হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ২৫

অন্যজন : ২৫

অন্যজন : ২৫
133
0

২৪ পর্বের লিংক


পর্ব- ২৫

৪৫.
মাটির গন্ধ ফজার নাকে সুড়সুড়ি দেয়। সে মনে মনে বলে, নাই কিছু আর/ এই মাটিতে খাঁটি করো মন আমার। মনা ভাই প্রায় গুনগুনিয়ে এটা গাইত।

জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ। কৃষকেরা বীজধানের জমি তৈরিতে ব্যস্ত। দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। চাষ দিয়ে রাখা জমিনে আসমানের ছায়া। সে বসে আছে আসমানের দিঘির পাড়ে। জমির আল ছেঁটে সুন্দর করা হয়েছে। ভাবে, চাষ না করলে জমির সৌন্দর্য থাকে না। চাষে জমি হয় চুল ছাঁটা বালক।


স্বপ্ন তো সবুজ পাখি। বীজতলার আলে বসে সুর বুনছে।


বীজতলায় ধানের চারা বাতাসে দুলছে। তার মনও দোলে। ভাবে, আমিন ভাই বিদেশ যেতে পারলে ভালোই হবে। চাষ করে আর কদ্দুর? বিদেশে গিয়ে টাকা কামাতে পারলে কিছু একটা করা যাবে। একটা খামারবাড়ি ও ফলের বাগান মনে উঁকি দেয়। স্বপ্ন তো সবুজ পাখি। বীজতলার আলে বসে সুর বুনছে। বিলে, জলে, আকাশে সুর ছড়িয়ে পড়ে। এ বিকাল তার ভালো লাগে।

সন্ধ্যায় দেখা হলে ছালাম বলে, ওয়া ফজা, খবর কী?

ফজা হাসে। ছালাম মুখ নাচিয়ে বলে, আছে গরু না চষে হাল/ দুঃখ যায় না সর্বকাল।

ফজা হেসে বলে, এখন ট্র্যাক্টর এসে গেছে।

টেক্সির গ্যারেজের পাশে বাঁশের টুলে বসল তারা। ছালাম বলে, বুঝেছিস? একবার চাষা হয়ে গেলে অন্য কিছু আর ভালো লাগে না।

মন ভালো থাকলে ছালামের মুখে ধানফুলের হাসি খেলা করে। বলে, একটা ধান আছে, কান্তা ইরি, স্বর্ণলতাও বলা হয়। বাবুনগরের হাশেম ওই দিন বলেছে কানিভুঁই এক শ থেকে এক শ বিশ আড়ি হয়। সুঁইয়ের মতো চিকন ধান। গাছ বেটে, চাল একটু লালচে, ভাত সুস্বাদু।

এক ঝাঁক টিয়ে সন্ধ্যাকে ডানায় নিয়ে উত্তর দিকে ওড়ে যায়। এই উড়ায় একনাগাড়ে সম্ভবত চার-পাঁচ মাইল চলে যাবে। ওরা কোথায় যায় তাও এক রহস্য।

ফজা হলো নদীর চরের মতো। একদিকে ক্ষয় হলে আরেকদিকে ভরাট হয়ে যায়। তাই তার মন ভাঙে না। চাষাবাদকে সে ঢোলের মতো বাজাতে পারে।

সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবার কথা ভাবে। বাবার পা থ্যাবড়া। পানি আর প্যাকে পায়ের পাতায় ছোট ছোট গর্ত। গর্তগুলো মিলে ডিজাইন হয়েছে। পা যেন মাটির মোজাইক। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গেলে পেছনের সারিতে বসে বাবার পা দেখে।

সে জিজ্ঞেস করে, বেগমপুরী ধান আছে?

