হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : শেষ পর্ব

অন্যজন : শেষ পর্ব

অন্যজন : শেষ পর্ব
146
0

২৫ পর্বের লিংক


শেষ পর্ব :

৪৭.
গত বছরের কথা মনে পড়ছে। জালা ফেলা থেকে শুরু করে চাষ পর্যন্ত আগাগোড়া সাহায্য করেছে মনা ভাই। দুজন মানুষের সমান খেটেছে।

আষাঢ়ের প্রথম দিকে জালা ফেলার সময় মায়ের সঙ্গে মিলে সে কী তোড়জোড়! তার ব্যস্ততায় কাজ করার উৎসাহ পাচ্ছিলাম। মা ডোলের পাশে রাখা বীজধান বের করেছিল। লাইয়ের নিচে দুটা ইট, ছেঁড়া শাড়িতে ভালোভাবে ঢাকা ছিল লাই ভরা ভেজা ধান।

মায়ের বীজধান নেওয়া দেখে মনে পড়েছিল ছোটকালের কথা। তখন আমি স্কুলে পড়তাম। ততদিনে ফজা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। যেদিন জালা মানে বীজ জমিতে ফেলত, সেদিন স্কুলে যেতাম না। আগের চার-পাঁচ দিন মা-বাবার কাজকর্ম দেখতাম গভীর আগ্রহে। ধান থেকে চারা গজানো দেখতে এত ভালো লাগত, মাঝে মাঝে নিজেকে ধানের চারা ভাবতাম।


প্রাণ মরে না। প্রাণ হলো বনের পাখি। খাঁচা ছেড়ে শুধু বেরিয়ে পড়তে চায়।


দিনে আমেনা, লিটন, শাহেনা ও মনির সঙ্গে খেলতাম। ছি বুড়ি খেলায় ‘চিঁ চিঁ বোলাইলেম/ গুইলদে কেঁডা ফুডিলেম/ গুইলদে কেঁডার এত বিষ/ খাইত ন পারলি আঁরে দিচ’ বোল দিয়ে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের তাড়া করতাম। বোল দিয়ে এক নিশ্বাসে কাউকে ছুঁতে পারলে সে মারা যাবে। যদি তার নিশ্বাস এক মুহূর্তের জন্যও থামে, বিপক্ষের কেউ তাকে ছোঁয়, তাহলে নিজে মারা যাবে।

হাডুডু, কানামাছি, মার্বেল খেলার সময় পাল্টে যেত আমাদের রং। রংগুলো এখন মনের কোনায় যেখানে ধানগাছ আছে, সেখানে ভিড় করে। রং মেখে আস্তে করে মায়ের পাশে চলে আসি। কিন্তু আমার আর চাষা থাকতে ইচ্ছে করে না।

ফজর ফাটছে। কাক, শালিক ও ঘুঘুরা গতকাল সন্ধ্যায় উড়ে যাওয়ার সময় আলো নিয়ে গিয়েছিল। এখন এই ভোরে একটু একটু ডাকছে আর তাদের ঠোঁট দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে আলো। ভোর সেই আলো মাখছে। আরো আলোর জন্য পাখিরা সুর ধরে। এ সময় মা দিনের সুর তৈরি করতে আড়মোড়া ভেঙে আল্লাহর নাম নিয়ে ওঠে।

আমার চোখ যায় ঘাটায়। বড় তুফানে কাত হয়ে পড়া আমগাছের শিকড়ে মনে হয় মনা ভাই বসে আছে। এটা তার প্রিয় জায়গা ছিল। এখানে বসে গান গেয়ে কত সময় কাটিয়েছে! মাঝে মাঝে মনে হতো ভাই গাছের সাথে লীন হয়ে আছে। তাকে গাছ ভাবতে ভালো লাগত।

