হোম গদ্য আল মাহমুদ : কুহলি পাখির পিছু পিছু

আল মাহমুদ : কুহলি পাখির পিছু পিছু

আল মাহমুদ : কুহলি পাখির পিছু পিছু
403
0

কে জানে ফিরলো কেন, তাকে দেখে কিষাণেরা অবাক সবাই
তাড়াতাড়ি নিড়ানির স্তূপাকার জঞ্জাল সরিয়ে
শস্যের শিল্পীরা এসে আলের ওপরে কড়া তামাক সাজালো।
একগাদা বিচালি বিছিয়ে দিতে দিতে
কে যেন ডাকলো তাকে; সস্নেহে বললো, বসে যাও,
লজ্জার কি আছে বাপু, তুমি তো গাঁয়েরই ছেলে বটে
আমাদেরই লোক তুমি। তোমার বাপের
মারফতির টান শুনে বাতাস বেঁহুশ হয়ে যেতো।
পুরনো সে কথা উঠলে এখনও দহলিজে
সমস্ত গাঁয়ের লোক নরম নীরব শোনে।
সোনালি খড়ের স্তূপে বসতে গিয়ে প্রত্যাগত পুরুষ সে জন
কী মুস্কিল দেখলো যে নগরের নিভাঁজ পোশাক
খামচে ধরেছে হাঁটু। উরুতের পেশী থেকে সোজা
অদূর কোমর অবধি
সম্পূর্ণ যুবক যেন বন্দি হয়ে আছে এক নির্মম সেলাইয়ে।
যা কিনা এখন তাকে স্বজনের সাহচর্য, আর
দেশের মাটির বুকে, অনায়াসে
বসতে দেবে না।
তোমাকে বসতে হবে এখানেই,
এই ঠান্ডা ধানের বাতাসে।
আদরে এগিয়ে দেওয়া হুঁকাটাতে সুখটান মেরে
তাদের জানাতে হবে কুহলি পাখির পিছু পিছু
কতদূর গিয়েছিলে পার হয়ে পানের বরোজ।
এখন কোথায় পাখি? একাকী তুমিই সারাদিন
বিহঙ্গ বিহঙ্গ বলে অবিকল পাখির মতন
চঞ্চল সবুজ লতা রাজপথে হারিয়ে এসেছো।
অথচ পাওনি কিছু, না ছায়া না পল্লবের ঘ্রাণ
কেবল দেখেছো শুধু কোকিলের ছদ্মবেশে সেজে
পাতার প্রতীক আঁকা কাইয়ুমের প্রচ্ছদের নিচে
নোংরা পালক ফেলে পৌর—ভাগাড়ে ওড়ে নগর শকুন।

[খড়ের গম্বুজ : সোনালি কাবিন/আল মাহমুদ]

পঞ্চাশের মহত্তম কবি আল মাহমুদের কাব্যকৃতির অমর স্বাক্ষর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’।

কলকাতা থেকে ১৯৭১ সালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৪টি সনেট নিয়ে ‘সোনালি কাবিন’ পুস্তিকা পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে প্রগতি প্রকাশনী, ঢাকা থেকে আরও ৪০টি কবিতা সংযোগে প্রকাশিত হয়। এ-গ্রন্থের ১৭ নম্বর কবিতা ‘খড়ের গম্বুজ’। এ-কবিতায় আল মাহমুদ নিজের কাব্যভবিষ্যৎকে নিপুণভাবে চিত্রিত করে যান অদৃষ্ট ইশারায়। ১১ জুলাই ২০১৮ কবির ৮৩তম জন্মজয়ন্তী। জীবনের এ পর্যায়ে এসেও কী কাব্যে কী যাপনের আল মাহমুদ হেঁটে চলেছে কুহলি পাখির পিছু পিছু।

