হোম গদ্য আহা…

আহা…

আহা…
325
0

অনেক আগে রাশিয়ান চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কির একটি ছবি দেখেছিলাম, নাম নস্টালজিয়া। একজন মানুষের স্মৃতিবিস্মৃতির টুকরো টুকরো ইমেজ, তার বর্তমান তার টানাপোড়েন ইত্যাদি নিয়ে। আমরা কথায় কথায় প্রায়ই যে শব্দটি ব্যবহার করি, নস্টালজিয়া বা নস্টালজিক… তাকে ক্যামেরার সামনে মূর্ত করে তুলেছিলেন তারকোভস্কি। একজন নায়ক ছিল সে ছবিতে। মানে মূল চরিত্র। তাকে ঘিরে তার স্মৃতি, তার বিচ্যুতি, পরাজয় সব হাহাকার করে উঠেছিল।

নামে নস্টালজিয়া না থাকলেও নস্টালজিক চরিত্রের সদর অন্দর নিয়ে এরকম বহু ছবি আমরা দেখেছি। হালে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবিতে আমরা সেটা পাই। লাল দরজা ছবিটির কথা মনে পড়ে। দিদিমার হাত থেকে সুতোর বান্ডিলটা গড়িয়ে অনেক দূরে নিচে নেমে যাওয়ার দৃশ্যটি। আবার ইরানি সিনেমাতেও মিলবে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ। আর ক্যামেরায় যতটা কঠিন, যতটা শ্রমসাধ্য, তার চেয়ে খুব সহজ কবিতায় এ বিষয় নিয়ে মাতামতি করা। বা মদির নিদ্রায় ঢলে পড়া। কবিতার ভাষার ভেতর একটা নস্টালজিক চরিত্র থাকে। কবিতা বস্তু চরিত্র পরিপার্শ্ব নিয়ে খুব একটা মূর্ত এবং বাস্তবিক অবয়ব নেয়া না বলে, তার ভাষার মিথিক্যাল ছাপ থেকে যায়, এক ধরনের সিম্বলিসিটি, আর বলতে গেলে ভাষার ধরনের মধ্য দিয়েই কবিতা আসলে অতীতামোদী নস্টালজিক হয়ে থাকে। ফলে আলাদা করে কবিতার নস্টালজিক ম্যানারগুলো খুঁজে বের করা, তার স্বকীয়ত্ব দেখানো মুশকিলেরই কাজ।


বর্তমান থেকে অতীতে, এখান থেকে সেখানে, কাল মাত্রা স্থান সবকিছু ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলল কবিতা। 


তার আগে সাধারণভাবে একটা বোঝাপড়া করা আবশ্যক মনে হয় যে, নস্টালজিয়া বিষয়টা আসলে কী? এখানে কি ফ্রয়েডীর মনোসমীক্ষণতত্ত্বের দোহাই পাড়ার প্রয়োজন দেখা দেবে? সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যারও কি দরকার আছে?

ফ্রয়েড বলবেন, চাওয়া-পাওয়া এবং না পাওয়ার বস্তুবর্তমানের সাথে অবদমনের একটা খেলা দ্বান্দ্বিকভাবে চলে, সেখানেই নস্টালজিয়ার বীজ থাকতে পারে। তাহলে সুখী সমৃদ্ধ স্বস্তিময় মানুষ কি কখনোই নস্টালজিক হয় না? আবার সমাজতত্ত্ব বলতে পারে, এটার মধ্যে শ্রেণিকরণের গোলমেলে সম্পর্কসূত্র আছে। আসলে এটা মানুষের হাতে অফুরন্ত অবসর থাকার সূত্রেই জায়মান একটা মনোপ্রক্রিয়া। তবে কি অবসর বা দৈনন্দিন সুযোগ না থাকলে স্মৃতিভারাক্রান্ততা বা অতীতবিলাসের প্রশ্নই থাকতে পারে না? এটাও কি হয়? নস্টালজিক না হলে বস্তুদুনিয়ার জীবন্ত বা জীবিত বিষয়াদির কাজকারবারের চাপেও কৃষক ক্যামনে গান গেয়ে ওঠে? গান যখন হয় তখন তো সে ভাষা মরে যাওয়া, মৃত। যা তার কণ্ঠে জীবিত হয়ে উঠবে বা পুনর্জন্ম পাবে। তো মরা ভাষাকে কণ্ঠে রূপ দেয়া কি সম্ভব, যদি তার মধ্যে মৃত্যুর আগের জীবিত দুনিয়া নিয়ে ভাবনা না থাকে? অর্থাৎ তার মনে নস্টালজিয়ার আকৃতি তীব্র না হয়?

