হোম গদ্য আল মাহমুদের উপন্যাসের জগৎ

আল মাহমুদের উপন্যাসের জগৎ

আল মাহমুদের উপন্যাসের জগৎ
430
0

কবি খ্যাতিতে বেশি উজ্জ্বল আল মাহমুদ [জন্ম ১৯৩৬-মৃত্যু ২০১৯] গত আড়াই দশক ধরে ঔপন্যাসিক হিসেবেও কম আলোচিত নন। তার কাব্যপ্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর সোনালী কাবিন [১৯৭৩] প্রকাশের পরপরই গল্পকার আল মাহমুদের আবির্ভাব। চিত্রকল্প নির্মাণে তার অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় কাব্যসম্ভার ছাড়িয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত-তেও পরিস্ফুটিত। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত এ গল্পগ্রন্থটি কথাসাহত্যিক আল মাহমুদের দার্ঢ্য উপস্থিতিকে নিশ্চিত করেছে। ক্রমে ক্রমে সৌরভের কাছে পরাজিত [১৯৮৩], গন্ধবণিক [১৯৮৬] প্রভৃতি তার গল্পকার পরিচয়ের তেজোময় প্রকাশ। তারপর এল ঔপন্যাসিক অভিধা—দেড়শ পৃষ্ঠার আত্মজৈবনিক প্রকৃত অর্থে আত্মকৈশোরিক, রচনা যেভাবে বেড়ে উঠি গদ্য ধারায় রচিত প্রথম দীর্ঘ প্রয়াস। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এ গ্রন্থটি যথার্থ বিচারে উপন্যাস না হলেও উপন্যাসের স্বাভাবিক কিছু লক্ষণ এতে সুস্পষ্ট। ১৯৯২-এ প্রকাশিত ডাহুকী তার প্রথম সার্থক উপন্যাস। এ গ্রন্থটিই তার উপন্যাস লেখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল।’১ পরবর্তী এক দশক ধরে আল মাহমুদের ঔপন্যাসিক প্রতিভা ক্রমপ্রসারমাণ। কবি ও কোলাহল, উপমহাদেশ  এবং কাবিলের বোন তিনটি উপন্যাসই প্রকাশ পেয়েছে ১৯৯৩ সালে। পরের বছরের একমাত্র উপন্যাস পুরুষ সুন্দর নারী সমকামিতার চিত্র—যে কারণে উপন্যাসটি বাঙলা ভাষায় রচিত কথাসাহিত্যে উল্লেখের দাবিদার। ১৯৯৫-এ প্রকাশ পায় তার আরও তিনটি উপন্যাস নিশিন্দা নারী’, মরু মুষিকের উপত্যকা এবং আগুনের মেয়ে। অভিনব বিষয় এবং উপস্থাপনা ভঙ্গির প্রসাদে তার অনেক উপন্যাসই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সমকালীন প্রসঙ্গের উপর সাংবাদিকসুলভ মন্তব্য তার কোনো কোনো উপন্যাসে উপস্থিত থাকায় আল মাহমুদের ঔপন্যাসিক পরিচয়টি বিতর্কিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার প্রতিভার স্বীকৃতি অনস্বীকার্য। তার রচিত অন্যান্য গৌণ উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে যে পারো ভুলিয়ে দাও, পুত্র, চেহারার চতুরঙ্গ ইত্যাদি। সুবিশাল প্রেক্ষাপট নির্মাণে আল মাহমুদ পিছু পা নন—যার প্রমাণ কাবিলের বোন যদিও উপন্যাসটিতে কখনও কখনও গতিচ্যুতি ঘটেছে; আবার ছোট বলয়ের মধ্যে উপন্যাসের গভীর বোধ সৃষ্টিতেও তিনি পারঙ্গম—উদাহরণ হিসেবে নিশিন্দা নারী সর্বাগ্রে উল্লেখ্য।

ডাহুকী বাংলাদেশের সাধারণ উপন্যাসগুলোর সমান আয়তনের। একশ পৃষ্ঠার এ কলেবরে প্রধান যে চরিত্র সেটি আতেকা বানু। আটত্রিশ বছরের বর্তমান আতেকা এবং তার কিশোরীকাল উপন্যাসটিতে অঙ্গাঙ্গীভাবে উপস্থাপিত। সে উপস্থাপনায় প্রধান উপাত্ত এককালের স্কুলে যাওয়ার সাথি কেরামতের—যার সাথে তার প্রেম। যে প্রেমের দীপ্তি দীর্ঘপর আজও আতেকার ভেতর আকাঙ্ক্ষা ছড়ায়। উপন্যাসে অন্য যে মানুষগুলো উপস্থিত তাদের মধ্যে আতেকার স্বামী অধ্যাপক শাহেদ, কেরামতের স্ত্রী সুফিয়া বানু এবং দর্শনের অধ্যাপক ফিরোজ প্রধান। তবে অতৃপ্ত দাম্পত্য ছাড়াও উপন্যাসটিতে আরও যে একটি উপকাহিনি রয়েছে সেটি হলো অধ্যাপক শাহেদের শৈশব ও কৈশোর স্পর্শিত—যেখানে বেশ্যাপাড়ার একজন নারী পরম মমতায় উপস্থিত।

আতেকা বানু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপিকা। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এই দম্পতি কিন্তু পারিবারিক জীবনে সুখী নয়। সেই কবে ছোট এক ঘটনা থেকে পৃথক শোয়া শুরু করল তারা আর এক বিছানায় শুলো না। মাঝখানে স্বামীর নিকট-সান্নিধ্যে এসে পড়ল আতেকারই বান্ধবী অধ্যাপিকা ফিরোজা যাকে নিয়ে শাহেদ নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখে। অন্যদিকে শাহেদের কৈশোর তার মর্মদংশনের এক প্রধান উপাদান—যেখানে সমবয়সী বাতানা শাহেদের সঙ্গী। বাইশ-তেইশ বছরের পরীবানু তার অর্থদাতা, যে অর্থে শাহেদ বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত। শাহেদের বাবা শওকত শালকরের ছাপড়া ছিল বেশ্যাপাড়া সংলগ্ন। আবার সেভাবেই পরীবানু শাহেদের ফুফু। শাহেদের বর্তমান অবস্থান তো তার সকল অতীতকে অস্বীকার করার কারণেই সম্ভব হয়েছে। পরীবানুর অর্থে পুষ্ট শাহেদ নিজের বিশ্বাসঘাতকতার দাহে সবসময়ই প্রজ্বলিত যা আতেকার কাছে প্রকাশে সে ব্যর্থ। আর ফিরোজান স্বামী মতিন, সে তো চলে গেছে আমেরিকায় অথচ ফিরোজা তাকেই ভালোবাসত; আর তাই নিজের নিঃসঙ্গতাকে সে একাকার করতে চায় শাহেদের দুঃখবোধের সাথে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় আতেকা গ্রাম থেকে ফিরে এসেছে সফর অসমাপ্ত রেখেই—এসেছে সে নতুন এক উপলব্ধি নিয়ে, তা হলো আল্লাহর পথ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামের আতেকার প্রথম শিক্ষক ইমাম সাহেবের সান্নিধ্যে তাকে এ পথের সন্ধান দিয়েছে শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে। আতেকার প্রতি ইমাম হুজুরের সর্বশেষ কথা হলো :

‘আল্লাহ তোমার মতি সুস্থির করবেন। মনে রাইখো, হুদাই ভোগের মইধ্যে সুখ নাই আল্লারে যত বেশি ইয়াদ করবা, আল্লাহ তত বেশি তোমার ইয়াদ করব।’২