ছালাম বলে, নাম শুনেছি।

পরশু গাড়িতে কয়েকজন বলল, আনোয়ারার দিকে নাকি ধানটা করে। জমি চাষ দেওয়া হয় না। ধান কেটে ফেলার পর ওটার গোড়ায় রোপণ করা হয়। তিন মাস পর ধান চলে আসে।

মাথা চুলকে ছালাম বলে, এ রকম চাষের কথা তো শুনি নি। তারপর হেসে বলল, কালো ছাগলটার শিং ভেঙে গিয়েছিল। কাঠি ছেঁচে লাগিয়ে দিলাম। সুন্দর করে রংও করলাম। হাটবারে সন্ধ্যায় নিয়ে গেলাম বাজারে। আট শ টাকা দিয়ে কেনা ছাগল পনেরো শ টাকায় বিক্রি করেছি।

কালাইয়ের বাপ বলে, সপ্তাহখানেক আগে গোস্ত কিনতে গিয়েছিলাম। হাড্ডি ছাড়া গোস্ত দেবে, আড়াই শ টাকা দরদাম হলো, নিলাম। একটা দোকানে গিয়ে মেপে দেখি দুই শ গ্রাম কম। গোস্তের মাঝখানে লুকানো একটা হাড্ডি। আবার গেলাম তার কাছে। আকবর, বিশ হাতের মধ্যে গোস্তের ওজন দুই শ গ্রাম কমে যায়, না? দেখি, গোস্ত মাপ আরেক কেজি। আগেরটা রেখে ওটা নিয়ে হাঁটা দিলাম।

টুলে বসা ড্রাইভার মোবাইল টেপাটেপি করছে। বলে, এমনিতে মানুষ রঙেচঙে থাকে। ড্রাইভারের জায়গায় বসলে এসব চলে না। তখন আমাদের আঠারো চোখ।

ড্রাইভার কেন এ কথা বলে ছালাম বুঝতে পারে না। মনে মনে বলে, আঠারো চোখের জন্যই তো এই অবস্থা। গাড়ি চালানোর সময় বড় গাড়ির তলে ঢুকিয়ে দিস।

ঘরে গিয়ে ফজা শোনে, বাম্বুর বউ নিজেকে রানি বানিয়ে বকবক করছে। তার বাপ নাকি জমিদার। মা তার বড় জা। মায়ের দিকে তেড়ে গিয়ে বলে, তোরা পোড়া কপালি, তোদের চোখে আঠা নাই, তোদের কপালে ঝাঁটার বাড়ি।

আমাদের চৌদ্দগুষ্টিকে ধানের চারা বানিয়ে তাদের জমিতে রুয়ে দেয়। কেউ রা করতে পারে না। করলেই আরো জোরে ছুটবে তার মুখ। মা ভাবে, তার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। কে বেইজ্জত হবে? বলবলা যখন বেড়েছে, বলুক, বলে ক্লান্ত হোক। আল্লাহ একজন আছে, সবকিছুর বিচার করবে।

রানির মুখের সঙ্গে কেউ পারে না। তাই ভাবি মনে মনে বুদ্ধি ভাজে। বুদ্ধি দিয়ে উঠানে খেজুরগাছের কাঁটায় রানির ধারাল জিহ্বাটা লটকে রাখতে পারলে বেশ হতো। আমগাছে দোয়েলটা কিচকিচ করে। ভাবি একটা দৃশ্য ভাবে, রানি বোবা হয়ে তেঁতুলতলায় বসে আছে।

ওওও শব্দে বাম্বুর বউয়ের কথা বলতে গিয়ে মঈনের মুখ থেকে লালা ছিটকে পড়ে ফজার হাতে। তার মুখে সবসময় লালা থাকে। ডান হাত লোলা। তবে বাম হাতের সুনাম করতে হয়। আর বুদ্ধিও কম না—সব বোঝে। জমিতে ফজার সঙ্গে সবসময় থাকে। এটা ওটা এগিয়ে দেয়। অবসরে কারেন্ট নিয়ে মেতে থাকে। জং ধরা লাল প্লাস হাতে হাঁটে, সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায়। প্রতিদিন বিকালে লাল গাভীকে চরাতে নিয়ে যায়।

রাত বাড়তে থাকে। কোনো একটা কথায় মা ভাবিকে বলে, মঈনকে পাওয়া জিনটা ছিল বদের বদ।

বৃষ্টি পড়ছে। গেঁজানো ধানবীজের গন্ধ পায় তারা। কাল সকালে জমিতে ফেলা হবে।

ভাবি হয়তো ভাবে, কাল সকালে যখন রোদ লম্বা হবে, তার স্বামী শালিকের মতো বীজতলার আলে দাঁড়িয়ে থাকবে। ফজা ও আমিন মই দিয়ে মাটি সমান করবে, বাবা বীজ ছিটাবে।