কবি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে বালক ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে একটি টিনের সুটকেস নিয়ে পাজামার সাথে শার্ট পরে রাজধানীতে গিয়ে উঠেছিলেন, মোল্লাবাড়ির সেই ব্যাপারীর ছেলে আবদুস শুকুর ওরফে আল মাহমুদ কতটুকু পৌর-ভাগাড় থেকে নগর শকুনদের সাথে প্রতিযোগিতা করে তার ন্যায্য আদায় করেছেন আর পল্লবের ঘ্রাণ আর ছায়ায় ছায়ায় কতটুকু ফিরে গেছেন। বিহঙ্গ বিহঙ্গ বলে অবিকল পাখির মতন শস্যের শিল্পীদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন—তা আজকের উপজীব্য।


কবি আল মাহমুদের কবিতার বিষয়-আসয় ব্যক্তিগত হলেও নাগরিক বাস্তবতাকে নির্মমভাবে কবিতার ধারণ করেছেন।


১.
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’-এ আল-মাহমুদ তিরিশের পঞ্চ কবির অনুবর্তী হয়ে আত্মকেন্দ্রিক পরিপার্শ্বিক ঘটন-অনুঘটনকে পদ্যময় করে তুলেছেন। এ নিয়ে ষাটের তুখোড় কবি-সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন :

‘… তার নিচু কন্ঠস্বরে তিনি তাঁর অনুভবের কথা, তাঁর পারিপার্শ্বিক কম্পামান অগ্রসরমান জীবনের কথা বলে গেছেন। …এক সুস্থ-স্বস্থ-স্বচ্ছ, জগতের অধিবাসী এই কবি সযত্ম ও পরিচ্ছন্ন ছন্দ ও ভাষার অধিকারী।[সমকাল : কবিতা সংখ্যা ১৩৭১-৭২]।’

এ পর্যায়ে কবি আল মাহমুদের কবিতার বিষয়-আসয় ব্যক্তিগত হলেও নাগরিক বাস্তবতাকে নির্মমভাবে কবিতার ধারণ করেছেন।

জীবিকাবিজয়ী দেহে কোন ঘরে দাঁড়াব রে আজ
কাকের ধূর্ততা নিয়ে ফিরেছি তো এখানে ওখানে
খুজেঁছি জলের কণা থর থর ধুলোর তুফানে
এখন বুঝেছি মানে—এও এক নারকী সমাজ

[তৃষ্ণার ঋতুতে : লোক-লোকান্তর]

নাগরিক এ বাস্তবতায় জলদস্যুর প্রতীকে নগরের এ নতুন নাগর প্রেমের সিম্ফোনিতে নস্টালজিয়ায় ভুগেছেন গাঁয়ের যে বালিকাটির প্রেমে, যে বলেছিল :

জলদস্যুর জাহাজে যেয়োনা ভেসে
নুন ভরা দেহে আমাকে জড়িয়ে নাও।
জল ছেড়ে এসো প্রবালেই ঘর বাধি
মুক্তো কুড়াতে যেয়োনা সুদূরে ভেসে।

[সমুদ্র বিলাস : লোক-লোকান্তর]

গাঁয়ের এ নারীই আল মাহমুদের কবিতায় বার বার ফিরে এসেছেন। আল মাহমুদের বিভিন্ন পর্যায়ের কবিতায় যে নারী প্রচ্ছন্ন হয়ে উঁকি দিতে গেছেন তা ভাদুগড়ের শ্যামলগড়ের সেই, প্রথম নারী—

দেখবেন ভাদুগড়ের শেষ প্রান্তে
এক নির্জন বাড়ির উঠোনে কুটে আছে
আমার মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাসবতী
একটি ম্লান দুঃখের করবী :

[রাস্তা : লোক-লোকদের]

কিন্তু লোক লোকান্তরে কবি আল মাহমুদ তিরিশের ভাষা উপমা উৎপ্রেক্ষা বাক্‌ভঙ্গিতে আক্রান্ত। ‘কালের কলস’-এ এসে কবি নিজস্ব ভাষা খুজেঁ পান, লোকজ উপাদানের সাথে সাথে এর বর্ণনা ভঙ্গিও লোকজ হয়ে ওঠে। বিশিষ্ট সমালচক গোলাম মুরশিদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :

‘… পল্লির শব্দ ও প্রবাদ প্রবচনকে আধুনিক কোনো কবি সম্ভবত এমন নিপুণ ও শৈল্পিক ভঙ্গিতে ব্যবহার করেন নি। পল্লির উপাদান থেকে তিনি নির্মাণ করেন তার উপমা, চিত্রকল্প। প্রকৃত পক্ষে তিনি কাব্য ভাষাক্ষেত্রে এক অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। জসীমউদ্‌দীন যেখানে লোক সাহিত্যের উপাদানের উপর তার কুটির তৈরি করেন, আল মাহমুদ সেখানে আধুনিক এক প্রসাদের কারুকার্যে লৌকিক উপাদান ব্যবহার করেন। কেননা, আল মাহমুদ অত্যন্ত সংবেদনশীল, সচেতন ও বিদগ্ধ শিল্পী, তার উপলব্ধির গভীরতা জসীমউদ্‌দীনের তুলনায় অতলস্পর্শী; তদুপরি অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ছন্দের এই ত্রিবিধ চলনেই বর্তমান কবির স্বচ্ছন্দ ব্যবহার অনেকের কাছেই ঈর্ষার বস্তু হতে পারে।’

[পূর্ববাংলার সাহিত্য : কবিতা, ‘দেশ : ১০ জুলাই ১৯৭১]

আর, এ ঈর্ষাই আল মাহমুদকে জীবনের উপান্ত পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ‘সোনালি কাবিনে’র উৎসর্গ পত্রে তাই আল মাহমুদ লিখেছেন :

শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, শহীদ-কাদরী—আমাদের
এক কালের সখ্য ও সাম্প্রতিক কাব্য-হিংসা অমর হোক।

১১ জুলাই ১৭ কবির ৮২তম জন্মজয়ন্তী। তার অমরকৃতি ‘সোনালি কাবিন’ ইতিমধ্যে কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে গেছে। তার কবিকৃতি নিয়ে উপমহাদেশে বিশিষ্ট চিন্তক শিবনারায়ন রায়ের মন্তব্য সত্যই অনন্য হয়ে আছেন। তিনি লিখেছেন :

‘Mohmud has on extraordinary gift for Telescoping discrete levels of experience; in his poem I find a mervellous fusionof passion and wit which reminds me occasionally of Bishnu Day. The complete secularism of his approach is also striking, more so … he was born and Brought up in a very conservative Muslim religious family; It is not a secularism forced by some ideology, but Present naturally and ubiquitously in his metaphors, Images and themes. [I Have seen Benggl’s Face- Sibnarayan Roy and Marion Madder (Ed…), 1974]’

তিরিশের দশকে যে বাংলা কবিতা ইউরোপবাহিত আধুনিকতার অনুরণন ‘ক্লেদ কসুম’ হয়ে নাগরিক যন্ত্রনার চিন্তা ভাষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; পঞ্চাশের দশকে এসে বাংলাদেশের কবিতা তা একান্ত বঙ্গজ হয়ে ওঠে। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানদের লোকজ জীবনাচার-ধর্ম-ঐতিহ্য ও ভাষার সমৃদ্ধে আলাদা হয়ে ওঠতে দেখি আল মাহমুদের কবিতায়, যা তার অন্যান্য সহযাত্রী কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীসহ নাগরিক কবিদের উন্নাসিক আধুনিকায়নে আমরা দেখতে পাই না। সেক্যুলার তকমা দিতে গিয়ে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য চ্যুত হয়ে শেকড়হীন রূপের নাগর হয়ে ওঠে বাংলা কবিতা। কিন্তু কবি আল মাহমুদের এ সচেতনতা আমরা লক্ষ করি কবিতায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ইংরেজি-আরবি-ফারসি শব্দের পাশাপাশি প্রাচীন সংস্কৃত সাধু-চলতি শব্দ নির্দ্বিধায় ব্যবহর করেছেন তার কবিতায়। উদাম, কাউয়া, গাঁওয়ার, বাদাম, পাইলা, টুম, হগল, আজকা, রও, উরত, সুখ টান, ঠিলা, জেয়র, শরমিন্দা, দেনমোহর, কাবিন, খোরগী, ছেদুর, ইষ্টা, বান্দির পুত্র, বাইন্ধা, আহে, জবর, মিছাঘোর, তাজ্জয, বাঙড়ি, নাদান, ইতর, পানিউড়ি, লানত, … মানত, কিসিম, সবক, কসুর, ইত্যাদি শব্দ আল মাহমুদের কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে কবিতা হয়ে ওঠেছে অনেক বেশি মাটিলগ্ন-মানুষের ভাষা ও হৃদয়ের কাছাকাছি।