জটিল মনোজগতের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্বের ভাঁজগুলোকে আল মাহমুদ সুপরিকল্পিতভাবে আলো ফেলে ফেলে স্পষ্ট করেছেন।


সন্দেহ নেই আতেকার এ পরিবর্তনে পাঠক চমকিত হন; কিন্তু তাই বলে এমন পরিবর্তন মনুষ্য জীবনে অসম্ভব তেমনটি ধারণা করাও অযৌক্তিক। ব্যক্তিজীবনে অসুখী মানুষের জন্য এমন পরিবর্তন তো বরং বেশিই স্বাভাবিক। যে মানুষ সুখের সন্ধানে এ ঘাট ও ঘাট করছে সে যদি ধর্মের ঘাটে ভিড়ে সুখের সন্ধান পায় তবে তা অলৌকিক কিছু নয়। তাছাড়া আতেকা ‘ধর্মের বিশ্বাস না করুক, আতেকা তো নাস্তিক নয়। আতেকা চায় ধর্ম ও সামাজিক ঐতিহ্যের মধ্যে তার ছেলেমেয়েরা মানুষ হোক।’৩ যদিও ইমাম সাহেবের উপস্থিতিতে আতেকার চেতনাগত যে অবলোকন তার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন অনেকেই। প্রথম উপন্যাসেই এমন উপাদানের উপস্থিতির কারণ আল মাহমুদের ঔপন্যাসিক শিল্পীসত্তার ব্যাপক পসারে বাধা হয়েছে বলে বর্তমান আলোচকের অনুমান।

তবে নিজের ঘরের প্রতি শাহেদের যে মনোযোগ তা ঘটেছে সংসারের ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির অবসানের কারণে। তাছাড়া পরস্পরের প্রতি তাদের যে প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যার প্রকাশ্য রূপ হলো তাদের সন্তানদ্বয়—রঞ্জু ও তামান্না। শাহেদের জন্য যে প্রশান্তি নেমে এসেছে তেমনটি কিন্তু লক্ষ করা যায় কেরামতের স্ত্রী সুফিয়ার ক্ষেত্রেও। আতেকার উপস্থিতির জন্য সুফিয়াও ঈর্ষান্বিত—গভীর রাতে স্বামী কেরামত আতেকার সাথে দেখা করতে গেলে সেও অনুসরণ করে কেরামতকে। সেসময় তার হাতে থাকে রামদাও। কেরামতের সাথে আতেকার সম্পর্কের প্রচারিত মন্তব্যগুলো তার কানেও গিয়েছে এবং সেসবের পরও সে নিজেকে সংবরণ করে। আর যখন আতেকা আত্মসমর্পণ করে সুফিয়ার কাছে তখন বোঝা যায় তার দার্ঢ্য এবং আস্থার উৎস কোথায় : সে তো তার স্বামীর ভরসার কথা। তার স্বামী বলেছে ‘আতেকাকে সে একদা ভালবাসত ঠিকই কিন্তু এখন সে সুফিয়াকে পেয়ে পরিতৃপ্ত।’৪ একজন সাধারণ কৃষক রমণীর কাছে সুখের প্রশ্নে অধ্যাপক আতিয়ার পরাজয় উপন্যাসটির একটি বিশিষ্ট অংশ যা আল মাহমুদের কলমে শিল্পিত; যদিও উপন্যাসটিতে শিল্পরুচির ব্যত্যয় ঘটেছে এমন কিছু উপাদানও রয়েছে যা আতেকা-কেরামতের কৈশোর প্রেমপর্বের সাথে যুক্ত।

আতেকার কিশোরকালের সাথি কামরুনের সাথে কেরামতকে নিয়ে যে সংলাপ তা গ্রামীণ কৃষক সমাজের প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক লাগে। কেরামত যখন গরুর দুধ দোহাতো তেমন এক সময় কামরুনকে আতেকার উক্তি :

‘এই কামরুনী গাইয়ের নিচে কি দেখছ?’

এগিয়ে গিয়ে খোঁচা দিয়ে কথা বলত আতেকা।

কামরুনও কথা বলতে জানত। সেও আসল জায়গায় খোঁচা মারত, ‘আমি গাইয়ের নিচে বইসা তর হাইরে দেখি।’

‘বেশি দেডিখস না। তাইলে কইলাম কেরামত ভাই গাই ছাইড়া তর উলান ধইরা দোয়াইব। তাড়াতাড়ি বাইর অইয়া যা।’

‘তর মতন গাই থুইয়া তর বাপের বান্ধা রাক্কাইল্যা আমার ওলান ধরব ক্যান লো বান্দরনী/ তরটা চুইষ্যাইত কেরামত মিঞার চিকনা বাড়তাছে।’৫

একজন পুরুষের সামনে, হোক সে বাড়ির রাখাল, দুই কিশোরীর এমন কথা অসম্ভব বৈকি। আর সে রাখাল যদি আতেকার মন পেয়ে থাকে তাহলে তো এমন বাক্য আরও অপ্রত্যাশিত। যেমনভাবে সে রাখালের আচরণ ও বচন অস্বাভাবিক মনে হয় যখন সে আতেকাকে ডাক ওঠা গাইয়ের পাল লাগানো দেখায়৬ অথবা আতেকার সদ্য ওঠা বুক দেখতে চায় সে৭ এবং মজার বিষয় হলো আতেকাকে বরাবরই কেরামত বোন বলে সম্বোধন করে।

বর্তমান আলোচনার পরবর্তী উপন্যাস কাবিলের বোন। ইতিমধ্যে নরনারী প্রেম বিষয়ক আল মাহমুদের আরও যে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তা হলো কবি ও কোলাহল। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস উপমহাদেশও ইতোমধ্যে প্রকাশিত। উপমহাদেশ প্রত্যক্ষ ও বিস্মৃত প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে ধরার প্রয়াস। অন্যদিকে কাবিলের বোন শেষ পর্যায়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হলেও এর প্রধান অনুষঙ্গ মুক্তযুদ্ধ পূর্ববর্তী ও চলাকালীন বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারীদের অস্তিত্ব বিপর্যয়ের কাহিনি। সন্দেহ নেই ‘কাবিলের বোন’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অনালোচিত অধ্যায়ের শব্দরূপ।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে উনিশ শ ষাট সালে। পূর্ব পাকিস্তানের সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম মনতলা থেকে ষোল-সতের বছরের কিশোর আহমাদ কাবিল সেদিন ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশনে এসে নামল। মনতলা হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে কাবিলের ঢাকা আগমন কলেজে ভর্তির উদ্দেশ্যে। ঢাকায় এসে সে উঠল চাচা আহমদ আলমের বাসায় যাকে কিনা তার বাবা আহমদ কামাল পরিত্যাগ করেছিলেন ‘বিহারি’ বউ বিয়ে করার জন্য। ইতিমধ্যে কাবিলের আব্বা গতায়ু এবং পার হয়ে গেছে পরেনটি বছর। চাচার বাসায় চাচি রওনক জাহান পরম আদরে বরণ করে কাবিলকে আর চাচাত বোন রোকসানা তো প্রথম পরিচয়েই কাবিলকে বসিয়ে ফেলে হৃদয়ের মণিকোঠায়। আর এভাবেই অবাঙালি ও বাঙালি মানুষের যোগসূত্র ঘটে, বিনিময় হয় হৃদয়ের উষ্ণতার। পরবর্তীকালে কাবিলের সাথে রোকসানার যে প্রেমপর্ব এবং সে অধ্যায়ের জটিলতা উপন্যাসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কিন্তু সেসব কিছুকে ছাপিয়ে কাবিলের বোন উপন্যাসে যে প্রসঙ্গটি আরও প্রাসঙ্গিক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে তা হলো মুক্তিযুদ্ধ প্রাক্কালে বাঙালি-বিহারি দ্বন্দ্ব এবং সে দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের অবস্থানরত বিহারি জনগণের নিরাপত্তাহীনতার মর্মন্তুদ চিত্র। জাতিগতভাবে ‘মাইনরিটি’ হওয়ায় একটি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের কিভাবে বদলে যায় উপন্যাসটিতে আল মাহমুদ তা গভীর মমতায় আঁকতে সমর্থ হয়েছেন।

