হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ১৩

অন্যজন : ১৩

অন্যজন : ১৩
289
0

১২ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৩

২১.
মুন্না আমিনকে বলে, একবার একটা নাটক দেখেছিলাম। নাটকের তরুণী তার প্রেমিককে বলেছিল, আগে নিজের মনটা পাল্টাও।

মেয়েটা প্রতিদিন একটা করে ভালো কাজ করত। এভাবে ভালো কাজের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। কিন্তু একদিন উপলব্ধি করে, মন আর তার নিজের নাই, চুরি হয়ে গেছে। তার আশপাশে লোকজন রণপা লাগিয়ে হাঁটছে।

নাটকের একটা দৃশ্য ছিল এ রকম : কয়েকজন কৃষক নিজেদের কবর তৈরি করে সেখানে শুয়ে আছে। এ সময় একদল ডাকাত এল। তারা সবার হাত-পা বেঁধে, মুখে টেপ লাগিয়ে খেতের ধান নিয়ে যায়।

তরুণী শেষ ডায়লগে প্রেমিককে বলেছিল, অন্ধ ছুঁচোর মতো বেঁচে থেকে লাভ কী?

মুন্না বলে, মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, বেশিরভাগ মানুষ পর-মাথায় চিন্তা করে।

হালদার পাড়ে বড় শিমুলগাছের নিচে কাঠের তক্তায় তারা বসে আছে। অদূরে বটের ডালে একটা শকুন। নদীর ওপারে শ্মশানে আগুন জ্বলছে। একটু আগে খুলি ফাটার শব্দ পেয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে বলে, বুঝেছিস? প্রতিদিনই নাটক চলে।

মুন্নাকে নিয়ে ঘরে যাই। সে মাকে জিজ্ঞেস করে, চাচি, তুমি নাটক দেখ?

মা কিছু বলে না। আমাকে নিয়ে শৈশবে ফিরে যায়। চোখে চোখে রাখে। বেরুতে গেলেই ভয় দেখায়। বলে, চারদিকে ছেলেধরা বেরিয়েছে। খবরদার বাইরে যাবি না। কল্লাকাটনি কল্লা কেটে নিয়ে যাবে।

ভয়ে ভয়ে জানতে চাই, মাথা দিয়ে তারা কী করে?

পুল জোড়া লাগায়।


চুলার আগুনকে মনে হয় সাগরের ঢেউ। সেই ঢেউয়ে মার মুখ দেখি। তামাটে, অনেক ঝড়-ঝাপটা সওয়া।


আমরা শিউরে উঠি। ছেলেধরা হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মতো নয়। তারা বোরকা পরে ঘুরে বেড়ায়। ছেলেমেয়েদের চকলেট দেয়, নানা প্রলোভন দেখায়। সুযোগ বুঝে বস্তায় ভরে নেয়। কেউ কেউ বের করে জাদুর রুমাল। যার চোখের সামনে ধরে সে আলাভোলা হয়ে যায়। তখন ছেলেধরা যেদিকে যায় সেও সেই পথ অনুসরণ করে।

ঘরে বসে কোকিলের ডাক শুনি। কোকিল দেখতে মন চাইলেও বেরুতে সাহস পাই না। নিষেধের বেড়াজালে আটকে থাকি। তাই স্বপ্নের পুকুরে মাছ ধরা শিখি নি। মনা ভাই জাল মারা শেখাতে চাইলেও কিছু বলি না।

আকাশ ভরা মেঘ। বিকাল নাকি সন্ধ্যা বুঝতে পারছি না। চাচাদের ঘরে বসে সিনেমা দেখি। নায়ক গান গায় : সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই। গান শুনে মন খারাপ হয়। খালেদার কথা মনে পড়ে। তাকে ভালোবাসলে সুখী হতাম মনে হয়। আমি কী করলাম?

