হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ১১

অন্যজন : ১১

অন্যজন : ১১
183
0

১০ম পর্বের লিংক

পর্ব- ১১

১৯.
কবরস্থানের জঙ্গলে কিঁয়াল্লিশ দেখি। লালচে মুখের সরীসৃপ। দাদি বলত, কিঁয়াল্লিশ দূর থেকে রক্ত শোষণ করে। আমরা ভয়ে ভয়ে ঢিল মারি। জিয়লগাছ থেকে কিঁয়াল্লিশটা ঝোপে ঢুকে যায়, তবুও ভয় কমে না। আড়ালে বসে শুষে নিচ্ছে নাকি? নিজেদের বাদামি চামড়ার ভেতর রক্ত চলাচল দেখার চেষ্টা করি।

ঘরে গিয়ে বললে মা মুখ গোমড়া করে। গোলা তো নেই, বারো মাসের ধানও নেই। পেটে হাত দিয়ে বসে থাকে সবাই। কাপড় শুকাতে দেওয়া রশি থেকে সবুজ ফড়িং ধরে কিঁয়াল্লিশ।

ক্ষুধায় পেট চেপে সন্তান দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা-মা চেষ্টা করে পেট থেকে উগরে কিছু বের করা যায় কি না। কিন্তু তারা কুকুর নয়। ছোটবেলায় বাম্বুদের গোলাঘরের নিচে একপাল বাচ্চার সামনে মা-কুকুরকে বমি করতে কতবার দেখেছি! বাচ্চাগুলো কাঁইকুঁই করে চেটেপুটে খেত।

বিকালে গল্পদাদার কাছে যাই। দাদা বলে, ক্ষুধার রাজ্যে এখন মানুষ মানুষকে খায়। টিভি, পেপার, সিনেমা—সব জায়গায় বলছে, খেতে হবে। দাদা হাসে। ঠোঁটের কোনা বেয়ে পড়ে পানের রস। নদীর পাড়ে গিয়ে পানের বরজের পাশে বসে।

বালকেরা ইটের উপর ইট চড়িয়ে স্ট্যাম্প বানিয়েছে। কেশ ওঠা টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলছে। তাদের মুখে ‘আউট’ শব্দটা চরের বালি হয়ে যায়।


হায়রে বঙ্গসন্তান! তোর মন দরিয়ার পানির মতো হয়ে গেছে।


দাদা বলে, এক দেশে এক রাজা ছিল। তাকে হটিয়ে দেয় আরেক রাজা। পরাজিত রাজার মেয়েকে আটক করা হয়। কিন্তু নিজের কুকীর্তি প্রকাশ না করার জন্য বাবা তার জিব কেটে দিয়েছিল। কারাগারে আটক মেয়ের রক্তের ধারায় কীর্তিনাশা নদী বয়ে যায়। নদীতে রক্তের ধারা দেখে প্রজারা কাঁদে। তারপর হেসে বলে, পুকুরে মাছ ধরা ফরিদ, মুনশি, মমতাজ ও বাম্বু তা জানে না। মানুষের মন মরুভূমি হচ্ছে। সেদিকে কারো খেয়াল নাই। দেখ বাছারা, লাঙল, জমি কিছুই থাকবে না। তোরা উদ্বাস্তু হবি।

মাছরাঙাটার দিকে তাকিয়ে বলে, হায়রে বঙ্গসন্তান! তোর মন দরিয়ার পানির মতো হয়ে গেছে।

দাদাকে আজ কথায় পেয়েছে। বলে, তোদের উঠানে আইউব, ইয়াহিয়ার বুটের ছাপ। মোনেম খাঁ হাঁটে। ইংরেজদের সাথে মীরজাফরও আসে। উঠানে ইট সাজিয়ে চুলা বানানো হয়। চুলায় ডেক। তোদের গাছপালা, পশুপাখি, ধান, পাট, জলাশয়, ঘর, নদী রান্না হয়। চিমটা দিয়ে তুলে খায়।

টিক্কা খান সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। বুঝলা? দাদা হাসে। যুদ্ধ তো প্রতিদিনের। যুদ্ধ শেষ হয় না। পকেটে নাই টাকা, উপোস ঘরে শোলক ভাজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, পরাণের বান্ধবরে, কোথায় গেলে পাব তোমারে।