কাবিলের বোন উপন্যাসের প্রধান চারটি যুবা চরিত্রের মধ্যে প্রেম বিষয়ক যে জটিলতা তাকে কোনো সহজ হিসাব নিকাশের আওতায় ফেলা যায় না। কাবিল, তার মামাত বোন মোমেনা, রোকসানা এবং তার মামাত ভাই অবাঙালি আন্দালিব। কাবিল ঢাকাতে আসতেই রোকসানা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়; অথচ এর আগে ফুফাত ভাই আন্দালিবের সাথে তার এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল যেহেতু আন্দালিব নিজেই তার ফুফু রওনকের সকল ব্যবসায় বাণিজ্যের দেখভাল করত এবং যথেষ্ট আস্থাও অর্জন করেছিল। অন্যদিকে রোকসানাকে নিয়ে কাবিল গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগেই তার মা জাকিয়া বানু পিতৃহীন মোমেনাকে নিজ বাড়িতে এনে কাবিলের উপযুক্ত করতে তাকে বড় করছিলেন। আরও পরে আন্দালিব কাবিলদের বাড়িতে গেলে মোমেনার সাথে তার সখীতা গড়ে ওঠে যা সবশেষে চূড়ান্ত পরিণতি অর্থাৎ বিবাহের সিদ্ধান্তেও পৌঁছায়। মোমেনার প্রতি সাধারণ দায়িত্ব পালনের সীমায় প্রথম থেকে কাবিলকে স্বাভাবিক মনে হলেও একসময় রোকসানা-মোমেনার দ্বন্দ্বে যে বিষয়টি প্রকাশ পেতে থাকে যার গভীরতা রীতিমতো বিস্ময়কর। উপন্যাসের চূড়ান্ত পর্বে আমরা দেখি মুক্তিযুদ্ধকালে রোকসানা আন্দালিবের সাথে পশ্চিম পাকিস্তান চলে গেছে। আন্দালিবের তো কেউই নিকটজন আর নেই—এ যুক্তিটিই রোকসানার প্রধান বিবেচ্য হয়েছে।

অন্যদিকে যুদ্ধোত্তরকালে রোকসানার অনুরোধ অনুযায়ী মোমেনাকে বিয়ের কথা বললেও মোমেনা কাবিলকে অস্বীকার করে কেননা রোকসানার দয়ার প্রসাদে তার কোনো ইচ্ছা নেই অথচ আন্দালিবকেও এ সময় মোমেনা জানিয়েছিল আন্দালিব এবং কাবিল এ দুজনের মধ্যে একজন বেছে নেয়ার প্রশ্ন উঠলেও মোমেনা কাবিলকেই বেছে নেবে। শেষ পর্যন্ত কাবিল যাকে বিয়ে করে নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছিল সে মুক্তিযুদ্ধকালে শহিদ তার বন্ধু নিসারের স্ত্রী আঞ্জুমান। জটিল মনোজগতের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্বের ভাঁজগুলোকে আল মাহমুদ সুপরিকল্পিতভাবে আলো ফেলে ফেলে স্পষ্ট করেছেন। এবং দক্ষ কথাকারের কলাকৌশলে কাবিলের বোন প্রেমের উপন্যাস হিসেবেও একটি উল্লেখযোগ্য নাম। কিন্তু উপন্যাসটির বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্বও অধিক মনোযোগের দাবিদার যে প্রসঙ্গটিতে এখন আমরা যাব।

পাঁচ পর্বে বিভক্ত উপন্যাসটির প্রথম পর্বেই এ দ্বন্দ্বটির উন্মোচন—প্রথমে পারিবারিক পর্যায়ে পরে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে। মোজাহির মেয়েকে বিয়ে করার কারণে কাবিলের চাচা বসড় ব্যবসায়ী হয়েও বাঙালি সমাজে আদৃত হন নি—যদিও গভীর অবলোকনে স্পষ্ট হয় ব্যক্তি পর্যায়ে এ দ্বন্দ্ব বিশেষ বিবেচিত হয় নি। রোকসানা মনতলা গেলে তার চাচি কাবিলের মা সৈয়দা জাকিয়া বানু তাকে যে কথা বলেছিল তার ভেতরেই এ বক্তব্যের সমর্থন মেলে। জাকিয়া বানুর ভাষায়:

‘বিহারী আর ভিনদেশীরা কি আমাদের মতদ মানুষ না? তাদের পেয়ার মহব্বত থাকতে নেই? আমি এসব নিয়ে মোটেই ভাবি না। তোর চাচা তোর আব্বার ওপর রাগ করেছিল সে ভিনদেশী বউ বিয়ে করেছে বলে নয়। তার রাগটা ছিল যে ভাইয়ের ওপর ভরসা করে তিনি তার সবকিছু ব্যয় করে ফেললেন, সে কি না বিয়ের মত একটি বড় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাকে মুখের কথাও জিজ্ঞেস করল না।’৮

কিন্তু ব্যক্তিগত এ ভাবনাগুলোকে ছাপিয়ে বৃহত্তর সমাজের অথবা রাজনৈতিক বলয়ের দৃষ্টিভঙ্গিটা ভিন্ন। প্রথম পর্বের সপ্তম অধ্যায়েই দ্বন্দ্বপূর্ণ মানসিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। কাবিল ও রোকসানা প্রথমবার মনতলা থেকে ফেরার দিন আন্দালিব স্টেশনে গিয়েছিল ওদেরকে আনতে আর সে ট্রেনেই ঢাকা আসছিলেন সোহরাওয়ার্দী। ঐদিন স্টেশনে কিছু বাঙালি যুবক মোজাহিরদের উপর অত্যাচার চালায় যা উদ্বিগ্ন করে তোলে আন্দালিবকে। আন্দালিবের সপ্রশ্ন অবচেতন যেকোনো পাঠককে এ দ্বন্দ্ব বুঝতে সাহায্য করবে। দীর্ঘ হলেও সে অংশের খানিকটা উৎফলন আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। স্টেশনের অবস্থা দেখে আন্দালিব নিশ্চিতভাবে বুঝল :