কথা বলব বাংলা কবিতা নিয়ে।

বাংলা কবিতায় নস্টালজিয়া। বাংলার কবিতা বা বাংলা কবিতা খুব পরিপূর্ণ অর্থে নস্টালজিয়ার কবিতা। যে সমাজে অপরের চাপে নিজেদের সামষ্টিক বিন্যাসকে ভেঙে ভেঙে দ্রুত বদলিয়ে যেতে হয়, সেখানে নস্টালজিয়াও কাজ করবে বেশি। নিজেকে হারানোর মর্মবেদনা যেখানে তীব্র, নস্টালজিয়ার শৈল্পিক প্রকাশও সেখানে ব্যাপক হবে তো বটেই।

বাংলার কবিতা অনেকাংশে আবেগপ্রবণ। বাংলা সংগীতের মতন। প্রকৃতির যুক্তিশর্তবর্জিত অনির্ণেয় লীলাখেলা যেখানে খুব কাছাকাছি ঘটে, সেখানে জীবনজগৎকে আবেগের রসে ভিজিয়ে তার স্বাদ পাওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক। আর একজন দার্শনিক বলে গিয়েছিলেন, যুক্তি যতটা বর্তমানমুখী, আবেগ মততটাই অতীতগামী।

আসলে মনে হয় মানুষ যখন যৌথ জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে, বা সরে আসে, ব্যক্তিতান্ত্রিকতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠে, তখন সে বেশি নস্টালজিক হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যিক প্রমাণ মেলে বাংলা কবিতা বা কাব্যমূলক রচনার একটা ধারাবাহিক বিশ্লেষণে গেলে। চর্যাপদে নস্টালজিয়া বা ব্যক্তিক স্মৃতিরোমন্থনের জায়গা একেবারেই নেই। আর চর্যা মূলত আখ্যাানের টুকরো টুকরো অংশ এবং দার্শনিক অভিক্ষেপ।

তার পরে গিয়ে আমরা যে পাঁচালিকাব্য পাই, সেখানেও কাব্যের আধারে ধরা থাকে বিশেষ শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ অর্থগত মানুষের ঘটনা, সেখানে সংকট আছে, সমাধান আছে এবং বিরহ আছে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর কোনো পদে নস্টালজিয়ার লক্ষণ আমরা পাব না। মনসামঙ্গলেও পাওয়া দুষ্কর। রাধার বিরহযন্ত্রণা বা মনসার বেদনাকাহন কিংবা চণ্ডীমঙ্গলের ফুল্লরার সংসারজ্বালার মধ্যে রচয়িতা এমন একটা আইকন তৈরির চেষ্টা করেন, যেখানে ব্যক্তিচরিত্রটির ভাব বা ক্রিয়াকলাপের চাইতে তার শ্রেণিগত পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তার দুঃখভরা জীবনের নমুনাকে তুলে ধরার একটা পরিকল্পনা সজাগ থাকে বেশি। ফুল্লরার ব্যক্তিত্বের চেয়ে তার শ্রেণির ব্যক্তিত্ব বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। সেখানে নস্টালজিক পয়েটিক মোমেন্ট তৈরির সম্ভাবনা থাকে না। ইউসুফ-জুলেখা বা অন্নদামঙ্গল-এও একই বিষয়। ময়মনসিংহ গীতিকাগুলো সামন্তীয় সমাজের গোধূলিলগ্নে রচিত হতে শুরু করেছে বলে সেখানে ব্যক্তিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা এবং ঘটনারাশির উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। মহুয়া বা মলুয়ার বেদনা কেবল শ্রেণিগত অর্থে একটি চিহ্ন মাত্র হয়ে থাকে না, পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্যে বেদনামলিন হয়ে ওঠে। তবুও যে অর্থে আমরা নস্টালজিয়া বুঝি, তার কোনো প্রত্যক্ষ উপাদান সেখানে পাব না। বৈষ্ণব পদাবলীতে কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার বিরহকালীন স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এরকম আবেগে বিগলিত হবার উদ্বেলিত থাকার হদিস মেলে। নস্টালজিয়া মানে যে একটি সময় বা জীবনপর্বকে ফেলে এসে আবার তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি বোঝায়, তার যে একটি সামগ্রিকতা আছে, সেটি পদাবলীতে নেই। কেবল বিচ্ছেদের বিগত আ আসন্ন উপলব্ধিতে কাতর থাকে প্রেমিকহৃদয়।

সখি, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বধূয়া আন বাড়ি যায়
আমার আঙিনা দিয়া…

একটি নারীসত্তা যে আমার হৃদয়ের সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বর্তমান ছিল, সে অতীত হয়ে যাচ্ছে, গূঢ় অর্থে সে অপর হয়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ সে সময়টি আর আমার নয়। এরকম বোধের মধ্যে কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে একটা নস্টালজিক ভাব থেকে যায়।

যাই হোক বাংলা উপন্যাস যখন হলো, তখন সেটি উত্তম পুরুষের বর্ণনার মধ্য দিয়ে কালকে একাকার করে ফেলতে পারল, তখন সে অনায়াসে সুযোগ পেল বর্তমান থেকে অতীতের কোনো আবেগী মুহূর্তে চলে যেতে আবার ভবিষ্যতের কোনো রূপ দেখে ফেলতে। ফলে বাংলা উপন্যাস ব্যক্তিকে নিয়ে নানান আবেগ, ভাব ও রসের খেলায় মেতে উঠল। সে আলাদা হয়ে গেল।