আমার ঘরের পাশে ফোটেছে কি কার্পাশের ফুল?
গলায় গুঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শরবী,
কোথায় রেখেছো বলো মহুরার মাটির বোতল
নিয়ে এসো চন্দ্রোলোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি।

[সনেট-৫ : সোনালি কাবিন]

২.
কবি আল মাহমুদ একুশের ফেরারি কবি। গ্রাম থেকে ফেরারি হয়ে কবিতা চর্চায় ঢাকা এলেও তিনি বার বার ফিরে গেছেন কবিতার জন্য বাংলার গ্রাম-গঞ্জে শস্যের শিল্পীর কাছে, মটির কাছাকাছি। শুধু ‘সোনালি কাবিন’ সনেট সিকোয়েন্স নিয়ে বলতে গিয়ে কবি ও শিল্প-সমালোচক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিখেন : ‘সোনালি কাবিন’ এই দীর্ঘ কবিতার মধ্যে আছে প্রতীকী ভাষণ, নিখুঁত বর্ণনা; আবেগ স্পন্দিত স্তবক; বিচ্ছিন্ন সুন্দর লাইন। অতীতের ব্যবহার তিনি করেছেন অতীতের ভিত্তিতে, প্রতিটি পর্বের স্টাইলের মধ্যে যাপন করেছেন, ফলে অতীত হয়ে উঠেছে এক ধরনের বর্তমান। বর্তমান : অতীতকে ইমারতের মতন গড়ে তোলার জন্য তিনি এক চরিত্র ব্যবহার করেছেন বাঙালি মনোস্বভারের প্রতিনিধি হিসেবে। ঐ ব্যক্তি বাঙালি, কবি, আবহমান মনুষ, ইতিহাসের মধ্যে হৃদয়ের ইতিহাস গেঁথে দিয়েছেন, জনপদ, শস্য, হৃদয় সবই এক মহাসত্যের বিভিন্ন দিক। আর শব্দ আবহমান, চিরকালীন, গ্রামীণ এবং লোকজ। আল মাহমুদের কৃতিত্ব এখানেই।’ [দৈনিক বাংলা; ২২ জুলাই ১৯৭৩]


বাঙলার চিরায়ত রূপ, এর মাটি ও মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, লোকজ উপাত্তে ঐতিহ্য মণ্ডিত হয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে আল মাহমুদকে কেন্দ্র করে। 


তিরিশের কবিদের নগর চেতনা, নাগরিক বিবমিষা, জটিল জঙ্গম মনোভূগোল থেকে বাংলা কবিতাকে আবার তার মর্মমূলে ফিরিয়ে নেয়ার তাগিদেই কবি আল মাহমুদ নাগরিক কবিদের মতো কোকিলের ছদ্মবেশ না নিয়ে কুহলি পাখির পিছু পিছু গিয়েও বার বার কবিতাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন ঘরের গম্বুজের কাছে, নিড়ানির স্তূপাকার জঞ্জালের কাছে এবং শস্যের শিল্পীদের কাছে, যাদের সাথে বসে কড়া তামাকে সাজালেন বাংলা কবিতার সত্যিকার লোকজ ব্যঞ্জন।