এখন এখানে বাঙালি বিহারির মধ্যে একটা হৈ-হাঙ্গামা বাঁধবে। কেউ জানে না কেন গোলযোগ হচ্ছে? হয়তো অতিশয় তুচ্ছ কারণে স্টেশনের ফেরিঅলা, রিকশাঅলা, পকেটমার কিংবা যাত্রীদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে তর্কাতর্কি বেধে গেছে। কোনো কোনো সময় বিনা টিকেটের যাত্রী বাঙালি ছাত্রদের সাথে বেধে যায় ঘুসখোর বিহারি টিকেট চেকার বা কালেক্টরের সাথে, তারপরই হকিস্টিক আর কশাইকানার ছড়ি-চাকু নিয়ে শুরু হয় ছোটাছুটি, মার শালা বিহারি বদমাশদের, শালারা বাংলাদেশকে লুটেপুটে খেয়ে ফেলল। হারামজাদাদের রেলের চাকুরি থেকে তাড়াতে হবে। … বিহারিগুলোকে কে বাংলাদেশে ঢুকতে  বলেছিল? … বাঙালি মাত্র বিহারীদের এদেশে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। কারণ বিহারীদের দাম্ভিক আচরণকে বাঙালিরা মোটেই সহ্য কর নিতে পারে নি।… তোমরা আমাদের ধর্মবোধের সমালোচনা করতে এসো না। আর একথা বলো না যে, তোমরা কোন অংশে বাঙালি ‘মুসলমানদের চেয়ে সম্ভ্রান্ত সম্প্রদায় বা জাতি।৯

উপন্যাসের এ পর্বটি শেষ হয়েছে সামান্য পরেই স্টেশনের দৃশ্যটি দিয়েই। ট্রেনে এসে নামেন সোহরাওয়ার্দী, পেছনে শেখ মুজিব।

শেখ মুজিবুর রহমান উপন্যাসটি প্রত্যক্ষ কোনো চরিত্র না হলেও উপন্যাসটির সামগ্রিক বিন্যাসে এ ছায়া-চরিত্রটি রীতিমতো শক্তিশালী। তাছাড়া কাবিলের বোন যেহেতু অধিকাংশতই মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন বাংলাদেশ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত, তাই শেখ মুজিবের শক্তিমান উপস্থিতিই স্বাভাবিক।

উপন্যাসটির দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে অগ্নিদাহ উনসত্তর দিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির সক্রিয় কর্মী কাবিল ও রোকসানা দুজনেই। কাবিল তো রীতিমতো নেতা, ডাকসুর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি। ছ’দফার আন্দোলনের এ উত্তুঙ্গ সময়ের ইতিহাস তো সকলের জানা—আল মাহমুদ সে ইতিহাসের সময়টাকেই ধরার চেষ্টা করেছেন গল্পের প্লট ও চরিত্রের ভেতর দিয়ে।  ক্রমে ক্রমে কাবিলের হাজতে আটক এবং সবশেষে শেখ মুজিবের স্নেহ লাভ। কাবিলের কালিমার রঙটা কিন্তু বারবারই তাজা করে তুলতে চায় সুবিধাবাদীরা। আর তাতেই বিহারিদের দালাল হিসেবে তাকে একবার চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে। কিন্তু শেখ মুজিব তো মানুষ চিনতে ভুল করেন না—আর তারই ফলশ্রুতিতে ছাত্র আন্দোলনের সর্বাগ্রে তিনি কাবিলকে স্থান দিয়েছেন। উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বের শেষে আমরা দেখি কাবিল আবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার। কাবিলের মার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত চাচা শেষ ধকল সইতে না পেরে মারা গেলে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও কাবিল গোরস্থানে গেলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

তৃতীয় পর্বে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চূড়ান্ত পর্বের প্রস্তুতি—সে পর্বে সামগ্রিক রাজনীতির কর্ণধার শেখ মুজিবুর রহমান এবং ছাত্র আন্দোলনে তার নির্ভরযোগ্য উত্তরসূরি সৈয়দ কাবিল আহমেদ। পাকিস্তানের অস্তিত্ব সংকটের এ সময়ে অবাঙালিদের দুশ্চিন্তা তাদের জাতিসত্তার প্রশ্নে। এ পর্বের শেষ পর্যায়ে একদিন শেখ মুজিবের ফোন-ডাকে সাড়া দিতে কাবিল বত্রিশ নম্বরের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলে চাচির কথায় কাবিল ভীষণ এক নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত পায়। চাচি তাকে বলেছিল, ‘শেখ সাহেব যখন তোকে এতই খাতির করেন তাকে বলিস আমি তোর চাচী বলেছি তিনি আমাদের সবারই নেতা। তিনি যেন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ভেঙে যায় এমন কিছু না করেন। তাহলে আমরা মোহাজিররা কোথায় যাব বল?’১০ মোহাজিরদের নিরাপত্তাহীনতার এ ব্যাপারটি দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা যত ত্বরান্বিত হয়েছে বিহারিদের সংকটময় পরিস্থিতি উপন্যাসটিতে তত বেশি করে অনুভূত হয়েছে। কাবিলের চাচি ও রোকসানার মামাত ভাইয়ের সাথে সে কাতারে আরও বেশি দুঃখী মানুষকে আমরা পেয়েছি। বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে যে মানুষটি সে হলো রোকসানা—যার বাবা বাঙালি এবং মা অবাঙালি আর দুর্মুখ ভাষায় সে হাফ বাঙালি অর্থাৎ কিনা পুরোদস্তুর বাঙালি নয়। জাতিদ্বন্দ্বের দোলাচলে সেই তো বড় শিকার। ‘সে কাকে সমর্থন করবে? তার অবাঙালি মাকে? না বাঙালি প্রেমিক চাচাত ভাইকে?’১১ যদিও অবাঙালি চাচাত ভাইয়ের ‘পাকিস্তান যদি না টেকে, ভাবো আমাদের ঠিকানা কী হবে?’ প্রশ্নের উত্তরে রোকসানার সহজ সমাধান:

‘যাবেন কেন? এখানে থাকবেন। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে আপনারা, আমার নানা ইন্ডিয়া থেকে এখানে এসেছিলেন। রাজনৈতিক কারণেই আসতে হয়েছিল। এখন এদেশটা ছাড়া আপনার না আমার আম্মার কোন আপন ঘাটি নেই। ইয়াহিয়া, ভুট্টো বা মুজিবের রাজনৈতিক লড়াইয়ের খেসারত মোহাজিররা কেন দিতে যাবে?’১২

কিন্তু এ সমস্যার সমাধান তো এমন সহজ নয়। ২৫ মার্চ যত এগিয়ে আসছিল ততই এটি তুঙ্গে পৌঁছাচ্ছিল। অবাঙালি মোহাজিররা মিরপুর আর মোহম্মদপুরে জড়ো হতে শুরু করল নগরীর সব এলাকা ছেড়ে। নারিন্দা ছেড়ে আন্দালিবকেও চলে আসতে হয় এক সময়। সাময়িক কিছু ব্যবস্থা কাবিল করতে পারলেও তা আর স্থায়ী হয় কতক্ষণ? সন্দিহান চাচির সন্দেহের বিষবৃক্ষ উন্মোচিত হয় যখন কাবিল তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে বলেছিল ‘আপনার ছেলে এই আমি ত বাঙালি’ তার উত্তরে। তখন রওনক জাহানের বিলাপ:

তুই বাঙালি, আমার পেটের মেয়েটা বাঙালি, আর আমি হলাম বিহারী। আমি মোহাজির। আমার কোন দেশ নেই। আমার আপনা আদমী কেউ নেই। পাড়ার লোকেরা আমাকে দুশমন ভেবে তাড়িয়ে দিতে চায়।’১৩


ছোটখাটো ত্রুটি ব্যতিরেখে কাবিলের বোন মানবিকতার চূড়ান্ত জয়গান।


রওনক জাহানের সৌভাগ্য এ সবের চূড়ান্ত পর্যায়টি তাকে দেখে যেতে হয় নি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাগুলির শব্দে তিনি হার্টফেল করে মারা যান। কিন্তু রোকসানা ও আন্দালিবকে এসবের শেষ দেখতে হয়েছিল। উপায়হীনভাবে দেশ ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছিল।