তখন বাংলা কবিতাকে সে সুযোগটি আরও বেশি করে নিতে হলো, কারণ আখ্যানের ভারটি উপন্যাস নিয়ে নেয়ায় সে পেল একেবারে ভাবোপলব্ধির জগৎকে সাজানোর মাঠ। ঘটনা সংস্থাপনের শর্ত না থাকায় কবিতা কবিকে নিরন্তর ভ্রমণের সুযোগ দিল। বর্তমান থেকে অতীতে, এখান থেকে সেখানে, কাল মাত্রা স্থান সবকিছু ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলল কবিতা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা পাব রবীন্দ্রনাথকে। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ। তিনিই এ ক্ষেত্রটির আধুনিক ও বৃহৎ অর্থে প্রথম এবং প্রধান কৃষক, যিনি কর্ষণ করেছেন ভাব, কল্পনা ও উপলব্ধির দৃশ্যাদৃশ্য ভূমি। রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা [আসলে কি দুটো আলাদা কিছু? গান কেন সুরটি বাদ দিলে কবিতা হবে না, এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া জরুরি।]

রবীন্দ্রনাথের হাজারো পঙ্‌ক্তি, চরণ, স্তবক, কবিতা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। সহজভাবে স্পষ্ট করে বলতে গেলে, সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে, কলতকাতার রূপ পাল্টাচ্ছে, মানুষের মূল্যবোধে পরিবর্তন আসছে, ঔপনিবেশিক তৎপরতার কারণে আপাত অর্থে চলছে উন্নয়নের কর্মকাণ্ড, হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক প্রত্যয়, বিলীন হচ্ছে নিজস্ব প্রকরণ স্বপ্ন গান কথা গল্প… তখনই তো নস্টালজিয়ায় ভোগার উপযুক্ত আবশ্যিকতা।

       কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনোই কাব্যকে সমাজতত্ত্বের বিষয় করে তুলতে চান নি, সে তিনি তার একেবারে প্রথম দিককার রচনার ভূমিকাতেও বলে গেছেন, ফলে তিনি বস্তুজগতের বসবাসের সেসব মর্মযাতনা ও বেদনাকে প্রকাশ করেছেন একটা মিস্টিক ও আধ্যাত্মিক অবস্তুগত বিরহবেদনার ধোঁয়াশায়।
যেমন—
                দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়
                রইল না
                সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি…
স্পষ্ট অর্থে এটি সবচেয়ে নস্টালজিক কাব্যনমুনা।
                আমার প্রাণের গানের ভাষা
                শিখবে তারা ছিল আশা…
সে আশা আর পূরণ হবার নয়। দেশ ও সময়ের দিকে চেয়েই কিন্তু এ সুরটি বেরোয়, রবীন্দ্রনাথ তাকে ক্লাসিক আদর্শে প্রকাশ করতে চান বলে তার মধ্যে একটা অ-কালদেশমাত্রিক চেহারা প্রকাশ পায় বেশি। অবশ্য নিখাদ শৈশবের নস্টালজিয়াও আছে। যেমন একেবারে শুরুর দিককার একটি কবিতা ধরা যাক। নাম—স্মৃতি-প্রতিমা।
… …. … ……
আজি বহুদিন পরে                 যেন সেই দ্বিপ্রহরে
                সেদিনের বায়ু বহে যায়
হা রে হা শৈশবমায়া              অতীত প্রাণের ছায়া
                এখনো কি আছিস হেথায় ?
এখনো কি থেকে থেকে           উঠিস রে ডেকে ডেকে
                সাড়া দিবে সে কি আর আছে ?
যা ছিল তা আছে সেই,           আমি যে সে আমি নেই
                কেন রে আসিস মোর কাছে ?
….. …… …… ……

সেই ঘর সেই দ্বার                 মনে পড়ে বার বার
                কত যে করিলি খেলাধুলি
খেলা ফেলে গেলি চলে           কথাটা না গেলি বলে
                অভিমানে নয়ন আকুলি।…

নিখাদ নিজেকে হারানোর বেদনা, নিখাদ নস্টালজিয়ার কবিতা একেই বলা যায়? এটি যুক্তির ধার ধারে না? এটি বলতে দেয় না যে, যা গেছে তা থাকার কোনো শর্ত ছিল কি নেই? এটি আসলে যাওয়ারই অনিবার্যতা এবং তাকে নিয়ে আবার মর্মচেরা বেদনারও আবশ্যকতা। আর এটাই নস্টালজিয়া।