তখন ধান রোয়া, কাটা, নতুন ধানের পিঠা—এসব মনের মধ্যে খেলা করতে পারে। ধোঁয়া ওঠা ভাত, শিরনি কিংবা নানারকম পিঠার গন্ধও পেতে পারে। হয়তো নতুন ধানের খড়ে ছোটরা লুকোচুরি খেলবে। অন্যদল খড় এলোমেলো করে তাদের খুঁজবে। মঈনের হাত ভালো হয়ে যাবে। সে কথা বলতে পারবে। খড় উল্টিয়ে লুকাবে, দাদির কাছে শোনা ‘আমার পরাণ পাখি তুই উইড়া উইড়া বেড়ারে’ গাইবে। ‘কুলুক’ বলবে। লাগা এবার দেবেই। খেলায় জিতে দৌড়াবে। স্কুলের মাঠে বিস্কুট খেলা হবে। মুখে বিস্কুট নেওয়ার জন্য সে লাফাবে।

মঈন বাম হাতে ভাত খাচ্ছে। ভাবি তার লোলা ডান হাতের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিল।

কারেন্ট চলে যায়। চেরাগ জ্বালানোর সাথে সাথে নকল রানি অর্থাৎ বাম্বুর বউয়ের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তার ফাঁকাফাঁকি, বাঁকানো মুখ, মোটা শরীর—সব নাকি লেদা পোকা হয়ে গেছে। এ কথা বলে ফজা রসিকতা করে, চলো সবাই কচুগাছের সাথে ফাঁসি খাই।


কারো কাঁচা আলে পা দিই না, পাকা ধানে মই দিই না, আল্লাহ আল্লাহ করে নিজের মতো চলি, তবুও মানুষ গুঁতায়।


তারেক তখন মিথ্যা মিথ্যা কচুগাছ এনে দেয় আর ফজা ফাঁসি খাওয়ার ভঙ্গি করে। হয়তো জিন্না টুপি পরা বাম্বুর শ্বশুরের কথা তার মনে পড়ে। লোকটা আতর মাখা তুলা কানে গুঁজে মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসেন।

গল্পদাদা দুষ্টুমি করত, রানি সাহেবা বেশি বকর বকর করলে কী করবি জানিস? সবাই তার কাছে যাবি, গিয়ে একসাথে বায়ু ছাড়বি।

ফজার মনে পড়ে সেই কথা। কথাটা বলে। সবাই হাসে। সেও হাসতে হাসতে ভাইপোর গায়ে গড়াগড়ি খায়।

৪৬.
আমি, পরেশ, মঈন ও ফজা শ্রেণিকক্ষের এক কোনায় হাতগুটি খেলছি। ইট দিয়ে এঁকে ছয়টি করে বারোটি গর্ত বানিয়েছি। এ সময় আলী আকবর স্যার বেত নাচিয়ে আসেন। ছাত্রছাত্রীরা দ্রুত বসে যায়।

ক্লাসে ঢুকেই স্যার বলেন, খাতা খোল। আইজ তোগোরে কমার ব্যবহার শিখামু। পেছনে কে একজন কথা বলেছে। স্যার ধমকান, এই চুপ, মনের ভিতর পুডি মাছ লাফাই নি? টেবিলে বেতের বাড়ি পড়ে। সবাই লেখে : এখানে পেশাব করিবে না, করিলে জরিমানা দিতে হইবে। স্যারের চক বোর্ডে নড়াচড়া করে, দ্যাখ, কমাটা যদি ‘করিবে’র পাশে লাগাই, কী হইবু?