মনে হতো বুড়াটা এসে মনা ভাইকে আলমাস ও গোলরায়হানের পুঁথি শোনাচ্ছে। আলমাস বন্ধু বাহরামকে নিয়ে যাচ্ছে গোলরায়হানের কাছে। আলমাসের বাবা রাজা, রাজার পাঁচ ছেলে। এক ছেলেরও সন্তান নাই…

তখন ভাই বলছে, মাইজভাণ্ডারের মূল কথা হলো প্রেম আর আদব; স্রষ্টার প্রতি প্রেম, সব সৃষ্টির প্রতি প্রেম। দরবার শরীফ সবার জন্য খোলা। যে কেউ বাবার কাছে আসতে পারে।

তারপর গলা ছেড়ে গাইছে, জগৎজোড়া মানুষ আছে/ মনের মানুষ নাই…

সেদিন ছিল শ্রাবণের তিন তারিখ। নানাদের বড় মহিষটার ধারালো শিং হয়ে বৃষ্টি ঝরছিল। বৃষ্টি দেখে মা ও ভাবি মানা করল। ভাই শুধু মৃদু হাসল। তারপর গাছের ডাঁটের ছাতাটা নিয়ে ‘আল্লার সুরুত’ বলে বেরিয়ে পড়ল। মাজারে বিশেষ মিলাদ আছে। তাকে যেতেই হবে।

পরে জেনেছি, জিকির করতে করতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নিতে নিতেই ভাই মারা গেল। তখন শেষ বিকাল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শাদা রং।

কয়েক বর্ষা আগে একদিন বিলে কই বিজুলি দেখে মনা ভাই বলেছিল, প্রাণ মরে না। প্রাণ হলো বনের পাখি। খাঁচা ছেড়ে শুধু বেরিয়ে পড়তে চায়। সেই কথাটা মনে পড়ে। ভাইয়ের প্রাণ কি বৃষ্টির সাথে মিশে অনেক প্রাণে ছড়িয়ে পড়েছে! মনের গভীরে তার সাড়া পাই। ধানের চারা, যেকোনো গাছ কিংবা মানুষের গায়ে হাত রাখলেই শুনতে পাই, কেউ কিছু বলছে।

৪৮.
আমাকে সুষম সমাজের ধারণা দিয়েছিল মুন্না ভাই। সে এখন পূবালী ব্যাংকে চাকরি করে। শুক্রবার বাড়ি এলে কথা প্রসঙ্গে বলি, এখানে এত গরিব, চাষাভুষা মানুষ—তোমাদের বিপ্লব হচ্ছে না কেন?

সে বলে, অনেক ব্যাপার আছে। তবে প্রথম কথা হলো, আমরা গরিব মানুষের রাজনীতি করি, কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছতে পারি না।

গল্পদাদা একবার বলেছিল, মানুষ এখন বেঁচে থাকে একা একা। কিন্তু একা বাঁচা ভালো নয়রে। সবার সঙ্গে না বাঁচলে মানুষ ছোট হয়ে যায়। কথাটা তাকে বলি।

সেই কথায় একমত হয়ে মুন্না বলে, আইনস্টাইন একবার একটা রেখা এঁকেছিলেন। বললেন, না কেটে এটা ছোট করো। তখন কী হলো জানিস? ওই রেখার পাশে আরেকটা লম্বা রেখা আঁকা হলো। ব্যস, রেখাটা ছোট হয়ে গেল। আমাদের দেশে বড় রেখা আঁকার মতো নেতা নাই।

বৈশাখের আমগাছ ছোট ছোট আমে ভরা। ঘাটার গাছটাতেও প্রচুর আম ধরেছে। মনা ভাই মারা যাওয়ার পর গাছটার দিকে তাকিয়ে মা চুপি চুপি কাঁদত আর বলত, ও মনা, মনারে…

মুন্না ভাইকে বললাম বিদেশ যাওয়ার কথা। মন খারাপ করে বলি, নিজের জমি আর কদ্দুর? সারা বছর বর্গা জমি চষা, বারো মাসে সাত মাস খোরাকি হওয়া—এসব আর ভালো লাগছে না। তাছাড়া বাম্বু শয়তানের জ্বালায় শান্তিতে থাকা যাচ্ছে না।