আবার কড়ি ও কোমল-এ একই সাথে পাশাপাশি স্থান পেয়েছে পুরাতন ও নূতন নামের দুটো কবিতা। রবীন্দ্রনাথের সব রেখার শেষত একটাই সুর যা আছে তার একটি গানে—
                চরণরেখা তব যে পথে দিলে লেখি
                চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচালে কি…………….
অর্থাৎ রাতের সকল তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে। অথবা যা হারাই, তা আসলে পাওয়ার মাঝেই বর্তমান। তাই তিনি বলেন,
                কী দেখিতে আসিয়াছ যাহা কিছু ফেলে গেছ
                                কে তাদের করিবে যতন
                স্মরণের চিহ্ন যত ছির পড়ে দিন-কত
                                ঝড়ে পড়া পাতার মতন…

এই ফেলে আসার এবং তাকে ফিরে পাবার মান-অভিমান, রবীন্দ্র-নস্টালজিয়ার দার্শনিক প্রত্যয়টি এরকমই। এর মাঝে এক ধরনের সূক্ষ্ম বর্ণচোরা ইতিহাস চেতনারও ব্যাপার আছে। আরও তীব্র তার এ স্মৃতি-অতীত আকুতি; এবং খুবই স্পষ্ট।
                বনের ছায়া কবিতায় লিখছেন :
                  কোথায় সে গুনগুন ঝর ঝর মরমর
                  কোথা সে মাথার পরে লতাপাতা থরথর
                  কোথায় সে ছায়া আলো, ছেলেমেয়ে খেলাধূলি
                  কোথা সে ফুলের মাঝে এলোচুলে হাসিখুলি।
কোথা রে সরল প্রাণ গভীর আনন্দ গান
           অসীম অশান্তির মাঝে প্রাণের সাধের গেহ
              তরুর শীতল ছায়া বনের শ্যামল  হে।

এই স্মৃতিভারাতুরতা একেবারেই বস্তুদুনিয়ার কালের হিসাবে বাঁধা কখনোই ছিল না, তা তার তারুণ্যেও, তার মধ্যে মহাজাগতিকতার বোধ প্রখর ছিল বলেই স্মৃতি কবিতায় লিখছেন :

                    ওই দেহ পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে
                    যেন কত শত পূর্বজনমের স্মৃতি।…
কত সহস্রবার জন্ম নিচ্ছে মানুষ। কত অনির্ণেয় বিন্দুতেই তার অবস্থান। এটাকে প্রলম্বিত করে জীবনানন্দ বলেন—হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি… একই কথা।

শেষ বয়সে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের নস্টালজিয়া একেক সময় শিশুতোষ হয়ে উঠেছিল। বাল্যবেলার কথা অনর্গল কবিতার মধ্য দিয়ে বলেছেন। আর একটা সরল আফসোস। সে সময়টার জন্য। আকাশপ্রদীপ নামের কাব্যগ্রন্থটি না ছড়া না কবিতা ধরনের রচনা। সেখানে পাতায় পাতায় পাওয়া যায় তার বাল্যকালের ডকুমেন্টেশন, তা নিয়ে স্মৃতিরোমন্থন। সে গ্রন্থের ভূমিকায় বলছেন তিনি :
                    স্মৃতির আকার দিয়ে আঁকা
বোধে যার চিহ্ন পড়ে          ভাষায় কুড়ায়ে তারে রাখা
                    কী অর্থ ইহার মনে ভাবি
                              এই দাবী
                    জীবনের এ ছেলেমানুষি
                মরণেরে বঞ্চিবার ভান করে খুশি…


রাবীন্দ্রিক স্মৃতিরোমন্থন বা ভাবাবেগ বা নস্টালজিক উপাদানের খুব অল্প জায়গায় কোনো দেশকালের স্বকীয় উপস্থিতি আছে, যেটা পাওয়া যায় জীবনানন্দে।


অর্থাৎ অন্তিমে এসে মানুষ শুরুর দিকে ফিরে চাইবে, এটাই তার স্বভাব। মাঝখানে যা থাকে তার জন্য মানুষের কমই আবেগ থাকে, ফিরে আসে তার একেবারে প্রারম্ভকালের ছবি। যাত্রাপথ, স্কুল পালানো, ধ্বনি প্রভৃতি কবিতায় শুধু সেই একই স্বর একই কথা। যা তিনি বাল্যকালে ঘটিয়েছেন, সেই দিনগুলি। আশ্চর্য ব্যাপার, এখানে রবীন্দ্রনাথ একেবারে গল্প বলার ঢঙে কবিতা লিখেছেন। ভারাক্রান্ততাও নয়। নেই জীবনান্দীয় দীর্ঘশ্বাস। একেবারে সেই দিনগুলোর কথা সরলভাবে জীবন্তু রূপে প্রকাশ করছেন তিনি। কবিতা হয়েও এগুলো একেকটা গল্প বা আত্মকথন।
যেমন :

                    ঠাকুরমা দ্রুততালে ছড়া যেত পড়ে
          ভাবখানা মনে আছে—বউ আসে চতুর্দোলা চড়ে
                              আম-কাঁঠালের ছায়ে
          গলায় মোতির মালা, সোনার চরণচক্র পায়ে।
                    বালকের প্রাণে
               প্রথমে সে নারীমন্ত্র আগমনী গানে
        ছন্দের লাগাল দোল আধোজাগা কল্পনার শিহরদোলায়…