সবাই জোরে বলে, এখানে পেশাব করিবে। তারা মুখ লুকিয়ে হাসে। স্যার তাদের এক পায়ে টুলের উপর দাঁড় করান।

একটু পর তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে কতগুলো সৈন্য। তারা স্যারকে বেয়নেটের গুঁতা মারার ভয় দেখিয়ে বলে, দেখি তোমার ঐতিহ্যের কথা বলো।

ঠোঁটের কোনা বাঁকিয়ে স্যার বলেন, বাসা থেকে আসার সময় দেখলাম পঞ্চাশ-ষাট গজ লম্বা শাড়ি বাতাসে উড়তাছে। চিলা ঘুড়ির মতো শোঁ শোঁ আওয়াজ। শাড়ি দেখে আমিনের বাপ কয়, মাস্টর, অনেরে ডাবুস, লেন্ডেন, কুলাহাঁফা আর বাক্স ঘণ্টি বানাই দিয়ুম। আমার হঠাৎ মনে পড়ে, আরে, এ তো মসলিন। কত সুক্ষ্ম! আঁচলায় সোনা-রূপা ও সিল্কের কাজ দেইখা আরাম লাগে।

আমাদের দিকে চেয়ে স্যার বলেন, তারপর কী হইল জানিস? মসলিনের কারিগরদের হাত কাইটা ফেলল হারামজাদারা। হায়রে দুঃখ। এরপর সৈন্যদের দিকে আঙুল তুলে বলেন, শয়তানদের জন্যই এই অবস্থা।

স্যারের চোখ দুটা জ্বলছে। যেন রাগী মহিষ, এখনই গুঁতা মারবেন। কিন্তু সৈন্যদের বেয়নেটের আঘাতে তার শিং ভেঙে যায়। তারা শিয়ালের মতো হুক্কাহুয়া করে আর স্যার ভাবেন, একটা মহিষ পেলে ওটার পিঠে চড়ে চলে যাব।

এক সৈন্য আমাদের বলে, তোমাগো লেবেনচুস খাওয়ামু।

আরেকজন ব্ল্যাকবোর্ডে রাজার ছবি আঁকে। তাই আলী আকবর স্যারের প্রয়োজন পড়ে না। দেবাশীষ স্যার এসে লাঠি ও তির-ধনুক আঁকানো শেখাবেন, তারও উপায় নেই। খবর পেয়ে তিনি বাড়ির পথ ধরেছেন। শর্ষের তেল মেখে পুকুরে ঝুপঝুপ ডুব দিলেও মন শান্ত হয় না।

পরদিন ছাত্রছাত্রীরা এসে দেখে, ব্ল্যাকবোর্ডে কচুপাতা দিয়ে আঁকা এক রাজা, মুখ বাঁকা করে পায়খানা করছে। তার সামনে ছিদ্রযুক্ত লোটা। লোটা থেকে পানি পড়ে যাচ্ছে আর সৈন্যরা অবাক চোখে রাজার হাগু দেখছে।

সবাই হাসে। তাদের অট্টহাসিতে আমিও যোগ দিই। হাসতে হাসতে ঘুম ভাঙে। বাবার চিৎকার শুনি। বলছে, কারো কাঁচা আলে পা দিই না, পাকা ধানে মই দিই না, আল্লাহ আল্লাহ করে নিজের মতো চলি, তবুও মানুষ গুঁতায়।

একটু পর বুঝতে পারি, বাম্বুর কথা বলা হচ্ছে। আমার আলসেমি মুহূর্তেই চলে যায়। ইচ্ছে করে, বাম্বুর নাকটা ভেঙে দিয়ে আসি।

এবার দিনাজপুরি পাইজামের চাষ হবে। তিন কানির জন্য তিন আড়ি বীজ ফেলা হয়েছে। সাধারণত এক কানিতে বারো-তেরো কেজি লাগে। প্রায় দেড় হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। পাশের জমি থেকে মাটি কেটে আরেকটা জমি ভরাট করা হচ্ছে। ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হবে। মাটি কাটা জমিতে পানি জমেছে। ওখান থেকে পানি সেচে তৈরি করা হয়েছে বীজতলা। জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এখন আষাঢ়ে প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি নাই, তাই চাষারা চিন্তিত।

চাষ থেকে অনেকের মন উঠে যাচ্ছে। চার শ টাকা করে মানুষ। তিন বেলা ভাত, দুই বেলা চা, এক প্যাকেট বিড়ি। কত টাকা পড়ে? পাঁচ শ সাড়ে পাঁচ শ টাকা খরচ হয়। তাছাড়া কানিভুঁই বিশ কেজি করে তিনবার ইউরিয়া দিতে হয়। আগাছা বাছা, কীটনাশক দেওয়া, কামলা—সব মিলে কানিতে প্রায় সাত হাজার টাকা খরচ পড়ে। এতে পোষায়?