দুনিয়ার কূলে বেঁচে থাকতে কষ্ট করতে হয়। এ কথা বলে মুন্না ভাই কী যেন ভাবল, তারপর বলল, একসময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ বাংলা মুল্লুকে আসত। কেউ আসত বাণিজ্যে, কেউ লুটপাট করতে। এখন বাঙালি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছুটছে। কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা করে আর কেউ থেকে যায়। দেখ, পশ্চিমের চেয়ে পুবের মানুষ অনেক ভালো। তুই জিজ্ঞেস করতে পারিস, কেন? আমেরিকা এখনো পৃথিবীব্যাপী লুটপাট চালাচ্ছে। জাতি হিশেবে তাদের কি কোনো লজ্জা আছে? মাঝে মাঝে এ কথা ভেবে অহংকার জাগে, আমরা চোরের জাত নই। আচ্ছা, তোর বয়স এখন কত?

পঁচিশ।

মুন্না বলে, মানুষ আসলে বিচ্ছিন্ন হয় না। শোন, যেখানেই যাস না কেন, তুই তোর নিজের কাছেই রয়ে যাবি। মন দেশের মাটিতেই থাকবে। দেশকে ছাড়তে পারবি না। যা, নিজেকে চিনে আয়। ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার চেয়ে সংগ্রাম করা অনেক ভালো।

বর্ষার মাঠে কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে ফুটবল খেলার কথা মনে পড়ে। ভাবি, বেঁচে থাকতে হলে শক্ত একটা ঘর, খাওয়া-পরা ও মাথা উঁচু করে হাঁটার সুযোগ পেতে হয়। হেসে বলি, বিদেশ ঘুরে এসে দেখব তোমরা সমাজতন্ত্র কায়েম করে ফেলেছ।

দুর গাধা, সেই পথ বহুদূর। আমাদের নেতাদের দিয়ে হবে না। তবে একদিন নিশ্চয় হবে।

কঁত্থে?

মুন্না ভাই কিছু বলে না। আকাশ থেকে চোখ ফেরায়। হয়তো আমার চোখে পরবর্তী প্রজন্মের কোনো স্বপ্ন দেখতে চাইছে।

আচ্ছা, আমাদের এখানে এত দলাদলি, মারামারি কেন?

মুন্না বলল, রাজনীতি। এদেশের মানুষ হাজার হাজার বছর পরাধীন ছিল। বার বার বিদ্রোহ করেছে, কিন্তু ক্ষমতা পায় নি। দেশ থাকলেও স্বাধীনতার স্বাদ পায় নি। স্বাধীনের পর হঠাৎ করে ক্ষমতা পেয়ে অনেকেই তাই অমানুষ হয়ে গেছে। অনেকে হয়ে গেছে মতান্ধ। খুনোখুনি, নৃশংসতায় তারা একটুও পিছপা হয় না। এদেশে ত্যাগের, নিঃস্বার্থতার পাশে তাই অনেক কালিমা। তবে একদিন পাল্টাবে। কেন জানিস? কারণ, আমাদের প্রাণশক্তি। আমাদের হাসিটা মলিন হয় না। যেকোনোভাবে বাঁচার উপায় আমরা খুঁজে নিই।


বাঙালি হলো কাদামাটি। তারে যেমন বানাও সে তেমন হয়। 


বশর স্যারের কথা মনে আছে? স্যার বলতেন, আমাদের সমাজ কাঠামোটা অনড় নয়। দীর্ঘদিন অন্যের অধীনে থাকায় এমন হয়েছে। বাঙালি যেকোনো কিছু সহজে গ্রহণ করতে পারে। তার গ্রহণ ক্ষমতা অসাধারণ। এভাবে সে টিকে থেকেছে, স্বপ্ন দেখেছে। তবে এতে ভয়ের ব্যাপারও আছে। যেকোনো অনাচার বা খারাপ কিছু সহজে ঢুকে যাওয়ার আশংকা থাকে। দেখিস না? তুচ্ছ কারণে দুই গ্রাম বা দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