রবীন্দ্রনাথের নস্টালজিয়া এ সময়ে দেখা দিল খুবই চঞ্চল বুড়োবালকের মধ্য দিয়ে। যে সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে খেলতে চায়, লুটোপুটি করতে চায়।

একেবারে বৃদ্ধবয়সে জীবনের শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথ স্বভাবতই ডুবেছিলেন গহনঅতীতে। ৭২ বছর বযসে তিনি লিখেছেন কৈশোরিকা নামের কবিতাটি। যেখানে কৈশোরের কোনো কিশোরীর কথা আছে, যে বর্তমানের জরাজীর্ণ কবির কাছে ফিরে ফিরে আসছে সঞ্জীবনীর মতো। সেই নস্টালজিয়ার রূপটি দেখুন :

               ছায়ায় ছায়ায় আমি ফিরিতাম একা
               দেখি দেখি করি শুধু হয়েছিল দেখা
               চকিত পায়ের চলার ইশারাখানি…
এবং দর্শনের আয়নায় চিনে নিচ্ছিলেন একই সাথে জীবনের সারসত্যটিকে। নাট্যশেষ কবিতায় লিখছেন [আষাঢ় ১৩৪২ সালে] :

          .… একা একা বসে দেখিতেছি মনে মনে, মম
               দূর আপনার ছবি নাট্যের প্রথম অংকভাগে
               কালের লীলায়। সেদিনের সদ্য-জাগা চক্ষে জাগে
               অস্পষ্ট কী প্রত্যাশার অরুণিম প্রথম উন্মেষ
               সম্মুখে সে চলেছিল, না জানিয়া শেষের উদ্দেশ,
               নেপথ্যের প্রেরণায়…

এখানে রবীন্দ্রনাথ তার চিরন্তন বিশ্ববীক্ষার ক্লাসিক্যালিটির জায়গাকে চেনান। এবং তা খুবই সরল সত্যের ভাবে। আসলেই, মানুষ আরম্ভ করে কোথায় সে যাবে তা না জেনেই। এবং শেষ পাদে এসে ফিরে দেখলে তার সে পদক্ষেপের কাল ও অভিজ্ঞতাকে তার কাছে কতই না কঠিন অন্ধকার মনে হয়।

রবীন্দ্রনাথের নস্টালজিয়া পাঠককে ন্যুব্জ করবার বা বুঁদ করে ফেলবার নয়। তার ছন্দ, ধ্বনি-ঝংকার, অনুপ্রাসের নাচ সব মিলিয়ে সেটি এমন, যেন তা অতীতকে বারবার বর্তমানের ভিতর ডেকে এনে তার গালে চিমটি কেটে দেয়া, তার থুতনি ধরে ইস করে ওঠা, এবং কখনো বা তার অন্তর্সত্যকে আঁচ করে জীবনের কালপর্বগুলোর অনিবার্যতা এবং তারই মধ্যে জীবনের সৌন্দর্যকে আঁচ করে হেসে ওঠা।

সেখান থেকে একেবারেই আলাদা জীবনানন্দ। নজরুলের বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারিকে নিয়ে লেখা কবিতা বা জসিমউদ্দিনের এইখানে দাদার কবর ওইখানে দাদীমার…, কিংবা বিষ্ণু দে’র একটি বকুল কবিতার প্রতীকী স্মৃতির বয়ান : একটি বকুলে ফোটে দুজনার ছবি/ দ্ইুজনে পুঁতেছিল একটি বকুল।/ আজ তার ফুল ঝরে নিঃসঙ্গের গানে,/ পাহাড়ের গোধূলিতে ভাসে তার সুর,/ আকাশের পাখোয়াজে নিঃসঙ্গ বিধুর…, প্রভৃতি উদাহরণ সত্ত্বেও বাংলা কবিতা নামক এলাকায় নস্টালজিয়া নামের একটি বিশেষ ভাব বা প্রত্যয়কে আমরা এ পর্বে শুধু বাংলা ভাষার এ দুই কবির কাব্যচাষের ফসল থেকে চিনতে চেষ্টা করব, এ কারণে যে, তাদের দুজনের কবিতাই গুণে পরিমাণে সবচেয়ে বেশি নস্টালজিয়ার লক্ষণাক্রান্ত।