‘আমার নিবাস জেনো লোহিতাপ মৃত্তিকার দেশে
পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পাট্টিকেরা পুরীর গৌরব,
রাক্ষসী গুল্মের কেউ সবকিছু গ্রাস করে এসে
ঝিঁঝির চিৎকারে বাজে অমিতাও গৌতমের স্তব।

[সনেট-৯: সোনালি কাবিন]

‘লোক-লোকান্তর’ থেকে সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার গল্পে ফুল ফুটেছে’ পর্যন্ত কবিতার-কবি আল মাহমুদ বাংলা কবিতাকে জনমানুষের বিশ্বাসের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন; তার ভাষাকে লোকজ বুলির কাছাকাছি; তার শিল্পকে সার্থকভাবে পাঠকের সহজ বোধে পৌঁছে দিয়েছেন। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতা বা নিরীক্ষার নামে অনাচারে তিনি ঝুঁকেন নি। তিনি সহজাত আনন্দে কবিতা বুনে গেছেন আপন স্বরে। তার কাব্যকৃতি নিয়ে কবি সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন : ‘এক ধরনের সহজ-সরল অনায়াস মোচড়হীন কবিত্বশক্তির অধিকারী … তার প্রকরণের সেই মোচড়হীন অনায়াস সহজে সচ্ছলতা [করতলে মহাদেশ, পৃষ্ঠা : ১৭২]

আর মাহমুদের কবিতার উপমা-উৎপ্রেক্ষা এককভাবে হয়ে ওঠে উপভোগ্য। যেন পূর্ণ কবিতার নান্দনিকতায় হয়ে ওঠে তৃপ্তিময়। বাঙালি লোক মানসের জীবনের উপাত্তগুলো হয়ে ওঠে কবিতার অনিবার্য অনুষঙ্গ। যেমন :

ক. কবিতা বনের পাখি কুড়ানো হাসের ডিম
ম্লানমুখ বউটির দড়ি-ছেঁড়া হাড়ানো বাছুর

খ. চূড়ির শব্দ যেন অন্ধকার গেলাফের ওপর রুপোর কাররুকাজ

গ. তোমার টিকলি হয়ে হৃৎপিণ্ড নড়ে দুরু দুরু

ঘ. উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়

ঙ. জীবনে জলাধারে হতে চাই তুমুল রোহিত

৩.
বাংলা কবিতায় পঞ্চাশের দশক বাঙালি মুসলমানের জন্য এক উজ্জ্বল সময়। এ-দশকেই ৫২-র সৃজনশীলতা প্রবলভাবে প্লাবিত হয়েছিল বাংলাদেশের কবিতায়। পঞ্চাশের কবিতাকে দুটো পর্বে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম পর্যায়ের কবি : আবদুল গনি হাজারী, সৈয়দ নুরুদ্দীন, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুল রশিদ খান, প্রজেশকুমার রায়, হাবীবুর রহমান, আতাউর রহমান, মাযহারুল ইসলাম প্রমুখ। দ্বিতীয় পর্যায়ের কবি : শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, ওমর আলী, আবদুস সত্তার, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আজিজুল হক, আলা উদ্দিন আল আজাদ, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, ফজর শাহাবুদ্দীন, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, দিলওয়ার, লতিফা হিলালী, আবু বকর সিদ্দিক, জিয়া হায়দার প্রমুখ।