এ সময় পাশ দিয়ে বাম্বু যাচ্ছিলেন। মৃদু হেসে দাদাকে বলেন, হায়রে বক, তোর গতি হলো না।

বাম্বু কদ্দুর যাওয়ার পর দাদা বলে, তুই একটা ঠক।

কথাটা শুনেও বাম্বু গা করেন না। ঘরের দিকে যান। ঘরের কাজ চলছে। পিলারের জন্য বানানো কাঠের বক্স একটু বাঁকা হয়েছে। রেগে মিস্ত্রিকে বলেন, কলার ছরা কাটার পর গাছ কাটতে হয়, জানস না?

কাক উড়ে যায়, মুরগি ঘরে ঢোকে। মাগরিবের আজান শুনে লোকে মসজিদে যায়। ঘরে গিয়ে টিভি ছাড়েন তিনি। খবরে বলে, আদালতের পাশে আট বছরের এক শিশু ধর্ষিত হয়েছে।

বাইরে পৌষের কুয়াশা, ভেতরে বউয়ের চিৎকার। বিকালে বলে গিয়েছিলেন কালিজিরা চাল রাঁধতে। রেঁধেছে কি না কে জানে। যে রকম ঝগড়াটে মহিলা! ঝগড়ার তালে পড়লে দুনিয়ার খবর থাকে না।

মা বলেছিল বউয়ের জন্য একটা তাবিজ আনতে। এখনো আনা হয় নি। সে কথা ভাবতে ভাবতে শুনে বউ স্যান্ডেল দিয়ে কাজের মেয়েকে মারছে। গালি দিয়ে বলছে, তোর বাপ-দাদা চৌদ্দগুষ্টি এই গ্লাস দেখেছে? আমারে তুই চিনিস?

হাতের পিঠ দিয়ে ভেজা চোখ মুছে ইয়াসমিন। তখন বাম্বুর বউ বলে, তোকে আজ বাপ-দাদার নাম ভুলাব। আরেকটা চড় মারে। মেয়েটা পড়ে যায়।

জীবন তো ঘা-পেঁচড়ায় ভরা। মাথার ওপর একপাল ভাই-বোন। মা থাকে নানাবাড়ি, বাবা তাদের রেখে পালিয়ে গেছে। এক দুপুরে কথায় কথায় মামিকে বলেছিল, বাবাকে সে ঘৃণা করে। এখন বাপ-দাদা তুলে কথা বলায় আঁতে ঘা লাগে। ভাবে, নানাবাড়ি চলে যাবে। কিন্তু গেলে মা আবার ঝাঁটা মেরে পাঠিয়ে দেবে।

মেঝেতে পড়ে আছে। রাগে-দুঃখে হেঁচকি তোলে। বলে, আমার মায়ের হাতে কখনো এ রকম মার খাই নি।

বাম্বুর বউ বলে, উঠ, তারাতারি উঠ।

ইয়াসমিনের কান্না দেখে বাম্বুর ছেলেরা হাসে। সে তাদের দিকে কড়া চোখে তাকায়। সব শুনে বাম্বু এদিকে আসেন না।

বাম্বুর বউ ইয়া মোটা। পাড়ার লোকেরা আড়ালে ডাকে বাম্বুনী। তারা বলে, শরীরে মাংস নাই, সব চর্বি। বিছানার কোণে গেড়ে বসে টেলিফোনে বলে, মিশু, বুঝতে পারছ?

রিসিভারে হাতচাপা দিয়ে স্যান্ডেল মারা ইয়াসমিনকে ডাকে, এই চাকরনির ঝি, কথা শুনতে পাচ্ছিস না? তোর জন্ম খারাপ নাকি?