রাবীন্দ্রিক স্মৃতিরোমন্থন বা ভাবাবেগ বা নস্টালজিক উপাদানের খুব অল্প জায়গায় কোনো দেশকালের স্বকীয় উপস্থিতি আছে, যেটা পাওয়া যায় জীবনানন্দে। জীবনানন্দের রূপসী বাংলা আমাদেরকে যে নস্টালজিয়ার অম্লমধুর স্বাদ দেয়, সেটির মধ্যে খুবই জীবন্ত হয়ে থাকে বাংলা নামের একটি দেশ, তার অতীত, ইতিহাস, তার সমাজচিত্রের বিলীয়মান ধূসর রঙ। একজন ব্যক্তির দেশকালহারা বেদনাবোধের স্মৃতিময়তার উপলব্ধি থেকে তা সহজেই এমন একটি বেদনার্ত শেণিকে দাঁড় করিয়ে ফেলে, যাদের সমস্ত উপাদান উপচারে এক হয়ে আছে অতীতের বা ফেলে আসার একটি জনপদ, যার নাম বাংলা। তার জন্য তাকে হাজার হাজার অনুষঙ্গ নিয়ে প্রামাণ্য স্মারক তৈরি করতে হয়। খড়ের চালের নিচে, লক্ষীপেঁচার ডাকে, বাবুইয়ের বাসার পিছনে, হোগলার শরে কাশে বাংলার গ্রামীণ জীবনের বর্ণাঢ্য অতীত ও তার বর্তমান ভগ্নচিত্রের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হয়ে থাকে। ফলে এ নস্টালজিয়ার একটা দৈশিক পেক্ষিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ধরা যাক, কুড়ি বছর পরে কবিতাটি। আবার বছর কুড়ি পরে এলে কার সাথে দেখা হবে? কখনো মনে হয় একটি মেয়ে, কখনো একটি জনপদ, কখনো-বা একটি সময়, যা হারিয়ে গেছে, যা তার সমস্ত চরিত্র নিয়ে হয়তো অপর হয়ে গেছে। কবিতাটির মধ্যে একটা মজা আছে। কালের একটা মিশ্র রূপ। যেমন, হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে, এটা জীবনানন্দীয় কৌশল। হয়তো আসিবে না বলে এসেছে বলা, ভবিষ্যৎকে বর্তমান করে তোলা। হারানো সবকিছুকে একেবারে সাজানো গোছানো করে পাবার সকল কাব্যিক আয়োজন শেষ করে রাখেন তিনি। কোথায় সাজান? বাংলার স্বকীয় রাস্তায়, প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গের সাথে।

জীবনানন্দ নস্টালজিক হন নি কেবল ব্যক্তির আত্মঅতীত নিয়ে। অতীতকে ইতিহাসের আয়নায় চেনাবার একটা চেষ্টা, তবে রোমান্টিক ভঙ্গিতে। যেমন মহাপৃথিবী কাব্যের শহর কবিতাটি।

হৃদয়, অনেক বড়ো বড়ো শহর দেখেছ তুমি;
সেইসব শহরের ইটপাথর
কথা, কাজ, আশা, নিরাশার ভয়াবহ হৃত চক্ষু
আমার মনের বিস্বাদের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

সেই ব্যবিলন বা এশিরিয়ার মতো…
জীবনানন্দ বিপ্লবী নন, কিন্তু রোমান্টিকতার যে স্বভাব, যা স্বাভাবিকতার ভিতরে একটা ব্যক্তিক উত্থানকে প্রকাশ করতে চায়, তারই অসাধারণ রকম পাব পরের চরণে।

কিন্তু তবুুও শহরের বিপুল মেঘের কিনারে সূর্য উঠতে দেখেছি;

এই সূর্য কবির চিরন্তন রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আরও অনেক নমুনা আমরা পাঠ করতে পারব।

জীবনানন্দ যখন বলেন, একদিন এ পৃথিবী জ্ঞানে আকাঙ্ক্ষায় বুঝি স্পষ্ট ছিল, আহা;
                                   কোনো এক উন্মুখ পাহাড়ে
                                   মেঘ আর রৌদ্রের ধারে
               ছিলাম গাছের মতো ডানা মেলে—পাশে তুমি রয়েছিলে ছায়া।

এটি আসলে কোনো ব্যক্তিমানুষের দূরস্মরণকালের জন্য দীর্ঘশ্বাস নয়। মানুষ নামক একটি বর্গের সামষ্টিক জীবনের একটি পর্যায়ের চিত্র দেখিয়ে তারই জন্য একটি হাহাকার। আমরা সকলেই তাকে ফেলে এসেছি। সেই প্রকৃতিবিধুর সহজ জীবন। এবার মানবিক করে তোলেন প্রকৃতিকে। মানবিক গুণ ও প্রবৃত্তিকে প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের সাথে মেলানোর আর্তি।

               একদিন এ জীবন সত্য ছিল শিশিরের মতো স্বচ্ছতায়;
                                   কোনো নীল নতুন সাগরে
                                   ছিলাম —তুমিও ছিলে ঝিনুকের ঘরে
               সেই জোড়া মুক্তো মিথ্যে বন্দরে বিকিয়ে গেল হায়।

অর্থাৎ একেবারে চিরন্তন কালের প্রবাহ নয়, অনিবার্য কালসত্য নয়, মানবিক স্খলনকেও দায়ী করছেন তিনি। এ নস্টালজিয়ার চরিত্র অবশ্যই ভিন্ন।

অথবা কত নিখাদ প্রেমেরও হতে পারে জীবনানন্দের দীর্ঘশ্বাস।
               এইখানে একদিন তুমি এসে বসেছিলে—তারপর কতদিন একা
               তোমারে রয়েছি ভুলে—একদিন তুমি এসে বসেছিলে কখন এখানে
               মুছেছে জীবন থেকে…