কাবিলের বোন উপন্যাসের পঞ্চম অর্থাৎ শেষ পাঠটিকে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক এবং আরোপিত মনে হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি না এনে বরং আন্দালিব ও রোকসানার দেশত্যাগের তথ্যটি পরিবেশনই যথেষ্ট ছিল বলে মনে করা যেতে পারে। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কাবিলের যুদ্ধে অংশগ্রহণ বা ফেরার পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটের যে প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছে তা উপন্যাসের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়েছে বলে মনে হয়, যেমনভাবে মুক্তিযুদ্ধের দশ মাসের সকল বিবরণ বাদ দিয়ে পনেরই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গের নতুন অবতারণা কেমন বেখাপ্পা লাগে পাঠকের কাছে এমন ছোটখাটো ত্রুটি ব্যতিরেখে কাবিলের বোন মানবিকতার চূড়ান্ত জয়গান। রোকসানার এক বক্তব্যে সে মনুষ্যত্বেরই প্রকাশ ঘটেছে। আন্দালিবের সাথে বাঙালি-অবাঙালি প্রসঙ্গে রোকসানা বলেছিল: ‘মানুষের চরম নিষ্ঠুরতা দেখে দেখে ঠিক করে নিয়েছি, কেবল মানব-সন্তান হওয়া ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আমার বেঁচে থাকার আর অবলম্বন নেই।১৪

পরবর্তী উপন্যাস নিশিন্দা নারী আয়তনে মাত্র ত্রিশ পৃষ্ঠার হলেও ইতিবাচক বহুবিধ অভিধায় এটিকে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। বর্ণনায় প্রতীক এবং চিত্রকল্প নির্মাণের চূড়ান্ত প্রতিভার পরিচায়ক এ উপন্যাসটি। বাম রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী আব্দুল্লাহ মাঝি পনের দিন যাবৎ উধাও হয়ে যাওয়ার পর এক গভীর রাতে তার স্ত্রী নিশিন্দাকে দিয়ে এ উপন্যাসের কাহিনি। কথাসাহিত্যে বহুমাত্রিকতার প্রশ্নে এটি আল মাহমুদের সর্বাগ্রে উল্লেখ্য উপন্যাস হিসেবে মনে করা যেতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস পাড়ের এক গ্রামে এই উপন্যাসের কাহিনি স্থাপিত। সে কাহিনিতে নিশিন্দার আবির্ভাব [কেননা তার স্থান মনুষ্য সাধারণের ঊর্ধ্বে] প্রথম বাক্যেই; আর প্রথম পরিচ্ছেদেই মানব ইতিহাসের প্রধান দুই নিয়ামক যৌনতা এবং ক্ষুধার উপস্থিতি—‘সারাদনি না খেতে পাওয়ার জ্বালা’ [২য় বাক্য]; এবং ‘তার নরম স্তন দুটি কাঁপছে’ [৪র্থ বাক্য]। আর সেই দুই নিয়ামকের পরিতৃপ্তির উপায় প্রথম পরিচ্ছেদেই ঘুমের ভেতরেই নিশিন্দা সন্ধান পায়। জনমানবহীন চারণভূমিতে গরুর রাখালই তার উদ্দিষ্ট। কেননা ‘এখন সত্যিকার খাওয়ার কিছু থাকলে তা আছে তিতাসের শেওলা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বাসিন্দাদের রাঁধা ভাত আর ফেনপানি।’ আর এভাবে এলাকার সকল দরিদ্র জনগণ নিশিন্দার গোত্রভুক্ত—তার স্বামী আব্দুল্লাহ মাঝি যে গোত্রের মাঝি। মানুষ গরু সবাই সেই একই কাতারের। স্বপ্নে গরুগুলোর উপস্থিতি যেন অতিবাস্তব এক আবহ তৈরি করে যার ভেতরে নিছক এক বাস্ততাকেই আল মাহমুদ উপস্থাপন করেছেন।

বিচিত্র এবং বহুধা এতসব বোধের উপস্থিতি আল মাহমুদের অন্য কোনো উপন্যাসে পাওয়া যায় না। ঔপন্যাসিকের এতসব পারকতা কিন্তু সমগ্র উপন্যাসটি ব্যোপেই বর্তমান। মনে হয় যেন উপন্যাসটির প্রতিটি বাক্য এমনকি শব্দ ব্যবহারও অনেক সূক্ষ্ম চিন্তার পরিশ্রুতি—যা কথাকারদের মধ্যে অথবা আল মাহমুদের নিজের লেখা অন্য উপন্যাসগুলোতেও এমন মাত্রায় অবস্থিত নয়। কবিতা সম্পর্কে কোলরিজের যুগান্তকারী উক্তি ‘শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার’-এর এক বহিঃপ্রমাণ যেন নিশিন্দা নারী। আপাত গদ্য চেহারার এ রচনাতে কাহিনি নির্মাণের আবরণে যেন আল মাহমুদ এক কাব্যপ্রতিমাই সৃষ্টি করেছেন।

উপন্যাসটির প্রথম অনুচ্ছেদ অতিক্রম করতেই সে জগতের রহস্যময়তা ক্রমশ বর্ধমান। স্বপ্নে ষাড়গুলো, যদিও নিশিন্দা ভালো করে বুঝতে পারছে এসবই স্বপ্ন, তার উঠোন নোংরা করা শুরু করতেই নিশিন্দা ‘ক্ষুধার্ত গাইগুলোর শিঙের কাছাকাছি চলে এল—‘এই জাবর কাটা মাগীর দল, আমার উঠোন নোংরা করবি না বলে দিচ্ছি। আর আমার তুলসী গাছের দিকে মুখ বাড়ালে পাটকাটার ছেটি দিয়ে জিব কেটে ফেলব।’১৫ বাক্যটিতে ব্যবহৃত শব্দ এবং তা উচ্চারণে নিশিন্দার অবর্ণিত ভঙ্গি দিয়েই আমরা যেন বুঝতে চেষ্টা করি নিশিন্দা মানুষটা কেমন। বোঝাবুঝির এই ঘোরলাগার মধ্যে তা যেন তীব্রতর হয়ে পড়ে যখন উপন্যাসটির দ্বিতীয় পৃষ্ঠার তৃতীয় অনুচ্ছেদে জানি ‘নিশিন্দা দত্তখোলার চামারের মেয়ে’। আব্দুল্লাহ মাঝির সাথে ঘর বাঁধার সময় ঋষিপাড়া থেকে সে একটি তুলসি গাছ এনে দাওয়ায় পুঁতে সকাল-সন্ধ্যা বাতি জ্বেলে মাথা নোয়ালে মাঝি তাকে যে ধমক দিয়েছিল তা মাঝির মানস বুঝতে সাহায্য করে।

‘এই চামারনী তুই না মুসলমান হয়েছিস? তুই না আমার বৌ? খবদ্দার গাছেরে পীর মানলে আমি তোরে দুই টুকরা করে কেটে তিতাসের মাখনা ক্ষেতে পুঁতে রাখব। মনে রাখিস, তোকে আমি আমার পীরের সামনে নিয়ে গিয়ে হুজুর কেবলাকে সাক্ষী রেখে শাদী করেছি। আর তুই মাগী এখন গাছ-পাথরের তলে মাথা ঠেকাস? তওবা পড় হারামজাদী, নিজের ভালাই চাইলে আওয়াল কলেমা পড়ে ছতরে ফুঁ দে।’১৬