তবে বশর স্যার একটা কথা বলতেন। স্যার বলতেন, বাঙালি হলো কাদামাটি। তারে যেমন বানাও সে তেমন হয়। তারে নিয়ে ভয় আছে, সুখও আছে। সুখ কী? সুখ হলো, সে নরম, অশান্তি পছন্দ করে না।

কোকিলের ডাক কত তীক্ষ্ণ ও তীব্র হতে পারে, গ্রামের ভোরে না শুনলে কেউ বুঝতে পারবে না। বৈশাখকে কাঁঠালের কোয়ার মতো খুলে খুলে মানুষের মনে ছড়িয়ে দেয় তার স্বাদ। মুন্না ভাইও আমার মধ্যে ও রকম কোনো স্বপ্নের স্বাদ ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে।

আমি ভোরের স্বপ্ন দেখি। তখনো অন্য পাখিরা জাগে নি। কোকিল অবিরত কুহু কুহু ডাকছে। একটু পর ডাহুক ডাকে। ফজর ফাটছে, আলো ফুটছে। এই ভোর আমার মনে সিল মেরে চলে যায়। ভোরের রঙে জেগে ওঠে মন।

সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে দেখি গোধূলির রং। কড়ই ও অশ্বত্থগাছেও সেই কমনীয়তা। কোন মিস্ত্রি এই রং বানিয়েছে? গোধূলির রঙে মায়া আছে। তা যেন শূন্যতার মায়া। দিন শেষ, আলোও শেষের পথে। চারদিক থেকে অন্ধকার আসছে। এই আঁধার আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। একটি স্বপ্ন ছেলেবেলার জামা গায়ে দিয়ে বেড়াতে আসে।

দেখি, ছোট মামার পা ভালো হয়ে গেছে। এখন দক্ষ হাতে মিষ্টি বানায়। শুক্রবার বিকালে মামা আমাকে নিয়ে মহিষের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। কত দূরে যে যায় আন্দাজ করতে পারি না। নানার মতো মৃদু হেসে পিঠে হাত বুলায়। আদর পেয়ে মোষটা ডাকে, আঁআঁক আঁআঁক।

৪৯.
আবার শুরু হয়েছে কর্মযজ্ঞ। এসেছে আষাঢ়, আষাঢ় এখন চাষার। তার প্রাণে বাজনা বাজাচ্ছে। বাজনার ঝুমঝুম শব্দে ভিজে যায় বীজতলা।

আমার মধ্যেও বৃষ্টি পড়ছে। কেননা আমি সফল হয়েছি। প্রথমে ধরেছিলাম বুবুকে, তাকে নানাভাবে বোঝালাম। আমাদের দুঃখ-কষ্ট, টানাটানি বুবু ভালো করেই জানে। বললাম, ছোটবেলা থেকে যে জীবন, তা পাল্টাতে চাই। মা-বাবাকে আরো ভালো রাখতে চাই। বাবাকে প্রায় দশ গন্ডা জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। এখন কয়েক গন্ডা বিক্রি করে দিক। টাকা এলে কত জমি হবে। ফজা আছে, দরকার হলে আরো বেশি বর্গা নেবে। ঘরটা ভাঙাচোরা। জোরে বাতাস এলেই ভেঙে পড়বে। এ রকম ঘরে মানুষ থাকে? বিদেশে যেতে এত মরিয়া হয়েছি কেন? তুমি প্রশ্ন করতে পারো। দেশে তেমন সুযোগ নেই। চাকরি তো করে দেখলাম। চার-পাঁচ হাজার টাকা বেতন পাব, নিজে খাব না ঘরে দেবো? যদি কষ্ট-মষ্ট করে একবার যেতে পারি, ভাগ্য খুলে যাবে। ওখানে টাকার মান বেশি, তাই বরকত হয়। বছর দুই-তিনেকের মধ্যেই কপাল ফিরে যাবে।

একবার দুইবার নয়, প্রতি সপ্তাহে গিয়ে বোঝাতাম। বলতাম, মাকে আমি মোটামুটি রাজি করিয়েছি। বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার।

একদিন বুবু বলল, জমি বিক্রি করার চিন্তা ছেড়ে দে।

কী করব?

