হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ১৮

অন্যজন : ১৮

অন্যজন : ১৮
147
0

১৭ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৮

৩১.
পুবের বিলে জমি তদারক করতে গিয়েছিলেন হান্নান শাহ বা বাম্বু। দুই পা ছড়িয়ে আলে বসে বাবাকে বলেন, আঁই অক্কল তরকারির বঅরপাতা (ধনেপাতা)।

লুঙ্গি হাঁটুর উপর তোলা। ছাগলদাড়ি নাড়েন, লম্বা ময়লা নখ দিয়ে হাঁটুর নিচে গছর গছর চুলকান। দাঁত-মুখ খিঁচানো। বলতে চান, সকল জায়গায় তিনি প্রয়োজনীয়।

আধা উপুড়, পিঠ-মুখ ভেজা, মরিচখেতে কোদাল চালিয়ে মাটি আলগা করছে বাবা। পেছনে মরা খাল। স্ল্যুইসগেট এখনো খোলা হয় নি, তাই রাগ প্রকাশ করে।

গল্পদাদা বলে, ডাক্তারের মুখ বন্ধ করা যায়? ডাক্তারের চাহিদা যেমন মিটানো যায় না, সরকারি লোকের খায়ও তেমনি মিটানো যায় না। স্ল্যুইসগেট যে চালায় তাকে টাকা দিতে হবে।

পৌষের শেষ। বেলা বারোটা। রোদের মাঝে কুয়াশাগুলো মিশে দুষ্টু বালকের মতো উঁকি দিচ্ছে। সন্ধ্যা হতে হতে ওগুলো তির হয়ে ছুটবে আর হুল ফোটাবে।

দাদার মতে, শীতে ভাপাপিঠার গন্ধ থাকে। তবে তার মতো বুড়ার কাছে শীত হলো মৃত্যুর গন্ধ।

রোদ দুপুর ছুঁয়েছে। গল্পদাদা লম্বা এয়াকুব জিয়লগাছে উঠে ঝিঙে পাড়ে। তাকে কেউ কেউ কিচ্ছার বাপও বলে। জোশ উঠলে একের পর এক কাহিনি বলা শুরু করে। কাহিনির রাজা মরে, মরা খালে কুমির এসে মানুষ খায়। পাশে কুমির স্কুল। তখন জোড়া আমগাছ ছিল না, বাবারা বাঁশের সাঁকো পার হয়ে বাল্যশিক্ষা হাতে স্কুলে যেত। স্কুল ছিল বেড়ার। মেঝেতে বসে লাইন ধরে পড়ত, অ-তে অজগর আসছে তেড়ে।


খেলোয়াড়রা দূরে দাঁড়িয়ে ভেংচি দেয় আর নাচে। বুড়ি মাথায় হাত দিয়ে শূন্য পুকুরে বসে থাকে।


অজগর সত্যি তেড়ে এসেছিল কিনা তা জানে গল্পদাদা। তবে অ আ চেনার বদলে তাকে চিনতে হয়েছে লাঙল, খেতখোলা।

দাদা ভাবে, হাতিয়ার ইলিশ শুঁটকির কথা বলবে। কিন্তু বলে যুদ্ধের কথা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানি বোমার ঠেলায় ব্রিটিশ সৈন্যদের তখন পোঁদের গুয়ে আছাড় খাওয়ার দশা। একদিন রেলস্টেশনে যাচ্ছি বড় ভাইকে আনার জন্য। আমার হাতে হারিকেন। হঠাৎ শাঁ শাঁ আওয়াজ, সাইরেনের গলা ফাটানো শব্দ। তাড়াতাড়ি হারিকেন নিভিয়ে বড় আমগাছটার তলে দাঁড়ালাম। ও বাপরে! একটু পর ফাটল বোমা। মনে হলো, গোটা দুনিয়া কেঁপে উঠেছে। অনেকক্ষণ দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে পড়েছিলাম।

আলে বসে বলে, দুনিয়ায় এখনো কত যুদ্ধ! আচ্ছা, যুদ্ধ শেষ হয় না কেন? বাম্বুর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, যুদ্ধ থেকে কখনো বেরুনো যাবে না।

মনার বাপের খেত কুপিয়ে দেবে কী না ভাবে। কিন্তু গল্পের ভেতর সে কলকাতা চলে যায়। একসময় জমিদারের ঘোড়ার গাড়ি চালাত। পেছনে মাতাল জমিদার বা জমিদারপুত্রকে নিয়ে গভীর বা শেষ রাতে মহলে ফিরত। পথে একটা শ্মশান পড়ে। ওই শ্মশানে মৃত স্বামীর সঙ্গে জীবিত বউকে পোড়ানোর কথা শুনেছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাকে ঘোড়ার লাদি সাফ করতে হতো। তখন বাইজি বাড়িতে তবলা বাজাতে ইচ্ছে করত। মনে হতো, তবলার অনেক শক্তি। তবলা ও নাচ দিয়ে জমিদারকে পায়ের নিচে রাখা যায়।

