অন্যজন : ৬

অন্যজন : ৬
206
0

৫ম পর্বের লিংক

পর্ব- ৬

১০.
গোল্লারে বলে চিৎকার দিই। সবাই দৌড়ায়। ফজা, শাহেনা, আমিনা, আলতা মিয়া, দুলাল ও আমি দৌড়ে পৌঁছে যাই ছোটবেলায়। সবাই একসঙ্গে গোল্লাছুট খেলি। হাডুডু, কানামাছি, মাছখেলা, কান ফুইস্যেনি, ভাতছালন, সাতচাঁড়া, মার্বেল, চাঁড়া দিয়ে তাস খেলা, দাড়িয়াবান্ধা, জাম্বুরা, কাগজ বা প্লাস্টিকের বল দিয়ে ফুটবল—একেকদিন একেক খেলা খেলি। আমাদের অনেক ফুটবল তো বেতঝোপে খেয়েছে।

খেলতে খেলতে বিকালটা লম্বা হয়। স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করি, থ্র্রি লম্বা বিড়ি/ ঘোড়ায় চড়ে বাহাদুরি।

একজন ছড়া কাটে : ইচকি মিচকি তামাকের দলা/ তামাক গেছে লাই পাড়া/ লাইকে না দিয়ে ভাইকে দিই/ ভাইয়ের সঙ্গে দোকান দিই/ দোকানের ভেতর কুডুর কাড়ুর/এল কাট বেল কাট/ রাজার পোয়ার আত কাট।


ছোটবেলা ঘরের পাশের খেজুরগাছটার মতো লম্বা ছিল। তার রসের মতো মজারও ছিল। 


চারজন হাত বিছিয়ে বসে। একজন ওই ছড়া কাটে। তার ডান হাত মুঠো করা। ছড়া কেটে প্রত্যেকের হাতের পিঠে মৃদু কিল দিয়ে যায়। ‘আত কাট’ বলার পর যার হাতে কিল পড়ে তার হাতটা কাটা যায়। তখন সে হাতটা গুটিয়ে পিঠের দিকে রাখে। এভাবে ছড়া কেটে একসময় সব হাত কাটা পড়ে আর খেলা শেষ হয়।

মাঠে গরু চড়ে, আমি আমগাছের ডালে বসে থই থই বিল দেখি। একজন চিৎকার করে একটা লাইন বলে। আরেকজন পরের লাইন বলে। এভাবে ছড়াটা লম্বা হয় : ওয়ান টু থিরি/ পাইলাম একটা বিড়ি/ বিড়িতে নাই আগুন/ হয়ে গেল বেগুন/ বেগুনেতে নাই বিচি/ হয়ে গেল কেঁচি/ কেঁচিতে নাই ধার/ হয়ে গেল হার/ হারেতে নাই লকেট/ হয়ে গেল পকেট/ পকেটেতে নাই টাকা/ কেমনে যাব ঢাকা/ ঢাকাতে নাই গাড়ি/ কেমনে যাব বাড়ি/ বাড়িতে নাই ভাত/ দিলাম একটা পাদ/ পাদে নাই গন্ধ/ হাই স্কুল বন্ধ/ স্কুলেতে যাব না/ বেতের বাড়ি খাব না।

অদূরে চার-পাঁচটা মেয়ে গোলাকার বসে আছে। তাদের মধ্যে একজনের হাতে কাগজের দলা। সে ছড়া কাটে : টুনি ভাইয়ুর টুনি/ হরবা গাছর বুনি/ কাত্তে আছে কাত্তে নাই/ কঅরি কাউঅ ভাইঙে চুইয্যে/ টাডিং টুডিং মানিক জোড়/ আলগা বেডার ফডির জোর/ ওই বেডাঅ বঅর চুর।

ছড়া কেটে কাগজের দলা লুকিয়ে একেকজনের হাতে দেয়। ওই সময় একজন ওদের চারপাশে ঘোরে। সে নিচের দিকে তাকাতে পারবে না। ছড়া কাটা শেষ হয়। যে ছড়া কাটে সে জিজ্ঞেস করে, কার কাছে আছে?