কয়েকদিন ধরে আমি চিন্তা করেছি। তোর দুলাভাইয়ের সাথেও কথা বলেছি।

কী কথা? তাড়াতাড়ি বলো।

আচ্ছা এত হুলুস্থুল করতে হবে না। আগে ভাত-টাত খা, আস্তে ধীরে বলব।

শোনার জন্য আমার তর সয় না। বিপ্লব উঠানে ফুটবল খেলার জন্য ডাকলেও যাই না। অন্যদিন হলে তার সঙ্গে দুষ্টুমি করে খেলতাম, দশ-বিশটা গোলও দিতাম।

বুবু ভাত রাঁধে, আমি পাশে বসে থাকি। পীড়াপীড়িতে বলল, এক কাজ কর, তোর দুলাভাই কিছু ব্যবস্থা করে দেবে। নানির কাছে কিছু টাকা আছে, ওগুলো নিতে হবে। মার বালাগুলো বিক্রি করে দেবো আর কিছু টাকা খালাদের কাছ থেকে নিবি। বড় ভাবিকেও বলব তালইকে বলতে। সব মিলে মোটামুটি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন তুই কাজে লেগে যা। আমারটা আমি করব।

মোড়ায় বসে বিপ্লবের খেলা দেখি। বলকে ইচ্ছেমতো ঘোরাচ্ছে, হেডে হেডে বেশ কয়েকবার মাথার উপর নাচাল। ইচ্ছে হয় দৌড়ে গিয়ে জোরে শট মারি। এক শটে বলটা অনেক উপরে উঠে যাবে। উঠেই হয়ে যাবে প্লেন। সেই প্লেনে করে আমি যাব।

বুবুর কথা শুনে মনটা হালকা হয়ে যায়। মনে হয় মনা ভাইয়ের গান শুনে ঘুম ভেঙেছে। আমার নাচতে ইচ্ছে করে। এভাবে এতদিন চিন্তা করি নি কেন? বলি, বুবু তাড়াতাড়ি ভাত রাঁধ, খিদে পেয়েছে।

দুলাভাই দোকান থেকে আসে দেড়টার দিকে। এসেই বলে, শালার পুত শালা, কেমন আছিস?

ভালো না, টেনশনে আছি।

তিনি বলেন, নো টেনশন।

তার হাসিতে অভয় পাই। আপার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার এত বছর পর এই প্রথম তাকে খুব ভালো লাগল।

৫০.
সাড়ে ছয় বছরের চেষ্টায় অবশেষে আমি সফল হয়েছি।

বিমানবন্দরে গাড়ি থেকে নেমেই এক লোকের হাতে পত্রিকায় চোখ পড়ে, অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাত্রা, সাগরে ট্রলার ডুবি। কতজন মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে সেটা আর দেখা হলো না।

ভেজা কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে একটা শালিক উড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মন এলোমেলো হয়ে যায়। পাখির মতো উড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে। কোথায় যাব? পাখির দিকে তাকাই। পাখি নেই, আকাশে একরাশ মেঘের খেলা। ওদিকে আবার একটু রোদও আছে।


আমি পারব। কেননা বাবা আমার মধ্যে ধান রুয়েছে আর মা দিয়েছে পানি।


ভেতরে ঢুকেই মনে হয় কি যেন হারিয়ে ফেলেছি। একটু আগেই কান্নাকাটি করে সবাই বিদায় দিয়েছে। মাইক্রোবাস ভাড়া করে এসেছিল। কর্জ হলেও পাত্তা দেয় নি। আমার চোখ এখনো ভেজা। দুনিয়ার সব শূন্যতা এসে ঘিরে ধরেছে। বুবু, ফজা, শফি, তোফেল ভাই, বাবা ও বাচ্চারা শালিক, চড়ুই, টিয়ে, ময়না, কাক, কবুতর, টুনটুনি, ফিঙে, দোয়েল, শ্যামা হয়ে আমার ভেতরে ঢুকে শূন্যতা মুছে দিতে চায়।