মা-বাপের নাম নিয়ে কথা বলবেন না।

হ্যাঁ মিশু, এখন রাখি, পরে কথা বলব। তারপর গালি দিয়ে বলে, ন্যাংটা দৌড় দে।

আমার মা-বাপ আপনার মতো না।

আমরা তোর মতন চৌদ্দ বাপের জনম না, এক বাপের জনম। অলির মতন আমার বাপ।

ইয়াসমিন থমকে যায়। কেননা ইতোমধ্যে দুই-তিনটা লাথি খেয়েছে। মনে মনে বলে, সেজন্যই তো মুখে সুন্দর সুন্দর কথা। তার ভেতর একটা গোখরো ফণা তুলতে চায়। মনে মনে ধারাল বঁটি খোঁজে। বাপকে গোলামের বাচ্চা বলে গালি দেয়। তাকে পেলে মায়ের সামনে এনে নাকে খত দেওয়াত। কিন্তু সে তো দাসী, মৃত্যুর সমান।

গল্পদাদাকে সে ডাকে নানা। ঘাটায় গেলে মাঝেমধ্যে নানাকে দুঃখের কথা বলে। মার খাওয়ার কথা শুনলে দাদা হয়তো বলত, মানুষ অতি সুলভ বস্তু। তার কোনো দাম নাই রে।

গল্পদাদা বলত, ছোটকালে চৈত্রের মেলায় ঘোড়ায় চড়তাম। ঘোড়ার কান নেড়ে বলতাম, কোথায় যাবি? ঘোড়াওয়ালা বলত, ঘুমের বাড়ি।

মাঘ মাসে আমরাও শাহ সাহেবের ওরশে যেতাম। নদী শুকিয়ে যেত, তাই বংশাল ঘাটে নৌকা চলত না। বাঁশ দিয়ে লম্বা সাঁকো বানানো হতো। অনেক লোক পার হতো। সবার মুখে ওরশের মেলায় যাওয়ার বা মেলা থেকে ফেরার আনন্দ।

শণের চালার নিচে বসা বুড়া সাঁকো পারাপারের লোকের কাছ থেকে আট আনা বা এক টাকা নিত। বাজার থেকে আসা মালের নৌকা আটকে থাকত চরে। ছেলেরা ফুটবল খেলত।

চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নারুটির গন্ধমাখা কথাটা শুনি। গত রাতে বুড়া ঘোড়াটা মরে গেছে।


শ্মশানের বুড়াটা বলে, বাবারে! মৃত্যুর চেয়ে বেশি বিষণ্ন দৃশ্য পৃথিবীতে আর নাই।


অবসরপ্রাপ্ত সরকারি এক কর্মচারী দেশ উদ্ধার করছে। বলে, দেশটা পানার মধ্যে ডুবে আছে। কান ধরে টান দিলে উঠে আসবে। তার মুখে যেন পানাফুল ফুটেছে। বলে, সরকারি অফিসে দুটা টেবিলের দূরত্ব কত জানেন? মাত্র এক হাত। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। বাঙালি হইল এক নম্বর হারামজাদা।

পালপাড়ার শিমুলগাছে বসে বারোমাইস্যে পেয়ারা খায় কাঠবিড়ালি। কাঠবিড়ালি দেখে লোকটা বলে, একটা এয়ারগান ভাড়া করতে হবে।

ছোটকালে শুনেছি, পালপাড়ার পুকুরে রাক্ষস নেমেছিল। এ পুকুর নাকি মানুষও নিয়েছিল। এখন তেলাপিয়া মাছ ভাসছে।

রাতে ঘুমের মধ্যে আসমানের বিলে হাল চষি। মাটি পাথরের মতো। লাঙল চালাতে গেলে ফলা ভেঙে যায়। বাবা কানাইলালের কাছে যেতে বলে। দেখি, হরি বোল দিয়ে লোকে কানাইলালকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে। শ্মশানের বুড়াটা বলে, বাবারে! মৃত্যুর চেয়ে বেশি বিষণ্ন দৃশ্য পৃথিবীতে আর নাই।

ভাঙা লাঙল কাঁধে বাজারে যাই। বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টিতে ভিজে লাঙল, কাপড়-চোপড় সব মুছে যায়। আমার জন্মপোশাক দেখে ঘুমের পাখিরা জেগে ওঠে। তারা দুটা ডানা দেয়। উড়ে উড়ে আমি মুন্না ভাইয়ের কাছে যাই।


১২ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)