এরপর নাটক চলে। নাটকে আজিজুল হাকিম বাসে কোথাও যাচ্ছেন। বন্ধুকে বলেন, আয়নাতে নিজ মুখ দেখার কথা মনে থাকে না।

গাড়িতে একদল তরুণ তর্ক করে। তারা নাকি দুঃসাহসী অভিযানে যাবে। এবার তাদের বিষয় মুরগি। একজন বলে, দেশি মোরগ-মুরগির চিৎকারে পাড়া সরগরম থাকত। ফার্মেরগুলো শুধু খায় আর ঝিমায়।

আরেকদল বলে, দেশিগুলো নিস্তি, অর্থাৎ নোংরা। বিদেশিগুলো সুন্দর, নরম মাংস।

ও পক্ষ বলে, দুর্বলের সৌন্দর্য কচুপাতার পানি।

শাদা জোব্বা পরা ইয়া লম্বা এক লোক সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, তুই একটা হাঁদারাম, জীবন হাতে নেওয়ার সাহস নাই। হাত মুঠো করে বলেন, জীবন হলো তির। তারপর লাল-হলুদ রঙের একটা পাখি উড়িয়ে দেন। তিনিও উড়ে চলে যান।

মা কোথায় যেন যাচ্ছে। আমাকে দেখে হেসে বলল, অনেকদিন পর বেরুলাম।

তার হাসিটা ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা বাংলার মতো। দেখি, খোলা মাঠে ডাকাতেরা ফুটবল খেলছে। পরিচিত বিশালদেহী নাপিতটা ইশারায় সাবধান করে। কিন্তু তার আগেই তারা আমাকে ঘিরে ধরে।

একটু পর সর্দার আসে। করুণ স্বরে বলি, আমি একজন হতভাগা। কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সর্দার অন্যদের সরে যেতে ইশারা করে। এই ফাঁকে তার ঘাড়ে দা চালাই। সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায়।

গত রাতে মাটিতে ভাঙা পাটিটা বিছিয়ে শুয়েছিলাম। এখনো সকাল হয় নি। বাইরে রাতজাগা পাখি ডাকে।

সকাল হয়। ঢেঁকির শব্দ শুনি। ভাবি চাল গুঁড়া করছে। মুখ ধুয়ে এসে দেখি, ভাবির কাজ শেষ। রান্নাঘরে যাই। মা চিতই পিঠা বানাচ্ছে। খোলা থেকে পিঠা তুলে মা সেই সময়ের কথা বলল। তখন আমাদের মুদির দোকান ছিল।

মা বলে, তোর বাবা সকালে খালি পেটে বেরুত। বাজারে গিয়ে এক কাপ চা আর একটা রুটি খেয়ে দুপুর পর্যন্ত কাটিয়ে দিত। সেই তুলনায় তোরা কোনো কষ্টই করিস নি।

এক চামচ কায় খোলায় দিয়ে ঢাকনা দেয়। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, জীবনে আগুনের মতো হতে হয়, বুঝেছিস?

তখন আমি বেগুন ফুলের গন্ধ পাই। মনে হয়, জাহাজে বসে আছি। মা চুলে সাগরের বাতাস মাখছে। জাহাজের ডেকে একটা চুলা। চুলায় রুটি সেঁকি। মাকে খেতে দিই। মা কিছু খায়, কিছু গাঙচিলের দিকে ছুড়ে দেয়।

চুলার আগুনকে মনে হয় সাগরের ঢেউ। সেই ঢেউয়ে মার মুখ দেখি। তামাটে, অনেক ঝড়-ঝাপটা সওয়া। খুব ভালো লাগে। ইচ্ছে করে, জোরে জড়িয়ে ধরি।

এ সময় ফজা এসে হাতা থেকে পিঠা খেতে শুরু করে। মা নিতে মানা করে।

কেন?

হাতা থেকে নেওয়া ভালো না।

অসুবিধা নাই।

মা খন্তি দিয়ে মারার ভয় দেখায়।

ফজা হেসে দূরে সরে যায়। গরম পিঠা খেয়ে বলে, মা, পিঠা দারুণ হয়েছে। আজ আমি বিশ-ত্রিশটা খাব।

আমি বলি, একশটা খা।

মা বলে, তুই বসে আছিস কী জন্য? গরম গরম খেয়ে নে। ঠান্ডা হলে মজা পাবি না।

ধোঁয়া ওঠা পিঠা হাতে নিই। প্রথম কামড়েই মুখ পুড়ে যায়। তখন মনে হয় আমি যা চাইব তা-ই পাব। সে জন্য লড়তে হবে। কালিঝুলি মাখা বেড়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি, এই ঘর থাকবে না। আমি হলাম চাষার বেটা, ফসল ফলাই। আমি যেকোনো কিছু ফলাতে পারি। আমার অনেক ক্ষমতা।