পঞ্চাশের প্রথম পর্যায়ের কবিরা মূলত বাস্তববাদী—তাদের কবিতায় নারী ও নিসর্গ তেমনিভাবে আচম্বিত হয় নি। সে তুলনায় দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিরা অনেক বেশি রোমান্টিক ও আধুনিক। শাসসুর রাহমান শহরে মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন নাগরিক ভাষার বাক্‌ভঙ্গিতে, শহীদ কাদরীর কবিতায় নাগরিক দ্বন্দ্ব ও উল্লাস আধুনিকতায় উপস্থাপিত হয়েছে। সাবলীল-সচল-রোমান্টিক-বিরল প্রত্যয় হয়ে প্রকাশ পেয়েছে আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতায়। নারী ও প্রকৃতি—স্রোতে ভেসে উপস্থাপিত হতে দেখা যায় ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতায় এবং শরীরী প্রেম ক্রমাগত মুখ্য হয়ে ওঠে তার কবিতাবলীতে। মনিরুজ্জমানের ব্যক্তিগত পৃথিবী ও পরিপার্শ্বে ছন্দময় প্রকাশ হয়ে ওঠে তার কবিতায়। পুঁথির নবরূপ পরিগ্রহণ করেছে আবদুল রশীদ ওয়াসেকপুরী ও আবদুর রশীদ খানের কবিতা। নিরীক্ষাপ্রবণ হয়ে সৃষ্টিশীলতায় অস্থির থেকেছেন সৈয়দ শামসুল হক। স্থান-কাল-ব্যক্তির উপস্থিতিতে প্রাতিস্বিক দার্শনিকতা অমরা লক্ষ করি ওমর আলীর কবিতায়। অতি সমাজ চেতনায় অগ্নিময় উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ করা যায় দিলওয়ারের কবিতায়। হাসান হাফিজুর রহমান পঞ্চাশের প্রথম প্রকৃত সমাজ সচেতন কবি—তির্যক, দৃঢ় ভাব আমরা লক্ষ করি তার কবিতায়। সাইয়িদ আতিকুল্লাহর কবিতায় নির্বস্তুকতা প্রকাশ গেয়েছে সুস্পষ্টভাবে। আর পাঠক লক্ষ করে আজিজুল হকের কবিতায় ব্যক্তি বিশ্বের কারুময় উপস্থিতি। আদিবাসী ও আরব বিশ্বের কাব্য সৌন্দর্য আমরা প্রত্যক্ষ করি আবদুস সাত্তারের কবিতায়। সমাজ সচেতনতা ও রোমান্টিকতার জ্বলজ্বলে প্রকাশ আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতায়। গণমানুষের অধিকার ও হাহাকার আবু বকর সিদ্দিকের কবিতায় উঠে এসেছে। আল মাহমুদের কবিতার বিবেচনা, উপস্থাপনা, কবিতার চিত্র উন্মোচনে আরও একটু সমকালীন কাব্যচরিত্রকে দৃশ্যে আনতে হবে।

বাংলা কবিতার এ বিশাল কাব্য যাত্রায় পঞ্চাশের কবিতার পাঠক বিভক্ত হয়ে যায়। নগর কেন্দ্রিক নাগরিক উল্লম্ফন যেভাবে কবি শাসসুর রাহমান কেন্দ্রিক আবর্তিত হয়েছে, তেমনি আবহমান বাঙলার চিরায়ত রূপ, এর মাটি ও মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, লোকজ উপাত্তে ঐতিহ্য মণ্ডিত হয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে আল মাহমুদকে কেন্দ্র করে। আর আল মহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান ও ওমর আলীর কবিতা অনেক বেশি মৃত্তিকা স্পর্শ হয়ে ওঠে এ সময়ে।

তাই কবি সমালোচক মান্নান সৈয়দ কবি আল মাহমুদকে চিহ্নিত করেছেন এভাবে।….

‘কাব্য মূল্যায়নে প্রথম দিকে নারী ও নিসর্গের সম্মোহন দেখা গেছে। তারপর গ্রামীণতার সঙ্গে উপস্থিত হয়েছে আধুনিকতা। প্রকরণে কোনো পরীক্ষা বা অভিনবত্ব নেই, অনেকখানি প্রচল নির্ভর, কিন্তু তার মধ্যেই আল মাহমুদ গভীয় সঞ্চারি কষ্ট উৎকীর্ণ করে শক্তি অনেকখানি কবিতার গভীরতায় ও আন্তরিকতায় নিয়ে গেছেন, এবং সমস্ত উচ্চারণকে একটা নিবিড় শিল্পমণ্ডিত বোধে উত্তীর্ণ করেছেন।’