যে ঘুরে সে বলতে পারলে খেলায় বসে যাবে আর যার হাতে জিনিসটা থাকবে সে উঠে ঘুরতে থাকবে। যদি না পারে তাহলে ওই খেলোয়াড় আবার ঘুরবে।

ছোটবেলা ঘরের পাশের খেজুরগাছটার মতো লম্বা ছিল। তার রসের মতো মজারও ছিল। রসের মতো ফোঁটা ফোঁটা পড়ে ছোটবেলা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া সেই রস থেকেই যেন শুরু হয় নতুন জীবন। আমি দেখেছি, প্রাণ ঘুমিয়ে থাকে। সুযোগ পেলেই জেগে ওঠে। এই তো বর্ষাকাল এসেছে। বীজতলা অর্থাৎ জালাবিছান তৈরির ধুম পড়ে গেছে চারপাশে।

ঘরে মার তোড়জোড় চলছে, বাইরে বাবার। ব্যস্ততার এই গন্ধে ছোটকালের কথা মনে পড়ে। ডোলের পাশে ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে ভালো করে ঢাকা আছে লাই ভরা ধান। মা বীজধান বের করে।

তখন স্কুলে পড়তাম। ততদিনে ফজা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। যেদিন জালা মানে বীজ জমিতে ফেলত সেদিন স্কুলে যেতাম না। আগের চার-পাঁচ দিন সবার কাজকর্ম দেখতাম গভীর আগ্রহে। ধান থেকে চারা গজানো দেখে মাঝে মাঝে নিজেকে ধানের চারা ভাবতাম। দিনে আমেনা, লিটন, শাহেনা, মনির সঙ্গে খেলতাম নানা খেলা; রাতে খেলতাম ধানের সাথে। বীজ ফেলার দিন মাথায় করে জালার লাই নিয়ে যেতাম। মজে থাকতাম অদ্ভুত একটা গন্ধে। রাতে এই গন্ধ খেলার সাথী হতো। খেলতে খেলতে ভাবতাম, বড় হলে ভালো চাষা হব। লম্বা চওড়ায় বাবার চেয়ে বড় হব। বৃষের চেয়েও শক্তিশালী হব। লাল গাইটার চোখের মতো হবে আমার মন। মন-প্রাণ ঢেলে কাজ করব। দুধ দুয়াত মা, আমি দেখতাম। গরুটা চোখ ছোট করে থাকত। মনে হত দুধ দিয়ে সুখ পাচ্ছে। ভাবতাম, বড় হলে আমিও আমার সব দেবো এই ঘরের জন্য।

গাইয়ের ওলান থেকে দুধ পড়ার মতো ছিল সেইসব দিন। একেকটি উদ্দীপনাময় দিন কাটত, কি খেলায়, কি কাজে। যেদিন ভাতছালন খেলা খেলতাম সেদিন সংসার পাততাম। আমাদের কেউ হতো বাবা, কেউ মা, কেউ ছেলে বা মেয়ে। কেউ বাজারে যেত, কেউ ভাত রাঁধত আম বা জামপাতা দিয়ে। ইটের গুঁড়ি হতো ঝোল বা ডাল। খুব মজা করে খেতাম। আরাম করে ঘুমও যেতাম।

সাতচাঁড়া খেললে সেদিন একেকজন দৌড়বিদ হতাম। ক্যাম্বিসের বল থাকত একজনের হাতে। সাতটা চাঁড়া একটার উপর একটা বসিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে মারত। ভেঙে দিতে পারলে দৌড়ে দূরে সরে যেতাম। বল নিয়ে তাড়া করে সে ছুড়ে মারত। কারো গায়ে লাগাতে পারলে তখন ওকে সাততলা চাঁড়া ভেঙে বল নিয়ে খেলোয়াড়দের তাড়াতে হতো।

তাছাড়া হাডুডু, কানামাছি ও মার্বেল খেলার সময় পাল্টে যেত আমাদের রং। রঙগুলো এসে মনের কোনায় যেখানে ধানের জমি আছে, সেখানে ভিড় করে। সেই রং মেখে মায়ের পাশে চলে আসি।

বাবা দুই চাষ দিয়ে দুদিন ফেলে রাখে জমি। মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় পুকুরে নিয়ে লাই ভরা ধান ভিজিয়ে আনে। কাপড়ে ঢেকে বেড়ায় হেলান দিয়ে রাখে। পানি এক কোনা দিয়ে সরে উঠানে পড়ে আর ধানের সাথে রাতভর গল্প করে।