২২.
কন্ট্রাক্টর চাচার মুখ বানরের মতো। শরীরজুড়ে ঘামাচি। তার মাথায় সবসময় চিন্তা থাকে, কিভাবে হেলপার-মিস্ত্রিদের টাকা কম দেওয়া যায়।

একদিন নদীর পাড়ে কালামের সঙ্গে দেখা। বলে, তুমি কিছু মনে না নিলে একটা কথা বলি। তোমার চাচাটা হইল একটা জাউরা।

আমার কিছু বলার সুযোগ থাকে না। নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবি, মানুষের হওয়া উচিত নৌকার সাথে পানির সম্পর্কের মতো।

চাচাকে সবাই দালাল বলে। একাত্তরে বাম্বুর সঙ্গে থেকে আকাম-কুকাম করেছে। স্বভাব-চরিত্র এখনো পাল্টায় নি।

দীর্ঘদিন ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় থেকে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে। গল্প বলার সময় তার মুখে চট্টগ্রামের ভাষা শোনাই যায় না।

একদিন ঘাটাপুকুরপাড়ে আমগাছতলে গল্পের আসর বসেছে। টাক মাথায় হাত বুলিয়ে চাচা বলে, শোন, প্রত্যেক দিন সকালে একটা করে মুরগির ডিম খাইবি। বলে কপালের ঘামাচি চুলকায়। হাঁসের ডিম হইতু না, হাঁসের ডিমে বাত আছে। ডিমের লেট্ট লেট্ট আছে না? ওগুলান না, সেরেফ কুসুম হাতর তালুত নিয়া গিলে ফালাইবি। না হয় ইসুবগুলের ভুসি আছে না? আখের গুড় চিনস নি? এক মগ পানি লইবি। একটু করে ভুসি দিয়া গুড় মিশ কইরা খাইবি। বাচ মাথা ঠান্ডা। ডিম হাফ বয়লও খাইতে পারস। না হয় কোমর পানিতে নাইমা কুসুম খাইবি। ক্রিয়া তাড়াতাড়ি আর আস্তে আস্তে করনের মধ্যে বেশকম আছে না?

চাচা বলে, আগর দিনে এত অষুধ অ আছিল না, রোগ অ আছিল না। দুব্বাঘাস আছে না? তুই কাইটা গেলি, দুব্বাঘাস ছিড়ি দাঁতত পিষে লাগাই দিবি। কাম ফিনিশ। রক্ত সাথে সাথে বন্ধ হইয়া যাইব। ডেটল-টেটল দুব্বাঘাসত্থুন বানায় এরি। লোহায় কাটলে, মনে কর দায়ে কাটলি, কী করবি? আরেকটা লোহা নিয়া দুইডাতে ঘষবি। লাল লাল য্যা গুরিগুলান বের হইব ওগুলান লাগাইয়া দিবি। রক্ত পড়া বন্ধ, কাটা জোড়া লাগব। বাসকপাতা চিনস নি? বাসকপাতা ছেঁচি রস খাইলি… এহন ত খালি ট্যাবলেট গিলন। কত কত ডাকতর, তুই হাতত গনি দশজন পাইবি না।


হাফিজ কাকা বুদ্ধিজীবীর ঢঙে বলে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সাপ আছে। কেউ বাঁচিয়ে রাখে, কেউ মেরে ফেলে।


লম্বা আবু বলে, তোমার সেই সময় এখন নাই। আমাদের পেটে বস্তা বস্তা ট্যাবলেট-ক্যাপসুল।

মৃদু হেসে পেট চুলকিয়ে চাচা বলে, কালসাপ চিনস?

হাফিজ কাকা বুদ্ধিজীবীর ঢঙে বলে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সাপ আছে। কেউ বাঁচিয়ে রাখে, কেউ মেরে ফেলে।

কাকার কপালে ব্যান্ডেজ। গতকাল ঘণ্টার সাথে বাড়ি খেয়েছে। স্কুলের দপ্তরি, স্কুল পরিচ্ছন্ন রাখার কাজও করতে হয়। ডিউটির সময় নীল শার্টটা পরে। কাঁধ ও বগলের তলে চিতে পড়েছে। তবে চুলে সবসময় নারকেল তেল দেয়। পরিপাটি করে আঁচড়ানো থাকে। এখন পরনে গেঞ্জি, লুঙ্গি হাঁটুর উপর।

পুকুরে হাঁস ডাকে। উত্তর-পশ্চিম পাড়ে কয়েকটা মেয়ে চাল ও ডেকচি ধোয়। লুঙ্গির কোচা থেকে পান নিয়ে মুখে দেয় হাফিজ কাকা। চাচাকেও একটা দেয়। তারপর বলে, বাঁচি থাকি কী গইয্যুম?