৪.
পঞ্চাশের কবিতাকে অনেকখানি প্রভাবিত করেছে বিশ্বকবিতাও। তাদের অনূদিত বিশ্বভূগোল একটু উন্মোচন করলে তার একটি রূপ পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর সাথে যদি পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চাশের বাকিদের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের কবিতার আলাদা স্বাতন্ত্র্য। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চাশের কবিতার দুটি চরিত্র লক্ষ করা যায়।

এক. বামপন্থি সমাজ চেতন ধারা।
দুই. বাঁধন ছাড়া রোমান্টিকতা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের কবিতার পঞ্চাশের দশকে এসেছিল পাকিস্তানবাদ ও বামপন্থি কমিউনিস্ট ধারার বিপরীতে দেশত্ববোধক রোমান্টিতা। বাংলাদেশের পঞ্চাশের কবিরাই সমাজ সচেতনার সঙ্গে নান্দনিকতার একটি মিশেল ঘটাতে পেরেছিলেন। এরা কবিতাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন রোমান্টিকতার কাছে। এ দশকে, বিশেষ করে আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান ও ওমর আলীর কবিতা দেশ-মা-মাটি প্রত্যয়ে অভিন্ন প্রতীক হয়ে উপমা-উৎপ্রেক্ষার সমন্বিত শিল্পভাষ্য হয়ে ওঠে। আর এককভাবে আল মাহমুদ শুধু কবিতাকে ভালোবেসে এগিয়ে নিয়ে গেছন বাংলা কবিতার সোঁদা, মাটি, শিল্প বৈভব। একে একে রচনা করেছেন : লোক-লোকান্তর, কালের কলস, সোনালি কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, অদৃষ্টবাদীদের রান্না বান্না, বখতিয়ারের ঘোড়া, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, প্রহারান্তরে পাশফেরা, একচক্ষু হরিণ, মিথ্যাবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, দোয়েল ও দয়িতা, পাথির তাছে ফুলের কাছে, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, নদীর ভেতরে নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, তোমার জন্য দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ, তুমি তৃষা তুমিই পিপাসার জল, সেলাই করা মুখ, তোমার রক্তে তোমার গন্ধে, তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে’ সহ তেইশটি কাব্যগ্রন্থ।


নাগরিক জীবনের অনিবার্যতাকে মেনে নিয়েও বাংলা কবিতাকে শেকড়ের দিকে ফেরানোর অনিবার্যতা আল মাহমুদের মতো আর কেউ বোঝেন নি এমন করে।


৫.
বাংলা কবিতার এ সমাজতন্ত্রকে বিশিষ্ট চিন্তক হুমায়ুন কবির চিহ্নিত করেছেন এভাবে :

পশ্চিম বাঙলার প্রকৃতি বাঙালির কবি মানসকে যে রূপ দিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে লোকাতীত রহস্যের আভাস। অনির্বচনীয়ের আস্বাদে অন্তর সেখানে উম্মুখ ও প্রত্যাশী, জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টাকে অতিক্রম করে প্রশান্তির মধ্যে আত্মবিস্মরণ। বাঙলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব বাংলার নিসর্গ হৃদয়কে ভাবুক করেছে বটে, কিন্তু উদাস করে নি। দিগন্ত প্রসারিত প্রান্তরের অভাব সেখানেও নাই, কিন্তু সে প্রান্তরে রয়েছে অহোরাত্র জীবনের চঞ্চল লীলা । পদ্মা-যমুনা-মেঘনার অবিরাম স্রোতধারায় নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনের ধ্বংস।

[বাংলার কাব্য-১৩৫৪]