আর ছতরের প্রসঙ্গ আসতেই যৌনাকাঙ্ক্ষার পুনর্পাঠ। নিশিন্দার মনে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার পুলিশ পনের দিন আগে তার বাড়ি তছনছ করে যখন জিজ্ঞেস করেছিল ‘এই মাগী, আবদুল্লাহ কই?’ তখন দারোগার টর্চটা ছিল নিশিন্দার বুকের ওপর স্থির। আর সে কারণেই নিশিন্দাকে বলতে হয়েছিল ‘আগে ছতর থেকে বাতি নামান দারোগা সাব। আবদুল্লাহ কি আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে নাকি? বাতি নামান।’ আর এভাবেই উপন্যাসটির দুই পৃষ্ঠা অতিক্রম করার আগেই নতুন নতুন অনুষঙ্গের ভিড় পাঠক মনে ঔৎসুক্যের এক বাতাস বইয়ে দেয়। সেসব অনুষঙ্গের শিল্পিত ও পরিমিত ব্যবহারই পাঠককে ক্রমাগত মহৎ সাহিত্য পাঠের এক অনুভূতিতে পৌঁছে দেয়।

নিশিন্দার এই গরুবিষয়ক স্বপ্ন শেষ হয়েছে সাড়ে চার পৃষ্ঠার দিকে যখন ক্ষুধার্ত গাই গরুগুলোর ছুরির ফলার মতো শিং নেমে আসে তার উপোসে শুকিয়ে থাকা নাভির উপর। যদিও তার আগেই আমরা জেনে ফেলেছি তিতাস পাড়ের চাষি-চামার সবার এক কথা ‘আবদুল্লাহ মাঝি আমাগো মাতব্বর’। আর সে সূত্রেই জানা গেছে, আবদুল্লাহর সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বামপন্থি দলগুলোর যোগাযোগ আছে আর সে কারণেই ইটখোলার ইজারাদাররা বুঝে গিয়েছে আবদুল্লাহর কথার বাইরে কোনো কাজ হবে না। আরও যা জানা গেল তা হচ্ছে স্বপ্নের গুরুগুলো তাদের রক্ষকদেরকে শিঙদিয়ে গুঁতিয়ে মেরে এসেছে—তারা আবদুল্লাহর দলে নাম লেখাবে। ‘খুনির দল কোথাকার’ বলে স্বপ্নের গরুগুলোকে ধমক দিয়েই দাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে গেলে সামনের গাইটা তার আঁচল কামড়িয়ে থামিয়ে দেয়, ‘আমরা আর বাথানে ফিরব না।’ আঁচলে টান পড়ায় নিশিন্দার বুক উদোম হয়ে পড়ে। নিশিন্দার মনে হয় গরুগুলো যেন এই মুহূর্তে জিব বের করে তার স্তন চাটা শুরু করবে। বাকসম্পন্ন স্বপ্নের গরুগুলোর সাথে এই দৃশ্যে আরও জানা যায় আবদুল্লাহর গোপন অস্ত্রের ভাণ্ডারে রয়েছে নদীর পাড়ে একটা পরিত্যক্ত পুঁতে রাখা নায়ের ভেতর। আর এভাবেই স্বপ্নের এ দৃশ্যের যখন সমাপ্তি ঘটে তখন আপাতভাবে মাত্র চারটি পৃষ্ঠা শেষ হলেও নিশিন্দাকে নিয়ে একটি রহস্যময় গল্প তৈরির প্রেক্ষাপট আল মাহমুদ তৈরি করে ফেলেন। সে প্রেক্ষাপটের প্রধান নট নিশিন্দা ঘুমের ভেতর থাকায় তার অবচেতনের অনুসন্ধান সহজ ও সম্ভবপর হয়।

স্বপ্নের গরুগুলোর শিং থেকে বাঁচার জন্য ‘আবদুল্লাহ বাঁচাও’ বলে যখন আর্তচিৎকার করে নিশিন্দা বিছানায় জেগে উঠল তখন তার ছতরে কাপড় নেই। আর তলপেটে হাত দিতেই বুঝল খিদের জ্বালাটা তাকে ছেড়ে যায় নি। অর্থাৎ ঘুমের ভেতর ক্ষুধা ও যৌনতার যে প্রতীকী আকাঙ্ক্ষা চিত্রিত হয়েছিল সেগুলো বাস্তবেও নিশিন্দার সহযাত্রী। স্বপ্নের গরুগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে হলো রাখালরা গাই গরুগুলো দুইয়ে কিছুক্ষণ পরই বাজারে নিয়ে যাবে; তার আগেই একটা গাইকে দুইয়ে দুধ নিয়ে এলে কেমন হয়—আর সে চিন্তা থেকেই সে পর্যায়ক্রমিক যে চিন্তায় পৌঁছুল তা হচ্ছে রাখালগুলোর হাতে ধরা পড়লে ওরা দল বেধে ওর শরীরের ওপর মজা লুটবে। এ ভাবনাই নিরাপত্তার প্রশ্নে নিশিন্দার হাতে তুলে দিল লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের ভেতর থেকে একটা রামদা। অনেক সাবধানতায় নিশিন্দা যখন দুধ দোওয়ার কাজ সম্পন্ন করছে ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি হাত এসে নামল নিশিন্দার বুকে। ঐ হাতের মালিক রাখালের সাথে নিশিন্দার এ দৃশ্যটি রীতিমতো চমকপ্রদ। নিশিন্দা যখন রামদা’র ভয় দেখাচ্ছে, রাখাল তখন ওর স্তনের প্রশংসা করছে এবং প্রত্যাশা করছে ভবিষ্যতে সে দুটিকে পাওয়ার জন্য। মৃত্যু এবং যৌনাকাঙ্ক্ষার এ যুদ্ধে কিন্তু মৃত্যু পরাজিত—কে তাকে গ্রাহ্য করে। কেননা মূল নিয়ন্ত্রক তো যৌনতাই। আর এভাবেই নিশিন্দা নারী উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের সমাপ্তি।

উপন্যাসটিতে সংখ্যা এবং অন্যবিধ সংকেত দিয়ে অধ্যায় বা পরিচ্ছেদগুলোর পৃথক্‌করণ হয় নি; যা হয়েছে সেটি সামান্য একটু ফাঁকা জায়গা রেখে। ছোট ছোট দুটি পরিচ্ছেদের সমন্বিত রূপ হলো উপন্যাসটি। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদটির সময়কাল পরদিনই যখন নদীর দিকে লোকজনের কোলাহল বাড়ছে এবং একসময় পুলিশ বাড়িতে এসে নিশিন্দাকে জেরা করতে এসে জানায় ‘আবদুল্লাহ গত রাতে খুন হয়েছে। তার লাশ নদীর কলমি ঝোপে পড়ে আছে’। এমত পরিস্থিতিতে ‘কারা কারা আবদুল্লাহকে খুন করতে পারে বলে তুই সন্দেহ করিস’ দারোগার প্রশ্নের জবাবে নিশিন্দা বলেছিল ‘আমার সবাইকে সন্দেহ হয়। পুলিশ, শহরের গাইগরুর মালিক আর আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর সঙ্গী সবাইকে।’১৭ তারপর সবকিছু শেষ করে নিশিন্দা যখন রাতে খিদে নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে তখন তার কানে বাজে আগের রাতে বাথানের রাখালের কণ্ঠ। অবচেতনের আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়। সে সাথে আবদুল্লাহর স্মৃতিও এসে ভিড় করে যা একটি ছোট্ট ফ্লাশব্যাকে আবদুল্লাহর সাথে নিশিন্দার পরিচয় ও প্রণয়ের প্রথম দিকগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়। আর তখন আসে খলিল-আবদুল্লাহর পার্টির সঙ্গী। ভালোমানুষের আবরণে আবদুল্লাহর হাতিয়ারগুলো নিয়ে যেতে চায় খলিল। পাঁচ এবং শেষে দশও সাধে। কিন্তু নিশিন্দার দৃঢ়তার পরিচয় যেন এসময়ই। তার এক কথা ‘আবদুল্লাহকে কে মেরেছে না জানা পর্যন্ত মালের সন্ধান কেউ পাবে না।’১৮ তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে খলিল পিস্তল বের করলে নিশিন্দার রামদার আঘাতে একটা আঙুল হারিয়ে তাকে ঐ বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচতে হয়। আর এভাবেই তৃতীয় পরিচ্ছেদের ইতি টানা।