মনা ভাই তো কোকিল হয়ে আছে। তার কথা বেশি মনে পড়ছে। ভাই বলত, আশ্বিনের সকালে ধানপাতায় জমা শিশিরের মতো মানুষের জীবন। বুঝেছিস? এ জীবনে কর্ম ছাড়া আর কিছু থাকবে না। কর্ম চাই, সৎ কর্ম। ভাই থাকলে কেমন করত কে জানে। ভাবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেছিলাম, তোমাকে কখনো কষ্ট পেতে দেবো না।

এ সময় খালেদার কথাও মনে পড়ে। ওর একটা ছেলে হয়েছিল। জন্মের পর পরই তাদের দূর সম্পর্কীয় এক আত্মীয় ছেলেটাকে নিয়ে যায়। ওর বিয়ে হয়েছে সুয়াবিলে ড্রাইভারের সঙ্গে।

ও আমার মধ্যে মায়ার এক জগৎ ছড়িয়ে দিয়েছিল। ওকে ভুলতে পারি নি। ও বুবুর মতো মেয়ে। বড় ভুল করেছি। ওকে হারিয়ে ফেলা আমার উচিত হয় নি।

বাংলার মাটি যেমন বীজ পেলেই জেগে ওঠে, আমিও তেমন। যখন যেটা ভাবি, তাতেই মেতে থাকি। পরিণতি কম ভাবি। এর জন্য মুন্না ভাইয়ের কাছে অনেক বকা খেয়েছি। বলত, আবেগই তোকে শেষ করবে।

অনেক বলার পরও মা ও বড় ভাবি আসে নি। মা বলেছে, ওখানে গিয়ে আমি সহ্য করতে পারব না। বরং ঘরে বসেই দোয়া করি। আল্লাহ আমার ছেলেকে রক্ষা করুক, তার কামাই রুজিতে বরকত দিক, সোনার সংসার করে দিক। তার আশা পূরণ করুক।

বিদেশ যাচ্ছি তাহলে! ঘরের চেহারা পাল্টাতে হবে। মন শুধু তা-ই গায়। ভাবি, বিদেশ থেকে ফিরে এসে শেষ পর্যন্ত চাষা-ই তো থাকতে হবে। তবে বাবার মতো না, অন্যরকম চাষ করব আমি। কিন্তু ততদিনে চাষ করার জমি কি পাব?

কত শস্য, গন্ধ, কত চাষ হারিয়ে গেছে। আমরাও হারিয়ে যাব। চাষ করে শুধু ভাতে বেঁচে থাকি। জীবন আর বেশি এগোয় না। তাহলে কী করব? জীবনের আকাশ-বাতাস কি একটু দেখব না? আমি দেখতে চাই, আবার মাটিতেও থাকতে চাই। আমি জীবন চাই।

সবকিছু আমার মধ্যে একটা ঘর তৈরি করতে শুরু করে। আমি দেয়াল দিই। ওখান থেকে কিছুই হারিয়ে যেতে দেবো না। ঘরটাকে আরো মজবুত করব। ওখানে আমার সব থাকবে—মা, মাটি, স্বপ্ন, সাধ…

এসব নিয়ে বিমানের সিঁড়িতে পা রাখি। অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। পা থেকে শরীরে তা ছড়িয়ে পড়ল। মন বলল, আমি পারব। ধানের চারার মতো সবুজ দেশের মানুষ আমি। আমি পারব। কেননা বাবা আমার মধ্যে ধান রুয়েছে আর মা দিয়েছে পানি।

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)