গল্পদাদা জবাব দেয়, ঘণ্টা বাজাবি এরি।

কালাম জানায়, বাম্বু গতকাল রূপচাঁদা মাছ কিনেছে। কেজি চারশ পঞ্চাশ টাকা।

দাদা দার্শনিকের মতো বলে, বড় লোকে কত কী খায়। গু-মুতও তাদের কাছে স্পেশাল জিনিস।

গত রাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়েছিল। পাতা ও পথে বৃষ্টির রস রয়ে গেছে।

চাচা পুনরায় জিজ্ঞেস করে, কালসাপ চিনস?

প্রশ্ন শুনে ঝিমুনি আসে। ঝিমুনি যেন হেলিকপ্টার। আমাদের নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু চাচা খপ করে ধরে ফেলে। বলে, পরদানশীল এ্যাক মহিলাকে ডাকতর দ্যাখব, সামনা-সামনি ত দ্যাখা যাইত না। কাইন্না আঙুল চিনস নি? কনিষ্ঠ আর কি। কনিষ্ঠ আঙুলে সুতা বাঁধল। ওই পাশে ডাকতর সুতা দ্যাইখা অষুদ দিব। ছেলে বলে, সুতা দ্যাখে কেমনে অষুদ দ্যায়। হেতে করল কি, বিলেই আছে না? বিলেইর পাত সুতা বাঁধি দিল। ডাকতরে কয়, আপনে চাইর পায়া জন্তুত সুতা বানছেন ক্যান? ছেলে লজ্জা পাইয়া গেল। হের পরে চিকিস্‌সা কইরা ডাকতরে কয়, তোমার মা আর এ্যাক হপ্তা বাঁচব, যা খাওনের খাওয়াই লও।

পোলা কয়, মা তোমার কি খাইতে মন চায়? বাজান আমি বিচি কেলা খামু। বিচি কেলা চিনস নি? মার লাইগা ছেলে এ্যাক ছড়া কেলা নিয়া আইল। অমা! এ্যাক হপ্তা পার হইয়া গেল, মা মরে না। এ রহমে তিন মাস হইয়া গেল। মার রুগ-টুগ কিচ্ছু নাই। রুফ যৈবন ফিরা আইল। ছেলে কয়, ব্যাপার কী? হেতেরে ধইরতে অইব। গেল ডাকতরের কাছে। আফনে কইলেন সাত দিন বাঁচব, এহন তিন মাস হইয়া গেল, মা আমার ভালা আছে। আফনে কি রহম ডাকতর হইলেন? ডাকতর কাচুমাচু করে। কয়, তোমার মারে কী খাওয়াইছ? আইট্টা কেলা। কেলা কি বাজার থিকা কিনছ না পাড়া থিকা? আমারে সেহানে নিয়া চল। মালিকরে জিজ্ঞাইল, তুমি কিছুদিন আগে কেলা বেচছ, গাছডা কোনাই? ওই ত। তিন মাসর ব্যাপার, গাছ ত পুচে ভসভইস্যা হইয়া গ্যাছে। ডাকতর কয় কুড়। কুড়ার পর গাছর তলাত দ্যাখে চাক দিয়া বইসা আছে হেতে। বুঝছস নি? ডাকতর সব বুঝল। বলল, এইবারে বুঝলাম তোমার মা ক্যান মরে নি। অষুদ হিশাবে কালসাপর বিষ হলি তোমার মা ভালা হইয়া যাইত। কিন্তু পাইবা কই? তাই এ্যাক হপ্তা টাইম কইছি। এহন যে বিচি কেলা খাইছে, গোড়া থেকে বিষ কেলায় গ্যাছে। তোমার মার পেডর বিষের দলা এই কেলা খাইয়া গ্যাছে গা। এবার বুঝ্, কত্ত বড় ডাকতর হলি রুগ ধরতে পারে।


১৪ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)