আমারও ইচ্ছে করে, এ রকম রাতে একটা বস্তা নিয়ে বের হই। আমি হাঁটব, পানি পেয়ে ধানেরা যেসব গল্প করে তা ওই বস্তায় ভরব। পরদিন সকালে বড় আমগাছটার নিচে বসে বস্তার মুখ খুলে দেবো। গল্প হুড়মুড় করে বেরুবে। পাড়ার সকলে অবাক হয়ে দেখবে একেকটি গল্পের মুখ। মনে ময়লা থাকলে তা মুছে যাবে। গল্প শুনে তারা এক হওয়ার কথা ভাববে।

আমি চলে যাব জমিতে। দেখব বাবা হাল চষছে। বাবার কাছ থেকে লাঙল নিয়ে চষতে থাকব। গরুর পিঠে হাত বুলিয়ে লেজ ধরে বোঝাব আমি এসেছি। গরু দুটি ফুর্তিতে হাঁটবে। দুই চাষ দেওয়া জমির মাটি নরম হয়ে গেছে। পাশের জলাশয় থেকে পানি দেওয়া হয়েছে। বাবা দিয়েছে এক চাষ। আমি আরো এক চাষ দিয়ে জমিকে মায়ের মনের মতো করে ফেলব। জমি হাসবে, শালিক ও ফিঙে উড়ে এসে বসবে গরুর পিঠে। পাখির ডাক শুনে দুপুরের রোদ কেঁচোর মতো কাঁপবে। লাঙল কাঁধে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরব। জলাশয়ে গরু গোসল করিয়ে আমগাছতলে বেঁধে খড় দেবো।


মানুষের জীবন বৃষ্টির ফোঁটা। এই এল, এই মিলিয়ে গেল। মাটিতে কত মানুষ মিশে আছে! 


বাছাই করে সেরা ধানগুলো নেওয়া হয় বীজের জন্য। প্রথম দিন সন্ধ্যায় মা ও ভাবি লাইয়ে ধান নিয়ে পুকুরে ডুবিয়ে রাখে। সারা রাত ভিজে। পরদিন সকালে তোলা হয়। তুলে তেরছাভাবে লাইটা ঘরের পাশে এক জায়গায় রাখা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় আবার ভেজানো হয়। এভাবে করা হয় চার দিন। পঞ্চম দিন সকালে দেখি ধানে গেঁজ বেরিয়েছে—কিছুটা শাদা ও ফ্যাকাশে। তলার দিকে থাকা গেঁজ লাইয়ের ফাঁকে-ফোকরে ঢুকে যায়। পঞ্চম দিন গেঁজওয়ালা ধান পরিষ্কার জায়গায় রেখে আলাদা করা হয়। এরপর লাইয়ে ভরে নেওয়া হয় জমিতে।

সকালেই আরেকটা চাষ দিয়ে জমি নরম করা হয়। আমাদের কাউকে বসিয়ে মই দেওয়া হয়। জমিকে সমান কয়েক ভাগে ভাগ করে পানি যাওয়ার জন্য মাঝখানে ও দুই পাশে ছোট নালার মতো করা হয়। হাতঝাড়া পিঠার কাই কড়াইয়ে ছিটানোর মতো বাবা জমিতে বীজ ছিটিয়ে দেয়। শুরু হয় নতুন গল্প।

গল্পের পুকুরে নেমে ঝুপঝুপ ডুব মারি। পানি পাড়ের সাথে বাড়ি খায়। ইচ্ছে হয় ডুব মেরে পুকুরের তলে যাই। মাঝেমধ্যে রহস্যময় জগৎ দেখতে ইচ্ছে করে। মার সামনে পিঁড়িতে বসি। মা ভাত বাড়ে। পুকুরের হাঁইচ্চারায় করা কচু ইছে শুঁটকি দিয়ে রান্না করেছে। গোগ্রাসে গিলতে থাকি। পরিশ্রম করে এসে খাওয়ার মধ্যে অনেক সুখ। এখন সবকিছু ভালো লাগছে। ভালো লাগা থেকে ঝিমুনি আসে। পাটি বিছিয়ে সামনের ঘরে শুয়ে পড়ি। আহা ঘুম! ঘুমের মধ্যে গরুর মতো হেঁটে কোথায় চলে যাই জানি না।