নিশিন্দার এমন আচরণ তার দার্ঢ্যেরই পরিচায়ক। তাই পরদিন সকালে ইটখোলার ম্যানেজার তাকে ডেকে পাঠালেও সে যায় না। এই না যাওয়ার অর্থ নিশিন্দারও খুন হওয়া, তা দারোগা রমিজ তাকে জানিয়েছে। কিন্তু নিশিন্দা তো জানত গেলেই ম্যানেজার তাকে শোয়ার প্রস্তাব দিত। আর ক্ষেপে গিয়ে সে হয়তো ম্যানেজারকে খুনই করে ফেলত। শেষ পর্যন্ত দারোগার সাথে সে একটা রফাতে যদিও পৌঁছেছিল—এক লাখ টাকার বিনিময়ে নিশিন্দা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে আর ভাটার ম্যানেজার ওদের বাড়ি জায়গায় নতুন ভাটা বসাবে। দারোগা বিষয়টিকে সহজভাবে মানলেও আমরা পারি না, কেননা আমরা তো ইতোমধ্যেই জেনে গেছি নিশিন্দার প্রতিশোধ পরায়ণ দৃঢ়চিত্তের কথা:

‘এখন সারা পেট জুড়ে ভুখের ব্যথা যেন ছড়িয়ে পড়েছে। নিশিন্দার মনে হল সে একটা ক্ষুধার্ত বাঘিনী। যে করেই হোক তার বেঁচে থেকে দুনিয়ার ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধ হত্যা এবং নিজের ক্ষুধার্ত পেটের। বেড়ায় ঝোলানো কনুই জালটার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। এইতো এখনও বেঁচে থাকার কিছু উপকরণ তার ঘরে আছে। জালটা আধমরা তিতাসের স্রোতে কয়েকবার ছুড়ে মারলে মাছ না উঠুক, কয়েকটা গুগলি শামুকও কি রিজিক দেনেঅলা জুটিয়ে দিতে পারে না? না পারলে কাল থেকে সে পিস্তল নিয়ে শহরের পথে রাহাজানি করে বেড়াবে। তবুও হার মানবে না সে। হার মানবে না আবদুল্লাহর খুনি শহরের জোতদার, ইটভাটার মালিক আর গুপ্ত পার্টির ছদ্মবেশধারী রাজনৈতিক ডাকাতদের কাছে।’১৯

রাত নটায় যখন নিশিন্দার ঘুম ভাঙল আবার সেই বাথানের রাখালের হাত। অদৃশ্য সে হাত তার অবচেতনে প্রোথিত। অবচেতনের সেই আকাঙ্ক্ষা ঝড়দৃষ্টির অন্ধকার সে রাতে টেনে নিয়ে চলল নিশিন্দাকে। রামদাটা হাতে নিয়েও রেখে গেছে এবার সে। পঞ্চম এই পরিচ্ছেদটিও বড় মর্মন্তুদ, সেই রাখালের কাছে নিশিন্দা যখন এসে পৌঁছল তার প্রথম কথাই হলো: ‘এমন দুর্যোগের রাতে কেউ চুরি করে দুইতে আসে?’ তারপর রাখালের তাহ নিশিন্দা শরীরের ওপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পেটের উপর গেলে তার কৌতূহলী প্রশ্ন: ‘কি ব্যাপার তোর নাভি বসে গেছে। ক’দিন ধরে উপোস দিচ্ছিস?’ এবং শেষ পর্যন্ত রাখালটি নিশিন্দার সাথে যৌনকার্য করে না, বরং এক পাতিল দুধ দিয়ে দেয়। একজন সাধারণ রাখালের মানবিকতার এ পরিচয় শুধু নিশিন্দাকে নয় পাঠককেও প্রীত করে। আর এ বোধই সম্ভবত নিশিন্দাকে অধিকতর দৃঢ়চেতা করে তোলে যার পূর্ণ প্রতিভাস ঘটেছে শেষ পরিচ্ছেদটিতে।


গল্প গাঁথুনি, ভাষাশৈলী এবং বোধসৃষ্টির প্রশ্নে নিশিন্দা নারী শ্রেষ্ঠ এমন অভিমত হয়তো অনেকেই দেবেন।


রাতে ইটভাটার ম্যানেজার এলে সাথে আনে মাত্র ত্রিশ হাজার। নিশিন্দা সেই টাকাটাই আটকে ফেলে আবদুল্লাহর খুনিদের খুঁজে বের করার জন্য। আর এরপর লোকটা যখন ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে হারাতে হয় তিনটা আঙ্গুল। রামদা মুছেটুছে বিছানায় শুতেই স্বপ্নের সেই গরুগুলো—হাম্বা করে তারা জানাতে থাকে, ‘আবদুল্লাহ মরেনি। আবদুল্লাহ খুন হয়েছে। তবে মরেনি। আবদুল্লাহ চিরকাল আমাদের মধ্যে থাকবে।’২০ ঘুম ছুটে যেতে উঠোনে বেরিয়ে নিশিন্দা দেখে দত্তখোলার চামারপাড়ার ঋষি নরনারী, ছেলেবুড়ো, বৌবাচ্চার বিরাট জমায়েত। তারা এসেছে নিশিন্দাকে রক্ষা করতে, সমন্বিতভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করতে। সর্বজনীনতার শক্তি উপন্যাসটিতে অত্যন্ত প্রকট। আর সে শক্তি নিশিন্দাকে সাহস জোগায় আবদুল্লাহর ভিটের উপর ঝড়গটা নিয়ে থাকার।

প্লটের পরিমিতবোধ এবং বিবরণের সৌকর্যনিশিন্দা নারী উপন্যাসটিকে অসাধারণতার মানে উত্তীর্ণ করেছে। ডাহুকী, উপমহাদেশ বা কাবিলের বোন এ দুটি উপন্যাস বিচারে সম্পূর্ণ সার্থক বলে বিবেচিত নাও হতে পারে। এমন কি উপন্যাস আগুনের মেয়েও এ দুটি গুণের অভাবে দুষ্ট। সম্ভবত কাহিনি নির্মাণে অপ্রয়োজনীয় উপাদানের বাহুল্য এভাবেই উপন্যাসের ক্ষতি সাধন করে থাকে। একটি মহৎ বিষয়কে ধারণ করেও কাবিলের বোন যে কারণে একটি মহৎ উপন্যাস হিসেবে পরিগণিত হতে ব্যর্থ হয়। অথচ ঔপন্যাসিকের সচেতনতার কারণে ছোট্ট কলেবরে নিশিন্দা নারী একটি শিল্পসফল উপন্যাস, সে খাত বোধকরি সকল সমালোচকই স্বীকার করবেন।