নিজের নস্টালজিয়াকে একটি ভূখণ্ডের ভেতর নির্দিষ্ট করে রঙার্দ্র করে তুলেছেন জীবনানন্দ। বাংলার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে নিজের পরিচয়কে গেঁথে নিয়ে তথাকথিত বাস্তবতার কাছে হার মানতে বসা তার চিরন্তন আবেদনে এভাবে দুর্নিবার সাড়া দিতে চান তিনি।

               তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও —আমি এই বাংলার পারে
               রয়ে যাব;
যে বাংলার টান তার রক্তমজ্জায়; কেন? এখানে তিনি দেখিবেন—
                ... কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বতাসে
               … খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে
               … মেয়েলি হাত সকরুণ—শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে
                   শঙ্খের মতো কাঁদে…
এসবের কোনো কালাকাল নেই, আশৈশব আমৃত্যু সবই তার চেতনার অংশ, কবিকে সে ছেড়ে যেতে পারে না, তাই সদর্পে বলেন তিনি—
                  .… তবু জানি কেনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে
                  হরাব না তারে আমি—সে যে আছে আমার এ বাংলার তীরে।

এই হচ্ছেন জীবনানন্দ। এই তার নস্টালজিয়ার স্থানিক আদর্শ। আমাদের আধুনিক কবিদের নস্টালজিয়া নিজের ফেলে আসা পরিপার্শ্ব নিয়ে, চরিত্র নিয়ে; জীবনানন্দের নস্টালজিয়া সেখানে একটা বড় বৃত্তে একাকার করে রেখেছে প্রকৃতি ও মানুষের সহসম্পর্কের একটি বিশাল জগৎকে। মানুষের আবেগ যেখানে আপাত অ-মানুষিক সকল অনুষঙ্গ ও প্রজাতির সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

পুরো রূপসী বাংলা জুড়ে তারই চিত্র, তারই ধ্বনি ও সংগীত।

      খুঁজে তরে মর মিছে—পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর
      রয়েছে অনেক কাক উঠানে—তব সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক
      নাই আর—অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক
      দাঁড়কাক দেখা যেত দিন রাত—সে আমার ছেলেবেলাকার
      কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার;

…….. ……    এতদিনে কোথায় সে? কী যে হল তার,

     কোথায় সে নিয়ে গেছে সঙ্গে করে নেই নদী, ক্ষেত, মাঠ, ঘাস,
     সেই দিন, সেই রাত্রি, সেই সব ম্লান চুল, ভিজে শাদা হাত,
     সেই সব নোনা গাছ, করমচা, শামুক, গুগলি, কচি তালশাঁস,
     সেই সব ভিজে ধুলো, বেলকুঁড়ি-ছাওয়া পথ—ধোঁয়াভরা ভাত,
     কোথায় গিয়েছে সব ?

     প্রকৃতির [এবং তা বাংলার] এত উপাদানের ভেতর নিজের অতীতকে, প্রেমকে, জীবনকে খুঁজে ফেরার এত বিষাদবহ বর্ণাঢ্য ভ্রমণ বাংলা কবিতা আর পায় নি। এখানেই জীবনানন্দের নস্টালজিয়ার জাতিতাত্ত্বিক তাৎপর্য ও অর্থবহ স্বকীয়তা। যেখানে বস্তুত তিনি থাকেন, শুধু সেখানেই নয়, যেখানে ভাবত তার বাস ও তার ভূমিজ নিয়তি, সেখানকার জন্য তার কাব্যিক নস্টালজিয়া। অর্থাৎ নস্টালজিয়ারও একটা দায় আছে, একটা গভীর ও পরোক্ষ রাজনৈতিক বোধ। কবিকে তা নির্মাণ করতে হয়।