আল মাহমুদের কবিতায় চিরকালের অনন্য চরিত্র হচ্ছে তার দেশজতা, মাটি ও মানুষ একসাথে যূথবদ্ধ সমম্বয় সাধন। জনপদ ও জনতা একসাথে উঠে এসেছে তার কবিতায়। নারী প্রেম ও দেশপ্রেম একটি ভিন্ন রেখায় এসে মিলেছে আল মাহমুদের কবিতায়। একটি সুহাসিনী বোনের জন্য কবিতার শেষ স্তবকে দেশ আর প্রিয়তমা নারী এক হয়ে গেছে।

কৃষ্ণা সে। কিন্তু আমার দেশ তা যত কালোই হোক।
কেশদাম কি উদ্দাম আর রুক্ষ সে। হোক, তবুও উত্তর বাঙলায়
গুল্মের মতই সে পানির পিয়াসী, বৃষ্টি প্রার্থিনী দেশ আমার।
কী শীতল পয়োধরা সে। তবুও এই পর্বত আর পাথরহীন প্রান্তরে
তার উপত্যকাই তো শত সন্তানের আশ্রয়।
তার কক্ষস্থল বিপ্লবের ধাত্রী।

যে কবি কুহলি পাখি পিছু পিছু ছুটতে গিয়ে নগন জঙ্গমে পৌর-ভাগাড়ের পণ্য ভাগাভাগি করতে চেয়েছেন, কিন্তু অলক্ষে বার বার ফিরে এসেছেন খড়ের গম্বুজের কাছে। কারণ :

‘মহানগরের ভদ্রবেশী বেশ্যা, লম্পট, হিরোইনসেবী ও ছিনতাইকারীর
প্রত্যহ পাপের দেনায় আমরা অতিষ্ঠ,
এর সাথে যোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহানপণ্ডিতেরা…

[কদররাত্রির প্রার্থনা : একচক্ষু হরিণ]

এই যে প্রত্যার্বতন, শিশিরে পাজামা ভিজে যাওয়া, শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতন লাল সূর্য ওঠা, জলের দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাওয়া, দীর্ঘ পাতাগুলো না না বলে কাঁপা, বাবার নিচু গলায় পড়তে থাকা …ফাবি আইয়ে আলা ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান…। এ প্রত্যাবর্তন পুরো বাংলা কবিতার শেকড়ের দিকে ফেরা। আর ‘সোনালি কাবিন’ থেকে ‘তোমার গন্ধে ফুল ফটেছে’ হলো মাকে জড়িয়ে ধরে প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলা। যখন কবি আল মাহমুদ বলে ওঠেন :

‘তোমার হাতে ইচ্ছে করে খাওয়ার
কুরুলিয়ার পুরোনো কই ভাজা;
কাউয়ার মতো মুন্সি বাড়ির দাওয়ায়
দেখবো বসে তোমার ঘষা মাজা
বলবে নাকি; এসেছে কোন গাঁওয়ার?
ভাঙ্গলে পিঠে কালো চুলের ঢেউ
আমার মতো বোঝেনি আর কেউ
তবু যে হাত নাড়িয়ে দিয়ে হাওয়ায়
শহরের পথ দেখিয়ে দিলে যাওয়ার।

[তোমার হাতে: সোনালি কাবিন]

হ্যাঁ, নাগরিক জীবনের অনিবার্যতাকে মেনে নিয়েও বাংলা কবিতাকে শেকড়ের দিকে ফেরানোর অনিবার্যতা আল মাহমুদের মতো আর কেউ বোঝেন নি এমন করে।

মাঈন উদ্দিন জাহেদ

জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২; চট্টগ্রাম। বিএ (অনার্স), এম.এ (বাংলা), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা: শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :

সেপ্টেম্বরের ইলশে রোদ ঘিয়ে বিষ্টি [পোয়েটিক্স-২০০৫]
নিখিলেশ কেমন আছো [গলুই ২০১৭]
আলৌকিক প্রণোদনা [গলুই ২০১৯]
ইমেল : jahed313@gmail.com / mayeen.u.jahed@kafcobd.com

Latest posts by মাঈন উদ্দিন জাহেদ (see all)