বর্তমান প্রবন্ধে আল মাহমুদের সর্বশেষ যে উপন্যাসটি নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই সেটি হলো আগুনের মেয়ে। প্রথম পুরুষের বক্তা বাংবাদিক রেজাউল করিম এ উপন্যাসের কথক। শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট হয় এটি জিনবিষয়ক একটি উপন্যাস। রেজাউল করিমের বাগদত্তা নারী কাওসরী বেগ এবং বাড়িঅলা আহমেদ আমেরকে ছাড়িয়ে যে চরিত্র বেশি গুরুত্বে বিবেচিত সে একজন জিন—নাম জাহরুন নার। অস্বাভাবিক এবং কল্পিত এ নারী চরিত্রটিই উপন্যাসের প্রধান উপাত্ত। নতুন বাসায় একাকী রাত যাপন করতে গিয়েই জিন নারের সাথে রেজাউল করিমের সাক্ষাৎ। লেখক তার কল্পনা থেকে সে জিনের শারীরিক বর্ণনা ও কার্যাদির বিবরণ দিয়েছেন। জিন নিয়ে উপন্যাস রচনার প্রশ্নে হয়তো আগুনের মেয়ে প্রথম নাম কিন্তু এটি পাঠককে কোনো সার্থক বোধে পৌঁছাতে পেরেছে এমন মনে হয় না।

প্রকাশকালের দিক মনোযোগ দিলে স্পষ্ট হয় নব্বইয়ের দশক থেকে আল মাহমুদ কাব্য রচনার পাশাপাশি কথাসাহিত্য সৃষ্টিতেও উদ্যোগী হন। প্রাথমিক পর্যায়ে গল্প রচনা দিয়ে সে যাত্রার শুরু। তারপর যুক্ত হয়েছে উপন্যাসের প্রবাহ। একের পর এক রচনা করে চলেছেন দীর্ঘ-হ্রস্ব উপন্যাসরাজি। বিষয় প্রশ্নেও তার উপন্যাস বৈচিত্র্যময়। আয়তন এবং বিষয়বস্তুর মহত্ত্বের নিরিখে যেমন তার কাবিলের বোন বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার, তেমনি গল্প গাঁথুনি, ভাষাশৈলী এবং বোধসৃষ্টির প্রশ্নে নিশিন্দা নারী শ্রেষ্ঠ এমন অভিমত হয়তো অনেকেই দেবেন। আর সেসব বিচারেই অনেক পরিণত বয়সে গদ্য রচনায় হাত দিয়েও ঔপন্যাসিক আল মাহমুদ স্থান করে নিতে পেরেছেন সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের আসরে।


তথ্যসূত্র এবং প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা:

১.   আল মাহমুদ, ‘ভূমিকা’, আল মাহমুদ রচনাবলী-২, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০০২, ঢাকা
২.   আল মাহমুদ, ডাহুকী, আল মাহমুদ রচনাবলী-২, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬
৩.   ঐ
৪.   ঐ, প্র. ১৩০
৫.   ঐ. পৃ. ১৬৮
৬.   ঐ. পৃ. ২৫০-২৫১
৭.   ঐ. পৃ. ২৫২
৮.   আল মাহমুদ, কাবিলের বোন, আল মাহমুদ রচনাবলী-৪, ঐতিহ্য, জুলাই ২০০২, ঢাকা, পৃ. ১৮৭
৯.   ঐ. পৃ. ১৯২-১৯৩
১০.  ঐ. পৃ. ৩১৬
১১.  ঐ. পৃ. ৪০৩
১২.   ঐ. পৃ. ৪০৬
১৩.  ঐ. পৃ. ৪৩০
১৪.   ঐ. পৃ. ৪৪৯
১৫.  আল মাহমুদ, নিশিন্দা নারী, আল মাহমুদ রচনাবলী-৩, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০০২, ঢাকা, পৃ ২১২
১৬.  ঐ.
১৭.   ঐ. পৃ. ২২৪
১৮.  ঐ. পৃ. ২২৯
১৯.  ঐ. পৃ. ২৩০
২০.   ঐ. পৃ. ২৪০

সুব্রত কুমার দাস

উদ্যোক্তা at bangladeshinovels
জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক।

প্রকাশিত বই—

১. কানাডীয় সাহিত্য: বিচ্ছিন্ন ভাবনা [মূর্ধন্য, ২০১৯]
২. শ্রীচৈতন্যদেব [ঐতিহ্য ২০১৮, ২০১৬ (টরন্টো)]
৩. আমার মহাভারত (নতুন সংস্করণ) [মূর্ধন্য, ২০১৪]
৪. নজরুল-বীক্ষা [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১৩]
৫. অন্তর্বাহ [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১৩]
৬. রবীন্দ্রনাথ: ইংরেজি শেখানো [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৭. রবীন্দ্রনাথ ও মহাভারত [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৮. আলোচনা-সমালোচনা [মূর্ধন্য, ঢাকা, ২০১২]
৯. রবীন্দ্রনাথ: কম-জানা, অজানা [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১১]
১০. প্রসঙ্গ শিক্ষা এবং সাহিত্য [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৫]
১১. বাংলাদেশের কয়েকজন ঔপন্যাসিক [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৫]
১২. নজরুল বিষয়ক দশটি প্রবন্ধ [সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৪]
১৩. বাংলা কথাসাহিত্য: যাদুবাস্তবতা এবং অন্যান্য [ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০২]
১৪. নজরুলের ‘বাঁধনহারা’ [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০০]


সম্পাদনা—

১. সেকালের বাংলা সাময়িকপত্রে জাপান (সম্পাদনা) [নবযুগ, ঢাকা, ২০১২]
২. জাপান প্রবাস (সম্পাদনা) [দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১২]
৩. অগ্রন্থিত মোজাফফর হোসেন (সম্পাদনা) [গদ্যপদ্য, ঢাকা, ২০১১]
৪. কোড়কদী একটি গ্রাম (সম্পাদনা) [কলি প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১১]


অনুবাদ—

১. Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspectives [ইন্ডিয়া সেন্টার ফাউন্ডেশন, জাপান, ২০১১]
২. Parobaas (ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস। অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের সাথে) [অনন্যা, ঢাকা, ২০০৯]
৩. Christian Religious Studies - Class V (এ এস এম এনায়েত করিমের সাথে) [এনসিটিবি, ঢাকা, ২০০৭]
৪. In the Eyes of Kazi Nazrul Islam: Kemal Pasha (অনুবাদ প্যানেলের সদস্য) [সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ২০০৬]
৫. Kazi Nazrul Islam: Speeches (অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের সাথে) [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০৫]
৬. Kazi Nazrul Islam: Selected Prose [নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০৪]

এমাজন কিন্ডল এডিশনে বই :

১. Kazi Nazrul Islam: Selected Prose www.amazon.com/Kazi-Nazrul-Islam-Selected-Prose-ebook/dp/B00864ZCLY/
২. Rabindranath Tagore: less-known Facts http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৩. Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspective http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৪. Worthy Reads from Bangladesh http://www.amazon.com/Rabindrath-Tagore-Less-Known-Facts-ebook/dp/B008CC3YLA/
৫. (Not) My Stories http://www.amazon.com/Not-Stories-Subrata-Kumar-Das-ebook/dp/B00880XDP8

ওয়েবসাইট : www.bdnovels.org
ই-মেইল : subratakdas@yahoo.com