১১.
নানার নাকের পাশে বড় একটা তিল আছে। সেই তিল এক রাতে উড়ে এসে নানির মনে বসেছিল। তারও প্রায় নয় মাস পর মার জন্ম। শৈশবে নানির কোলের কাছে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শুনতাম এই গল্প। গল্প শুনে ঘুম ভেঙে যেত।

গল্পের মোড় ঘুরিয়ে নানি বলত, বানর প্রথমে ডেফল খেল, তারপর নারকেল। খাওয়ার পর বলে, ডেফল সুফল, নারকেল অতি টক। আসল ঘটনা হলো, ডেফল খুব টক আর নারকেলের স্বাদ তো সবাই জানি। কিন্তু বানর বুঝতে পারে নি।

আমরাও অনেক কিছুর স্বাদ বুঝতে পারতাম না। নানি বুঝতে পারত। বলত, তোর মা ছিল সুন্দর একটা শালিক।মা কিছুটা বেঁটে। তাকে দেখে ‘অগাধ ধৈর্য’ ব্যাপারটা বুঝি। বাবার মধ্যে গোয়ার্তুমি, গালাগালি আছে। মাকে তা সইতে হয়। বড় ভাবি তার ছায়া হয়ে উঠেছে। জামাইয়ের কর্মহীনতা ভাবি নিজের কর্ম দিয়ে ঢাকে।

মা-ও কর্মঠ, ছোট ধারাল দা’র মতো। মা যেন গল্পের মহিষ। মাথায় সংসারের ভার নিয়ে বসে আছে। সর্বংসহা শব্দটা কি মায়ের জন্যই এসেছে!

বাবা সারা দিন কিছু না কিছু করে। তার কথা বলতে গেলে প্রথমে চোখ দুটার কথা বলতে হবে। লাঙলের ফলার চেয়েও ধারাল সেই চোখ। বড় ভাইকে নিয়ে তার মিশ্র অনুভূতি। মেজ ভাই তোফেল লজ্জা আর কর্মী বলে সেজ ভাই মঈনকে ভালোবাসে। তার বেশি ভালোবাসা ফজার জন্য।

ফজার চুলগুলো যেন বস্তা সেলাই করা সুচ। হাল চষার সময় লাঙলের ফলায় মাটি দুই ভাগ হয়ে বড় চলদা ওঠে। তার চুল ওই চলদার মতো। ছোটকালে সে তুচ্ছ কারণেও গোয়ার্তুমি করত। এ জন্য কত মার খেয়েছে! মনা ভাই বলত, এ বেটা বড় হলে ডাকাত হবে। তার কথা এক অর্থে সঠিক। বলতে গেলে সে ডাকাতই। ডাকাতি করে জমি থেকে বেশি ফসল আদায় করে।

মনা ভাই অনেকটা এ রকম—আমি মিলি তার সনে। তার মতে, মানুষের জীবন বৃষ্টির ফোঁটা। এই এল, এই মিলিয়ে গেল। মাটিতে কত মানুষ মিশে আছে! তার একটা দোষ, সে উপার্জন করে না। তবে কাউকে ডিস্টার্বও করে না। মাঝে মধ্যে এসে মাকে বলে, আঁই চনা মনা, আঁরে ভাত দঅনা।

শ্রাবণ মাসের মেঘের চোখ জলে টুপটুপ। যেকোনো মুহূর্তে বড় বড় ফোঁটা পড়বে। হঠাৎ মেঘ ফেটে বেরিয়ে আসে রোদেলা বিকাল। চমৎকার এক আলোয় ভরে যায় চারপাশ।

দুটি ফিঙে ঝগড়া করছে। একটার ঠোঁটে পোকা, আরেকটা তা কেড়ে নিতে চায়। ওটা মুখ বাঁকিয়ে গিলে ফেলে নদী পেরিয়ে উড়ে যায়। ওপারে চরে ছয়-সাতটা কুকুর নানা ভঙ্গিতে বসে আছে। হালদার পানিতে ফিঙের ছায়া পড়ে। একটা কুকুর তা দেখে চোখ নাড়ল।