কিচ্ছার সত্য-মিথ্যা ঝুড়ি মনের ভেতর রেখে ফ্যাক্টরির মালিকের দোতলা বাড়ির দিকে তাকায়। তাদের আইকম ফেল একমাত্র ছেলে নাকি নেশা করে। দাদা বুকে হাত ঘষে। চৈত্র মাসের খরায় জমি যে রকম ফেটে যায়, এখন তার মুখভঙ্গি তেমন।

এ সময় উঠানে আমগাছের ছায়ায় দাদা ও তার ভাইয়ের নাতি-নাতনিরা হাতে হাত ধরে গোলাকার দাঁড়িয়ে পুকুর খেলার পুকুর হয়। ছোট্ট মেয়ে কুঁজো বুড়ি সেজেছে। হাতে লাঠি। আম, কাঁঠাল ও জামপাতার টাকা নিয়ে ঘোরে। ছোট পুকুরটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেমেয়েরা জিজ্ঞেস করে, অ বুড়ি বুড়ি কোথায় যাও? আমাদের পুকুরে আস।

বুড়ি বলে, তোমাদের পুকুর তো ছোট।

তারা ভালো মানুষের মতো বলে, টাকা দিলে বড় হয়ে যাবে।

বুড়ি আশপাশে আরো পুকুর খোঁজে। তার দোনদশায় চিন্তিত হয়ে পুকুরওয়ালারা মিষ্টি স্বরে আহ্বান জানায়। বুড়ি পুকুরটির কাছে যায়। পুকুরের ভেতর এক টাকা ফেলে, সামান্য বড় হয়। দুই টাকা ফেলে, আরেকটু বড় হয়। টাকার পর টাকা ফেলে, পুকুর বড় হয়।

এবার পুকুরে নামার পালা, ধাক্কা খাওয়ারও পালা। চারপাশে হাতের বাঁধা। একেকটা হাতে লাঠি ছুঁয়ে বলে, এদিক দিয়ে যাব।

সবাই বলে, কোদাল ছুড়ে মারব।

এদিক দিয়ে যাব।

বঁটি দিয়ে কাটব।

বুড়ি পস্তায়। টাকাগুলো উদ্ধার করার চিন্তা করে। পুকুরওয়ালারা সত্যি কথা বলছে, এমন ভঙ্গিতে বলে, দেখ বুড়ি দেখ, খড়ের গাদায় আগুন লেগেছে।

বুড়ির বুক কেঁপে ওঠে। আগুন দেখার জন্য দক্ষিণে তাকালে ওরা টাকা নিয়ে দৌড় দেয়। বুড়ি হায় হায় করে। খেলোয়াড়রা দূরে দাঁড়িয়ে ভেংচি দেয় আর নাচে। বুড়ি মাথায় হাত দিয়ে শূন্য পুকুরে বসে থাকে।

তাদের খেলা শেষ হয়। কিন্তু বড়দের খেলা শেষ হয় না। গল্পদাদার নিজেকে মনে হয় অচিন কোনো পাখি। মাথায় জড়ানো গামছায় মুখ মুছে সূর্যের দিকে তাকায়।

রোদের তেজের কারণে ছাতার কথা ওঠে। বাবা ছাতা ছিঁড়ে যাওয়ার কথা জানায়। তখন দাদা তার ভাই ছাতা মিস্ত্রি আবুর কাছে যেতে বলে।

তাদের পায়ে বাঁশঝাড়ের ছায়া। ছায়ার মাটিতে আঁকিবুঁকি কেটে দাদা বলে, গত বছরের কথা। হাটবারে আবু কালা মুন্সির হাটে গেছে। পল্লী বিদ্যুতের খাম্বার নিচে বসে ছাতা সেলাই করে। ঘরের পাশের দৈত্যাকার ধানমারাগাছ, বাঁশঝাড়, খালপাড়ের বড় জামগাছ সেলাইয়ের ফোঁড়ে ঢুকে যায়। সেলাই মজবুত হয়।

রাতে কী হলো জানো? কারিগর হাট থেকে ফিরছে। ডান কাঁধের থলেয় চাল, বাম কাঁধে গাটরি। বাম হাতে ছোট ছোট দুটা ইলিশ, ডান হাতে হারিকেনের আলো বাতাসে কাঁপছে।

মাছের গন্ধ পেয়ে কোত্থেকে একটা মেছোভুত আসে। সে ভিক্ষুক সেজে বলে, আঁমাকে এঁকটু মাঁছ দেঁবে?