গতকাল লাঙল কেনার জন্য বাবা বিবিরহাট গিয়েছিল। প্রায় পাঁচশ টাকা লেগেছে। জোয়াল একটা চেয়েছিল। দাম বলেছে আড়াই শ।

গাড়িতে বুড়া লোকটা বকবক করছিল, মানুষকে গোঁয়ার হতে হয়, না হয় চলা যায় না। একটু পর জায়গা পেয়ে পেছনের সিটে বসে। পাশের লোকটাকে বলে, সব কিছু চাষের নিচে।

কয়েকজন অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়।

বুড়া বলে, ঠিক কথাই বলছি। নিজের চাষ, নিজের মতো করে খাওয়া, নির্ভেজাল সব। এতে মজাই আলাদা।

বাড়ি এসে বাবা বুড়ার কথা আমাকে বলেছিল। আমি বলেছি, হাটহাজারীর বুড়াটা ভালো লাঙল বানায়। ওর কাছে না গিয়ে বিবিরহাট কেন গেছ?

এখানে কাজিরহাট থেকে লাঙল আসে। কাজিরহাটের লাঙলও ভালো।

লাঙলের কথা ভাবতে ভাবতে মন অন্যদিকে সরে যায়, মাটি থেকে আলগা হতে চায়। দাদি থাকলে হেসে বলত, একটা হাড়, চারদিকে মাংস। ভেঙে দে।

আমি বলতাম, খড়ের গাদা।

দাদি ছেঁচা পান মাড়ি দিয়ে চিবিয়ে বলত, ধানগাছের বয়স বিশ থেকে পঁচিশ দিন হলে দেখতে কেমন লাগে? এমন সবুজ হয়, মনে হয় জোয়ান মেয়ে তার ভালো লাগা পুরুষের দিকে তাকাচ্ছে। তোর জন্য ধানের চারার মতো সুন্দর একটা মেয়ে আনব।


গর্ভবতী নারীর মতো যে মাটি, তার কাছে নত হব।


আমি চুপ থাকতাম। দাদি বলত, শোন, চাষ হাউস না, চাষ হলো শরীরের ভেতরের রক্ত।

ছালাম ভাই হলে বলত, বিদেশ গেলে যাবি, তা নিয়ে অত ভাবনা কী? আচ্ছা বল তো, আমাদের এদিকে সেরা চাষা কে?

আমি কিছু বলতাম না। ফজা বলত, কে আর, সাহাব মিয়া।

তাই নাকি? কালাইয়ের বাপ জানতে চাইত। তারপর মাথা নেড়ে বলত, এই তো কামলা এসেছে। সকাল থেকে কাইচ কাটবে, হাল চষবে। বিকালে আর জমির গোড়ায় যাবে না। শুধু বেশি জমিনে চাষ করলে ভালো চাষা হওয়া যায় না।

ছালাম বলবে, অনেকদিন জমির সাথে, ধানের সাথে থেকে বুঝেছি মানুষও ধানের চারার মতো।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার ভেতরটা কাদামাটিতে ভরা। হাল চষে জমি থেকে উঠে এলে বাবার গায়ে যে গন্ধ, তা নাকে আসে। তার কথা ভাবলেই কার্তিক মাসের কথা মনে পড়ে। কিছু ধান পেকেছে, কিছু কাঁচা—এ এক অন্য রূপ।

রোদ ও কুয়াশায় ধান পাকতে থাকে। পাকা ধানের গন্ধের মতো কোনো গান আছে? সেই গানের সুর কেমন? তা কি বাবার মতো? নতুন ধানের গন্ধ হয়তো আমাকে জাগিয়ে দেবে। উৎসাহে মাটির কাছে যাব। গর্ভবতী নারীর মতো যে মাটি, তার কাছে নত হব।


শেষ পর্ব আগামী শনিবার 

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)