বিকাল এখন বীজতলায় খেলা করছে, মিশে যাচ্ছে বৃষ্টিমাখা মাটিতে। বিকাল লাল গরুটার মুখে জাবর কাটছে।বীজতলার মাঝখানে কাঠিতে প্লাস্টিক উড়ছে। কয়েকটা কাঠিতে দাঁড় করানো হয়েছে খড় দিয়ে বানানো আধখানা মানুষ। মানুষ দেখে পাখি কাছে আসবে না। জালা ফেলার পর কয়েকদিন পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। ভাডুই কিংবা বাবুই পাখির ঝাঁক আসে। ঝাঁক পড়লে চারার পাতা একটাও রাখবে না।

তেঁতুলগাছটা কুঁজো বুড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কাণ্ড ও ডালপালার বিস্তার দেখেই বয়সের ভার বোঝা যায়। এখন ঝকঝকে তার পাতা।


নানিটা অদ্ভুত। যখন শান্ত থাকে মনে হয় কাদামাটি। ইচ্ছেমতো নাড়ি-চাড়ি, খেলনা গাড়ি বানাই, বলের মতো ছুড়েও মারি।


তেঁতুলপাতা দেখে মন চলে যায় নানাবাড়ি। বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা আসে। রাস্তায় কী কাদারে বাবা! সন্ধ্যা যেন কাদা মেখে পথে পড়ে আছে। সেখানে আবার গরু-ছাগলের শত শত পায়ের ছাপ। হাতির বিল থেকে গরুগুলো চরে ফিরে এসেছে। বিশাল বিল দেখে ভয় লাগে। বিলের চারপাশে অনেক টিলা। একেকটার একেক নাম। যেমন শিরনি খাওয়া টিলা, ছু টিলা, পোড়া টিলা।

নানাবাড়ির অদূরেই বাঘবন। নানার বাবার আমলে এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলে আসত বাঘ। তখন থেকেই এর নাম বাঘবন। এখন জঙ্গল তেমন নেই, আছে টিলা। কয়েক বছর আগে টিলায় মেহগনি, ইউক্যালিপটাস ও এই জাতীয় কিছু কাঠের গাছ লাগিয়েছে বনবিভাগ। নানা বলত, ‘একটা গাছ একটা পোলা’ স্লোগান দিয়ে স্বৈরাচারী সরকার মানুষের মধ্যে লোভ ছড়িয়েছে। ফলে বেশি পানি খাওয়া বিদেশি গাছে সয়লাব হয়ে গেছে গ্রাম। বাঘবন পেরিয়ে নানার বাড়িতে ঢুকি। বড় শিংওয়ালা বৃষটা নাক ঝাড়ছে। রাত বাড়ে, কারেন্টও চলে যায়। আমরা বলি, নানি কিস্তে কও।

নানি বলে, কিস্তে মিস্তে নারকেলের ছোবড়া।

নানিটা অদ্ভুত। যখন শান্ত থাকে মনে হয় কাদামাটি। ইচ্ছেমতো নাড়ি-চাড়ি, খেলনা গাড়ি বানাই, বলের মতো ছুড়েও মারি। নানি উপভোগ করে। কোনো কারণে রেগে গেলে আমরা একেবারে চুপ। নানি তখন ধারাল বঁটি হয়ে যায়। চোখ দুটা হয় ঝগড়াটে বিড়ালের মতো।

নানি কিচ্ছা না বলে আনারস কেটে দেয়। বড় মামা মানিকছড়ি গিয়েছিল। এক ডজন আনারস এনেছে। জলডুয়া আনারস দেখলেই শাহ সাহেবের ওরশের গয়াল অথবা হেলেদুলে চলা গাভিন গরুর কথা মনে পড়ে। ইয়া বড় একেকটি আনারস। চোখ কম থাকে, খেতে স্বাদ, তবে হালকা টক। ফজার পছন্দ দেশি আনারস। সে বলে, দেশি আনারস হচ্ছে কম বয়সী বৃষ। চোখ বেশি হলেও রসে টুসটুস। এর স্বাদ হাড়ে পৌঁছে যায়।

ভাত-টাত খেয়ে সামনের ঘরে আসি। রাত আরেকটু বেড়েছে। নানি জুত করে বসে। বুঝতে পারি গল্প বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।


৭ম পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)