এক লোক উদবাত্তি জ্বালিয়ে হালদা নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল। লোটাভর্তি মাছে মেছোভুতের নজর পড়ে। লোকটা দয়া দেখিয়ে একটা মাছ দিয়েছিল। ভুত লোটার সব মাছ খেয়ে ফেলে। মাছ না পেয়ে শেষে লোকটাকেই খেতে চায়। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। জ্ঞান ছিল না, নাকে-মুখে ছিল ফেনা। মনে আছে সেই ঘটনা?

শ্রোতারা মাথা নাড়ে। দাদা বলে, মেছোভুতকে কখনো মাছ দিতে নাই।

চাঁদ গাজী সিকদার বাড়ির পাশের বিল দিয়ে আবু যাচ্ছে। উঠানে বসা চাঁদ গাজী সিকদার একটা শেয়ালকে দৌড়ে যেতে দেখেন। জলিল ও জানাউল্লা সিকদার তার পাশে বসা। তারা জমি কেনার বিষয়ে আলাপ করছেন।

বিলে আবু একা। ভুত তার দিক ভুলিয়ে দেয়। সে ভাবে, কখন বাড়ি পৌঁছব? ধুকপুক করা কলিজা ডাঙায় তোলা রুই মাছের মতো আছাড় খায়। সে ঘোরের মধ্যে পড়ে। দেখে, আলোর অনেক পর্দা। একটার পর একটা পর্দা সরিয়ে ভুতের বাজারে ঢোকে। সবাই হাসতে হাসতে রসগোল্লা খাচ্ছে। সেও গরম রসগোল্লা খায়। খেয়ে মাথা আউলা হয়ে যায়। নিজের চুল ছিঁড়ে। ভুতের মা এসে বলে, মঁনের পোঁকা ফেঁলবে? আঁমার বাঁড়ি আঁস, পোঁকা নিঁর্বংশ কঁরে দেঁব।


রাত তো জিনের চুলের চেয়েও লম্বা। ঘুরতে ঘুরতে হাড্ডি ভেঙে যাওয়ার দশা।


মিস্ত্রি দৌড়ে বিলে চক্কর দেয়। ভুতকে বলে, আমাকে চাঁদ গাজীর বাড়ি নিয়ে যাবি? ভুত বিলে মাছের কাঁটা ছিটিয়ে দেয়। আবু বলে, তোকে নিয়ে চাঁদ গাজীর বড় পুকুরে যাব।

ভুত বলে, আঁমাকে মাঁছ দেঁ, নাঁ হঁয় তোঁকে কাঁচা খাঁব।

কারিগর কাউকে ডাকতে চায়, কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। ভূুকে বলতে চায়, আমাদের একটা ভালো জাল আছে। পাঁচ-ছয় কেজি ওজনের কয়েকটা কাতলা মাছ ধরে তোকে দেবো। এবার ছেড়ে দে বাপ, আমি বাড়ি যাব। সারা দিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে। আঙুলের গিঁটে গিঁটে ব্যথা।

ভুতের অট্টহাস্যে অল্প সময়ের জন্য আঁধারটা সরে যায়। সে দেখে, ভুতের মুখে ইলিশ দুটা নড়ছে। তার মনে হয়, ভুতের হাসিটা খুব চেনা। একটু দয়া হলেও হতে পারে। কিন্তু ভুতের সহচর হিন্দি গান গায় আর নাকে নাফা লাগিয়ে তাকে ঘুরায়।

রাত তো জিনের চুলের চেয়েও লম্বা। ঘুরতে ঘুরতে হাড্ডি ভেঙে যাওয়ার দশা। শরীরে এতটুকু শক্তি নেই। হাঁটতে হাঁটতে মাছের কাঁটায় পা রক্তাক্ত।

সে কাঁদে। তার কান্না ঘরে অপেক্ষারত ছেলেমেয়েরা শুনে না। তারা ভাতের জন্য কাঁদে। খিদের কথা জানালে মা দা হাতে নেয়। এক কোপে যেন খিদেকেই কেটে ফেলবে।

কারিগর কেমন করে বাড়ি ফিরেছে, দাদা সেই কথা আর বলে না। কেননা তার পেটের ভুতটা ডাকছে। ভুতের ডাকে সাড়া দিয়ে বাড়ির পথ ধরে।


১৯ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)