‘আধুনিক’ কালের কবিরা নস্টালজিক হলেও তাকে সরলরৈখিকভাবে প্রকাশ করতে নারাজ। 


     পরবর্তীকালে সে নির্মাণ কতটুকু হয়েছে, বা হতে পেরেছে, তার হিসাব আগামী কোনো সাহিত্যিক হালখাতার জন্য তোলা রইল। আপাতত, তাৎক্ষণিক মনে পড়ে, তিরিশের পরের কাব্যযুগে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আজ আমি নামের মায়াবী কবিতার পঙ্‌ক্তি : আজ আমার সারাদিনই সূর্যাস্ত, লাল টিলা—তার ওপর/ গড়িয়ে পড়ছে আলখাল্লা পরা স্মৃতির মেঘ……. আজ আমি কিছুতেই আর ওদের ফেলে উঠে আসতে পারলুম না / পাড়ের কাঁথা, মাটির বাড়ি, নোনা হাওয়া—/ সবারই কেমন একটা দেহ-দেহ ভাব আছে, আঁশটে গন্ধ আছে, যা মায়া—, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আমার কৈশোর কবিতার কিছু লাইন : …. আমার কৈশোরে পথের ওপর ঝরে পড়ে থাকা / শিশির মাখা শিউলির ওপর পা ফেললে / পাপ হত/ আমরা পাপ কাটাবার জন্য প্রণাম করতাম/ আমার কৈশোরে শিউলির সম্মানে সরে যেত বৃষ্টিময় মেঘ…, মনে পড়ে শামসুর রাহমানের কবিতায় পুরনো ঢাকার হরেক রঙের বিষাদস্মৃতির চিহ্ন, যেমন : দুঃসময়ের মুখোমুখি কবিতায় জিজ্ঞেস করছেন : বাচ্চু…. পাশের বাড়ির তেজপাতা-রঙ বুড়িটার ঘরে/ মাঘের সকালে/ মায়ের কল্যাণী হাতে বোনা হলদে সোয়েটার পরে/ যেতাম কিনতে পিঠা মোরগের ডাক-সচকিত/ চাঁপা ভোরে তোর মনে নেই, মেহেরের সঙ্গে, নতুন মামীর সঙ্গে,/ নানীর সাধের,/ আচারের বৈয়ম করেছি লুট দুপুরবেলায়,/ তোর মনে নেই? আল মাহমুদের আসে না আর কবিতাটি : পাহাড়পুরের পাথর রেখে বামে/ পেরিয়ে খাল পুরনো গড়খাই/ এগোলে কেউ আসে না আর ঘরে/ এই কথা তো জানতে, তবু কেন/ হাটের মাঝে আসতে দিয়েছিলে?/ তোমায় শিকের রঙ মাখাতো যারা/ তোমায় এনে দিত মোরগফুল/ তাদের হাত ফেরালে একবার/ কখনো তারা আসে না আর গাঁয়ে/ এই কথা তো জানাই ছিল তবু/ বানের জলে ভাসতে দিয়েছিলে…, বিনয় মজুমদারের ছেলেবেলা কবিতার নির্মোহ বয়ান : বাবুই পাখির বাসা সঙ্গে নিয়ে একটি কিশোরী/ চলেছিল ব্রহ্মদেশে; কিন্ত সে শৈশবে সেই বাসাটি কখনো/ ব্যবহার করিনি তো। তখনো শিথিল হয়ে ঝুলে থাকতাম।/ তখনো সুদৃঢ় হয়ে ভালোভাবে দাঁড়াতে পারি না।…, উৎপলকুমার বসু ভোর সাড়ে ছটা কবিতায় রুক্ষভাবে বলে ওঠেন : যারা ফিরবে বলেছিলে—আজ কাল অথবা আগামী/ যে-কোনো সপ্তাহে মাসে বছরের ক্লান্ত শেষদিকে/ তারা মিথ্যে বলেছিলে।/ কলকাতা এক-একদিন তোমাদের পুরনো প্রলাপে, লঘু/ কিশোর মিথ্যায় ভরে ওঠে। মনে পড়ে হালের রণজিৎ দাশের এপ্রিল কবিতার কিছু লাইন, যেখানে তিনি তার জন্মমাস এপ্রিলকে বলছেন, আমি ভীষণ একা, তুমি তিরিশটা দিন আমাকে/ একটু সঙ্গ দাও/পঞ্চাশ সালে তুমি দেখেছিলে আমার আসন্নপ্রসবা মা-কে/ সে গল্প বলো… তুমি দেখেছো আমার সুসময়—দীর্ঘ কৈশোর/ তখনকার সমস্ত ছড়া আমি ভুলে গেছি/ তুমি সেইসব ছড়া বলো…, আমাদের মোহাম্মদ রফিক কী আশ্চর্য ভাঙা ভাঙা পঙ্‌ক্তিতে পরিপূর্ণ নিরর্থকতার অর্থপ্রয়াস নির্মাণ করেন : ঘর থেকে এই উঠোন,/ উঠোন তো ওই বহুদূর ঘাট থেকে এই পুকুর,/ পুকুর তো ওই বহুদূর ছায়া থেকে এই লোক,/লোকটা তো ওই বহুদূর….. নেই থেকে এই তুমি, / তুমি তো আজ ওই দূর, বহুদূর

বাংলার নাতিদূর ‘আধুনিক’ কালের কবিরা নস্টালজিক হলেও তাকে সরলরৈখিকভাবে প্রকাশ করতে নারাজ। অনেকটাই দ্বান্দ্বিক, বহুমাত্রিক তাদের অতীতভ্রমণ ও যাপনের কৌশল; তাদের কাব্যিক নস্টালজিয়া।

অবশেষে, তবু, সবকিছু ছাপিয়ে মনে পড়ে আশৈশব বুকের ভেতর পিনপিনিয়ে গোপন কান্নার সুর তোলা যতীন্দ্রমোহন বাগচীর সেই কাজলা দিদির কথা;
                    বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই
                    মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?

আহা! আমাদের সেই শোলক বলা কাজলা দিদিরা আজ কোথায়!

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com