রে বাম্বু, আইলে বসে পায়খানা করেছে কয়দিন হচ্ছে? সেই বেটা এখন ফুটানি করে।

রাতে স্বপ্নের মধ্যে শুনি, দাদা বলছে, পৃথিবীটা হলো যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধের ময়দানে বাম্বু গরুর নলা দিয়ে ভাত খায়। নলার মগজ চোষার ফুরুত ফুরুত আওয়াজ শুনে আমার ঘুম আসে। সে স্বর্ণের কারিগরের চোঙের ভেতর ঘুম রেখে দেয়। ঘুম খুঁজে না পেয়ে আমি হাঁটি।

বাবা হাল চষে। এ সময় শালিক উড়ে উড়ে পোকা খায়।

স্কুলের ঘণ্টা বাজে। বই নিয়ে আমি স্কুলে যাই। ছুটির পর নদীর পাড়ে এসে দেখি পাল তুলে নৌকা যাচ্ছে। মাঝি গায় : মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না…

বাম্বু গাইল : তোর দু চোখ ভরা স্বপ্ন/ এদেশ আমার জন্য।

গান শুনে পানিতে বৈঠার বাড়ি মেরে মাঝি বলে, আমার সন্তান কি দুধে-ভাতে থাকবে না!

হাসতে হাসতে বাম্বু বলেন, রাতের গায়ে স্নো-পাউডার মেখে চাঁদ ধলি বক হয়ে যখন উড়ে বেড়ায়, তখন আসিস। তোকে বলব।


৯ম পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)